শরিয়তের দৃষ্টিতে আবাসন ব্যবসা ও অ্যাপার্টমেন্ট ডেভেলপমেন্ট
প্রশ্নঃ ১৬৭৮৯৬. আসসালামুআলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ, মুতারাম!
বর্তমান প্রচলিত হাউজি্ং, অ্যাপার্টমেন্ট, প্লট ডেভলপমেন্ট, এজাতীয় ব্যবসার বৈধতা/অবৈধতা ফেকহি ইসলামের আলোকে সমাধান দিন।
৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
ঢাকা
উত্তর
و علَيْــــــــــــــــــــكُم السلام ورحمة الله وبركاته
بسم الله الرحمن الرحيم
সম্মানিত প্রশ্নকারী!
ইসলামি শরিয়তের আলোকে জমি, আবাসন বা রিয়েল এস্টেট (হাউজিং, অ্যাপার্টমেন্ট ও প্লট ডেভেলপমেন্ট) ব্যবসা হালাল এবং বৈধ। তবে বর্তমান সময়ে বহুল প্রচলিত এই ব্যবসায় বিভিন্ন ধরণে অনৈতিক এবং শরীয়ত পরিপন্থি বিভিন্ন কাজ, পদক্ষেপ, পলিসি এবং অপকৌশল অবলম্বনের ফলে এই ব্যবসা শরঈ বিধানের দৃষ্টিতে ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে তাই এর সঠিক বিধান জেনে তারপর এই ব্যবসায় সমপৃক্ত হওয়া আবশ্য। কেননা শরীয়তের সকল বিষয়ের ন্যায় এক্ষেত্রেও কিছু সুনির্দিষ্ট শর্ত, ফিকহি বিধিবিধান এবং নৈতিক বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এই শর্তগুলো শতভাগ মেনে চললে ব্যবসাটি বৈধ হবে, অন্যথায় এটি অবৈধ বা হারামে রূপ নিতে পারে। সকল ব্যবসায়ীর পলিসি এক নয়; সকলের ব্যবসা পলিসি সম্পর্কে আমরাও অবগত নই। তবে সামগ্রিক বিবেচনায় ব্যবসায় যেই বিষয়গুলো লক্ষ রাখতে হয় সেগুলোর আলোকে যদি ব্যবসা পরিচালনা করা হয় তাহলে ব্যবসা হালাল হবে। না হলে ব্যবসা হারাম হবে। নিম্নে ফিকহে ইসলামির আলোকে এজাতীয় ব্যবসার বিধিনিষেধ নিয়ে আলোকপাত করা হলো।
০১. মূল ব্যবসার বৈধতা: আকদুল ইস্তিসনা (নির্মাণ চুক্তি):
ইসলামি শরিয়তের সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী, কোনো জিনিস তৈরি হওয়ার আগে বা অস্তিত্বে আসার আগে তা বিক্রি করা জায়েজ নেই। কিন্তু মানুষের বাড়ি-ঘর প্লট ও ফ্ল্যাট নির্মাণের বাস্তব প্রয়োজনীয়তার কথা বিবেচনা করে হানাফি ফিকহে "আকদুল ইস্তিসনা" (অর্ডার দিয়ে কোনো জিনিস বানিয়ে নেওয়ার চুক্তি) পদ্ধতিকে বৈধতা দেওয়া হয়েছে। এর ফলে, প্লট, ফ্ল্যাট বা বিল্ডিং তৈরি হওয়ার আগেই ক্রেতার কাছ থেকে অগ্রিম বা কিস্তিতে টাকা নেওয়া এবং ডেভেলপারদের ব্যবসা করা হালাল ও বৈধ।
جاء في بدائع الصنائع صـــ 93/4 (زكريا ديوبند) : أما صورة الاستصناع فهي أن يقول إنسان لصانع - من خفاف أو صفار أو غيرهما -: اعمل لي خفا، أو آنية من أديم أو نحاس، من عندك بثمن كذا، ويبين نوع ما يعمل وقدره وصفته، فيقول الصانع: نعم. … وأما جوازه، فالقياس: أن لا يجوز؛ لأنه بيع ما ليس عند الإنسان، لا على وجه السلم، وقد نهى رسول الله ﷺ عن بيع ما ليس عند الإنسان، ورخص في السلم، ويجوز استحسانا؛ لإجماع الناس على ذلك؛ لأنهم يعملون
وفيه أيضا : ذلك في سائر الأعصار من غير نكر، وقد قال ﵊: «لا تجتمع أمتي على ضلالة» وقال ﵊: «ما رآه المسلمون حسنا؛ فهو عند الله حسن، وما رآه المسلمون قبيحا؛ فهو عند الله قبيح» والقياس يترك بالإجماع، ولهذا ترك القياس في دخول الحمام بالأجر، من غير بيان المدة، ومقدار الماء الذي يستعمل، وفي قطعه الشارب للسقاء، من غير بيان قدر المشروب، وفي شراء البقل، وهذه المحقرات كذا هذا؛ ولأن الحاجة تدعو إليه؛ لأن الإنسان قد يحتاج إلى خف، أو نعل من جنس مخصوص، ونوع مخصوص، على قدر مخصوص وصفة مخصوصة، وقلما يتفق وجوده مصنوعا؛ فيحتاج إلى أن يستصنع، فلو لم يجز؛ لوقع الناس في الحرج وقد خرج الجواب عن قوله: إنه معدوم؛ لأنه ألحق بالموجود لمساس الحاجة إليه، كالمسلم فيه: فلم يكن بيع ما ليس عند الإنسان على الإطلاق؛ ولأن فيه معنى عقدين جائزين، - وهو السلم والإجارة -؛ لأن السلم عقد على مبيع في الذمة، واستئجار الصناع يشترط فيه العمل، وما اشتمل على معنى عقدين جائزين؛ كان جائزا.
وأما شرائط جوازه (فمنها) : بيان جنس المصنوع، ونوعه وقدره وصفته؛ لأنه لا يصير معلوما بدونه.
(ومنها) : أن يكون مما يجري فيه التعامل بين الناس - من أواني الحديد والرصاص، والنحاس والزجاج، والخفاف والنعال، ولجم الحديد للدواب، ونصول السيوف، والسكاكين والقسي، والنبل والسلاح كله، والطشت والقمقمة، ونحو ذلك - ولا يجوز في الثياب؛ لأن القياس يأبى جوازه، وإنما جوازه - استحسانا - لتعامل الناس، ولا تعامل في الثياب.
০২. প্লট ও ফ্ল্যাটের বিবরণ শতভাগ স্পষ্ট হওয়া
যেহেতু এটি একটি অগ্রিম বিক্রয় চুক্তি, তাই প্লট ও ফ্ল্যাটের মস্ত বিবরণ (যেমন: মোট জমির পরিমাণ, ভরাটের খরচ, রাস্তাঘাট ইত্যাদির ব্যবস্থা, ফ্ল্যাাটের স্কয়ার ফিট, ফ্লোর বা তলা, রুমের সংখ্যা, ব্যবহৃত রড-সিমেন্ট-টাইলসের মান এবং হস্তান্তরের নির্দিষ্ট সময়) চুক্তিনামায় স্পষ্ট করে লিখতে হবে। কোনো ধরনের অস্পষ্টতা বা তথ্য গোপন রাখা যাবে না। বিবরণ অস্পষ্ট থাকলে চুক্তি ফাসেদ বা বাতিল হয়ে যাবে।
وفي رد المحتار على الدر المختار صــ٥٠١/٧ (رشيدية باكستان) عن البدائع من شروطه : بيان جنس المصنوع، ونوعه وقدره وصفته، وأن يكون مما فيه تعامل، وأن لا يكون مؤجلا وإلا كان سلما وعندهما المؤجل استصناع إلا إذا كان مما لا يجوز فيه الاستصناع فينقلب سلما في قولهم جميعا.
০৩. কিস্তির টাকা দিতে দেরি হলে 'বিলম্ব ফি' বা জরিমানা নেওয়া
আমাদের দেশের প্রচলিত আবাসন ব্যবসায় ক্রেতা কিস্তির টাকা দিতে দেরি করলে কোম্পানি তার ওপর অতিরিক্ত দৈনিক বা মাসিক জরিমানা (Late Fee) ধার্য করে। হানাফি ফিকহ ও সামগ্রিক ইসলামি শরিয়তের দৃষ্টিতে এটি স্পষ্ট সুদ (Riba) এবং সম্পূর্ণ হারাম। ইসলামে কোনো অপরাধের শাস্তি হিসেবে আর্থিক জরিমানা করে সেই টাকা নিজের পকেটে ভরা বা কোম্পানির মালিকানায় নেওয়া বৈধ নয়।
وفي الفتاوى الهندية في كتاب الحدود تحت فصل في التعزير: (المكتبة الشاملة) التعزير قد يكون بالحبس وقد يكون بالصفع وتعريك الأذن وقد يكون بالكلام العنيف وقد يكون بالضرب وقد يكون بنظر القاضي إليه بنظر عبوس كذا في النهاية وعند أبي يوسف - رحمه الله تعالى - يجوز التعزير للسلطان بأخذ المال وعندهما وباقي الأئمة الثلاثة لا يجوز كذا في فتح القدير. ومعنى التعزير بأخذ المال على القول به إمساك شيء من ماله عنده مدة لينزجر ثم يعيده الحاكم إليه لا أن يأخذه الحاكم لنفسه أو لبيت المال كما يتوهمه الظلمة إذ لا يجوز لأحد من المسلمين أخذ مال أحد بغير سبب شرعي كذا في البحر الرائق.
০৪. চুক্তি বাতিল করলে বুকিং বা বায়নামার টাকা বাজেয়াপ্ত করা
কোনো ক্রেতা যদি বুকিং দেওয়ার পর আর্থিক সমস্যা বা অন্য কোনো কারণে বাকি কিস্তি দিতে না পেরে চুক্তি বাতিল করতে চায়, তবে ডেভেলপার কোম্পানিগুলো পুরো বুকিং বা বায়নামার টাকা কেটে রেখে দেয়। হানাফি ফিকহে একে 'বায়উল ওরবান' বলা হয়, যা সম্পূর্ণ অবৈধ। কোম্পানি ক্রেতার জমা টাকা নিজের কাছে রেখে দিতে পারবে না। তবে কোম্পানি প্রজেক্টের পেছনে ক্রেতার কারণে যে বাস্তব প্রশাসনিক ক্ষতি বা খরচ (Actual Administrative Cost) হয়েছে, তা কেটে রেখে বাকি টাকা ফেরত দিতে বাধ্য।
وَعَنْ عَمْرِو بْنِ شُعَيْبٍ عَنْ أَبِيهِ عَنْ جَدِّهِ قَالَ: نَهَى رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَنْ بَيْعِ الْعُرْبَانِ. رَوَاهُ مَالِكٌ وَأَبُو دَاوُد وَابْن مَاجَه
২৮৬৪। হযরত আমর ইবনে শোআয়ব তাঁহার পিতার মাধ্যমে তাঁহার দাদা হইতে বর্ণনা করিয়াছেন, রাসূলুল্লাহ্ (ﷺ) নিষেধ করিয়াছেন— 'ওরবান' রকমের ক্রয়-বিক্রয় হইতে। —মালেক, আবু দাউদ ও ইবনে মাজাহ্
কোন বস্তু বাকী ক্রয় করিয়া ক্রেতা ঐ বস্তুকে গ্রহণ করিয়া নিল; তখন মূল মূল্য প্রদান করিল না, বরং মূল্যের কিছু অংশ প্রদান করিল। শর্ত থাকিল যে, যদি ক্রয় সাব্যস্ত রাখা হয়, তবে মূল্যের অবশিষ্ট আদায় করিয়া দেওয়া হইবে—এই প্রদত্ত অংশকেও মোট মূল্যের অংশ প্রদানই গণ্য করা হইবে। আর যদি ক্রয়কে ভঙ্গ করিয়া ঐ বস্তুকে ফেরত দেওয়া হয়, তবে প্রদত্ত মূল্যের অংশ ক্রেতা ফেরত পাইবে না, উহা বিক্রেতারই থাকিয়া যাইবে।
মিশকাতুল মাসাবীহ، হাদীস নং ২৮৬৪
হাদীসের লিংক:https://muslimbangla.com/hadith/37809
০৫. জমির মালিক ও ডেভেলপার কোম্পানির যৌথ ব্যবসা
জমির মালিক জমি দেবে এবং ডেভেলপার কোম্পানি নিজের খরচে ভবন নির্মাণ করে নিজেদের মাঝে ফ্ল্যাট ভাগাভাগি করে নেবে—এই পদ্ধতিটি হানাফি ফিকহে 'মুশারাকাতুল আমাল' (কাজের অংশীদারিত্ব) চুক্তির নিয়মে সম্পূর্ণ বৈধ। তবে শর্ত হলো, কার ভাগে কতটি বা কোন কোন ফ্ল্যাট থাকবে, তা ভবন নির্মাণের আগেই লিখিত চুক্তিতে সুনির্দিষ্ট হতে হবে। পরবর্তীতে ব্যবসায় কোনো আর্থিক লোকসান হলে তা মালিকানার অনুপাত অনুযায়ী বহন করতে হবে।
وفي الهداية شرح بداية المبتدي تحت عنوان فصل: "وَلَا تَنْعَقِدُ الشِّرْكَةُ إلَّا بِمَا تَنْعَقِدُ بِهِ الْبُيُوعُ" (المكتبة الشاملة): ويصح أن يتساويا في المال ويتفاضلا في الربح" وقال زفر والشافعي: لا تجوز لأن التفاضل فيه يؤدي إلى ربح ما لم يضمن، فإن المال إذا كان نصفين والربح أثلاثا فصاحب الزيادة يستحقها بلا ضمان، إذ الضمان بقدر رأس المال، ولأن الشركة عندهما في الربح للشركة في الأصل، ولهذا يشترطان الخلط، فصار ربح المال بمنزلة نماء الأعيان فيستحق بقدر الملك في الأصل. ولنا قوله ﵌: "الربح على ما شرطا، والوضيعة على قدر المالين" ولم يفصل، ولأن الربح كما يستحق بالمال يستحق بالعمل كما في المضاربة؛ وقد يكون أحدهما أحذق وأهدى وأكثر عملا وأقوى فلا يرضى بالمساواة فمست الحاجة إلى التفاضل،
والله اعلم بالصواب
উত্তর দাতা:
সাইদুজ্জামান কাসেমি
মুফতী ও মুহাদ্দিস, জামিয়া ইমাম বুখারী, উত্তরা, ঢাকা।
মুফতী ও মুহাদ্দিস, জামিয়া ইমাম বুখারী, উত্তরা, ঢাকা।
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন
এ সম্পর্কিত আরও জিজ্ঞাসা/প্রশ্ন-উত্তর
মাসায়েল-এর বিষয়াদি
আল কুরআনুল কারীম
৪
হাদীস ও সুন্নাহ
৬
তাসাউফ-আত্মশুদ্ধি । ইসলাহী পরামর্শ
৩
শরীআত সম্পর্কিত
১৫
ফিতনাসমুহ; বিবরণ - করণীয়
২
আখিরাত - মৃত্যুর পরে
৩
ঈমান বিধ্বংসী কথা ও কাজ
৬
ফিরাকে বাতিলা - ভ্রান্ত দল ও মত
২
পবিত্রতা অর্জন
৮
নামাযের অধ্যায়
১৯
যাকাত - সদাকাহ
৫
রোযার অধ্যায়
৬
হজ্ব - ওমরাহ
২
কাফন দাফন - জানাযা
৫
কসম - মান্নত
১
কুরবানী - যবেহ - আকীকা
৪
বিবাহ শাদী
৮
মীরাছ-উত্তরাধিকার
২
লেনদেন - ব্যবসা - চাকুরী
৯
আধুনিক মাসায়েল
৬
দন্ড বিধি
২
দাওয়াত ও জিহাদ
৩
ইতিহাস ও ঐতিহ্য
৬
সীরাতুন নবী সাঃ । নবীজীর জীবনচরিত
৩
সাহাবা ও তাবেঈন
৩
ফাযায়েল ও মানাকেব
৩
কিতাব - পত্রিকা ও লেখক
৩
পরিবার - সামাজিকতা
৭
মহিলা অঙ্গন
২
আখলাক-চরিত্র
২
আদব- শিষ্টাচার
১২
রোগ-ব্যধি। চিকিৎসা
২
দোয়া - জিকির
২
নাম। শব্দ জ্ঞান
৩
নির্বাচিত
২
সাম্প্রতিক
১
বিবিধ মাসআলা
১