প্রবন্ধ
নারী সাহাবীদের পর্দা
৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
১৩৩
০
ভূমিকা
নারীর সৌন্দর্য আল্লাহ তাআলার দেওয়া এক বিশেষ নিয়ামত। আর যে জিনিস মূল্যবান, তার সংরক্ষণও তত বেশি প্রয়োজন। ইসলাম নারীর সৌন্দর্যকে অবমূল্যায়ন করেনি; বরং তাকে মর্যাদা দিয়েছে, পবিত্রতা দিয়েছে এবং এমন একটি জীবনব্যবস্থা দিয়েছে, যার মাধ্যমে তার সৌন্দর্য, সম্মান ও ব্যক্তিত্ব অনাকাঙ্ক্ষিত দৃষ্টি ও অনৈতিকতার হাত থেকে সুরক্ষিত থাকে।
এই সুরক্ষার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিধান হলো পর্দা।
পর্দা শুধু একটি কাপড়ের নাম নয়। পর্দা হলো চোখের পর্দা, পোশাকের পর্দা, চলাফেরার পর্দা, কথাবার্তার পর্দা এবং সর্বোপরি অন্তরের পর্দা। একজন মুমিন নারী যখন পর্দা করে, তখন সে মূলত ঘোষণা করে—আমার সৌন্দর্য প্রদর্শনের বস্তু নয়; এটি আল্লাহর দেওয়া আমানত।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর যুগে নারীরা কেমন পর্দা করতেন?
তাঁরা কি আজকের মতোই পর্দা করতেন, নাকি পর্দা ছিল শুধু একটি সামাজিক রীতি?
এর উত্তর আমাদের খুঁজতে হবে সাহাবিয়াতদের জীবনে। কারণ সাহাবিয়াতগণ ছিলেন কুরআনের জীবন্ত বাস্তবায়ন। তাঁরা আয়াত শুধু তিলাওয়াত করতেন না; আয়াত নাজিল হলে নিজেদের জীবনকে সেই আয়াতের অধীন করে দিতেন।
তাই সাহাবিয়াতের পর্দার ইতিহাস কেবল অতীতের একটি ঘটনা নয়; বরং আজকের মুসলিম নারীর জন্য এটি একটি জীবন্ত আদর্শ।
পর্দার বিধানের কুরআনি ভিত্তি
পর্দার আলোচনা শুরু করার আগে এর কুরআনি প্রেক্ষাপট জানা জরুরি।
আল্লাহ তাআলা প্রথমে মুমিন পুরুষদের দৃষ্টি সংযত করার নির্দেশ দিয়েছেন,
قُلْ لِلْمُؤْمِنِينَ يَغُضُّوا مِنْ أَبْصَارِهِمْ وَيَحْفَظُوا فُرُوجَهُمْ ۚ ذَٰلِكَ أَزْكَىٰ لَهُمْ ۗ إِنَّ اللَّهَ خَبِيرٌ بِمَا يَصْنَعُونَ
মুমিন পুরুষদের বলে দিন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি অবনত রাখে এবং নিজেদের লজ্জাস্থান সংরক্ষণ করে। এটাই তাদের জন্য অধিক পবিত্র। নিশ্চয়ই তারা যা করে আল্লাহ সে সম্পর্কে সম্যক অবগত।—সূরা আন-নূর: ৩০
এর পরপরই নারীদের উদ্দেশে আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَقُلْ لِلْمُؤْمِنَاتِ يَغْضُضْنَ مِنْ أَبْصَارِهِنَّ وَيَحْفَظْنَ فُرُوجَهُنَّ وَلَا يُبْدِينَ زِينَتَهُنَّ إِلَّا مَا ظَهَرَ مِنْهَا ۖ وَلْيَضْرِبْنَ بِخُمُرِهِنَّ عَلَىٰ جُيُوبِهِنَّ
আর মুমিন নারীদের বলে দিন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি অবনত রাখে, লজ্জাস্থান সংরক্ষণ করে এবং তাদের সৌন্দর্য প্রকাশ না করে; যা স্বাভাবিকভাবে প্রকাশ পায় তা ব্যতীত। আর তারা যেন তাদের ওড়না বক্ষদেশের ওপর টেনে দেয়।—সূরা আন-নূর: ৩১
এরপর আরও সুস্পষ্টভাবে জিলবাবের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে,
يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ قُلْ لِأَزْوَاجِكَ وَبَنَاتِكَ وَنِسَاءِ الْمُؤْمِنِينَ يُدْنِينَ عَلَيْهِنَّ مِنْ جَلَابِيبِهِنَّ ۚ ذَٰلِكَ أَدْنَىٰ أَنْ يُعْرَفْنَ فَلَا يُؤْذَيْنَ
হে নবী! আপনি আপনার স্ত্রীদের, কন্যাদের এবং মুমিন নারীদের বলে দিন, তারা যেন নিজেদের ওপর তাদের জিলবাবের কিছু অংশ টেনে দেয়। এতে তাদের চেনা সহজ হবে এবং তাদেরকে কষ্ট দেওয়া হবে না।—সূরা আল-আহযাব: ৫৯
আর রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর স্ত্রীদের উদ্দেশে আল্লাহ বলেন,
وَإِذَا سَأَلْتُمُوهُنَّ مَتَاعًا فَاسْأَلُوهُنَّ مِنْ وَرَاءِ حِجَابٍ ۚ ذَٰلِكُمْ أَطْهَرُ لِقُلُوبِكُمْ وَقُلُوبِهِنَّ
তোমরা যখন তাঁর স্ত্রীদের কাছে কোনো সামগ্রী চাইবে, তখন পর্দার আড়াল থেকে চাইবে। এটি তোমাদের অন্তর এবং তাঁদের অন্তরের জন্য অধিক পবিত্র।—সূরা আল-আহযাব: ৫৩
এ আয়াতের শেষ কথাটি বিশেষভাবে লক্ষণীয়,
ذَٰلِكُمْ أَطْهَرُ لِقُلُوبِكُمْ وَقُلُوبِهِنَّ
“এটি তোমাদের অন্তর ও তাঁদের অন্তরের জন্য অধিক পবিত্র।”
অর্থাৎ পর্দার উদ্দেশ্য কেবল বাহ্যিক আবরণ নয়; এর অন্যতম উদ্দেশ্য হলো অন্তরের পবিত্রতা রক্ষা করা।
আয়াত নাজিল হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সাহাবিয়াতদের আমল
কুরআনের আয়াত নাজিল হলো, আর সাহাবিয়াতরা অপেক্ষা করলেন—এমন নয় যে, কয়েকদিন পরে কীভাবে বাস্তবায়ন করবেন তা চিন্তা করবেন। বরং তাঁরা সঙ্গে সঙ্গে আমল করতেন।
উম্মুল মুমিনীন আয়েশা রাযি. বলেন,
يَرْحَمُ اللَّهُ نِسَاءَ الْمُهَاجِرَاتِ الْأُوَلَ، لَمَّا أَنْزَلَ اللَّهُ: ﴿وَلْيَضْرِبْنَ بِخُمُرِهِنَّ عَلَى جُيُوبِهِنَّ﴾ شَقَّقْنَ مُرُوطَهُنَّ فَاخْتَمَرْنَ بِهَا
আল্লাহ প্রথম যুগের মুহাজির নারীদের প্রতি রহমত করুন। যখন আল্লাহ নাজিল করলেন—‘তারা যেন তাদের ওড়না বক্ষদেশের ওপর টেনে দেয়’—তখন তাঁরা নিজেদের চাদর ছিঁড়ে তা দিয়ে মাথা ঢেকে নিলেন।—সুনান আবু দাউদ, ৪১০২
সহিহ বুখারির বর্ণনায়ও এসেছে,
شَقَّقْنَ مُرُوطَهُنَّ فَاخْتَمَرْنَ بِهَا
অর্থাৎ, তাঁরা নিজেদের কাপড় ছিঁড়ে তা দিয়ে নিজেদের আবৃত করেছিলেন। —বুখারী, হাদীস নং: ৪৭৫৯
এখানে সাহাবিয়াতদের ঈমানের একটি অসাধারণ বৈশিষ্ট্য প্রকাশ পায়—আল্লাহর নির্দেশ পাওয়ার পর তাঁরা নিজেদের সুবিধা দেখেননি; নির্দেশ পালন করেছেন।
হযরত খাদিজা রাযি.—পবিত্রতা ও লজ্জাশীলতার অনন্য আদর্শ
হযরত খাদিজা রাযি. ছিলেন ইসলামের প্রথম যুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নারী। পর্দার বিধান নাজিল হওয়ার পূর্বেই তিনি ইন্তেকাল করেন; তবে জাহেলি সমাজে থেকেও তাঁর জীবন ছিল পবিত্রতা, সম্ভ্রান্ততা, লজ্জাশীলতা ও মর্যাদার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁর পবিত্র চরিত্র ও অনন্য মর্যাদার কারণে তাঁকে গভীরভাবে ভালোবাসতেন এবং তাঁর ইন্তেকালের পরও বারবার তাঁর প্রশংসা করতেন।
হযরত আয়েশা রাযি. বলেন,
مَا غِرْتُ عَلَى نِسَاءِ النَّبِيِّ ﷺ إِلَّا عَلَى خَدِيجَةَ، وَإِنِّي لَمْ أُدْرِكْهَا
“আমি নবী ﷺ-এর কোনো স্ত্রীর ব্যাপারে যতটা ঈর্ষা অনুভব করেছি, খাদিজা রাযি.-এর ব্যাপারে ততটা করেছি; অথচ আমি তাঁকে দেখিইনি।”
রাসূলুল্লাহ ﷺ হযরত খাদিজা রাযি.-এর ব্যাপারে বলতেন,
إِنِّي قَدْ رُزِقْتُ حُبَّهَا
নিশ্চয়ই আল্লাহ আমাকে তাঁর ভালোবাসা দান করেছেন।’— সহিহ মুসলিম, হাদিস ২৪৩৫।
হযরত খাদিজা রাযি.-এর জীবন আমাদের শিক্ষা দেয়—একজন মুমিন নারীর সৌন্দর্য শুধু বাহ্যিক আবরণে নয়; বরং তাঁর পবিত্রতা, লজ্জাশীলতা, আত্মমর্যাদা, স্বামী-সংসারের প্রতি বিশ্বস্ততা এবং আল্লাহর প্রতি আনুগত্যের মধ্যেই প্রকৃত সৌন্দর্য নিহিত।
আম্মাজান আয়েশা রাযি. ও সাহাবিয়াতদের পর্দা
সাহাবিয়াতদের পর্দার আলোচনা করতে গেলে সর্বপ্রথম যে মহীয়সী নারীর কথা আসে, তিনি হলেন উম্মুল মুমিনীন আয়েশা সিদ্দীকা রাযি.।
তিনি ছিলেন রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর ঘরের মানুষ, উম্মতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ আলিমা এবং পর্দা ও হায়ার জীবন্ত আদর্শ।
ইফকের ঘটনা: বিপদের মধ্যেও পর্দা
আয়েশা রাযি.-এর জীবনের সবচেয়ে বিখ্যাত ঘটনাগুলোর একটি হলো ইফকের ঘটনা।
এক সফর থেকে ফেরার পথে আয়েশা রাযি. তাঁর হার খুঁজতে গিয়ে বাহিনী থেকে পিছনে পড়ে যান। বাহিনী তাঁকে হাওদাজের মধ্যে আছে মনে করে চলে যায়। পরে সাহাবি সাফওয়ান ইবনে মু‘আত্তাল রাযি. সেখানে এসে তাঁকে দেখতে পান।
এখানে আয়েশা রাযি.-এর আচরণ অত্যন্ত শিক্ষণীয়।
তিনি বলেন,
فَعَرَفَنِي حِينَ رَآنِي، وَكَانَ رَآنِي قَبْلَ الْحِجَابِ، فَاسْتَيْقَظْتُ بِاسْتِرْجَاعِهِ حِينَ عَرَفَنِي، فَخَمَّرْتُ وَجْهِي بِجِلْبَابِي، وَاللَّهِ مَا تَكَلَّمْنَا بِكَلِمَةٍ، وَلَا سَمِعْتُ مِنْهُ كَلِمَةً غَيْرَ اسْتِرْجَاعِهِ
সে আমাকে দেখে চিনতে পারল। সে আমাকে পর্দার বিধান নাজিল হওয়ার আগে দেখেছিল। তার ইস্তিরজা পাঠে আমি জেগে উঠলাম। সে আমাকে চিনতে পারতেই আমি আমার মুখ জিলবাব দিয়ে ঢেকে নিলাম। আল্লাহর কসম! আমরা একটি কথাও বলিনি এবং আমি তার কাছ থেকে ইস্তিরজা ছাড়া আর কোনো কথা শুনিনি।—সহিহ বুখারি, হাদিস ৪১৪১; ফাতহুল বুখারী শরহু সহীহিল বুখারী।
এই একটি ঘটনা সাহাবিয়াতদের পর্দার মান বোঝার জন্য যথেষ্ট।
একজন নারী একা, মরুভূমিতে, চারদিকে কোনো মানুষ নেই; সামনে একজন সাহাবি। তবুও আয়েশা রাযি.-এর প্রথম কাজ কী?
فَخَمَّرْتُ وَجْهِي بِجِلْبَابِي
“আমি আমার মুখ জিলবাব দিয়ে ঢেকে নিলাম।”
পর্দা তাঁর কাছে মানুষের উপস্থিতির ওপর নির্ভরশীল ছিল না; বরং এটি ছিল আল্লাহর বিধান ও অন্তরের হায়ার বিষয়।
ইফকের ঘটনা শুধু পর্দার ঘটনা নয়
ইফকের ঘটনায় আয়েশা রাযি. দীর্ঘ এক মাস অপবাদ, দুশ্চিন্তা ও কষ্টের মধ্যে ছিলেন। শেষ পর্যন্ত আল্লাহ তাআলা কুরআনের আয়াত নাজিল করে তাঁর পবিত্রতা ঘোষণা করেন,
إِنَّ الَّذِينَ جَاءُوا بِالْإِفْكِ عُصْبَةٌ مِنْكُمْ
“যারা এই মিথ্যা অপবাদ রটনা করেছে, তারা তোমাদেরই একটি দল।”—সূরা আন-নূর: ১১
এই ঘটনার মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা শুধু আয়েশা রাযি.-এর পবিত্রতা ঘোষণা করেননি; বরং মুসলিম সমাজকে শিখিয়েছেন,
নারীর সম্মান নিয়ে কথা বলার ক্ষেত্রে কতটা সতর্ক হতে হবে;
কোনো অপবাদ যাচাই ছাড়া প্রচার করা যাবে না;
মুমিন নারী-পুরুষ উভয়েরই দৃষ্টি ও মুখের হেফাজত করতে হবে;
চরিত্রহনন কত ভয়াবহ অপরাধ।
আয়েশা রাযি.-এর তাওয়াফের সময় পর্দা
পর্দা মানে ইবাদত ছেড়ে দেওয়া নয়। আয়েশা রাযি. হজ করেছেন, তাওয়াফ করেছেন; কিন্তু পুরুষদের সঙ্গে মিশে নয়।
সহিহ বুখারির একটি গুরুত্বপূর্ণ বর্ণনায় এসেছে,
وَكَانَتْ عَائِشَةُ تَطُوفُ حِجَابًا لَا تُخَالِطُ الرِّجَالَ
বর্ণনার মর্ম হলো, আয়েশা রাযি. পুরুষদের সঙ্গে মিশে তাওয়াফ করতেন না। এমনকি এক নারী তাঁকে হাজরে আসওয়াদ স্পর্শ করতে যাওয়ার প্রস্তাব দিলে তিনি নিজে তা থেকে বিরত থাকেন। উম্মাহাতুল মুমিনীনরা রাতে তাওয়াফ করতেন এবং কাবায় প্রবেশের প্রয়োজন হলে পুরুষেরা বের হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতেন। সহীহ বুখারী, ১৬১৮; ফাতহুল বারী: ৩/৫৬০
এখানে আমাদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা রয়েছে,
পবিত্র স্থান হলেও পর্দার বিধান বাতিল হয়ে যায় না।
আজ কেউ যদি বলে, “এটি তো মসজিদ”, “এটি তো ইবাদতের স্থান”—তাহলে সাহাবিয়াতদের আমল তার উত্তর দেয়।
উম্মে সালামা রাযি. ও পোশাকের পর্দা
উম্মুল মুমিনীন উম্মে সালামা রাযি. ছিলেন পর্দার ব্যাপারে অত্যন্ত সতর্ক।
একবার নারীদের পোশাকের নিচের অংশ কতটুকু লম্বা হবে, এ বিষয়ে আলোচনা হলে তিনি রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে জিজ্ঞেস করলেন,
فَكَيْفَ النِّسَاءُ؟
“তাহলে নারীরা কী করবে?”
রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন,
يُرْخِينَ شِبْرًا
“তারা এক বিঘত ঝুলিয়ে দেবে।”
উম্মে সালামা রাযি. বললেন,
إِذًا تَنْكَشِفُ أَقْدَامُهُنَّ
“তাহলে তো তাদের পা প্রকাশ হয়ে যাবে।”
রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন,
فَيُرْخِينَ ذِرَاعًا، لَا يَزِدْنَ عَلَيْهِ
“তাহলে এক হাত পরিমাণ ঝুলিয়ে দেবে; এর বেশি নয়।”—জামে তিরমিজি, ১৭৩১।
খেয়াল করুন, উম্মে সালামা রাযি.-এর চিন্তা কী ছিল?
তিনি ভাবেননি, “কাপড় তো এমনিতেই অনেক বড়।” বরং তাঁর চিন্তা ছিল—“আমার পা যেন প্রকাশ না হয়ে যায়।” এটাই ছিল সাহাবিয়াতদের তাকওয়া।
অসুস্থ অবস্থাতেও উম্মে সালামা রাযি.-এর পর্দার ব্যবস্থা
হজের সময় উম্মে সালামা রাযি. অসুস্থ ছিলেন। তিনি রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে জানালে তিনি বললেন,
طُوفِي مِنْ وَرَاءِ النَّاسِ وَأَنْتِ رَاكِبَةٌ
“তুমি মানুষের পেছন দিয়ে সওয়ার অবস্থায় তাওয়াফ করো।”
উম্মে সালামা রাযি. তাই করেছিলেন।—সহিহ বুখারি ১৬১৯।
অর্থাৎ তিনি ইবাদতও করলেন, আবার মানুষের ভিড়ের মধ্যেও নিজেকে আলাদা রাখার ব্যবস্থা করলেন।
ফজরের নামাজে সাহাবিয়াতদের পোশাক
আম্মাজান আয়েশা রাযি. বলেন,
لَقَدْ كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم يُصَلِّي الْفَجْرَ، فَيَشْهَدُ مَعَهُ نِسَاءٌ مِنَ الْمُؤْمِنَاتِ مُتَلَفِّعَاتٍ فِي مُرُوطِهِنَّ، ثُمَّ يَرْجِعْنَ إِلَى بُيُوتِهِنَّ مَا يَعْرِفُهُنَّ أَحَدٌ
“রাসূলুল্লাহ ﷺ ফজরের নামাজ পড়তেন। মুমিন নারীদের কিছুসংখ্যক নারী তাঁর সঙ্গে ফজরের নামাজে উপস্থিত হতেন। তাঁরা নিজেদের চাদরে সম্পূর্ণভাবে আবৃত থাকতেন। এরপর তাঁরা নিজেদের ঘরে ফিরে যেতেন; অন্ধকারের কারণে কেউ তাঁদের চিনতে পারত না।”—সহিহ বুখারি, ৩৭২।
এখানে লক্ষ্য করুন, সাহাবিয়াতরা মসজিদে যেতেন। তাঁরা দ্বীনের শিক্ষা গ্রহণ করতেন। কিন্তু বের হওয়ার সময় নিজেদের শরীর আবৃত করতেন।
অর্থাৎ ইসলাম নারীকে ঘরে বন্দি করেনি; বরং বাইরে বের হওয়ার আদব ও সীমারেখা নির্ধারণ করেছে।
আসমা রাযি.-এর পোশাকের ঘটনা
আসমা বিনতে আবু বকর রাযি. রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর কাছে পাতলা কাপড় পরিহিত অবস্থায় প্রবেশ করেছিলেন—এমন একটি বর্ণনা আবু দাউদে এসেছে। এতে রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁর দিকে দৃষ্টি ফেরান এবং নারীর পোশাক সম্পর্কে নির্দেশ দেন।
يَا أَسْمَاءُ، إِنَّ الْمَرْأَةَ إِذَا بَلَغَتِ الْمَحِيضَ لَمْ تَصْلُحْ أَنْ يُرَى مِنْهَا إِلَّا هَذَا وَهَذَا
এবং তিনি নিজের মুখ ও হাতের দিকে ইশারা করেন।—সুনান আবু দাউদ, ৪১০৪।
আয়েশা রাযি. ও উসমান রাযি.-এর ঘটনা: হায়ার সূক্ষ্মতা
হায়ার আরেকটি অসাধারণ দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় আয়েশা রাযি.-এর বর্ণনায়।
সাঈদ ইবনুল আস নবী (ﷺ) এর স্ত্রী আয়িশা ও উসমান (রাযিঃ) থেকে বর্ণনা করেন যে, আবু বকর (রাযিঃ) রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর কাছে প্রবেশের অনুমতি চাইলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তখন নিজের বিছানায় আয়িশার চাদর গায়ে দিয়ে শুয়ে ছিলেন। তিনি আবু বকরকে অনুমতি দিলেন। আর তিনি এ অবস্থায়ই রইলেন। আবু বকর (রাযিঃ) তাঁর প্রয়োজনে শেষ করে চলে গেলেন। এরপর উমর (রাযিঃ) অনুমতি চাইলে তাঁকে অনুমতি দিলেন এবং রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এ অবস্থায়ই রইলেন। উমর (রাযিঃ) তাঁর কাজ সেরে চলে গেলেন।
উসমান (রাযিঃ) বলেন, এরপর আমি অনুমতি চাইলাম, তিনি উঠে বসে পড়লেন এবং আমাকে বললেন, قَالَ لِعَائِشَةَ " اجْمَعِي عَلَيْكِ ثِيَابَكِ " ভালোমতো তোমার গায়ে কাপড় ঠিক করে নাও। আমি আমার কাজ শেষ করে চলে গেলে আয়িশা (রাযিঃ) বললেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ! কি ব্যাপার, আবু বকর ও উমর (রাযিঃ) এলে আপনাকে এমন ব্যতিব্যস্ত হতে দেখলাম না, যেমন উসমান আসতেই আপনি ব্যতিব্যস্ত হলেন! রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেনঃ উসমান (রাযিঃ) বড়ই লাজুক পুরুষ। তাই আমি ভাবলাম, এ অবস্থায় তাকে আসতে বললে হয়ত সে তার প্রয়োজন আমার কাছে পেশ করতে পারবে না।—সহীহ মুসলিম, হাদীস নং: ২৪০২
এ ঘটনা আমাদের শেখায়—হায়া ঈমানের সৌন্দর্য।
ফাতিমা রাযি.—মৃত্যুর পরও পর্দার চিন্তা
রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর প্রিয় কন্যা ফাতিমা রাযি. ছিলেন হায়া ও পবিত্রতার প্রতীক।
তাঁর মৃত্যুর পূর্বে আসমা বিনতে উমাইস রাযি.-এর সঙ্গে একটি প্রসিদ্ধ বর্ণনা পাওয়া যায়। ফাতিমা রাযি. চিন্তা করেছিলেন, মৃত্যুর পর জানাজার সময় তাঁর দেহের আকৃতি যেন প্রকাশ না পায়। তখন আসমা রাযি. হাবশায় দেখা একটি পদ্ধতির কথা বলেন।
বর্ণনায় এসেছে—
أَلَا تَرَيْنَ إِلَى مَا بَلَغْتُ، أُحْمَلُ عَلَى السَّرِيرِ ظَاهِرًا؟
ফাতিমা রাযি. বললেন, “তুমি কি দেখছ না, আমি কতটা অবস্থায় পৌঁছেছি? আমাকে খাটের ওপর এমনভাবে বহন করা হবে যে আমার দেহের অবয়ব প্রকাশ পাবে।”
তখন আসমা রাযি. বললেন—
أَلَا لَعَمْرِي، وَلَكِنْ أَصْنَعُ لَكِ نَعْشًا كَمَا رَأَيْتُ يُصْنَعُ بِأَرْضِ الْحَبَشَةِ
“না, আল্লাহর কসম! বরং আমি তোমার জন্য এমন একটি আচ্ছাদিত কাঠামো তৈরি করব, যেমনটি আমি হাবশার দেশে দেখেছি।”
এরপর খেজুরের ডাল দিয়ে কাঠামো তৈরি করা হয় এবং তার ওপর কাপড় দেওয়া হয়। বর্ণনায় এসেছে, ফাতিমা রাযি. এতে সন্তুষ্ট হন এবং তাঁর পর্দার চিন্তা দূর হয়। ––আল মুসতাদরাক আলাস সহীহহাইন: ৪/১৫১
আসমা বিনতে উমাইসের পর্দা
হযরত আসমা বিনতে উমাইস রাযি., পোশাকের ব্যাপারে অত্যন্ত সতর্কতা
সুনানে কুবরা বায়হাকীতে এসেছে। আসমা বিনতে উমাইস রাযি. বলেন,
دَخَلَ رَسُولُ اللهِ صلى الله عليه وسلم عَلَى عَائِشَةَ بِنْتِ أَبِي بَكْرٍ، وَعِنْدَهَا أُخْتُهَا أَسْمَاءُ بِنْتُ أَبِي بَكْرٍ، وَعَلَيْهَا ثِيَابٌ شَامِيَّةٌ وَاسِعَةُ الْأَكْمَامِ، فَلَمَّا نَظَرَ إِلَيْهَا رَسُولُ اللهِ صلى الله عليه وسلم قَامَ فَخَرَجَ...
এরপর আয়েশা রাযি. তাঁকে সরে যেতে বলেন। রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁর পোশাকের অবস্থা অপছন্দ করেছেন—এ কথা বুঝতে পেরে তিনি সরে যান।
বর্ণনায় এরপর এসেছে—
إِنَّهُ لَيْسَ لِلْمَرْأَةِ الْمُسْلِمَةِ أَنْ يَبْدُوَ مِنْهَا إِلَّا هَذَا وَهَذَا
মুসলিম নারীর এমনভাবে প্রকাশ পাওয়া উচিত নয়, বরং এতটুকু ও এতটুকু।
বর্ণনাটিতে রাসূলুল্লাহ ﷺ মুখ ও হাতের দিকে ইঙ্গিত করার কথা এসেছে।— সুনানুল কুবরা লিল-বায়হাকি, ৭/১৩৮, হাদিস ১৩৪৯৭।
আয়েশা রাযি. এর তাওয়াফেও নিকাব
সাফিয়্যা বিনতে শাইবা রাযি. বলেন—
أَنَّ عَائِشَةَ كَانَتْ تَطُوفُ وَهِيَ مُتَنَقِّبَةٌ
অর্থ: আয়েশা রাযি. তাওয়াফ করতেন, আর তিনি নিকাব পরিহিত থাকতেন।—ফাদলুর রাহীমিল ওয়াদূদ, তাখরীজু সুনানি আবী দাঊদ: ২/১৪।
এটি আখবারু মক্কায় এসেছে। একই অর্থের বর্ণনা মুসান্নাফ আবদুর রাজ্জাকেও পাওয়া যায়।
আরেক বর্ণনায় এসেছে—
حَدَّثَنِي جَدِّي قَالَ: حَدَّثَنِي مُسْلِمُ بْنُ خَالِدٍ الزَّنْجِيُّ، عَنِ ابْنِ جُرَيْجٍ، عَنْ عَطَاءٍ، أَنَّهُ كَرِهَ أَنْ تَطُوفَ الْمَرْأَةُ بِالْكَعْبَةِ وَهِيَ مُتَنَقِّبَةٌ، حَتَّى أَخْبَرَتْهُ صَفِيَّةُ بِنْتُ شَيْبَةَ أَنَّهَا رَأَتْ عَائِشَةَ تَطُوفُ بِالْبَيْتِ وَهِيَ مُتَنَقِّبَةٌ، فَرَجَعَ عَنْ رَأْيِهِ ذَلِكَ وَأَرْخَصَ فِيهِ
অর্থ: আতা রহ. প্রথমে নিকাব পরে নারীর তাওয়াফ করা অপছন্দ করতেন। পরে সাফিয়্যা বিনতে শাইবা রাযি. তাঁকে জানালেন যে, তিনি আয়েশা রাযি.-কে নিকাব পরিহিত অবস্থায় তাওয়াফ করতে দেখেছেন। তখন তিনি তাঁর পূর্বের মত থেকে ফিরে এসে এতে অনুমতি দেন।—আল-আযরাকী, আখবারু মক্কাহ, ২/১৪ ।
আয়েশা রাযি.—পুরুষ পথিকদের সামনে মুখ ঢেকে নেওয়া
হজের ইহরাম অবস্থায় আয়েশা রাযি. ও অন্যান্য নারীরা পুরুষদের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় মুখের ওপর জিলবাব নামিয়ে দিতেন।
كَانَ الرُّكْبَانُ يَمُرُّونَ بِنَا وَنَحْنُ مَعَ رَسُولِ اللَّهِ ﷺ مُحْرِمَاتٍ، فَإِذَا حَاذَوْا بِنَا سَدَلَتْ إِحْدَانَا جِلْبَابَهَا مِنْ رَأْسِهَا عَلَى وَجْهِهَا، فَإِذَا جَاوَزُونَا كَشَفْنَاهُ
অর্থ: আমরা রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সঙ্গে ইহরাম অবস্থায় থাকতাম। পথিকরা যখন আমাদের পাশ দিয়ে অতিক্রম করত, তখন আমাদের একজন মাথা থেকে জিলবাব মুখের ওপর নামিয়ে দিত। তারা চলে গেলে আমরা তা সরিয়ে নিতাম।— সুনানে আবু দাউদ, ১৮৩৩; ইবনে মাজাহ, ২৯৩৫; মুসনাদে আহমদ, ২৪০২১।
আনসারি নারীরা—পর্দার আয়াত নাজিল হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তন
উম্মে সালামা রাযি. বলেন,
لَمَّا نَزَلَتْ: يُدْنِينَ عَلَيْهِنَّ مِنْ جَلَابِيبِهِنَّ خَرَجَ نِسَاءُ الْأَنْصَارِ كَأَنَّ عَلَى رُؤُوسِهِنَّ الْغِرْبَانَ مِنَ الْأَكْسِيَةِ
অর্থ: যখন এই আয়াত নাজিল হলো—তারা যেন নিজেদের ওপর তাদের জিলবাব টেনে দেয়—তখন আনসারি নারীরা এমনভাবে বের হলেন, যেন তাদের মাথার ওপর কালো কাক বসে আছে।—সুনানে আবু দাউদ, ৪১০১।
পর্দার আড়াল থেকে একজন নারীর চিঠি
আয়েশা রাযি. থেকে বর্ণিত,
جَاءَتِ امْرَأَةٌ وَرَاءَ السِّتْرِ بِيَدِهَا كِتَابٌ إِلَى رَسُولِ اللهِ صلى الله عليه وسلم
অর্থ: একজন নারী পর্দার আড়াল থেকে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর কাছে একটি চিঠি নিয়ে হাত বাড়িয়ে দিলেন।
রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন,
مَا أَدْرِي أَيَدُ رَجُلٍ أَمْ يَدُ امْرَأَةٍ؟
আমি জানি না, এটি পুরুষের হাত, নাকি নারীর হাত?
নারী বললেন, নারীর হাত। তখন তিনি বললেন—
لَوْ كُنْتِ امْرَأَةً لَغَيَّرْتِ أَظْفَارَكِ بِالْحِنَّاءِ
অর্থ: তুমি যদি নারী হও, তাহলে মেহেদি দিয়ে তোমার নখ রাঙাতে।—সুনান আবি দাউদ, ৪১৬৬
ফাতিমা বিনতে কায়েস রাযি.—পর্দা রক্ষায় রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর বিশেষ নির্দেশ
তালাকের পর কোথায় ইদ্দত পালন করবেন, সে বিষয়ে রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁকে বলেছিলেন—
فَإِنِّي أَكْرَهُ أَنْ يَسْقُطَ عَنْكِ خِمَارُكِ، أَوْ يَنْكَشِفَ الثَّوْبُ عَنْ سَاقَيْكِ، فَيَرَى الْقَوْمُ مِنْكِ مَا تَكْرَهِينَ
আমি অপছন্দ করি যে, তোমার ওড়না পড়ে যাক অথবা তোমার কাপড় তোমার পায়ের পিণ্ডলি থেকে সরে যায়, ফলে সেখানে আগত লোকেরা তোমার এমন কিছু দেখে ফেলে যা তুমি অপছন্দ কর।
এরপর তাঁকে ইবনে উম্মে মাকতুম রাযি.-এর বাড়িতে ইদ্দত পালনের নির্দেশ দেওয়া হয়।- সহিহ মুসলিম।
আয়েশা রাযি.-এর কাছে ‘যীনাতে জাহিরা’ সম্পর্কে প্রশ্ন
উম্মে শাবীব নামে এক নারী আয়েশা রাযি.-কে জিজ্ঞেস করেন,
سَأَلْتُ عَائِشَةَ رَضِيَ اللهُ عَنْهَا عَنِ الزِّينَةِ الظَّاهِرَةِ
আমি আয়েশা রাযি.-কে প্রকাশ্য সৌন্দর্য বা অলংকার সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম।
তিনি বলেন,
الْقَلْبُ وَالْفَتْخَةُ
অর্থাৎ হাতের বালা বা অনুরূপ অলংকারের কথা উল্লেখ করেন এবং নিজের হাতার দ্বারা ইঙ্গিত করেন।—সুনানুল কুবরা লিল-বায়হাকি, ৭/৮৬।
আসমা বিনতে আবু বকর রাযি.-এর পাতলা পোশাকের ঘটনা
এক বর্ণনায় এসেছে, আসমা বিনতে আবু বকর রাযি.-এর পরনে ছিল পাতলা শামী পোশাক,
وَعَلَيْهَا ثِيَابٌ شَامِيَّةٌ رِقَاقٌ
অর্থ: তাঁর পরনে ছিল পাতলা শামী পোশাক।
এ অবস্থা দেখে রাসূলুল্লাহ ﷺ দৃষ্টি ফিরিয়ে নেন এবং নারীর পোশাকের সীমা সম্পর্কে নির্দেশ দেন।—সুনান আবি দাউদ
মাইমুনা রাযি.—নামাজে আবরণের প্রতি যত্ন
মাইমুনা রাযি. সম্পর্কে বর্ণিত হয়েছে,
أَنَّهَا كَانَتْ تُصَلِّي فِي الدِّرْعِ وَالْخِمَارِ لَيْسَ عَلَيْهَا إِزَارٌ
অর্থ: তিনি জামা ও ওড়না পরেই নামাজ পড়তেন; তাঁর ওপর আলাদা ইযার ছিল না।—মুয়াত্তা ইমাম মালিক।
পর্দা মানে ঘরে বন্দি থাকা নয়
সাহাবিয়াতদের জীবন থেকে একটি বিষয় পরিষ্কার—পর্দা মানে নারীকে ঘরের চার দেয়ালের মধ্যে বন্দি করে রাখা নয়।
আয়েশা রাযি. ছিলেন উম্মতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ শিক্ষক।
নারীরা তাঁর কাছে ইলম শিখেছেন। পুরুষ সাহাবিরাও তাঁর কাছ থেকে হাদিস ও ফিকহ শিখেছেন। কিন্তু ইলমের এই বিশাল খেদমতও পর্দার সীমারেখার বাইরে ছিল না।
হজে তাঁরা অংশ নিয়েছেন।
মসজিদে গেছেন।
প্রয়োজনে বাইরে বের হয়েছেন।
অসুস্থদের সেবা করেছেন।
যুদ্ধে আহতদের পানি পান করিয়েছেন।
কিন্তু এসবের মধ্যেও হায়া ও শরয়ি সীমারেখা তাঁদের জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়নি। এটাই ইসলামের ভারসাম্য।
সাহাবিয়াতদের পর্দা ছিল কয়েক স্তরের
সাহাবিয়াতদের জীবন পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, তাঁদের পর্দা শুধু শরীর ঢাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না।
১. চোখের পর্দা
কুরআন প্রথমে পুরুষ ও নারী উভয়কেই দৃষ্টি সংযত করার নির্দেশ দিয়েছে।
২. পোশাকের পর্দা
নারীরা এমন পোশাক পরতেন, যা শরীরকে যথাযথভাবে আবৃত করত। উম্মে সালামা রাযি.-এর ঘটনা এর উজ্জ্বল উদাহরণ।
৩. মুখ ও সৌন্দর্যের পর্দা
ইফকের ঘটনায় আয়েশা রাযি. গায়রে মাহরাম পুরুষের সামনে পড়েই মুখ জিলবাব দিয়ে ঢেকে নিয়েছিলেন।
৪. চলাফেরার পর্দা
তাওয়াফের সময় আয়েশা রাযি. পুরুষদের সঙ্গে মিশতেন না। উম্মে সালামা রাযি.-কে অসুস্থ অবস্থায়ও মানুষের পেছনে থেকে তাওয়াফ করতে বলা হয়েছিল।
৫. কথাবার্তার পর্দা
কুরআন নারীদের এমন কোমল ভঙ্গিতে কথা বলতে নিষেধ করেছে, যাতে অন্তরে রোগগ্রস্ত ব্যক্তি আকৃষ্ট হয়—
فَلَا تَخْضَعْنَ بِالْقَوْلِ فَيَطْمَعَ الَّذِي فِي قَلْبِهِ مَرَضٌ
“তোমরা কথায় এমন কোমলতা অবলম্বন করো না, যাতে যার অন্তরে ব্যাধি রয়েছে সে লালসা করে বসে।”—সূরা আল-আহযাব: ৩২
সাহাবিয়াতদের পর্দা আমাদের কী শিক্ষা দেয়?
সাহাবিয়াতদের জীবন থেকে সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো—পর্দা মানুষের জন্য নয়, আল্লাহর জন্য।
আয়েশা রাযি. যখন মরুভূমিতে একা ছিলেন, তখনও মুখ ঢেকেছিলেন।
কেউ তাঁকে নির্দেশ দিচ্ছিল না।
কেউ তাঁকে দেখার মতোও ছিল না।
তবুও তিনি পর্দা করলেন।
কারণ তাঁর অন্তরে ছিল আল্লাহর ভয়।
মুহাজির নারীরা যখন আয়াত শুনলেন, তখন তাঁরা নিজেদের কাপড় ছিঁড়ে পর্দা করলেন।
উম্মে সালামা রাযি. নিজের পা প্রকাশ পাওয়ার আশঙ্কা করলেন।
আয়েশা রাযি. পুরুষদের সঙ্গে তাওয়াফ করা থেকে বিরত থাকলেন।
এগুলো আমাদের সামনে একটি প্রশ্ন রাখে—
আজ আমরা পর্দার ক্ষেত্রে কাকে অনুসরণ করছি?
ফ্যাশনের জগতকে?
সামাজিক রীতিকে?
নাকি রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর ঘরের নারীদের?
সুতরাং, সাহাবিয়াতদের পর্দার ইতিহাস পড়লে বোঝা যায়, তাঁদের কাছে পর্দা কোনো বোঝা ছিল না। এটি ছিল তাঁদের ঈমানের সৌন্দর্য, হায়ার পরিচয় এবং আল্লাহর আনুগত্যের নিদর্শন।
আয়েশা রাযি. ছিলেন জ্ঞানের সমুদ্র, কিন্তু একই সঙ্গে ছিলেন পর্দাশীল নারী।
উম্মে সালামা রাযি. ছিলেন প্রজ্ঞার অধিকারী, কিন্তু তাঁর পোশাকের সামান্য অংশও যেন প্রকাশ না পায়—এ নিয়ে তিনি সতর্ক ছিলেন।
মুহাজির নারীরা ছিলেন দ্বীনের প্রথম প্রজন্মের নারী; আয়াত নাজিল হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাঁরা নিজেদের কাপড় দিয়ে পর্দা করলেন।
আনসারি নারীরা আল্লাহর নির্দেশ পেয়ে নিজেদের জিলবাবে আবৃত হলেন।
ফাতিমা রাযি.-এর জীবনের প্রসিদ্ধ বর্ণনা আমাদের সামনে এমন এক হায়ার চিত্র তুলে ধরে, যেখানে মৃত্যুর পরও নারীর দেহের মর্যাদা ও আবরণের বিষয়টি তাঁর চিন্তার মধ্যে ছিল।
এরা ছিলেন আমাদের পূর্বসূরি।
তাঁদের জীবন আমাদের বলে—
পর্দা সৌন্দর্যের মৃত্যু নয়; পর্দা সৌন্দর্যের মর্যাদা।
পর্দা নারীর বন্দিত্ব নয়; পর্দা তার পবিত্রতার প্রহরী।
পর্দা সমাজের চাপ নয়; পর্দা আল্লাহর আনুগত্য।
আর যে নারী আল্লাহর জন্য পর্দা গ্রহণ করে, সে আসলে নিজের সৌন্দর্যকে মানুষের দৃষ্টি থেকে সরিয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য সংরক্ষণ করে।
আল্লাহ তাআলা আমাদের মা-বোনদের আয়েশা সিদ্দীকা রাযি., উম্মে সালামা রাযি., ফাতিমা রাযি. ও অন্যান্য সাহাবিয়াতদের হায়া ও পর্দার আদর্শ অনুসরণ করার তাওফিক দান করুন। আমিন।
মন্তব্য (...)
এ সম্পর্কিত আরও প্রবন্ধ
সুন্নাহ-সম্মত পোশাক (পর্ব দুই)
ষষ্ঠ মূলনীতি: পুরুষের পোশাক জাফরানী, কুসুমী কিংবা গাঢ় লাল রঙের না হওয়া। পুরুষের জন্য জাফরানী রঙের ...
নারীর রূপচর্চা : বৈধতা ও অবৈধতার সীমারেখা
এক. কার জন্য সাজবেন? প্রিয় বোন, সাজসজ্জার ক্ষেত্রে প্রথমে ভাবতে হবে, আপনি কার জন্য এবং কাকে দেখানোর ...
সুন্নাহ-সম্মত পোশাক (পর্ব তিন)
(আট) পোশাকের চারটি স্তর ফরজ পর্যায় : পোশাকের প্রথম স্তর ফরয। এতে কোন ব্যত্যয় ঘটলে কবীরা গুনাহ হবে।...
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন