প্রবন্ধ
রহমাতুল লিল আলামীন ﷺ
৮ আগস্ট, ২০২৬
৭
০
ভূমিকা
সমস্ত প্রশংসা বিশ্বজগতের প্রতিপালক মহান আল্লাহ তা‘আলার জন্য। অসংখ্য দরূদ ও সালাম বর্ষিত হোক মানবজাতির শ্রেষ্ঠ নেতা, সর্বশেষ নবী ও রাসূল, হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা ﷺ-এর প্রতি; যাঁকে আল্লাহ তা‘আলা শুধু একটি জাতি, একটি অঞ্চল কিংবা একটি যুগের জন্য নয়, বরং সমগ্র সৃষ্টিজগতের জন্য রহমতস্বরূপ প্রেরণ করেছেন।
মানব ইতিহাসে বহু মনীষী, সমাজসংস্কারক ও রাষ্ট্রনায়কের আবির্ভাব ঘটেছে। তাঁদের অবদান নির্দিষ্ট সময় বা সমাজে সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর আগমন ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। তাঁর দাওয়াত ছিল সর্বজনীন, তাঁর শরীয়ত ছিল সর্বশেষ এবং তাঁর রহমত ছিল সর্বব্যাপী। মানুষ, জিন, নারী-পুরুষ, ধনী-গরিব, বন্ধু-শত্রু, এমনকি নির্বাক প্রাণী ও প্রকৃতি সকলেই তাঁর রহমতের পরশ লাভ করেছে। এ কারণেই কুরআন তাঁকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে ‘রহমাতুল লিল আলামীন’ সমস্ত জগতের জন্য রহমত হিসেবে।
‘রহমাতুল লিল আলামীন’ শব্দের অর্থ ও তাৎপর্য
‘রহমত’ অর্থ দয়া, অনুগ্রহ, কল্যাণ, মমতা ও করুণা। আর ‘আলামীন’ শব্দটি ‘আলাম’-এর বহুবচন; যার অর্থ সমস্ত জগত বা আল্লাহ ছাড়া সমগ্র সৃষ্টি। অর্থাৎ মানুষ, জিন, ফেরেশতা, পশু-পাখি, উদ্ভিদ, প্রকৃতি সবই এর অন্তর্ভুক্ত। এ কারণেই কুরআনের ভাষায় মহানবী ﷺ শুধু মানুষের জন্য নন; বরং সমগ্র সৃষ্টিজগতের জন্য রহমত।
এই রহমত কেবল ধর্মীয় শিক্ষায় সীমাবদ্ধ ছিল না। তাঁর চরিত্রে ছিল দয়া, ন্যায়বিচার, সহনশীলতা, ক্ষমাশীলতা, মানবপ্রেম, দুর্বলদের প্রতি সহমর্মিতা, প্রাণীর প্রতি মমতা এবং পরিবেশ সংরক্ষণের চেতনা। তাঁর সমগ্র জীবন ছিল করুণার এক জীবন্ত ব্যাখ্যা। তাই ইতিহাসের নিরপেক্ষ গবেষকরাও স্বীকার করেছেন যে, মানবতার কল্যাণে তাঁর মতো সর্বাঙ্গীন দয়ার আদর্শ পৃথিবী খুব কমই দেখেছে।
এক কথায়, ‘রহমাতুল লিল আলামীন’ কোনো সম্মানসূচক উপাধি নয়; এটি রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর ব্যক্তিত্ব, চরিত্র, দাওয়াত, রাষ্ট্রনীতি, পারিবারিক জীবন, সামাজিক আচরণ এবং সমগ্র মানবতার প্রতি তাঁর অফুরন্ত ভালোবাসার বাস্তব পরিচয়।
‘রহমাতুল লিল আলামীন’ কুরআনের ঘোষণা
আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেন,
(وَمَا أَرْسَلْنَاكَ إِلَّا رَحْمَةً لِّلْعَالَمِينَ)
আমি আপনাকে সমগ্র জগতের জন্য রহমতস্বরূপই প্রেরণ করেছি।-(সূরা আল-আম্বিয়া, ২১:১০৭)
এই আয়াতটি রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সমগ্র জীবন ও নবুয়তের উদ্দেশ্যের সারসংক্ষেপ। তিনি কোনো জাতিগত নবী নন; বরং সকল মানুষের জন্য প্রেরিত আল্লাহর সর্বশেষ রাসূল।
প্রখ্যাত মুফাসসির হযরত ইবন আব্বাস (রাঃ) এ আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন,
«مَنْ آمَنَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ كُتِبَتْ لَهُ الرَّحْمَةُ فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ، وَمَنْ لَمْ يُؤْمِنْ بِاللَّهِ وَرَسُولِهِ عُوفِيَ مِمَّا أَصَابَ الْأُمَمَ مِنَ الْخَسْفِ وَالْقَذْفِ»
অর্থাৎ, যে ব্যক্তি আল্লাহ ও আখিরাতের প্রতি ঈমান এনেছে, তার জন্য দুনিয়া ও আখিরাতে রহমত নির্ধারিত হয়েছে। আর যে ঈমান আনেনি, সেও পূর্ববর্তী অবাধ্য জাতিগুলোর মতো তাৎক্ষণিক আসমানি গজব থেকে রক্ষা পেয়েছে।
ইমাম আবু জাফর আত-তাবারী (রহ.) আরও বলেন, আল্লাহ তা‘আলা মুহাম্মদ ﷺ-কে সমস্ত সৃষ্টির জন্য রহমত হিসেবে প্রেরণ করেছেন। মুমিনরা তাঁর মাধ্যমে হিদায়াত লাভ করে জান্নাতের অধিকারী হয়েছে, আর কাফিররাও তাঁর আগমনের কারণে পূর্ববর্তী জাতিগুলোর মতো সমূলে ধ্বংসের শাস্তি থেকে অবকাশ পেয়েছে। জামেউল বয়ান: ১৮/৫৫২ (ইমাম তাবারী)
রাসূল ﷺ নিজেই তাঁর পরিচয় দিয়েছেন ‘রহমত’ হিসেবে
কুরআনের এই ঘোষণাকে রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁর হাদীসেও স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন।
আবু হুরাইরা (রাঃ) বর্ণনা করেন,
قِيلَ: يَا رَسُولَ اللَّهِ، ادْعُ عَلَى الْمُشْرِكِينَ، قَالَ:
«إِنِّي لَمْ أُبْعَثْ لَعَّانًا، وَإِنَّمَا بُعِثْتُ رَحْمَةً»
একদা বলা হলো, হে আল্লাহর রাসূল! মুশরিকদের বিরুদ্ধে বদদোয়া করুন।’ তিনি বললেন, ‘আমি অভিশাপদাতা হয়ে প্রেরিত হইনি; বরং রহমত হয়ে প্রেরিত হয়েছি।-(সহীহ মুসলিম)
আরেক হাদীসে তিনি বলেন,
«إِنَّمَا أَنَا رَحْمَةٌ مُهْدَاةٌ»
অর্থঃ আমি তো উপহারস্বরূপ প্রেরিত রহমত। -মিশকাতুল মাসাবীহ
অন্য এক হাদীসে তিনি নিজের পরিচয় দিতে গিয়ে বলেন,
«أَنَا مُحَمَّدٌ، وَأَحْمَدُ، وَالْمُقَفِّي، وَالْحَاشِرُ، وَنَبِيُّ التَّوْبَةِ، وَنَبِيُّ الرَّحْمَةِ»
অর্থঃ আমি মুহাম্মদ, আহমদ, আল-মুকাফ্ফী, আল-হাশির, তাওবার নবী এবং রহমতের নবী। -(সহীহ মুসলিম)
এ হাদীসগুলো থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়, রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর দাওয়াতের ভিত্তি ছিল দয়া, কল্যাণ ও হিদায়াত; প্রতিশোধ, বিদ্বেষ বা ধ্বংস নয়।
তাঁর রহমত ছিল মানুষ ও জিন, উভয়ের জন্য
রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর নবুয়ত শুধু মানবজাতির মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং জিন জাতিও তাঁর উম্মতের অন্তর্ভুক্ত।
আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿قُلْ أُوحِيَ إِلَيَّ أَنَّهُ اسْتَمَعَ نَفَرٌ مِّنَ الْجِنِّ فَقَالُوا إِنَّا سَمِعْنَا قُرْآنًا عَجَبًا يَهْدِي إِلَى الرُّشْدِ فَآمَنَّا بِهِ﴾
বলুন, আমার প্রতি ওহি করা হয়েছে যে, একদল জিন মনোযোগ দিয়ে কুরআন শ্রবণ করেছে। অতঃপর তারা বলেছে, আমরা এক বিস্ময়কর কুরআন শুনেছি, যা সঠিক পথের দিশা দেয়। তাই আমরা এর প্রতি ঈমান এনেছি।-(সূরা আল-জিন: ১–২)
এ আয়াত প্রমাণ করে, রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর দাওয়াত ও রহমত মানবজাতির সীমানা অতিক্রম করে জিন জাতিকেও অন্তর্ভুক্ত করেছে। তিনি তাঁদের কাছেও আল্লাহর বাণী পৌঁছে দিয়েছেন এবং তাঁর মাধ্যমেই জিনদের একটি দল হিদায়াতের আলো লাভ করেছে।
শত্রু, বিরোধী ও অমুসলিমদের প্রতিও রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর রহমত
রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর জীবনের অন্যতম বিস্ময়কর দিক হলো, যাঁরা তাঁকে কষ্ট দিয়েছে, নির্যাতন করেছে, এমনকি হত্যার ষড়যন্ত্র করেছে, তাঁদের প্রতিও তিনি প্রতিশোধপরায়ণ হননি। বরং তাঁদের হিদায়াত, কল্যাণ ও মুক্তিই কামনা করেছেন। এ কারণেই তাঁর রহমত বন্ধু-স্বজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; শত্রুরাও তাঁর মহান চরিত্রের পরশে অভিভূত হয়েছিল।
বদদোয়ার পরিবর্তে হিদায়াতের দোয়া
মক্কার মুশরিকরা দীর্ঘ তেরো বছর ধরে রাসূলুল্লাহ ﷺ ও তাঁর সাহাবিদের ওপর সীমাহীন নির্যাতন চালায়। এরপরও তিনি তাঁদের বিরুদ্ধে অভিশাপ দিতে আগ্রহী হননি।
আবূ হুরাইরা (রাঃ) বর্ণনা করেন,
قِيلَ: يَا رَسُولَ اللَّهِ، ادْعُ عَلَى الْمُشْرِكِينَ، فَقَالَ:
«إِنِّي لَمْ أُبْعَثْ لَعَّانًا، وَإِنَّمَا بُعِثْتُ رَحْمَةً»
অর্থঃ কেউ বলল, হে আল্লাহর রাসূল! মুশরিকদের বিরুদ্ধে বদদোয়া করুন। তিনি বললেন, আমি অভিশাপদাতা হয়ে প্রেরিত হইনি; বরং রহমত হয়ে প্রেরিত হয়েছি।
এই হাদীস রাসূল ﷺ-এর নবুয়তের প্রকৃত পরিচয় বহন করে। তাঁর লক্ষ্য ছিল মানুষকে ধ্বংস করা নয়; বরং তাদের আল্লাহর পথে ফিরিয়ে আনা।
তায়েফের রক্তাক্ত প্রান্তরে রহমতের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত
নবুয়তের দশম বছরে রাসূলুল্লাহ ﷺ তায়েফে ইসলামের দাওয়াত নিয়ে গেলে সেখানকার নেতারা শুধু তাঁর আহ্বান প্রত্যাখ্যানই করেনি; বরং উচ্ছৃঙ্খল লোকদের লেলিয়ে দিয়েছিল। তারা তাঁকে পাথর নিক্ষেপ করে এমনভাবে আহত করেছিল যে, তাঁর জুতা রক্তে ভরে গিয়েছিল।
এই কঠিন মুহূর্তে পাহাড়ের ফেরেশতা উপস্থিত হয়ে বললেন, আপনি নির্দেশ দিলে আমি এ দুই পাহাড় একত্র করে তাদের ধ্বংস করে দেব। কিন্তু মানবতার মহান শিক্ষক ﷺ বললেন,
«بَلْ أَرْجُو أَنْ يُخْرِجَ اللَّهُ مِنْ أَصْلَابِهِمْ مَنْ يَعْبُدُ اللَّهَ وَحْدَهُ لَا يُشْرِكُ بِهِ شَيْئًا»
অর্থঃ না; বরং আমি আশা করি, আল্লাহ তাদের বংশধরদের মধ্য থেকে এমন মানুষ সৃষ্টি করবেন, যারা এক আল্লাহর ইবাদত করবে এবং তাঁর সঙ্গে কাউকে শরিক করবে না।- সহীহ বুখারী
রক্তাক্ত অবস্থায়ও যারা তাঁকে নির্যাতন করেছে, তাদের ধ্বংস নয়, তাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের হিদায়াত কামনা করা মানব ইতিহাসে এক অনন্য ঘটনা।
মক্কা বিজয়ে ক্ষমার অনুপম দৃষ্টান্ত
মক্কা বিজয়ের দিন ছিল প্রতিশোধ নেওয়ার সর্বোত্তম সুযোগ। যেসব কুরাইশ নেতারা বছরের পর বছর মুসলমানদের ওপর অত্যাচার চালিয়েছিল, তারা সেদিন ভীতসন্ত্রস্ত অবস্থায় রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সামনে উপস্থিত হয়।
তিনি তাদের উদ্দেশে জিজ্ঞেস করলেন,
«مَا تَظُنُّونَ أَنِّي فَاعِلٌ بِكُمْ؟»
তারা বলল,
«أَخٌ كَرِيمٌ وَابْنُ أَخٍ كَرِيمٍ»
অর্থঃ আপনি একজন মহানুভব ভাই এবং একজন মহানুভব ভাইয়ের সন্তান।
তখন রাসূলুল্লাহ ﷺ ঘোষণা করলেন,
«اذْهَبُوا فَأَنْتُمُ الطُّلَقَاءُ»
অর্থঃ তোমরা চলে যাও; আজ তোমরা সবাই মুক্ত।
ইতিহাসে বিজয়ীদের মধ্যে এমন ক্ষমার দৃষ্টান্ত খুব কমই পাওয়া যায়। এ ঘটনাই প্রমাণ করে, ইসলামের বিজয় প্রতিশোধের নয়; বরং দয়া ও মহানুভবতার বিজয়।- আখবারে মক্কাহ: ২/১২১; কিতাবুল উম্ম: ৭/৩৮২; সিরাতে ইবনে হিশাম: ২/৪১২।
অমুসলিমদের প্রতিও ছিল তাঁর আন্তরিকতা
রাসূলুল্লাহ ﷺ শুধু মুসলমানদের খোঁজখবর নিতেন না; ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের প্রতিও তিনি মানবিক আচরণ করতেন।
একজন ইহুদি কিশোর তাঁর সেবা করত। অসুস্থ হলে রাসূলুল্লাহ ﷺ নিজে তাকে দেখতে গেলেন। তার পাশে বসে ইসলামের দাওয়াত দিলেন। ছেলেটি পিতার অনুমতি নিয়ে ইসলাম গ্রহণ করলে রাসূলুল্লাহ ﷺ অত্যন্ত আনন্দিত হয়ে বললেন,
«الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي أَنْقَذَهُ بِي مِنَ النَّارِ»
অর্থঃ সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর, যিনি আমার মাধ্যমে তাকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করেছেন।-সুনান আবু দাউদ
এখানে লক্ষণীয়, তাঁর আনন্দের কারণ ছিল একজন মানুষের চিরস্থায়ী মুক্তি; ব্যক্তিগত লাভ বা সামাজিক মর্যাদা নয়।
যুদ্ধক্ষেত্রেও মানবতার শিক্ষা
ইসলাম যুদ্ধকে কখনো উদ্দেশ্য বানায়নি; বরং প্রয়োজনে যুদ্ধের মধ্যেও মানবিকতার সর্বোচ্চ মানদণ্ড প্রতিষ্ঠা করেছে।
রাসূলুল্লাহ ﷺ সৈন্যদের নির্দেশ দিতেন,
বিশ্বাসঘাতকতা করবে না।
মৃতদেহ বিকৃত করবে না।
শিশু হত্যা করবে না।
নারী হত্যা করবে না।
বৃদ্ধ ও ইবাদতে নিমগ্ন সন্ন্যাসীদের হত্যা করবে না।
ফলবান বৃক্ষ কাটবে না।
ফসল নষ্ট করবে না।
অযথা প্রাণী হত্যা করবে না।
এসব নির্দেশনা প্রমাণ করে, ইসলামে যুদ্ধও নৈতিকতার সীমার মধ্যে পরিচালিত হয়।
চুক্তি রক্ষার শিক্ষা
রাসূলুল্লাহ ﷺ চুক্তি পালনের ব্যাপারে অত্যন্ত কঠোর ছিলেন। তিনি শিক্ষা দিয়েছেন,
«مَنْ كَانَ بَيْنَهُ وَبَيْنَ قَوْمٍ عَهْدٌ، فَلَا يَحُلَّنَّ عَهْدًا، وَلَا يَشُدَّنَّهُ، حَتَّى يَمْضِيَ أَمَدُهُ»
অর্থঃ যার সঙ্গে কোনো জাতির চুক্তি রয়েছে, সে যেন নির্ধারিত মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে তা ভঙ্গ না করে।- সুনান তিরমিজি
এ শিক্ষা ইসলামের বিশ্বস্ততা, ন্যায়পরায়ণতা ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের উচ্চ নৈতিকতার প্রমাণ বহন করে।
রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর জীবন আমাদের শিক্ষা দেয়, প্রকৃত শক্তি প্রতিশোধে নয়, ক্ষমায়; প্রকৃত বিজয় শত্রুকে ধ্বংসে নয়, তার হৃদয় জয়ে। তাই তিনি শুধু মুসলমানদের নবী নন; তিনি সমগ্র মানবতার জন্য আল্লাহর প্রেরিত রহমত।
নারী, শিশু, এতিম, দরিদ্র ও দুর্বল মানুষের প্রতি রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর অপরিসীম রহমত
রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর রহমতের অন্যতম উজ্জ্বল দিক ছিল সমাজের দুর্বল, অসহায় ও অধিকারবঞ্চিত মানুষের প্রতি তাঁর সীমাহীন মমতা। ইসলাম-পূর্ব আরব সমাজে নারী, এতিম, দাস-দাসী ও দরিদ্র মানুষের কোনো সম্মানজনক অবস্থান ছিল না। মহানবী ﷺ আল্লাহপ্রদত্ত ওহির আলোকে সেই সমাজে মানবিকতার এক অভূতপূর্ব বিপ্লব সাধন করেন। তিনি শিক্ষা দিয়েছেন, সমাজের শক্তিশালী মানুষ নয়; বরং দুর্বল ও অসহায় মানুষের অধিকার রক্ষাই প্রকৃত ঈমানের পরিচয়।
মুমিনদের প্রতি তাঁর সীমাহীন মমতা
আল্লাহ তা‘আলা কুরআনে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর হৃদয়ের কোমলতার পরিচয় দিয়ে বলেন,
﴿لَقَدْ جَاءَكُمْ رَسُولٌ مِّنْ أَنْفُسِكُمْ عَزِيزٌ عَلَيْهِ مَا عَنِتُّمْ حَرِيصٌ عَلَيْكُمْ بِالْمُؤْمِنِينَ رَءُوفٌ رَّحِيمٌ﴾
অর্থঃ নিশ্চয়ই তোমাদের নিকট তোমাদের মধ্য থেকেই একজন রাসূল এসেছেন। তোমাদের কষ্ট তাঁর কাছে অত্যন্ত বেদনাদায়ক। তিনি তোমাদের কল্যাণকামী এবং মুমিনদের প্রতি অত্যন্ত স্নেহশীল ও পরম দয়ালু। (সূরা আত-তাওবা: ১২৮)
এ আয়াতের প্রতিটি শব্দ রাসূল ﷺ-এর চরিত্রের একেকটি উজ্জ্বল দিক তুলে ধরে। মানুষের দুঃখ তাঁকে ব্যথিত করত, তাদের হিদায়াতের জন্য তিনি ব্যাকুল থাকতেন এবং মুমিনদের প্রতি তাঁর ভালোবাসা ছিল পিতার চেয়েও অধিক।
উম্মতের কষ্ট তিনি নিজের কষ্ট মনে করতেন
রাসূলুল্লাহ ﷺ শুধু উপদেশই দিতেন না; বরং উম্মতের সুখ-দুঃখকে নিজের জীবনের অংশ মনে করতেন। তিনি আল্লাহর দরবারে দোয়া করতেন,
«اللَّهُمَّ مَنْ وَلِيَ مِنْ أَمْرِ أُمَّتِي شَيْئًا فَشَقَّ عَلَيْهِمْ فَاشْقُقْ عَلَيْهِ، وَمَنْ وَلِيَ مِنْ أَمْرِ أُمَّتِي شَيْئًا فَرَفَقَ بِهِمْ فَارْفُقْ بِهِ»
অর্থঃ হে আল্লাহ! আমার উম্মতের যে ব্যক্তি কোনো দায়িত্ব গ্রহণ করে তাদের কষ্ট দেয়, আপনিও তাকে কষ্ট দিন। আর যে তাদের প্রতি কোমলতা ও দয়া প্রদর্শন করে, আপনিও তার প্রতি দয়া করুন।-সহীহ মুসলিম
এ হাদীস শুধু রাষ্ট্রনায়কদের জন্য নয়; বরং প্রত্যেক শিক্ষক, অভিভাবক, আলেম ও দায়িত্বশীল ব্যক্তির জন্য এক চিরন্তন নীতিমালা।
শিশুদের প্রতি তাঁর স্নেহ ছিল সীমাহীন
রাসূলুল্লাহ ﷺ শিশুদের অত্যন্ত ভালোবাসতেন। তিনি তাদের কোলে নিতেন, সালাম দিতেন, আদর করতেন এবং তাদের সঙ্গে হাস্যরস করতেন।
তিনি বলেন,
«لَيْسَ مِنَّا مَنْ لَمْ يَرْحَمْ صَغِيرَنَا وَيُوَقِّرْ كَبِيرَنَا»
অর্থঃ সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়, যে আমাদের ছোটদের প্রতি দয়া করে না এবং বড়দের সম্মান করে না।-সুনান তিরমিজি
এ হাদীস ইসলামী সমাজের পারিবারিক ও সামাজিক সম্পর্কের ভিত্তি স্থাপন করেছে।
কন্যাসন্তানের মর্যাদা প্রতিষ্ঠা
যে সমাজে কন্যাসন্তানকে জীবন্ত কবর দেওয়া হতো, সে সমাজেই রাসূলুল্লাহ ﷺ কন্যাসন্তান লালন-পালনকে জান্নাত লাভের মাধ্যম ঘোষণা করেন।
তিনি বলেন,
«مَنْ عَالَ جَارِيَتَيْنِ حَتَّى تَبْلُغَا جَاءَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ أَنَا وَهُوَ كَهَاتَيْنِ»
এরপর তিনি নিজের দুই আঙুল পাশাপাশি মিলিয়ে দেখালেন।
অর্থঃ যে ব্যক্তি দুই কন্যাসন্তানকে প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া পর্যন্ত লালন-পালন করবে, কিয়ামতের দিন সে ও আমি এভাবে পাশাপাশি থাকব।-সহীহ মুসলিম
এ হাদীস নারীর মর্যাদা সম্পর্কে ইসলামের বিপ্লবী দৃষ্টিভঙ্গির উজ্জ্বল প্রমাণ।
এতিমদের প্রতি তাঁর অসাধারণ মমতা
এতিম শিশুদের প্রতি রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর ভালোবাসা ছিল অনন্য।
তিনি বলেন,
«أَنَا وَكَافِلُ الْيَتِيمِ فِي الْجَنَّةِ كَهَاتَيْنِ»
এ কথা বলে তিনি তর্জনী ও মধ্যমা আঙুল পাশাপাশি রাখলেন।
অর্থঃ যে ব্যক্তি কোনো এতিমের লালন-পালনের দায়িত্ব নেবে, সে এবং আমি জান্নাতে এভাবে পাশাপাশি থাকব।-সহীহ বুখারী
আবার এক ব্যক্তি হৃদয়ের কঠোরতার অভিযোগ করলে তিনি বললেন,
«امْسَحْ رَأْسَ الْيَتِيمِ، وَأَطْعِمِ الْمِسْكِينَ»
অর্থঃ এতিমের মাথায় স্নেহভরে হাত বুলিয়ে দাও এবং মিসকীনকে আহার করাও।-মিশকাতুল মাসাবীহ
এ শিক্ষা প্রমাণ করে, ইসলামে মানবিকতা কেবল তাত্ত্বিক শিক্ষা নয়; বরং বাস্তব কর্মের নাম।
নারীদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় তাঁর অবদান
রাসূলুল্লাহ ﷺ নারীকে অবজ্ঞার পাত্র নয়; বরং সম্মান ও মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।
তিনি বলেন,
«اسْتَوْصُوا بِالنِّسَاءِ خَيْرًا»
অর্থঃ নারীদের সঙ্গে উত্তম আচরণ করো।-সহীহ মুসলীম
আর বিদায় হজে তিনি ঘোষণা করেন,
«فَاتَّقُوا اللَّهَ فِي النِّسَاءِ»
অর্থঃ নারীদের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করো।-মা‘আরিফুল হাদীস
এ দুটি সংক্ষিপ্ত নির্দেশনার মধ্যেই পারিবারিক জীবনের শান্তি, সৌহার্দ্য ও ন্যায়বিচারের ভিত্তি নিহিত রয়েছে।
বিধবা ও দরিদ্র মানুষের সেবার মর্যাদা
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন,
«السَّاعِي عَلَى الْأَرْمَلَةِ وَالْمِسْكِينِ كَالْمُجَاهِدِ فِي سَبِيلِ اللَّهِ»
অন্য বর্ণনায় রয়েছে,
«وَكَالْقَائِمِ الَّذِي لَا يَفْتُرُ، وَكَالصَّائِمِ الَّذِي لَا يُفْطِرُ»
অর্থঃ যে ব্যক্তি বিধবা ও দরিদ্র মানুষের সেবায় নিয়োজিত থাকে, সে আল্লাহর পথে জিহাদকারীর ন্যায়; বরং সেই ব্যক্তির মতো, যে সারারাত ইবাদত করে এবং সারাদিন রোজা রাখে।-সহীহ বুখারী
এ হাদীস প্রমাণ করে, ইসলামে সামাজিক সেবাও এক মহান ইবাদত।
রহমতের এক পূর্ণাঙ্গ সমাজব্যবস্থা
রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর শিক্ষা শুধু ব্যক্তিগত চরিত্র গঠনের জন্য নয়; বরং একটি দয়াময় সমাজ গড়ে তোলার জন্য। সেখানে শিশু ভালোবাসা পায়, নারী সম্মান পায়, এতিম আশ্রয় পায়, দরিদ্র সহযোগিতা পায় এবং দুর্বল মানুষ নিরাপত্তা পায়। এ কারণেই তাঁর প্রতিষ্ঠিত সমাজ ইতিহাসে মানবিকতার সর্বোত্তম দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।
মানবজাতির প্রতি তাঁর রহমতের এ অধ্যায় আমাদের শিক্ষা দেয়, যে সমাজে দুর্বল মানুষের অধিকার রক্ষা করা হয়, সে সমাজই আল্লাহর রহমতের উপযুক্ত সমাজ।
পশু-পাখি, পরিবেশ ও সমগ্র সৃষ্টিজগতের প্রতি রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর রহমত
রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর রহমত শুধু মানুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং আল্লাহর প্রতিটি সৃষ্টির প্রতিই তাঁর হৃদয় ছিল মমতা ও করুণায় পরিপূর্ণ। মানুষ, পশু-পাখি, বৃক্ষ-লতা, এমনকি প্রকৃতি ও পরিবেশের প্রতিও তিনি দয়া, সহানুভূতি ও ভারসাম্য রক্ষার শিক্ষা দিয়েছেন। পৃথিবীর ইতিহাসে এমন কোনো ধর্মীয় নেতা খুঁজে পাওয়া কঠিন, যিনি নির্বাক প্রাণীর অধিকার সম্পর্কেও এত সুস্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছেন।
প্রতিটি জীবের প্রতি দয়া প্রদর্শনের শিক্ষা
রাসূলুল্লাহ ﷺ ঘোষণা করেন,
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رضي الله عنه أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ ﷺ قَالَ: «فِي كُلِّ كَبِدٍ رَطْبَةٍ أَجْرٌ»
অর্থঃ প্রত্যেক জীবন্ত প্রাণীর প্রতি দয়া প্রদর্শনে সওয়াব রয়েছে।-সহীহ বুখারী
এই সংক্ষিপ্ত হাদীস ইসলামের একটি মৌলিক নীতি প্রতিষ্ঠা করেছে-যে, প্রাণীর হৃদয় স্পন্দিত হয়, তার প্রতি দয়া করা আল্লাহর নিকট ইবাদতস্বরূপ। মানুষের সেবা যেমন নেক আমল, তেমনি ক্ষুধার্ত পশুকে খাদ্য দেওয়া, তৃষ্ণার্ত প্রাণীকে পানি পান করানো এবং অসহায় জীবের কষ্ট লাঘব করাও সওয়াবের কাজ।
একটি কুকুরকে পানি পান করানোর প্রতিদান
আবূ হুরাইরা (রাঃ) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,
«بَيْنَمَا رَجُلٌ يَمْشِي، اشْتَدَّ عَلَيْهِ الْعَطَشُ، فَنَزَلَ بِئْرًا فَشَرِبَ، ثُمَّ خَرَجَ، فَإِذَا كَلْبٌ يَلْهَثُ يَأْكُلُ الثَّرَى مِنَ الْعَطَشِ، فَقَالَ: لَقَدْ بَلَغَ هَذَا الْكَلْبَ مِنَ الْعَطَشِ مِثْلُ الَّذِي بَلَغَ بِي، فَنَزَلَ الْبِئْرَ، فَمَلَأَ خُفَّهُ مَاءً، ثُمَّ أَمْسَكَهُ بِفِيهِ، فَسَقَى الْكَلْبَ، فَشَكَرَ اللَّهُ لَهُ، فَغَفَرَ لَهُ»
সাহাবিগণ জিজ্ঞেস করলেন,
«وَإِنَّ لَنَا فِي الْبَهَائِمِ أَجْرًا؟»
তিনি বললেন,
«فِي كُلِّ كَبِدٍ رَطْبَةٍ أَجْرٌ»
অর্থঃ এক ব্যক্তি তৃষ্ণার্ত একটি কুকুরকে পানি পান করায়। আল্লাহ তার এই দয়ার কারণে তাকে ক্ষমা করে দেন। সাহাবিরা জানতে চাইলেন, পশুদের প্রতিও দয়া করলে কি সওয়াব আছে? তিনি বললেন, প্রত্যেক জীবন্ত প্রাণীর প্রতি দয়া প্রদর্শনে সওয়াব রয়েছে।-সহীহ বুখারী
এ ঘটনা প্রমাণ করে, আল্লাহর রহমত লাভের জন্য বড় বড় কাজই সব নয়; আন্তরিক মানবিকতাও জান্নাতের কারণ হতে পারে।
একটি বিড়ালের কারণে জাহান্নাম
অন্যদিকে রাসূলুল্লাহ ﷺ কঠোর সতর্কবাণী উচ্চারণ করে বলেন,
«عُذِّبَتِ امْرَأَةٌ فِي هِرَّةٍ، حَبَسَتْهَا حَتَّى مَاتَتْ، فَدَخَلَتْ فِيهَا النَّارَ، لَا هِيَ أَطْعَمَتْهَا وَسَقَتْهَا، وَلَا هِيَ تَرَكَتْهَا تَأْكُلُ مِنْ خَشَاشِ الْأَرْضِ»
অর্থঃ এক নারী একটি বিড়ালকে বন্দি রেখে না খাইয়ে মৃত্যুর কারণ হয়েছিল। এ অপরাধের জন্য সে জাহান্নামে প্রবেশ করেছে। কারণ সে বিড়ালটিকে খাদ্য-পানি দেয়নি, আবার ছেড়েও দেয়নি যাতে সে নিজে খাদ্য সংগ্রহ করতে পারে।-সহীহ মুসলিম
এ হাদীস প্রাণীর অধিকার সম্পর্কে ইসলামের সুস্পষ্ট অবস্থান তুলে ধরে।
জবাইয়ের ক্ষেত্রেও দয়ার নির্দেশ
ইসলাম হালাল জবাইয়ের অনুমতি দিয়েছে; কিন্তু সেই ক্ষেত্রেও নিষ্ঠুরতা, ম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করেছে।
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন,
«إِنَّ اللَّهَ كَتَبَ الْإِحْسَانَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ، فَإِذَا قَتَلْتُمْ فَأَحْسِنُوا الْقِتْلَةَ، وَإِذَا ذَبَحْتُمْ فَأَحْسِنُوا الذِّبْحَ، وَلْيُحِدَّ أَحَدُكُمْ شَفْرَتَهُ، وَلْيُرِحْ ذَبِيحَتَهُ»
অর্থঃ আল্লাহ প্রতিটি কাজেই উত্তম আচরণের নির্দেশ দিয়েছেন। অতএব যখন জবাই করবে, তখন উত্তমভাবে জবাই করবে। তোমাদের প্রত্যেকে যেন নিজের ছুরি ধারালো করে এবং জবাইকৃত প্রাণীকে কষ্টমুক্ত রাখে।-সহীহ মুসলিম
একবার তিনি দেখলেন, একজন ব্যক্তি পশুর সামনে দাঁড়িয়েই ছুরি ধার দিচ্ছে। তখন তিনি বললেন,
«أَتُرِيدُ أَنْ تُمِيتَهَا مَوْتَتَيْنِ؟»
অর্থঃ তুমি কি একে দুইবার হত্যা করতে চাও?- আত্তারগীব ওয়াত্তারহীব
এ শিক্ষা ইসলামের সূক্ষ্ম মানবিকতার এক অপূর্ব দৃষ্টান্ত।
একটি উটের অভিযোগ
আব্দুল্লাহ ইবন জাফর (রাঃ) বর্ণনা করেন, একবার রাসূলুল্লাহ ﷺ একটি বাগানে প্রবেশ করলে সেখানে একটি উট তাঁকে দেখে কাঁদতে শুরু করল। তিনি উটটির কাছে গিয়ে তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। পরে মালিককে ডেকে বললেন
«أَلَا تَتَّقِي اللَّهَ فِي هَذِهِ الْبَهِيمَةِ الَّتِي مَلَّكَكَ اللَّهُ إِيَّاهَا؟ فَإِنَّهُ شَكَا إِلَيَّ أَنَّكَ تُجِيعُهُ وَتُدْئِبُهُ»
অর্থঃ তুমি কি এ প্রাণীটির ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করো না? এটি আমার কাছে অভিযোগ করেছে যে, তুমি তাকে ক্ষুধার্ত রাখো এবং অতিরিক্ত পরিশ্রম করাও।-সুনান আবু দাউদ
একটি নির্বাক প্রাণীর কষ্টও রাসূল ﷺ-এর হৃদয়কে ব্যথিত করত।
বৃক্ষ ও পরিবেশ সংরক্ষণের শিক্ষা
রাসূলুল্লাহ ﷺ শুধু প্রাণীর অধিকার নয়; পরিবেশ সংরক্ষণেরও শিক্ষা দিয়েছেন।
তিনি বলেন,
«مَا مِنْ مُسْلِمٍ يَغْرِسُ غَرْسًا، أَوْ يَزْرَعُ زَرْعًا، فَيَأْكُلُ مِنْهُ طَيْرٌ، أَوْ إِنْسَانٌ، أَوْ بَهِيمَةٌ، إِلَّا كَانَ لَهُ بِهِ صَدَقَةٌ»
অর্থঃ কোনো মুসলমান যদি একটি গাছ রোপণ করে অথবা শস্য উৎপন্ন করে, অতঃপর তা থেকে মানুষ, পাখি বা পশু আহার করে, তবে তা তার জন্য সদকা হিসেবে গণ্য হবে।- সহীহ বুখারী
এ শিক্ষা পরিবেশ সংরক্ষণকে শুধু সামাজিক দায়িত্ব নয়; বরং ইবাদতের মর্যাদা দিয়েছে।
সুতরাং, রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর রহমতের পরিধি এতটাই বিস্তৃত ছিল যে, মানুষ, পশু-পাখি, বৃক্ষ-লতা ও প্রকৃতি সবাই তাঁর দয়ার ছায়াতলে স্থান পেয়েছে। তিনি শিখিয়েছেন, আল্লাহর প্রকৃত বান্দা সেই ব্যক্তি, যার আচরণে অন্য কোনো প্রাণী কষ্ট পায় না। তাই তাঁর জীবন শুধু মুসলমানদের জন্য নয়; সমগ্র বিশ্বের জন্য দয়া, মানবিকতা ও ভারসাম্যের এক চিরন্তন আদর্শ।
যেহেতু রাসূলুল্লাহ ﷺ সমগ্র জগতের জন্য রহমতস্বরূপ প্রেরিত হয়েছেন, আর এটি এমন এক অনন্য বৈশিষ্ট্য, যা তাঁকে সমগ্র সৃষ্টিজগতের অন্য সকলের থেকে স্বতন্ত্র মর্যাদা দান করেছে, তাই আমরা তাঁর অনুসারী হিসেবে আমাদেরও উচিত সমগ্র জগতের জন্য রহমতস্বরূপ হওয়া।
আমাদের নিজেদের প্রতি, পরিবার-পরিজন ও আপনজনদের প্রতি, সমাজের প্রতি, বরং সমগ্র মানুষের প্রতি রহমত ও মমতার আচরণ করা উচিত। শুধু মানুষই নয়, বরং সকল সৃষ্টির প্রতিই আমাদের দয়া ও অনুগ্রহের আচরণ করা উচিত। কারণ, যে দয়া করে না, তার প্রতিও দয়া করা হয় না।
ইমাম বুখারী রহ. আল-আদাবুল মুফরাদ-এ সা‘দ ইবনু উবাদাহ্ (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,
«إِنَّ اللَّهَ لَا يَرْحَمُ مِنْ عِبَادِهِ إِلَّا الرُّحَمَاءَ»
নিশ্চয়ই আল্লাহ তাঁর বান্দাদের মধ্যে কেবল দয়াশীলদের প্রতিই দয়া করেন।— আল-আদাবুল মুফরাদ, হাদীস: ৫১৩।
সুনান তিরমিজি, আবু দাউদ ও বায়হাকী রহ. আবদুল্লাহ ইবনু আমর ইবনুল আস (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,
«الرَّاحِمُونَ يَرْحَمُهُمُ الرَّحْمَنُ، ارْحَمُوا مَنْ فِي الْأَرْضِ يَرْحَمْكُمْ مَنْ فِي السَّمَاءِ»
দয়াশীলদের প্রতি পরম দয়াময় আল্লাহ দয়া করেন। তোমরা পৃথিবীবাসীর প্রতি দয়া করো, তাহলে আকাশের অধিবাসী (আল্লাহ) তোমাদের প্রতি দয়া করবেন।
— সুনান তিরমিজি, হাদীস: ১৯২৪; আবী দাউদ, হাদীস: ৪৯৪১; আল-বায়হাকী, ৯/৪১, হাদীস: ১৭৬৮৩।
আর মানুষের প্রতি রহমতের সর্বোচ্চ প্রকাশ হলো, সাধ্যমতো সকল উপায় ও পন্থা অবলম্বন করে তাদেরকে ইসলামের দিকে আহ্বান করা; সেই ইসলামের দিকে, যা মূলত রহমত ও কল্যাণের দ্বীন।
উম্মতের প্রতি রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সীমাহীন ভালোবাসা, শাফাআত ও রহমতের চূড়ান্ত প্রকাশ
রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর জীবনের প্রতিটি অধ্যায়ে রহমতের বিচ্ছুরণ ঘটেছে। তবে তাঁর রহমতের সর্বোচ্চ প্রকাশ ঘটেছে তাঁর উম্মতের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা, তাদের হিদায়াতের জন্য নিরন্তর প্রচেষ্টা এবং আখিরাতে তাদের মুক্তির জন্য অবিরাম চিন্তায়। তিনি নিজের আরাম-আয়েশের জন্য নয়; বরং উম্মতের কল্যাণের জন্য জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। তাঁর দাওয়াত, ইবাদত, জিহাদ, দোয়া সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দু ছিল তাঁর উম্মত।
উম্মতের কষ্টে তাঁর হৃদয় ব্যথিত হতো
মহান আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেন,
﴿لَقَدْ جَاءَكُمْ رَسُولٌ مِّنْ أَنْفُسِكُمْ عَزِيزٌ عَلَيْهِ مَا عَنِتُّمْ حَرِيصٌ عَلَيْكُمْ بِالْمُؤْمِنِينَ رَءُوفٌ رَّحِيمٌ﴾
অর্থঃ তোমাদের নিকট তোমাদের মধ্য থেকেই একজন রাসূল এসেছেন। তোমাদের কষ্ট তাঁর কাছে অত্যন্ত বেদনাদায়ক। তিনি তোমাদের কল্যাণের জন্য অত্যন্ত আগ্রহী এবং মুমিনদের প্রতি অত্যন্ত স্নেহশীল ও পরম দয়ালু।-(সূরা আত-তাওবা: ১২৮)
এই আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর হৃদয়ের প্রকৃত পরিচয় তুলে ধরেছেন। উম্মতের কষ্ট তাঁকে কষ্ট দিত, তাদের বিপথগামিতা তাঁকে ব্যথিত করত এবং তাদের মুক্তির জন্য তিনি সর্বদা ব্যাকুল থাকতেন।
উম্মতের জন্য তাঁর অশ্রুসিক্ত দোয়া
রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর দয়ার সর্বোচ্চ নিদর্শনগুলোর একটি হলো তাঁর উম্মতের জন্য অশ্রুসিক্ত প্রার্থনা।
আবদুল্লাহ ইবন আমর (রাঃ) বর্ণনা করেন, একদিন রাসূলুল্লাহ ﷺ ইবরাহীম (আ.) ও ঈসা (আ.)-এর দোয়া সম্বলিত দুটি আয়াত তিলাওয়াত করলেন
﴿رَبِّ إِنَّهُنَّ أَضْلَلْنَ كَثِيرًا مِّنَ النَّاسِ فَمَن تَبِعَنِي فَإِنَّهُ مِنِّي﴾
এবং,
﴿إِن تُعَذِّبْهُمْ فَإِنَّهُمْ عِبَادُكَ وَإِن تَغْفِرْ لَهُمْ فَإِنَّكَ أَنتَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ﴾
এরপর তিনি দুই হাত তুলে বলতে লাগলেন,
«اللَّهُمَّ أُمَّتِي، أُمَّتِي»
অর্থাৎ, হে আল্লাহ! আমার উম্মত! আমার উম্মত!
এ কথা বলতে বলতে তিনি অশ্রুসিক্ত হয়ে পড়লেন।
তখন আল্লাহ তা‘আলা জিবরীল (আ.)-কে নির্দেশ দিলেন,
«إِنَّا سَنُرْضِيكَ فِي أُمَّتِكَ وَلَا نَسُوءُكَ»
অর্থঃ আমি আপনার উম্মতের ব্যাপারে আপনাকে সন্তুষ্ট করব এবং আপনাকে অসন্তুষ্ট করব না।-হাদীসে কুদসী
এ ঘটনা প্রমাণ করে, একজন নবীর হৃদয়ে নিজের জন্য নয়; বরং সমগ্র উম্মতের জন্য কত গভীর ভালোবাসা ছিল।
কিয়ামতের দিনও তাঁর চিন্তা হবে উম্মত
যেদিন প্রত্যেক মানুষ নিজের মুক্তির চিন্তায় ব্যস্ত থাকবে, সেদিনও রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁর উম্মতের কথাই ভাববেন।
তিনি বলেন,
«لِكُلِّ نَبِيٍّ دَعْوَةٌ مُسْتَجَابَةٌ، فَتَعَجَّلَ كُلُّ نَبِيٍّ دَعْوَتَهُ، وَإِنِّي اخْتَبَأْتُ دَعْوَتِي شَفَاعَةً لِأُمَّتِي يَوْمَ الْقِيَامَةِ»
অর্থঃ প্রত্যেক নবীর একটি কবুল হওয়া দোয়া ছিল। তাঁরা তা দুনিয়াতেই করে নিয়েছেন। কিন্তু আমি আমার সেই দোয়াকে কিয়ামতের দিন আমার উম্মতের শাফাআতের জন্য সংরক্ষণ করে রেখেছি।-সহীহ বুখারী
এ হাদীস রাসূল ﷺ-এর উম্মতের প্রতি সীমাহীন মমতার এক অনন্য দলিল।
তাঁর কান্না ছিল মানবতার জন্য
রাসূলুল্লাহ ﷺ ছিলেন কোমল হৃদয়ের অধিকারী। তিনি আল্লাহর ভয়ে কেঁদেছেন, কুরআন শুনে কেঁদেছেন, প্রিয়জনের মৃত্যুতে কেঁদেছেন এবং সর্বোপরি উম্মতের ভবিষ্যৎ নিয়ে কেঁদেছেন।
পুত্র ইবরাহীম (রা.)-এর ইন্তিকালে তিনি বলেন,
«إِنَّ الْعَيْنَ تَدْمَعُ، وَالْقَلْبَ يَحْزَنُ، وَلَا نَقُولُ إِلَّا مَا يُرْضِي رَبَّنَا، وَإِنَّا بِفِرَاقِكَ يَا إِبْرَاهِيمُ لَمَحْزُونُونَ»
অর্থঃ নিশ্চয়ই চোখ অশ্রু ঝরায়, হৃদয় ব্যথিত হয়; তবে আমরা এমন কথাই বলি, যাতে আমাদের প্রতিপালক সন্তুষ্ট হন। হে ইবরাহীম! তোমার বিচ্ছেদে আমরা অবশ্যই শোকাহত।-সহীহ বুখারী
এ হাদীস শিক্ষা দেয়, ইসলাম মানবীয় আবেগকে অস্বীকার করে না; বরং তাকে সঠিক পথে পরিচালিত করে।
রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর জীবন গভীরভাবে অধ্যয়ন করলে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে ‘রহমাতুল লিল আলামীন’ শুধু একটি উপাধি নয়; বরং তাঁর সমগ্র জীবনব্যবস্থার বাস্তব পরিচয়।
তিনি ছিলেন,
হিদায়াতের রহমত,
ক্ষমার রহমত,
ন্যায়বিচারের রহমত,
মানবতার রহমত,
উম্মতের রহমত,
এবং সমগ্র সৃষ্টিজগতের রহমত।
তাঁর রহমতের ছায়ায় আশ্রয় পেয়েছে মানুষ ও জিন, ধনী ও দরিদ্র, নারী ও পুরুষ, শিশু ও বৃদ্ধ, বন্ধু ও শত্রু, এমনকি পশু-পাখি ও প্রকৃতিও।
আজকের পৃথিবী যুদ্ধ, বিদ্বেষ, বৈষম্য, পারিবারিক ভাঙন ও নৈতিক সংকটে জর্জরিত। এমন সময় রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর দয়া, ক্ষমাশীলতা, সহনশীলতা, ন্যায়পরায়ণতা ও মানবিকতার আদর্শই পারে মানবসভ্যতাকে শান্তি ও কল্যাণের পথে ফিরিয়ে আনতে।
আসুন, আমরা শুধু মুখে তাঁকে "রহমাতুল লিল আলামীন" বলে সম্মান প্রদর্শন না করে, তাঁর চরিত্রকে নিজেদের জীবনে ধারণ করি। পরিবারে দয়া, সমাজে ন্যায়, দুর্বলের প্রতি সহমর্মিতা, ভিন্নমতের মানুষের প্রতি সহিষ্ণুতা এবং আল্লাহর সকল সৃষ্টির প্রতি মমতা প্রদর্শনের মাধ্যমে তাঁর প্রকৃত অনুসারী হওয়ার চেষ্টা করি।
আল্লাহ তা‘আলা আমাদের সবাইকে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর আদর্শ অনুযায়ী জীবন গড়ার তাওফীক দান করুন। তাঁর সুন্নাহর ওপর অবিচল রাখুন এবং কিয়ামতের দিন তাঁর শাফাআত নসীব করুন।
آمين يا رب العالمين
মন্তব্য (...)
এ সম্পর্কিত আরও প্রবন্ধ
ইবলিস ও জিন জাতি
ইবলিস আল্লাহর নিকট ইবলিসের অবস্থান ছিল অত্যন্ত সম্মান ও মর্যাদার। কিন্তু আল্লাহর আদেশের বিপরীত যুক্ত...
বার্মার আরাকান রাজ্য ও রোহিঙ্গা জাতির ইতিহাস : আমাদের কর্তব্য
ভাগ্যদুর্বিপাকে বার্মা তথা মায়ানমারের দখলে চলে যাওয়া আরাকান তথা রাখাইন রাজ্যটি আসলে একটি স্বতন্ত্র দ...
ইমাম আবু হানীফা রহ. সম্পর্কে ইমাম ইবনে আবী শাইবা রহ.-এর মনোভাব : একটি পর্যালোচনা
ইমাম আবু হানীফা রহ. সম্পর্কে ইমাম ইবনে আবী শাইবা রহ.-এর মনোভাব : একটি পর্যালোচনা মাওলানা মুহসিনুদ্দী...
ফিলিস্তিন সংকট : তোমরাই বিজয়ী হবে...
শাঈখুল ইসলাম মুফতি তাকী উসমানী হামদ ও ছানার পর... وَلَا تَهِنُواْ وَلَا تَحْزَنُواْ وَأَنتُمُ الْأَع...
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন