প্রবন্ধ
নফসের জিহাদ
৬ অক্টোবর, ২০২৬
৩৩
০
মানুষ পৃথিবীর বহু শত্রুকে পরাজিত করতে পারে। সে পাহাড় জয় করতে পারে, সমুদ্র পাড়ি দিতে পারে, অন্ধকারকে বিদীর্ণ করে আলো আবিষ্কার করতে পারে; সে বাহ্যিক শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে বিজয়ের পতাকা উড়াতে পারে। কিন্তু এমন একজন শত্রু আছে—যে তার সঙ্গে একই ঘরে থাকে, একই বিছানায় ঘুমায়, তার সঙ্গেই আহার করে, তার মুখ দিয়েই কথা বলে, তার চোখ দিয়েই পৃথিবী দেখে—আর সুযোগ পেলেই তাকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়। সে শত্রু—মানুষের নিজের নফস। বাইরের শত্রুকে মানুষ সহজে চিনতে পারে; কিন্তু নফসের শত্রুতার সবচেয়ে ভয়ংকর দিক হলো—সে শত্রু হয়েও নিজেকে বন্ধু হিসেবে উপস্থাপন করে। সে বলে—
আরেকটু দেখো, আরেকটু ঘুমাও, আজ না হয় গুনাহটা করে ফেলো, কে দেখছে? সবাই তো করছে! তুমি তো আলেম; তোমার কিছু হবে না! তুমি তো অনেক আমল করেছ!
এভাবেই নফস মানুষকে ধীরে ধীরে আল্লাহ থেকে দূরে সরিয়ে নিয়ে যায়। তাই মানুষের সবচেয়ে বড় যুদ্ধ বাইরের কোনো যুদ্ধ নয়; বরং নিজের অন্তরের প্রবৃত্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধ।
নফসকে সামলানোই মানুষের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা
আল্লাহ তাআলা সূরা আশ-শামসে একের পর এক শপথ করে মানুষের নফসের কথা উল্লেখ করেছেন—
وَنَفْسٍ وَمَا سَوَّاهَا فَأَلْهَمَهَا فُجُورَهَا وَتَقْوَاهَا قَدْ أَفْلَحَ مَنْ زَكَّاهَا وَقَدْ خَابَ مَنْ دَسَّاهَا
“শপথ নফসের এবং যিনি তাকে সুঠাম করেছেন তাঁর। অতঃপর তাকে তার পাপ ও তাকওয়ার জ্ঞান দান করেছেন। অবশ্যই সফল হয়েছে সে, যে তাকে পরিশুদ্ধ করেছে। আর অবশ্যই ব্যর্থ হয়েছে সে, যে তাকে কলুষিত করেছে।” —সূরা আশ-শামস: ৭–১০
লক্ষ করুন—আল্লাহ তাআলা মানুষের সফলতার সংজ্ঞা কী দিয়েছেন? সম্পদ নয়। খ্যাতি নয়। ক্ষমতা নয়। মানুষের বাহবা নয়। বরং—
قَدْ أَفْلَحَ مَنْ زَكَّاهَا
“সফল হয়েছে সে, যে নিজের নফসকে পরিশুদ্ধ করেছে।”
ইমাম ইবন কাসীর রহ. এই আয়াতের তাফসীরে লিখেছেন—
طهرها من الأخلاق الدنيئة والرذائل
মন্দ চরিত্র ও নিন্দনীয় বিষয় থেকে তাকে পবিত্র করা।
অন্যদিকে আল্লাহ তাআলা বলেছেন—
وَقَدْ خَابَ مَنْ دَسَّاهَا
“আর অবশ্যই ব্যর্থ হয়েছে সে, যে তাকে কলুষিত করেছে।”
ইবন কাসীর রহ. বলেন, এর অর্থ—মানুষ নফসকে হিদায়াত থেকে দূরে সরিয়ে দেয়, ফলে সে গুনাহে লিপ্ত হয় এবং আল্লাহর আনুগত্য পরিত্যাগ করে।
অর্থাৎ মানুষের আসল যুদ্ধ—নিজের নফসকে ধ্বংস করা নয়; বরং নফসের বিদ্রোহকে দমন করে তাকে আল্লাহর বান্দা বানানো।
নফস কী চায় আর আল্লাহ কী চান—সেখানেই যুদ্ধ
নফস চায় আরাম। আল্লাহ চান আনুগত্য। নফস চায় চোখ যা চায় তা দেখতে। আল্লাহ বলেন—
قُلْ لِلْمُؤْمِنِينَ يَغُضُّوا مِنْ أَبْصَارِهِمْ
মুমিনদের বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি অবনত রাখে।—সূরা আন-নূর: ৩০
নফস চায় জিহ্বা যা ইচ্ছা বলুক। আল্লাহ বলেন—
مَا يَلْفِظُ مِنْ قَوْلٍ إِلَّا لَدَيْهِ رَقِيبٌ عَتِيدٌ
“মানুষ যে কথাই উচ্চারণ করে, তার কাছে তা সংরক্ষণকারী প্রহরী উপস্থিত থাকে।”—সূরা ক্বাফ: ১৮
নফস চায় সম্পদ নিজের জন্য জমিয়ে রাখতে। আল্লাহ চান—
وَمِمَّا رَزَقْنَاهُمْ يُنْفِقُونَ
“আমি তাদের যে রিজিক দিয়েছি, তা থেকে তারা ব্যয় করে।”—সূরা আল-বাকারা: ৩
নফস চায় রাগের সময় প্রতিশোধ নিতে। আল্লাহ বলেন—
وَالْكَاظِمِينَ الْغَيْظَ وَالْعَافِينَ عَنِ النَّاسِ
“যারা ক্রোধ সংবরণ করে এবং মানুষকে ক্ষমা করে।”—সূরা আলে ইমরান: ১৩৪
নফস চায় নিজের বড়ত্ব প্রকাশ করতে। আল্লাহ চান বিনয়। নফস চায় মানুষের প্রশংসা। আল্লাহ চান ইখলাস। নফস চায় গুনাহের স্বাদ। আল্লাহ চান জান্নাতের চিরস্থায়ী আনন্দ। এই দুই চাওয়ার সংঘর্ষের নামই নফসের জিহাদ।
রাসূল ﷺ-এর ভাষায় প্রকৃত মুজাহিদ কে?
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন—
الْمُجَاهِدُ مَنْ جَاهَدَ نَفْسَهُ
“মুজাহিদ তো সে-ই, যে নিজের নফসের সঙ্গে জিহাদ করে।” সুনানে তিরমিযী, ১৬২১
এই হাদীসটি আমাদের জন্য যেন অন্তরের আয়না। আমরা অনেক সময় মনে করি—মুজাহিদ মানে যে বাইরে শত্রুর সঙ্গে যুদ্ধ করে। কিন্তু একজন মানুষ হয়তো হাজার শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াই করতে পারে, অথচ নিজের নফসের কাছে প্রতিদিন পরাজিত হতে পারে। সে অন্যকে দ্বীনের দিকে ডাকছে—কিন্তু নিজের চোখকে সামলাতে পারছে না। সে অন্যকে তাকওয়ার কথা বলছে—কিন্তু একাকী হলে আল্লাহকে ভুলে যাচ্ছে। সে মানুষকে সুন্নতের কথা শোনাচ্ছে—কিন্তু নিজের রাগকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না। সে মানুষের সামনে কাঁদছে—কিন্তু অন্তরে মানুষের প্রশংসার আকাঙ্ক্ষা লুকিয়ে আছে। এখানেই নফসের সূক্ষ্ম প্রতারণা। বাহ্যিক শত্রুর সঙ্গে যুদ্ধ করা তুলনামূলক সহজ; কিন্তু নফসের সঙ্গে যুদ্ধ করা অত্যন্ত কঠিন। কারণ বাহ্যিক শত্রুকে মানুষ দেখতে পায়, অথচ অন্তরের শত্রু তার নিজের ভেতরেই লুকিয়ে থাকে। বাইরের শত্রুকে পরাজিত করে মানুষ বিজয়ী হয়; কিন্তু নিজের নফসকে পরাজিত করতে না পারলে সেই বিজয়ও তাকে রক্ষা করতে পারে না।
নফসের সঙ্গে জিহাদ মানে নিজেকে কষ্ট দেওয়া নয়
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বুঝে নেওয়া জরুরি। নফসের জিহাদ মানে হালাল জিনিসকে হারাম করে নেওয়া নয়। মুজাহাদা হলো মন্দ ও নিন্দনীয় প্রবৃত্তির বিরোধিতা করা; হালাল ও স্বাভাবিক জীবনকে অকারণে ত্যাগ করা মুজাহাদার উদ্দেশ্য নয়।
অতএব—ভালো খাবার খাওয়া নফসের জিহাদের বিরুদ্ধে নয়; কিন্তু পেটের দাস হয়ে যাওয়া বিপদ। বিশ্রাম নেওয়া অপরাধ নয়; কিন্তু নামাজ নষ্ট করে ঘুমানো অপরাধ। কথা বলা নিষিদ্ধ নয়; কিন্তু অনর্থক কথা, গীবত, অপবাদ ও অহংকারে জিহ্বাকে ছেড়ে দেওয়া বিপদ। বিয়ে করা নফসের বিরুদ্ধে নয়; কিন্তু হারাম দৃষ্টির পেছনে নফসকে ছেড়ে দেওয়া বিপদ। ইসলাম নফসকে হত্যা করতে বলেনি; ইসলাম নফসকে শরিয়তের অধীন করতে বলেছে।
নফসের সবচেয়ে বড় প্রতারণা—“আমি তো ভালো আছি”
নফসের একটি আশ্চর্য ক্ষমতা আছে। সে মানুষের গুনাহকে ছোট করে দেখায়, আর নেক আমলকে বড় করে দেখায়। একজন মানুষ সারাদিন মানুষের সঙ্গে রূঢ় আচরণ করল, কারও অন্তর ভেঙে দিল, কারও হক নষ্ট করল; রাতে দু’রাকাত নফল পড়ে মনে করল—আজ আমি অনেক ভালো কাজ করেছি! এটাই নফসের ধোঁকা।
কখনো সে বলে—
“আমি তো তাহাজ্জুদ পড়ি।” কিন্তু মানুষের সম্মান নিয়ে তার অন্তর পুড়ে যায়।
“আমি তো কুরআন পড়ি।” কিন্তু সামান্য সমালোচনা সহ্য হয় না।
“আমি তো দীন নিয়ে কাজ করি।” কিন্তু নিজের ঘরের মানুষের সঙ্গে আখলাক ঠিক থাকে না।
“আমি তো আলেমদের ভালোবাসি।” কিন্তু নিজের নফসের ভুল স্বীকার করতে পারে না।
নফসের সবচেয়ে ভয়ংকর কারাগার হলো—মানুষ যখন নিজের বন্দিত্বকেই স্বাধীনতা মনে করে।
নফসের চিকিৎসা—প্রথম ওষুধ: আল্লাহর ভয়
আল্লাহ তাআলা বলেন—
وَأَمَّا مَنْ خَافَ مَقَامَ رَبِّهِ وَنَهَى النَّفْسَ عَنِ الْهَوَى فَإِنَّ الْجَنَّةَ هِيَ الْمَأْوَى
“আর যে ব্যক্তি তার রবের সামনে দাঁড়ানোর ভয় করেছে এবং নফসকে প্রবৃত্তি থেকে বিরত রেখেছে, নিশ্চয়ই জান্নাতই হবে তার আশ্রয়।”—সূরা আন-নাযিয়াত: ৪০–৪১
খেয়াল করুন, আল্লাহ এখানে জান্নাতের আগে কী উল্লেখ করেছেন?
نَهَى النَّفْسَ عَنِ الْهَوَى
“নফসকে প্রবৃত্তি থেকে বিরত রেখেছে।”
জান্নাতের পথে শুধু ইচ্ছা যথেষ্ট নয়। ইচ্ছাকে আল্লাহর হুকুমের সামনে নত করতে হয়। মন চায়—তবু করব না। চোখ চায়—তবু দেখব না। রাগ চায়—তবু গালি দেব না। প্রতিশোধ চায়—তবু ক্ষমা করব। ঘুম চায়—তবু নামাজের জন্য উঠব। সম্পদ জমাতে চায়—তবু আল্লাহর পথে ব্যয় করব। মানুষের প্রশংসা চায়—তবু কাজটি আল্লাহর জন্য করব। এই “তবু”—এর মধ্যেই নফসের জিহাদ। আর এটা অর্জন করার জন্য আল্লাহর ভয় থাকা শর্ত। আল্লাহর ভয় ছাড়া নফসকে প্রবৃত্তি থেকে বিরত রাখা অসম্ভব।
দ্বিতীয় ওষুধ: নেক সঙ্গ গ্রহণ করা
নফস একা থাকলে নিজের যুক্তি দিয়ে নিজেকেই ধোঁকা দেয়। তাই আল্লাহওয়ালা, মুত্তাকী, সুন্নতের অনুসারী এবং আত্মশুদ্ধিতে আগ্রহী মানুষের সঙ্গ গ্রহণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইসলাহের পথে অভিজ্ঞ কোনো আলেম মুরব্বির কাছে নিজের দুর্বলতা প্রকাশ করাও অনেক সময় নফসের চিকিৎসার দরজা খুলে দেয়। হাকীমুল উম্মত থানভী রহ. নিজেই সতর্ক করেছেন—নফসের চিকিৎসা নিজের খেয়ালমতো নির্ধারণ করে নেওয়া ঠিক নয়; উপযুক্ত ব্যক্তির দিকনির্দেশনা অনুযায়ী চিকিৎসা গ্রহণ করা উচিত।
তৃতীয় ওষুধ: আল্লাহর কাছে দোয়া করা
মানুষ নিজের নফসকে নিজের শক্তিতে পুরোপুরি শুদ্ধ করতে পারে না। তাই রাসূল ﷺ দোয়া করেছেন—
اللَّهُمَّ آتِ نَفْسِي تَقْوَاهَا، وَزَكِّهَا أَنْتَ خَيْرُ مَنْ زَكَّاهَا، أَنْتَ وَلِيُّهَا وَمَوْلَاهَا
“হে আল্লাহ! আমার নফসকে তার তাকওয়া দান করুন এবং তাকে পরিশুদ্ধ করুন। আপনিই তাকে সর্বোত্তমভাবে পরিশুদ্ধকারী। আপনিই তার অভিভাবক ও মালিক।”-মুসলিম, ২৭২২
সূরা আশ-শামসের আয়াতের সঙ্গে সম্পর্কিত আলোচনায় ইবন কাসীর রহ.ও এই দোয়াটি উল্লেখ করেছেন। কী অসাধারণ দোয়া! মানুষ যেন বলছে—“হে আল্লাহ! আমার নফস আমার হাতে নিরাপদ নয়। আপনি তাকে সামলান।”
চতুর্থ ওষুধ: মুশারাতা, মুরাকাবা, মুহাসাবা
ইমাম গাযালী রহ. বলেন, নফসের বিরুদ্ধে জিহাদ করতে হলে প্রতিদিন সকালে নফসের সাথে কথা বলতে হবে। নফসের সাথে এই চুক্তি করতে হবে, আজ সারাদিন আমি তোমাকে আল্লাহর নাফরমানী করতে দিবো না। এই চুক্তির নাম মুশারাতা।
এরপর সারাদিন নফসের দিকে খেয়াল রাখতে হবে সে যেন কোনো ভাবেই আল্লাহর নাফরমানীতে লিপ্ত হতে না পারে। এর নাম মুরাকাবা।
রাতে ঘুমানোর আগে সারাদিনের কৃতকর্মের হিসাব নিতে হবে। নেক কাজের উপর শুকরিয়া আদায় করা। আর গুনাহ হয়ে থাকলে তওবা করে ঘুমানো। এর নাম মুহাসাবা।
আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে নফসের বিরুদ্ধে জিহাদ করার প্রবল শক্তি দান করেন। নফসের বিরুদ্ধে বিজয় হওয়ার তাওফিক দান করেন।
মন্তব্য (...)
এ সম্পর্কিত আরও প্রবন্ধ
গোনাহ থেকে বেঁচে থাকার ১০ আমল ও কৌশল
গোনাহের সবচেয়ে বড় এবং ভয়াবহ ক্ষতি হলো, মানুষ আল্লাহর ইবাদত থেকে মাহরুম হয়ে যায়। আল্লাহর ইবাদত ক...
মাহে রমযান কুরআন ও তাকওয়ার পথে অগ্রসর হওয়ার মৌসুম
বছর ঘুরে আবারো বিশ্বের মুসলমানদের দোরগোড়ায় উপস্থিত হয়েছে রমযানুল মোবারক। রহমত ও মাগফিরাত , সহমর্মিতা...
প্রতিটি কাজ ইখলাসের সাথে করা
ইসলাম এমন একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা, যেখানে মানুষের প্রতিটি কথা, কাজ, চিন্তা, অনুভূতি ও উদ্দেশ্য প...
নেককার-মুত্তাকী হওয়ার উপায়
কুরআন মুত্তাকীদের জন্য হিদায়াত। অর্থাৎ কুরআনের প্রকৃত হিদায়াত দ্বারা উপকৃত হবে কেবল মুত্তাকী গণ। আল্...
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন