জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনে অংশ গ্রহণ করা যাবে?
প্রশ্নঃ ১২৯৮৩২. আসসালামুআলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ, শান্তিরক্ষা মিশনে যাওয়া কি জায়েয?
উত্তর
و علَيْــــــــــــــــــــكُم السلام ورحمة الله وبركاته
بسم الله الرحمن الرحيم
প্রিয় প্রশ্নকারী দ্বীনি ভাই!
শান্তিরক্ষা মিশনে অংশগ্রহণ জায়েয তখনই হবে, যখন এর উদ্দেশ্য হবে জুলুম প্রতিরোধ, নিরপরাধ মানুষের জীবন ও সম্পদ রক্ষা এবং ন্যায় প্রতিষ্ঠা। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَتَعَاوَنُوۡا عَلَی الۡبِرِّ وَالتَّقۡوٰی ۪ وَلَا تَعَاوَنُوۡا عَلَی الۡاِثۡمِ وَالۡعُدۡوَانِ ۪ وَاتَّقُوا اللّٰہَ ؕ اِنَّ اللّٰہَ شَدِیۡدُ الۡعِقَابِ
“তোমরা নেকী ও তাকওয়ার কাজে একে অপরকে সহযোগিতা কর” (সূরা মায়িদা: ২)
অন্য আয়াতে বলেন,
فَاِنۡ فَآءَتۡ فَاَصۡلِحُوۡا بَیۡنَہُمَا بِالۡعَدۡلِ وَاَقۡسِطُوۡا ؕ اِنَّ اللّٰہَ یُحِبُّ الۡمُقۡسِطِیۡنَ
“যদি মুমিনদের দুই দল পরস্পর লড়াইয়ে লিপ্ত হয়, তবে তোমরা তাদের মধ্যে মীমাংসা করে দাও।” (সূরা হুজুরাত: ৯)
এসব আয়াত থেকে বোঝা যায়, শান্তি প্রতিষ্ঠা ও সংঘাত নিরসন একটি প্রশংসনীয় ও শরিয়তসম্মত কাজ। উপরন্তু, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: وَاللَّهُ فِي عَوْنِ الْعَبْدِ مَا كَانَ الْعَبْدُ فِي عَوْنِ أَخِيهِ
“আল্লাহ বান্দার সাহায্যে থাকেন, যতক্ষণ বান্দা তার ভাইয়ের সাহায্যে থাকে।” (সহীহ মুসলিম, আন্তর্জাতিক নং: ২৬৯৯-১)
হাদীসের ব্যাখ্যা:
মুমিন ব্যক্তির কষ্ট নিরসন করার ফযীলত
বলা হয়েছে- من نفس عن مؤمن كربة (যে ব্যক্তি কোনও মুমিনের একটি কষ্ট দূর করে দেয়)। نفس শব্দটির উৎপত্তি تنفيس থেকে। এর অর্থ অপসারণ করা, শিথিল করা, ফাঁক করা ইত্যাদি। تنفيس -এর উৎপত্তি نفس থেকে, যার অর্থ নিঃশ্বাস, দম ও প্রাণ। বলা হয়, نفس الخناق (গলার বাঁধন শিথিল করল), যাতে নিঃশ্বাস গ্রহণ করতে পারে।
كربة অর্থ এমন দুঃখ-কষ্ট, যা মানুষের হৃদয়মন আচ্ছন্ন করে এবং তাকে এমনভাবে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত করে, যদ্দরুন নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসে। এককথায় শ্বাসরুদ্ধকর কষ্ট।
হাদীছে বোঝানো হচ্ছে, কোনও কোনও দুঃখ-কষ্ট এমন তীব্র হয়ে থাকে, যদ্দরুন মানুষের দম বন্ধ হয়ে আসে। তার সে কষ্ট লাঘব করার দ্বারা যেন গলার বাঁধন শিথিল করা হয়। ফলে সে স্বচ্ছন্দে নিঃশ্বাস গ্রহণ করতে পারে। তো কারও এরকম দম বন্ধ করা দুঃখ-কষ্ট যে ব্যক্তি লাঘব করে দেয়, আল্লাহ তাআলা তার প্রতি এমন খুশি হন যে, তিনি কিয়ামতের দিন তার একটি শ্বাসরুদ্ধকর কষ্ট দূর করে দেবেন। এ হাদীছে জানানো হয়েছে- نفس الله عنه كربة من كرب يوم القيامة (আল্লাহ তার কিয়ামত দিবসের কষ্টসমূহ হতে একটি কষ্ট দূর করে দেবেন)। এর দ্বারা অন্যের কষ্ট লাঘব করা-যে কত বড় ফযীলতের কাজ তা অনুমান করা যায়। কেননা আখেরাতের কষ্টের তুলনায় দুনিয়ার কষ্ট উল্লেখযোগ্য কিছুই নয়। মান ও পরিমাণ উভয়দিক থেকেই তা তুচ্ছ। আখেরাতের তুলনায় তার স্থায়িত্বও অনেক কম। বড়জোর মৃত্যু পর্যন্ত। তো কারও এই ক্ষণস্থায়ী জীবনের এমন কষ্ট, যা কোনও দিক থেকেই আখেরাতের কষ্টের সঙ্গে তুলনীয় নয়, তা দূর করার দ্বারা পরকালীন দুর্বিষহ কোনও কষ্ট থেকে যদি মুক্তি পাওয়া যায়, তবে তা কত বড়ই না প্রাপ্তি।
আখেরাতের এ অতুলনীয় পুরস্কার অর্জন করাও বিশেষ কঠিন কিছু নয়। দুনিয়ার তুচ্ছ সম্পদের খানিকটা ব্যয় করেই এটা হাসিল হতে পারে। এমনিভাবে তা অর্জন হতে পারে নিজ ক্ষমতার বৈধ ব্যবহার, প্রভাব-প্রতিপত্তি প্রয়োগ, সুপরামর্শ দান, কিছুটা শারীরিক শ্রম ব্যয়, নিজে সরাসরি বা লোকমারফত সুপারিশ করা, একটা চিঠি লিখে দেওয়া কিংবা ফোনে একটা কথা বলার দ্বারাও। অন্ততপক্ষে আল্লাহ তাআলার কাছে দুআও তো করা যেতে পারে যে, হে আল্লাহ, তুমি অমুকের কষ্ট দূর করে দাও। এসবই আল্লাহ তাআলার কাছ থেকে সে মহান পুরস্কার লাভের এক কার্যকর উপায়। বিভীষিকাময় কিয়ামতের ঘোর কষ্ট থেকে নিরাপত্তা লাভের আশায় আমরা কি এ উপায় অবলম্বন করব না?
সুতরাং দুনিয়ায় কারও একটি বিপদ দূর করার দ্বারা যদি আখেরাতের একটি বিপদ দূরীভূত হয়, তবে সে প্রাপ্তি অনেক বড়। প্রত্যেক মুমিনের এটা কাম্যও বটে।
আল্লাহর বান্দাদের সাহায্য-সহযোগিতা করে যাওয়া
এ হাদীছে বর্ণিত চতুর্থ ফযীলতপূর্ণ আমল হল আল্লাহর বান্দাদের সাহায্য সহযোগিতা করে যাওয়া। হাদীছে এ আমলটিকে সাধারণভাবে ব্যক্ত করা হয়েছে, বিশেষ কোনও ক্ষেত্রের সাহায্যের কথা বলা হয়নি। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন- والله فى عون العبد ما كان العبد في عون أخيه (বান্দা যতক্ষণ তার ভাইয়ের সাহায্যে লেগে থাকে, আল্লাহ ততক্ষণ তার সাহায্য করতে থাকেন)। মানুষের সাহায্য প্রয়োজন হয় যেমন দীনী বিষয়ে, তেমনি প্রয়োজন হয় দুনিয়াবী বিষয়েও।মানুষের কখনও অর্থ-সাহায্যের প্রয়োজন হয়, কখনও অন্ন, বস্ত্র বা বাসস্থানের ব্যবস্থা করে দেওয়ার প্রয়োজন হয়, কখনও দরকার পড়ে চিকিৎসা-সহযোগিতার, কখনও বিপদাপদ থেকে উদ্ধারের। বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, অগ্নিকাণ্ড প্রভৃতি দুর্যোগে উদ্ধার সহযোগিতা ও ত্রাণ বিতরণের প্রয়োজন হয়। দুস্থ, প্রতিবন্ধী, বেকার এবং এ জাতীয় অন্যান্য অসহায় লোকদের প্রয়োজন কর্মসংস্থানসহ নানামুখী সহযোগিতা। আসলে দুনিয়ায় মানুষের প্রয়োজন বিচিত্র ও বহুমুখী। একেকজনের একেকরকম ঠ্যাকা। এর তালিকা অনেক দীর্ঘ। জীবনচলার ক্ষেত্রে যার যা প্রয়োজন তা পূরণ করার সামর্থ্য যার আছে তার উচিত আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টিলাভের উদ্দেশ্যে সে প্রয়োজন পূরণে নিজের সে সামর্থ্য ব্যয় করা। যে ব্যক্তি তা করবে এবং যতদিন করবে, ততদিন সে আল্লাহর পক্ষ হতেও সাহায্য পেতে থাকবে, যেমনটা এ হাদীছে বলা হয়েছে।
কারও প্রয়োজন দীনী বিষয়ে সাহায্যের। আমলোকের দরকার বিভিন্ন দীনী বিষয়ে নির্দেশনার। যে ব্যক্তি কুরআন পড়তে জানে না তাকে কুরআনপাঠ শেখানো, যে ব্যক্তি ওযূ-গোসল, নামায-রোয়া প্রভৃতি দীনী জরুরি মাসাইল জানে না তাকে এসব বিষয়ক মাসাইল শেখানো, যার আকীদা-বিশ্বাস দুরস্ত নয় তাকে বিশুদ্ধ আকীদা-বিশ্বাস শেখানো, যে ব্যক্তি হালাল-হারামের পার্থক্য সম্পর্কে খবর রাখে না তাকে এ সম্পর্কে অবহিত করা ইত্যাদি সবই দীনী সাহায্যের অন্তর্ভুক্ত। অনেক সময় মানুষ এমন জটিল মাসআলার সম্মুখীন হয়ে পড়ে, যার সমাধান ছাড়া তার পার্থিব জীবন অচল হয়ে যায়, সে ক্ষেত্রে সঠিক সমাধানদান যেমন দীনী সাহায্য, তেমনি তা দুনিয়াবী সাহায্যও বটে।
মানুষের সাহায্য করা যায় মনের শুভেচ্ছা ও নেক দুআ দ্বারা, সাহায্য করা যায় শারীরিক সক্ষমতা দ্বারা, সাহায্য করা যায় বিদ্যা-বুদ্ধি দ্বারা এবং সাহায্য করা যায় অর্থব্যয় দ্বারাও। আবার অনেক সময় পদমর্যাদা, প্রভাব-প্রতিপত্তি ইত্যাদির বৈধ ব্যবহার দ্বারাও মানুষের অনেক বড় সাহায্য করা যায়। সুপরামর্শ ও সুপারিশও সাহায্যের এক বড় উপায়। মোটকথা যার পক্ষে যেভাবে কারও সাহায্য করা সম্ভব, তার উচিত সেভাবেই তার প্রতি সাহায্যের হাত বাড়ানো। এটা নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নত। দুনিয়া ও আখেরাতে আল্লাহ তাআলার সাহায্য লাভার্থে তিনি আমাদেরকে বিভিন্নভাবে এর প্রতি উৎসাহিত করেছেন। তিনি নিজে তো জীবনভরই এ কাজে আন্তরিক থেকেছেন।
নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এ বিষয়ক ঘটনা আছে বহু। একটা ঘটনা উল্লেখ করা যাচ্ছে।
একটি ঘটনা
হিজরতের আগের কথা। একদিন নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মসজিদে বসা । তাঁর সঙ্গে কয়েকজন সাহাবীও আছেন। এ অবস্থায় 'যুবায়দ' গোত্রীয় এক ব্যক্তি এগিয়ে আসল। সে বলছিল, 'হে কুরায়শ সম্প্রদায়! কিভাবে তোমাদের কাছে পণ্য নিয়ে আসা হবে? কিভাবে কোনও ব্যবসায়ী তোমাদের আঙিনায় আসবে? কেউ তোমাদের এলাকায় আসলে তোমরা তাদের প্রতি জুলুম কর'। সে এসব কথা বলছিল আর লোকজনের একেক জটলার সামনে দাঁড়াচ্ছিল। পরিশেষে সে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মজলিসে পৌছল। তিনি তাকে জিজ্ঞেস করলেন, কে তোমার প্রতি জুলুম করেছে?
সে জানাল যে, সে তার শ্রেষ্ঠ তিনটি উট নিয়ে এখানে এসেছিল। কিন্তু আবূ জাহল দাম-দর করতে গিয়ে উটগুলোর দাম বলল তার প্রকৃত মূল্যের মাত্র তিনভাগের এক ভাগ। আবূ জাহল এ দাম বলার কারণে আর কেউ তার উপর দিয়ে দাম বলল না। তারপর সে বলল, আবূ জাহল আমার পণ্য অচল করে দিয়েছে। সে এভাবে আমার উপর জুলুম করেছে।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমার উটগুলো কোথায়?
সে জায়গার নাম বলল।
তিনি উঠে সেখানে গেলেন। সঙ্গে সাহাবীগণও। তিনি দেখলেন, খুবই উঁচু মানের উট। তারপর তিনি যুবায়দী লোকটিকে সেটির দাম বললেন। একপর্যায়ে তিনি তার কাঙ্ক্ষিত দামে উপনীত হলেন। লোকটি উপযুক্ত দাম পেয়ে তাঁর কাছে সেগুলো বিক্রি করে দিল। তিনি তা থেকে দুটি উট ওই দামেই বিক্রি করে দিলেন। একটি বিক্রি করলেন আরও বেশি দামে। তিনি সেটির মূল্য আব্দুল মুত্তালিবের আওলাদের মধ্যকার বিধবাদের মধ্যে বিতরণ করে দিলেন।
আবূ জাহল বাজারের এক প্রান্তে বসা ছিল। সে সবকিছু দেখছিল, কিন্তু কোনও কথা বলছিল না। শেষে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার কাছে এগিয়ে গেলেন। তিনি তাকে লক্ষ্য করে বললেন
হে আমর্ (এটা আবূ জাহলের আসল নাম)! সাবধান, এই বেদুঈনের সঙ্গে যা আচরণ করলে ভবিষ্যতে আর কারও সঙ্গে এমন করো না যেন। করলে কিন্তু আমার পক্ষ থেকে যে ব্যবহার পাবে তা তোমার প্রীতিকর বোধ হবে না।
উত্তরে আবূ জাহল বলছিল, হে মুহাম্মাদ! আর কখনও করব না। হে মুহাম্মাদ! আর কখনও করব না।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ফিরে আসলেন।
ওদিকে উমাইয়া ইবনে খালাফ এবং উপস্থিত অন্যান্য লোকজন অবাক বিস্ময়ে এ দৃশ্য লক্ষ করছিল। শেষে তারা আবূ জাহলকে লক্ষ্য করে বলল, আপনি আজ মুহাম্মাদের হাতে বড় অপদস্থ হলেন। তবে কি আপনি তার অনুসরণ করবেন বলে মনস্থ করেছেন? নাকি কোনও কারণে তাকে দেখে আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিলেন?
আবূ জাহল বলল, আমি জীবনেও তার অনুসরণ করব না। বাকি তোমরা যে দৃশ্য দেখেছ তার কারণ, আমার চোখ এমনকিছু দেখেছে যা তোমরা দেখনি। আমি দেখলাম, তার ডানে ও বামে বর্শাধারী কিছু লোক। তারা সেগুলো আমার দিকে তাক করে আছে। আমি তার অবাধ্য হলে সেই বর্শা দিয়ে তারা আমাকে গেঁথে ফেলত।
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ রিয়াযুস সালিহীন (অনুবাদ- মাওলানা আবুল বাশার মুহাম্মাদ সাইফুল ইসলাম হাফি.)
সুতরাং যদি মিশনের কার্যক্রম ন্যায়ভিত্তিক ও মানবিক সহায়তামূলক হয়, তবে তা সওয়াবের কাজও হতে পারে।
তবে শান্তিরক্ষা মিশন নাজায়েয হবে, যদি তাতে অন্যায় যুদ্ধ, নিরপরাধের ক্ষতি, মুসলিমদের বিরুদ্ধে জুলুম, বা শরিয়তবিরোধী কর্মকাণ্ডে বাধ্য হতে হয়। কারণ আল্লাহ বলেন:
وَلَا تَعَاوَنُوۡا عَلَی الۡاِثۡمِ وَالۡعُدۡوَانِ ۪ وَاتَّقُوا اللّٰہَ ؕ اِنَّ اللّٰہَ شَدِیۡدُ الۡعِقَابِ
“গুনাহ ও সীমালঙ্ঘনের কাজে সহযোগিতা করো না।” (সূরা মায়িদা: ২)
এবং রাসূলুল্লাহ ﷺ স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন:
عَنِ ابْنِ عُمَرَ، قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم " السَّمْعُ وَالطَّاعَةُ عَلَى الْمَرْءِ الْمُسْلِمِ فِيمَا أَحَبَّ وَكَرِهَ مَا لَمْ يُؤْمَرْ بِمَعْصِيَةٍ فَإِنْ أُمِرَ بِمَعْصِيَةٍ فَلاَ سَمْعَ عَلَيْهِ وَلاَ طَاعَةَ "
ইবনে উমর (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, প্রত্যক মুসলিম ব্যক্তির কর্তব্য হল পছন্দ হোক বা অপছন্দ সর্বাস্থায় আমীরের কথা শুনা ও মান্য করা যতক্ষণ পর্যন্ত না তাকে আল্লাহর নাফরমানীর নির্দেশ দেওয়া হয়। তবে তাকে নাফরমানীর নির্দেশ দেওয়া হলে তখন আর শোনা ও মান্য করা যাবে না।
আল জামিউল কাবীর- ইমাম তিরমিযী রহঃ, হাদীস নং: ১৭০৭
অর্থাৎ কোনো আদেশ যদি আল্লাহর নাফরমানির দিকে নিয়ে যায়, তবে তা মানা বৈধ নয়। তাই অংশগ্রহণের আগে কাজের প্রকৃতি, উদ্দেশ্য ও বাস্তব কার্যক্রম শরিয়তের মানদণ্ডে যাচাই করা আবশ্যক।
হাদীসের ব্যখ্যা:
إِلَّا أَنْ يُؤْمَر بِمَعْصِية (যতক্ষণ না পাপকর্মের আদেশ করা হয়)। অর্থাৎ যদি সরকার এমন কোনও কাজের হুকুম করে, যা শরী'আত অনুমোদন করে না, ফলে তাতে আল্লাহর অবাধ্যতা হয় এবং তা পাপকর্মরূপে গণ্য হয়, তবে আলাদা কথা। অর্থাৎ তা মানা যাবে না। যেমন কোনও নির্দোষ ব্যক্তিকে হত্যা করার হুকুম। রাষ্ট্রপ্রধান যদি তার আঞ্চলিক কোনও প্রতিনিধিকে, বিচারককে বা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে কিংবা সাধারণ কোনও নাগরিককে হুকুম করে যে, অমুককে হত্যা করো, অথচ সে হত্যার উপযুক্ত হওয়ার মতো কোনও অপরাধ করেনি, তবে রাষ্ট্রপ্রধানের এ হুকুম পালন করা কারও জন্যই জায়েয হবে না। এমনিভাবে সাজানো মামলা দেওয়া, নামায না পড়া, অন্যায়ভাবে মালক্রোক করা, মদপান করা, নাচ-গান করা এবং অনুরূপ যে-কোনও শরী'আতবিরোধী কাজের হুকুম করা হলে কারও জন্যই সে হুকুম পালন করা জায়েয নয়। হাদীছের পরবর্তী বাক্যে সুস্পষ্টভাবেই এটা বলে দেওয়া হয়েছে যে-
فَإِذَا أُمِرَ بِمَعْصِيَةٍ فَلَا سَمْعَ وَلَا طَاعَة (যখন কোনও পাপকর্মের আদেশ করা হবে, তখন কোনও শ্রবণ ও আনুগত্য নেই)। অর্থাৎ যে কাজ করলে আল্লাহ তা'আলার অবাধ্যতা হয়, সরকার যদি তা করার হুকুম দেয়, তবে তা শোনা ও মানা যাবে না। অর্থাৎ এরূপ ক্ষেত্রে তোমরা শাসকের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করবে না। কেননা যে কাজে আল্লাহর অবাধ্যতা হয়, তাতে শাসকের আনুগত্য করা জায়েয নয়। অপর এক হাদীছে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-
لَا طَاعَةَ لِمَخْلُوْقٍ فِي مَعْصِيَةِ الْخَالِقِ
‘সৃষ্টিকর্তার অবাধ্যতা হয় এমন কাজে কোনও মাখলুকের আনুগত্য নেই। (মুসান্নাফে ইবন আবী শায়বা: ৩৩৭১৭; মুসান্নাফে আব্দুর রাযযাক: ৩৭৮৮; মুসনাদে আহমাদ: ৩৮৮৯; মুসনাদুল বাযযার: ১৯৮৮; শারহুস সুন্নাহ: ২৪৫৫; তাবারানী, আল মু'জামুল কাবীর :৩৮১)
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ রিয়াযুস সালিহীন (অনুবাদ- মাওলানা আবুল বাশার মুহাম্মাদ সাইফুল ইসলাম হাফি.)
والله اعلم بالصواب
উত্তর দাতা:
মুফতী, ফাতাওয়া বিভাগ, মুসলিম বাংলা
লেখক ও গবেষক, হাদীস বিভাগ, মুসলিম বাংলা
খতীব, রৌশন আলী মুন্সীবাড়ী জামে মসজিদ, ফেনী
রেফারেন্স উত্তর :
প্রশ্নঃ ১০৩২১২. আসসালামুআলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ, জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে যাওয়া কি জায়েজ হবে? একজন সৈনিক হিসেবে যতদুর আমি জানি, যেসব দেশে মিশন হয় সেসব দেশের সম্পদ লুট করে নেয়া হয় গোপনে এবং আমরা এই রাহাজনির একপ্রকার পাহারাদার হিসেবে যাই। মোটা অংকের আর্থিক সুবিধা থাকায় কেউ মুখ খুলতে চায় না। জানাবেন দয়া করে।
উত্তর
و علَيْــــــــــــــــــــكُم السلام ورحمة الله وبركاته
بسم الله الرحمن الرحيم
কোন ব্যক্তি বা গোষ্ঠী সম্পর্কেও কোন হুকুম প্রয়োগ করতে হলে তাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে পূর্ণ অবগত হওয়া এবং তা সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া জরুরি। সুতরাং আপনি আপনার মাসআলাটি সম্পর্কে পূর্ণ অবগত হতে আপনার নিকটস্থ কোন আলেমের শরণাপন্ন হোন , পূর্ণ বিষয়গুলো তাকে অবগত করুন। যিনি বর্তমান সমসাময়িক অবস্থা সম্পর্কে পূর্ণ সচেতন। এমন ব্যক্তি থেকে সরাসরি আপনার প্রশ্নের উত্তর জেনে নিন।
والله اعلم بالصواب
উত্তর দাতা:
মুফতী ও মুহাদ্দিস, জামিআ মুহাম্মাদিয়া আরাবিয়া, মোহাম্মদপুর
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন