প্রবন্ধ
চোখের বিনিময়ে জান্নাত
৪ জুলাই, ২০২৬
৭১
০
পৃথিবীর জীবনে মানুষ যত নিয়ামত ভোগ করে, তার মধ্যে দৃষ্টিশক্তি অন্যতম শ্রেষ্ঠ। চোখের মাধ্যমে মানুষ আল্লাহর সৃষ্টি দেখে, কুরআনের অক্ষর পড়ে, মা-বাবার মুখ দেখে, সন্তানের হাসি উপভোগ করে, জীবনের পথ চিনে নেয়। একটি মুহূর্তের জন্য চোখ বন্ধ করলে মানুষ উপলব্ধি করতে পারে, এই নিয়ামতের মূল্য কত অপরিসীম!
কিন্তু মহান আল্লাহ যিনি নিয়ামত দান করেন, তিনিই কখনো কখনো বান্দাকে সেই নিয়ামত ফিরিয়েও নেন। এটি তাঁর রাগের নিদর্শন নয়; বরং অনেক সময় বান্দাকে আরও উচ্চ মর্যাদায় উন্নীত করার জন্যই তিনি পরীক্ষা করেন। মুমিনের জীবনে বিপদ-আপদ, রোগ-ব্যাধি, দারিদ্র্য কিংবা অঙ্গহানি, এসবই আল্লাহর পক্ষ থেকে পরীক্ষা। যে ব্যক্তি ধৈর্য ধারণ করে, আল্লাহর ফয়সালায় সন্তুষ্ট থাকে এবং তাঁর প্রতিদানের আশা করে, সে দুনিয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত হলেও আখিরাতে হয়ে যায় মহাসফল।
চোখ হারানো মানুষের কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষাগুলোর একটি। কিন্তু ইসলাম এই পরীক্ষাকেও হতাশার কারণ বানায়নি; বরং এটিকে জান্নাত লাভের সুবর্ণ সুযোগে পরিণত করেছে। এমনকি একটি সহীহ হাদীসে রাসূলুল্লাহ ﷺ জানিয়েছেন, যে ব্যক্তি চোখ হারিয়ে ধৈর্য ধারণ করবে, তার প্রতিদান হবে জান্নাত। পৃথিবীর অল্প কষ্টের বিনিময়ে চিরস্থায়ী জান্নাত এর চেয়ে বড় সুসংবাদ আর কী হতে পারে?
দুনিয়া হলো পরীক্ষার স্থান:
মুমিনের জীবনে বিপদ আসা কোনো অস্বাভাবিক ঘটনা নয়। বরং এটি আল্লাহর নির্ধারিত সুন্নাহ। মহান আল্লাহ বলেন,
"আর অবশ্যই আমি তোমাদেরকে কিছুটা ভয়, ক্ষুধা এবং ধন-সম্পদ, জীবন ও ফল-ফসলের ক্ষয়ক্ষতির মাধ্যমে পরীক্ষা করব। আর আপনি ধৈর্যশীলদের সুসংবাদ দিন।"—(সূরা আল-বাকারা, ২:১৫৫)
পরবর্তী আয়াতে আল্লাহ ধৈর্যশীলদের পরিচয় দিয়েছেন,
"যাদের ওপর কোনো বিপদ আপতিত হলে তারা বলে, ‘নিশ্চয়ই আমরা আল্লাহরই এবং নিশ্চয়ই তাঁরই দিকে প্রত্যাবর্তনকারী।’"—(সূরা আল-বাকারা, ২:১৫৬)
আরও ইরশাদ হয়েছে,
"নিশ্চয়ই ধৈর্যশীলদের তাদের প্রতিদান অগণিতভাবে প্রদান করা হবে।"—(সূরা আয-যুমার, ৩৯:১০)
আল্লাহ তাআলা মানুষকে বিপদ দেন তাকে ধ্বংস করার জন্য নয়; বরং তাকে পরিশুদ্ধ করার জন্য। অনেক সময় একটি বিপদ এমন মর্যাদা এনে দেয়, যা বছরের পর বছর নফল ইবাদত করেও অর্জন করা সম্ভব হতো না।
চোখের বিনিময়ে জান্নাতের প্রতিশ্রুতি:
মানবজীবনের সবচেয়ে মূল্যবান নিয়ামতগুলোর একটি হলো দুটি চোখ। তাই রাসূলুল্লাহ ﷺ এই নিয়ামত হারানোর কষ্টের বিনিময়ে এমন প্রতিদানের ঘোষণা দিয়েছেন, যা শুনে প্রতিটি মুমিনের অন্তর আশায় ভরে ওঠে।
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন, আল্লাহ তাআলা বলেন, "যখন আমি আমার কোনো মুমিন বান্দাকে তার প্রিয় দুটি বস্তু (অর্থাৎ দুটি চোখ) দ্বারা পরীক্ষা করি, অতঃপর সে ধৈর্য ধারণ করে, তখন আমি তার জন্য জান্নাতকেই প্রতিদান হিসেবে নির্ধারণ করি।"—বুখারী, হাদীস নং ৫৬৫৩।
এই হাদীসে "দুটি প্রিয় বস্তু" বলতে দুই চোখকে বোঝানো হয়েছে। কারণ মানুষের কাছে দৃষ্টিশক্তির চেয়ে প্রিয় ও মূল্যবান অঙ্গ খুব কমই আছে। চোখ হারানোর কষ্ট অসহনীয় হলেও, যদি সে আল্লাহর ওপর অভিযোগ না করে, ধৈর্য ধারণ করে এবং সওয়াবের আশা রাখে, তাহলে তার প্রতিদান স্বয়ং জান্নাত।
এখানে লক্ষণীয় বিষয় হলো, হাদীসে ধৈর্যের কথা বলা হয়েছে। শুধু অন্ধ হওয়াই জান্নাতের নিশ্চয়তা নয়; বরং সেই পরীক্ষায় আল্লাহর ওপর সন্তুষ্ট থাকা, অভিযোগ না করা, ঈমান অটুট রাখা এবং সওয়াবের আশা করাই জান্নাত লাভের কারণ।
এ কারণেই একজন মুমিন বিপদকে শুধু কষ্ট হিসেবে দেখে না; বরং এটিকে আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের একটি সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করে। যে চোখ আজ দুনিয়ার আলো দেখতে পায় না, সেই চোখের মালিক যদি ধৈর্যশীল হয়, তবে কিয়ামতের দিন সে এমন জান্নাতের আলো দেখবে, যার সৌন্দর্য কখনো নিঃশেষ হবে না।
ধৈর্যের প্রকৃত অর্থ: অভিযোগ নয়, আল্লাহর ফয়সালায় সন্তুষ্টি:
চোখ হারানো নিঃসন্দেহে মানুষের জীবনের অন্যতম কঠিন পরীক্ষা। একজন মানুষ হঠাৎ করেই পৃথিবীর রঙ, আপনজনের মুখ, কুরআনের অক্ষর কিংবা প্রকৃতির সৌন্দর্য দেখা থেকে বঞ্চিত হয়ে যায়। এমন পরিস্থিতিতে অন্তর ভেঙে পড়া স্বাভাবিক। কিন্তু একজন মুমিনের বৈশিষ্ট্য হলো, সে কষ্ট অনুভব করে, চোখের পানি ঝরায়; তবুও আল্লাহর সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে না। সে বিশ্বাস করে, যে রব দৃষ্টিশক্তি দিয়েছিলেন, তিনিই তা ফিরিয়ে নিয়েছেন, আর তিনি কখনো তাঁর বান্দার প্রতি অবিচার করেন না।
মহান আল্লাহ বলেন,
“হে মুমিনগণ! তোমরা ধৈর্য ও সালাতের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সঙ্গে আছেন।”—(সূরা আল-বাকারা, ২:১৫৩)
আবার আল্লাহ বলেন,
“যে ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তার জন্য উত্তরণের পথ বের করে দেন এবং তাকে এমন উৎস থেকে রিযিক দান করেন, যা সে কল্পনাও করতে পারে না।”—(সূরা আত-তালাক, ৬৫: ২–৩)
অনেক সময় মানুষ মনে করে, অন্ধত্বই তার জীবনের সমাপ্তি। অথচ আল্লাহর কাছে বিষয়টি সম্পূর্ণ ভিন্ন। দুনিয়ার একটি নিয়ামত চলে গেলেও আখিরাতের অসীম নিয়ামত তার জন্য অপেক্ষা করতে পারে। তাই একজন মুমিন বাহ্যিক ক্ষতির দিকে নয়; বরং আল্লাহর প্রতিশ্রুত প্রতিদানের দিকেই তাকিয়ে থাকে।
ধৈর্যের সর্বোত্তম নমুনা:
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, “প্রকৃত ধৈর্য তো সেটিই, যা প্রথম আঘাতের সময় প্রকাশ পায়।”—বুখারী, হাদীস নং ১২০৮; মুসলীম, হাদীস নং ৯২৬।
অর্থাৎ বিপদ আসার অনেক পরে নিজেকে সামলে নেওয়া সহজ হতে পারে; কিন্তু প্রকৃত ধৈর্য হলো, যখন বিপদ প্রথম আসে, তখনই আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে নিজেকে সংযত রাখা।
চোখ হারানোর মতো কঠিন পরীক্ষায় এই ধৈর্যই মানুষকে জান্নাতের উপযুক্ত করে তোলে।
এক অন্ধ সাহাবিয়ার জন্য জান্নাতের সুসংবাদ:
একজন মহিলা, যিনি মৃগীরোগে আক্রান্ত ছিলেন, মাঝে মাঝে অজ্ঞান হয়ে যেতেন এবং তখন তাঁর শরীরের কিছু অংশ অনিচ্ছাকৃতভাবে উন্মুক্ত হয়ে পড়ত। তিনি রাসূলুল্লাহ ﷺ–এর কাছে এসে বললেন,
“হে আল্লাহর রাসূল! আমার জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করুন, যেন তিনি আমাকে সুস্থ করে দেন।”
রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁকে দুটি পথের কথা বললেন, “তুমি চাইলে ধৈর্য ধারণ করো, আর তোমার জন্য থাকবে জান্নাত। আর চাইলে আমি আল্লাহর কাছে দোয়া করি, তিনি তোমাকে সুস্থ করে দেবেন।” মহীয়সী সেই নারী উত্তর দিলেন, “আমি ধৈর্য ধারণ করব। তবে আমার শরীর যেন উন্মুক্ত না হয়, সে জন্য আপনি আল্লাহর কাছে দোয়া করুন।” তখন রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁর জন্য দোয়া করলেন।— বুখারী, হাদীস নং ৫২৪৯
এই ঘটনা আমাদের একটি অসাধারণ শিক্ষা দেয়। সেই নারী সাময়িক সুস্থতার চেয়ে চিরস্থায়ী জান্নাতকে অধিক মূল্যবান মনে করেছিলেন। তিনি জানতেন, দুনিয়ার কষ্ট কয়েক বছরের; কিন্তু জান্নাতের সুখ অনন্তকালের।
যে ব্যক্তি চোখ হারিয়ে ধৈর্য ধারণ করে, কিংবা অন্য কোনো কঠিন পরীক্ষায় আল্লাহর ওপর সন্তুষ্ট থাকে, তারও লক্ষ্য হওয়া উচিত এই অনন্ত প্রতিদান।
দুনিয়ার অন্ধত্ব নয়, ভয়ংকর হলো অন্তরের অন্ধত্ব:
অনেক মানুষ দৃষ্টিশক্তি থাকা সত্ত্বেও সত্যকে দেখতে পায় না। আবার অনেক অন্ধ মানুষ ঈমান, তাকওয়া ও আল্লাহর পরিচয়ে এমন উচ্চতায় পৌঁছে যান, যা অনেক সুস্থ মানুষও অর্জন করতে পারেন না।
মহান আল্লাহ বলেন, “নিশ্চয়ই চোখ অন্ধ হয় না; বরং অন্ধ হয় বক্ষস্থিত অন্তর।”— (সূরা আল-হাজ্জ, ২২:৪৬)
এই আয়াত আমাদের শেখায়, প্রকৃত বিপদ শুধু দৃষ্টিশক্তি হারানো নয়; বরং আল্লাহকে ভুলে যাওয়া, সত্যকে অস্বীকার করা এবং অন্তরকে মৃত করে ফেলা।
অতএব যে ব্যক্তি দৃষ্টিশক্তি হারিয়েও ঈমান রক্ষা করতে পারে, আল্লাহর প্রতি আস্থা অটুট রাখে এবং ধৈর্যের সঙ্গে জীবন অতিবাহিত করে, সে প্রকৃত অর্থে ক্ষতিগ্রস্ত নয়। বরং সে এমন এক ব্যবসা করেছে, যার লাভ হবে চিরস্থায়ী জান্নাত।
সালাফে সালিহীনের জীবনে ধৈর্যের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত:
ইসলামের ইতিহাসে এমন বহু মুহাদ্দীস আলেম ও নেককার ব্যক্তি ছিলেন, যারা জীবনের শেষভাগে/ শুরুতেই দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছিলেন। কিন্তু তাঁরা এটিকে আল্লাহর শাস্তি মনে করেননি; বরং তাঁর ফয়সালার প্রতি সন্তুষ্ট থেকে ইলম, ইবাদত ও দাওয়াতের কাজ চালিয়ে গেছেন।
প্রসিদ্ধ মুহাদ্দিস ও ফকীহ আতা ইববে আবি রাবাহ (রহ.) ছিলেন দৃষ্টিহীন। শারীরিকভাবে দুর্বল হলেও তিনি ছিলেন মক্কার সর্বশ্রেষ্ঠ ফকীহদের অন্যতম। সাহাবায়ে কেরামও তাঁর ইলমের প্রশংসা করতেন। দৃষ্টিশক্তি না থাকলেও আল্লাহ তাঁর অন্তরকে ইলমের নূরে আলোকিত করেছিলেন। তাঁর জীবন প্রমাণ করে চোখের আলো নিভে গেলেও ঈমান ও ইলমের আলো কখনো নিভে যায় না।
ইমাম বুখারী (রহ.)-এর পিতা-মাতা এবং শৈশবের এক বিস্ময়কর ঘটনা:
ইমাম বুখারী (রহ.)-এর পিতা নিজেও একজন মুহাদ্দিস ছিলেন। তিনি হাদীস বর্ণনায় বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। ইলমে হাদীসের ছাত্ররা তাঁর কাছে আসতেন এবং ইরাকের আলেমগণও তাঁর কাছ থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য শিষ্যদের মধ্যে ছিলেন ইয়াহইয়া ইবন জা‘ফার আল-বায়কান্দী, যিনি পরবর্তীতে ইমাম বুখারী (রহ.)-কে তাঁর পিতার সূত্রে হাদীস বর্ণনা করেন। এছাড়া আহমদ ইবন জা‘ফার এবং নাসর ইবন হুসাইনও তাঁর শিষ্যদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন।
ইমাম বুখারী (রহ.) তাঁর ‘আত-তারীখুল কাবীর’ গ্রন্থে বিভিন্ন স্থানে তাঁর পিতার উল্লেখ করেছেন এবং সংক্ষিপ্তভাবে তাঁর জীবনীও তুলে ধরেছেন। এক স্থানে তিনি লিখেছেন,
“আমাদের শাইখ ইয়াহইয়া এবং অন্যরা আমার পিতার সূত্রে আমাকে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলতেন, ‘আমি হাম্মাদ ইবন যায়দকে দেখেছি। একবার মক্কায় আবদুল্লাহ ইবন মুবারক তাঁর কাছে এলে তিনি উভয় হাত দিয়ে তাঁর সঙ্গে মুসাফাহা করেছিলেন।’”
এছাড়া ইমাম আবু হাতিম মুহাম্মাদ ইবন হিব্বান (রহ.) তাঁর ‘আস-সিকাত’ গ্রন্থে ইমাম বুখারী (রহ.)-এর পিতাকে নির্ভরযোগ্য রাবীদের চতুর্থ স্তরে অন্তর্ভুক্ত করেছেন।
ইমাম বুখারী (রহ.)-এর মা:
ইমাম বুখারী (রহ.)-এর মায়ের নাম ইতিহাসে খুব বেশি সংরক্ষিত হয়নি। তিনি ছিলেন হাসান ও আহমদের জননী। যদিও তাঁর সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায় না, তবুও যে কয়েকটি বর্ণনা আমাদের কাছে পৌঁছেছে, সেগুলো থেকে জানা যায়, তিনি ছিলেন অত্যন্ত নেককার, পরহেযগার, ইবাদতগুজার এবং এমন একজন আল্লাহভীরু নারী, যার দোয়া আল্লাহ তাআলা কবুল করতেন। (মুস্তাজাবুদ দাওয়াহ) তিনি ইলমের মর্যাদা গভীরভাবে উপলব্ধি করতেন।
এ কারণেই তিনি ছোটবেলায় তাঁর পুত্রকে শিক্ষা অর্জনের জন্য মক্তবে পাঠিয়েছিলেন। পরে তাঁকে সঙ্গে নিয়ে হিজাজে গমন করেন, যাতে তিনি হজ আদায় করতে পারেন এবং একই সঙ্গে সে যুগের শ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস ও আলেমদের কাছে হাদীস শিক্ষা গ্রহণ ও তাঁদের সাক্ষাৎ লাভের সুযোগ পান। এরপর তিনি তাঁর বড় ছেলে আহমদকে সঙ্গে নিয়ে নিজ দেশে ফিরে আসেন; কিন্তু মুহাম্মাদ ইবন ইসমাঈল (ইমাম বুখারী)কে হিজাজেই থেকে ইলম অর্জনের অনুমতি দেন।
মায়ের দোয়ার বরকতে দৃষ্টিশক্তি ফিরে পাওয়া:
তাঁর সম্পর্কে একটি প্রসিদ্ধ ঘটনা বর্ণিত হয়েছে, যা আল্লাহর সঙ্গে তাঁর গভীর সম্পর্কের এক উজ্জ্বল প্রমাণ।
শৈশবে ইমাম বুখারী (রহ.)-এর দৃষ্টিশক্তি নষ্ট হয়ে যায়। এতে তাঁর মা অত্যন্ত মর্মাহত হন। কিন্তু তিনি হতাশ না হয়ে সর্বদা আল্লাহ তাআলার দরবারে অশ্রুসিক্ত নয়নে প্রার্থনা করতে থাকেন, যেন আল্লাহ তাঁর সন্তানের দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দেন।
এক রাতে তিনি স্বপ্নে আল্লাহর খলিল হযরত ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম)-কে দেখলেন। তিনি বললেন,
“তোমার সন্তানের জন্য তোমার অধিক পরিমাণ দোয়া ও কান্নার কারণে আল্লাহ তাআলা তার দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দিয়েছেন।”
পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে তিনি দেখলেন, আল্লাহ তাআলা সত্যিই তাঁর পুত্রকে সম্পূর্ণ সুস্থ করে দিয়েছেন এবং তাঁর দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দিয়েছেন।
এ ঘটনাটি সেই নেককার মায়ের আল্লাহর নিকট বিশেষ মর্যাদা ও তাঁর দোয়া কবুল হওয়ার এক অনন্য নিদর্শন। একই সঙ্গে এটি এ কথাও প্রকাশ করে যে, আল্লাহ তাআলা শৈশব থেকেই এই মহান শিশুটিকে তাঁর বিশেষ তত্ত্বাবধানে রেখেছিলেন, যাতে পরবর্তীকালে তিনি মুসলিম উম্মাহর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ইমাম ও হাদীসের অমর সেবকে পরিণত হন।
-আল মাদখাল ইলা সহীহিল বুখারী, পৃ. ২৬ (মুহাম্মাদ আবুল হুদা আল ইয়াকূবী।); তারিখে দিমাশক: ৫৫/৪২; সিয়ারু আলামিন নুবালা: ২৭৭–২৭৮; তবাক্বাতুশ শাফিয়িয়্যাহ ওয়াল কুবরা: ১/৪২৪–৪২৫।
অনুরূপভাবে বহু আলেম জীবনের শেষদিকে অন্ধ হয়ে যাওয়ার পরও হাদীস শিক্ষা দিয়েছেন, ফতোয়া প্রদান করেছেন এবং অসংখ্য ছাত্র গড়ে তুলেছেন। কারণ তাঁরা জানতেন, মানুষের মর্যাদা চোখের দৃষ্টিতে নয়; বরং তাকওয়া, ইলম ও আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের মধ্যেই প্রকৃত সম্মান।
মহান আল্লাহ বলেন,
“নিশ্চয়ই আল্লাহর নিকট তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তিই সর্বাধিক সম্মানিত, যে সর্বাধিক তাকওয়াবান।”– (সূরা আল-হুজুরাত, ৪৯:১৩)
এ আয়াত আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, মানুষের বাহ্যিক সৌন্দর্য, শক্তি কিংবা সুস্থতা নয়, আল্লাহর কাছে মূল্যবান হলো ঈমান ও তাকওয়া।
চোখের পরীক্ষা হলে একজন মুমিনের করণীয়:
যদি আল্লাহ কাউকে দৃষ্টিশক্তি হারানোর মতো কঠিন পরীক্ষায় ফেলেন, তাহলে তার করণীয় কী?
প্রথমত, আল্লাহর ফয়সালার ওপর সন্তুষ্ট থাকা এবং ধৈর্য ধারণ করা। মনে রাখতে হবে, যিনি নিয়ামত দিয়েছেন, তিনিই হিকমতের ভিত্তিতে তা ফিরিয়ে নিয়েছেন।
দ্বিতীয়ত, পাঁচ ওয়াক্ত সালাত, কুরআন তিলাওয়াত (শোনা বা মুখস্থ পাঠ), যিকির ও দোয়ার মাধ্যমে আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক আরও দৃঢ় করা।
তৃতীয়ত, মানুষের কাছে অভিযোগের পরিবর্তে আল্লাহর কাছে বেশি বেশি দোয়া করা। রাসূলুল্লাহ ﷺ বিপদে পড়লে আল্লাহর কাছেই সাহায্য চাইতেন।
চতুর্থত, জান্নাতের প্রতিশ্রুতিকে সব সময় স্মরণ রাখা। দুনিয়ার কষ্ট ক্ষণস্থায়ী; কিন্তু জান্নাতের সুখ চিরস্থায়ী।
মহান আল্লাহ বলেন, “তোমাদেরকে যে-সব কিছু দেওয়া হয়েছে, তা দুনিয়ার জীবনের সামান্য ভোগ্যবস্তু; আর আল্লাহর কাছে যা আছে, তা উত্তম ও অধিক স্থায়ী।”–(সূরা আল-কাসাস, ২৮:৬০)
সুতরাং, চোখ হারানো নিঃসন্দেহে মানুষের জীবনের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষাগুলোর একটি। কিন্তু একজন মুমিন জানে, আল্লাহ কখনো তাঁর বান্দার প্রতি অবিচার করেন না। তিনি যদি কোনো নিয়ামত ফিরিয়ে নেন, তবে তার পরিবর্তে এমন কিছু দান করেন, যা দুনিয়ার সব নিয়ামতের চেয়েও মূল্যবান হতে পারে।
যে মানুষ আজ দুনিয়ার সূর্য, চাঁদ, ফুল কিংবা আপনজনের মুখ দেখতে পায় না, সে যদি ধৈর্য ধারণ করে, আল্লাহর ফয়সালায় সন্তুষ্ট থাকে এবং তাঁর প্রতিদানের আশা করে, তবে কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাকে এমন এক জগতে প্রবেশ করাবেন, যেখানে আর কোনো অন্ধত্ব থাকবে না, থাকবে না কোনো কষ্ট, থাকবে না কোনো বিচ্ছেদ।
সেখানে থাকবে চিরসবুজ জান্নাত, প্রবাহিত নদী, অফুরন্ত শান্তি এবং সর্বোপরি মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি।
এ কারণেই রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সেই সুসংবাদ একজন মুমিনের হৃদয়ে আশার আলো জ্বালিয়ে দেয়, যে ব্যক্তি দুই চোখ হারিয়ে ধৈর্য ধারণ করবে, আল্লাহ তার প্রতিদান হিসেবে জান্নাত দান করবেন।
তাই আমাদের প্রত্যেকের উচিত আল্লাহর প্রতিটি নিয়ামতের শুকরিয়া আদায় করা, আর যদি কোনো নিয়ামত হারিয়ে যায়, তবে হতাশ না হয়ে ধৈর্য, দোয়া ও আল্লাহর প্রতি অটল বিশ্বাস নিয়ে জীবন অতিবাহিত করা। কারণ মুমিনের জীবনে কোনো কষ্টই অর্থহীন নয়; প্রতিটি অশ্রুবিন্দু, প্রতিটি দীর্ঘশ্বাস এবং প্রতিটি ধৈর্যের মুহূর্ত আল্লাহর কাছে সংরক্ষিত থাকে। আর সেই ধৈর্যের সর্বোত্তম প্রতিদান হলো, চিরস্থায়ী জান্নাত।
মন্তব্য (...)
এ সম্পর্কিত আরও প্রবন্ধ
সৎ জীবনে দারিদ্র্য মুমিনের ঐশ্বর্য
এক . রাহমাতুল্লিল আলামীন হযরত রাসূলে আরাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। তাঁর সামনে উপস্থিত ফেরেশত...
সংঘাতময় পরিস্থিতি: উপেক্ষিত নববী আদর্শ
দিনে দিনে উত্তপ্ত হয়ে উঠছে পৃথিবী। সমতালে এর অধিবাসীরাও 'গরম' হয়ে উঠছে দিনকে দিন। সেই তাপ ও উত্তাপ ব...
শান্তি সম্প্রীতি ও উদারতার ধর্ম ইসলাম
নামে যার শান্তির আশ্বাস তার ব্যাপারে আর যাই হোক, সন্ত্রাসের অপবাদ দেয়ার আগে তার স্বরূপ উদঘাটনে দু'দণ...
আদর্শ শিক্ষকের গুণাবলী
[প্রদত্ত বয়ান থেকে সংগৃহীত] হামদ ও সালাতের পর... আদর্শ শিক্ষকের পরিচয় হলো- যে শিক্ষক তার নিবিড় অধ...
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন