জিকির, দরুদ ও ইস্তিগফারের ধারাবাহিকতা এবং শরয়ী বিধান
প্রশ্নঃ ১৬৭৬২৭. আসসালামুআলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ, আমি নতুন নতুন ইসলামের সংস্পর্শে আসছি তো তাই মনে হয় আজব ধরনের সমস্যা/ফিতনায় পড়ছি এই যেমন দরুদ আগে পড়বো নাকি ইস্তেগফার আগে নাকি তাসবিহ তাহলীল আগে পড়বো এই নিয়ে মাঝে মাঝে প্রবলেম এ পরি, পরে কেনো জানি কোনোটাই হয়না, একটা সমাধান দিন প্লিজ, সাহাবীরা কিভাবে পড়তেন।
উত্তর
و علَيْــــــــــــــــــــكُم السلام ورحمة الله وبركاته
بسم الله الرحمن الرحيم
প্রথমত আপনি ইসলামের সংস্পর্শে এসেছেন, এটি আনন্দের সংবাদ। আল্লাহ তাআলা আপনাকে তাঁর দ্বীনের পথে অটল-অবিচল থাকার তাওফিক দান করুন। নতুন করে কোনো বিষয় শুরু করতে গেলে কোনো কোনো ক্ষেত্রে দ্বিধা তৈরি হওয়াটা স্বাভাবিক। এক্ষেত্রে সহজ, কার্যকরী ও স্থায়ী সমাধান হলো, স্থানীয় কোনো বিজ্ঞ পরহেজগার আলেমের সাথে পরামর্শ করে দ্বীনের পথে অগ্রসর হওয়া। শুধু অনলাইন-নির্ভরতা অনেক সময় আশানুরূপ কার্যকর প্রমাণিত নাও হতে পারে। আল্লাহ তাআলা তাওফিক দান করুন। আমিন।
দ্বিতীয়ত, আপনার প্রশ্নে বর্ণিত বিষয়ে বলব—
সাধারণ জিকিরে ধারাবাহিকতা ঠিক করা জরুরি নয়। ইস্তিগফার, দরুদ বা তাসবিহ-তাহলিল, যেটা আগে মনে আসে সেটাই আগে পড়ুন, আর তাতেই সওয়াব পাবেন। কুরআনে সাধারণভাবে বলা হয়েছে,
یٰۤاَیُّہَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوا اذۡکُرُوا اللّٰہَ ذِکۡرًا کَثِیۡرًا ۙ
অর্থঃ হে মুমিনগণ! আল্লাহকে স্মরণ কর অধিক পরিমাণে। সূরাঃ আল আহ্যাব - আয়াত নং : ৪১
এতে কোনো নির্দিষ্ট ক্রমের শর্ত নেই।
তবে হ্যাঁ, কিছু জায়গায় হাদিসে নির্দিষ্ট ধারাবাহিকতা এসেছে:
১. ফরজ নামাযের পর: প্রথমে তিনবার আস্তাগফিরুল্লাহ বলা, এরপর "আল্লাহুম্মা আনতাস সালাম..." (সহীহ মুসলিম, হাদিস ৫৯১)। এরপর ৩৩ বার সুবহানাল্লাহ, ৩৩ বার আলহামদুলিল্লাহ, ৩৪ বার আল্লাহু আকবার (সহীহ বুখারী ৮৪৩, সহীহ মুসলিম ৫৯৫)। এরপর একবার "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারীকা লাহু..." (সহীহ মুসলিম ৫৯৭)।
হাদিস : ০১
حَدَّثَنَا دَاوُدُ بْنُ رُشَيْدٍ، حَدَّثَنَا الْوَلِيدُ، عَنِ الأَوْزَاعِيِّ، عَنْ أَبِي عَمَّارٍ، - اسْمُهُ شَدَّادُ بْنُ عَبْدِ اللَّهِ - عَنْ أَبِي أَسْمَاءَ، عَنْ ثَوْبَانَ، قَالَ كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم إِذَا انْصَرَفَ مِنْ صَلاَتِهِ اسْتَغْفَرَ ثَلاَثًا وَقَالَ " اللَّهُمَّ أَنْتَ السَّلاَمُ وَمِنْكَ السَّلاَمُ تَبَارَكْتَ ذَا الْجَلاَلِ وَالإِكْرَامِ " . قَالَ الْوَلِيدُ فَقُلْتُ لِلأَوْزَاعِيِّ كَيْفَ الاِسْتِغْفَارُ قَالَ تَقُولُ أَسْتَغْفِرُ اللَّهَ أَسْتَغْفِرُ اللَّهَ .
১২১২। দাউদ ইবনে রাশীদ (রাহঃ) ......... সাওবান (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) যখন তার নামায শেষ করতেন, তখন তিনবার ইস্তিগফার- করতেন এবং বলতেনঃ
اللَّهُمَّ أَنْتَ السَّلاَمُ وَمِنْكَ السَّلاَمُ تَبَارَكْتَ ذَا الْجَلاَلِ وَالإِكْرَامِ
“হে আল্লাহ! আপনি শান্তিময় এবং আপনার থেকেই শান্তি। আপনি বরকতময় হে মহিমান্বিত ও সষ্মানিত’”।
ওয়ালীদ বলেন, আমি আওযাঈকে জিজ্ঞাসা করলাম, 'ইস্তিগফার' কিরূপ? তিনি বললেন, আসতাগফিরুল্লাহ,আসতাগফিরুল্লাহ বলবে। সহীহ মুসলিম, হাদীস নংঃ ১২১২, আন্তর্জাতিক নং: ৫৯১
হাদিস : ০২
حَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ أَبِي بَكْرٍ، قَالَ: حَدَّثَنَا مُعْتَمِرٌ، عَنْ عُبَيْدِ اللَّهِ، عَنْ سُمَيٍّ، عَنْ أَبِي صَالِحٍ، عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ، قَالَ: جَاءَ الفُقَرَاءُ إِلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَقَالُوا: ذَهَبَ أَهْلُ الدُّثُورِ مِنَ الأَمْوَالِ بِالدَّرَجَاتِ العُلاَ، وَالنَّعِيمِ المُقِيمِ يُصَلُّونَ كَمَا نُصَلِّي، وَيَصُومُونَ كَمَا نَصُومُ، وَلَهُمْ فَضْلٌ مِنْ أَمْوَالٍ يَحُجُّونَ بِهَا، وَيَعْتَمِرُونَ، وَيُجَاهِدُونَ، وَيَتَصَدَّقُونَ، قَالَ: «أَلاَ أُحَدِّثُكُمْ إِنْ أَخَذْتُمْ أَدْرَكْتُمْ مَنْ سَبَقَكُمْ وَلَمْ يُدْرِكْكُمْ أَحَدٌ بَعْدَكُمْ، وَكُنْتُمْ خَيْرَ مَنْ أَنْتُمْ بَيْنَ ظَهْرَانَيْهِ إِلَّا مَنْ عَمِلَ مِثْلَهُ تُسَبِّحُونَ وَتَحْمَدُونَ وَتُكَبِّرُونَ خَلْفَ كُلِّ صَلاَةٍ ثَلاَثًا وَثَلاَثِينَ» ، فَاخْتَلَفْنَا بَيْنَنَا، فَقَالَ بَعْضُنَا: نُسَبِّحُ ثَلاَثًا وَثَلاَثِينَ، وَنَحْمَدُ ثَلاَثًا وَثَلاَثِينَ، وَنُكَبِّرُ أَرْبَعًا وَثَلاَثِينَ، فَرَجَعْتُ إِلَيْهِ، فَقَالَ: تَقُولُ: «سُبْحَانَ اللَّهِ، وَالحَمْدُ لِلَّهِ، وَاللَّهُ أَكْبَرُ، حَتَّى يَكُونَ مِنْهُنَّ كُلِّهِنَّ ثَلاَثًا وَثَلاَثِينَ»
৮০৩। মুহাম্মাদ ইবনে আবু বকর (রাহঃ) ......... আবু হুরায়রা (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, দরিদ্রলোক নবী (ﷺ) এর কাছে এসে বললেন, সম্পদশালী ও ধনী ব্যক্তিরা তাদের সম্পদের দ্বারা উচ্চ মর্যাদা ও স্থায়ী আবাস লাভ করছেন, তারা আমাদের মত নামায আদায় করছেন, আমাদের মত রোযা পালন করছেন এবং অর্থের দ্বারা হজ্জ, উমরা, জিহাদ ও সাদ্কা করার মর্যাদাও লাভ করছেন। এ শুনে তিনি বললেন, আমি কি তোমাদের এমন কিছু কাজের কথা বলব, যা তোমরা করলে, যারা নেক কাজে তোমাদের চাইতে অগ্রগামী হয়ে গিয়েছে, তাদের সমপর্যায়ে পৌছাতে পারবে। তবে যারা পুনরায় এ ধরনের কাজ করবে তাদের কথা স্বতন্ত্র। তোমরা প্রত্যেক নামাযের পর তেত্রিশ বার করে তাসবীহ (সুবহানাল্লাহ), তাহমীদ (আলহামদুলিল্লাহ) এবং তাকবীর (আল্লাহু আকবার) পাঠ করবে। (এ বিষয়টি নিয়ে) আমাদের মধ্যে মতানৈক্য সৃষ্টি হল। কেউ বলল, আমরা তেত্রিশ বার তাসবীহ পড়ব, তেত্রিশ বার তাহমীদ আর চৌত্রিশ বার তাকবীর পড়ব। এরপর আমি তাঁর কাছে ফিরে গেলাম। তিনি বললেন, سُبْحَانَ اللَّهِ، وَالْحَمْدُ لِلَّهِ، وَاللَّهُ أَكْبَرُ বলবে, যাতে সবগুলোই তেত্রিশ বার করে হয়ে যায়।
সহীহ বুখারী, হাদীস নংঃ ৮০৩, আন্তর্জাতিক নং: ৮৪৩
হাদিস : ০৩
حَدَّثَنِي عَبْدُ الْحَمِيدِ بْنُ بَيَانٍ الْوَاسِطِيُّ، أَخْبَرَنَا خَالِدُ بْنُ عَبْدِ اللَّهِ، عَنْ سُهَيْلٍ، عَنْ أَبِي عُبَيْدٍ الْمَذْحِجِيِّ، - قَالَ مُسْلِمٌ أَبُو عُبَيْدٍ مَوْلَى سُلَيْمَانَ بْنِ عَبْدِ الْمَلِكِ - عَنْ عَطَاءِ بْنِ يَزِيدَ اللَّيْثِيِّ، عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، عَنْ رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم " مَنْ سَبَّحَ اللَّهَ فِي دُبُرِ كُلِّ صَلاَةٍ ثَلاَثًا وَثَلاَثِينَ وَحَمِدَ اللَّهَ ثَلاَثًا وَثَلاَثِينَ وَكَبَّرَ اللَّهَ ثَلاَثًا وَثَلاَثِينَ فَتِلْكَ تِسْعَةٌ وَتِسْعُونَ وَقَالَ تَمَامَ الْمِائَةِ لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ وَحْدَهُ لاَ شَرِيكَ لَهُ لَهُ الْمُلْكُ وَلَهُ الْحَمْدُ وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَىْءٍ قَدِيرٌ غُفِرَتْ خَطَايَاهُ وَإِنْ كَانَتْ مِثْلَ زَبَدِ الْبَحْرِ " .
১২৩০। আব্দুল হামীদ ইবনে বায়ান আল ওয়াসিতী (রাহঃ) ......... আবু হুরায়রা (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলূল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, যে ব্যক্তি প্রত্যেক নামাযের পর সুবহানাল্লাহ তেত্রিশবার, আলহামদুলিল্লাহ তেত্রিশবার ও আল্লাহু আকবার তেত্রিশবার বলবে এই হল নিরানব্বই-আর একশত পূর্ণ করার জন্য বলবেঃ
لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ وَحْدَهُ لاَ شَرِيكَ لَهُ لَهُ الْمُلْكُ وَلَهُ الْحَمْدُ وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَىْءٍ قَدِيرٌ
তার পাপ সমুহ মাফ হয়ে যাবে, যদিও তা সমুদ্রের ফেনার মত হয়।
সহীহ মুসলিম, হাদীস নংঃ ১২৩০, আন্তর্জাতিক নং: ৫৯৭-১
২. দোয়ার আগে: আল্লাহর প্রশংসা করা, এরপর নবী ﷺ-এর ওপর দরুদ পাঠ করা, তারপর নিজের দোয়া করা। (তিরমিযী ৩৪৭৭, আবূ দাউদ ১৪৮১)
হাদিস :
حَدَّثَنَا مَحْمُودُ بْنُ غَيْلاَنَ، حَدَّثَنَا عَبْدُ اللَّهِ بْنُ يَزِيدَ الْمُقْرِئُ، حَدَّثَنَا حَيْوَةُ بْنُ شُرَيْحٍ، حَدَّثَنِي أَبُو هَانِئٍ الْخَوْلاَنِيُّ، أَنَّ عَمْرَو بْنَ مَالِكٍ الْجَنْبِيَّ، أَخْبَرَهُ أَنَّهُ، سَمِعَ فَضَالَةَ بْنَ عُبَيْدٍ، يَقُولُ سَمِعَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم رَجُلاً يَدْعُو فِي صَلاَتِهِ فَلَمْ يُصَلِّ عَلَى النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم فَقَالَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم " عَجِلَ هَذَا " . ثُمَّ دَعَاهُ فَقَالَ لَهُ أَوْ لِغَيْرِهِ " إِذَا صَلَّى أَحَدُكُمْ فَلْيَبْدَأْ بِتَحْمِيدِ اللَّهِ وَالثَّنَاءِ عَلَيْهِ ثُمَّ لِيُصَلِّ عَلَى النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم ثُمَّ لِيَدْعُ بَعْدُ بِمَا شَاءَ " . قَالَ أَبُو عِيسَى هَذَا حَدِيثٌ حَسَنٌ صَحِيحٌ .
৩৪৭৭. মাহমুদ ইবনে গায়লান (রাহঃ) ..... ফাযালা ইবনে উবাইদ (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এক ব্যক্তি কে নামাযে দুআ করতে শুনতে পেলেন। কিন্তু সে নবী (ﷺ) এর উপর দরুদ পাঠ করে নি। তিনি তখন বললেনঃ এতো বড় তাড়াহুড়া করে ফেললে। এরপর তিনি তাকে ডাকলেন। তাকে বা অন্যকে লক্ষ্য করে বললেনঃ তোমাদের কেউ যখন নামায আদায় করবে তখন যেন সে (দুআর পূর্বে) শুরুতে আল্লাহর হামদ ও সানা সিফাত বর্ণরা করে পরে নবী (ﷺ) এর উপর দরুদ পাঠ করে এরপর যেন সে তার যা চায় সে দুআ করবে।
জামে' তিরমিযী, হাদীস নংঃ ৩৪৭৭, আন্তর্জাতিক নং: ৩৪৭৭
এই সব জায়গার বাইরে, অর্থাৎ যেকোনো সময় নিজের মতো যিকির করলে ক্রমের কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। যখন ভালো লাগে দরুদ পড়ুন। বিশেষত শুক্রবারে দরুদ পড়ার আলাদা গুরুত্ব এসেছে হাদিসে, সেদিন বেশি মাত্রায় দরুদ পড়ুন। অন্য কোনো সময় ইস্তেগফার করুন। একইভাবে অন্যান্য তাসবিহ তাহলিলের বিষয়েও একই কথা। বিশেষ কোনো অবস্থা বা ক্ষেত্রে বিশেষ দুআ পড়া যেতে পারে। এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে আমাদের দুআ সেকশন ফলো করতে পারেন।
আপনার আরেকটি কথা লক্ষ্যণীয়: "পরে কেন জানি কোনোটাই হয় না।" এটি সম্ভবত ওয়াসওয়াসা, অর্থাৎ শয়তানের কুমন্ত্রণা বা অতিরিক্ত সতর্কতার চাপ, যা ইবাদত থেকে দূরে সরিয়ে দিতে চায়। এই দ্বিধা নিয়ে ভাবনায় ডুবে যাবেন না। "আউযুবিল্লাহ" পড়ে সঙ্গে সঙ্গে যেকোনো একটি দিয়ে শুরু করে দিন
একটি সহজ নিয়ম যা আপনি শুরু করতে পারেন:
- ফরয নামাযের পর উপরের তাসবীহগুলো পড়ুন।
- সকাল বা রাতে যেকোনো ক্রমে ১০০ বার ইস্তিগফার, ১০০ বার তাসবীহ, ১০০ বার দরুদ, অথবা যতটা সহজ ততটা।
- সংখ্যা কম রাখুন, কিন্তু নিয়মিত রাখুন।
আল্লাহ তাআলা তাওফিক দান করুন।
والله اعلم بالصواب
উত্তর দাতা:
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, মদিনা মুনাওয়ারা ৷
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন