অনুমতি ছাড়া বোনকে দেওয়া গহনা বিক্রি করার বিধান
প্রশ্নঃ ১৬৭৯৯০. আসসালামুআলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ, স্বামীর অনেক টাকা ঋন। টাকা দেওয়ার মতো অবস্থা নেই। ছোট বোনের কিছু গয়না আছে মায়ের কাছে। বোন বুদ্ধি প্রতিবন্ধী। বোনকে না জানিয়ে কি তার গয়না বিক্রি করে ঋন দেওয়া যাবে? গয়না তার ভাই দিয়েছে। ভাইয়ের একটা গাড়ি আছে। যার ইনকামের টাকায় সংসার চলে। তাই গাড়িটা বিক্রি করা যাবে না। বোনের গয়না পরে বানিয়ে দেওয়া হবে।
উত্তর
و علَيْــــــــــــــــــــكُم السلام ورحمة الله وبركاته
بسم الله الرحمن الرحيم
সম্মানিত প্রশ্নকারী!
ছোট বোনকে না জানিয়ে বা তার সম্মতি ছাড়া তার গয়না বিক্রি করা আপনার স্বামীর জন্য জায়েজ হবে না। ধর্মীয় এবং আইনগত উভয় দিক থেকেই বিষয়টি স্পর্শকাতর । তাছাড়া স্বামীর বোন বুদ্ধি প্রতিবন্ধী হওয়ায় তার অধিকার ও সম্পত্তির সুরক্ষায় বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করা জরুরী ।
গয়নাগুলো তার ভাই (সম্ভবত আপনার) দিয়েছেন, যার অর্থ গয়নাগুলোর বর্তমান মালিক এখন তার ছোট বোন। যিনি উপহার দিয়েছেন (ভাই), দেওয়ার পর সেই সম্পত্তির ওপর তার আর কোনো অধিকার থাকে না। বুদ্ধি প্রতিবন্ধী হলেও একজন ব্যক্তির নিজস্ব সম্পত্তির ওপর অধিকার থাকে। তাকে না জানিয়ে তার জিনিস নেওয়া বা বিক্রি করা জায়েজ নয়।
গিফট ফেরত নেওয়ার বিধান:
কাউকে কোনো কিছু হেবা-দান-গিফট করার পর তার ফেরত নেওয়া যায় না। শরীয়তে এটাকে অত্যন্ত গর্হিত কাজের সাথে তুলনা করা হয়েছে। হাদিস শরীফে বর্ণিত হয়েছে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "যে ব্যক্তি দান (গিফট/হেবা/হাদিয়) করার পর তা ফেরত নেয়, সে ওই কুকুরের মতো যে বমি করে আবার তা খায়।" (সহীহ বুখারী ও মুসলিম)। https://muslimbangla.com/hadith/2445
হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) তাঁর খেলাফতের সময় ফয়সালা দিয়েছিলেন: "যে ব্যক্তি তার কোনো নিকটাত্মীয়কে (যাদের সাথে বিবাহ হারাম, যেমন সন্তান) কোনো কিছু হেবা করে দেয়, তার জন্য তা আর ফেরত নেওয়ার অধিকার নেই।" (মুসান্নাফ ইবনে আবী শায়বাহ, কিতাবুল হেবা) হাদিস নং ২১৭৫৮
হানাফী ফকীহদের মতে, দান ফেরত নেওয়া ইসলামের একটি অত্যন্ত নিন্দনীয় কাজ এবং এটি সবার জন্যই প্রযোজ্য।
হানাফী ফিকহের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ও প্রামাণিক কিতাব 'الهداية في شرح بداية المبتدي-তে ইমাম বুরহানুদ্দীন আল-মারগিনানী (র.) স্পষ্ট লিখেছেন:
" "وإن وهب هبة لذي رحم محرم منه فلا رجوع فيها" لقوله ﵊: "إذا كانت الهبة لذي رحم محرم منه لم يرجع فيها"؛ ولأن المقصود فيها صلة الرحم وقد حصل "وكذلك ما وهب أحد الزوجين للآخر"؛ لأن المقصود فيها الصلة كما في القرابة، وإنما ينظر إلى هذا المقصود وقت العقد، حتى لو تزوجها بعدما وهب لها فله الرجوع، ولو أبانها بعدما وهب فلا رجوع. " كتاب الهبة باب الرجوع في الهبة (المكتبة الشاملة)
অনুবাদ: "আর যদি কেউ এমন কোনো আত্মীয়কে দান করে যার সাথে তার বিবাহ চিরতরে নিষিদ্ধ (মাহরাম), তবে সে তা আর ফিরিয়ে নিতে পারবে না। এর কারণ হিসেবে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: 'যখন দান এমন আত্মীয়কে করা হয় যার সাথে বিবাহ নিষিদ্ধ, তখন তা আর ফিরিয়ে নেওয়া যাবে না।' তাছাড়া এর আরেকটি কারণ হলো, এই দানের মূল উদ্দেশ্যই হচ্ছে আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করা, যা দান করার মাধ্যমেই ইতোমধ্যে অর্জিত হয়ে গেছে। তদ্রূপ স্বামী-স্ত্রীর একজন অপরজনকে যা দান করে, তাও আর ফেরত নেওয়া যাবে না। কারণ আত্মীয়তার সম্পর্কের মতো এখানেও মূল উদ্দেশ্য হলো পারস্পরিক সুসম্পর্ক ও ভালোবাসা বৃদ্ধি করা। আর এই উদ্দেশ্যটি মূলত দান বা চুক্তি সম্পাদনের সময়ের ওপর ভিত্তি করে ধর্তব্য হবে। ফলে, কোনো ব্যক্তি যদি কোনো নারীকে কোনো কিছু দান করার পর তাকে বিয়ে করে, তবে সে উক্ত দান ফেরত নিতে পারবে (যেহেতু দানের সময় তারা স্বামী-স্ত্রী ছিল না)। কিন্তু স্বামী-স্ত্রী থাকাকালীন দান করার পর যদি তাদের বিচ্ছেদ ঘটে, তবে সে তা আর ফেরত নিতে পারবে না।"(কিতাবুল হেবা, বাবুর রুজু ফিল হেবা, শামেলা ভার্সন)
ইমাম ইবনে নুজাইম আল-মিসরী (র.) البحر الرائق شرح كنز الدقائق- কিতাবে হেবা ফেরত না নেওয়ার ৭টি প্রধান প্রতিবন্ধকতা (موانع الرجوع) আলোচনা করতে গিয়ে উল্লেখ করেছেন :
(قوله والقاف القرابة فلو وهب لذي رحم محرم منه لا يرجع) لحديث الحاكم مرفوعا «إذا كانت الهبة لذي رحم محرم لم يرجع فيها» وصححه وقال على شرط الشيخين ومفهوم شرطه أنها إذا كانت لغير محرم فله الرجوع
ক্বাফ' অক্ষর দ্বারা 'কারাবাত' বা আত্মীয়তা বোঝানো হয়েছে। সুতরাং কেউ যদি এমন কোনো আত্মীয়কে দান করে যার সাথে তার বিবাহ চিরতরে নিষিদ্ধ (মাহরাম), তবে সে তা আর ফিরিয়ে নিতে পারবে না) এর প্রমাণ হলো ইমাম হাকিম কর্তৃক মারফূ সূত্রে বর্ণিত হাদীস—'যখন দান কোনো মাহরাম আত্মীয়কে করা হয়, তখন তা আর ফিরিয়ে নেওয়া যাবে না।' ইমাম হাকিম হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন এবং শর্তানুযায়ী এটি বুখারী ও মুসলিমের মানদণ্ড উত্তীর্ণ। (কিতাবুল হেবা, খণ্ড: ৭, পৃষ্ঠা: ১১৭/শামেলা ভার্সন)
উপমহাদেশের হানাফী ফিকহের সবচেয়ে বড় বিশ্বকোষ 'ফাতাওয়া হিন্দিয়া' (الفتاوى الهندية)-তে বলা হয়েছে:
"وَمِنْهَا الْقَرَابَةُ النَّسَبِيَّةُ فِي مَحْرَمٍ فَلَا رُجُوعَ فِي الْهِبَةِ لِلْوَلَدِ وَإِنْ سَفَلَ وَلِلْآبَاءِ وَالْأُمَّهَاتِ وَإِنْ عَلَوْا... هَكَذَا فِي الْكَافِي"
(কিতাবুল হেবা, অধ্যায়: ৫, খণ্ড: ৪, পৃষ্ঠা: ৩৮৫)
কাজেই আপনার স্বামীর জন্য কিছুতেই তার বোনের অনুমতি ছাড়া তার গহনা বিক্রি করা জায়েজ হবে না।
বিকল্প সমাধান:
আলোচনা: প্রয়োজনে বোনোর সাথে আলোচনা করে তার সম্মতিতেই সেগুলো বিক্রি করে ঋণ পরিশোধ করুন।
অন্যান্য অপ্রয়োজনীয় সম্পদ: পরিবারে অন্য কোনো গয়না, অব্যবহৃত জমি বা সম্পদ থাকলে তা বিবেচনা করুন।
সাহায্য বা কর্জে হাসানা: নিকটাত্মীয় বা বন্ধুদের কাছ থেকে সুদবিহীন কোনো সহায়তার ব্যবস্থা করা যায় কি না তা দেখা।
والله اعلم بالصواب
উত্তর দাতা:
মুফতী ও মুহাদ্দিস, জামিয়া ইমাম বুখারী, উত্তরা, ঢাকা।
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন