প্রবন্ধ
নারী সাহাবীদের ঈমান আকিদা
২০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
৩৬৮
০
ইসলামের সোনালী ইতিহাসে ঈমান, আকাইদ ও আমলের সর্বোচ্চ চূড়ায় আরোহন করেছিলেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রিয় সাহাবীগণ। তাঁদের মধ্যে নারী সাহাবীরা যে ত্যাগ, অবিচলতা এবং গভীর আকিদাগত বিশ্বাসের নমুনা স্থাপন করে গেছেন, তা কিয়ামত পর্যন্ত মুসলমানদের জন্য এক চিরন্তন আলোকবর্তিকা। নারী সাহাবীরা কেবল পারিবারিক কাজেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না; বরং তাওহিদ, রিসালাত ও আখেরাতের প্রতি তাঁদের ঈমানী চেতনা এতই সুদৃঢ় ছিল যে, কোনো প্রকার নির্যাতন কিংবা পার্থিব প্রলোভন তাঁদেরকে হক পথ থেকে বিচ্যুত করতে পারেনি।
কুরআনের ভাষায় নারীদের ঈমান ও আমল
শরিয়তে ঈমানের মূল ভিত্তি হলো অন্তরের সুদৃঢ় বিশ্বাস, মুখে স্বীকার এবং কাজে তার প্রতিফলন। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে মুমিন পুরুষ ও নারী উভয়ের ঈমানী মর্যাদাকে সমানভাবে ঘোষণা করেছেন:
مَنۡ عَمِلَ صَالِحًا مِّنۡ ذَکَرٍ اَوۡ اُنۡثٰی وَہُوَ مُؤۡمِنٌ فَلَنُحۡیِیَنَّہٗ حَیٰوۃً طَیِّبَۃً ۚ وَلَنَجۡزِیَنَّہُمۡ اَجۡرَہُمۡ بِاَحۡسَنِ مَا کَانُوۡا یَعۡمَلُوۡنَ
অর্থঃ যে ব্যক্তিই মুমিন থাকা অবস্থায় সৎকর্ম করবে, সে পুরুষ হোক বা নারী, আমি অবশ্যই তাকে উত্তম জীবন যাপন করাব এবং তাদেরকে তাদের উৎকৃষ্ট কর্ম অনুযায়ী তাদের প্রতিদান অবশ্যই প্রদান করব। আন নাহ্ল - আয়াত নং, 97
অন্যত্র আল্লাহ তাআলা নারীদের গুণাবলি বর্ণনা করে ঘোষণা করেন:
اِنَّ الۡمُسۡلِمِیۡنَ وَالۡمُسۡلِمٰتِ وَالۡمُؤۡمِنِیۡنَ وَالۡمُؤۡمِنٰتِ وَالۡقٰنِتِیۡنَ وَالۡقٰنِتٰتِ وَالصّٰدِقِیۡنَ وَالصّٰدِقٰتِ وَالصّٰبِرِیۡنَ وَالصّٰبِرٰتِ وَالۡخٰشِعِیۡنَ وَالۡخٰشِعٰتِ وَالۡمُتَصَدِّقِیۡنَ وَالۡمُتَصَدِّقٰتِ وَالصَّآئِمِیۡنَ وَالصّٰٓئِمٰتِ وَالۡحٰفِظِیۡنَ فُرُوۡجَہُمۡ وَالۡحٰفِظٰتِ وَالذّٰکِرِیۡنَ اللّٰہَ کَثِیۡرًا وَّالذّٰکِرٰتِ ۙ اَعَدَّ اللّٰہُ لَہُمۡ مَّغۡفِرَۃً وَّاَجۡرًا عَظِیۡمًا
অর্থঃ নিশ্চয়ই আনুগত্য প্রকাশকারী পুরুষ ও আনুগত্য প্রকাশকারী নারী, মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারী, ইবাদতগুজার পুরুষ ও ইবাদতগুজার নারী, সত্যবাদী পুরুষ ও সত্যবাদী নারী, ধৈর্যশীল পুরুষ ও ধৈর্যশীল নারী, আন্তরিকভাবে বিনীত পুরুষ ও আন্তরিকভাবে বিনীত নারী, সদকাকারী পুরুষ ও সদকাকারী নারী, রোযাদার পুরুষ ও রোযাদার নারী, নিজ লজ্জাস্থানের হেফাজতকারী পুরুষ ও হেফাজতকারী নারী এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণকারী পুরুষ ও স্মরণকারী নারী আল্লাহ এদের সকলের জন্য মাগফেরাত ও মহা প্রতিদান প্রস্তুত করে রেখেছেন। আল আহ্যাব - আয়াত নং 35
এ আয়াতগুলো প্রমাণ করে যে, ঈমান, আকিদা ও আমলের সওয়াবের ব্যাপারে পুরুষ ও নারীর মাঝে কোনো ভেদাভেদ নেই। যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য অগ্রসর হবে, সে আল্লাহ তায়ালার নৈকট্য অর্জন করতে পারবে।
ঈমানের ওপর নারী সাহাবীদের অবিচলতা
নারী সাহাবীদের ঈমানী চেতনা কতটা গভীর ছিল, তা তাঁদের জীবনযাত্রার বিভিন্ন ঐতিহাসিক হাদিসের মাধ্যমেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ইসলামের সূচনালগ্নে যখন এক আল্লাহর প্রতি ঈমান আনা চরম বিপজ্জনক ছিল, তখন নারী সাহাবীরা ঈমানের পরীক্ষায় অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। হযরত সুমাইয়্যা বিনতে খাইয়াত রা. ছিলেন ইসলামের প্রথম শহীদ। আবু জাহেল ও কুরাইশদের অমানুষিক নির্যাতন সহ্য করেও তিনি ঈমান থেকে একচুল পিছপা হননি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁদের এ কষ্টের মুহূর্তে সান্ত্বনা দিয়ে বলতেন: "হে ইয়াসিরের পরিবার! ধৈর্য ধারণ করো, নিশ্চয়ই তোমাদের ঠিকানা জান্নাত।" (শুআবুল ঈমান, ১৫১৫)
সুনির্দিষ্ট নির্যাতনের মুখেও হযরত সুমাইয়্যা (রা.)-এর আকিদাগত দৃঢ়তা প্রমাণ করে যে, ঈমানের স্বাদ পেলে মৃত্যুর ভয়ও দূর হয়ে যায়।
আখেরাতের প্রতি গভীর বিশ্বাস ও ত্যাগের মনোভাব
হযরত খাদিজাতুল কুবরা (রা.) ছিলেন ঈমানের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। ওহী নাজিলের প্রথম কঠিন মুহূর্তে তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে মানসিকভাবে সান্ত্বনা দেন এবং তাঁর সমস্ত সম্পদ ইসলামের খেদমতে অকাতরে বিলিয়ে দেন। বুখারি শরীফের হাদিসে এসেছে, জিবরাইল (আ.) স্বয়ং এসে হযরত খাদিজা (রা.)-কে আল্লাহর পক্ষ থেকে সালাম পৌঁছান এবং জান্নাতে তাঁর জন্য মুক্তা দিয়ে তৈরি একটি ঘরের সুসংবাদ দেন। সহীহ বুখারি, ৩৮২০
হযরত উম্মে সুলাইম (রা.)-এর ঈমানী আকিদার গভীরতা প্রকাশ পায় তাঁর বিবাহ সূত্রে। হযরত আবু তালহা (রা.) যখন তাঁকে বিবাহের প্রস্তাব দেন, তখন তিনি বলেন: "আপনি তো কাফির, আর আমি মুসলিম। আমি আপনাকে বিবাহ করতে পারি না। তবে আপনি যদি ইসলাম গ্রহণ করেন, তবে সেটাই হবে আমার মোহরানা।"। জাগতিক ধন-সম্পদের চেয়ে ঈমানকে তিনি অগ্রাধিকার দিয়েছিলেন। সুনানে নাসায়ী, ৩৩৪১
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রতি ভালোবাসা ও রিসালাতের আকিদা
আকিদার অন্যতম রুকন হলো রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে নিজের প্রাণের চেয়েও বেশি ভালোবাসা। উহুদ যুদ্ধের সময় হযরত উম্মে আম্মারা (নুসাইবা বিনতে কাআব রা.) তলোয়ার ও ঢাল নিয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে কাফিরদের আক্রমণ থেকে রক্ষা করতে আত্মনিয়োগ করেছিলেন। তাঁর গায়ে বারোটিরও বেশি মারাত্মক আঘাত লেগেছিল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: "উহুদের দিনে আমি ডানে বা বামে যেদিকেই তাকিয়েছি, উম্মে আম্মারাকে আমার সুরক্ষায় যুদ্ধ করতে দেখেছি।"-সুবুলুল হুদা ওয়ার রাশাদ, ৪/২০২
একইভাবে, উহুদ যুদ্ধে এক আনসারী নারী সাহাবীর পিতা, ভাই ও স্বামী সবাই শহীদ হন। কিন্তু তিনি সেদিকে খেয়াল না করে শুধু জিজ্ঞেস করেছিলেন, "আমার আল্লাহর রাসূল কেমন আছেন?" যখন তাঁকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে দেখানো হলো, তখন তিনি ঐতিহাসিক উক্তি করেন: "আপনাকে জীবিত দেখার পর আমার ওপর আগত সমস্ত মুসীবত তুচ্ছ ও সহজ হয়ে গেছে।" -তাফসীরে রাযী, ৯/৭৯
তাকদীরের প্রতি রেজা ও সন্তুষ্টি
নারীরা স্বভাবগত কোমল হৃদয়ের হয়ে থাকে। কিন্তু নারী সাহাবীগণ সমস্ত কঠিন পরিস্থিতিতে আল্লাহর ফায়সালাকে প্রাধান্য দিতেন। সন্তান বা প্রিয়জনের শাহাদাত ও মৃত্যুতেও তারা শোকে ভেঙে না পড়ে অসীম ধৈর্য ও প্রজ্ঞার পরিচয় দিতেন। হযরত উম্মে সুলাইম (রা.)-এর ছোট সন্তান ইন্তেকাল করার পর তিনি ধৈর্য ধরে স্বামীকে খাবার পরিবেশন করেন এবং পরে অত্যন্ত প্রজ্ঞার সাথে মৃত্যুর খবর জানান। তিনি স্বামীকে বলেন,
أرأيت لو أن قوما أعاروا عاريتهم أهل بيت فطلبوا عاريتهم ألهم أن يمنعوهم قال لا . قالت فاحتسب ابنك
অর্থাৎ কেউ যদি কাউকে কোন জিনিস রাখতে দেয়, এরপর তা নিয়ে নেয়, তবে কি সে তা ফিরাতে পারে? আবু তালহা রা. বললেন, না। উম্মে সুলায়ম রা. বললেন, আমি তোমার ছেলের মৃত্যু সংবাদ দিচ্ছি। সহীহ মুসলিম, ৬১০০
বর্তমান যুগে নারী সাহাবীদের ঈমান ও আকিদার প্রাসঙ্গিকতা
বর্তমান যুগে ফিতনার প্রভাব ও পাশ্চাত্য সংস্কৃতির সয়লাবে যখন পারিবারিক ও সামাজিক জীবন বিপর্যস্ত, তখন নারী সাহাবীদের আকিদা ও চরিত্র অনুসরণ করা অপরিহার্য।
· শিরক ও কুসংস্কার থেকে মুক্তি: নারী সাহাবীরা যেকোনো পরিস্থিতিতে কেবল আল্লাহর ওপর ভরসা করতেন। আজকের নারীদেরও সমস্ত জ্যোতিষশাস্ত্র, লোকবিশ্বাস ও কুসংস্কার ত্যাগ করে খাঁটি তাওহিদের ওপর স্থির থাকতে হবে।
· ধৈর্য ও সহনশীলতা: জীবনের দুঃখ-কষ্টে সাহাবীদের ধৈর্যের আদর্শ অনুসরণ করা উচিত।
· সন্তান লালন-পালনে দ্বীনি তারবিয়াত: হযরত খান্সা (রা.) যেভাবে কাদিসিয়ার যুদ্ধে নিজের চার সন্তানকে দ্বীনের জন্য উৎসর্গ করতে উৎসাহিত করেছিলেন, সেই ঈমানী চেতনায় সন্তানদের গড়ে তোলা প্রয়োজন।
উপসংহার
নারী সাহাবীদের ঈমান ও আকিদা কোনো রূপকথা নয়; বরং এটি ছিল এক বাস্তবতা, যা ইসলামকে গোড়াপত্তন ও বিকশিত করতে ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেছে। তাঁদের ঈমান ছিল তাওহিদের দীক্ষায় উজ্জ্বল, সুন্নাতের অনুসারী এবং ত্যাগের মহিমায় ভাস্বর। সর্বযুগের হাক্কানী ওলামায়ে কেরাম নারীদেরকে সাহাবীয়াতদের পদঙ্ক অনুসরণের যে শিক্ষা দিয়েছেন, তা বাস্তবায়ন করলেই একটি আদর্শ, নৈতিক ও ঈমানদার সমাজ গঠন করা সম্ভব। আল্লাহ তাআলা আমাদের বোন ও মায়েদেরকে নারী সাহাবীদের খাঁটি ঈমান ও আকিদার ওপর জীবন পরিচালনা করার তৌফিক দান করুন। আমিন।
মন্তব্য (...)
এ সম্পর্কিত আরও প্রবন্ধ
ঝাড়ফুঁক-তাবীয : একটি দালীলিক বিশ্লেষণ (৩য় পর্ব)
...
ঈমান সুরক্ষায় কুসংস্কার থেকে দূরে থাকুন!
আমাদের সমাজে সামাজিকতা ও নিয়মনীতি পালনের নামে বহু কুপ্রথা ও কুসংস্কার প্রচলন রয়েছে। শরীয়তে এগুলোর কো...
ঝাড়ফুঁক-তাবীয : একটি দালীলিক বিশ্লেষণ (২য় পর্ব)
...
শান্তি সম্প্রীতি ও উদারতার ধর্ম ইসলাম
নামে যার শান্তির আশ্বাস তার ব্যাপারে আর যাই হোক, সন্ত্রাসের অপবাদ দেয়ার আগে তার স্বরূপ উদঘাটনে দু'দণ...
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন