নির্যাতিত মুসলিমদের প্রতি আমাদের দায়িত্ব কী?
প্রশ্নঃ ১৬১১৯৮. আসসালামুআলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ, আজ ফিলিস্তিন, উইঘুর, ভারতের মুসলিমরা নির্যাতিত-নিপিড়ীত, আজ মুসলিম উম্মাহ নিশ্চুপ। ফিলিস্তিনের জন্য না আরবরা কিছু করছে, না চীনকে কেউ কিছু বলছে। এ করুন অবস্থার জন্য আরব শাসকদের দায়ভার কতটুকু? আধুনিক যুগে মুসলিম উম্মাহর করুন অবস্থায় আবু বকর, ওমর ফারুক ও খালিদ (র) থাকলে কি করতেন? আর আমাদের কি করা উচিত?
১৪ জুলাই, ২০২৬
আনোয়ারা
উত্তর
و علَيْــــــــــــــــــــكُم السلام ورحمة الله وبركاته
بسم الله الرحمن الرحيم
প্রিয় প্রশ্নকারী দ্বীনি ভাই!
বর্তমান সময়ে ফিলিস্তিন, পূর্ব তুর্কিস্তান (উইঘুর), ভারতের কিছু অঞ্চলে এবং বিশ্বের আরও বিভিন্ন স্থানে মুসলিমদের ওপর নির্যাতন ও নিপীড়নের খবর মুসলিমদের হৃদয়কে ব্যথিত করে। একজন মুসলিম হিসেবে এসব ঘটনায় কষ্ট পাওয়া, তাদের জন্য দুআ করা এবং বৈধ উপায়ে তাদের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করা ঈমানের দাবির অন্তর্ভুক্ত। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, “মুমিনগণ পারস্পরিক ভালোবাসা, দয়া ও সহমর্মিতায় একটি দেহের ন্যায়। দেহের একটি অঙ্গ অসুস্থ হলে সমগ্র দেহ জেগে থাকে এবং জ্বরে আক্রান্ত হয়।” (সহীহ বুখারী, হাদিস: ৬০১১; সহীহ মুসলিম, হাদিস: ২৫৮৬)
আরব শাসক বা অন্য কোনো মুসলিম দেশের শাসকদের দায়িত্বের প্রশ্নে ইসলামের মূলনীতি হলো, শাসকের ওপর তার সামর্থ্য, দায়িত্ব এবং প্রাপ্ত বাস্তব পরিস্থিতি অনুযায়ী মুসলিমদের স্বার্থ রক্ষা, জুলুম প্রতিরোধ এবং ন্যায় প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা আবশ্যক। আল্লাহ তাআলা বলেন, “নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের নির্দেশ দেন, তোমরা আমানত যথাযথভাবে তার হকদারদের কাছে পৌঁছে দাও এবং যখন মানুষের মধ্যে বিচার করো, তখন ন্যায়বিচারের সঙ্গে বিচার করো।” (সূরা আন-নিসা, ৪:৫৮) রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, “তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেককেই তার অধীনস্থদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।” (সহীহ বুখারী, হাদিস: ৮৯৩; সহীহ মুসলিম, হাদিস: ১৮২৯)
তবে কোনো নির্দিষ্ট রাষ্ট্র বা শাসক কতটুকু দায়ী, তারা কী করতে পারতেন বা পারেননি, এসব বিষয়ে নিশ্চিত ফয়সালা দেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক, সামরিক ও কূটনৈতিক বাস্তবতা সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ তথ্য জানা প্রয়োজন। তাই সব দোষ এককভাবে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর ওপর চাপিয়ে দেওয়া ন্যায়সঙ্গত নয়। তবে এটুকু বলা যায়, মুসলিম উম্মাহর ঐক্য, পারস্পরিক সহযোগিতা, ন্যায়ভিত্তিক নেতৃত্ব এবং আল্লাহর দ্বীনের প্রতি সামগ্রিক দুর্বলতা আজকের সংকটকে আরও গভীর করেছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, “তোমরা সবাই আল্লাহর রজ্জুকে দৃঢ়ভাবে ধারণ করো এবং পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না।” (সূরা আলে ইমরান, ৩:১০৩) অন্যত্র তিনি বলেন, “আল্লাহ কোনো জাতির অবস্থা পরিবর্তন করেন না, যতক্ষণ না তারা নিজেদের অবস্থা পরিবর্তন করে।” (সূরা আর-রা'দ, ১৩:১১)
হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রাযিয়াল্লাহু আনহু), হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব (রাযিয়াল্লাহু আনহু) এবং হযরত খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ (রাযিয়াল্লাহু আনহু) যদি আজ জীবিত থাকতেন—তাঁরা কী করতেন, সে বিষয়ে নিশ্চিতভাবে কিছু বলা সম্ভব নয়। কারণ এটি গায়েব-সংক্রান্ত অনুমান। তবে তাঁদের জীবন থেকে আমরা স্পষ্টভাবে শিখি যে, তাঁরা আল্লাহর ওপর পূর্ণ তাওয়াক্কুল করতেন, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় আপসহীন ছিলেন, মুসলিমদের ঐক্যকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতেন, শূরার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতেন এবং প্রয়োজনীয় সব বৈধ উপায় অবলম্বন করতেন। আবু বকর (রা.) রিদ্দার ফিতনার সময় উম্মাহর ঐক্য রক্ষা করেছেন, উমর (রা.) ন্যায়বিচারের আদর্শ প্রতিষ্ঠা করেছেন এবং খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ (রা.) অসাধারণ সাহস, দক্ষতা ও কৌশলের মাধ্যমে মুসলিমদের নেতৃত্ব দিয়েছেন। তাই তাঁদের জীবন থেকে শিক্ষা নেওয়াই আমাদের করণীয়, তাঁদের নামে নিশ্চিত কোনো বক্তব্য আরোপ করা নয়।
আমাদের করণীয় হলো, প্রথমে নিজেদের ঈমান, আকীদা ও আমল সংশোধন করা। কারণ আল্লাহর সাহায্য তাঁর আনুগত্যের সঙ্গেই সম্পৃক্ত। পাশাপাশি নির্যাতিত মুসলিমদের জন্য আন্তরিকভাবে দুআ করা, সামর্থ্য অনুযায়ী বিশ্বস্ত ও নির্ভরযোগ্য মানবিক সংস্থার মাধ্যমে সাহায্য করা, মুসলিমদের মধ্যে ঐক্য, শিক্ষা, সচেতনতা ও ভ্রাতৃত্ব বৃদ্ধি করা এবং জুলুমের বিরুদ্ধে সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে শরিয়তসম্মত ও শান্তিপূর্ণ উপায়ে অবস্থান নেওয়া। আল্লাহ তাআলা বলেন, “সৎকর্ম ও তাকওয়ার কাজে একে অপরকে সহযোগিতা করো।” (সূরা আল-মায়িদা, ৫:২)
একই সঙ্গে হতাশ হওয়া কোনো মুমিনের বৈশিষ্ট্য নয়। আল্লাহ তাআলা বলেন, “হে মুমিনগণ! তোমরা ধৈর্য ধারণ করো, ধৈর্যে অটল থাকো, সদা প্রস্তুত থাকো এবং আল্লাহকে ভয় করো, যাতে তোমরা সফল হতে পারো।” (সূরা আলে ইমরান, ৩:২০০) তিনি আরও বলেন, “তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না।” (সূরা আয-যুমার, ৩৯:৫৩) তাই আবেগ, হতাশা বা বিভক্তির পরিবর্তে ঈমান, ইলম, আমল, ঐক্য, দুআ এবং হিকমতের সঙ্গে বৈধ প্রচেষ্টাই মুসলিম উম্মাহর পুনর্জাগরণের প্রকৃত পথ।
والله اعلم بالصواب
উত্তর দাতা:
শাহাদাত হুসাইন ফরায়েজী
মুফতী, ফাতাওয়া বিভাগ, মুসলিম বাংলা
লেখক ও গবেষক, হাদীস বিভাগ, মুসলিম বাংলা
খতীব, রৌশন আলী মুন্সীবাড়ী জামে মসজিদ, ফেনী
মুফতী, ফাতাওয়া বিভাগ, মুসলিম বাংলা
লেখক ও গবেষক, হাদীস বিভাগ, মুসলিম বাংলা
খতীব, রৌশন আলী মুন্সীবাড়ী জামে মসজিদ, ফেনী
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন
এ সম্পর্কিত আরও জিজ্ঞাসা/প্রশ্ন-উত্তর
মাসায়েল-এর বিষয়াদি
আল কুরআনুল কারীম
৪
হাদীস ও সুন্নাহ
৬
তাসাউফ-আত্মশুদ্ধি । ইসলাহী পরামর্শ
৩
শরীআত সম্পর্কিত
১৫
ফিতনাসমুহ; বিবরণ - করণীয়
২
আখিরাত - মৃত্যুর পরে
৩
ঈমান বিধ্বংসী কথা ও কাজ
৬
ফিরাকে বাতিলা - ভ্রান্ত দল ও মত
২
পবিত্রতা অর্জন
৮
নামাযের অধ্যায়
১৯
যাকাত - সদাকাহ
৫
রোযার অধ্যায়
৬
হজ্ব - ওমরাহ
২
কাফন দাফন - জানাযা
৫
কসম - মান্নত
১
কুরবানী - যবেহ - আকীকা
৪
বিবাহ শাদী
৮
মীরাছ-উত্তরাধিকার
২
লেনদেন - ব্যবসা - চাকুরী
৯
আধুনিক মাসায়েল
৬
দন্ড বিধি
২
দাওয়াত ও জিহাদ
৩
ইতিহাস ও ঐতিহ্য
৬
সীরাতুন নবী সাঃ । নবীজীর জীবনচরিত
৩
সাহাবা ও তাবেঈন
৩
ফাযায়েল ও মানাকেব
৩
কিতাব - পত্রিকা ও লেখক
৩
পরিবার - সামাজিকতা
৭
মহিলা অঙ্গন
২
আখলাক-চরিত্র
২
আদব- শিষ্টাচার
১২
রোগ-ব্যধি। চিকিৎসা
২
দোয়া - জিকির
২
নাম। শব্দ জ্ঞান
৩
নির্বাচিত
২
সাম্প্রতিক
১
বিবিধ মাসআলা
১