পিতা-মাতার বিচ্ছেদ হলেও নেক সন্তানের দোয়ার ফল উভয়ই পাবে
প্রশ্নঃ ১৭১১৯১. আসসালামুআলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ, মৃত্যুর পর সন্তান সাদাকায়ে জারিয়া/ গুণাহে জারিয়া হবে এটা শুনছি। কিন্তু মা বাবার ডিভোর্সের পর, সন্তান যদি বাবা/ মা যেকোনো একজনের কাছে থেকে বড় হয়। সেক্ষেত্রে কী ঐ সন্তান দু' জনেরই সাদাকায়ে জারিয়া/ গুণাহে জারিয়া হবে? ডিভোর্সের পর সন্তানের ওপর মায়ের হক কীরূপ হবে?
উত্তর
و علَيْــــــــــــــــــــكُم السلام ورحمة الله وبركاته
بسم الله الرحمن الرحيم
বাবা-মায়ের বিচ্ছেদ হয়ে গেলেও সন্তানের সঙ্গে বাবা-মায়ের সম্পর্ক ও হক শেষ হয়ে যায় না। সন্তান বাবা বা মার কোনো একজনের কাছে থেকে বড় হলেও অন্যজনের হক নষ্ট হয় না।
রাসূলুল্লাহ ﷺ যে হাদীসে বলেছেন,
إِذَا مَاتَ الإِنْسَانُ انْقَطَعَ عَنْهُ عَمَلُهُ إِلاَّ مِنْ ثَلاَثَةٍ إِلاَّ مِنْ صَدَقَةٍ جَارِيَةٍ أَوْ عِلْمٍ يُنْتَفَعُ بِهِ أَوْ وَلَدٍ صَالِحٍ يَدْعُو لَهُ
অর্ধ : যখন মানুষ মারা যায় তখন তিন প্রকার আমল ব্যতীত তার সকল আমল বন্ধ হয়ে যায়: (১) সাদ্কায়ে জারিয়া (২) এমন ইলম যার দ্বারা উপকার সাধিত হয় (৩) নেককার সন্তান যে তার জন্য দুআ করতে থাকে।
[সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১৬৩১]
(https://muslimbangla.com/hadith/11126)
সুতরাং পিতা-মাতার বিচ্ছেদের পর সন্তান যার কাছেই বড় হোক সে যদি নেককার সন্তান হয়, সে মায়ের জন্য দোয়া করলে মা যেমন উপকৃত হবেন, তেমনি বাবার জন্য দোয়া করলে বাবাও উপকৃত হবেন। সন্তান কার কাছে বড় হয়েছে, এটি এ ফজিলত পাওয়ার ক্ষেত্রে বাধা নয়।
আর সন্তানেরও উচিত পিতা-মাতা উভয়ের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখা, প্রয়োজনীয় খোঁজখবর নেওয়া ও দেখাশোনা করা। পিতা-মাতার সম্পর্ক নষ্ট হওয়ার কারণে পিতা-মাতার প্রতি সন্তানের হকের ক্ষেত্রে কোনো পরিবর্তন আসবে না।
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَقَضٰی رَبُّکَ اَلَّا تَعۡبُدُوۡۤا اِلَّاۤ اِیَّاہُ وَبِالۡوَالِدَیۡنِ اِحۡسٰنًا ؕ اِمَّا یَبۡلُغَنَّ عِنۡدَکَ الۡکِبَرَ اَحَدُہُمَاۤ اَوۡ کِلٰہُمَا فَلَا تَقُلۡ لَّہُمَاۤ اُفٍّ وَّلَا تَنۡہَرۡہُمَا وَقُلۡ لَّہُمَا قَوۡلًا کَرِیۡمًا
অর্থ : তোমার প্রতিপালক নির্দেশ দিয়েছেন যে, তাকে ছাড়া অন্য কারও ইবাদত করো না, পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করো। পিতা-মাতার কোনও একজন কিংবা উভয়ে যদি তোমার কাছে বার্ধক্যে উপনীত হয়, তবে তাদেরকে উফ্ পর্যন্ত বলো না এবং তাদেরকে ধমক দিও না; বরং তাদের সাথে সম্মানজনক কথা বলো।
[সূরা বনী ইসরাইল, আয়াত নং ২৩]
(https://muslimbangla.com/sura/17/tafsir/23)
অপর আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَوَصَّیۡنَا الۡاِنۡسَانَ بِوَالِدَیۡہِ اِحۡسٰنًا
অর্থ : আমি মানুষকে তার পিতা-মাতার প্রতি সদ্ব্যবহার করার হুকুম দিয়েছি।
[সূরা আল-আহকাফ, আয়াত নং ১৫]
(https://muslimbangla.com/sura/46/tafsir/15)
সুতরাং পিতা-মাতার মধ্যে পরস্পরের সম্পর্ক থাক বা না থাক, সন্তান হিসেবে পিতা-মাতা উভয়ের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখা, তাদের সাথে সৎ ব্যবহার করা এবং প্রয়োজনীয় সাহায্য-সহযোগিতা ও খোঁজখবর নেওয়া সন্তানের ওপর আবশ্যক।
অনুরূপভাবে পিতা-মাতার মাঝে বিচ্ছেদ হয়ে গেলেও পিতা-মাতা উভয়ের দায়িত্ব সন্তানকে সুন্দরভাবে লালন-পালন করা, সুশিক্ষা দেওয়া ও আদর্শ সন্তান হিসেবে গড়ে তোলা। সুতরাং পিতা-মাতা উভয়ে বা কোনো একজন যদি এ দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন না করে এবং এ কারণে সন্তান কোনো অন্যায়-অপরাধে জড়িয়ে পড়ে, তবে তার দায় থেকে পিতা-মাতা মুক্ত হতে পারবে না।
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন,
یٰۤاَیُّہَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا قُوۡۤا اَنۡفُسَکُمۡ وَاَہۡلِیۡکُمۡ نَارًا
অর্থ : হে মুমিনগণ! তোমরা নিজেদেরকে এবং তোমাদের পরিবারবর্গকে জাহান্নাম থেকে রক্ষা করো।
[সূরা আত-তাহরীম, আয়াত নং ৬]
(https://muslimbangla.com/sura/66/tafsir/6)
হাদীসে রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,
كُلُّكُمْ رَاعٍ، وَكُلُّكُمْ مَسْئُولٌ عَنْ رَعِيَّتِهِ، الإِمَامُ رَاعٍ وَمَسْئُولٌ عَنْ رَعِيَّتِهِ، وَالرَّجُلُ رَاعٍ فِي أَهْلِهِ وَهُوَ مَسْئُولٌ عَنْ رَعِيَّتِهِ، وَالمَرْأَةُ رَاعِيَةٌ فِي بَيْتِ زَوْجِهَا وَمَسْئُولَةٌ عَنْ رَعِيَّتِهَا
অর্থ : তোমরা সকলেই দায়িত্বশীল এবং তোমাদের প্রত্যেককেই অধীনস্থদের (দায়িত্ব) সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে। ইমাম একজন দায়িত্বশীল ব্যক্তি, তাঁকে তাঁর অধীনস্থদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে। পুরুষ তার পরিবারবর্গের অভিভাবক, তাকে তাঁর অধীনস্থদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে। নারী তার স্বামীগৃহের কর্ত্রী, তাকে তাঁর অধীনস্থদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।
[সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৮৯৩]
(https://muslimbangla.com/hadith/849)
সুতরাং বাবা-মায়ের দায়িত্ব হলো সন্তানকে দ্বীন ও নৈতিকতার শিক্ষা দিয়ে সঠিকভাবে গড়ে তোলার যথাসাধ্য চেষ্টা করা। তারা দায়িত্ব পালনে অবহেলা করলে সেই অবহেলার জন্য আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করতে হবে।
আর যদি তারা যথাযথভাবে দ্বীন শিক্ষা দিয়ে থাকে, আদর্শ সন্তান হিসেবে গড়ে তোলার যথাযথ চেষ্টা করে—তারপরেও সে সন্তান কোনো গুনাহে জড়িয়ে পড়ে, তবে সে গুনাহের ভার পিতা-মাতার ওপর আসবে না।
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেন,
مَنِ اہۡتَدٰی فَاِنَّمَا یَہۡتَدِیۡ لِنَفۡسِہٖ ۚ وَمَنۡ ضَلَّ فَاِنَّمَا یَضِلُّ عَلَیۡہَا ؕ وَلَا تَزِرُ وَازِرَۃٌ وِّزۡرَ اُخۡرٰی
অর্থ : যে ব্যক্তি সরল পথে চলে, সে তো সরল পথে চলে নিজ মঙ্গলের জন্যই; আর যে ব্যক্তি ভ্রান্ত পথ অবলম্বন করে, সে নিজের ক্ষতির জন্যই তা অবলম্বন করে। আর কোনো বোঝাবহনকারী অন্য কারও (পাপের) বোঝা বহন করবে না।
সূরা বনী ইসরাইল, আয়াত নং ১৫ (https://muslimbangla.com/sura/17/tafsir/15)
সারকথা: পিতা-মাতার বিচ্ছেদ হলেও সন্তান নেককার হয়ে দোয়া করলে তার সওয়াব পিতা-মাতা উভয়েই পাবেন। এবং সন্তানের করণীয় হলো, পিতা-মাতার সম্পর্ক থাক বা না থাক সন্তানকে সর্বাবস্থায় বাবা-মা উভয়ের সঙ্গেই সুসম্পর্ক ও খোঁজখবর রাখতে হবে।
আর পিতা-মাতা উভয়ের দায়িত্ব হলো, সন্তানকে সঠিক দ্বীনি শিক্ষা দেওয়া। যথাযথ দ্বীন শিক্ষা না দেওয়ার কারণে সন্তান গুনাহে জড়িত হলে পিতা-মাতা দায়মুক্ত হতে পারবেন না। তবে সাধ্যমত চেষ্টার পর সন্তান পাপে লিপ্ত হলে সেই গুনাহ পিতা-মাতার ওপর আসবে না।
والله اعلم بالصواب
উত্তর দাতা:
উস্তাজ, ইদারাতুত্ তাখাসসুস ফিল উলূমিল ইসলামিয়া, আজিমপুর
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন