প্রবন্ধ
অদৃশ্য আল্লাহতে ঈমান অস্বীকার! বাউল মতবাদ! পর্ব—১
৫ জানুয়ারী, ২০২৬
১৯০৩
০
নাস্তিকরা অদৃশ্য আল্লাহ—অর্থাৎ যাঁকে চোখে দেখা যায় না—তাঁর প্রতি বিশ্বাসকে মূর্খতা বলে মনে করে। তাদের ধারণা অনুযায়ী, যা প্রত্যক্ষভাবে দেখা বা ইন্দ্রিয় দিয়ে উপলব্ধি করা যায় না, তা বিশ্বাসযোগ্য নয়।
বাউল ধর্মে কী বলে?
বাউলদের বিশ্বাস নাস্তিকদের চিন্তার সঙ্গে অনেকাংশে সাদৃশ্যপূর্ণ। তাদের মতে, যে খোদাকে চোখে দেখা যায় না, সেই খোদার সাধনা তারা করে না। বাউল দর্শনে ‘দৃশ্যমান’ ও ‘মানবদেহে উপলব্ধ’ সত্তাকেই প্রাধান্য দেওয়া হয়। এই ভাবধারার প্রতিফলন দেখা যায় বাউলগুরু লালন ফকিরের লেখাতেও তিনি লিখেছেন—যারে দেখি না নয়নে, তারে ভজিব কেমনে? —(বাংলাদেশের বাউল, পৃ. ২১)
বাউলসাধক শাহ আবদুল করিম এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন—‘আমি কখনোই আসমানি খোদাকে মান্য করি না। মানুষের মধ্যে যে খোদা বিরাজ করে আমি তার চরণেই পূজো দেই।' এ রকম বাউলদের প্রায় সবাই মানুষ ভজনার জয়গান গেয়েছেন। তাঁদের বিশ্বাস, মানুষের মধ্যেই সৃষ্টিকর্তা আসীন, তাই তাঁকে ভালোবাসলেই সৃষ্টিকর্তার ভালোবাসা পাওয়া সম্ভব। নেত্রকোনার বাউল জালালউদ্দীন খাঁর গানের একটি পঙক্তি তো রীতিমতো প্রবাদতুল্য—‘মানুষ থুইয়া খোদা ভজ, এই মন্ত্রণা কে দিয়াছে'। এই মানুষের মধ্যে সৃষ্টিকর্তাকে খোঁজার আকুলতা বাউলদের বস্তুবাদী চেতনার বিষয়টিই পরিস্ফুট হয়। —(বাউলসাধনা, পৃ. ৩০)
অর্থাৎ তাদের বক্তব্য হলো—আল্লাহ তাআলাকে যেহেতু চোখে দেখা যায় না, সেহেতু তাঁর ইবাদত করা উচিত নয়।
ইসলাম কী বলে?
ইসলামে ‘অদৃশ্যে বিশ্বাস রাখা’ ঈমানের মৌলিক বিষয়গুলোর অন্যতম। পবিত্র কুরআনে ঈমানদার মুত্তাকিদের পরিচয় দিতে গিয়ে আল্লাহ তাআলা বলেন—
الَّذِينَ يُؤْمِنُونَ بِالْغَيْبِ
‘যারা অদৃশ্য বিষয়ে ঈমান রাখে।’ —(সুরা বাকারা : ৩)
সুতরাং যারা অদৃশ্য আল্লাহতে ঈমান আনে না, তারা প্রকৃত অর্থে ঈমানদার হতে পারে না। কারণ ঈমানের ভিত্তিই হলো আল্লাহ তাআলার অস্তিত্ব ও সত্তাকে বিনা প্রত্যক্ষ দর্শনে বিশ্বাস করা।
এ ছাড়া আল্লাহকে চোখে দেখার দাবি করাও এক মারাত্মক অপরাধ। এই অপরাধের কারণেই অতীতের এক উম্মত ভয়াবহ শাস্তির সম্মুখীন হয়েছিল। মহান রব্ব বলেন—
وَإِذْ قُلْتُمْ يَا مُوسَى لَن نُّؤْمِنَ لَكَ حَتَّى نَرَى اللَّهَ جَهْرَةً فَأَخَذَتْكُمُ الصَّاعِقَةُ وَأَنتُمْ تَنظُرُونَ
‘আর যখন তোমরা বলেছিলে—হে মূসা, আমরা কখনোই তোমাকে বিশ্বাস করবো না, যতক্ষণ না আল্লাহকে প্রকাশ্যে নিজেদের চোখে দেখতে পাই। তখন বজ্রাঘাত তোমাদেরকে পাকড়াও করলো, আর তোমরা তা দেখতেই থাকলে।’ —(সুরা বাকারা : ৫৫)
সুতরাং আল্লাহ তাআলাকে না দেখেই বিশ্বাস করতে হবে। কারণ, আল্লাহ তাআলাকে দেখা কোনো মাখলুকের পক্ষেই সম্ভব নয়। ধরুন, আপনার শরীরে প্রবহমান রক্তে গ্লুকোজ বা চিনির মাত্রা বেড়ে গেছে—ডাক্তার আপনাকে তা জানালেন এবং পরামর্শ দিলেন নিয়মিত দুই মাইল হাঁটতে, খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন আনতে ইত্যাদি। আপনি সেই পরামর্শ অনুযায়ী আমল করছেন। অথচ আপনি নিজ চোখে আপনার রক্তে কোনো চিনি দেখতে পান না। কারণ, তা দেখার বা উপলব্ধি করার মতো যোগ্যতা ও সামর্থ্য আপনার মাঝে নেই। ঠিক একইভাবে মহান রব্ব ঘোষণা করেন—
لَّا تُدْرِكُهُ الْأَبْصَارُ وَهُوَ يُدْرِكُ الْأَبْصَارَ ۖ وَهُوَ اللَّطِيفُ الْخَبِيرُ
‘দৃষ্টিসমূহ তাঁকে ধরতে পারে না, কিন্তু সকল দৃষ্টি তাঁর আয়ত্তাধীন। তিনি অতি সূক্ষ্ম এবং সর্ব বিষয়ে পূর্ণ অবগত।’ —(সুরা আনআম : ১০৩)
শরীরের সামান্য এক ফোঁটা গ্লুকোজও আমরা খালি চোখে দেখতে পাই না—তাহলে সেই গ্লুকোজের স্রষ্টাকে দেখার দাবি কীভাবে আসে? মূর্খতারও তো একটি সীমা থাকা দরকার। তবে কেউ কেউ প্রশ্ন তুলতে পারেন— “আমি না দেখলেও কী হয়েছে? ডাক্তার তো দেখেছেন।” আসলেই কি ডাক্তার সরাসরি দেখেছেন? না। তিনি কোনো দিন খালি চোখে রক্তের ভেতরের গ্লুকোজ দেখেননি। বরং যন্ত্রের মাধ্যমে পরীক্ষা করে বুঝেছেন। কারণ, গ্লুকোজ শরীরের চামড়া ও রগ-রেশার আবরণে লুকিয়ে থাকে—যা যন্ত্র ছাড়া মানুষের চোখে ধরা পড়ে না। যে জিনিস শরীরের আবরণে থেকেও চোখে দেখা যায় না, সেই স্রষ্টা—যিনি আসমান-জমিনের ঊর্ধ্বে, যিনি মাখলুকের সীমা ও উপলব্ধির বাইরে—তাঁকে আমরা কোন যুক্তিতে দেখতে চাই? অথচ হযরত জিবরাঈল আ. নিজেই বলেন—
يَا مُحَمَّدُ إِنِّي دَنَوْتُ مِنَ اللَّهِ دُنُوًّا مَا دَنَوْتُ مِنْهُ قطّ. قَالَ: وَكَيف كَانَ ياجبريل؟ قَالَ: كَانَ بَيْنِي وَبَيْنَهُ سَبْعُونَ أَلْفَ حِجَابٍ مِنْ نُورٍ.
‘হে মুহাম্মাদ, আমি আল্লাহর এত নিকটে গিয়েছিলাম—যেমন নিকটবর্তী হওয়া আর কখনো হয়নি।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিজ্ঞেস করলেন, কীভাবে, হে জিবরীল? তিনি বললেন, তখন আমার ও তাঁর মধ্যে ছিল সত্তর হাজার নূরের পর্দা।’—(মিশকাত : হাদিস নং : ৭৪১)
আমরা বুঝতে পারলাম—শরীরের ভেতরে থাকা সামান্য গ্লুকোজও আবরণে ঢাকা থাকার কারণে আমাদের চোখে ধরা পড়ে না। সেখানে সত্তর হাজার নূরের কুদরতি পর্দায় আবৃত মহান রব্বকে কীভাবে দেখা সম্ভব হতে পারে?
আরও স্পষ্ট করে বললে—পনেরো কোটি চৌদ্দ লক্ষ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত সূর্যের দিকে আমরা ঠিক দুপুরবেলা একনাগাড়ে তাকিয়ে থাকতে পারি না। চোখ ঝলসে যায়, দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসে। তাহলে সেই সূর্যের স্রষ্টা আল্লাহ তাআলাকে এই দুনিয়াতেই দেখার আকাঙ্ক্ষা—এ কি বোকামি ছাড়া আর কিছু? কারণ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন—
حِجَابُهُ النُّورُ لَوْ كَشَفَهُ لأَحْرَقَتْ سُبُحَاتُ وَجْهِهِ مَا انْتَهَى إِلَيْهِ بَصَرُهُ مِنْ خَلْقِهِ
‘তাঁর পর্দা হলো নূর। যদি সে আবরণ সরিয়ে দেওয়া হয়, তবে তাঁর নূরের জ্যোতি সৃষ্টি জগতের যত দূর পর্যন্ত দৃষ্টি পৌঁছে—সবকিছুকে ভস্ম করে দেবে।’—(সহিহ মুসলিম : হাদিস নং :১৭৯)
কুরআনে কারীমে অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় এসেছে—
وَلَمَّا جَاء مُوسَى لِمِيقَاتِنَا وَكَلَّمَهُ رَبُّهُ قَالَ رَبِّ أَرِنِي أَنظُرْ إِلَيْكَ قَالَ لَن تَرَانِي وَلَـكِنِ انظُرْ إِلَى الْجَبَلِ فَإِنِ اسْتَقَرَّ مَكَانَهُ فَسَوْفَ تَرَانِي فَلَمَّا تَجَلَّى رَبُّهُ لِلْجَبَلِ جَعَلَهُ دَكًّا وَخَرَّ موسَى صَعِقًا فَلَمَّا أَفَاقَ قَالَ سُبْحَانَكَ تُبْتُ إِلَيْكَ وَأَنَاْ أَوَّلُ الْمُؤْمِنِينَ
‘মূসা (আ.) যখন আমার নির্ধারিত সময়ে এসে পৌঁছালেন এবং তাঁর প্রতিপালক তাঁর সঙ্গে কথা বললেন, তখন তিনি বললেন, হে আমার প্রতিপালক! আমাকে দেখা দিন, আমি আপনাকে দেখব। আল্লাহ বললেন, তুমি আমাকে কখনোই দেখতে পারবে না। বরং তুমি পাহাড়ের দিকে তাকাও—যদি তা নিজ স্থানে স্থির থাকে, তবে তুমি আমাকে দেখতে পাবে।
অতঃপর যখন তাঁর প্রতিপালক পাহাড়ের ওপর তাজাল্লী প্রকাশ করলেন, তখন তা পাহাড়কে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিল, আর মূসা (আ.) সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়ে গেলেন। পরে জ্ঞান ফিরে এলে তিনি বললেন, আপনার সত্তা পবিত্র! আমি আপনার দরবারে তাওবা করছি এবং (এই সত্যের প্রতি) আমি সবার আগে ঈমান আনছি যে, দুনিয়ায় কেউ আপনাকে দেখতে সক্ষম নয়।—(সুরা আরাফ : ১৪৩)
এই আয়াত আমাদের সুস্পষ্টভাবে জানিয়ে দেয়—এই পৃথিবীতে মহান আল্লাহ তাআলাকে দেখা কোনো মানুষের পক্ষেই সম্ভব নয়। মানুষের দৃষ্টি, শক্তি ও সহনক্ষমতা সেই মর্যাদার উপযোগী নয়। সুতরাং সৌভাগ্যবান তারাই—যারা না দেখেই অদৃশ্যের রব্বের ওপর ঈমান আনে, তাঁর আদেশ মেনে চলে এবং বিনয়ের সঙ্গে তাঁর ইবাদত করে। তাদের জন্যই রয়েছে মহা প্রতিদান। আল্লাহ তাআলা বলেন—
إِنَّ الَّذِينَ يَخْشَوْنَ رَبَّهُم بِالْغَيْبِ لَهُم مَّغْفِرَةٌ وَأَجْرٌ كَبِيرٌ
‘যারা তাদের প্রতিপালককে না দেখেই ভয় করে, নিঃসন্দেহে তাদের জন্য রয়েছে ক্ষমা এবং এক মহান পুরস্কার।’—(সুরা মুলক : ১২)
আসল রহস্যটি হলো—এই বাউলরা প্রায়শই আল্লাহ তাআলার প্রতি প্রকৃত উপাসনা বাদ দিয়ে নিজেদেরকে খোদার আসনে বসানোর জন্যই এমন কিছু অনর্থক কথা প্রচলিত করেন। যেমন বাউলমুন্সী মনিরুদ্দীন লিখেছে—আলিপ খাড়া রুকু হায়, দালে আসন মীম সজিদায় মুর্শিদ রূপে ধ্যান করে, কর সজিদা সময় যায়৷ —(বাউলসাধনা, পৃ. ৬৪)
এ গানের ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ‘বাউলসাধনা’ বইয়ে লেখা হয়েছে— ‘আলিপ” মানে সোজা ও ‘রুকু' মানে হাঁটুতে যাওয়া । তারপর সিজদার সময় মুর্শিদ রূপ ধ্যান করতে হবে। সেই ধ্যান করতে পারলে চোখের সামনে আল্লাহরূপী মুর্শিদ উপস্থিত হন। আর সেই আল্লাকেই হাজির-নাজির রেখে সেজদা করতে হবে। —(বাউলসাধনা, পৃ. ৬৫)
বুঝা গেলো—বাউলরা সিজদার সময় চোখে না দেখেও গুরুকে ধ্যান করে, অথচ মহান আল্লাহকে না দেখেই তাঁর ইবাদত করতে চায় না। এখানেই প্রশ্ন জন্মে—যদি চোখে না দেখার পরও মানুষের জন্য ধ্যান ও সিজদা সম্ভব হয়, তবে কেনই বা তারা মহান রব্বের জন্য সেই বিশ্বাস, বিনয় ও ইবাদত প্রদর্শন করতে অক্ষম? এটি স্পষ্ট করে দেয়—যে ব্যক্তি আল্লাহর প্রতি সঠিক ঈমান ও বিনয় প্রদর্শন করে না, তাঁর পথ কখনোই প্রকৃত ইসলাম বা মুসলিমত্বের সঙ্গে মিলিত হতে পারে না। এখন সিদ্ধান্ত আপনারই হাতে, এই পথ অনুসরণকারীরা কি কখনই মুসলিম হতে পারে?
মন্তব্য (...)
এ সম্পর্কিত আরও প্রবন্ধ
তাহাফফুযে খতমে নবুওত ও কাদিয়ানী সম্প্রদায়
الحمد لله نحمده ونستعينه ونستغفره ونؤمن به ونتوكل عليه،ونعوذ بالله من شرور أنفسنا ومن سيئات أعمالنا،...
ঈমান-আমল সুরক্ষিত রাখতে হক্কানী উলামায়ে কেরামের সঙ্গে থাকুন, অন্যদের সঙ্গ ছাড়ুন
[প্রদত্ত বয়ান থেকে সংগৃহীত] হামদ ও সালাতের পর... قال الله تعالى: يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتّ...
মূর্তি ও ভাস্কর্য : যুগে যুগে শিরকের সর্ববৃহৎ প্রণোদনা
...
তাওহীদের ক্ষেত্রে প্রান্তিকতাঃ দু’টি উদাহরণ
...
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন