সূরা
পারা

Loading verses...

অন্যান্য

অনুবাদ
তেলাওয়াত

সূরা আল আনফাল (الأنفال) | আল আনফাল

মাদানী

মোট আয়াতঃ ৭৫

بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَـٰنِ الرَّحِيمِ

পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে

یَسۡـَٔلُوۡنَکَ عَنِ الۡاَنۡفَالِ ؕ قُلِ الۡاَنۡفَالُ لِلّٰہِ وَالرَّسُوۡلِ ۚ فَاتَّقُوا اللّٰہَ وَاَصۡلِحُوۡا ذَاتَ بَیۡنِکُمۡ ۪ وَاَطِیۡعُوا اللّٰہَ وَرَسُوۡلَہٗۤ اِنۡ کُنۡتُمۡ مُّؤۡمِنِیۡنَ ١

ইয়াছআলূনাকা ‘আনিল আনফা-লি কুল্লি আনফা-লুলিল্লা-হি ওয়াররাছূলি ফাত্তাকুল্লা-হা ওয়া আসলিহূযা-তা বাইনিকুম ওয়া আতী‘উল্লা-হা ওয়া রাছূলাহূইন কুনতুম মু’মিনীন।

(হে নবী!) লোকে তোমাকে যুদ্ধলব্ধ সম্পদ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে। বলে দাও, যুদ্ধলব্ধ সম্পদ (সম্পর্কে সিদ্ধান্ত দান)-এর এখতিয়ার আল্লাহ ও রাসূলের। সুতরাং তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং তোমাদের পারস্পরিক সম্পর্ক শুধরে নাও। এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য কর, যদি তোমরা প্রকৃত মুমিন হও।

তাফসীরঃ

১. বদর যুদ্ধে যখন শত্রুদের পরাজয় ঘটল, তখন সাহাবায়ে কিরাম তিন ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছিলেন। একদল নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হিফাজতের দায়িত্বে নিয়োজিত থাকলেন। একদল শত্রুর পশ্চাদ্ধাবন করার জন্য রওয়ানা হয়ে গেলেন এবং একদল শত্রুর ফেলে যাওয়া মালামাল কুড়াতে শুরু করলেন। যেহেতু এটাই ছিল প্রথম যুদ্ধ এবং যুদ্ধলব্ধ সম্পদ সম্পর্কে বিস্তারিত বিধান তখনও পর্যন্ত নাযিল হয়নি, তাই তৃতীয় দল মনে করেছিল, তারা যে মালামাল কুড়িয়েছে, তা তাদেরই। (সম্ভবত জাহিলী যুগে এমনই রেওয়াজ ছিল)। কিন্তু যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর প্রথমোক্ত দুই দলের খেয়াল হল, তারাও তো যুদ্ধে পুরোপুরি শরীক ছিল, বরং গনীমত কুড়ানোর সময় তারাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ কাজ আঞ্জাম দিয়েছে। সুতরাং গনীমতের ভেতর তাদেরও অংশ থাকা চাই। বস্তুত এটা ছিল এক স্বভাবগত চাহিদা, যে কারণে এ নিয়ে তাদের মধ্যে কিছুটা বাদানুবাদও শুরু হয়ে গিয়েছিল। যখন বিষয়টা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে পৌঁছল, তখন এই আয়াত নাযিল হল। এতে জানানো হয়েছে, গনীমত বা যুদ্ধলব্ধ সম্পদ সম্পর্কে ফায়সালা নেওয়ার এখতিয়ার কেবল আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের। সুতরাং সামনে এ সূরারই ৪১নং আয়াতে গনীমত বণ্টনের বিস্তারিত নীতিমালা বর্ণিত হয়েছে। আর এ আয়াতে আদেশ করা হয়েছে যে, মুসলিমদের মধ্যে যদি কোনও বিষয়ে মনোমালিন্য দেখা দেয়, তবে তা দূর করে পারস্পরিক সম্পর্ক ঠিক করে নেওয়া চাই।

اِنَّمَا الۡمُؤۡمِنُوۡنَ الَّذِیۡنَ اِذَا ذُکِرَ اللّٰہُ وَجِلَتۡ قُلُوۡبُہُمۡ وَاِذَا تُلِیَتۡ عَلَیۡہِمۡ اٰیٰتُہٗ زَادَتۡہُمۡ اِیۡمَانًا وَّعَلٰی رَبِّہِمۡ یَتَوَکَّلُوۡنَ ۚۖ ٢

ইন্নামাল মু’মিনূনাল্লাযীনা ইযা-যুকিরাল্লা-হুওয়াজিলাতকুলূবুহুম ওয়া ইযা-তুলিয়াত ‘আলাইহিম আ-ইয়া-তুহূঝা-দাতহুম ঈমা-নাওঁ ওয়া ‘আলা-রাব্বিহিম ইয়াতাওয়াক্কালূন।

মুমিন তো তারাই, (যাদের সামনে) আল্লাহকে স্মরণ করা হলে তাদের হৃদয় ভীত হয়, যখন তাদের সামনে তাঁর আয়াতসমূহ পড়া হয়, তখন তা তাদের ঈমানের উন্নতি সাধন করে এবং তারা তাদের প্রতিপালকের উপর ভরসা করে।

الَّذِیۡنَ یُقِیۡمُوۡنَ الصَّلٰوۃَ وَمِمَّا رَزَقۡنٰہُمۡ یُنۡفِقُوۡنَ ؕ ٣

আল্লাযীনা ইউকীমূনাসসালা-তা ওয়া মিম্মা-রাঝাকনা-হুম ইউনফিকূ ন।

যারা নামায কায়েম করে এবং আমি তাদেরকে যে রিযক দিয়েছি, তা থেকে (আল্লাহর পথে) ব্যয় করে।

اُولٰٓئِکَ ہُمُ الۡمُؤۡمِنُوۡنَ حَقًّا ؕ  لَہُمۡ دَرَجٰتٌ عِنۡدَ رَبِّہِمۡ وَمَغۡفِرَۃٌ وَّرِزۡقٌ کَرِیۡمٌ ۚ ٤

উলাইকা হুমুল মু’মিনূনা হাক্কান লাহুম দারাজা-তুন ‘ইনদা রাব্বিহিম ওয়া মাগফিরাতুওঁ ওয়া রিঝকুন কারীম।

এরাই প্রকৃত মুমিন। তাদের জন্য তাদের প্রতিপালকের কাছে রয়েছে উচ্চ মর্যাদা, ক্ষমা ও সম্মানজনক রিযক।

کَمَاۤ اَخۡرَجَکَ رَبُّکَ مِنۡۢ بَیۡتِکَ بِالۡحَقِّ ۪  وَاِنَّ فَرِیۡقًا مِّنَ الۡمُؤۡمِنِیۡنَ لَکٰرِہُوۡنَ ۙ ٥

কামাআখরাজাকা রাব্বুকা মিম বাইতিকা বিলহাক্কি ওয়া ইন্না ফারীকাম মিনাল মু’মিনীনা লাকা-রিহূন।

(গনীমত বণ্টনের এ বিষয়টা সেই রকম), যেমন তোমার প্রতিপালক তোমাকে সত্যের জন্য নিজ ঘর থেকে বের করেছিলেন, অথচ মুমিনদের একটি দলের কাছে এ বিষয়টা অপছন্দ ছিল।

তাফসীরঃ

২. যারা গনীমত কুড়িয়েছিল, তাদের আশা ছিল সে সম্পদ কেবল তাদেরই থাকবে। কিন্তু ফায়সালা যেহেতু সে রকম হয়নি, তাই তাদেরকে সান্তনা দেওয়া হচ্ছে যে, মানুষের সব আশাই পরিণামে মঙ্গলজনক হয় না। পরে তার বুঝে আসে, যে সিদ্ধান্ত তার ইচ্ছার বিপরীত হয়েছে কল্যাণ তাতেই নিহিত। এটাকে আবু জাহলের সাথে যুদ্ধ করার ব্যাপারটার সাথে তুলনা করতে পার। মদীনা থেকে বের হওয়ার সময় তো লক্ষ্য ছিল আবু সুফিয়ানের কাফেলাকে আটকানো, যে কারণে রীতিমত কোনও বাহিনীও তৈরি করা হয়নি। অনাকাঙ্খিতভাবে যখন আবু জাহলের নেতৃত্বে একটি বিশাল বাহিনী এগিয়ে আসছে বলে খবর পাওয়া গেল, তখন কতিপয় সাহাবী চাচ্ছিলেন, যুদ্ধ না করে ওয়াপস চলে যাওয়া হোক। কেননা এভাবে অপ্রস্তুত ও নিরস্ত্র অবস্থায় একটি সশস্ত্র বাহিনীর সাথে যুদ্ধ করলে সেটা মৃত্যুমুখে ঝাঁপ দেওয়ার নামান্তর হবে। কিন্তু অন্যান্য সাহাবীগণ অত্যন্ত উদ্দীপনাময় বক্তৃতা দিলেন এবং তাতে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম খুব খুশী হলেন। অবশেষে যখন তাঁর ইচ্ছা অনুধাবন করা গেল তখন সকলেই যুদ্ধে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলেন। পরে প্রমাণ হল, যুদ্ধ করার মধ্যেই মুসলিমদের মহা কল্যাণ ছিল। কেননা এর ফলে কুফরের মেরুদণ্ড ভেঙ্গে যায়।

یُجَادِلُوۡنَکَ فِی الۡحَقِّ بَعۡدَمَا تَبَیَّنَ کَاَنَّمَا یُسَاقُوۡنَ اِلَی الۡمَوۡتِ وَہُمۡ یَنۡظُرُوۡنَ ؕ ٦

ইউজা-দিলূনাকা ফিল হাক্কি বা‘দা মা-তাবাইইয়ানা কাআন্নামা-ইউছা-কূনা ইলাল মাওতি ওয়া হুম ইয়ানজু রুন।

সত্য স্পষ্ট হয়ে যাওয়ার পরও তারা তোমার সাথে সে বিষয়ে এমনভাবে বিতর্ক করছে, যেন তাদেরকে মৃত্যুর দিকে তাড়িয়ে নেওয়া হচ্ছে এবং তারা তা নিজ চোখে দেখতে পাচ্ছে।

وَاِذۡ یَعِدُکُمُ اللّٰہُ اِحۡدَی الطَّآئِفَتَیۡنِ اَنَّہَا لَکُمۡ وَتَوَدُّوۡنَ اَنَّ غَیۡرَ ذَاتِ الشَّوۡکَۃِ تَکُوۡنُ لَکُمۡ وَیُرِیۡدُ اللّٰہُ اَنۡ یُّحِقَّ الۡحَقَّ بِکَلِمٰتِہٖ وَیَقۡطَعَ دَابِرَ الۡکٰفِرِیۡنَ ۙ ٧

ওয়া ইয ইয়া‘ইদুকুমুল্লা-হুইহদাততাইফাতাইনি আন্নাহা-লাকুম ওয়া তাওয়াদ্দূনা আন্না গাইরা যা-তিশশাওকাতি তাকূনুলাকুম ওয়া ইউরীদুল্লা-হুআইঁ ইউহিক্কাল হাক্কা বিকালিমাতিহী ওয়া ইয়াকতা‘আ দা-বিরাল কা-ফিরীন।

(সেই সময়কে স্মরণ কর), যখন আল্লাহ তোমাদেরকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে, দু’টি দলের মধ্যে কোন একদল তোমাদের আয়ত্তে আসবে। আর তোমাদের কামনা ছিল, নিষ্কণ্টক দলটি তোমাদের আওতাধীন হোক। আল্লাহ চাচ্ছিলেন, নিজ বিধানাবলী দ্বারা সত্যকে সত্যে পরিণত করে দেখাবেন এবং কাফেরদের মূলোচ্ছেদ করবেন।

তাফসীরঃ

৩. এর দ্বারা আবু সুফিয়ানের কাফেলাকে বোঝানো উদ্দেশ্য। আর ‘কাঁটা’ দ্বারা বিপদ বোঝানো হয়েছে। কাফেলায় সশস্ত্র লোক ছিল মোট চল্লিশজন। কাজেই কাফেলার উপর আক্রমণ করাটা বেশি বিপজ্জনক ছিল না বিধায় অন্তরের ঝোঁক এ দিকেই বেশি থাকা স্বাভাবিক ছিল।

لِیُحِقَّ الۡحَقَّ وَیُبۡطِلَ الۡبَاطِلَ وَلَوۡ کَرِہَ الۡمُجۡرِمُوۡنَ ۚ ٨

লিইউহিক্কাল হাক্কা ওয়া ইউবতিলাল বা-তিলা ওয়া লাও কারিহাল মুজরিমূন।

এভাবে তিনি সত্যকে সত্য ও অসত্যকে অসত্যরূপে প্রমাণ করতে চান, তাতে অপরাধীদের (এটা) যতই অপছন্দ হোক।

اِذۡ تَسۡتَغِیۡثُوۡنَ رَبَّکُمۡ فَاسۡتَجَابَ لَکُمۡ اَنِّیۡ مُمِدُّکُمۡ بِاَلۡفٍ مِّنَ الۡمَلٰٓئِکَۃِ مُرۡدِفِیۡنَ ٩

ইয তাছতাগীছূনা রাব্বাকুমফাছতাজা-বা লাকুমআন্নীমুমিদ্দুকুম বিআলফিম মিনাল মালাইকাতি মুরদিফীন।

(স্মরণ কর), যখন তোমরা নিজ প্রতিপালকের কাছে ফরিয়াদ করেছিলে, তখন তিনি তোমাদের ফরিয়াদে সাড়া দিয়ে (বললেন), আমি তোমাদের সাহায্যার্থে এক হাজার ফিরিশতার একটি বাহিনী পাঠাচ্ছি, যারা একের পর এক আসবে।
১০

وَمَا جَعَلَہُ اللّٰہُ اِلَّا بُشۡرٰی وَلِتَطۡمَئِنَّ بِہٖ قُلُوۡبُکُمۡ ۚ  وَمَا النَّصۡرُ اِلَّا مِنۡ عِنۡدِ اللّٰہِ ؕ  اِنَّ اللّٰہَ عَزِیۡزٌ حَکِیۡمٌ ٪ ١۰

ওয়ামা-জা‘আলাহুল্লা-হু ইল্লা-বুশরা-ওয়া লিতাতমাইন্না বিহী কুলূবুকুম ওয়া মান নাসরু ইল্লা-মিন ‘ইনদিল্লা-হি ইন্নাল্লা-হা ‘আঝীঝুন হাকীম।

এ প্রতিশ্রুতি আল্লাহ কেবল এজন্যই দিয়েছেন, যাতে এটা তোমাদের জন্য সুসংবাদ হয় এবং যাতে এর দ্বারা তোমাদের অন্তর প্রশান্তি লাভ করে, আর সাহায্য তো কেবল আল্লাহর পক্ষ থেকেই আসে। নিশ্চয়ই আল্লাহ মহা ক্ষমতাবান, প্রজ্ঞাময়।

তাফসীরঃ

৪. অর্থাৎ সাহায্য করার জন্য ফিরিশতা পাঠানোর কোনও প্রয়োজন আল্লাহ তাআলার ছিল না। তাছাড়া ফিরিশতাদেরও নিজস্ব কোনও শক্তি নেই যে, তারা নিজেদের পক্ষ থেকে সাহায্য করবে। সাহায্য তো আল্লাহ তাআলা সরাসরিও করতে পারেন। কিন্তু মানুষের স্বভাব হল, কোনও জিনিসের আসবাব-উপকরণ সামনে দেখতে পেলে তাতে তার আস্থা বেশি হয় এবং মনও খুশি হয়। সে কারণেই এ প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। এ আয়াতে শিক্ষা দেওয়া হয়েছে যে, যে-কোনও কাজের জন্য যখন সে কাজের উপকরণাদি অবলম্বন করা হয়, তখন প্রতি মুহূর্তে চিন্তা করতে হবে এ উপকরণসমূহও আল্লাহ তাআলারই সৃষ্টি এবং এর যে প্রভাব ও কার্যকারিতা, তাও আল্লাহ তাআলার হুকুমেই দেখা দেয়। সুতরাং ভরসা উপকরণের উপর নয়, বরং আল্লাহ তাআলার ফযল ও তাঁর করুণার উপরই করতে হবে।
১১

اِذۡ یُغَشِّیۡکُمُ النُّعَاسَ اَمَنَۃً مِّنۡہُ وَیُنَزِّلُ عَلَیۡکُمۡ مِّنَ السَّمَآءِ مَآءً لِّیُطَہِّرَکُمۡ بِہٖ وَیُذۡہِبَ عَنۡکُمۡ رِجۡزَ الشَّیۡطٰنِ وَلِیَرۡبِطَ عَلٰی قُلُوۡبِکُمۡ وَیُثَبِّتَ بِہِ الۡاَقۡدَامَ ؕ ١١

ইয ইউগাশশীকুমুননু‘আ-ছা আমানাতাম মিনহু ওয়া ইউনাঝঝিলু‘আলাইকুম মিনাছছামাই মাআল লিইউতাহহিরাকুম বিহী ওয়া ইউযহিবা ‘আনকুম রিজঝাশশাইতা-নি ওয়া লিইয়ারবিতা ‘আলা-কুলূবিকুম ওয়া ইউছাব্বিতা বিহিল আকাদা-ম।

(স্মরণ কর), যখন তিনি নিজের পক্ষ হতে স্বস্তির জন্য তোমাদেরকে তন্দ্রাচ্ছন্ন করছিলেন এবং আকাশ থেকে তোমাদের উপর পানি বর্ষণ করছিলেন, তা দ্বারা তোমাদেরকে পবিত্র করার জন্য, তোমাদের থেকে শয়তানের আবিলতা দূর করার জন্য, তোমাদের অন্তরে দৃঢ়তা বাঁধার জন্য এবং তার মাধ্যমে (তোমাদের) পা স্থির রাখার জন্য।

তাফসীরঃ

৫. এত বড় বাহিনীর সঙ্গে যদি নিরস্ত্র-প্রায় একটি ক্ষুদ্র দলকে যুদ্ধ করতে হয়, তবে ঘাবড়ে যাওয়াটা খুবই স্বাভাবিক। আল্লাহ তাআলা তাদের সে ঘাবড়ানি প্রশমিত করার লক্ষ্যে তাদেরকে তন্দ্রাচ্ছন্ন করে দিলেন। এটা তন্দ্রাচ্ছন্নতার এক সুফল যে, এর দ্বারা ভয়-ভীতি কেটে যায়। সুতরাং যুদ্ধের পূর্বের রাতে তারা প্রাণ ভরে ঘুমালেন। ফলে তারা একদম চাঙ্গা হয়ে উঠলেন। তাছাড়া যুদ্ধ চলাকালেও মাঝে-মধ্যে তাদের তন্দ্রাভাব দেখা দিত এবং তাতে তাদের স্বস্তি লাভ হত।
১২

اِذۡ یُوۡحِیۡ رَبُّکَ اِلَی الۡمَلٰٓئِکَۃِ اَنِّیۡ مَعَکُمۡ فَثَبِّتُوا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا ؕ  سَاُلۡقِیۡ فِیۡ قُلُوۡبِ الَّذِیۡنَ کَفَرُوا الرُّعۡبَ فَاضۡرِبُوۡا فَوۡقَ الۡاَعۡنَاقِ وَاضۡرِبُوۡا مِنۡہُمۡ کُلَّ بَنَانٍ ؕ ١٢

ইযইঊহী রাব্বুকা ইলাল মালাইকাতি আন্নী মা‘আকুম ফাছাব্বিতুল্লাযীনা আ-মানূ ছাউলকী ফী কুলূবিল্লাযীনা কাফারূররু‘বা ফাদরিবূফাওকাল আ‘না-কিওয়াদরিবূমিনহুম কুল্লা বানা-ন।

(স্মরণ কর), যখন তোমার প্রতিপালক ফিরিশতাদেরকে ওহীর মাধ্যমে হুকুম দিলেন যে, আমি তোমাদের সঙ্গে আছি। কাজেই তোমরা মুমিনদের পা স্থির রাখ, আমি কাফেরদের মনে ভীতি সঞ্চার করব। সুতরাং তোমরা তাদের ঘাড়ের উপর আঘাত কর এবং তাদের আঙ্গুলের জোড়াসমূহেও আঘাত কর।
১৩

ذٰلِکَ بِاَنَّہُمۡ شَآقُّوا اللّٰہَ وَرَسُوۡلَہٗ ۚ وَمَنۡ یُّشَاقِقِ اللّٰہَ وَرَسُوۡلَہٗ فَاِنَّ اللّٰہَ شَدِیۡدُ الۡعِقَابِ ١٣

যা-লিকা বিআন্নাহুম শাককুল্লা-হা ওয়া রাছূলাহূ ওয়া মাইঁ ইউশাকিকিল্লা-হা ওয়া রাছূলাহূফাইন্নাল্লা-হা শাদীদুল ‘ইকা-ব।

এটা এই কারণে যে, তারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিরোধিতায় লিপ্ত হয়েছে। নিশ্চয়ই কেউ আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিরোধিতায় লিপ্ত হলে, আল্লাহর আযাব তো সুকঠিন।
১৪

ذٰلِکُمۡ فَذُوۡقُوۡہُ وَاَنَّ لِلۡکٰفِرِیۡنَ عَذَابَ النَّارِ ١٤

যা-লিকুম ফাযূকূহু ওয়া আন্না লিলকা-ফিরীনা ‘আযা-বান্না-র।

সুতরাং এসবের মজা ভোগ কর। তাছাড়া কাফেদের জন্য রয়েছে জাহান্নামের (আসল) শাস্তি।
১৫

یٰۤاَیُّہَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡۤا اِذَا لَقِیۡتُمُ الَّذِیۡنَ کَفَرُوۡا زَحۡفًا فَلَا تُوَلُّوۡہُمُ الۡاَدۡبَارَ ۚ ١٥

ইয়া আইয়ুহাল্লাযীনা আ-মানূ-ইযা- লাকীতুমুল্লাযীনা কাফারূ ঝাহফান ফালাতুওয়াল্লুহুমুল আদবা-র।

হে মুমিনগণ! যখন তোমরা হানাদার কাফিরদের মুখোমুখি হও, তখন তাদেরকে পৃষ্ঠপ্রদর্শন করো না।
১৬

وَمَنۡ یُّوَلِّہِمۡ یَوۡمَئِذٍ دُبُرَہٗۤ اِلَّا مُتَحَرِّفًا لِّقِتَالٍ اَوۡ مُتَحَیِّزًا اِلٰی فِئَۃٍ فَقَدۡ بَآءَ بِغَضَبٍ مِّنَ اللّٰہِ وَمَاۡوٰىہُ جَہَنَّمُ ؕ وَبِئۡسَ الۡمَصِیۡرُ ١٦

ওয়া মাইঁ ইউওয়ালিলহিম ইয়াওমায়িযিন দুবুরাহূইল্লা-মুতাহাররিফাল লিকিতা-লিন আও মুতাহাইয়িঝান ইলা-ফিআতিন ফাকাদ বাআ বিগাদাবিম মিনাল্লা-হি ওয়া মা’ওয়া-হু জাহান্নামু ওয়াবি’ছাল মাসীর।

যে ব্যক্তি সেদিন তাদেরকে পৃষ্ঠপ্রদর্শন করবে, যুদ্ধের জন্য কৌশল অবলম্বন অথবা নিজ দলে স্থানগ্রহণের উদ্দেশ্য ছাড়া, সে আল্লাহর পক্ষ থেকে ক্রোধ নিয়ে ফিরবে এবং তার ঠিকানা জাহান্নাম, আর তা অতি মন্দ ঠিকানা।

তাফসীরঃ

৮. যুদ্ধক্ষেত্র হতে পলায়নকে সর্বাবস্থায় অবৈধ সাব্যস্ত করা হয়েছে, তাতে শত্রু-সৈন্য যত বেশিই হোক। বদর যুদ্ধে সুরতহাল এ রকমই ছিল। অবশ্য পরবর্তীকালে হুকুম ঠিক এ রকম থাকেনি। অবস্থাভেদে বিধানে প্রভেদ করা হয়েছে, যা এ সূরারই ৬৫-৬৬ নং আয়াতে বিস্তারিত বর্ণিত হয়েছে। সে আলোকে এখন বিধান এই যে, শত্রু-সৈন্যের সংখ্যা যদি দ্বিগুণ হয় বা তার কম,তখন রণক্ষেত্র ত্যাগ করা হারাম। কিন্তু তাদের সংখ্যা যদি তার চেয়ে বেশি হয়। তখন যুদ্ধক্ষেত্র ছেড়ে যাওয়ার অনুমতি আছে। আবার যে ক্ষেত্রে শত্রুদেরকে পৃষ্ঠপ্রদর্শন করা জায়েয নয়, তা থেকেও দুটো অবস্থাকে ব্যতিক্রম রাখা হয়েছে। (ক) অনেক সময় যুদ্ধ-কৌশল হিসেবে যুদ্ধ চলা অবস্থায়ই পেছনে সরে আসার প্রয়োজন দেখা দেয়। তখন ময়দান থেকে পলায়ন করা উদ্দেশ্য থাকে না। উদ্দেশ্য থাকে অন্য কিছু। এরূপ অবস্থায় পশ্চাদপসরণ করা জায়েয। (খ) অনেক সময় ক্ষুদ্র দল পেছনে সরে এসে নিজ বাহিনীর সাথে মিলিত হয় এবং উদ্দেশ্য থাকে তাদের সাহায্য নিয়ে একযোগে শত্রুর উপর ঝাঁপিয়ে পড়া। এ জাতীয় পৃষ্ঠপ্রদর্শনও জায়েয।
১৭

فَلَمۡ تَقۡتُلُوۡہُمۡ وَلٰکِنَّ اللّٰہَ قَتَلَہُمۡ ۪ وَمَا رَمَیۡتَ اِذۡ رَمَیۡتَ وَلٰکِنَّ اللّٰہَ رَمٰی ۚ وَلِیُبۡلِیَ الۡمُؤۡمِنِیۡنَ مِنۡہُ بَلَآءً حَسَنًا ؕ اِنَّ اللّٰہَ سَمِیۡعٌ عَلِیۡمٌ ١٧

ফালাম তাকতুলূহুম ওয়ালা-কিন্নাল্লা-হা কাতালাহুম ওয়ামা-রামাইতা ইযরামাইতা ওয়ালা-কিন্নাল্লা-হা রামা- ওয়ালি ইউবলিয়াল মু’মিনীনা মিনহু বালাআন হাছানান ইন্নাল্লা-হা ছামী‘উন আলীম।

সুতরাং (হে মুসলিমগণ! প্রকৃতপক্ষে) তোমরা তাদেরকে (অর্থাৎ কাফেরদেরকে) হত্যা করনি; বরং আল্লাহই তাদেরকে হত্যা করেছিলেন এবং (হে নবী!) তুমি যখন (তাদের উপর মাটি) নিক্ষেপ করেছিলে, তখন তা তুমি নিক্ষেপ করনি; বরং আল্লাহই নিক্ষেপ করেছিলেন আর (তা তোমাদের হাত দ্বারা করিয়েছিলেন) তার মাধ্যমে মুমিনদেরকে উত্তম প্রতিদান দেওয়ার জন্য। নিশ্চয়ই আল্লাহ সকল কিছুর শ্রোতা ও সবকিছুর জ্ঞাতা।

তাফসীরঃ

৯. বদর যুদ্ধের সময় শত্রু বাহিনী যখন সর্বশক্তি দিয়ে আক্রমণ চালাচ্ছিল, তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহ তাআলার হুকুমে এক মুঠো মাটি ও কাঁকর তুলে কাফেরদের দিকে নিক্ষেপ করলেন। আল্লাহ তাআলা তা প্রতিটি কাফের পর্যন্ত পৌঁছিয়ে দিলেন, যা তাদের চোখে-মুখে গিয়ে লাগল। ফলে শত্রুবাহিনীতে হই-চই পড়ে গেল। এখানে সেই ঘটনার দিকেই ইঙ্গিত করা হয়েছে।
১৮

ذٰلِکُمۡ وَاَنَّ اللّٰہَ مُوۡہِنُ کَیۡدِ الۡکٰفِرِیۡنَ ١٨

যা-লিকুম ওয়াআন্নাল্লা-হা মূহিনুকাইদিল কা-ফিরীন।

তা তো রয়েছেই, তদুপরি আল্লাহ কাফেরদের চক্রান্ত দুর্বল করার ছিলেন। ১০

তাফসীরঃ

১০. প্রকৃতপক্ষে এটি একটি প্রশ্নের উত্তর। প্রশ্ন হতে পারে যে, আল্লাহ তাআলা তো নিজ কুদরতে সরাসরিই শত্রু নিপাত করতে পারতেন। তা সত্ত্বেও তিনি মুসলিমদেরকে কেন ব্যবহার করলেন এবং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাত দিয়ে কাঁকর-মাটি কেন নিক্ষেপ করালেন? উত্তর দেওয়া হয়েছে এই যে, প্রথমত আল্লাহ তাআলার নীতি হল, তিনি তাকবীনী (রহস্যজগতীয়) বিষয়াবলীও বাহ্যিক কোন কারণ-উপকরণের মাধ্যমে সম্পন্ন করে থাকেন। এস্থলে মুসলিমদেরকে মাধ্যম বানানো হয়েছে এ কারণে, যাতে এই ছলে তাদের সওয়াব ও প্রতিদান হয়ে যায়। ‘তা তো রয়েছেই’ বলে এদিকেই ইঙ্গিত করা হয়েছে। দ্বিতীয়ত তিনি কাফেরদেরকে দেখাতে চাচ্ছিলেন যে, তোমরা তোমাদের যে কৌশল ও চক্রান্ত এবং আসবাব-উপকরণ নিয়ে গর্ববোধ করে থাক, আল্লাহ তাআলা সেগুলোকে মুসলিমদের হাতে ধুলোয় মিশিয়ে দিতে পারেন, যেই মুসলিমদেরকে তোমরা অতি দুর্বল মনে করছ।
১৯

اِنۡ تَسۡتَفۡتِحُوۡا فَقَدۡ جَآءَکُمُ الۡفَتۡحُ ۚ  وَاِنۡ تَنۡتَہُوۡا فَہُوَ خَیۡرٌ لَّکُمۡ ۚ  وَاِنۡ تَعُوۡدُوۡا نَعُدۡ ۚ  وَلَنۡ تُغۡنِیَ عَنۡکُمۡ فِئَتُکُمۡ شَیۡئًا وَّلَوۡ کَثُرَتۡ ۙ  وَاَنَّ اللّٰہَ مَعَ الۡمُؤۡمِنِیۡنَ ٪ ١٩

ইন তাছতাফতিহূফাকাদ জাআকুমুল ফাতহু ওয়া ইন তানতাহূফাহুওয়া খাইরুল্লাকুম ওয়া ইন তা‘ঊদূনা‘উদ ওয়া লান তুগনিয়া ‘আনকুম ফিআতুকুম শাইআওঁ ওয়ালাও কাছুরাত ওয়া আন্নাল্লা-হা মা‘আল মু’মিনীন।

(হে কাফেরগণ!) তোমরা যদি মীমাংসাই চেয়ে থাক, তবে মীমাংসা তো তোমাদের সামনে এসেই গেছে। এখন যদি তোমরা নিবৃত্ত হও, তবে তা তোমাদেরই পক্ষে কল্যাণকর হবে। আর যদি পুনরায় (সেই কাজই) কর (যা এ যাবৎ করছিলে), তবে আমরাও পুনরায় (তাই) করব (যেমনটা সদ্য করলাম) এবং তখন তোমাদের দল তোমাদের কোনও কাজে আসবে না, তার সংখ্যা যত বেশিই হোক। স্মরণ রেখ, আল্লাহ মুমিনদের সঙ্গে আছেন।
২০

یٰۤاَیُّہَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡۤا اَطِیۡعُوا اللّٰہَ وَرَسُوۡلَہٗ وَلَا تَوَلَّوۡا عَنۡہُ وَاَنۡتُمۡ تَسۡمَعُوۡنَ ۚۖ ٢۰

ইয়াআইয়ুহাল্লাযীনা আ-মানূআতী‘উল্লা-হা ওয়া রাছূলাহূওয়ালা-তাওয়াল্লাও ‘আনহু ওয়া আনতুম তাছমা‘ঊন।

হে মুমিনগণ! আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য কর এবং এর থেকে (অর্থাৎ আনুগত্য থেকে) মুখ ফিরিয়ে নিয়ো না, যখন তোমরা (আল্লাহ ও রাসূলের নির্দেশাবলী) শুনছ।
২১

وَلَا تَکُوۡنُوۡا کَالَّذِیۡنَ قَالُوۡا سَمِعۡنَا وَہُمۡ لَا یَسۡمَعُوۡنَ ٢١

ওয়ালা-তাকূনূকাল্লাযীনা কা-লূছামি‘না-ওয়া হুম লা-ইয়াছমা‘ঊন।

এবং তাদের মত হয়ো না, যারা বলে, আমরা শুনলাম কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তারা শোনে না।
২২

اِنَّ شَرَّ الدَّوَآبِّ عِنۡدَ اللّٰہِ الصُّمُّ الۡبُکۡمُ الَّذِیۡنَ لَا یَعۡقِلُوۡنَ ٢٢

ইন্না শাররাদ্দাওয়াব্বি ‘ইনদাল্লা-হিসসুম্মুল বুকমুল্লাযীনা লা-ইয়া‘কিলূন।

নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে নিকৃষ্টতম জীব সেই বধির ও বোবা লোক, যারা বুদ্ধি কাজে লাগায় না। ১১

তাফসীরঃ

১১. পূর্বের আয়াতে ‘শোনা’ দ্বারা ‘উপলব্ধি করা’ বোঝানো উদ্দেশ্য। অর্থাৎ কাফেরগণ শোনার দাবী করলেও বোঝার চেষ্টা করে না। এ হিসেবে তারা পশুরও অধম। কেননা বাকশক্তিহীন পশু কোন কথা না বুঝলে সেটা নিন্দাযোগ্য নয়, যেহেতু তাদের সে যোগ্যতাই নেই এবং তাদের কাছে এটা দাবীও থাকে না। কিন্তু মানুষের তো বোঝার যোগ্যতা আছে এবং তার কাছে দাবীও রয়েছে যে, সে বুঝে-শুনে ভালো পথ গ্রহণ করুক। তথাপি সে বোঝার চেষ্টা না করলে পশু অপেক্ষাও অধম সাব্যস্ত হবে বৈকি!
২৩

وَلَوۡ عَلِمَ اللّٰہُ فِیۡہِمۡ خَیۡرًا لَّاَسۡمَعَہُمۡ ؕ وَلَوۡ اَسۡمَعَہُمۡ لَتَوَلَّوۡا وَّہُمۡ مُّعۡرِضُوۡنَ ٢٣

ওয়া লাও ‘আলিমাল্লা-হু ফীহিম খাইরাল লাআছমা‘আহুম ওয়া লাও আছমা‘আহুম লাতাওয়াল্লাওঁ ওয়া হুম মু‘রিদূন।

আল্লাহর যদি জানা থাকত তাদের মধ্যে কোন কল্যাণ আছে, তবে তিনি তাদেরকে অবশ্যই শোনার তাওফীক দিতেন, কিন্তু (তাদের মধ্যে যেহেতু কোন কল্যাণ নেই, তাই) তাদের শোনার তাওফীক দিলেও তারা মুখ ফিরিয়ে পালাবে। ১২

তাফসীরঃ

১২. ‘কল্যাণ’ দ্বারা সত্যের অনুসন্ধিৎসা বোঝানো হয়েছে। আর পূর্বে বলা হয়েছে যে, ‘শোনা’ দ্বারা বোঝানো উদ্দেশ্য ‘উপলব্ধি করা’। এ আয়াত দ্বারা একটি গুরুত্বপূর্ণ তত্ত্ব জানা গেল। তা এই যে, সত্য বোঝার ও মানার তাওফীক আল্লাহ তাআলা কেবল তাকেই দান করেন, যার অন্তরে সত্যের অনুসন্ধিৎসা আছে। যদি কোনও ব্যক্তি সত্য জানার আগ্রহই না রাখে এবং সে এই ভেবে গাফলতির জীবন যাপন করে যে, আমি যা করছি সঠিক করছি, কারও কাছে আমার কিছু শেখার প্রয়োজন নেই, তবে প্রথমত সে সত্য-সঠিক কথা বুঝতেই পারে না, আর কখনও বুঝে আসলেও সে তা গ্রহণ করতে প্রস্তুত হয় না; বরং অহংকার বশে তা থেকে যথারীতি মুখ ফিরিয়ে রাখে।
২৪

یٰۤاَیُّہَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوا اسۡتَجِیۡبُوۡا لِلّٰہِ وَلِلرَّسُوۡلِ اِذَا دَعَاکُمۡ لِمَا یُحۡیِیۡکُمۡ ۚ وَاعۡلَمُوۡۤا اَنَّ اللّٰہَ یَحُوۡلُ بَیۡنَ الۡمَرۡءِ وَقَلۡبِہٖ وَاَنَّہٗۤ اِلَیۡہِ تُحۡشَرُوۡنَ ٢٤

ইয়াআইয়ুহাল্লাযীনা আ-মানুছতাজীবূলিল্লা-হি ওয়ালিররাছূলি ইযা-দা‘আ-কুম লিমাইউহয়ীকুম ওয়া‘লামূআন্নাল্লা-হা ইয়াহূলুবাইনাল মারয়ি ওয়া কালবিহী ওয়া আন্নাহূইলাইহি তুহশারূন।

হে মুমিনগণ! আল্লাহ ও রাসূলের দাওয়াত কবুল কর, যখন তিনি (রাসূল) তোমাদেরকে এমন বিষয়ের দিকে ডাকেন, যা তোমাদেরকে জীবন দান করে। ১৩ জেনে রেখ, আল্লাহ মানুষ ও তার অন্তরের মধ্যে প্রতিবন্ধক হয়ে যান। ১৪ আর তোমাদের সকলকে তারই কাছে (নিয়ে) জমা করা হবে।

তাফসীরঃ

১৩. এ সংক্ষিপ্ত বাক্যে এক অনস্বীকার্য বাস্তবতা বিবৃত হয়েছে। প্রথমত ইসলামের দাওয়াত ও তার বিধানাবলী এমন যে, সমস্ত মানুষ যদি পূর্ণাঙ্গরূপে তা গ্রহণ ও অনুসরণ করে তবে ইহলোকেই তারা শান্তিপূর্ণ জীবনের নিশ্চয়তা লাভ করতে পারে। ইবাদত-বন্দেগী তো আত্মিক প্রশান্তির সর্বোত্তম মাধ্যম। তাছাড়া ইসলামের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বিধানসমূহ বিশ্বকে স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ জীবন সরবরাহ করতে পারে। অন্য দিকে প্রকৃত জীবন তো আখিরাতের জীবন। সে জীবনের সুখণ্ডশান্তি ইসলামী বিধান মেনে চলার উপর নির্ভরশীল। সুতরাং কারও কাছে যদি ইসলামের কোনও বিধান কঠিনও মনে হয়, তবে তার চিন্তা করা উচিত যে, এর উপর তো তার পরকালীন জীবনের শান্তি নির্ভর করে। এই পার্থিব জীবনের জন্যও তো মানুষ বড়-বড় অপারেশনে রাজি হয়ে যায় এবং অনেক কষ্টসাধ্য কাজ মাথা পেতে নেয়। তাহলে শরীয়তের যে সকল বিধান শ্রম ও কষ্টসাধ্য বলে মনে হয় কিংবা যাতে মনের অনেক চাহিদা ত্যাগ করতে হয়, সেগুলোকে কেন হাসিমুখে মেনে নেওয়া হবে না, যখন আখিরাতের প্রকৃত ও অনন্ত-স্থায়ী জীবনের সুখণ্ডশান্তি তার উপর নির্ভরশীল?
২৫

وَاتَّقُوۡا فِتۡنَۃً لَّا تُصِیۡبَنَّ الَّذِیۡنَ ظَلَمُوۡا مِنۡکُمۡ خَآصَّۃً ۚ وَاعۡلَمُوۡۤا اَنَّ اللّٰہَ شَدِیۡدُ الۡعِقَابِ ٢٥

ওয়াত্তাকূফিতনাতাল লা-তুসীবান্নাল্লাযীনা জালামূমিনকুম খাসসাতাওঁ ওয়া‘লামূআন্নাল্লা-হা শাদীদুল ‘ইকা-ব।

এবং সেই বিপর্যয়কে ভয় কর, যা বিশেষভাবে তোমাদের মধ্যে যারা জুলুম করে কেবল তাদেরকেই আক্রান্ত করবে না। ১৫ জেনে রেখ, আল্লাহর আযাব সুকঠিন।

তাফসীরঃ

১৫. এ আয়াতে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তা এই যে, একজন মুসলিমের দায়িত্ব কেবল নিজেকে শরীয়তের অনুসারী বানানোর দ্বারাই শেষ হয়ে যায় না। সমাজে যদি কোন মন্দ কাজের বিস্তার ঘটতে দেখে, তবে সাধ্যমত তা রোধ করাও তার দায়িত্ব। এ দায়িত্ব পালনে যদি অবহেলা করে এবং সেই মন্দ কাজের দরুণ কোনও বিপর্যয় দেখা দেয়, তবে মন্দ কাজে যারা সরাসরি জড়িত ছিল কেবল তারাই সেই বিপর্যয়ের শিকার হবে না; বরং যারা নিজেরা সরাসরি মন্দ কাজ করেনি, কিন্তু অন্যদেরকে তা করতে বাধাও দেয়নি, তাদেরকে তার শিকার হতে হবে।
২৬

وَاذۡکُرُوۡۤا اِذۡ اَنۡتُمۡ قَلِیۡلٌ مُّسۡتَضۡعَفُوۡنَ فِی الۡاَرۡضِ تَخَافُوۡنَ اَنۡ یَّتَخَطَّفَکُمُ النَّاسُ فَاٰوٰىکُمۡ وَاَیَّدَکُمۡ بِنَصۡرِہٖ وَرَزَقَکُمۡ مِّنَ الطَّیِّبٰتِ لَعَلَّکُمۡ تَشۡکُرُوۡنَ ٢٦

ওয়াযকুরূ ইয আনতুমকালীলুমমুছতাদ‘আফূনা ফিল আরদি তাখা-ফূনা আইঁ ইয়াতাখাত্তাফাকুমুন্না-ছুফাআ-ওয়া কুম ওয়া আইইয়াদাকুম বিনাসরিহী ওয়া রাঝাকাকুম মিনাততাইয়িবা-তি লা‘আল্লাকুম তাশকুরূন।

এবং সেই সময়কে স্মরণ কর, যখন তোমরা সংখ্যায় অল্প ছিলে, লোকে তোমাদেরকে তোমাদের দেশে দাবিয়ে রেখেছিল। তোমরা ভয় করতে, পাছে লোকে তোমাদেরকে অকস্মাৎ তুলে নিয়ে যায়। অতঃপর আল্লাহ তোমাদেরকে আশ্রয় দিলেন, তোমাদেরকে নিজ সাহায্য দ্বারা শক্তিশালী করলেন এবং তোমাদেরকে উৎকৃষ্ট জিনিসসমূহের রিযক দান করলেন, যাতে তোমরা কৃতজ্ঞতা আদায় কর। ১৬

তাফসীরঃ

১৬. এর দ্বারা মক্কী জীবনের কথা স্মরণ করানো হয়েছে, যখন মুসলিমদের সংখ্যা ছিল খুব কম। কাফেরগণ তাদেরকে নানারকম জুলুম-নির্যাতন দ্বারা দুর্বল করে রেখেছিল। তারা সর্বক্ষণ তটস্থ থাকত, না জানি কখন আকস্মিক হামলা চালিয়ে তাদের উপর হত্যাযজ্ঞ চালায়। পরিশেষে আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে মদীনায় আশ্রয় দান করেন এবং আসনারদেরকে তাদের সহযোগী বানিয়ে দেন। তারপর বদর যুদ্ধ আসে। তাতে মুহাজির-আনসারের সম্মিলিত বাহিনীকে ফিরিশতাদের সাহায্যকারী দল দ্বারা শক্তিশালী করেন ও তাদেরকে বিজয় দান করেন এবং এ যুদ্ধে লব্ধ সম্পদ অর্থাৎ গনীমতের মালকে তাদের জন্য হালাল করে দেন। এসব অনুগ্রহের দাবি হল, আল্লাহর শোকরগোযার হয়ে তাঁর বিধানাবলী পালনে যত্নবান থাকা। -অনুবাদক
২৭

یٰۤاَیُّہَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا لَا تَخُوۡنُوا اللّٰہَ وَالرَّسُوۡلَ وَتَخُوۡنُوۡۤا اَمٰنٰتِکُمۡ وَاَنۡتُمۡ تَعۡلَمُوۡنَ ٢٧

ইয়াআইয়ুহাল্লাযীনা আ-মানূলা-তাখূনুল্লা -হা ওয়ার রাছূলা ওয়া তাখূনূআমা-না-তিকুম ওয়া আনতুম তা‘লামুন।

হে মুমিনগণ! আল্লাহ ও রাসূলের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করো না এবং জেনে-শুনে নিজেদের আমানতের খেয়ানত করো না।
২৮

وَاعۡلَمُوۡۤا اَنَّمَاۤ اَمۡوَالُکُمۡ وَاَوۡلَادُکُمۡ فِتۡنَۃٌ ۙ  وَّاَنَّ اللّٰہَ عِنۡدَہٗۤ اَجۡرٌ عَظِیۡمٌ ٪ ٢٨

ওয়া‘লামূআন্নামাআমওয়া-লুকুম ওয়া আওলা-দুকুম ফিতনাতুওঁ ওয়া আন্নাল্লা-হা ‘ইনদাহুআজরুন ‘আ জীম।

জেনে রেখ, তোমাদের সম্পদ ও তোমাদের সন্তান-সন্ততি তোমাদের জন্য এক পরীক্ষা। ১৭ আর মহা পুরস্কার রয়েছে আল্লাহরই কাছে।

তাফসীরঃ

১৭. মাল ও আওলাদের মহব্বত মানুষের মজ্জাগত বিষয়। যৌক্তিক সীমার মধ্যে থাকলে দূষণীয়ও নয়। কিন্তু পরীক্ষা এভাবে যে, এ ভালোবাসা আল্লাহ তাআলার নাফরমানী করতে উৎসাহ যোগায় কি না সেটা লক্ষ্য করা হবে। অর্থ-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততির ভালোবাসা আল্লাহ তাআলার আনুগত্যের সাথে হলে তা কেবল জায়েযই নয়; বরং এ কারণে সওয়াবও পাওয়া যাবে। পক্ষান্তরে এ ভালোবাসা যদি গুনাহ ও নাফরমানীর দিকে নিয়ে যায়, তবে এটা মহা মুসিবতের কারণ। আল্লাহ তাআলা সকল মুসলিমকে এর থেকে হেফাজত করুন।
২৯

یٰۤاَیُّہَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡۤا اِنۡ تَتَّقُوا اللّٰہَ یَجۡعَلۡ لَّکُمۡ فُرۡقَانًا وَّیُکَفِّرۡ عَنۡکُمۡ سَیِّاٰتِکُمۡ وَیَغۡفِرۡ لَکُمۡ ؕ وَاللّٰہُ ذُو الۡفَضۡلِ الۡعَظِیۡمِ ٢٩

ইয়াআইয়ুহাল্লাযীনা আ-মানূইন তাত্তাকুল্লা-হা ইয়াজ‘আল্লাকুম ফুরকা-নাওঁ ওয়া ইউকাফফির ‘আনকুম ছাইয়িআ-তিকুম ওয়া ইয়াগফির লাকুম ওয়াল্লা-হু যুল ফাদলিল ‘আজীম।

হে মুমিনগণ! তোমরা যদি আল্লাহর সঙ্গে তাকওয়ার নীতি অবলম্বন কর, তবে তিনি তোমাদেরকে (সত্য ও মিথ্যার মধ্যে) পার্থক্য করার শক্তি দেবেন, ১৮ তোমাদের পাপ মোচন করবেন এবং তোমাদেরকে ক্ষমা করবেন। আল্লাহ মহা অনুগ্রহের মালিক।

তাফসীরঃ

১৮. এটা তাকওয়ার এক বৈশিষ্ট্য যে, তা মানুষকে পরিষ্কার বুঝ-সমঝ ও চিন্তার স্বচ্ছতা দান করে। ফলে সে সত্য-মিথ্যা ও ন্যায়-অন্যায়ের মধ্যে পার্থক্য করতে সক্ষম হয়। অপর দিকে গুনাহ ও পাপাচারের বৈশিষ্ট্য হল, তা মানুষের বিবেক-বুদ্ধি নষ্ট করে দেয়। ফলে সে ভালোকে মন্দ ও মন্দকে ভালো মনে করতে শুরু করে।
৩০

وَاِذۡ یَمۡکُرُ بِکَ الَّذِیۡنَ کَفَرُوۡا لِیُثۡبِتُوۡکَ اَوۡ یَقۡتُلُوۡکَ اَوۡ یُخۡرِجُوۡکَ ؕ وَیَمۡکُرُوۡنَ وَیَمۡکُرُ اللّٰہُ ؕ وَاللّٰہُ خَیۡرُ الۡمٰکِرِیۡنَ ٣۰

ওয়া ইযইয়ামকুরু বিকাল্লাযীনা কাফারূলিইউছবিতূকা আও ইয়াকতুলূকা আও ইউখরিজুকা ওয়া ইয়ামকুরূনা ওয়া ইয়ামকুরুল্লা-হু ওয়াল্লা-হু খাইরুল মা-কিরীন।

(হে নবী! সেই সময়কে স্মরণ কর), যখন কাফেরগণ তোমাকে বন্দী করা অথবা তোমাকে হত্যা করা কিংবা তোমাকে (দেশ থেকে) বহিষ্কার করার জন্য তোমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছিল। তারা তো নিজেদের ষড়যন্ত্র পাকাচ্ছিল আর আল্লাহও নিজ কৌশল প্রয়োগ করছিলেন। বস্তুত আল্লাহ সর্বাপেক্ষা শ্রেষ্ঠ কৌশলকারী। ১৯

তাফসীরঃ

১৯. এ আয়াতে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হিজরতের ঘটনার দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে। মক্কার কাফেরগণ যখন দেখল, ইসলাম অতি দ্রুত বিস্তার লাভ করছে এবং মদীনা মুনাওয়ারায় প্রচুর সংখ্যক লোক ইসলাম গ্রহণ করেছে, তখন তারা এক পরামর্শ সভা ডাকল। তাতে বিভিন্ন প্রস্তাব পেশ করা হল। এ আয়াতে সেসব প্রস্তাব উল্লেখ করা হয়েছে আর তা হচ্ছে, গ্রেফতার করা, হত্যা করা ও নির্বাসন দেওয়া। শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছিল যে, তাকে হত্যাই করা হবে এবং তা এভাবে যে, বিভিন্ন গোত্র থেকে একজন করে যুবক বেছে নেওয়া হবে এবং তারা সকলে একযোগে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উপর আক্রমণ চালাবে। আল্লাহ তাআলা ওহীর মাধ্যমে তাদের এ সমস্ত কথা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জানিয়ে দিলেন এবং তাঁকে হিজরত করার হুকুম দিলেন। শত্রুরা তাঁর ঘর অবরোধ করে রেখেছিল আর এ অবস্থায় তিনি আল্লাহ তাআলার কুদরতে তাদের সম্মুখ দিয়ে বের হয়ে গেলেন, কিন্তু তারা তাঁকে দেখতে পেল না। ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ সীরাত গ্রন্থসমূহে দেখা যেতে পারে। মাআরিফুল কুরআনেও এ আয়াতের ব্যাখ্যায় তা বর্ণিত হয়েছে।
৩১

وَاِذَا تُتۡلٰی عَلَیۡہِمۡ اٰیٰتُنَا قَالُوۡا قَدۡ سَمِعۡنَا لَوۡ نَشَآءُ لَقُلۡنَا مِثۡلَ ہٰذَاۤ ۙ اِنۡ ہٰذَاۤ اِلَّاۤ اَسَاطِیۡرُ الۡاَوَّلِیۡنَ ٣١

ওয়া ইযা-তুতলা-‘আলাইহিম আ-য়া-তুনা-কা-লূকাদ ছামি‘না-লাও নাশাউ লাকুলনামিছলা হা-যা ইন হা-যা ইল্লা আছা-তীরুল আওওয়ালীন।

তাদের সামনে যখন আমার আয়াতসমূহ তিলাওয়াত করা হয়, তখন তারা বলে, (আচ্ছা) শুনলাম তো! ইচ্ছা করলে আমরাও এরূপ কথা বলতে পারি। এটা (কুরআন) পূর্ববর্তী লোকদের কল্পকাহিনী ছাড়া কিছু নয়।
৩২

وَاِذۡ قَالُوا اللّٰہُمَّ اِنۡ کَانَ ہٰذَا ہُوَ الۡحَقَّ مِنۡ عِنۡدِکَ فَاَمۡطِرۡ عَلَیۡنَا حِجَارَۃً مِّنَ السَّمَآءِ اَوِ ائۡتِنَا بِعَذَابٍ اَلِیۡمٍ ٣٢

ওয়া ইয কা-লুল্লা-হুম্মা ইন কা-না হা-যা-হুওয়াল হাক্কা মিন ‘ইনদিকা ফাআমতির ‘আলাইনা-হিজারাতাম মিনাছ ছামাই আবি’তিনা-বি‘আযা-বিন আলীম।

(একটা সময় ছিল) যখন তারা বলেছিল, হে আল্লাহ! এই কুরআনই যদি আপনার পক্ষ হতে আগত সত্য হয়ে থাকে, তবে আমাদের প্রতি আকাশ থেকে পাথর-বৃষ্টি বর্ষণ করুন অথবা আমাদের প্রতি কোন মর্মন্তুদ শাস্তি নিক্ষেপ করুন।
৩৩

وَمَا کَانَ اللّٰہُ لِیُعَذِّبَہُمۡ وَاَنۡتَ فِیۡہِمۡ ؕ وَمَا کَانَ اللّٰہُ مُعَذِّبَہُمۡ وَہُمۡ یَسۡتَغۡفِرُوۡنَ ٣٣

ওয়ামা-কা-নাল্লা-হু লিইউ‘আযযিবাহুম ওয়া আনতা ফীহিম ওয়ামা-কা-নাল্লা-হু মু‘আযযিবাহুম ওয়া হুম ইয়াছতাগফিরূন।

এবং (হে নবী!) আল্লাহ এমন নন যে, তুমি তাদের মধ্যে বর্তমান থাকা অবস্থায় তাদেরকে শাস্তি দেবেন এবং তিনি এমনও নন যে, তারা ইস্তিগফারে রত থাকা অবস্থায় তাদেরকে শাস্তি দেবেন। ২০

তাফসীরঃ

২০. অর্থাৎ শিরক ও কুফরের কারণে তারা তো এরই উপযুক্ত ছিল যে, শাস্তি অবতীর্ণ করে তাদেরকে ধ্বংস করে দেওয়া হবে। কিন্তু দু’টি কারণে তাদের উপর শাস্তি অবতীর্ণ করা হয়নি। একটি কারণ এই যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মক্কা মুকাররমায় তাদের মধ্যেই রয়েছেন। আর তাঁর বর্তমানে শাস্তি নাযিল হতে পারে না। কেননা আল্লাহ তাআলা কোনও জাতির উপর তাদের নবীর বর্তমানে শাস্তি নাযিল করেন না। নবী যখন তাদের মধ্য হতে বের হয়ে যান তখনই শাস্তি নাযিল করা হয়ে থাকে। তাছাড়া নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে রহমাতুল লিল আলামীন বানিয়ে পাঠানো হয়েছে। তাই তাঁর বরকতে ব্যাপক আযাব আসবে না। দ্বিতীয় কারণ হল, মক্কা মুকাররমায় বহু মুসলিম ইস্তিগফার ও ক্ষমা প্রার্থনায় রত আছে, তাদের ইস্তিগফারের বরকতে আযাব থেমে রয়েছে। কোনও কোনও মুফাসসির আয়াতটির ব্যাখ্যা করেছেন যে, খোদ মুশরিকগণও তাওয়াফকালে ‘গুফরানাকা-গুফরানাকা’ ‘তোমার ক্ষমা চাই, তোমার ক্ষমা চাই’ বলত, যা ইস্তিগফারেরই এক পদ্ধতি। যদিও কুফর ও শিরকের কারণে তারা এ ইস্তিগফার দ্বারা আখিরাতের আযাব থেকে বাঁচতে পারবে না, কিন্তু আল্লাহ তাআলা কাফেরদের পুণ্যের বদলা ইহজগতেই দিয়ে দেন। তাই তাদের ইস্তিগফারের ফায়দাও তারা দুনিয়ায় পেয়ে গেছে আর তা এভাবে যে, ছামুদ, আদ প্রভৃতি জাতির উপর যেমন ব্যাপক শাস্তি অবতীর্ণ হয়েছিল, মক্কার কাফেরদের উপর সে রকম ব্যাপক শাস্তি অবতীর্ণ করা হয়নি।
৩৪

وَمَا لَہُمۡ اَلَّا یُعَذِّبَہُمُ اللّٰہُ وَہُمۡ یَصُدُّوۡنَ عَنِ الۡمَسۡجِدِ الۡحَرَامِ وَمَا کَانُوۡۤا اَوۡلِیَآءَہٗ ؕ اِنۡ اَوۡلِیَآؤُہٗۤ اِلَّا الۡمُتَّقُوۡنَ وَلٰکِنَّ اَکۡثَرَہُمۡ لَا یَعۡلَمُوۡنَ ٣٤

ওয়ামা-লাহুম আল্লা-ইউ‘আযযিবাহুমুল্লা-হু ওয়া হুম ইয়াসুদ্দূনা ‘আনিল মাছজিদিল হারা-মি ওয়ামা-কা-নূআওলিয়াআউহূ ইন আওলিয়াউহূইল্লাল মুত্তাকূনা ওয়ালা-কিন্না আকছারাহুম লা-ইয়া‘লামূন।

আর তাদের কী-বা গুণ আছে যে, আল্লাহ তাদেরকে শাস্তি দেবেন না, অথচ তারা (মানুষকে) মসজিদুল হারামে যেতে বাধা দেয়, ২১ যদিও তারা তার মুতাওয়াল্লী নয়। মুত্তাকীগণ ছাড়া অন্য কোনও লোক তার মুতাওয়াল্লী হতেও পারে না। কিন্তু তাদের অধিকাংশ লোক (এ কথা) জানে না।

তাফসীরঃ

২১. অর্থাৎ যদিও উপরে বর্ণিত দুই কারণে দুনিয়ায় তাদের উপর কোন শাস্তি অবতীর্ণ হচ্ছে না, তাই বলে এটা মনে করা ঠিক হবে না যে, তারা শাস্তির উপযুক্তই নয়। বস্তুত কুফর ও শিরক ছাড়াও তারা এমন বহু অপরাধ করে থাকে, যা তাদের জন্য শাস্তিকে অবধারিত করে রেখেছে, যেমন তাদের একটা অপরাধ হল, তারা মুসলিমদেরকে মসজিদুল হারামে ইবাদত করতে দেয় না। পূর্বে এ সম্পর্কে হযরত সাদ ইবনে মুয়াজ (রাযি.)-এর ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। (দেখুন এ সূরার পরিচিতি)। সুতরাং যখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও তাঁর সাহাবীগণ মক্কা মুকাররমা থেকে বের হয়ে যাবেন, তখন তাদের উপর আংশিক শাস্তি এসে যাবে, যেমনটা পরবর্তীকালে মক্কা বিজয়রূপে দেখা দিয়েছিল। অতঃপর তারা আখিরাতে পূর্ণাঙ্গ শাস্তির সম্মুখীন হবে।
৩৫

وَمَا کَانَ صَلَاتُہُمۡ عِنۡدَ الۡبَیۡتِ اِلَّا مُکَآءً وَّتَصۡدِیَۃً ؕ فَذُوۡقُوا الۡعَذَابَ بِمَا کُنۡتُمۡ تَکۡفُرُوۡنَ ٣٥

ওয়ামা-কা-না সালা-তুহুম ‘ইনদাল বাইতি ইল্লা-মুকা-আওঁ ওয়া তাসদিয়াতান ফাযূকুল ‘আযা-বা বিমা-কুনতুম তাকফুরূন।

বাইতুল্লাহর নিকট তাদের নামায শিস দেওয়া ও তালি বাজানো ছাড়া কিছুই নয়। সুতরাং (হে কাফেরগণ!) তোমরা যে কুফরী করতে, তজ্জন্য এখন শাস্তি ভোগ কর।
৩৬

اِنَّ الَّذِیۡنَ کَفَرُوۡا یُنۡفِقُوۡنَ اَمۡوَالَہُمۡ لِیَصُدُّوۡا عَنۡ سَبِیۡلِ اللّٰہِ ؕ  فَسَیُنۡفِقُوۡنَہَا ثُمَّ تَکُوۡنُ عَلَیۡہِمۡ حَسۡرَۃً ثُمَّ یُغۡلَبُوۡنَ ۬ؕ  وَالَّذِیۡنَ کَفَرُوۡۤا اِلٰی جَہَنَّمَ یُحۡشَرُوۡنَ ۙ ٣٦

ইন্নাল্লাযীনা কাফারূইউনফিকূনা আমওয়া-লাহুম লিয়াসুদ্দূ‘আন ছাবীলিল্লা-হি ফাছাইউনফিকূনাহা-ছু ম্মা তাকূনু‘আলাইহিম হাছরাতান ছুম্মা ইউগলাবূনা ওয়াল্লাযীনা কাফারূইলা-জাহান্নামা ইউহশারূন।

যারা কুফর অবলম্বন করেছে, তারা আল্লাহর পথে (মানুষকে) বাঁধা দেওয়ার জন্য নিজেদের অর্থ-সম্পদ ব্যয় করে। ২২ এর পরিণাম হবে এই যে, তারা অর্থ-সম্পদ ব্যয় করতে থাকবে, অতঃপর সেসব তাদের মনস্তাপের কারণ হয়ে যাবে এবং শেষ পর্যন্ত তারা পরাভূত হবে। আর যারা কুফরী করে, তাদেরকে (আখিরাতে) জাহান্নামে নিয়ে একত্র করা হবে।

তাফসীরঃ

২২. বদর যুদ্ধের পর কুরাইশের যে সকল মোড়ল জীবিত ছিল, তারা আরও বড় যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হচ্ছিল এবং সে লক্ষ্যে তারা চাঁদা গ্রহণ করতে শুরু করেছিল। তারই পরিপ্রেক্ষিতে এ আয়াত নাযিল হয়েছে।
৩৭

لِیَمِیۡزَ اللّٰہُ الۡخَبِیۡثَ مِنَ الطَّیِّبِ وَیَجۡعَلَ الۡخَبِیۡثَ بَعۡضَہٗ عَلٰی بَعۡضٍ فَیَرۡکُمَہٗ جَمِیۡعًا فَیَجۡعَلَہٗ فِیۡ جَہَنَّمَ ؕ  اُولٰٓئِکَ ہُمُ الۡخٰسِرُوۡنَ ٪ ٣٧

লিয়ামীঝাল্লা-হুল খাবীছা মিনাততাইয়িবি ওয়া ইয়াজ‘আলাল খাবীছা বা‘দাহূ‘আলাবা‘দিন ফাইয়ারকুমাহূজামী‘আন ফাইয়াজ‘আলাহূফী জাহান্নামা উলাইকা হুমুল খাছিরূন।

আর তা এই জন্য যে, আল্লাহ অপবিত্র (লোকদের)কে পবিত্র (লোকদের) থেকে পৃথক করে দেবেন এবং এক অপবিত্রকে অপর অপবিত্রের উপর রেখে তাদের সকলকে স্তূপীকৃত করবেন, অতঃপর সেই স্তূপকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবেন। এরাই সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত।
৩৮

قُلۡ لِّلَّذِیۡنَ کَفَرُوۡۤا اِنۡ یَّنۡتَہُوۡا یُغۡفَرۡ لَہُمۡ مَّا قَدۡ سَلَفَ ۚ وَاِنۡ یَّعُوۡدُوۡا فَقَدۡ مَضَتۡ سُنَّتُ الۡاَوَّلِیۡنَ ٣٨

কুল লিল্লাযীনা কাফারূইয়ঁইয়ানতাহূইউগফারলাহুম মা-কাদ ছালাফা ওয়াইয়ঁ ইয়া‘ঊদূফাকাদ মাদাত ছুন্নাতুল আওওয়ালীন।

(হে নবী!) যারা কুফর অবলম্বন করেছে, তাদেরকে বলে দাও, তারা যদি নিবৃত্ত হয়, তবে অতীতে যা-কিছু হয়েছে তাদেরকে তা ক্ষমা করে দেওয়া হবে। ২৩ কিন্তু তারা যদি পুনরায় (সে কাজই) করে, তবে পূর্ববর্তী লোকদের সাথে যে আচরণ করা হয়েছে তা তো (তাদের সামনে) গত হয়েছেই। ২৪

তাফসীরঃ

২৩. এ আয়াতে মূলনীতি বলে দেওয়া হয়েছে যে, কেউ যখন ঈমান আনে, তখন তার কুফরী অবস্থায় কৃত যাবতীয় গুনাহ মাফ হয়ে যায়। এমনকি আগের নামায, রোযা ও অন্যান্য ইবাদতের কাযা করাও জরুরী হয় না।
৩৯

وَقَاتِلُوۡہُمۡ حَتّٰی لَا تَکُوۡنَ فِتۡنَۃٌ وَّیَکُوۡنَ الدِّیۡنُ کُلُّہٗ لِلّٰہِ ۚ فَاِنِ انۡتَہَوۡا فَاِنَّ اللّٰہَ بِمَا یَعۡمَلُوۡنَ بَصِیۡرٌ ٣٩

ওয়া কা-তিলূহুম হাত্তা-লা-তাকূনা ফিতনাতুওঁ ওয়া ইয়াকূনাদদীনুকুল্লুহূলিল্লা-হি ফাইনিন তাহাও ফাইন্নাল্লা-হা বিমা-ইয়া‘মালূনা বাসীর।

(হে মুসলিমগণ!) তোমরা কাফেরদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করতে থাক, যাবৎ না ফিতনা দূরীভূত হয় এবং দীন সম্পূর্ণরূপে আল্লাহর হয়ে যায়। ২৫ অতঃপর তারা যদি নিবৃত্ত হয়, তবে আল্লাহ তো তাদের কার্যাবলী সম্যক দেখছেন। ২৬

তাফসীরঃ

২৫. সামনে সূরা তাওবায় বলা হয়েছে, আল্লাহ তাআলা জাযিরাতুল আরবকে ইসলামের কেন্দ্রভূমি বানিয়েছেন। তাই এখানকার জন্য বিধান হল যে, এখানে কোন কাফের ও মুশরিক স্থায়ীভাবে বসবাস করতে পারবে না। হয় ইসলাম গ্রহণ করবে, নয়ত অন্য কোথাও চলে যাবে। সে কারণেই এ আয়াতে হুকুম দেওয়া হয়েছে, জাযিরাতুল আরবের কাফের ও মুশরিকগণ যতক্ষণ পর্যন্ত উল্লিখিত দু’টি বিষয়ের কোন একটি গ্রহণ না করবে, ততক্ষণ পর্যন্ত তাদের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যেতে হবে। জাযিরাতুল আরবের বাইরে এ হুকুম প্রযোজ্য নয়। সেখানে অমুসলিমদের সাথে বিভিন্ন রকমের চুক্তি হতে পারে। প্রায় এই একই রকমের আয়াত সূরা বাকারায় (২ : ১৯৩) গত হয়েছে। সেখানে আমরা যে টীকা লিখেছি তা দেখে নেওয়ার অনুরোধ করা যাচ্ছে।
৪০

وَاِنۡ تَوَلَّوۡا فَاعۡلَمُوۡۤا اَنَّ اللّٰہَ مَوۡلٰىکُمۡ ؕ نِعۡمَ الۡمَوۡلٰی وَنِعۡمَ النَّصِیۡرُ ٤۰

ওয়া ইন তাওয়াল্লাও ফা‘লামূআন্নাল্লা-হা মাওলা-কুম নি‘মাল মাওলা-ওয়া নি‘মান নাসীর।

তারা যদি মুখ ফিরিয়ে রাখে, তবে জেনে রেখ, আল্লাহই তোমাদের অভিভাবক কত উত্তম অভিভাবক তিনি এবং কত উত্তম সাহায্যকারী।
৪১

وَاعۡلَمُوۡۤا اَنَّمَا غَنِمۡتُمۡ مِّنۡ شَیۡءٍ فَاَنَّ لِلّٰہِ خُمُسَہٗ وَلِلرَّسُوۡلِ وَلِذِی الۡقُرۡبٰی وَالۡیَتٰمٰی وَالۡمَسٰکِیۡنِ وَابۡنِ السَّبِیۡلِ ۙ اِنۡ کُنۡتُمۡ اٰمَنۡتُمۡ بِاللّٰہِ وَمَاۤ اَنۡزَلۡنَا عَلٰی عَبۡدِنَا یَوۡمَ الۡفُرۡقَانِ یَوۡمَ الۡتَقَی الۡجَمۡعٰنِ ؕ وَاللّٰہُ عَلٰی کُلِّ شَیۡءٍ قَدِیۡرٌ ٤١

ওয়া‘লামূআন্নামা-গানিমতুম মিন শাইয়িন ফাআন্না লিল্লা-হি খুমুছাহূওয়া লিররাছূলি ওয়া লিযিল কুরবা-ওয়াল ইয়াতা-মা-ওয়াল মাছা-কীনি ওয়াবনিছ ছাবীলি ইন কুনতুম আমানতুম বিল্লা-হি ওয়া মাআনঝালনা-‘আলা-‘আবদিনা-ইয়াওমাল ফুরকা-নি ইয়াওমাল তাকাল জাম‘আ-নি ওয়াল্লা-হু ‘আলা-কুল্লি শাইয়িন কাদীর।

(হে মুসলিমগণ!) জেনে রাখ, তোমরা যা-কিছু গনীমত অর্জন কর, তার এক-পঞ্চমাংশ আল্লাহ, রাসূল, (তাঁর) আত্মীয়বর্গ, ইয়াতীম, মিসকীন ও মুসাফিরদের প্রাপ্য ২৭ (যা আদায় করা তোমাদের অবশ্য কর্তব্য)যদি তোমরা আল্লাহর প্রতি ও সেই বিষয়ের প্রতি ঈমান রাখ, যা আমি নিজ বান্দার উপর মীমাংসার দিন অবতীর্ণ করেছি ২৮ যে দিন দু’ দল পরস্পরের সম্মুখীন হয়েছিল। আল্লাহ সর্ব বিষয়ে শক্তিমান।

তাফসীরঃ

২৭. গনীমত বলে সেই সম্পদকে, যা জিহাদকালে শত্রুপক্ষের থেকে মুজাহিদদের হস্তগত হয়। এ আয়াতে তা বণ্টনের মূলনীতি শিক্ষা দেওয়া হয়েছে। মূলনীতির সারমর্ম এই যে, জিহাদে যে সম্পদ অর্জিত হয়, তাকে পাঁচ ভাগ করা হবে। তার চার ভাগ মুজাহিদদের মধ্যে বণ্টন করা হবে এবং পঞ্চম ভাগ বায়তুল মালে (রাষ্ট্রীয় কোষাগারে) জমা করা হবে। এই পঞ্চম ভাগকে ‘খুমুস’ বলা হয়। খুমুস বণ্টনের নিয়ম সম্পর্কে আয়াতে প্রথমে বলা হয়েছে যে, এ মালের প্রকৃত মালিক আল্লাহ তাআলা। সুতরাং তার নির্দেশ মতই এটা বণ্টন করতে হবে। অতঃপর এটা বণ্টনের পাঁচটি খাত উল্লেখ করা হয়েছে। এক ভাগ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের। এক ভাগ তাঁর আত্মীয়-স্বজনের। কেননা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আত্মীয়বর্গ তাঁর ও ইসলামের সাহায্যার্থে অসাধারণ ত্যাগ স্বীকার করেছিলেন, আবার তাদের জন্য যাকাতের অর্থও হারাম করা হয়েছিল। অবশিষ্ট তিন ভাগ ইয়াতীম, মিসকীন ও মুসাফিরদের জন্য ব্যয় করার হুকুম দেওয়া হয়েছে। অধিকাংশ ফুকাহায়ে কিরামের মতে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অংশ তাঁর ওফাতের পর আর কার্যকর নেই। তাঁর আত্মীয়দের অংশ সম্পর্কে ফকীহগণের মধ্যে কিছুটা মতভেদ আছে। ইমাম শাফেয়ী (রহ.)-এর মতে এ অংশের কার্যকারিতা এখনও বহাল আছে। কাজেই তা বনু হাশিম ও বনু মুত্তালিবের মধ্যে তাদের অধিকার হিসেবে বণ্টন করা জরুরী, তাতে তারা ধনী হোক বা গরীব। কিন্তু আহলুস সুন্নাহর অন্যান্য ফকীহগণ বলেন, তারা গরীব হলে তো অন্যান্য গরীবদের উপর অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে তাদেরকে খুমুসের অর্থ দেওয়া হবে। আর তারা যদি অভাবগ্রস্ত না হয়, তবে খুমুসে আলাদাভাবে তাদের কোন অধিকার থাকবে না। হযরত উমর (রাযি.) একবার হযরত আলী (রাযি.)কে খুমুস থেকে অংশ দিলে হযরত আলী (রাযি.) এই বলে তা প্রত্যাখ্যান করলেন যে, এ বছর আমাদের খান্দানের কোন প্রয়োজন নেই (আবু দাঊদ, হাদীস নং ২৯৮৪)। সুতরাং হযরত আলী (রাযি.)-সহ চারও খুলাফায়ে রাশেদীনের নীতি এটাই ছিল যে, বনু হাশিম ও বনু মুত্তালিবের লোকজন অভাবগ্রস্ত হলে খুমুস থেকে অংশ দানের ক্ষেত্রে তাদেরকে অগ্রাধিকার দিতেন; আর তারা যদি অভাবগ্রস্ত না হতেন, তবে তাদেরকে দিতেন না। তার একটি কারণ এই-ও যে, অধিকাংশ ফুকাহা ও মুফাসসিরগণের মতে এ আয়াতে যে পাঁচটি খাত বর্ণিত হয়েছে, খুমুসের অর্থ তাদের সকল শ্রেণীকে দেওয়া এবং সমহারে দেওয়া অপরিহার্য নয় এবং আয়াতের উদ্দেশ্যও সেটা নয়; বরং খুমুস ব্যয়ের এ পঞ্চ খাত যাকাতের খাতসমূহেরই মত (যাদের উল্লেখ সূরা তাওবায় [৯ : ৬০] আসছে)। অর্থাৎ ইমাম তথা রাষ্ট্রপ্রধানের এখতিয়ার রয়েছে যে, এ খাতসমূহের মধ্যে প্রয়োজন অনুযায়ী যে খাতে যে পরিমাণ দেওয়া সমীচীন মনে করেন তাই দেবেন। এ মাসআলা সম্পর্কে বান্দা সহীহ মুসলিমের ভাষ্যগ্রন্থ তাকমিলা ফাতহুল মুলহিমে (খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ২৫৪-২৫৮) বিস্তারিত আলোচনা করেছে।
৪২

اِذۡ اَنۡتُمۡ بِالۡعُدۡوَۃِ الدُّنۡیَا وَہُمۡ بِالۡعُدۡوَۃِ الۡقُصۡوٰی وَالرَّکۡبُ اَسۡفَلَ مِنۡکُمۡ ؕ  وَلَوۡ تَوَاعَدۡتُّمۡ لَاخۡتَلَفۡتُمۡ فِی الۡمِیۡعٰدِ ۙ  وَلٰکِنۡ لِّیَقۡضِیَ اللّٰہُ اَمۡرًا کَانَ مَفۡعُوۡلًا ۬ۙ  لِّیَہۡلِکَ مَنۡ ہَلَکَ عَنۡۢ بَیِّنَۃٍ وَّیَحۡیٰی مَنۡ حَیَّ عَنۡۢ بَیِّنَۃٍ ؕ  وَاِنَّ اللّٰہَ لَسَمِیۡعٌ عَلِیۡمٌ ۙ ٤٢

ইযআনতুম বিল ‘উদওয়াতিদদুনইয়া-ওয়া হুম বিল‘উদওয়াতিল কুসওয়া-ওয়াররাকবু আছফালা মিনকুম ওয়া লাও তাওয়া-‘আততুম লাখতালাফতুম ফিল মী‘আ-দি ওয়ালাকিল লিয়াকদিইয়াল্লা-হু আমরান কা-না মাফ‘ঊলাল লিইয়াহলিকা মান হালাকা ‘আম বাইয়িনাতিওঁ ওয়া ইয়াহইয়া-মান হাইয়া ‘আম বাইয়িনাতিওঁ; ওয়া ইন্নাল্লা-হা লাছামী‘উন আলীম।

(স্মরণ কর), যখন তোমরা (উপত্যকার) নিকটবর্তী প্রান্তে ছিলে এবং তারা ছিল দূরবর্তী প্রান্তে, আর কাফেলা ছিল তোমাদের অপেক্ষা নিচের দিকে। ২৯ তোমরা যদি (আগে থেকেই) পারস্পরিক আলোচনাক্রমে (যুদ্ধের) সময় নির্ধারণ করতে চাইতে, তবে সময় নির্ধারণের ব্যাপারে তোমাদের মধ্যে অবশ্যই মতভেদ দেখা দিত। কিন্তু (পূর্ব সিদ্ধান্ত ব্যতিরেকে এজন্য ঘটেছে), যাতে যে বিষয়টা ঘটবার ছিল আল্লাহ তা সম্পন্ন করে দেখান। ফলে যার ধ্বংস হওয়ার, সে সুস্পষ্ট প্রমাণ দেখেই ধ্বংস হয় আর যার জীবিত থাকার, সেও সুস্পষ্ট প্রমাণ দেখেই জীবিত থাকে।, ৩০ আল্লাহ সবকিছুর শ্রোতা ও সব কিছুর জ্ঞাতা।

তাফসীরঃ

২৯. এর দ্বারা যুদ্ধক্ষেত্রের মানচিত্র তুলে ধরা হয়েছে। বদর একটি উপত্যকার নাম। তার যে প্রান্ত মদীনা মুনাওয়ারার নিকটবর্তী, সেখানে মুসলিম বাহিনী অবস্থান নিয়েছিল আর যে প্রান্ত মদীনা মুনাওয়ারা থেকে অপেক্ষাকৃত দূরে, সেখানে ছিল কাফেরদের বাহিনী। আর ‘কাফেলা’ দ্বারা আবু সুফিয়ানের কাফেলাকে বোঝানো হয়েছে, যা উপত্যকার নিুদিক থেকে বের হয়ে উপকূলবর্তী পথ ধরেছিল এবং এভাবে আত্মরক্ষা করতে সক্ষম হয়েছিল। সূরার শুরুতে এ ঘটনা বিস্তারিত উল্লেখ করা হয়েছে।
৪৩

اِذۡ یُرِیۡکَہُمُ اللّٰہُ فِیۡ مَنَامِکَ قَلِیۡلًا ؕ وَلَوۡ اَرٰىکَہُمۡ کَثِیۡرًا لَّفَشِلۡتُمۡ وَلَتَنَازَعۡتُمۡ فِی الۡاَمۡرِ وَلٰکِنَّ اللّٰہَ سَلَّمَ ؕ اِنَّہٗ عَلِیۡمٌۢ بِذَاتِ الصُّدُوۡرِ ٤٣

ইয ইউরীকাহুমুল্লা -হু ফী মানা-মিকা কালীলাওঁ ওয়া লাও আরা-কাহুম কাছীরাল লাফাশিলতুম ওয়ালা তানা-ঝা‘তুম ফিল আমরি ওয়ালা-কিন্নাল্লা-হা ছাল্লামা ইন্নাহূ ‘আলীমুম বিযা-তিসসুদূ র।

(হে নবী! স্মরণ কর), যখন আল্লাহ তোমাকে স্বপ্নে তাদের (অর্থাৎ শত্রুদের) সংখ্যা কম দেখাচ্ছিলেন। ৩১ তোমাকে যদি তাদের সংখ্যা বেশি দেখাতেন, তবে (হে মুসলিমগণ!) তোমরা সাহস হারাতে এবং এ বিষয়ে তোমাদের মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি হত, কিন্তু আল্লাহ (তোমাদেরকে তা থেকে) রক্ষা করলেন। নিশ্চয়ই তিনি অন্তরের গুপ্ত কথাসমূহও ভালোভাবে জানেন।

তাফসীরঃ

৩১. যুদ্ধ শুরুর আগে হানাদার কাফেরদের সংখ্যা কত তা যখন মুসলিমদের জানা ছিল না, তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে স্বপ্নে দেখানো হয় যে, তাদের সংখ্যা অল্প। তিনি সে স্বপ্ন সাহাবায়ে কিরামের সামনে বর্ণনা করলেন। এতে তাদের সাহস বৃদ্ধি পায়। ইমাম রাযী (রহ.) বলেন, নবীর স্বপ্ন যেহেতু বাস্তববিরোধী হতে পারে না, তাই দৃশ্যত বোঝা যাচ্ছে তাকে সৈন্যদের একটা অংশ দেখানো হয়েছিল, তিনি সেই অংশ সম্পর্কেই জানিয়েছিলেন যে, তারা অল্পসংখ্যক। কেউ বলেন, স্বপ্নে যে জিনিস দেখানো হয়, তার সম্পর্ক থাকে উপমা জগত (আলম-ই-মিছাল)-এর সাথে। যা দেখা যায়, উদ্দেশ্য হুবহু সেটাই হয় না। এ কারণে স্বপ্নের তাবীর করার প্রয়োজন থাকে। সুতরাং স্বপ্নে যদিও গোটা বাহিনীর সংখ্যা অল্প দেখানো হয়েছিল, কিন্তু সে অল্পতার আসল ব্যাখ্যা ছিল এই যে, সৈন্য সংখ্যা বেশি হলেও তার গুরুত্ব বড় কম। এ ব্যাখ্যা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জানা ছিল। সুতরাং সে দৃষ্টিতেই তিনি সাহাবায়ে কিরামের সামনে এ স্বপ্নের কথা উল্লেখ করেছিলেন, যাতে তাদের সাহস ও উদ্যম বৃদ্ধি পায়।
৪৪

وَاِذۡ یُرِیۡکُمُوۡہُمۡ اِذِ الۡتَقَیۡتُمۡ فِیۡۤ اَعۡیُنِکُمۡ قَلِیۡلًا وَّیُقَلِّلُکُمۡ فِیۡۤ اَعۡیُنِہِمۡ لِیَقۡضِیَ اللّٰہُ اَمۡرًا کَانَ مَفۡعُوۡلًا ؕ  وَاِلَی اللّٰہِ تُرۡجَعُ الۡاُمُوۡرُ ٪ ٤٤

ওয়া ইযইউরীকুমূহুম ইযিলতাকাইতুম ফীআ‘ইউনিকুম কালীলাওঁ ওয়া ইউকালিল্লুকুম ফীআ‘ইউনিহিম লিয়াকদিইয়াল্লা-হু আমরান কা-না মাফ‘ঊলাওঁ ওয়া ইলাল্লা-হি তুরজা‘উল উমূর।

এবং (সেই সময়কে স্মরণ কর), যখন তোমরা একে অপরের মুখোমুখি হয়েছিলে, তখন আল্লাহ তোমাদের চোখে তাদের সংখ্যা অল্প দেখাচ্ছিলেন এবং তাদের চোখে তোমাদেরকে অল্প দেখাচ্ছিলেন, ৩২ যাতে যে কাজ সংঘটিত হওয়ার ছিল, আল্লাহ তা সম্পন্ন করে দেখান। যাবতীয় বিষয় আল্লাহরই দিকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়।

তাফসীরঃ

৩২. এটা সেই স্বপ্ন নয়; বরং জাগ্রত অবস্থার কথা। উভয় পক্ষ যখন একে অন্যের সম্মুখীন, ঠিক তখনই এটা ঘটেছিল। তখন আল্লাহ তাআলা মুসলিমদের অন্তরে এমন এক অবস্থার সৃষ্টি করে দেন, যদ্দরুণ কাফেরদের সেই বিশাল ও শক্তিশালী বাহিনীকেও তাদের কাছে অত্যন্ত মামুলি মনে হচ্ছিল।
৪৫

یٰۤاَیُّہَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡۤا اِذَا لَقِیۡتُمۡ فِئَۃً فَاثۡبُتُوۡا وَاذۡکُرُوا اللّٰہَ کَثِیۡرًا لَّعَلَّکُمۡ تُفۡلِحُوۡنَ ۚ ٤٥

ইয়াআইয়ুহাল্লাযীনা আ-মানূইযা-লাকীতুম ফিআতান ফাছবুতূওয়াযকুরুল্লা-হা কাছীরাল লা‘আল্লাকুম তুফলিহূন।

হে মুমিনগণ! যখন তোমরা কোন দলের সম্মুখীন হবে, তখন অবিচলিত থাকবে এবং আল্লাহকে বেশি পরিমাণে স্মরণ করবে, যাতে তোমরা সফলতা অর্জন কর।
৪৬

وَاَطِیۡعُوا اللّٰہَ وَرَسُوۡلَہٗ وَلَا تَنَازَعُوۡا فَتَفۡشَلُوۡا وَتَذۡہَبَ رِیۡحُکُمۡ وَاصۡبِرُوۡا ؕ  اِنَّ اللّٰہَ مَعَ الصّٰبِرِیۡنَ ۚ ٤٦

ওয়া আতী‘উল্লা-হা ওয়া রাছূলাহূওয়ালা-তানা-ঝা‘ঊ ফাতাফশালূওয়া তাযহাবা রীহুকুম ওয়াসবিরূ ইন্নাল্লা-হা মা‘আসসা-বিরীন।

এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করবে এবং পরস্পরে কলহ করবে না, অন্যথায় তোমরা দুর্বল হয়ে পড়বে এবং তোমাদের হাওয়া (প্রভাব) বিলুপ্ত হবে। আর ধৈর্য ধারণ করবে। নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে।
৪৭

وَلَا تَکُوۡنُوۡا کَالَّذِیۡنَ خَرَجُوۡا مِنۡ دِیَارِہِمۡ بَطَرًا وَّرِئَآءَ النَّاسِ وَیَصُدُّوۡنَ عَنۡ سَبِیۡلِ اللّٰہِ ؕ وَاللّٰہُ بِمَا یَعۡمَلُوۡنَ مُحِیۡطٌ ٤٧

ওয়ালা-তাকূনূকাল্লাযীনা খারাজুমিন দিয়া-রিহিম বাতারাওঁ ওয়া রিআআন্না-ছি ওয়া ইয়াসুদ্দূনা ‘আন ছাবীলিল্লা-হি ওয়াল্লা-হু বিমা-ইয়া‘মালূনা মুহীত।

তোমরা তাদের মত হবে না, যারা নিজ গৃহ থেকে দম্ভভরে এবং মানুষকে (নিজেদের ঠাটবাট) দেখাতে দেখাতে বের হয়েছিল এবং তারা (অন্যদেরকে) আল্লাহর পথে বাধা দিত। ৩৩ আল্লাহ মানুষের সমস্ত কর্ম (নিজ জ্ঞান দ্বারা) পরিবেষ্টন করে আছেন। ৩৪

তাফসীরঃ

৩৩. এর দ্বারা কুরায়শের সেই বাহিনীকে বোঝানো হয়েছে, যারা বদরের যুদ্ধে অহমিকা ভরে ও নিজেদের শান-শওকত প্রদর্শন করতে করতে বের হয়েছিল। শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে যে, নিজেদের সামরিক শক্তি যত বেশিই হোক, তার উপর ভরসা করে অহমিকায় লিপ্ত হওয়া উচিত নয়। বরং ভরসা কেবল আল্লাহ তাআলারই উপর রাখা চাই।
৪৮

وَاِذۡ زَیَّنَ لَہُمُ الشَّیۡطٰنُ اَعۡمَالَہُمۡ وَقَالَ لَا غَالِبَ لَکُمُ الۡیَوۡمَ مِنَ النَّاسِ وَاِنِّیۡ جَارٌ لَّکُمۡ ۚ  فَلَمَّا تَرَآءَتِ الۡفِئَتٰنِ نَکَصَ عَلٰی عَقِبَیۡہِ وَقَالَ اِنِّیۡ بَرِیۡٓءٌ مِّنۡکُمۡ اِنِّیۡۤ اَرٰی مَا لَا تَرَوۡنَ اِنِّیۡۤ اَخَافُ اللّٰہَ ؕ  وَاللّٰہُ شَدِیۡدُ الۡعِقَابِ ٪ ٤٨

ওয়াইযঝাইইয়ানা লাহুমুশশাইতা-নুআ‘মা-লাহুম ওয়া কা-লা লা-গা-লিবা লাকুমুল ইয়াওমা মিনান্না-ছি ওয়া ইন্নী জা-রুল্লাকুম ফালাম্মা-তারা-আতিল ফিআতা-নি নাকাসা ‘আলা-‘আকিবাইহি ওয়া কা-লা ইন্নী বারীউম মিনকুম ইন্নীআরা-মা-লা-তারাওনা ইন্নীআখা-ফুল্লা-হা ওয়াল্লা-হু শাদীদুল ‘ইকা-ব।

এবং (সেই সময়ও উল্লেখযোগ্য) যখন শয়তান তাদের (অর্থাৎ কাফেরদের) কাজকর্মকে তাদের দৃষ্টিতে শোভনীয় করে তুলেছিল এবং বলেছিল, আজ মানুষের মধ্যে এমন কেউ নেই, যে তোমাদের উপর বিজয়ী হতে পারে। আর আমিই তোমাদের রক্ষক। ৩৫ অতঃপর যখন উভয় দল পরস্পর মুখোমুখি হল, তখন সে পিছন দিকে সরে পড়ল এবং বলল, তোমাদের সাথে আমার কোন সম্পর্ক নেই। আমি এমন কিছু দেখছি যা তোমরা দেখতে পাচ্ছ না। আমি আল্লাহকে ভয় করছি এবং আল্লাহর শাস্তি অতি কঠোর।

তাফসীরঃ

৩৫. শয়তানের পক্ষ থেকে এ আশ্বাস দানের কাজটি এভাবেও হতে পারে যে, মুশরিকদের অন্তরে এরূপ ভাবনা জাগ্রত করেছিল। কিন্তু পরের বাক্যে যে ঘটনা বর্ণিত হয়েছে, তা দ্বারা স্পষ্ট হয় যে, সে মানুষের বেশে মুশরিকদের সামনে এসেছিল এবং এসব কথা বলে তাদেরকে উস্কানি দিয়েছিল। সুতরাং ইবনে জারীর তাবারী (রহ.) প্রমূখ এই ঘটনা উল্লেখ করেছেন যে, মক্কার মুশরিকগণ যখন যুদ্ধের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হচ্ছিল, তখন তাদের পুরানো শত্রু বনু বকরের দিক থেকে তাদের আশঙ্কা বোধ হল, পাছে তারা তাদের ঘর-বাড়িতে হামলা চালায়। এ সময় শয়তান বনু বকরের নেতা সুরাকার বেশে তাদের সামনে উপস্থিত হল এবং তাদেরকে আশ্বস্ত করল যে, তোমাদের সৈন্য সংখ্যা বিপুল। তোমাদের উপর কেউ জয়ী হতে পারবে না। আর আমাদের গোত্র সম্পর্কে তোমরা নিশ্চিন্ত থাক। আমি নিজেই তোমাদের রক্ষা করব এবং তোমাদের সাথেই যাব। মক্কার মুশরিকগণ এ কথায় আশ্বস্ত হয়ে গেল। কিন্তু বদরের ময়দানে যখন ফিরিশতাদের বাহিনী সামনে এসে গেল, তখন সুরাকারূপী শয়তান এই বলে তাদের থেকে পালালো যে, আমি তোমাদের কোন দায়িত্ব নিতে পারব না। আমি এমন এক বাহিনী দেখছি, যা তোমরা দেখতে পাচ্ছ না। পরে মুশরিক বাহিনী যখন পরাস্ত হয়ে মক্কায় ফিরল তখন তারা সুরাকাকে ধরে অভিযোগ করল যে, তুমি আমাদেরকে এত বড় ধোঁকা দিলে? সুরাকা বলল, আমি তো এ ঘটনার কিছুই জানি না এবং আমি এমন কোনও কথা বলিওনি।
৪৯

اِذۡ یَقُوۡلُ الۡمُنٰفِقُوۡنَ وَالَّذِیۡنَ فِیۡ قُلُوۡبِہِمۡ مَّرَضٌ غَرَّہٰۤؤُ لَآءِ دِیۡنُہُمۡ ؕ وَمَنۡ یَّتَوَکَّلۡ عَلَی اللّٰہِ فَاِنَّ اللّٰہَ عَزِیۡزٌ حَکِیۡمٌ ٤٩

ইযইয়াকূলুল মুনা-ফিকূনা ওয়াল্লাযীনা ফী কুলূবিহিম মারাদুন গাররা হাউলাই দীনুহুম ওয়া মাইঁ ইয়াতাওয়াক্কাল ‘আলাল্লা-হি ফাইন্নাল্লা-হা ‘আঝীঝুন হাকীম।

(স্মরণ কর), মুনাফিক ও যাদের অন্তরে ব্যাধি ছিল, তারা যখন বলছিল, তাদের (অর্থাৎ মুসলিমদের) দীন তাদেরকে বিভ্রান্ত করেছে। ৩৬ অথচ কেউ আল্লাহর উপর ভরসা করলে, আল্লাহ তো পরাক্রান্ত, প্রজ্ঞাময়।

তাফসীরঃ

৩৬. মুসলিমগণ যখন সম্পূর্ণ অপ্রস্তুত অবস্থায় কাফেরদের অত বড় বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করার সিদ্ধান্ত নিয়ে নিল, তখন মুনাফিকগণ বলতে লাগল, নিজেদের দীনের ব্যাপারে এরা বড় ধোঁকার মধ্যে রয়েছে। মক্কার লোকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার মত শক্তি এদের কোথায়? (এর জবাবে আল্লাহ তাআলা বলছেন, তারা আদৌ ধোঁকায় পড়েনি। প্রকৃত পক্ষে তারা আল্লাহর উপর নির্ভরশীল। আর যারা তাঁর উপর নির্ভর করে, তিনি অবশ্যই তাদের সাহায্য করেন। ফলে শত্রুসৈন্য যত প্রবলই হোক তারা তাদেরকে পরাস্ত করতে পারে না -অনুবাদক।)
৫০

وَلَوۡ تَرٰۤی اِذۡ یَتَوَفَّی الَّذِیۡنَ کَفَرُوا ۙ الۡمَلٰٓئِکَۃُ یَضۡرِبُوۡنَ وُجُوۡہَہُمۡ وَاَدۡبَارَہُمۡ ۚ وَذُوۡقُوۡا عَذَابَ الۡحَرِیۡقِ ٥۰

ওয়া লাও তারাইযইয়াতাওয়াফফাল্লাযীনা কাফারুল মালাইকাতুইয়াদরিবূনা উজূহাহুম ওয়া আদবা-রাহুম ওয়া যূকূ‘আযা-বাল হারীক।

তুমি যদি দেখতে, ফিরিশতাগণ কাফেরদের চেহারা ও পিঠে আঘাত করে করে তাদের প্রাণ হরণ করছিল (আর বলছিল), এবার তোমরা জ্বলার মজাও ভোগ কর (তাহলে চমৎকার দৃশ্য দেখতে পেতে)।
৫১

ذٰلِکَ بِمَا قَدَّمَتۡ اَیۡدِیۡکُمۡ وَاَنَّ اللّٰہَ لَیۡسَ بِظَلَّامٍ لِّلۡعَبِیۡدِ ۙ ٥١

যা-লিকা বিমা-কাদ্দামাত আইদীকুম ওয়া আন্নাল্লা-হা লাইছা বিজাল্লা-মিল লিল ‘আবীদ।

এসব, তোমরা নিজ হাতে যা সামনে পাঠিয়েছিলে তার প্রতিফল। আর আল্লাহ বান্দাদের প্রতি জুলুমকারী নন।
৫২

کَدَاۡبِ اٰلِ فِرۡعَوۡنَ ۙ وَالَّذِیۡنَ مِنۡ قَبۡلِہِمۡ ؕ کَفَرُوۡا بِاٰیٰتِ اللّٰہِ فَاَخَذَہُمُ اللّٰہُ بِذُنُوۡبِہِمۡ ؕ اِنَّ اللّٰہَ قَوِیٌّ شَدِیۡدُ الۡعِقَابِ ٥٢

কাদা’বি আ-লি ফির‘আওনা ওয়াল্লাযীনা মিন কাবলিহিম কাফারু বিআ-য়া-তিল্লা-হি ফাআখাযাহুমুল্লা-হু বিযুনূবিহিম ইন্নাল্লা-হা কাবিউন শাদীদুল ‘ইকা-ব।

(তাদের অবস্থা ঠিক সেই রকমই হয়েছে) যেমন ফির‘আউনের সম্প্রদায় ও তাদের পূর্ববর্তী লোকদের অবস্থা হয়েছিল। তারা আল্লাহর নিদর্শনসমূহ প্রত্যাখ্যান করেছিল। ফলে আল্লাহ তাদের পাপাচারের কারণে তাদেরকে পাকড়াও করেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ অতি শক্তিমান এবং তার শাস্তি অতি কঠোর।
৫৩

ذٰلِکَ بِاَنَّ اللّٰہَ لَمۡ یَکُ مُغَیِّرًا نِّعۡمَۃً اَنۡعَمَہَا عَلٰی قَوۡمٍ حَتّٰی یُغَیِّرُوۡا مَا بِاَنۡفُسِہِمۡ ۙ  وَاَنَّ اللّٰہَ سَمِیۡعٌ عَلِیۡمٌ ۙ ٥٣

যা-লিকা বিআন্নাল্লা-হা লাম ইয়াকুমুগাইয়িরান নি‘মাতান আন‘আমাহা-‘আলা-কাওমিন হাত্তা-ইউগাইয়িরূমা-বিআনফুছিহিম ওয়া আন্নাল্লা-হা ছামী‘উন ‘আলীম।

তা এ কারণে যে, আল্লাহ কোনও সম্প্রদায়কে যে নিয়ামত দান করেন, তা ততক্ষণ পর্যন্ত পরিবর্তন করেন না, যতক্ষণ না তারা নিজেরা নিজেদের অবস্থা পরিবর্তন করে ফেলে। ৩৭ আল্লাহ সবকিছু শোনেন, সবকিছু জানেন।

তাফসীরঃ

৩৭. অর্থাৎ আল্লাহ তাআলা নিজ নিয়ামতসমূহকে শাস্তি দ্বারা পরিবর্তন করেন কেবল তখনই, যখন মানুষ নিজেই নিজের অবস্থা পরিবর্তন করে ফেলে। মক্কার কাফেরদেরকে আল্লাহ তাআলা সব রকমের নিয়ামত দান করেছিলেন। সর্বাপেক্ষা শ্রেষ্ঠ নিয়ামত হল তাদেরই মধ্যে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আবির্ভাব হওয়া। তখন যদি তারা জেদ না দেখিয়ে সত্য তালাশ করত ও ন্যায়নিষ্ঠতার পরিচয় দিত, তবে ইসলাম গ্রহণ করা তাদের পক্ষে কিছুমাত্র কঠিন ছিল না। কিন্তু তারা এ নিয়ামতের অকৃতজ্ঞতা করল এবং জেদ দেখিয়ে নিজেদের অবস্থা পরিবর্তন করে ফেলল। এমনকি হঠকারিতাবশত ইসলাম গ্রহণকে তারা নিজেদের জন্য অমর্যাদাকর মনে করল। ফলে সত্য গ্রহণ তাদের পক্ষে কঠিন হয়ে গেল। এভাবে যখন তারা নিজেদের অবস্থা পরিবর্তন করে ফেলল, তখন আল্লাহ তাআলাও নিয়ামতকে পরিবর্তিত করে দিলেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে তাদের থেকে সরিয়ে মদীনায় নিয়ে গেলেন এবং তাদেরকে কঠিন শাস্তি দিলেন।
৫৪

کَدَاۡبِ اٰلِ فِرۡعَوۡنَ ۙ وَالَّذِیۡنَ مِنۡ قَبۡلِہِمۡ ؕ کَذَّبُوۡا بِاٰیٰتِ رَبِّہِمۡ فَاَہۡلَکۡنٰہُمۡ بِذُنُوۡبِہِمۡ وَاَغۡرَقۡنَاۤ اٰلَ فِرۡعَوۡنَ ۚ وَکُلٌّ کَانُوۡا ظٰلِمِیۡنَ ٥٤

কাদা’বি আ-লি ফির‘আওনা ওয়াল্লাযীনা মিন কাবলিহিম কাযযাবূবিআ-য়া-তি রাব্বিহিম ফাআহলাকনা-হুম বিযুনুবিহিম ওয়া আগরাকনা-আ-লা ফির‘আওনা ওয়া কুল্লুন কা-নূজা-লিমীন।

(এ বিষয়েও তাদের অবস্থা) ফির‘আউনের সম্প্রদায় ও তাদের পূর্ববর্তী লোকদের অবস্থার মত। তারা তাদের প্রতিপালকের নিদর্শনসমূহ প্রত্যাখ্যান করেছিল, ফলে তাদের পাপাচারের কারণে তাদেরকে ধ্বংস করে দেই এবং ফির‘আউনের সম্প্রদায়কে করি নিমজ্জিত। তারা সকলেই ছিল জালেম।
৫৫

اِنَّ شَرَّ الدَّوَآبِّ عِنۡدَ اللّٰہِ الَّذِیۡنَ کَفَرُوۡا فَہُمۡ لَا یُؤۡمِنُوۡنَ ۖۚ ٥٥

ইন্না শাররাদ্দাওয়াব্বি ‘ইনদাল্লা-হিল্লাযীনা কাফারূফাহুম লা-ইউ’মিনূন।

নিশ্চয়ই (ভূ-পৃষ্ঠে বিচরণকারী প্রাণীদের মধ্যে) আল্লাহর কাছে সর্বাপেক্ষা নিকৃষ্ট জীব হল তারা যারা কুফর অবলম্বন করেছে, যে কারণে তারা ঈমান আনয়ন করছে না। ৩৮

তাফসীরঃ

৩৮. এর জন্য পিছনে ২২নং আয়াতের টীকা দেখুন।
৫৬

اَلَّذِیۡنَ عٰہَدۡتَّ مِنۡہُمۡ ثُمَّ یَنۡقُضُوۡنَ عَہۡدَہُمۡ فِیۡ کُلِّ مَرَّۃٍ وَّہُمۡ لَا یَتَّقُوۡنَ ٥٦

আল্লাযীনা ‘আ-হাততা মিনহুম ছু ম্মা ইয়ানকু দূ না ‘আহদাহুম ফী কুল্লি মাররাতিওঁ ওয়া হুম লা-ইয়াত্তাকূন।

(তারা) সেই সকল লোক, যাদের থেকে তুমি প্রতিশ্রুতি নিয়েছিলে। তা সত্ত্বেও তারা প্রতিবার নিজ প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে এবং তারা বিন্দুমাত্র ভয়করে না। ৩৯

তাফসীরঃ

৩৯. এর দ্বারা মদীনার আশেপাশে বসবাসকারী ইয়াহুদীদের প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে। তাদের সঙ্গে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চুক্তি হয়েছিল যে, তারা ও মুসলিমগণ পরস্পর শান্তিতে সহাবস্থান করবে। একে অন্যের শত্রুর সহযোগিতা করবে না। কিন্তু ইয়াহুদীরা এ চুক্তি বার বার ভঙ্গ করেছে এবং তারা গোপনে মক্কার কাফেরদের সাথে যোগসাজশে রত থেকেছে।
৫৭

فَاِمَّا تَثۡقَفَنَّہُمۡ فِی الۡحَرۡبِ فَشَرِّدۡ بِہِمۡ مَّنۡ خَلۡفَہُمۡ لَعَلَّہُمۡ یَذَّکَّرُوۡنَ ٥٧

ফাইম্মা-তাছকাফান্নাহুম ফিল হারবি ফাশাররিদ বিহিম মান খালফাহুম লা‘আল্লাহুম ইয়াযযাক্কারূন।

সুতরাং যুদ্ধকালে যদি তুমি তাদেরকে নাগালে পাও, তবে (তাদেরকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিয়ে) তাদের মাধ্যমে তাদের পশ্চাদ্বর্তীদেরকেও বিক্ষিপ্ত করে ফেলবে, যাতে তারা শিক্ষা গ্রহণ করে। ৪০

তাফসীরঃ

৪০. অর্থাৎ তারা যদি কোন যুদ্ধে মুসলিমদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে ময়দানে আসে, তবে তাদেরকে এমন শিক্ষা দিতে হবে, যাতে বিশ্বাস ভঙ্গের পরিণাম কেবল তাদেরকেই নয়; বরং তাদের পিছনে থেকে যারা তাদেরকে উস্কানি দেয় তাদেরকেও ভোগ করতে হয় এবং তাদের সব ষড়যন্ত্র নস্যাৎ হয়ে যায়।
৫৮

وَاِمَّا تَخَافَنَّ مِنۡ قَوۡمٍ خِیَانَۃً فَانۡۢبِذۡ اِلَیۡہِمۡ عَلٰی سَوَآءٍ ؕ  اِنَّ اللّٰہَ لَا یُحِبُّ الۡخَآئِنِیۡنَ ٪ ٥٨

ওয়া ইম্মা-তাখা-ফান্না মিন কাওমিন খিয়া-নাতান ফামবিযইলাইহিম ‘আলা-ছাওয়াইন ইন্নাল্লা-হা লা-ইউহিব্বুল খাইনীন।

তুমি যদি কোনও সম্প্রদায়ের পক্ষ হতে বিশ্বাসঘাতকতার আশঙ্কা কর, তবে তুমিও (সে চুক্তি) সরাসরিভাবে তাদের দিকে ছুঁড়ে মার। ৪১ স্মরণ রেখ, আল্লাহ বিশ্বাস ভঙ্গকারীদেরকে পছন্দ করেন না।

তাফসীরঃ

৪১. যদি তাদের পক্ষ থেকে প্রকাশ্যে বিশ্বাস ভঙ্গের মত কোন কাজ পাওয়া না যায়, কিন্তু সুযোগ মত বিশ্বাস ভঙ্গ করে মুসলিমদের কোন ক্ষতিসাধন করতে পারে বলে আশঙ্কা হয়, তবে সে ক্ষেত্রে কী করণীয়, এ আয়াতে তার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এরূপ ক্ষেত্রে মুসলিমদেরকে আদেশ করা হয়েছে, তারা যেন পরিষ্কারভাবে চুক্তি বাতিলের ঘোষণা দিয়ে দেয় এবং তাদেরকে জানিয়ে দেয় যে, এখন থেকে আমাদের মধ্যে কোনও পক্ষই চুক্তি মানতে বাধ্য নয়। যে-কোনও পক্ষ চাইলে অপর পক্ষের বিরুদ্ধে যে-কোনও রকমের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারবে এ ব্যাপারে সে সম্পূর্ণ স্বাধীন। ‘তুমিও সে চুক্তি সরাসরিভাবে তাদের দিকে ছুঁড়ে মার’ বলে এ কথাই বোঝানো হয়েছে। আরবদের পরিভাষায় বাক্যটি এ অর্থেই ব্যবহৃত হয়। এতদসঙ্গে সতর্ক করে দেওয়া হয়েছে যে, শত্রু পক্ষের দিক থেকে বিশ্বাসঘাতকতার আশঙ্কা দেখা দিলে আগেই তাদের বিরুদ্ধে চুক্তি-বিরোধী পদক্ষেপ গ্রহণ করা যাবে না। আগে চুক্তি বাতিলের ঘোষণা দিয়ে নিতে হবে। অন্যথায় সেটা চুক্তি ভঙ্গের শামিল হবে, যা আল্লাহ তাআলার পছন্দ নয়।
৫৯

وَلَا یَحۡسَبَنَّ الَّذِیۡنَ کَفَرُوۡا سَبَقُوۡا ؕ اِنَّہُمۡ لَا یُعۡجِزُوۡنَ ٥٩

ওয়ালা-ইয়াহছাবান্নাল্লাযীনা কাফারূছাবাকূ ইন্নাহুম লা ইউ‘জিঝূন।

কাফেরগণ যেন কিছুতেই মনে না করে যে, তারা পরিত্রাণ পেয়ে গেছে। ৪২ এটা তো নিশ্চিত কথা যে, তারা (আল্লাহকে) ব্যর্থ করতে পারবে না।

তাফসীরঃ

৪২. এর দ্বারা সেই সকল কাফেরের দিকে ইশারা করা হয়েছে, যারা বদর যুদ্ধ থেকে পলায়ন করেছিল। অর্থাৎ তারা যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালিয়ে যে একদম বেঁচে গেছে এমন নয়। তারা আমার ক্ষমতার বলয়ের মধ্যেই আছে। আমি যখন ইচ্ছা তাদেরকে শাস্তিদান করব। তারা আমার ইচ্ছা ব্যর্থ ও প্রতিহত করতে পারবে না। -অনুবাদক
৬০

وَاَعِدُّوۡا لَہُمۡ مَّا اسۡتَطَعۡتُمۡ مِّنۡ قُوَّۃٍ وَّمِنۡ رِّبَاطِ الۡخَیۡلِ تُرۡہِبُوۡنَ بِہٖ عَدُوَّ اللّٰہِ وَعَدُوَّکُمۡ وَاٰخَرِیۡنَ مِنۡ دُوۡنِہِمۡ ۚ لَا تَعۡلَمُوۡنَہُمۡ ۚ اَللّٰہُ یَعۡلَمُہُمۡ ؕ وَمَا تُنۡفِقُوۡا مِنۡ شَیۡءٍ فِیۡ سَبِیۡلِ اللّٰہِ یُوَفَّ اِلَیۡکُمۡ وَاَنۡتُمۡ لَا تُظۡلَمُوۡنَ ٦۰

ওয়া আ‘ইদ্দূলাহুম মাছতাতা‘তুম মিন কুওওয়াতিওঁ ওয়া মির রিবা-তিল খাইলি তুরহিবূনা বিহী ‘আদুওঁ ওআল্লা-হি ওয়া ‘আদুওঁ ওয়াকুম ওয়া আ-খারীনা মিন দূ নিহিম লাতা‘লামূনাহুম আল্লা-হু ইয়া‘লামুহুম ওয়া মা-তুনফিকূমিন -শাইয়িন ফী ছাবীলিল্লা-হি ইউওয়াফফা ইলাইকুম ওয়া আনতুম লা-তুজলামূন।

(হে মুসলিমগণ!) তোমরা তাদের (মুকাবিলার) জন্য যথাসাধ্য শক্তি ও অশ্ব-ছাউনি প্রস্তুত কর, ৪৩ যা দ্বারা তোমরা আল্লাহর শত্রু ও নিজেদের (বর্তমান) শত্রুদেরকে সন্ত্রস্ত করে রাখবে এবং তাদের ছাড়া সেই সব লোককেও, যাদেরকে তোমরা এখনও জান না; (কিন্তু) আল্লাহ তাদেরকে জানেন। ৪৪ তোমরা আল্লাহর পথে যা-কিছু ব্যয় করবে, তা তোমাদেরকে পরিপূর্ণরূপে দেওয়া হবে এবং তোমাদের প্রতি জুলুম করা হবে না।

তাফসীরঃ

৪৩. গোটা মুসলিম উম্মাহর প্রতি এটা এক স্থায়ী নির্দেশ যে, তারা যেন ইসলাম ও মুসলিমদের প্রভাব-প্রতিপত্তি প্রতিষ্ঠিত রাখার লক্ষ্যে সব রকম প্রতিরক্ষা শক্তি গড়ে তোলে। কুরআন মাজীদ সাধারণভাবে ‘শক্তি’ শব্দ ব্যবহার করে বোঝাচ্ছে যে, রণপ্রস্তুতি বিশেষ কোনও অস্ত্রের উপর নির্ভরশীল নয়। বরং যখন যে ধরনের প্রতিরক্ষা-শক্তি কাজে আসে, তখন সেই রকম শক্তি অর্জন করা মুসলিমদের জন্য অবশ্য কর্তব্য। সুতরাং সর্বপ্রকার আধুনিক অস্ত্র-শস্ত্রও এর অন্তর্ভুক্ত। এ ছাড়া মুসলিমদের জাতীয়, সামাজিক ও সামরিক উন্নতির জন্য যত রকমের আসবাব-উপকরণ দরকার হয়, সে সবও এর মধ্যে পড়ে। আফসোস আজকের মুসলিম বিশ্ব এ ফরয আদায়ে চরম অবহেলা প্রদর্শন করেছে। ফলে আজ তারা অন্যান্য জাতির আশ্রিত ও বশীভূত জাতিতে পরিণত হয়েছে। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে এ সূরতহাল থেকে পরিত্রাণ দিন।
৬১

وَاِنۡ جَنَحُوۡا لِلسَّلۡمِ فَاجۡنَحۡ لَہَا وَتَوَکَّلۡ عَلَی اللّٰہِ ؕ اِنَّہٗ ہُوَ السَّمِیۡعُ الۡعَلِیۡمُ ٦١

ওয়া ইন জানাহূলিছছালমি ফাজনাহলাহা-ওয়া তাওয়াক্কাল ‘আলাল্লা-হি ইন্নাহূহুওয়াছ ছামী‘উল ‘আলীম।

আর তারা যদি সন্ধির দিকে ঝুঁকে পড়ে, তবে তুমিও সে দিকে ঝুঁকে পড়বে ৪৫ এবং আল্লাহর উপর নির্ভর করবে। নিশ্চয়ই তিনি সকল কথা শোনেন, সকল কিছু জানেন।

তাফসীরঃ

৪৫. এ আয়াত মুসলিমদেরকে শত্রুর সাথে সন্ধি স্থাপনেরও অনুমতি দিয়েছে। তবে শর্তাবলী এমন হতে হবে, যাতে মুসলিমদের স্বার্থ রক্ষা পায়।
৬২

وَاِنۡ یُّرِیۡدُوۡۤا اَنۡ یَّخۡدَعُوۡکَ فَاِنَّ حَسۡبَکَ اللّٰہُ ؕ  ہُوَ الَّذِیۡۤ اَیَّدَکَ بِنَصۡرِہٖ وَبِالۡمُؤۡمِنِیۡنَ ۙ ٦٢

ওয়া ইয়ঁইউরীদূ আইঁ ইয়াখদা‘ঊকা ফাইন্না হাছবাকাল্লা-হু হুওয়াল্লাযী আইঁ ইয়াদাকা বিনাসরিহী ওয়া বিলমু’মিনীন।

তারা যদি তোমাকে ধোঁকা দিতে চায়, তবে আল্লাহই তোমার জন্য যথেষ্ট। তিনিই তোমাকে শক্তিশালী করেছেন নিজ সাহায্যে এবং মুমিনদের দ্বারা।
৬৩

وَاَلَّفَ بَیۡنَ قُلُوۡبِہِمۡ ؕ لَوۡ اَنۡفَقۡتَ مَا فِی الۡاَرۡضِ جَمِیۡعًا مَّاۤ اَلَّفۡتَ بَیۡنَ قُلُوۡبِہِمۡ وَلٰکِنَّ اللّٰہَ اَلَّفَ بَیۡنَہُمۡ ؕ اِنَّہٗ عَزِیۡزٌ حَکِیۡمٌ ٦٣

ওয়া আল্লাফা বাইনা কুলূবিহিম লাও আনফাকতা মা-ফিল আরদিজামী‘আম মাআল্লাফতা বাইনা কুলূবিহিম ওয়ালা-কিন্নাল্লা-হা আল্লাফা বাইনাহুম ইন্নাহূ‘আঝীঝুন হাকীম।

এবং তিনি তাদের হৃদয়ে পরস্পরের প্রতি সম্প্রীতি সৃষ্টি করেছেন। তুমি যদি পৃথিবীর যাবতীয় সম্পদও ব্যয় করতে, তবে তাদের হৃদয়ে সম্প্রীতি সৃষ্টি করতে পারতে না। কিন্তু তিনি তাদের অন্তরসমূহে প্রীতি স্থাপন করেছেন। নিশ্চয়ই তিনি পরাক্রান্ত, প্রজ্ঞাময়।
৬৪

یٰۤاَیُّہَا النَّبِیُّ حَسۡبُکَ اللّٰہُ وَمَنِ اتَّبَعَکَ مِنَ الۡمُؤۡمِنِیۡنَ ٪ ٦٤

ইয়াআইয়ুহান্নাবিইয়ুহাছবুকাল্লা-হু ওয়া মানিত তাবা‘আকা মিনাল মু’মিনীন।

হে নবী! তোমার জন্য আল্লাহ এবং যে সকল মুমিন তোমার অনুসরণ করেছে তারাই যথেষ্ট। ৪৬

তাফসীরঃ

৪৬. অর্থাৎ এমনিতে তো তোমার জন্য এক আল্লাহই যথেষ্ট। তারপরও বাহ্যিক উপায়-উপকরণ হিসেবে মুমিনগণ তোমার সঙ্গে আছে। তাদের সংখ্যা যত কমই হোক বাহ্যিক সহযোগী হিসেবে তারা তোমার জন্য যথেষ্ট। আয়াতটির অন্য অর্থ হল তোমার ও তোমার অনুসারী মুমিনদের জন্য আল্লাহই যথেষ্ট, কাজেই শত্রুর শক্তিমত্তা দেখে ভয় পেয়ো না। বিজ্ঞজনদের অধিকাংশ শেষোক্ত অর্থই গ্রহণ করেছেন। -অনুবাদক
৬৫

یٰۤاَیُّہَا النَّبِیُّ حَرِّضِ الۡمُؤۡمِنِیۡنَ عَلَی الۡقِتَالِ ؕ اِنۡ یَّکُنۡ مِّنۡکُمۡ عِشۡرُوۡنَ صٰبِرُوۡنَ یَغۡلِبُوۡا مِائَتَیۡنِ ۚ وَاِنۡ یَّکُنۡ مِّنۡکُمۡ مِّائَۃٌ یَّغۡلِبُوۡۤا اَلۡفًا مِّنَ الَّذِیۡنَ کَفَرُوۡا بِاَنَّہُمۡ قَوۡمٌ لَّا یَفۡقَہُوۡنَ ٦٥

ইয়াআইয়ুহান্নাবিইয়ুহাররিদিল মু’মিনীনা ‘আলাল কিতা-লি ইয়ঁইয়াকুম মিনকুম ‘ইশরূনা সা-বিরূনা ইয়াগলিবূমিআতাইনি ওয়া ইয়ঁইয়াকুম মিনকুম মিআতুইঁ ইয়াগলিবূ আলফাম মিনাল্লাযীনা কাফারূবিআন্নাহুম কাওমুল লা-ইয়াফকাহূন।

হে নবী! মুমিনদেরকে যুদ্ধের জন্য উদ্বুদ্ধ কর। তোমাদের মধ্যে যদি বিশজন ধৈর্যশীল লোক থাকে, তবে তারা দু’শ জনের উপর জয়ী হবে। তোমাদের যদি একশ’ জন থাকে, তবে তারা এক হাজার কাফেরের উপর জয়ী হবে। কেননা তারা এমন এক সম্প্রদায়, যারা বুঝ-সমঝ রাখে না। ৪৭

তাফসীরঃ

৪৭. যেহেতু সঠিক বুঝ রাখে না তাই ইসলামও গ্রহণ করে না। আর ইসলাম গ্রহণ না করার কারণে আল্লাহ তাআলার গায়েবী সাহায্য থেকেও বঞ্চিত থাকে এবং নিজেদের দশগুণ বেশি শক্তি থাকা সত্ত্বেও মুসলিমদের কাছে পরাস্ত হয়। প্রসঙ্গত এ আয়াতে আদেশ করা হয়েছে যে, কাফেরদের সংখ্যা মুসলিমদের অপেক্ষা দশগুণ বেশি হলেও মুসলিমদের জন্য পিছু হটা জায়েয নয়। অবশ্য এরপরে পরবর্তী আয়াতটি দ্বারা এ হুকুম আরও সহজ করে দেওয়া হয়েছে।
৬৬

اَلۡـٰٔنَ خَفَّفَ اللّٰہُ عَنۡکُمۡ وَعَلِمَ اَنَّ فِیۡکُمۡ ضَعۡفًا ؕ فَاِنۡ یَّکُنۡ مِّنۡکُمۡ مِّائَۃٌ صَابِرَۃٌ یَّغۡلِبُوۡا مِائَتَیۡنِ ۚ وَاِنۡ یَّکُنۡ مِّنۡکُمۡ اَلۡفٌ یَّغۡلِبُوۡۤا اَلۡفَیۡنِ بِاِذۡنِ اللّٰہِ ؕ وَاللّٰہُ مَعَ الصّٰبِرِیۡنَ ٦٦

আলআ-না খাফফাফাল্লা-হু ‘আনকুম ওয়া ‘আলিমা আন্না ফীকুম দা‘ফান ফাইয়ঁইয়াকুম মিনকুম মিআতুন সা-বিরাতুইঁ ইয়াগলিবূমিআতাইনি ওয়াইঁ ইয়াকুম মিনকুম আলফুইঁ ইয়াগলিবূআলফাইনি বিইযনিল্লা-হি ওয়াল্লা-হু মা‘আসসা-বিরীন।

এখন আল্লাহ তোমাদের ভার লাঘব করলেন। তিনি জানেন, তোমাদের মধ্যে কিছু দুর্বলতা আছে। সুতরাং (এখন বিধান এই যে,) তোমাদের মধ্যে যদি একশ’ জন ধৈর্যশীল থাকে, তবে তারা দু’শ জনের উপর জয়ী হবে; আর যদি তোমাদের মধ্যে এক হাজার জন থাকে, তবে তারা আল্লাহর হুকুমে দু’ হাজার জনের উপর জয়ী হবে। আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সঙ্গে আছেন। ৪৮

তাফসীরঃ

৪৮. এ হুকুম পরবর্তীতে নাযিল হয়েছে। এর দ্বারা আগের হুকুম সহজ করা হয়েছে। এখন বিধান এই যে, শত্রুদের সংখ্যা মুসলিমদের দ্বিগুণ পর্যন্ত থাকলে মুসলিমদের জন্য পিছু হটা জায়েয নয়। শত্রু সংখ্যা যদি আরও বেশি হয়, তবে পশ্চাদপসরণ করার অবকাশ আছে। এভাবে পূর্বে ১৫ ও ১৬নং আয়াতে যে বিধান বর্ণিত হয়েছিল, এ আয়াতে তার ব্যাখ্যা করে দেওয়া হল।
৬৭

مَا کَانَ لِنَبِیٍّ اَنۡ یَّکُوۡنَ لَہٗۤ اَسۡرٰی حَتّٰی یُثۡخِنَ فِی الۡاَرۡضِ ؕ تُرِیۡدُوۡنَ عَرَضَ الدُّنۡیَا ٭ۖ وَاللّٰہُ یُرِیۡدُ الۡاٰخِرَۃَ ؕ وَاللّٰہُ عَزِیۡزٌ حَکِیۡمٌ ٦٧

মা-কা-না লিনাবিইয়িন আইঁ ইয়াকূনা লাহূআছরা-হাত্তা-ইউছখিনা ফিল আরদি তুরীদূ না ‘আরাদাদদুনইয়া- ওয়াল্লা-হু ইউরীদুল আ-খিরাতা ওয়াল্লা-হু ‘আঝীঝুন হাকীম ।

কোনও নবীর পক্ষে এটা শোভনীয় নয় যে, সে যমীনে যতক্ষণ পর্যন্ত (শত্রুদের) রক্ত ব্যাপকভাবে প্রবাহিত না করবে (যাতে তাদের প্রভাব সম্পূর্ণরূপে খতম হয়ে যায়), ততক্ষণ পর্যন্ত তার কাছে কয়েদী থাকবে। ৪৯ তোমরা দুনিয়ার সম্পদ কামনা কর আর আল্লাহ (তোমাদের জন্য) আখিরাত (-এর কল্যাণ) চান। আল্লাহ পরাক্রান্ত, প্রজ্ঞাময়।

তাফসীরঃ

৪৯. বদরের যুদ্ধে কুরাইশদের সত্তর জন লোক বন্দী হয়েছিল। তাদেরকে যুদ্ধবন্দী হিসেবে মদীনায় নিয়ে আসা হয়। তাদের সঙ্গে কি আচরণ করা হবে এ নিয়ে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবায়ে কিরামের সঙ্গে পরামর্শ করলেন। হযরত উমর (রাযি.)-সহ কতিপয় সাহাবীর রায় ছিল তাদেরকে হত্যা করে ফেলা। কেননা মুসলিমদের প্রতি তারা যে উৎপীড়ন চালিয়েছিল, সে কারণে তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া উচিত। অন্যান্য সাহাবীগণ মত দিলেন, তাদেরকে ফিদয়ার বিনিময়ে ছেড়ে দেওয়া হোক (ফিদয়া বলে সেই অর্থকে, যার বিনিময়ে যুদ্ধবন্দীকে মুক্তি দেওয়া হয়)। যেহেতু সংখ্যাগরিষ্ঠ সাহাবীগণ এই দ্বিতীয় মতেরই পক্ষে ছিলেন, তাই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ অনুসারেই ফায়সালা দান করলেন। সুতরাং কয়েদীদেরকে মুক্তিপণ নিয়ে ছেড়ে দেওয়া হল। সে পরিপ্রেক্ষিতে এ আয়াত নাযিল হয়েছে। আয়াতে এ ফায়সালার প্রতি অসন্তোষ প্রকাশ করা হয়েছে এবং তার কারণ বলা হয়েছে এই যে, বদর যুদ্ধের মূল উদ্দেশ্য ছিল কাফেরদের দর্প চূর্ণ করা ও তাদের মেরুদণ্ড সম্পূর্ণরূপে ভেঙ্গে দেওয়া। আর এভাবে যারা বছরের পর বছর কেবল সত্য দীনের পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেই ক্ষান্ত হয়নি; বরং মুসলিমদের প্রতি বর্বরোচিত জুলুম-নির্যাতনও চালিয়ে গেছে, তাদের মধ্যে মুসলিমদের প্রতাপ বসিয়ে দেওয়া। এর জন্য দরকার ছিল তাদের প্রতি কোনরূপ দয়া না দেখিয়ে বরং সকলকে হত্যা করে ফেলা, যাতে কেউ ওয়াপস গিয়ে মুসলিমদের জন্য নতুন করে বিপদের কারণ হতে না পারে এবং তাদের দৃষ্টান্তমূলক পরিণতি দেখে অন্যরাও শিক্ষালাভ করতে পারে। প্রকাশ থাকে যে, যুদ্ধবন্দীকে মুক্তি দানের কারণে যে অসন্তোষ প্রকাশ করা হয়েছে, এটা বদর যুদ্ধের উপরিউক্ত লক্ষ্য-উদ্দেশ্যর সাথে সম্পৃক্ত। পরবর্তীকালে সূরা মুহাম্মাদের ৪৭ : ৪নং আয়াতে স্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছে যে, এখন যেহেতু কাফেরদের সামরিক শক্তি ভেঙ্গে গেছে, তাই এখন আর তাদের যুদ্ধবন্দীকে হত্যা করা জরুরী নয়; বরং এখন ফিদয়ার বিনিময়েও তাদেরকে মুক্তি দেওয়া জায়েয। এমনকি প্রয়োজনবোধে ফিদয়াবিহীন মুক্তি দানের ঔদার্যও তাদের প্রতি প্রদর্শন করা যেতে পারে।
৬৮

لَوۡلَا کِتٰبٌ مِّنَ اللّٰہِ سَبَقَ لَمَسَّکُمۡ فِیۡمَاۤ اَخَذۡتُمۡ عَذَابٌ عَظِیۡمٌ ٦٨

লাও লা-কিতা-বুমমিনাল্লা-হি ছাবাকা লামাছছাকুমফীমাআখাযতুম‘আযা-বুন‘আজীম।

যদি আল্লাহর পক্ষ থেকে লিখিত এক বিধান পূর্বে না থাকত, তবে তোমরা যে পথ অবলম্বন করেছ সে কারণে তোমাদের উপর বড় কোন শাস্তি আপতিত হত। ৫০

তাফসীরঃ

৫০. ‘পূর্বে লিখিত বিধান’ দ্বারা কি বোঝানো হয়েছে? কতক মুফাসসির বলেন, পূর্বে ৩৩নং আয়াতে বর্ণিত বিধান, অর্থাৎ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বর্তমানে আল্লাহ তাআলার কোনও আযাব না আসা। অন্যান্য মুফাসসিরগণ বলেন, কয়েদীদের মধ্য হতে কারও কারও তাকদীরে লেখা ছিল যে, তারা ইসলাম গ্রহণ করবে, এ আয়াতে তাকদীরের সেই লিখনকেই বোঝানো হয়েছে। অর্থাৎ আল্লাহ তাআলা সে ফায়সালার কারণে মুসলিমদেরকে শাস্তি দেননি এ কারণে যে, কয়েদীদের মধ্যে এমন কেউ কেউ এ ফায়সালার কারণে ইসলাম গ্রহণের সুযোগ পেয়েছে, যাদের ভাগ্যে ইসলাম লেখা ছিল। নয়ত নীতিগতভাবে এ ফায়সালা পছন্দনীয় ছিল না।
৬৯

فَکُلُوۡا مِمَّا غَنِمۡتُمۡ حَلٰلًا طَیِّبًا ۫ۖ  وَّاتَّقُوا اللّٰہَ ؕ  اِنَّ اللّٰہَ غَفُوۡرٌ رَّحِیۡمٌ ٪ ٦٩

ফাকুলূমিম্মা-গনিমতুম হালা-লান তাইয়িবাওঁ ওয়াত্তাকুল্লা-হা ইন্নাল্লা-হা গাফূরুর রাহীম।

সুতরাং তোমরা যে গনীমত অর্জন করেছ, তা ভোগ কর বৈধ উত্তম সম্পদরূপে এবং আল্লাহকে ভয় করে চলো। নিশ্চয়ই আল্লাহ অতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। ৫১

তাফসীরঃ

৫১. যুদ্ধবন্দীদের সম্পর্কে এ ফায়সালা যেহেতু সংখ্যাগরিষ্ঠের মত ও নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সমর্থনক্রমে নেওয়া হয়েছিল, তাই অসন্তোষ প্রকাশ সত্ত্বেও আল্লাহ তাআলা মুসলিমদেরকে ক্ষমা করারও ঘোষণা দিয়ে দিয়েছেন। সেই সঙ্গে অনুমতি দিয়েছেন যে, তারা ফিদয়া হিসেবে যে সম্পদ গ্রহণ করেছে তা তারা ভোগ করতে পারে। তাদের পক্ষে তা হালাল।
৭০

یٰۤاَیُّہَا النَّبِیُّ قُلۡ لِّمَنۡ فِیۡۤ اَیۡدِیۡکُمۡ مِّنَ الۡاَسۡرٰۤی ۙ اِنۡ یَّعۡلَمِ اللّٰہُ فِیۡ قُلُوۡبِکُمۡ خَیۡرًا یُّؤۡتِکُمۡ خَیۡرًا مِّمَّاۤ اُخِذَ مِنۡکُمۡ وَیَغۡفِرۡ لَکُمۡ ؕ وَاللّٰہُ غَفُوۡرٌ رَّحِیۡمٌ ٧۰

ইয়াআইয়ুহান্নাবিইয়ুকুল লিমান ফীআইদীকুম মিনাল আছরা ইয়ঁইয়া‘লামিল্লা-হু ফী কুলূবিকুম খাইরাইঁ ইউ’তিকুম খাইরাম মিম্মা-উখিযা মিনকুম ওয়া ইয়াগফির লাকুম ওয়াল্লা-হু গাফূরুর রাহীম।

হে নবী! তোমাদের হাতে যে সকল বন্দী আছে (এবং যারা ইসলাম গ্রহণের ইচ্ছা প্রকাশ করেছে), তাদেরকে বলে দাও, আল্লাহ তোমাদের অন্তরে ভালো কিছু দেখলে তোমাদের থেকে যে সম্পদ (ফিদয়ারূপে) নেওয়া হয়েছে, তোমাদেরকে তা অপেক্ষা উত্তম কিছু দান করবেন ৫২ এবং তোমাদেরকে ক্ষমা করবেন। আল্লাহ অতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।

তাফসীরঃ

৫২. ভালো কিছু দেখার অর্থ যারা ইসলাম গ্রহণের ইচ্ছা প্রকাশ করেছে, তাদের অন্তরে ইখলাস ও নিষ্ঠা থাকা, দূরভিসন্ধিমূলকভাবে ইসলাম গ্রহণের ঘোষণা না দেওয়া। এ অবস্থায় তাদেরকে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে যে, তারা নিজেদের মুক্তির জন্য যে অর্থ ব্যয় করেছে, দুনিয়া বা আখিরাতে তাদেরকে তার চেয়ে উত্তম বদলা দেওয়া হবে। সুতরাং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চাচা হযরত আব্বাস (রাযি.), যিনি তখনও পর্যন্ত ইসলাম গ্রহণ করেননি এবং বদরের যুদ্ধে বন্দী হয়েছিলেন, তিনি আরয করেছিলেন, আমি ইসলাম গ্রহণের ইচ্ছা করেছিলাম, কিন্তু আমার গোত্রের লোকেরা আমাকে যুদ্ধে আসতে বাধ্য করেছে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, সে যাই হোক, ফিদয়া দেওয়ার যে সিদ্ধান্ত স্থির হয়ে গেছে, আপনাকেও তা দিতে হবে। সেই সঙ্গে আপনার ভাতিজা আকীল ও নাওফালের ফিদয়াও আপনিই দেবেন। তিনি বললেন, এতটা অর্থ আমি কোথায় পাব? নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, আপনি আপনার স্ত্রী উম্মুল ফযলের কাছে গোপনে যে অর্থ রেখে এসেছেন তার কী হল? এ কথা শুনে হযরত আব্বাস (রাযি.) স্তম্ভিত হয়ে গেলেন। কেননা তিনি ও তাঁর স্ত্রী ছাড়া আর কারও এ কথা জানা ছিল না। তৎক্ষণাৎ তিনি বলে উঠলেন, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আপনি আল্লাহর রাসূল। পরবর্তীকালে হযরত আব্বাস (রাযি.) বলতেন, ফিদয়া হিসেবে আমি যা দিয়েছিলাম, আল্লাহ তাআলা আমাকে তার চেয়ে ঢের বেশি দিয়েছেন।
৭১

وَاِنۡ یُّرِیۡدُوۡا خِیَانَتَکَ فَقَدۡ خَانُوا اللّٰہَ مِنۡ قَبۡلُ فَاَمۡکَنَ مِنۡہُمۡ ؕ وَاللّٰہُ عَلِیۡمٌ حَکِیۡمٌ ٧١

ওয়া ইয়ঁইউরীদূখিয়া-নাতাকা ফাকাদ খা-নুল্লা-হা মিন কাবলুফাআমকানা মিনহুম ওয়াল্লা-হু ‘আলীমুন হাকীম।

(হে নবী!) তারা যদি তোমার সঙ্গে বিশ্বাস ভঙ্গের ইচ্ছা করে থাকে, তবে তারা তো ইতঃপূর্বে আল্লাহর সঙ্গেও বিশ্বাস ভঙ্গ করেছে, যার পরিণামে আল্লাহ তাদেরকে (তোমাদের) আয়ত্তাধীন করেছেন। বস্তুত আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।
৭২

اِنَّ الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا وَہَاجَرُوۡا وَجٰہَدُوۡا بِاَمۡوَالِہِمۡ وَاَنۡفُسِہِمۡ فِیۡ سَبِیۡلِ اللّٰہِ وَالَّذِیۡنَ اٰوَوۡا وَّنَصَرُوۡۤا اُولٰٓئِکَ بَعۡضُہُمۡ اَوۡلِیَآءُ بَعۡضٍ ؕ وَالَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا وَلَمۡ یُہَاجِرُوۡا مَا لَکُمۡ مِّنۡ وَّلَایَتِہِمۡ مِّنۡ شَیۡءٍ حَتّٰی یُہَاجِرُوۡا ۚ وَاِنِ اسۡتَنۡصَرُوۡکُمۡ فِی الدِّیۡنِ فَعَلَیۡکُمُ النَّصۡرُ اِلَّا عَلٰی قَوۡمٍۭ بَیۡنَکُمۡ وَبَیۡنَہُمۡ مِّیۡثَاقٌ ؕ وَاللّٰہُ بِمَا تَعۡمَلُوۡنَ بَصِیۡرٌ ٧٢

ইন্নাল্লাযীনা আ-মানূওয়া হা-জারূ ওয়া জা-হাদূ বিআমওয়া-লিহিম ওয়া আনফুছিহিম ফী ছাবীলিল্লা-হি ওয়াল্লাযীনা আ-ওয়াওঁ ওয়া নাসারূউলাইকা বা‘দুহুম আওলিয়াউ বা‘দিওঁ ওয়াল্লাযীনা আ-মানূওয়া লাম ইউহা-জিরূমা-লাকুম মিওঁ ওয়ালা-ইয়াতিহিম মিন শাইয়িন হাত্তা-ইউহাজিরু ওয়া ইনিছ তানসারূকুম ফিদদীনি ফা‘আলাইকুমুন্নাসরু ইল্লা-‘আলা-কাওমিম বাইনাকুম ওয়াবাইনাহুম মীছা-কুওঁ ওয়াল্লা-হুবিমা-তা‘মালূনা বাসীর।

যারা ঈমান এনেছে, হিজরত করেছে এবং নিজেদের মাল ও জান দ্বারা আল্লাহর পথে জিহাদ করেছে এবং যারা (তাদেরকে মদীনায়) আশ্রয় দিয়েছে ও (তাদের) সাহায্য করেছে, তারা পরস্পরে একে অন্যের অলি-ওয়ারিশ। আর যারা ঈমান এনেছে কিন্তু হিজরত করেনি, হিজরত না করা পর্যন্ত তাদের সাথে তোমাদের উত্তরাধিকারের কোনও সম্পর্ক নেই। ৫৩ হাঁ দীনের কারণে তারা তোমাদের সাহায্য চাইলে (তাদেরকে) সাহায্য করা তোমাদের অবশ্য কর্তব্য, অবশ্য (সে সাহায্য) যদি এমন কোনও সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে হয়, যাদের সঙ্গে তোমাদের কোন চুক্তি আছে, (তবে নয়)। ৫৪ তোমরা যা-কিছু কর আল্লাহ তা ভালোভাবে দেখেন।

তাফসীরঃ

৫৩. সূরা আনফালের শেষদিকের এ আয়াতসমূহে মীরাছ সংক্রান্ত কিছু বিধান বর্ণিত হয়েছে। এসব বিধান মক্কা মুকাররমা থেকে মুসলিমদের হিজরতের ফলশ্রুতিতে উদ্ভুত হয়েছিল। এ মূলনীতি তো আল্লাহ তাআলা শুরুতেই স্থির করে দিয়েছিলেন যে, মুসলিম ও কাফের একে অন্যের ওয়ারিশ হতে পারে না। হিজরতের পর অবস্থা এই হয়েছিল যে, যে সকল সাহাবী মদীনা মুনাওয়ারায় হিজরত করেছিলেন, তাদের অনেকের আত্মীয়-স্বজন মক্কা মুকাররমায় রয়ে গিয়েছিল। তাদের মধ্যে অনেকে এমনও ছিল, যারা ওয়ারিশ হতে পারত। কিন্তু তাদের অধিকাংশ যেহেতু ছিল কাফের, তখনও পর্যন্ত ইসলাম গ্রহণ করেনি, তাই ঈমান ও কুফরের প্রতিবন্ধকতার কারণে তারা মুসলিমদের ওয়ারিশ হতে পারেনি। এ আয়াত দ্ব্যর্থহীনভাবে জানিয়ে দিয়েছে যে, না তারা মুসলিমদের ওয়ারিশ হতে পারে, আর না মুসলিমগণ তাদের। মুহাজিরদের এমন কিছু আত্মীয়ও ছিল, যারা ইসলাম গ্রহণ করেছিল বটে, কিন্তু তারা মদীনা মুনাওয়ারায় হিজরত করেনি। তাদের সম্পর্কেও এ আয়াত বিধান দিয়েছে যে, মুহাজির মুসলিমদের সঙ্গে তাদেরও উত্তরাধিকার প্রাপ্তির কোনও সূত্র নেই। তার এক কারণ তো এই যে, তখন মক্কা মুকাররমা থেকে হিজরত করা সকল মুসলিমের উপর ফরয ছিল। তারা হিজরত করে তখনও পর্যন্ত এ ফরয আদায় করেনি। আর দ্বিতীয় কারণ হল, মুহাজিরগণ ছিলেন মদীনা মুনাওয়ারায়, যা ছিল দারুল ইসলাম বা ইসলামী রাষ্ট্র; আর তাদের ওই মুসলিম আত্মীয়গণ ছিলেন মক্কা মুকাররমায়, যা তখন দারুল হারব বা অমুসলিম রাষ্ট্র ছিল এবং উভয়ের মধ্যে বিশাল প্রতিবন্ধক বিদ্যমান ছিল। যা হোক, মুহাজিরগণের যেসব আত্মীয় মক্কা মুকাররমায় ছিল, তারা মুসলিম হোক বা অমুসলিম, তাদের সাথে মুহাজিরদের উত্তরাধিকার সূত্র ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল। ফলে তাদের কোনও আত্মীয় যদি মক্কা মুকাররমায় মারা যেত, তবে তার রেখে যাওয়া সম্পদে মুহাজিরদের কোনও অংশ থাকত না। আর যদি কোন মুহাজির মদীনায় মারা যেতেন, তার রেখে যাওয়া সম্পদেও তার মক্কাস্থ কোনও আত্মীয় অংশ লাভ করত না। এদিকে যে সকল মুহাজির মদীনায় চলে এসেছিলেন, মদীনার আনসারগণ তাদেরকে নিজেদের ঘর-বাড়িতে আশ্রয় দিয়েছিলেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রতি একজন আনসারী সাহাবীর সাথে একেকজন মুহাজির সাহাবীর ভ্রাতৃ-বন্ধন গড়ে দিয়েছিলেন। পরিভাষায় একে ‘মুআখাত’ বলে। এ আয়াতে বিধান দেওয়া হয়েছে যে, এখন প্রত্যেক মুহাজিরের ওয়ারিশ হবে তার মুআখাত ভিত্তিক আনসারী ভাই, মক্কাস্থ আত্মীয়গণ নয়।
৭৩

وَالَّذِیۡنَ کَفَرُوۡا بَعۡضُہُمۡ اَوۡلِیَآءُ بَعۡضٍ ؕ  اِلَّا تَفۡعَلُوۡہُ تَکُنۡ فِتۡنَۃٌ فِی الۡاَرۡضِ وَفَسَادٌ کَبِیۡرٌ ؕ ٧٣

ওয়াল্লাযীনা কাফারূবা‘দুহুম আওলিয়াউ বা‘দিন ইল্লা-তাফ‘আলূহু তাকুন ফিতনাতুন ফিল আরদিওয়া ফাছা-দুন কাবীর।

যারা কুফর অবলম্বন করেছে, তারা পরস্পরে একে অন্যের অলি-ওয়ারিশ। তোমরা যদি এরূপ না কর, তবে পৃথিবীতে ফিতনা ও মহা বিপর্যয় দেখা দেবে। ৫৫

তাফসীরঃ

৫৫. মীরাছসংক্রান্ত উপরিউক্ত বিধান এবং যে সকল মুসলিম হিজরত করেনি তাদের সাহায্য করা সংক্রান্ত যে বিধান শেষ দিকে এ আয়াতসমূহে বর্ণিত হয়েছে, তারই সাথে এ বাক্যের সম্পর্ক। এতে সতর্ক করা হয়েছে যে, এসব বিধান অমান্য করলে পৃথিবীতে ফিতনা-ফাসাদ ছড়িয়ে পড়বে। উদাহরণত কাফেরদের হাতে যে সকল মুসলিম নিপীড়িত হচ্ছে, তাদের সাহায্য না করলে যে বিপর্যয় দেখা দেবে এটা তো স্পষ্ট কথা। এমনিভাবে তাদের সাহায্য করতে গিয়ে যদি অমুসলিমদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করা হয়, তবে এর দ্বারাও সেই সকল কল্যাণ ও স্বার্থ পদদলিত হবে, যার প্রতি লক্ষ্য করে চুক্তি সম্পাদন করা হয়েছিল।
৭৪

وَالَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا وَہَاجَرُوۡا وَجٰہَدُوۡا فِیۡ سَبِیۡلِ اللّٰہِ وَالَّذِیۡنَ اٰوَوۡا وَّنَصَرُوۡۤا اُولٰٓئِکَ ہُمُ الۡمُؤۡمِنُوۡنَ حَقًّا ؕ لَہُمۡ مَّغۡفِرَۃٌ وَّرِزۡقٌ کَرِیۡمٌ ٧٤

ওয়াল্লাযীনা আ-মানূওয়া হা-জারূওয়া জা-হাদূফী ছাবীলিল্লা-হি ওয়াল্লাযীনা আ-ওয়াওঁ ওয়া নাসারুউলাইকা হুমুল মু’মিনূনা হাক্কাল লাহুম মাগফিরাতুওঁ ওয়া রিঝকুন কারীম।

যারা ঈমান এনেছে, হিজরত করেছে এবং আল্লাহর পথে জিহাদ করেছে আর যারা (তাদেরকে) আশ্রয় দিয়েছে ও (তাদের) সাহায্য করেছে, তারাই প্রকৃত মুমিন। ৫৬ তাদের জন্য রয়েছে মাগফিরাত ও (জান্নাতের) সম্মানজনক রিযিক।
৭৫

وَالَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا مِنۡۢ بَعۡدُ وَہَاجَرُوۡا وَجٰہَدُوۡا مَعَکُمۡ فَاُولٰٓئِکَ مِنۡکُمۡ ؕ  وَاُولُوا الۡاَرۡحَامِ بَعۡضُہُمۡ اَوۡلٰی بِبَعۡضٍ فِیۡ کِتٰبِ اللّٰہِ ؕ  اِنَّ اللّٰہَ بِکُلِّ شَیۡءٍ عَلِیۡمٌ ٪ ٧٥

ওয়াল্লাযীনা আ-মানূমিম বা‘দুওয়া হা-জারূওয়া জা-হাদূমা‘আকুম ফাউলাইকা মিনকুম ওয়া ঊলুল আরহা-মি বা‘দুহুম আওলাউ ব্বিা‘দিন ফী কিতা-বিল্লা-হি ইন্নাল্লাহা বিকুল্লি শাইয়িন ‘আলীম।

যারা পরে ঈমান এনেছে, হিজরত করেছে ও তোমাদের সাথে জিহাদ করেছে, তারাও তোমাদের অন্তর্ভুক্ত। আর (তাদের মধ্যে) যারা (পুরানো মুহাজিরদের) আত্মীয়, আল্লাহর কিতাবে তারা একে-অন্যের (মীরাছের ব্যাপারে অন্যদের অপেক্ষা) বেশি হকদার। ৫৭ নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্ব বিষয়ে পরিপূর্ণ জ্ঞান রাখেন।

তাফসীরঃ

৫৭. যে সকল মুসলিম ইতঃপূর্বে হিজরত করেনি, তারাও পরিশেষে হিজরত করে মদীনায় চলে এসেছে, এটা সেই সময়কার কথা। তাদের সম্পর্কে এ আয়াতে দু’টি বিধান বর্ণিত হয়েছে। (ক) হিজরতের মাধ্যমে তারা যেহেতু নিজেদের সেই ত্রুটি দূর করে ফেলেছে, যদ্দরুণ তাদের মর্যাদা মুহাজির ও আনসারদের চেয়ে নিচে ছিল, সেহেতু এখন তারাও তাদের সম-মর্যাদার হয়ে গেছে। (খ) এত দিন তারা তাদের মুহাজির আত্মীয়দের ওয়ারিশ হতে পারত না। এখন তারাও যেহেতু হিজরত করে মদীনায় চলে এসেছে এবং ওয়ারিশ হওয়ার মূল প্রতিবন্ধকতা দূর হয়ে গেছে, তাই এখন তারা তাদের মুহাজির ভাইদের ওয়ারিশ হবে। এর অনিবার্য ফল এই যে, ইতঃপূর্বে আনসারী ভাইদেরকে যে মুহাজিরদের ওয়ারিশ বানানো হয়েছিল, তা রহিত হয়ে গেছে। কেননা সেটা ছিল এক সাময়িক বিধান। মদীনায় মুহাজিরদের কোন আত্মীয় না থাকার কারণেই সে বিধান দেওয়া হয়েছিল। এখন যেহেতু তারা মদীনায় এসে গেছে, তাই এখন মীরাছের মূল বিধান ফিরে আসবে অর্থাৎ নিকটাত্মীয়দের মধ্যেই উত্তরাধিকার সম্পত্তি বণ্টন হবে।