দাজ্জাল কি এআই ও গ্লোবাল সিস্টেমের মাধ্যমে ঈমান হরণ করবে?
প্রশ্নঃ ১৬১০৩৮. আসসালামুআলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ, কিছু কিছু আলেমের মুখে শুনি দাজ্জালি ব্যবস্হাপনা এটা সেটা যেমন - এআই, বর্তমান গ্লোবাল ব্যবস্থা, শিক্ষা ব্যবস্থা, আসলেই কি দাজ্জাল মানুষের ইমান হরণ করবে কোনো সিস্টেমের মাধ্যমে? নাকি আল্লাহ প্রদত্ত শক্তির মাধ্যমে?
১৩ জুলাই, ২০২৬
JXW৯+M২V
উত্তর
و علَيْــــــــــــــــــــكُم السلام ورحمة الله وبركاته
بسم الله الرحمن الرحيم
প্রিয় প্রশ্নকারী দ্বীনি ভাই!
১. দাজ্জাল একজন বাস্তব ব্যক্তি, কোনো প্রতীক বা কেবল একটি ব্যবস্থা নন।
বর্তমান সময়ে কেউ কেউ এআই, গ্লোবাল সিস্টেম, শিক্ষা ব্যবস্থা বা আধুনিক প্রযুক্তিকে সরাসরি “দাজ্জালি ব্যবস্থা” বলে থাকেন। কিন্তু কুরআন ও সহীহ হাদীসের আলোকে এ ধরনের নির্দিষ্ট দাবি করা সঠিক নয়। কারণ দাজ্জাল সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ ﷺ যেসব বর্ণনা দিয়েছেন, তাতে তিনি একজন বাস্তব ব্যক্তি। তাঁর শারীরিক বৈশিষ্ট্য, চলাফেরা, অনুসারী এবং শেষ পর্যন্ত ঈসা (আ.)-এর হাতে তাঁর নিহত হওয়ার বিবরণ সবই হাদীসে এসেছে। তাই “দাজ্জাল মানেই এআই” বা “দাজ্জাল মানেই বর্তমান বিশ্বব্যবস্থা”—এ ধরনের বক্তব্য প্রমাণভিত্তিক নয়।
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,
«مَا بَيْنَ خَلْقِ آدَمَ إِلَى قِيَامِ السَّاعَةِ أَمْرٌ أَكْبَرُ مِنَ الدَّجَّالِ»
“আদম (আ.)-এর সৃষ্টি থেকে কিয়ামত পর্যন্ত দাজ্জালের চেয়ে বড় কোনো ফিতনা নেই।” (সহীহ মুসলিম, ২৯৪৬)
https://muslimbangla.com/hadith/14177
২. দাজ্জালের মূল শক্তি হবে আল্লাহ প্রদত্ত পরীক্ষামূলক ক্ষমতা।
আল্লাহ তাআলা দাজ্জালকে মানুষের জন্য এক মহাপরীক্ষা হিসেবে কিছু অসাধারণ ক্ষমতা দান করবেন। সহীহ হাদীসে এসেছে, তার সঙ্গে জান্নাত ও জাহান্নামের মতো কিছু থাকবে। সে আকাশকে বৃষ্টি বর্ষণের নির্দেশ দেবে, জমিনকে শস্য উৎপন্ন করতে বলবে। আল্লাহর ইচ্ছায় এসব ঘটবে, যাতে মানুষ পরীক্ষার সম্মুখীন হয়। সুতরাং দাজ্জালের ফিতনার মূল ভিত্তি হবে আল্লাহ প্রদত্ত পরীক্ষামূলক ক্ষমতা, কেবল কোনো প্রযুক্তি বা সামাজিক ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল হওয়া নয়।
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,
«إِنَّ مَعَهُ جَنَّةً وَنَارًا، فَنَارُهُ جَنَّةٌ وَجَنَّتُهُ نَارٌ»
“দাজ্জালের সঙ্গে জান্নাত ও জাহান্নামের মতো কিছু থাকবে। কিন্তু তার আগুন হবে প্রকৃতপক্ষে জান্নাত এবং তার জান্নাত হবে প্রকৃতপক্ষে জাহান্নাম।” (সহীহ মুসলিম, ২৯৪৩)
https://muslimbangla.com/hadith/14149
৩. তবে দাজ্জাল বিভিন্ন মাধ্যম ও ব্যবস্থাকে ব্যবহার করতে পারে।
এ কথাও অস্বীকার করার সুযোগ নেই যে, দাজ্জাল মানুষের দুর্বলতাকে কাজে লাগাবে। ধন-সম্পদের লোভ, ক্ষমতার মোহ, ভয়, ক্ষুধা এবং দ্বীনি অজ্ঞতা—এসবই তার বড় অস্ত্র হবে। তাই সে তার উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে যুগোপযোগী বিভিন্ন মাধ্যম ও ব্যবস্থা ব্যবহার করতে পারে। কিন্তু সেই মাধ্যম এআই হবে, নাকি কোনো বৈশ্বিক রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক ব্যবস্থা হবে—এ বিষয়ে কুরআন-হাদীস কোনো নির্দিষ্ট কথা বলেনি। তাই অনুমানকে আকীদা বানানো উচিত নয়।
আল্লাহ তাআলা বলেন,
﴿وَلَنَبْلُوَنَّكُمْ بِشَيْءٍ مِنَ الْخَوْفِ وَالْجُوعِ وَنَقْصٍ مِنَ الْأَمْوَالِ وَالْأَنْفُسِ وَالثَّمَرَاتِ﴾
“আমি অবশ্যই তোমাদেরকে কিছুটা ভয়, ক্ষুধা, ধন-সম্পদ, জীবন ও ফল-ফসলের ক্ষতির মাধ্যমে পরীক্ষা করব।” (সূরা আল-বাকারা, ২:১৫৫)
৪. তাই কোনো প্রযুক্তিকে নিশ্চিতভাবে “দাজ্জালের সিস্টেম” বলা ঠিক নয়।
কোনো আলেম যদি বলেন, বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থা, মিডিয়া, এআই বা গ্লোবাল কাঠামোর কিছু অংশ মানুষকে দ্বীন থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে, তাহলে এটি একটি বিশ্লেষণ হিসেবে গ্রহণ করা যেতে পারে। কিন্তু এগুলোই নিশ্চিতভাবে “দাজ্জালের সিস্টেম”—এ কথা বলা শরয়ী প্রমাণ ছাড়া সঠিক নয়। মুসলিমের দায়িত্ব হলো ওহীর সীমা অতিক্রম না করা।
আল্লাহ তাআলা বলেন,
﴿وَلَا تَقْفُ مَا لَيْسَ لَكَ بِهِ عِلْمٌ﴾
“যে বিষয়ে তোমার কোনো জ্ঞান নেই, তার অনুসরণ করো না।” (সূরা আল-ইসরা, ১৭:৩৬)
৫. দাজ্জালের ফিতনা থেকে বাঁচার প্রকৃত উপায়।
রাসূলুল্লাহ ﷺ দাজ্জালের মোকাবিলার জন্য প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণ শেখাননি; বরং ঈমানকে মজবুত করার আমল শিখিয়েছেন। তিনি নামাজে দাজ্জালের ফিতনা থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাইতে নির্দেশ দিয়েছেন এবং সূরা কাহফের প্রথম দশ আয়াত, অন্য বর্ণনায় শেষ দশ আয়াত পাঠ ও মুখস্থ রাখতে উৎসাহিত করেছেন। এ থেকেই বোঝা যায়, দাজ্জালের বিরুদ্ধে প্রকৃত নিরাপত্তা হলো বিশুদ্ধ আকীদা, কুরআনের সঙ্গে সম্পর্ক, সুন্নাহর অনুসরণ এবং আল্লাহর ওপর অবিচল ভরসা।
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,
«مَنْ حَفِظَ عَشْرَ آيَاتٍ مِنْ أَوَّلِ سُورَةِ الْكَهْفِ عُصِمَ مِنَ الدَّجَّالِ»
“যে ব্যক্তি সূরা কাহফের প্রথম দশ আয়াত মুখস্থ করবে, সে দাজ্জালের ফিতনা থেকে নিরাপদ থাকবে।” (সহীহ মুসলিম, ৮০৯)
https://muslimbangla.com/hadith/8805
আরেক হাদীসে তিনি দোয়া শিখিয়েছেন,
«اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنْ عَذَابِ جَهَنَّمَ، وَمِنْ عَذَابِ الْقَبْرِ، وَمِنْ فِتْنَةِ الْمَحْيَا وَالْمَمَاتِ، وَمِنْ شَرِّ فِتْنَةِ الْمَسِيحِ الدَّجَّالِ»
“হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে জাহান্নামের আযাব, কবরের আযাব, জীবন ও মৃত্যুর ফিতনা এবং মসীহ দাজ্জালের ফিতনার অনিষ্ট থেকে আশ্রয় চাই।” (সহীহ মুসলিম, ৫৮৮)
https://muslimbangla.com/hadith/8252
সুতরাং ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান হলো, দাজ্জাল একজন বাস্তব ব্যক্তি; আল্লাহ তাঁকে অসাধারণ পরীক্ষামূলক ক্ষমতা দেবেন। তিনি বিভিন্ন মাধ্যম ব্যবহার করতে পারেন, কিন্তু সেই মাধ্যমগুলো কী হবে তা নির্দিষ্ট করে কুরআন-হাদীস কিছু বলেনি। তাই এআই, গ্লোবাল সিস্টেম বা অন্য কোনো প্রযুক্তিকে নিশ্চিতভাবে “দাজ্জালের সিস্টেম” বলা যেমন ঠিক নয়, তেমনি মানুষকে ঈমানহারা করে এমন যেকোনো ব্যবস্থা থেকে সতর্ক থাকাও একজন মুমিনের দায়িত্ব।
والله اعلم بالصواب
উত্তর দাতা:
শাহাদাত হুসাইন ফরায়েজী
মুফতী, ফাতাওয়া বিভাগ, মুসলিম বাংলা
লেখক ও গবেষক, হাদীস বিভাগ, মুসলিম বাংলা
খতীব, রৌশন আলী মুন্সীবাড়ী জামে মসজিদ, ফেনী
মুফতী, ফাতাওয়া বিভাগ, মুসলিম বাংলা
লেখক ও গবেষক, হাদীস বিভাগ, মুসলিম বাংলা
খতীব, রৌশন আলী মুন্সীবাড়ী জামে মসজিদ, ফেনী
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন
এ সম্পর্কিত আরও জিজ্ঞাসা/প্রশ্ন-উত্তর
মাসায়েল-এর বিষয়াদি
আল কুরআনুল কারীম
৪
হাদীস ও সুন্নাহ
৬
তাসাউফ-আত্মশুদ্ধি । ইসলাহী পরামর্শ
৩
শরীআত সম্পর্কিত
১৫
ফিতনাসমুহ; বিবরণ - করণীয়
২
আখিরাত - মৃত্যুর পরে
৩
ঈমান বিধ্বংসী কথা ও কাজ
৬
ফিরাকে বাতিলা - ভ্রান্ত দল ও মত
২
পবিত্রতা অর্জন
৮
নামাযের অধ্যায়
১৯
যাকাত - সদাকাহ
৫
রোযার অধ্যায়
৬
হজ্ব - ওমরাহ
২
কাফন দাফন - জানাযা
৫
কসম - মান্নত
১
কুরবানী - যবেহ - আকীকা
৪
বিবাহ শাদী
৮
মীরাছ-উত্তরাধিকার
২
লেনদেন - ব্যবসা - চাকুরী
৯
আধুনিক মাসায়েল
৬
দন্ড বিধি
২
দাওয়াত ও জিহাদ
৩
ইতিহাস ও ঐতিহ্য
৬
সীরাতুন নবী সাঃ । নবীজীর জীবনচরিত
৩
সাহাবা ও তাবেঈন
৩
ফাযায়েল ও মানাকেব
৩
কিতাব - পত্রিকা ও লেখক
৩
পরিবার - সামাজিকতা
৭
মহিলা অঙ্গন
২
আখলাক-চরিত্র
২
আদব- শিষ্টাচার
১২
রোগ-ব্যধি। চিকিৎসা
২
দোয়া - জিকির
২
নাম। শব্দ জ্ঞান
৩
নির্বাচিত
২
সাম্প্রতিক
১
বিবিধ মাসআলা
১