প্রবন্ধ
প্রতিটি কাজ ইখলাসের সাথে করা
২৮ জুন, ২০২৬
৪৭৮
০
ইসলাম এমন একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা, যেখানে মানুষের প্রতিটি কথা, কাজ, চিন্তা, অনুভূতি ও উদ্দেশ্য পর্যন্ত মূল্যায়িত হয়। এ কারণে ইসলামে শুধু বাহ্যিক আমলের প্রতি গুরুত্বারোপ করা হয়নি; বরং আমলের অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য ও নিয়তের বিশুদ্ধতাকেই সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বাহ্যিকভাবে দুটি আমল একই রকম হতে পারে, কিন্তু নিয়তের ভিন্নতার কারণে আল্লাহ তাআলার কাছে একটির মর্যাদা আসমানসম উচ্চে পৌঁছে যায়, আর অন্যটি সম্পূর্ণ মূল্যহীন হয়ে পড়ে।
মানুষের জীবনে এমন অনেক কাজ আছে, যা অন্যের চোখে অত্যন্ত প্রশংসনীয়। কেউ মসজিদ নির্মাণ করে, কেউ দান-সদকা করে, কেউ দ্বীনের দাওয়াত দেয়, কেউ কুরআন শিক্ষা দেয়, আবার কেউ দীর্ঘ সময় ইবাদতে অতিবাহিত করে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এসব আমল কি আল্লাহ তাআলার নিকট অবশ্যই কবুল হবে? এর উত্তর কুরআন ও সুন্নাহ আমাদের সামনে অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরেছে। আমল কবুল হওয়ার প্রথম এবং প্রধান শর্ত হলো, আমলটি একমাত্র আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টির জন্য হতে হবে। এর নামই ইখলাস।
ইখলাস এমন এক মহামূল্যবান সম্পদ, যা প্রতিটি নেক আমলের প্রাণ। দেহ থেকে প্রাণ বের হয়ে গেলে যেমন তার আর কোনো মূল্য থাকে না, তেমনি আমল থেকে ইখলাস চলে গেলে সেই আমলেরও প্রকৃত মূল্য থাকে না। ইখলাসবিহীন আমল বাহ্যিকভাবে যত বড়ই হোক না কেন, তা আল্লাহর নিকট গ্রহণযোগ্য হয় না। পক্ষান্তরে ইখলাসপূর্ণ একটি ক্ষুদ্র আমলও মহান রবের নিকট অপরিসীম মর্যাদা লাভ করে।
এ কারণেই কুরআন মাজীদের অসংখ্য আয়াতে আল্লাহ তাআলা বান্দাকে ইবাদতের পরিমাণ বৃদ্ধির আগে ইবাদতের বিশুদ্ধতার প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। রাসূলুল্লাহ ﷺ-ও তাঁর উম্মতকে সর্বাগ্রে নিয়ত সংশোধনের শিক্ষা দিয়েছেন। সাহাবায়ে কেরাম (রাযিয়াল্লাহু আনহুম), তাবিঈন এবং সালাফে সালেহীনের জীবন পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, তাঁরা আমলের চেয়ে আমল কবুল হওয়ার ব্যাপারেই অধিক চিন্তিত ছিলেন। কারণ তাঁরা জানতেন, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলা শুধু আমলের সংখ্যা দেখবেন না; বরং দেখবেন সেই আমলের অন্তরে কতটুকু ইখলাস ছিল।
আজ আমাদের সমাজে বাহ্যিক আমলের প্রতি আগ্রহ বৃদ্ধি পেলেও ইখলাসের চর্চা তুলনামূলকভাবে কমে যাচ্ছে। অনেক সময় মানুষ আল্লাহর সন্তুষ্টির চেয়ে মানুষের প্রশংসা, জনপ্রিয়তা, অনুসারী বৃদ্ধি, সামাজিক মর্যাদা কিংবা পার্থিব স্বার্থকে বেশি গুরুত্ব দিয়ে ফেলে। ফলে অজান্তেই অনেক নেক আমল রিয়া (লোক দেখানো) দ্বারা বিনষ্ট হয়ে যায়। অথচ রাসূলুল্লাহ ﷺ উম্মতের জন্য যে বিষয়গুলোর ব্যাপারে সবচেয়ে বেশি আশঙ্কা করেছেন, তার অন্যতম হলো এই গোপন শিরক তথা রিয়া।
অতএব, একজন মুমিনের জন্য সবচেয়ে বড় প্রয়োজন হলো, নিজের প্রতিটি আমলের আগে, আমলের সময় এবং আমলের পরে নিজের অন্তরকে পরীক্ষা করা; আমি কার জন্য এই কাজ করছি? যদি উত্তর হয় "একমাত্র আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টির জন্য", তবে সে আমলই ইখলাসের আমল।
ইখলাসের পরিচয়
'ইখলাস' শব্দটি আরবি (الإخلاص) থেকে এসেছে। এর মূল ধাতু (خ ل ص)। এর অর্থ, বিশুদ্ধ হওয়া, খাঁটি হওয়া, ভেজালমুক্ত হওয়া, মিশ্রণমুক্ত হওয়া।
আরবরা বিশুদ্ধ মধুকে عسل خالص এবং খাঁটি দুধকে لبن خالص বলে থাকে। অর্থাৎ যে জিনিসের মধ্যে অন্য কোনো ভেজাল বা মিশ্রণ নেই, তাকেই 'খালিস' বলা হয়।
ইসলামী পরিভাষায় ইখলাস হলো,
সমস্ত ইবাদত, আনুগত্য ও নেক আমল একমাত্র আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে সম্পাদন করা এবং তাতে মানুষের প্রশংসা, সুনাম, প্রতিদান, মর্যাদা কিংবা অন্য কোনো পার্থিব স্বার্থকে উদ্দেশ্য না করা।
ইবনুল কাইয়্যিম আল-জাওযিয়্যাহ বলেন,‘‘ইখলাস হলো বান্দার সকল ইচ্ছা, উদ্দেশ্য ও আমলকে একমাত্র আল্লাহর জন্য নিবেদিত করে দেওয়া।’’
আর আল-ফুদাইল ইবনু 'ইয়াদ বলেন, ‘‘মানুষের কারণে আমল ছেড়ে দেওয়া রিয়া, আর মানুষের জন্য আমল করা শিরক। পক্ষান্তরে আল্লাহ উভয়টি থেকে রক্ষা করলে সেটিই ইখলাস।’’
এই সংক্ষিপ্ত কথার মধ্যেই ইখলাসের প্রকৃত পরিচয় ফুটে উঠেছে। অনেক সময় মানুষ লোক দেখানোর ভয়ে নেক কাজই ছেড়ে দেয়। এটিও সঠিক নয়। আবার মানুষের প্রশংসা লাভের জন্য নেক কাজ করা তো আরও ভয়াবহ। প্রকৃত ইখলাস হলো, মানুষ কী বলল বা কী বলল না, সে দিকে ভ্রুক্ষেপ না করে একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টিকে উদ্দেশ্য করে আমল করা।
কুরআনের আলোকে ইখলাসের অপরিহার্যতা
কুরআন মাজীদে বিভিন্ন স্থানে ইখলাসকে ঈমান ও ইবাদতের ভিত্তি হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা ইবাদতের পরিমাণের আগে ইবাদতের বিশুদ্ধতা নিশ্চিত করতে নির্দেশ দিয়েছেন।
প্রথমেই আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,
وَمَا أُمِرُوا إِلَّا لِيَعْبُدُوا اللَّهَ مُخْلِصِينَ لَهُ الدِّينَ حُنَفَاءَ
"তাদেরকে কেবল এ নির্দেশই দেওয়া হয়েছে যে, তারা একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর ইবাদত করবে, তাঁর জন্যই দ্বীনকে বিশুদ্ধ রাখবে।"- (সূরা আল-বাইয়্যিনাহ, আয়াত ৫)
এই আয়াতে লক্ষণীয় বিষয় হলো, আল্লাহ তাআলা 'ইবাদত করো' বলেই থেমে যাননি; বরং বলেছেন, 'মুখলিসীন লাহুদ্দীন' অর্থাৎ দ্বীনকে সম্পূর্ণভাবে আল্লাহর জন্য বিশুদ্ধ করে ইবাদত করো। এর দ্বারা বোঝা যায়, ইখলাস ছাড়া ইবাদতের দাবি পূর্ণ হয় না।
অন্যত্র আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেন,
أَلَا لِلَّهِ الدِّينُ الْخَالِصُ
"জেনে রেখো! বিশুদ্ধ আনুগত্য ও ইবাদত একমাত্র আল্লাহরই প্রাপ্য।"- (সূরা আয-যুমার, আয়াত ৩)
এ আয়াতে 'الدين الخالص' বিশুদ্ধ দ্বীন, বলা হয়েছে। অর্থাৎ এমন ইবাদত, যার মধ্যে লোক দেখানো, অহংকার, আত্মপ্রচার বা পার্থিব স্বার্থের কোনো অংশ নেই।
এরপর আল্লাহ তাআলা স্বয়ং রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে নির্দেশ দিয়ে বলেন,
قُلْ إِنِّي أُمِرْتُ أَنْ أَعْبُدَ اللَّهَ مُخْلِصًا لَهُ الدِّينَ
"বলুন, আমাকে আদেশ করা হয়েছে যেন আমি একনিষ্ঠভাবে আল্লাহরই ইবাদত করি।"- (সূরা আয-যুমার, আয়াত ১১)
যিনি মানবজাতির সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যক্তি, সর্বাধিক ইখলাসসম্পন্ন বান্দা তাঁকেও যখন এ নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, তখন সাধারণ মুমিনদের জন্য এ নির্দেশ কত বেশি গুরুত্বপূর্ণ, তা সহজেই উপলব্ধি করা যায়।
আল্লাহ তাআলা আরও বলেন,
قُلْ إِنَّ صَلَاتِي وَنُسُكِي وَمَحْيَايَ وَمَمَاتِي لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ
"বলুন, নিশ্চয়ই আমার সালাত, আমার কুরবানি, আমার জীবন এবং আমার মৃত্যু, সবই আল্লাহ, বিশ্বজগতের প্রতিপালকের জন্য।"- (সূরা আল-আন‘আম, আয়াত ১৬২)
এ আয়াত শুধু ইবাদত নয়; বরং একজন মুমিনের সমগ্র জীবনব্যবস্থার ঘোষণা। একজন মুসলমানের নামাজ, রোযা, দান-সদকা, ব্যবসা, পরিবার, সমাজসেবা, দাওয়াত সবকিছুই আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য হওয়া উচিত। এটাই ইখলাসের সর্বোচ্চ স্তর।
আল্লাহ তাআলা আরও ইরশাদ করেন,
الَّذِي خَلَقَ الْمَوْتَ وَالْحَيَاةَ لِيَبْلُوَكُمْ أَيُّكُمْ أَحْسَنُ عَمَلًا
"তিনি মৃত্যু ও জীবন সৃষ্টি করেছেন, যাতে তিনি পরীক্ষা করেন, তোমাদের মধ্যে কে আমলের দিক থেকে সর্বাধিক উত্তম।"- (সূরা আল-মুলক, আয়াত ২)
এ আয়াতের ব্যাখ্যায় আল-ফুদাইল ইবনু 'ইয়াদ বলেন, "এখানে 'সর্বাধিক আমলকারী' বলা হয়নি; বরং 'সর্বোত্তম আমলকারী' বলা হয়েছে। আর উত্তম আমল হলো, যা একদিকে সর্বাধিক ইখলাসপূর্ণ এবং অন্যদিকে সুন্নাহ অনুযায়ী সম্পাদিত। যদি আমল ইখলাসপূর্ণ হয় কিন্তু সুন্নাহসম্মত না হয়, তবে তা গ্রহণযোগ্য নয়। আবার সুন্নাহসম্মত হলেও যদি ইখলাস না থাকে, তবুও তা কবুল হবে না।"
এ কথাটি ইসলামের একটি মৌলিক নীতিকে স্পষ্ট করে দেয়, আমল কবুল হওয়ার জন্য ইখলাস ও ইত্তিবাউস সুন্নাহ উভয়টি অপরিহার্য।
হাদীসের আলোকে ইখলাসের অপরিহার্যতা
কুরআন মাজীদে ইখলাসের যে গুরুত্ব বর্ণিত হয়েছে, রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁর হাদীসসমূহে তা আরও সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন। হাদীস অধ্যয়ন করলে দেখা যায়, তিনি উম্মতকে সর্বাগ্রে যে বিষয়টির প্রতি সতর্ক করেছেন, তা হলো, আমল যেন আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টির জন্য হয়। কারণ ইখলাসই হলো প্রতিটি আমলের রূহ, ভিত্তি ও সৌন্দর্য।
১. সকল আমলের ভিত্তি নিয়ত
ইসলামের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ হাদীসগুলোর একটি হলো,
عَنْ أَمِيرِ الْمُؤْمِنِينَ أَبِي حَفْصٍ عُمَرَ بْنِ الْخَطَّابِ رضي الله عنه قَالَ: سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ ﷺ يَقُولُ: إِنَّمَا الْأَعْمَالُ بِالنِّيَّاتِ، وَإِنَّمَا لِكُلِّ امْرِئٍ مَا نَوَى...
উমর ইবনুল খাত্তাব (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে বলতে শুনেছি,
"সমস্ত আমল নিয়তের ওপর নির্ভরশীল। আর প্রত্যেক ব্যক্তি তাই পাবে, যা সে নিয়ত করেছে।"- সহীহ বুখারী, হাদীস নং: ১
এই হাদীসকে মুহাদ্দিসগণ ইসলামের অন্যতম মৌলিক ভিত্তি হিসেবে গণ্য করেছেন। ইমাম আশ-শাফিঈ বলেন, "এই একটি হাদীস ইসলামের জ্ঞানের এক-তৃতীয়াংশের প্রতিনিধিত্ব করে।"
কারণ মানুষের প্রতিটি কাজের পেছনে একটি উদ্দেশ্য থাকে। একই কাজ একজনকে জান্নাতের অধিবাসী করতে পারে, আবার একই কাজ অন্যজনকে জাহান্নামের দিকে নিয়ে যেতে পারে। পার্থক্য শুধু নিয়তের। কেউ দান করে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য, আর কেউ করে মানুষের প্রশংসা পাওয়ার জন্য। বাহ্যিকভাবে কাজ একই; কিন্তু আল্লাহর কাছে এ দুটির মূল্য কখনো সমান নয়।
এ হাদীস থেকে আরও জানা যায়, ইখলাস শুধু ইবাদতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং একজন মুমিনের ঘুম, খাওয়া, উপার্জন, পরিবারকে সময় দেওয়া, সন্তান লালন-পালন, এমনকি বৈধ আনন্দ-বিনোদনও নেক আমলে পরিণত হতে পারে, যদি তার নিয়ত হয় আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন।
২. আল্লাহ অন্তরের দিকে দৃষ্টি দেন
মানুষ সাধারণত বাহ্যিক চাকচিক্য দেখে মুগ্ধ হয়। কিন্তু আল্লাহ তাআলার বিচার সম্পূর্ণ ভিন্ন। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন,
إِنَّ اللَّهَ لَا يَنْظُرُ إِلَى صُوَرِكُمْ وَأَمْوَالِكُمْ، وَلَكِنْ يَنْظُرُ إِلَى قُلُوبِكُمْ وَأَعْمَالِكُمْ
"নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের চেহারা ও সম্পদের দিকে তাকান না; বরং তিনি তোমাদের অন্তর ও আমলের দিকে তাকান।"- সহীহ মুসলিম, হাদীস নং: ২৫৬৩
এ হাদীস আমাদের শিক্ষা দেয় যে, আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্যতার মানদণ্ড মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি নয়। সমাজে কেউ খুব প্রসিদ্ধ হতে পারে, আবার কেউ সম্পূর্ণ অখ্যাত হতে পারে; কিন্তু আল্লাহর কাছে অখ্যাত সেই বান্দাই অধিক মর্যাদাবান হতে পারে, যার অন্তর ইখলাসে পরিপূর্ণ।
আজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে অনেক সময় মানুষ নেক আমলের চেয়ে নেক আমল প্রকাশের প্রতি বেশি আগ্রহী হয়ে পড়ে। অথচ একজন মুমিনের প্রথম চিন্তা হওয়া উচিত, আমার এ কাজটি আল্লাহর নিকট গ্রহণযোগ্য হলো কি না।
৩. আল্লাহ কেবল ইখলাসপূর্ণ আমলই গ্রহণ করেন
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,
إِنَّ اللَّهَ لَا يَقْبَلُ مِنَ الْعَمَلِ إِلَّا مَا كَانَ لَهُ خَالِصًا وَابْتُغِيَ بِهِ وَجْهُهُ
"আল্লাহ কেবল সেই আমলই গ্রহণ করেন, যা একমাত্র তাঁর জন্য করা হয়েছে এবং যার দ্বারা তাঁর সন্তুষ্টিই কামনা করা হয়েছে।"- নাসাঈ, হাদীস নং: ৩১৪০
এই হাদীস অত্যন্ত গভীর শিক্ষা বহন করে। আল্লাহ তাআলার কোনো অভাব নেই যে, তিনি মানুষের অসংখ্য আমলের মুখাপেক্ষী হবেন। তিনি চান বিশুদ্ধ অন্তর, খাঁটি উদ্দেশ্য এবং একনিষ্ঠ আনুগত্য।
সুতরাং ইবাদতের পরিমাণ বাড়ানোর আগে আমাদের চিন্তা করা উচিত, আমার ইবাদতের মধ্যে ইখলাস কতটুকু রয়েছে?
৪. কিয়ামতের দিনের প্রথম বিচার, এক ভয়াবহ শিক্ষা
ইখলাসের গুরুত্ব বোঝাতে রাসূলুল্লাহ ﷺ একটি অত্যন্ত হৃদয়বিদারক ঘটনা বর্ণনা করেছেন।
সুলাইমান ইবনে ইয়াসার (রাহঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা লোকজন যখন আবু হুরায়রা (রাযিঃ) এর নিকট থেকে বিদায় নিচ্ছিলো, তখন সিরিয়াবাসী নাতিল (রাহঃ) বললেন, হে শায়খ! আপনি রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর নিকট থেকে শুনেছেন এমন একখানা হাদীস আমাদেরকে শুনান। তিনি বললেন, হ্যাঁ (শুনাবো)।
আমি রাসূলুল্লাহ (ﷺ) কে বলতে শুনেছি, কিয়ামতের দিন সর্বপ্রথম যার বিচার করা হবে, সে হচ্ছে এমন একজন যে শহীদ হয়েছিল। তাঁকে হাযির করা হবে এবং আল্লাহ তাঁর নিআমত রাশির কথা তাকে বলবেন এবং সে তার সবটাই চিনতে পারবে (এবং যথারীতি তার স্বীকারোক্তিও করবে।) তখন আল্লাহ তাআলা বলবেনঃ এর বিনিময়ে কি আমল করেছিলে? সে বলবে, আমি আপনার (সন্তুষ্টির) জন্য যুদ্ধ করেছি এমন কি শেষ পর্যন্ত শহীদ হয়েছি। তখন আল্লাহ তাআলা বলবেনঃ তুমি মিথ্যা বলেছো। তুমি বরং এ জন্যেই যুদ্ধ করেছিলে যাতে লোকে তোমাকে বলে তুমি বীর। তা তো বলা হয়েছে। এরপর নির্দেশ দেওয়া হবে। সে মতে তাকে উপুড় করে হেঁচড়িয়ে নিয়ে যাওয়া হবে এবং জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।
তারপর এমন এক ব্যক্তির বিচার করা হবে, যে জ্ঞান অর্জন ও বিতরণ করেছে এবং কুরআন অধ্যয়ন করেছে। তখন তাকে হাযির করা হবে। আল্লাহ তাআলা তার প্রদত্ত নিআমতের কথা তাকে বলবেন এবং সে তা চিনতে পারবে (এবং যথারীতি তার স্বীকারোক্তিও করবে) তখন আল্লাহ তাআলা বলবেনঃ এত (বড় নিআমত পেয়ে বিনিময়ে) তুমি কি করলে? জবাবে সে বলবে, আমি জ্ঞান অর্জন করেছি এবং তা শিক্ষা দিয়েছি এবং আপনারই (সন্তুষ্টি লাভের) উদ্দেশ্যে কুরআন অধ্যয়ন করেছি। জবাবে আল্লাহ তাআলা বলবেনঃ তুমি মিথ্যা বলেছো। তুমি তো জ্ঞান অর্জন করেছিলে এজন্যে যাতে লোকে তোমাকে জ্ঞানী বলে। কুরআন তিলাওয়াত করেছিলে এ জন্যে যাতে লোকে বলে সে একজন ক্বারী। তা বলা হয়েছে। তারপর আদেশ দেওয়া হবে এবং তাকেও উপুড় করে হেঁচড়িয়ে নিয়ে যাওয়া হবে এবং জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।
তারপর এমন এক ব্যক্তির বিচার হবে যাকে আল্লাহ তাআলা স্বচ্ছলতা এবং সর্ববিধ সম্পদ দান করেছেন। তাকে হাযির করা হবে এবং তাকে প্রদত্ত নিআমত সমূহের কথা তাঁকে বলবেন। সে তা চিনতে পারবে (স্বীকারোক্তি করবে।) তখন তিনি (আল্লাহ তাআলা) বলবেনঃ এর বিনিময়ে তুমি কি আমল করেছো? জবাবে সে বলবে, সম্পদ ব্যয়ের এমন কোন খাত নেই যাতে সস্পদ ব্যয় আপনি পছন্দ করেন অথচ আমি সে খাতে আপনার (সন্তুষ্টির) জন্যে করিনি। তখন আল্লাহ তাআলা বলবেনঃ তুমি মিথ্যা বলছো। তুমি বরং এ জন্যে তা করেছিলে যাতে লোকে তোমাকে “দানবীর” বলে অবিহিত করে। তা বলা হয়েছে। তারপর নির্দেশ দেওয়া হবে, সে মতে তাকেও উপুড় করে হেঁচড়িয়ে নিয়ে যাওয়া হবে এবং জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।-মুসলিম, হাদীস নং: ১৯০৫
এ হাদীসের শিক্ষা অত্যন্ত ভয়াবহ। শহীদ হওয়া, ইলম অর্জন ও শিক্ষা দেওয়া, কুরআন তিলাওয়াত এবং দান-সদকা, এসব ইসলামের সর্বোচ্চ মর্যাদার আমল। কিন্তু ইখলাস না থাকার কারণে এগুলোই তাদের মুক্তির পরিবর্তে ধ্বংসের কারণ হয়ে গেল।
এ কারণেই সালাফে সালেহীন আমলের পরিমাণ নিয়ে যতটা না চিন্তা করতেন, তার চেয়ে বেশি চিন্তা করতেন আমলের ইখলাস নিয়ে।
৫. গোপন শিরকের ভয়
রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন,
عَنْ مَحْمُودِ بْنِ لَبِيدٍ ، أَنَّ النَّبِىَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ : « إِنَّ أَخْوَفَ مَا أَخَافُ عَلَيْكُمُ الشِّرْكُ الْأَصْغَرُ » قَالُوا : وَمَا الشِّرْكُ الْأَصْغَرُ يَا رَسُولَ اللَّهِ؟ قَالَ : " الرِّيَاءُ . (رواه احمد)
হযরত মাহমূদ ইবনে লবীদ (রা) থেকে বর্ণিত, নবী করীম ﷺ বলেছেন: আমি তোমাদের বেলায় যে জিনিসটার সবচেয়ে বেশী আশংকা করি। সেটা হচ্ছে ছোট শির্ক। সাহাবায়ে কেরাম জিজ্ঞাসা করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! ছোট শিকের অর্থ কি? তিনি উত্তর দিলেন, সেটা হচ্ছে রিয়া। (অর্থাৎ, কোন নেক কাজ মানুষকে দেখানোর জন্য করা।)- মা'আরিফুল হাদীস, হাদীস নং: ২৫৫
রিয়া এমন একটি রোগ, যা খুব অদৃশ্যভাবে মানুষের অন্তরে প্রবেশ করে। কখনও মানুষ নিজেও বুঝতে পারে না যে, তার আমলের মধ্যে মানুষের প্রশংসা পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা ঢুকে গেছে। তাই একজন মুমিনের উচিত সবসময় নিজের অন্তরকে পর্যবেক্ষণ করা এবং আল্লাহর নিকট ইখলাসের জন্য দোয়া করা।
ইখলাসের পথে সবচেয়ে বড় বাধা হলো নিজের নফস। নফস সবসময় চায় মানুষ তাকে প্রশংসা করুক, সম্মান করুক এবং তার সুনাম ছড়িয়ে পড়ুক। কিন্তু একজন সত্যিকার মুমিনের লক্ষ্য থাকে, মানুষ জানুক বা না জানুক, আল্লাহ যেন আমার আমল কবুল করেন।
সাহাবায়ে কেরামের জীবনে ইখলাসের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত
রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর পর এই উম্মতের সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ হলেন সাহাবায়ে কেরাম (রাযিয়াল্লাহু আনহুম)। তাঁদের মর্যাদার মূল কারণ শুধু রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সাহচর্য লাভ নয়; বরং তাঁদের ঈমান, তাকওয়া, ত্যাগ, আন্তরিকতা ও ইখলাস। তাঁরা যে কাজই করতেন, একমাত্র আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যেই করতেন। মানুষের প্রশংসা, দুনিয়ার মর্যাদা কিংবা ইতিহাসে নাম লেখানোর কোনো আকাঙ্ক্ষা তাঁদের ছিল না। তাই তাঁদের অল্প আমলও আল্লাহ তাআলার নিকট এত মহান মর্যাদা লাভ করেছে, যা পরবর্তীদের জন্য অনুসরণীয় আদর্শ হয়ে রয়েছে।
১. আবু বকর সিদ্দীক (রাযিয়াল্লাহু আনহু) ইখলাসের সর্বোচ্চ নমুনা:
উমার ইবন খাত্তাব (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ রাসূলুল্লাহ (ﷺ) একবার আমাদের সদকা করতে নির্দেশ দিলেন। ঐ সময় আমার কাছে বেশ কিছু ধন-সম্পদ ছিল। আমি মনে মনে বললামঃ যদি কোন দিন আবু বাকরকে আমি ডিঙ্গিয়ে যেতে পারি তবে এই সময়েই আমি তাঁকে ডিঙ্গাতে পারব। তাই আমি আমার সম্পর্কের অর্ধেক নিয়ে এসে হাযির হলাম। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন : তোমার পরিবারের জন্য কি অবশিষ্ট রেখেছ? আমি বললামঃ এর সমপরিমাণ সম্পদ।
আবু বাকর (রাযিঃ) নিয়ে এলেন তাঁর কাছে যা ছিল সব। নবী (ﷺ) তাঁকে জিজ্ঞাসা করলেন। হে আবু বাকর! তোমার পরিবারের জন্য কি অবশিষ্ট রেখে এসেছ?
তিনি বললেনঃ আমি তাদের জন্য আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে রেখে এসেছি। আমি বললামঃ কোন বিষয়ই কখনও আমি তাঁর অগ্রবর্তী হতে পারব না।- জামে' তিরমিযী, হাদীস নং: ৩৬৭৫
এই ঘটনা শুধু দানের নয়; বরং ইখলাসের। কারণ যিনি নিজের সবকিছু আল্লাহর জন্য বিলিয়ে দিতে পারেন, তাঁর অন্তরেই প্রকৃত ইখলাস বিদ্যমান।
২. গোপন দান, যেখানে মানুষ জানত না, আল্লাহ জানতেন
وَرَجُلٌ تَصَدَّقَ بِصَدَقَةٍ فَأَخْفَاهَا، حَتَّى لَا تَعْلَمَ شِمَالُهُ مَا تُنْفِقُ يَمِينُهُ
সাহাবায়ে কেরামের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিল, তাঁরা গোপনে নেক আমল করতে ভালোবাসতেন। কারণ তাঁরা জানতেন, গোপন আমল রিয়া থেকে অধিক নিরাপদ।
অনেক সাহাবি এমনভাবে দান করতেন যে, ডান হাত যা দিত, বাম হাতও তা জানতে পারত না। রাসূলুল্লাহ ﷺ যে সাত শ্রেণির সৌভাগ্যবান ব্যক্তির কথা বলেছেন, যারা কিয়ামতের দিন আল্লাহর আরশের ছায়া লাভ করবে, তাদের একজন হলো, "সে ব্যক্তি, যে এত গোপনে দান করে যে, তার ডান হাত যা ব্যয় করে, বাম হাতও তা জানতে পারে না।"- মা'আরিফুল হাদীস, হাদীস নং: ৫২
সাহাবায়ে কেরাম এ হাদীসকে শুধু শুনেই ক্ষান্ত হননি; বরং নিজেদের জীবনে বাস্তবায়ন করেছিলেন।
৩. আবু তালহা (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর প্রিয় বাগান দান
আনাস ইবনে মালিক (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত যে, মদীনায় আনসারদের মধ্যে আবু তালহার খেজুর বাগান-সম্পদ সবচাইতে বেশী ছিল। আর সকল সম্পদের মধ্যে তার কাছে সবচাইতে প্রিয় সম্পদ ছিল মসজিদের (নববীর) সামনে অবস্থিত বায়রুহা বাগানটি। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) সে বাগানে যেতেন এবং এর সুস্বাদু পানি পান করতেন। আনাস (রাযিঃ) বলেন, যখন নাযিল হলঃلَنْ تَنَالُوا الْبِرَّ حَتَّى تُنْفِقُوا مِمَّا تُحِبُّونَ তোমরা যা ভালবাস তা থেকে ব্যয় না করা পর্যন্ত তোমরা নেকী হাসিল করতে পারবে না। আবু তালহা (রাযিঃ) দাঁড়িয়ে বলেন, ‘ইয়া রাসূলাল্লাহ! আল্লাহ বলেছেনঃ তোমরা যা ভালবাস, তা থেকে ব্যয় না করা পর্যন্ত তোমরা কখনো নেকী হাসিল করতে পারবে না। আমার কাছে সবচাইতে প্রিয় সম্পদ হল বায়রুহা। সেটি আল্লাহর নামে সাদ্কা। আমি আল্লাহর কাছে এর নামে সাওয়াব ও কিয়ামতের সঞ্চয়ের আশা করি। আল্লাহর মর্জি অনুযায়ী আপনি তা ব্যয় করুন।’
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, ‘বেশ!, এটি লাভজনক সম্পদ অথবা (বললেন), অস্থায়ী সম্পদ।’ ইবনে মাসলামা সন্দেহ পোষণ করেন। (রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেন) তুমি যা বলেছ, আমি তা শুনেছি। আমার মতে তুমি তা তোমার আত্মীয়দের মধ্যে বন্টন করে দাও। আবু তালহা (রাযিঃ) বলেন, ‘ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি তা-ই করব।’ তারপর তিনি তা তাঁর আত্মীয় ও চাচাতো ভাইদের মধ্যে বন্টন করে দিলেন। ইসমাঈল, আব্দুল্লাহ ইবনে ইউসুফ, ইয়াহয়া ইবনে ইয়াহয়া (রহ) মালিক (রহ) এর (সন্দেহ ছাড়াই) رَايِحٌ (অস্থায়ী) বর্ণনা করেছেন- বুখারী, হাদীস নং: ২৭৬৯
এটাই ছিল ইখলাসের শিক্ষা। তিনি এমন জিনিসই আল্লাহর পথে ব্যয় করলেন, যা তাঁর হৃদয়ের সবচেয়ে প্রিয় ছিল।
৪. সাহাবায়ে কেরামের সবচেয়ে বড় চিন্তা, আমল কবুল হবে তো?
বর্তমানে আমরা অধিকাংশ সময় ভাবি, আমি কত বেশি আমল করতে পারলাম। কিন্তু সাহাবায়ে কেরাম (রাযিয়াল্লাহু আদনহুম)-এর চিন্তা ছিল ভিন্ন। তাঁরা ভাবতেন, আমার আমলটি আদৌ কবুল হলো কি না?
আল্লাহ তাআলা ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম) ও ইসমাঈল (আলাইহিস সালাম)-এর ঘটনা বর্ণনা করে বলেন,
"যখন তারা কাবার ভিত্তি উঁচু করছিলেন, তখন তাঁরা দোয়া করছিলেন, 'হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের পক্ষ থেকে এ আমল কবুল করে নিন।'"- (সূরা আল-বাকারা, আয়াত ১২৭)
কাবা নির্মাণের মতো মহান আমল সম্পন্ন করার পরও তাঁরা কবুলিয়াতের জন্য কাঁদছিলেন। সাহাবায়ে কেরামও এ শিক্ষা হৃদয়ে ধারণ করেছিলেন। তাই তাঁরা আমলের সংখ্যার চেয়ে কবুলিয়াতের জন্য বেশি দোয়া করতেন।
৫. ইখলাসই তাঁদের সাফল্যের মূল রহস্য
সাহাবায়ে কেরাম (রাযিয়াল্লাহু আনহুম)-এর জীবনের দিকে তাকালে দেখা যায়, তাঁদের সংখ্যা ছিল অল্প, সম্পদ ছিল সীমিত, সামরিক শক্তিও ছিল নগণ্য। কিন্তু তাঁদের অন্তরে ছিল পাহাড়সম ইখলাস। তাই আল্লাহ তাআলা তাঁদের অল্প আমলকে অনেক বরকত দান করেছেন, অল্প শক্তিকে প্রবল শক্তিতে রূপান্তরিত করেছেন এবং তাঁদের মাধ্যমে পৃথিবীর ইতিহাস পরিবর্তন করেছেন।
প্রকৃতপক্ষে, ইখলাস এমন একটি শক্তি, যা দুর্বল মানুষকে শক্তিশালী করে, অল্প আমলকে মহামূল্যবান করে এবং সীমিত সামর্থ্যকে অসীম বরকতের কারণ বানিয়ে দেয়। এ কারণেই সাহাবায়ে কেরামের জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো, আল্লাহ তাআলা আমলের পরিমাণের চেয়ে অন্তরের বিশুদ্ধতাকে অধিক মূল্য দেন।
অতএব, আমাদের প্রত্যেকের উচিত সাহাবায়ে কেরামের এই অনন্য আদর্শ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করা। আমল বাড়ানোর পাশাপাশি ইখলাস বৃদ্ধির জন্যও সমানভাবে চেষ্টা করা। কারণ ইখলাসই হলো আমলের প্রাণ, কবুলিয়াতের চাবিকাঠি এবং আখিরাতের সফলতার সর্বপ্রধান মাধ্যম।
সালাফে সালেহীনের জীবনে ইখলাস : আমাদের জন্য অনুকরণীয় আদর্শ
রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সাহাবায়ে কেরামের পর যাঁরা ইখলাস, তাকওয়া ও আল্লাহভীতিতে সর্বোচ্চ মর্যাদা লাভ করেছেন, তাঁরা হলেন সালাফে সালেহীন। তাঁরা জানতেন, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলার দরবারে আমলের আধিক্য নয়; বরং আমলের বিশুদ্ধতাই হবে মুক্তির মূল পুঁজি। এ কারণেই তাঁরা ইবাদত-বন্দেগির পাশাপাশি নিজের অন্তরকে শুদ্ধ করার প্রতি সর্বাধিক গুরুত্ব দিতেন। তাঁদের কাছে ইখলাস ছিল এমন এক অমূল্য সম্পদ, যা অর্জন করা যেমন কঠিন, তেমনি সারাজীবন ধরে তা রক্ষা করাও অত্যন্ত কঠিন।
সালাফে সালেহীনের জীবনী অধ্যয়ন করলে একটি বিষয় খুব স্পষ্ট হয়ে ওঠে, তাঁরা মানুষের সামনে বড় হওয়ার চেষ্টা করেননি; বরং আল্লাহর নিকট গ্রহণযোগ্য হওয়ার চেষ্টা করেছেন। তাঁরা কখনো মানুষের প্রশংসায় আনন্দিত হতেন না, আবার মানুষের নিন্দায়ও ভেঙে পড়তেন না। তাঁদের একমাত্র চিন্তা ছিল, "আমার রব কি আমার প্রতি সন্তুষ্ট?"
ইখলাস অর্জনই ছিল তাঁদের সবচেয়ে বড় সংগ্রাম
সুফইয়ান আস-সাওরী (রহ.) বলেন, «ما عالجت شيئًا أشد عليَّ من نيتي؛ لأنها تتقلب عليَّ.»
"আমার নিয়তের সংশোধনের চেয়ে কঠিন আর কোনো বিষয়ের মোকাবিলা আমাকে করতে হয়নি। কারণ নিয়ত বারবার পরিবর্তিত হতে থাকে।"
এ উক্তি একজন মহান ইমামের। অথচ তিনি ছিলেন যুগশ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস, ফকীহ ও আল্লাহভীরু ব্যক্তি। তবুও তিনি নিজের নিয়ত নিয়ে নিরাপদ বোধ করেননি। বরং সবসময় ভয় করতেন, কখন যে শয়তান বা নফস মানুষের প্রশংসার আকাঙ্ক্ষা অন্তরে ঢুকিয়ে দেয়!
আজ আমাদের অবস্থা সম্পূর্ণ বিপরীত। আমরা অনেক সময় আমল নিয়ে নিশ্চিন্ত হয়ে যাই; কিন্তু সালাফে সালেহীন আমলের পরেও নিজেদের নিয়ত নিয়ে কাঁদতেন।
মানুষের জন্য আমল করা শিরক, মানুষের ভয়ে আমল ছেড়ে দেওয়াও ভুল
আল-ফুদাইল ইবনু 'ইয়াদ (রহ.)-এর একটি বিখ্যাত উক্তি রয়েছে, «ترك العمل لأجل الناس رياء، والعمل لأجل الناس شرك، والإخلاص أن يعافيك الله منهما.»
অর্থাৎ, "মানুষের কারণে কোনো নেক আমল ছেড়ে দেওয়া রিয়া; মানুষের সন্তুষ্টির জন্য আমল করা শিরক; আর আল্লাহ যখন এ উভয় অবস্থা থেকে বান্দাকে রক্ষা করেন, তখন সেটিই ইখলাস।"
এই উক্তির মধ্যে ইখলাসের একটি সূক্ষ্ম শিক্ষা নিহিত রয়েছে। অনেক সময় মানুষ বলে, "লোকেরা আমাকে ভালো বলবে, তাই আমি এই নেক কাজটি করব না।" এটিও শয়তানের একটি কৌশল। আবার কেউ মানুষের প্রশংসা পাওয়ার জন্য আমল করে। এটিও মারাত্মক বিপজ্জনক। প্রকৃত ইখলাস হলো, মানুষের প্রশংসা বা নিন্দার দিকে দৃষ্টি না দিয়ে একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কাজ করে যাওয়া।
গোপন আমলকে তাঁরা অধিক ভালোবাসতেন
সালাফে সালেহীনের জীবনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল, তাঁরা গোপনে নেক আমল করতে অত্যন্ত আগ্রহী ছিলেন। কারণ তাঁরা বিশ্বাস করতেন, গোপন আমল রিয়া থেকে অধিক নিরাপদ।
আয়্যুব আস-সাখতিয়ানী (রহ.) সম্পর্কে বর্ণিত আছে, তিনি বহু বছর রাতের বেলা তাহাজ্জুদ পড়তেন। কিন্তু দিনের বেলায় এমনভাবে আচরণ করতেন, যেন তিনি রাতে সাধারণ মানুষের মতোই ঘুমিয়েছেন। তাঁর পরিবার বা নিকটবর্তী অনেকেই দীর্ঘদিন তাঁর নিয়মিত তাহাজ্জুদের বিষয়টি জানতেন না।
আবার যখন তিনি কুরআন তিলাওয়াত করতে করতে অশ্রুসিক্ত হয়ে পড়তেন এবং আশঙ্কা করতেন যে, কেউ তা দেখে ফেলবে, তখন কৌশলে মুখ ফিরিয়ে নিতেন অথবা কাশির ভান করতেন, যেন মানুষ তাঁর কান্নার প্রকৃত কারণ বুঝতে না পারে।
এ ছিল তাঁদের ইখলাসের পরিচয়। তাঁরা মানুষের সামনে কান্না দেখাতে চাননি; তাঁরা চেয়েছেন আল্লাহ তাঁদের অন্তরের অবস্থা জানুন।
নিজের আমলকে কখনো বড় মনে করতেন না
আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক (রহ.) বলেন, "কত ছোট আমল নিয়তের কারণে বড় হয়ে যায়, আর কত বড় আমল নিয়তের ত্রুটির কারণে ছোট হয়ে যায়।"
এই কথাটি ইখলাসের প্রকৃত মূল্য বুঝিয়ে দেয়। আল্লাহর কাছে আমলের পরিমাণ মুখ্য নয়; বরং নিয়তের বিশুদ্ধতাই মুখ্য।
এক ব্যক্তি হয়তো দুই রাকাআত নামাজ পড়ল। কিন্তু সে এমন ইখলাসের সঙ্গে তা আদায় করল যে, আল্লাহ তাআলা তা কবুল করে নিলেন। অন্যদিকে আরেক ব্যক্তি দীর্ঘ সময় ইবাদত করল; কিন্তু তাতে যদি আত্মপ্রশংসা, লোকদেখানো বা দুনিয়াবি স্বার্থ মিশে যায়, তাহলে সেই আমল মূল্যহীন হয়ে যেতে পারে।
ইখলাস গোপন রাখার চেষ্টা
বিশর আল-হাফী (রহ.) বলতেন, "মানুষের কাছে পরিচিত হওয়ার চেয়ে অজ্ঞাত থাকা আমার কাছে বেশি প্রিয়।" কারণ তিনি জানতেন, মানুষের পরিচিতি যত বাড়ে, অন্তরে রিয়ার আশঙ্কাও তত বৃদ্ধি পায়।
ইমাম আহমাদ (রহ.)-এর ইখলাস
ইমাম আহমাদ ইবন হাম্বল (রহ.) ছিলেন সমগ্র মুসলিম বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ইমাম। কিন্তু তিনি কখনো নিজের ইলম বা মর্যাদার কারণে অহংকার করেননি।
তাঁকে একবার জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, "কখন একজন মানুষ ইখলাস অর্জন করতে পারে?"
তিনি উত্তর দেন, "যখন সে মানুষের প্রশংসা লাভের আকাঙ্ক্ষা পরিত্যাগ করবে এবং নিজের নফসের ভাগ (স্বার্থ) ভুলে যাবে।" তিনি আরও বলতেন, "ইখলাস এমন একটি বিষয়, যা খুবই দুর্লভ।" এ কারণেই তিনি সবসময় আল্লাহর কাছে নিজের নিয়তের বিশুদ্ধতার জন্য দোয়া করতেন।
মানুষ কী বলল তা নয়; আল্লাহ কী জানেন, সেটিই আসল
ইমাম আল-গাজ্জালী (রহ.) তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ইহইয়াউ উলূমিদ্দীন-এ লিখেছেন, মানুষের অন্তরে রিয়া খুব সূক্ষ্মভাবে প্রবেশ করে। অনেক সময় মানুষ নিজেও বুঝতে পারে না যে, সে মানুষের সন্তুষ্টিকে আল্লাহর সন্তুষ্টির ওপর প্রাধান্য দিচ্ছে। তাই প্রত্যেক নেক আমলের আগে, আমলের সময় এবং আমলের পরে নিজের অন্তরকে পরীক্ষা করা উচিত।
প্রকৃত মুমিনের পরিচয় হলো, সে নিজেকে মানুষের সামনে নয়; বরং আল্লাহর সামনে দাঁড়িয়ে আছে বলে অনুভব করে। তাই মানুষ তাকে সম্মান করুক বা না করুক, তার কোনো ক্ষতি নেই; কিন্তু আল্লাহ যদি তার প্রতি অসন্তুষ্ট হন, তবে সেটিই তার সবচেয়ে বড় ক্ষতি।
ইখলাসের ফল, আল্লাহর নিকট গ্রহণযোগ্যতা
সালাফে সালেহীনের জীবনের দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাই, তাঁদের অনেকেই পৃথিবীতে খুব বেশি পরিচিত ছিলেন না। কিন্তু আকাশে তাঁদের পরিচয় ছিল। অনেকের নাম ইতিহাসের পৃষ্ঠায়ও নেই; অথচ আল্লাহ তাআলার কাছে তাঁদের মর্যাদা ছিল অপরিসীম।
এ কারণেই তাঁরা বলতেন, "তোমার আমলকে যতটা সম্ভব গোপন রাখো। কারণ যে আমল শুধু আল্লাহ জানেন, সেই আমল রিয়া থেকে অধিক নিরাপদ এবং কবুল হওয়ার সম্ভাবনাও বেশি।"
অতএব, সালাফে সালেহীনের জীবন আমাদের শিক্ষা দেয়, ইখলাস মুখের দাবি নয়; এটি অন্তরের অবস্থা। এটি অর্জন করতে হয় দীর্ঘ মুজাহাদা, আত্মসমালোচনা, নফসের বিরুদ্ধে সংগ্রাম এবং সর্বদা আল্লাহর সাহায্য কামনার মাধ্যমে। যে ব্যক্তি নিজের অন্তরকে ইখলাস দ্বারা আলোকিত করতে পারে, আল্লাহ তাআলা তার অল্প আমলেও বরকত দান করেন, তার দোয়া কবুল করেন এবং তাকে দুনিয়া ও আখিরাতে সম্মানিত করেন।
সুতরাং আমাদের উচিত সালাফে সালেহীনের এই উজ্জ্বল আদর্শ অনুসরণ করা। মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ নয়; বরং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনকেই জীবনের একমাত্র লক্ষ্য বানানো। কেননা মানুষের প্রশংসা ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু আল্লাহর সন্তুষ্টিই চিরস্থায়ী সফলতার একমাত্র পথ।
রিয়া, ইখলাসের সবচেয়ে বড় শত্রু
ইখলাসের বিপরীত হলো রিয়া (الرياء)। ইখলাস যেমন প্রতিটি আমলের প্রাণ, তেমনি রিয়া হলো প্রতিটি আমলের জন্য এক নীরব ঘাতক। এটি এমন একটি অন্তরের ব্যাধি, যা মানুষের অজান্তেই তার নেক আমলকে ধ্বংস করে দিতে পারে। বাহ্যিকভাবে একজন মানুষ অত্যন্ত নেককার, ইবাদতগুজার ও দানশীল বলে পরিচিত হতে পারে; কিন্তু যদি তার অন্তরে আল্লাহর সন্তুষ্টির পরিবর্তে মানুষের প্রশংসা লাভের আকাঙ্ক্ষা থাকে, তবে সেই আমল আল্লাহ তাআলার দরবারে কোনো মূল্য বহন করবে না।
এ কারণেই সালাফে সালেহীন প্রকাশ্য গুনাহের চেয়েও অন্তরের রোগকে বেশি ভয় করতেন। কারণ প্রকাশ্য গুনাহ মানুষকে লজ্জিত করে তাওবার দিকে ফিরিয়ে আনতে পারে; কিন্তু রিয়া মানুষকে অনেক সময় নেককারের বেশে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যায়, অথচ সে নিজেই তা অনুভব করতে পারে না।
ইখলাসই আমল কবুল হওয়ার চাবিকাঠি
সমগ্র আলোচনার সারকথা হলো, ইখলাস এমন একটি অমূল্য নেয়ামত, যা ছাড়া কোনো আমলই আল্লাহ তাআলার নিকট প্রকৃত মূল্য লাভ করে না। নামাজ, রোযা, যাকাত, হজ, কুরআন তিলাওয়াত, দান-সদকা, দাওয়াত, ইলম অর্জন, ইলম শিক্ষা, সমাজসেবা, সবকিছুই তখনই অর্থবহ, যখন তার একমাত্র উদ্দেশ্য হয় আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি।
আল্লাহ তাআলা আমাদের অন্তরকে রিয়া, অহংকার, আত্মপ্রশংসা ও সব ধরনের নিয়তের বিকৃতি থেকে হেফাজত করুন। তিনি আমাদের প্রতিটি ইবাদত, প্রতিটি নেক কাজ এবং সমগ্র জীবনকে একমাত্র তাঁর সন্তুষ্টির জন্য কবুল করে নিন। আমীন, ইয়া রব্বাল আলামীন।
মন্তব্য (...)
এ সম্পর্কিত আরও প্রবন্ধ
মুসলমানদের অধঃপতনের মূল কারণ
...
স্রষ্টা ও তাঁর অস্তিত্ব
...
শরীয়তের উপর অবিচলতা
...
ঝাড়ফুঁক-তাবীয : একটি দালীলিক বিশ্লেষণ (২য় পর্ব)
...
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন