প্রবন্ধ
নারী সাহাবীদের দানশীলতা
৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
৩৩২
০
ইসলামী সভ্যতার সূচনালগ্ন থেকেই দানশীলতা, উদারতা ও পরোপকারকে আত্মিক পরিশুদ্ধির অন্যতম মাধ্যম হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। নিজের ভালোবাসার বস্তু ও অর্জিত সম্পদকে আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে অকাতরে বিলিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে সোনালী যুগের পুণ্যবতী নারী সাহাবীগণ যে সুমহান আদর্শ স্থাপন করে গেছেন, তা মানব ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে খোদাই করা আছে।
যাঁরা আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-এর পবিত্র সান্নিধ্যে ঈমান ও ইহসানের গভীর পাঠ গ্রহণ করেছিলেন, তাঁদের নিকট পার্থিব ধন-সম্পদ কেবলই পরকালীন পাথেয় অর্জনের বাহন ছিল। তাঁরা কেবল সচ্ছল অবস্থায় দান করেননি, বরং তীব্র অভাব-অনটন ও সংকটের মুহূর্তেও নিজেদের ওপর অন্যকে অগ্রাধিকার দিয়ে ত্যাগের এক অভূতপূর্ব দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন।
সমকালীন ভোগবাদী ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক সমাজে যখন মানুষ কেবল নিজের স্বার্থ রক্ষায় ব্যতিব্যস্ত, তখন এই মহীয়সী নারীদের নিঃস্বার্থ দান, উদারতা ও ইখলাসের জীবনাদর্শ আমাদের অন্তরে এক নতুন আধ্যাত্মিক জাগরণ সৃষ্টি করতে পারে।
যয়নব বিনতে জাহশ (রা.)-এর স্বহস্তে উপার্জিত অর্থ দান
উম্মুল মুমিনীন হযরত যয়নব বিনতে জাহশ (রা.) ছিলেন দানশীলতা ও সদকার ক্ষেত্রে নারী সাহাবীদের মাঝে এক প্রোজ্জ্বল নক্ষত্র। তিনি কেবল স্বামীর দেওয়া অর্থই দান করতেন না, বরং নিজে পরিশ্রম করে উপার্জন করতেন তারপর সেই সম্পদ আল্লাহর দ্বীনের জন্য এবং দরিদ্রদের কল্যাণে বিলিয়ে দিতেন।
হযরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) একবার তাঁর স্ত্রীদের লক্ষ্য করে বলেছিলেন:
«أَسْرَعُكُنَّ لُحُوقًا بِي أَطْوَلُكُنَّ يَدًا»
"তোমাদের মধ্যে আমার সাথে পরকালে সবার আগে সেই মিলিত হবে, যার হাত সবচেয়ে বেশি দীর্ঘ।" (সহীহ মুসলিম: ২৪৫২)
নবীজি (ﷺ)-এর পবিত্র ইন্তেকালের পর উম্মাহাতুল মুমিনীনগণ এই বাণীর রহস্য বুঝতে পেরেছিলেন। হযরত আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেছেন:
«فَكَانَتْ أطْوَلَنَا يَدًا زَيْنَبُ، لِأنَّهَا كَانَتْ تَعْمَلُ بِيَدِهَا وَتَتَصَدَّقُ»
"আমাদের মধ্যে যয়নবের হাতই ছিল সবচেয়ে দীর্ঘ; কারণ সে নিজের হাতে বিভিন্ন কাজ করত এবং তা থেকে সদকা করত।" (সহীহ মুসলিম: ২৪৫২)
তিনি তাঁর এই অসাধারণ পরিশ্রমের দ্বারা সমাজ থেকে অলসতা দূর করার এবং পরনির্ভরশীলতা পরিহার করে আত্মমর্যাদার সাথে সমাজসেবা করার এক চিরন্তন দৃষ্টান্ত স্থাপন করে রেখে গেছেন।
আয়েশা (রা.) ও আসমা (রা.): দানশীলতার দুই ভিন্ন ও অনুপম পদ্ধতি
হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.)-এর দুই মহীয়সী কন্যা উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা (রা.) এবং হযরত আসমা বিনতে আবি বকর (রা.) উভয়েই ছিলেন দানের ক্ষেত্রে শ্রেষ্ঠতম উদাহরণ। তবে তাঁদের দান করার মানসিকতা ও পদ্ধতি ছিল কিছুটা ভিন্ন ও অনন্য, যা মানুষের মনস্তত্ত্ব অনুযায়ী সদকার দুটি সুন্দর পথ নির্দেশ করে।
হযরত আব্দুল্লাহ বিন যুবাইর (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি তাঁর খালা ও মায়ের অকৃত্রিম দানের গভীরতা ও ধরন বর্ণনা করতে গিয়ে বলেছেন:
«مَا رَأَيْتُ امْرَأَتَيْنِ أَجْوَدَ مِنْ عَائِشَةَ وَأَسْمَاءَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمَا وَجُودُهُمَا مُخْتَلِفٌ، فَأَمَّا عَائِشَةُ فَكَانَتْ تَجْمَعُ الشَّيْءَ إِلَى الشَّيْءِ حَتَّى إِذَا اجْتَمَعَ عِنْدَهَا قَسَمَتْ، وَأَمَّا أَسْمَاءُ فَكَانَتْ لَا تُمْسِكُ شَيْئًا لِغَدٍ»
"আমি আয়েশা ও আসমা (রা.)-এর চেয়ে বেশি দানশীল আর কোনো নারীকে দেখিনি। তবে তাঁদের উভয়ের দানের ধরন ছিল ভিন্ন। হযরত আয়েশা (রা.) এক একটি জিনিস একত্রিত করতে থাকতেন এবং যখন বেশ কিছু সম্পদ জমা হতো, তখন তা অভাবীদের মাঝে বণ্টন করে দিতেন। আর হযরত আসমা (রা.) আগামীকালের জন্য কোনো কিছুই জমা করে রাখতেন না, হাতে আসামাত্রই বিলিয়ে দিতেন।" (আদাবুল মুফরাদ: ২৮০)
দান করার এই দুই ধরনের মাঝেই নিহিত রয়েছে ইখলাস ও ত্যাগের পবিত্রতম ছোঁয়া। হযরত আয়েশা (রা.)-এর দান ছিল সুপরিকল্পিত ও সুশৃঙ্খল এবং হযরত আসমা (রা.)-এর দান ছিল তাৎক্ষণিক ও পরম তাওয়াক্কুল বা আল্লাহর প্রতি নিখাদ বিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে।
তাঁদের এই জীবনাদর্শ আমাদের শেখায় যে, দান করার ক্ষেত্রে মানুষের আর্থিক সামর্থ্য বা মনস্তাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্যের তারতম্য থাকতে পারে, কিন্তু মূল লক্ষ্য হতে হবে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন।
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)-এর স্ত্রী যয়নব (রা.)-এর দান
দান বা সদকা কেবল অপরিচিত বা দূরের মানুষদেরই করতে হবে এমন নয়, বরং নিজের নিকটাত্মীয় ও পরিবারের লোকদের সাহায্য করাও ইসলামের দৃষ্টিতে বড় আমল। এর সবচেয়ে উত্তম উদাহরণ স্থাপন করেছিলেন হযরত যয়নব (রা.) (যিনি হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)-এর স্ত্রী ছিলেন)।
হযরত যয়নব (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদা আমি মসজিদে ছিলাম। তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে দেখলাম তিনি নারীদেরকে লক্ষ্য করে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বললেন:
«تَصَدَّقْنَ وَلَوْ مِنْ حُلِيِّكُنَّ»
"তোমরা সদকা করো, এমনকি তোমাদের অলঙ্কার থেকে হলেও।"
হযরত যয়নব (রা.) ছিলেন একজন উপার্জনক্ষম নারী। তিনি যখন নবীজি (ﷺ)-এর এই নির্দেশ শুনলেন, তখন তাঁর মনে প্রশ্ন জাগল যে তাঁর স্বামী হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) যেহেতু অভাবী ও দরিদ্র, তাই স্বামী ও এতিমদের ওপর এই সদকার অর্থ ব্যয় করা বৈধ হবে কি না।
তিনি নবীজি (ﷺ)-এর নিকট হযরত বিলাল (রা.)-এর মাধ্যমে এই ব্যাপারে সরাসরি ফতোয়া চাইলেন। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) অত্যন্ত আনন্দের সাথে এই প্রশ্নের উত্তরে বলেছিলেন:
«نَعَمْ، لَهَا أَجْرَانِ، أَجْرُ القَرَابَةِ وَأَجْرُ الصَّدَقَةِ»
"হ্যাঁ, তার জন্য দুটি সওয়াব রয়েছে; একটি হলো আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখার সওয়াব এবং অপরটি হলো সদকা করার সওয়াব।" (সহীহ মুসলিম: ১০০০)
এই ঘটনাটি প্রমাণ করে যে, ঘরের অভাবগ্রস্ত সদস্যদের পাশে দাঁড়ানো এবং তাঁদের অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা নিশ্চিত করা স্ত্রীর পক্ষ থেকে অনেক বড় দান ও কল্যাণের আমল। এটি একই সাথে পরিবারকে অভাবের হাত থেকে রক্ষা করে এবং আল্লাহর দরবারে দ্বিগুণ সওয়াবের অধিকারী বানায়।
সদকার জন্য নারীদেরকে নবীজি (ﷺ)-এর বিশেষ তাকিদ
ইসলামে নারীদের সম্পদ ও অলঙ্কারের ওপর একক মালিকানা ও অধিকার স্বীকার করা হয়েছে, তবে সেই সাথে তাঁদেরকে পরকালীন আযাব থেকে বাঁচতে বেশি বেশি দান করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ঈদের দিনগুলোতে নবীজি (ﷺ) বিশেষভাবে নারীদের সদকার গুরুত্ব তুলে ধরতেন, আর নারী সাহাবীগণও বিন্দুমাত্র কুণ্ঠাবোধ না করে নিজেদের অলঙ্কার উৎসর্গ করতেন।
হযরত আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, একদা রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ঈদের নামায শেষে নারীদের কাছে আসলেন এবং তাঁদেরকে আখেরাতের কথা স্মরণ করিয়ে সদকা করার বিশেষ তাকিদ করলেন। তখন নারী সাহাবীরা নিজেদের অলঙ্কারাদি খুলে হযরত বিলালের কাপড়ে ফেলতে লাগলেন। তিনি সেই দৃশ্যের বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন:
«فَأَخَذْنَ يَنْزِعْنَ الْفُتُحَ وَالْقُرْطَةَ وَالْخَوَاتِيمَ وَيُلْقِينَهَا فِي ثَوْبِ بِلاَلٍ»
"তখন পুণ্যবতী মহিলারা তাঁদের কানের দুল, হাতের চুড়ি, আংটি খুলে খুলে হযরত বিলালের কাপড়ে ফেলতে লাগলেন।" (সহীহ বুখারী: ৯৭৮, সহীহ মুসলিম: ৮৮৫)
নারী সাহাবীদের এই স্বতঃস্ফূর্ত ও তাৎক্ষণিক দানশীলতার উৎসব আজ বিশ্ব নারী সমাজের জন্য এক বিরল শিক্ষা। যেখানে মহিলারা নিজেদের অলঙ্কারকে সবচেয়ে প্রিয় বস্তু মনে করে সিন্দুকবন্দী করে রাখেন, সেখানে নারী সাহাবীগণ দ্বীনের প্রয়োজনে এবং আখেরাতের কল্যাণে সেই প্রিয় অলঙ্কার এক মুহূর্তের নোটিশে বিলিয়ে দিয়েছিলেন।
উম্মুল মুমিনীন খাদিজা (রা.): ইসলাম প্রচারে সর্বস্ব উৎসর্গ ও ত্যাগের সর্বোচ্চ শিখর
ইসলামের ইতিহাসের প্রথম ও সর্বশ্রেষ্ঠ দান এবং ত্যাগের সুউচ্চ পর্বত ছিলেন উম্মুল মুমিনীন হযরত খাদিজা (রা.)। আরবের অন্যতম ধনাঢ্য ও সফল ব্যবসায়ী নারী হওয়া সত্ত্বেও তিনি বিয়ের পর তাঁর সমস্ত সম্পদ আল্লাহর দ্বীন ও তাঁর প্রিয় স্বামীর খিদমতে নিঃশর্তভাবে সঁপে দিয়েছিলেন।
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) হযরত খাদিজা (রা.)-এর এই সুমহান ত্যাগের কথা সারা জীবন অত্যন্ত শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করতেন। হযরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) হযরত খাদিজা (রা.)-এর প্রশংসা করে বলেছিলেন:
«وَوَاسَتْنِي بِمَالِهَا إِذْ حَرَمَنِي النَّاسُ»
"সে তার সম্পদ দিয়ে আমাকে সান্ত্বনা ও সাহায্য করেছিল, যখন সাধারণ মানুষ আমাকে বঞ্চিত করেছিল।" (মুসনাদে আহমাদ: ২৪৮৬৪)
কুরাইশরা যখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এবং মুসলমানদেরকে শিআবে আবি তালিবে অবরুদ্ধ করে তিন বছর অর্থনৈতিকভাবে সম্পূর্ণ বয়কট করেছিল, তখন এই মহীয়সী নারী তাঁর বিপুল ঐশ্বর্য ও আরাম-আয়েশ বিসর্জন দিয়ে সেই মরুভূমির গুহায় গাছের পাতা খেয়ে দিনাতিপাত করেছিলেন, কিন্তু ক্ষণিকের জন্যও অনুযোগ করেননি। তাঁর এই সুমহান আত্মত্যাগ ও দানের কারণেই ইসলাম আরবের মরুভূমি পেরিয়ে আজ বিশ্বের আনাচে কানাচে ছড়িয়ে পড়েছে।
ইসলামের প্রথম নারী ওয়াকফ তদারককারী হিসেবে হাফসা (রা.)-এর ঐতিহাসিক ভূমিকা
ইসলামে নারীর মর্যাদা ও তাঁর অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক স্বাধীনতা কতখানি সুদৃঢ় ছিল, তার এক অনন্য দলিল হলো হযরত হাফসা (রা.)-এর ওয়াকফ পরিচালনার দায়িত্ব লাভ। তিনি কেবল নিজের সম্পদই দান করেননি, বরং ইসলামের ইতিহাসে প্রথম নারী ওয়াকফ তদারককারী বা ‘নাজিমা’ হিসেবে এক ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করেছিলেন।
তাঁর পিতা আমীরুল মুমিনীন হযরত উমর (রা.) ইন্তেকালের পূর্বে তাঁর সুবিশাল ওয়াকফ সম্পত্তি তদারকি ও পরিচালনার জন্য তাঁর মহীয়সী কন্যা হযরত হাফসা (রা.)-কে মনোনীত করে অসিয়ত করে গিয়েছিলেন। (সুনানে আবু দাউদ: ২৮৭৯)
একজন নারীর ওপর এত বড় একটি অর্থনৈতিক ও সামাজিক ট্রাস্টের দায়িত্ব অর্পণ করা ছিল ইসলামের ইতিহাসে এক বৈপ্লবিক ঘটনা। এই গৌরবময় অবদানের বর্ণনা ইতিহাসবিদদের লেখায় এভাবে উঠে এসেছে:
قامت حَفْصَةُ بإدارة أوقاف أبيها عمر بن الخطاب رضي الله عنه بناء على وصيته، وبذلك تعد أول ناظرة على الأوقاف في الإسلام
"হযরত হাফসা (রা.) তাঁর পিতা হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)-এর অসিয়ত মুতাবেক তাঁর ওয়াকফ সম্পত্তিগুলো তদারকি ও পরিচালনা করেছিলেন এবং এর মাধ্যমে তিনি ইসলামের ইতিহাসে প্রথম ওয়াকফ পরিচালনাকারিণী বা নাজিমা হিসেবে গণ্য হন।" (أوقاف النساء عبر التاريخ الإسلامي)
হযরত হাফসা (রা.)-এর এই বলিষ্ঠ ভূমিকা আজকের যুগে মুসলিম নারীদেরকে এধরণের কল্যাণমূলক কাজে অংশগ্রহণের জন্য অনুপ্রেরণা যোগায়।
উম্মুল মুমিনীন আয়েশা (রা.)-এর লক্ষাধিক দিরহাম দানের অসামান্য উপাখ্যান
উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা (রা.) ছিলেন দানশীলতা ও কৃচ্ছ্রসাধনের এক অনন্য উপাখ্যান। তাঁর জীবনের সবচেয়ে বিস্ময়কর ও হৃদয়স্পর্শী ঘটনাগুলোর একটি হল ক্ষুধার্ত অবস্থায়ও নিজের ইফতারের কথা ভুলে গিয়ে লক্ষাধিক দিরহামের বিশাল তহবিল অভাবী মানুষের মাঝে বিলিয়ে দেওয়া।
একদিন হযরত মুয়াবিয়া (রা.) আয়েশা (রা.)-এর নিকট এক লক্ষ দিরহাম হাদিয়া পাঠালেন। আয়েশা (রা.) সেদিন রোজা ছিলেন। কিন্তু সেই বিশাল সম্পদের একটি দিরহামও নিজের ঘরের জন্য না রেখে, অভাবী ও দরিদ্র মানুষের ঘরে ঘরে তা সঙ্গে সঙ্গে বিতরণ করে দেন।
পরবর্তীতে তাঁর খাদেমা হযরত বারীরাহ (রা.) বললেন:
أنتِ صائمةٌ، فهَلَّا ابتَعْتِ لنا بدِرْهَمٍ لحمًا؟
"আপনি তো আজ রোজা ছিলেন। আপনি কি এক দিরহাম দিয়ে ইফতারের জন্য সামান্য মাংস কিনতে পারতেন না? তখন আয়েশা (রা.) উত্তরে বললেন, মনে থাকলে তো করতাম।" (মুস্তাদরাক: ৬৯১৪)
নিজে অভুক্ত ও রোজা রাখা অবস্থায়ও লক্ষাধিক দিরহামের বিশাল সম্পদের মালিক হয়ে তা নিজের জন্য বিন্দুমাত্র সঞ্চয় না করা এবং দানের সময় নিজের ক্ষুধার কথাও ভুলে যাওয়া ত্যাগের এমন সুউচ্চ ও অপার্থিব নজির কেবল সাহাবীদের পক্ষেই স্থাপন করা সম্ভব ছিল।
হযরত আসমা বিনতে আবি বকর (রা.)-এর দান ও বরকত লাভের শিক্ষা
হযরত আসমা বিনতে আবি বকর (রা.)-এর ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবন ছিল আল্লাহর ওপর গভীর তাওয়াক্কুল ও উদারতার এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। তিনি কখনো নিজের কাছে সম্পদ জমিয়ে রাখতেন না এবং আগামীকালের জন্য কোনো কিছু সঞ্চয় করতেন না। নবীজি (ﷺ) তাঁকে বরকত অর্জন ও হৃদয়ের সংকীর্ণতা দূরীকরণে অকাতরে এবং মুক্তহস্তে দান করার নির্দেশ দিয়েছিলেন।
হযরত আসমা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাঁকে বলেছিলেন:
«لاَ تُوكِي فَيُوكَى عَلَيْكِ»
"তুমি (দান না করে সম্পদ) থলেতে বন্দি করে রেখো না, অন্যথায় তোমার রিযিকও সংকীর্ণ করে দেওয়া হবে।" (সহীহ বুখারী: ১৪৩৩)
অন্য এক দীর্ঘ বর্ণনায় এসেছে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাঁকে বরকতময় দানের গভীরতা ও নিয়ম শিখিয়ে বলেন:
«أَنْفِقِي أَوْ انْفَحِي، أَوْ انْضَحِي وَلاَ تُحْصِي فَيُحْصِي اللَّهُ عَلَيْكِ، وَلاَ تُوعِي فَيُوعِي اللَّهُ عَلَيْكِ»
"তুমি ব্যয় করো বা সৎপথে ঢেলে দাও অথবা মুক্তহস্তে দান করো। হিসাব করে রেখো না, নতুবা আল্লাহও তোমার রিযিক হিসাব করে করে দেবেন। আর গুটিয়ে রেখো না, অন্যথায় আল্লাহও তোমার রিযিক গুটিয়ে রাখবেন।" (সহীহ মুসলিম: ১০২৯)
দানশীলতার এই অনুপম নববী শিক্ষা হযরত আসমা (রা.)-এর অন্তরে এমন গভীর প্রভাব বিস্তার করেছিল যে, তিনি নিজের হাতে আসামাত্রই সবকিছু আল্লাহর রাস্তায় বিলিয়ে দিতেন। নারী সাহাবীদের এই মুক্তহস্তে দান করার মানসিকতা আমাদের শেখায় যে, আল্লাহর পথে ব্যয় করলে সম্পদ কখনো হ্রাস পায় না, বরং তা রিযিকের বরকত ও প্রাচুর্যকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
আনসারী সাহাবিয়ার দান ও অতিথিসেবার সোনালী উপাখ্যান
অতিথিসেবা ও মেহমানদারির ক্ষেত্রে এক আনসারী নারী সাহাবীর অকৃত্রিম আত্মত্যাগ মানব ইতিহাসের এক নজিরবিহীন গৌরবময় অধ্যায়। নিজের ঘরে চরম অর্থনৈতিক সংকট ও তীব্র অনাহার থাকা সত্ত্বেও কেবল নবীজি (ﷺ)-এর মেহমানকে সন্তুষ্ট করতে তিনি নিজের কোমলমতি সন্তানদেরকে ক্ষুধার্ত রেখে ঘুম পাড়িয়ে দিয়েছিলেন।
হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, একদা এক ব্যক্তি অত্যন্ত ক্ষুধার্ত অবস্থায় নবীজি (ﷺ)-এর নিকট আসলে তিনি স্ত্রীদের নিকট খাবারের সন্ধান পাঠালেন। কিন্তু উম্মাহাতুল মুমিনীনের সকলের ঘর থেকে উত্তর এল যে, পানি ব্যতীত তাঁদের ঘরে আর কিছুই নেই। তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) সাহাবীদের ডেকে বললেন:
«مَنْ يُضِيفُ هَذَا اللَّيْلَةَ؟»
"আজ রাতে এই মেহমানকে কে আপ্যায়ন করবে?" (সহীহ মুসলিম: ২০৫৪)
আনসারদের মধ্য থেকে এক ব্যক্তি (কোন কোন বর্ণনা অনুযায়ী হযরত আবু তালহা রা.) এই মেহমানদারির দায়িত্ব নিলেন এবং ঘরে গিয়ে স্ত্রীকে মেহমানের যথোপযুক্ত সম্মান নিশ্চিতের নির্দেশ দিলেন। কিন্তু স্ত্রী জানালেন যে, ঘরে কেবল বাচ্চাদের সামান্য খাবার ছাড়া আর কিছুই নেই। তখন স্বামী তাঁকে নির্দেশ দিলেন বাচ্চাদের কোনোভাবে ভুলিয়ে রেখে ঘুম পাড়িয়ে দিতে এবং মেহমান খেতে বসলে বাতিটি নিভিয়ে দিতে, যাতে তারা যে কেবল মুখের নড়াচড়ার আওয়াজ করছেন কিন্তু খাচ্ছেন না, তা যেন মেহমান বুঝতে না পারেন।
সেই পুণ্যবতী আনসারী সাহাবিয়া মাতৃত্বের তীব্র আবেগকে আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে দমন করে সন্তানদের ঘুম পাড়িয়ে দিলেন এবং বাতি নিভিয়ে মেহমানকে অন্ধকার ঘরে তৃপ্তিসহকারে খাওয়ালেন। পরদিন সকালে যখন তাঁরা নবীজি (ﷺ)-এর দরবারে আসলেন, তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) অত্যন্ত প্রফুল্ল চিত্তে বললেন:
«لَقَدْ عَجِبَ اللَّهُ مِنْ صَنِيعِكُمَا بِضَيْفِكُمَا اللَّيْلَةَ»
"আজ রাতে তোমরা তোমাদের মেহমানের সাথে যে মহান আচরণ করেছ, তা দেখে আল্লাহ তাআলা সন্তুষ্ট হয়েছেন।" (সহীহ বুখারী: ৩৭৯৮)
নিজেদের এবং সন্তানদের পেটে পাথর বেঁধে মেহমানকে খাওয়ানোর এই বিরল আত্মত্যাগ প্রমাণ করে যে, নারী সাহাবীদের নিকট আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সন্তুষ্টি পার্থিব সমস্ত আবেগের চেয়ে কত বেশি মূল্যবান ছিল।
সমকালীন সমাজে নারী সাহাবীদের দানশীলতার প্রাসঙ্গিকতা ও আমাদের করণীয়
বর্তমান আধুনিক সমাজ ও বিশ্বব্যবস্থা এক চরম ভোগবাদ, বস্তুবাদ এবং আত্মকেন্দ্রিক সংকীর্ণতার মুখে পতিত হয়েছে, যেখানে মানুষ কেবল নিজের বৈষয়িক সুখ ও ভোগের প্রাচুর্য নিশ্চিত করতেই আজীবন ব্যতিব্যস্ত। মানুষের মনের এই তীব্র লালসা ও স্বার্থপরতা মানব আত্মাকে দিন দিন এক অন্ধকার খাঁচায় বন্দি করে ফেলছে। এই পরিস্থিতিতে মহীয়সী নারী সাহাবীদের দানশীলতা, ত্যাগ ও পরোপকারের শিক্ষা আত্মিক পরিশুদ্ধির সর্বোত্তম চাবিকাঠি।
ইসলামী জীবনদর্শনে দান বা ব্যয় কেবল টাকা-পয়সা বিলিয়ে দেওয়ার নাম নয়, বরং এটি হলো মানুষের সংকীর্ণ মানসিকতা ও কৃপণতার শৃঙ্খল ভেঙে নিজের পরম ভালোবাসার সম্পদকে আল্লাহর ওয়াস্তে বিলিয়ে দেওয়ার এক পবিত্র অনুশীলন। একজন মুসলিম নারী যখন নামায ও ফরয যাকাত আদায় করেন, তখন তিনি মূলত নিজের ওপর অর্পিত ব্যক্তিগত ফরয দায়িত্ব (ফরযে আইন) পালন করেন। কিন্তু তিনি যখন স্বতঃস্ফূর্তভাবে নিজের সম্পদের অতিরিক্ত অংশ, সময় এবং আন্তরিক ভালোবাসা নিয়ে সমাজের দরিদ্র, এতিম ও দুস্থ মানুষের পাশে দাঁড়ান, তখন তিনি প্রকারান্তরে গোটা উম্মাহর ওপর অর্পিত ফরযে কিফায়ার গুরুদায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেন।
মুমিন নারীদের এই যৌথ সামাজিক দায়িত্ব ও সংস্কারমূলক ভূমিকা সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন:
«وَالْمُؤْمِنُونَ وَالْمُؤْمِنَاتُ بَعْضُهُمْ أَوْلِيَاءُ بَعْضٍ يَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَيَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنْكَرِ»
"আর মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীগণ একে অপরের বন্ধু; তারা সৎকাজের আদেশ দেয় এবং অসৎকাজ থেকে নিষেধ করে।" (সূরা আত-তওবা: ৭১)
আজকের সমাজে নারীদের করণীয় হলো নারী সাহাবীদের সুমহান ত্যাগের চেতনাকে নিজেদের অন্তরে পুনরায় জাগ্রত করা। চারপাশে ছড়িয়ে থাকা অভাবী আত্মীয়-স্বজন, অনাথ শিশু ও সমাজের অবহেলিত মানুষের অর্থনৈতিক ও আধ্যাত্মিক উন্নয়নে নিজেদেরকে নিয়োজিত করা।
ইসলামের সোনালী যুগের গৌরবময় ইতিহাস পর্যালোচনা করলে এ সত্য সূর্যালোকের মতো স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, নারী সাহাবীদের দানশীলতা, ত্যাগ ও পরোপকার কেবল কোনো সাময়িক আবেগ বা লৌকিক আচরণ ছিল না; বরং তা ছিল ঈমান ও ইহসানের এক সুউচ্চ ও প্রাণবন্ত বাস্তবতা। উম্মুল মুমিনীন হযরত খাদিজা (রা.)-এর ইসলাম প্রচারে নিজের বিপুল বাণিজ্য-সামগ্রী অকাতরে বিলিয়ে দেওয়া থেকে শুরু করে, হযরত আয়েশা (রা.)-এর রোজা রাখা অবস্থায় লক্ষাধিক দিরহাম দান করা, হযরত যায়নাব (রা.)-এর নিজস্ব উপার্জন অকাতরে উৎসর্গ করার প্রতিটি অধ্যায় মানব সভ্যতার ইতিহাসে দানশীলতার এক একটি স্বর্ণালী উদাহরণ।
যারা ঈমান, তাকওয়া ও সদকার এই সুমহান আদর্শকে নিজেদের জীবনে ধারণ করবেন, পরকালে তাঁদের জন্য রয়েছে চিরস্থায়ী শান্তির জান্নাত। পবিত্র কুরআনে পুণ্যবতী নারীদেরকে মর্যাদা ও সম্মানের সাথে জান্নাতে প্রবেশের সুসংবাদ দিয়ে মহান আল্লাহ তায়ালা ঘোষণা করেছেন:
«ادْخُلُوا الْجَنَّةَ أَنْتُمْ وَأَزْوَاجُكُمْ تُحْبَرُونَ»
"তোমরা এবং তোমাদের স্ত্রীগণ সসম্মানে প্রফুল্লচিত্তে জান্নাতে প্রবেশ করো।" (সূরা যুখরুফ: ৭০)
অতএব, নারী সাহাবীদের এই অনন্য আদর্শই হোক আমাদের ইহকালীন জীবনের পাথেয় এবং পরকালীন মুক্তির রাজপথ।
মন্তব্য (...)
এ সম্পর্কিত আরও প্রবন্ধ
টুপি পরিধান করার কোন প্রমাণ কি হাদীস বা আছারে সাহাবায় নেই?
টুপি মুসলিম উম্মাহর ‘ শিআর ’ জাতীয় নিদর্শন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, সাহাবায়ে ...
হযরত উসমান রাঃ সম্পর্কে উত্থিত আপত্তির স্বরূপ সন্ধানে
হযরত উসমান রাঃ এর উপর স্বজনপ্রীতিমূলক আপত্তি সমূহের তাহকিকঃ হযরত উসমান রাঃ সম্পর্কে স্বজনপ্রীতিমূলক ...
মক্কা-মদীনার বাইরে সাহাবীদের কবর
বিদায় হজ্বে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সঙ্গে প্রায় সোয়া লক্ষ সাহাবী হজ্ব করেছেন। কিন...
সাহাবায়ে কেরামের মর্যাদা ও সাহাবা সমালোচকদের পরিণতি
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাহাবাগণের মর্যাদা ও ফযীলত কুরআন ও হাদীসের মাঝে বিস্তারিতভাব...
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন