প্রবন্ধ
উম্মতে মুহাম্মাদীর শ্রেষ্ঠত্ব ও অনন্য বৈশিষ্ট্যাবলী
২০ জুলাই, ২০২৬
৮১৪
০
মহান আল্লাহ তাআলা মানবজাতিকে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে পথপ্রদর্শনের জন্য যুগে যুগে অগণিত নবী ও রাসূল প্রেরণ করেছেন। তবে শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ (ﷺ)-এর উম্মত হিসেবে আমাদেরকে যে মর্যাদা দান করা হয়েছে, তা পূর্ববর্তী সকল জাতির শ্রেষ্ঠত্বকে ছাড়িয়ে যায়। উম্মতে মুহাম্মাদীর এই বিশেষত্ব কেবল বংশগত বা জাতিগত নয়, বরং ঈমান, আমল এবং মহান আল্লাহর বিশেষ রহমতের ওপর প্রতিষ্ঠিত। কুরআন ও সুন্নাহর পাতায় পাতায় এই উম্মতের যে অসামান্য ফজিলত বর্ণিত হয়েছে, তা মুমিনের হৃদয়ে একদিকে যেমন কৃতজ্ঞতার সঞ্চার করে, অন্যদিকে তাকে অর্পিত দায়িত্ব পালনে সচেতন করে তোলে। আলোচ্য প্রবন্ধে আমরা এই মহান উম্মতের অনন্য বৈশিষ্ট্য ও শ্রেষ্ঠত্বের বিভিন্ন দিক উন্মোচন করার প্রয়াস পাবো।
উম্মতে মুসলিমা: একটি মধ্যপন্থী ও ভারসাম্যপূর্ণ জাতি
উম্মতে মুহাম্মাদীর সর্বপ্রধান বৈশিষ্ট্য হলো তারা একটি ভারসাম্যপূর্ণ জাতি। তারা বাড়াবাড়ি ও ছাড়াছাড়ির মাঝামাঝি এক ভারসাম্যপূর্ণ পথের পথিক। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন পবিত্র কুরআনে এই জাতির বিশেষত্ব বর্ণনা করতে গিয়ে 'উম্মতে ওয়াসাত' বা মধ্যপন্থী জাতি শব্দবন্ধটি ব্যবহার করেছেন। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:
وَ كَذٰلِکَ جَعَلْنٰکُمْ اُمَّۃً وَّسَطًا لِّتَکُوْنُوْا شُہَدَآءَ عَلَی النَّاسِ وَ یَکُوْنَ الرَّسُوْلُ عَلَیْکُمْ شَہِیْدًا
অর্থ: "(হে মুসলমানগণ!) এভাবেই আমি তোমাদেরকে এক মধ্যপন্থী জাতি বানিয়েছি, যাতে তোমরা অন্য মানুষের ওপর সাক্ষী হতে পারো এবং রাসূল তোমাদের ওপর সাক্ষী হতে পারেন।" (সূরা বাকারা: ১৪৩)
আরবিতে 'ওয়াসাত' শব্দের অর্থ হলো মধ্যপন্থী, ভারসাম্যপূর্ণ এবং ইনসাফপূর্ণ। যেভাবে কোনো একটি সভার মঞ্চ ঠিক মাঝখানে করা হয় এবং প্রধান ব্যক্তির আসনটি থাকে একদম মধ্যস্থলে, তেমনি এই উম্মতকেও আল্লাহ এক বিশেষ মর্যাদায় আসীন করেছেন। এই আয়াত থেকে প্রতীয়মান হয় যে, উম্মতে মুহাম্মাদী ধর্মের ক্ষেত্রে যেমন বাড়াবাড়ি করে না, তেমনি দুনিয়ার মোহে পড়ে দ্বীনকে বিসর্জনও দেয় না। এই ন্যায়নিষ্ঠ ও ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থানের কারণেই কিয়ামতের দিন তারা পূর্ববর্তী জাতিগুলোর বিরুদ্ধে সত্য সাক্ষ্য প্রদান করার যোগ্য বিবেচিত হবে।
সাহাবায়ে কেরামকে ভারসাম্যপূর্ণ ইবাদতের প্রশিক্ষণ
আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (ﷺ) সাহাবায়ে কেরামকে সর্বদা বাড়াবাড়ি পরিহার করে মধ্যপন্থায় জীবন অতিবাহিত করার শিক্ষা দিয়েছেন। হযরত আনাস ইবনে মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, তিন ব্যক্তির একটি দল নবী কারীম (ﷺ)-এর স্ত্রীদের ঘরে তাঁর ইবাদত সম্পর্কে জানতে এলেন। যখন তাদেরকে নবীজির ইবাদত সম্পর্কে জানানো হলো, তখন তাঁরা যেন সেটাকে কম মনে করলেন। তাঁরা বলতে লাগলেন, "নবীজির সাথে আমাদের কী তুলনা? তাঁর তো আগের পরের সকল ভুল-ত্রুটি ক্ষমা করে দেওয়া হয়েছে।"
তাঁদের একজন বললেন, "আমি সারা রাত নফল নামাজ পড়ব।" দ্বিতীয়জন বললেন, "আমি সারাজীবন রোজা রাখব, কখনো বিরতি দেব না।" আর তৃতীয়জন বললেন, "আমি নারী থেকে দূরে থাকব এবং কখনো বিয়ে করব না।" তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাঁদের কাছে এসে বললেন:
أنْتُمُ الَّذِيْنَ قُلْتُمْ کَذَا وَکَذَا أمَا وَاللہِ إِنِّيْ لَأخْشَاکُمْ لِلہِ وَأتْقَاکُمْ لَہٗ لَکِنِّيْ أصُوْمُ وَاُفْطِرُ وَأصَلِّيْ وَأرْقُدُ وَأتَزَوَّجُ النِّسَاءَ فَمَنْ رَغِبَ عَنْ سُنَّتِيْ فَلَيْسَ مِنِّيْ
অর্থ: "তোমরাই কি সেই সব লোক যারা এমন এমন কথা বলেছ? শোনো! আল্লাহর কসম, আমি তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আল্লাহকে ভয় করি এবং তোমাদের মাঝে সর্বশ্রেষ্ঠ মুত্তাকী। কিন্তু আমি রোজা রাখি আবার বিরতিও দেই, রাতে নামাজ পড়ি আবার ঘুমাই এবং আমি নারীদের বিয়েও করি। সুতরাং যে আমার সুন্নত থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে, সে আমার দলভুক্ত নয়।" (সহীহ বুখারী: ৫০৬৩)
এই হাদিস থেকে প্রতীয়মান হয় যে, দুনিয়া ত্যাগ করে বৈরাগ্য অবলম্বন করা ইসলামের আদর্শ নয়। বরং নবীজির প্রদর্শিত পরিমিতিবোধ ও সুন্নাহর অনুসরণই হলো প্রকৃত কামিয়াবি।
দীন ও দুনিয়ার কর্তব্যে ভারসাম্য রক্ষা
ইসলাম কেবল ব্যক্তিগত ইবাদত নয়, বরং সামাজিক ও পারিবারিক হক আদায়ের ওপরও সমান গুরুত্ব দেয়। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর কাছে এসে জিহাদে যাওয়ার অনুমতি চাইলেন। নবীজি (ﷺ) তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, "তোমার কি বাবা-মা বেঁচে আছেন?" তিনি উত্তর দিলেন, "হ্যাঁ।" তখন নবীজি (ﷺ) বললেন:
فَفِيْہِمَا فَجَاہِدْ
অর্থ: "তাহলে তাঁদের সেবা করার মাধ্যমেই জিহাদ করো।"
অন্য এক বর্ণনায় এসেছে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাঁকে বললেন: "তুমি তোমার বাবা-মার কাছে ফিরে যাও এবং তাঁদের সাথে উত্তম আচরণ করো।" (সহীহ বুখারী: ৩০০৪)
এই হাদিসের অন্তর্নিহিত তাৎপর্য হলো এই যে, জিহাদ যদিও ইসলামে অত্যন্ত উচ্চস্তরের আমল, কিন্তু সেই ব্যক্তির জন্য ওই মুহূর্তে তাঁর বাবা-মার সেবা করা ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দীনী দায়িত্ব। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাঁর এই নির্দেশনার মাধ্যমে উম্মতকে ইবাদত ও অন্যান্য দায়িত্বের মধ্যে সুন্দর এক ভারসাম্য চর্চা শিখিয়েছেন।
যেমনিভাবে আল্লাহ তাআলা এই উম্মতকে শরীয়তের দিক থেকে শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন, তেমনিভাবে দুনিয়া ও আখেরাতে অন্যান্য অনেক শ্রেষ্ঠত্ব ও মর্যাদা এই উম্মতের জন্য গচ্ছিত রেখেছেন। সময় ও ইতিহাসের প্রবাহে এই উম্মতকে যে সব অনন্য সম্মানে ভূষিত করা হয়েছে, তা নিচে পর্যায়ক্রমে আলোচনা করা হলো।
মানব ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ যুগ ও সময়
উম্মতে মুহাম্মাদীর একটি বিশাল মর্যাদা হলো, এই উম্মতের আগমন ঘটেছে পৃথিবীর ইতিহাসের শ্রেষ্ঠতম সময়ে। নবী কারীম (ﷺ) ইরশাদ করেছেন:
بُعِثْتُ مِنْ خَيْرِ قُرُونِ بَنِي آدَمَ، قَرْنًا فَقَرْنًا، حَتَّي كُنْتُ مِنَ القَرْنِ الَّذِي كُنْتُ فِيهِ
অর্থ: "আমাকে বনী আদমের সর্বশ্রেষ্ঠ যুগে প্রেরণ করা হয়েছে। এভাবে এক যুগের পর আরেক যুগ অতিক্রান্ত হয়ে শ্রেষ্ঠতম যুগটি এসেছে যাতে আমার আবির্ভাব ঘটেছে।" (সহীহ বুখারী: ৩৫৫৭)
এই হাদিস থেকে প্রতীয়মান হয় যে, পূর্ববর্তী অন্যান্য নবীগণের সময়কাল অপেক্ষা নবীজি (ﷺ)-এর যুগ এবং তাঁর উম্মতের সময়কাল আল্লাহর কাছে অধিকতর শ্রেষ্ঠ। সকল উম্মতের অভিজ্ঞতার নির্যাস এবং ইসলামের পূর্ণাঙ্গ রূপটি পাওয়ার সৌভাগ্য কেবল এই শেষ উম্মতেরই হয়েছে।
সাপ্তাহিক শ্রেষ্ঠ দিন জুমআ লাভ
আল্লাহ তাআলা দয়াপরবশ হয়ে উম্মতে মুহাম্মাদীকে জুমআ দান করেছেন। জুমআর দিনটি সপ্তাহের শ্রেষ্ঠ দিন, যাকে এই উম্মতের জন্য সাপ্তাহিক ঈদ হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এ সম্পর্কে ইরশাদ করেছেন:
مَا طَلَعَتِ الشَّمْسُ وَلَا غَرَبَتْ عَلٰي يَوْمٍ خَيْرٍ مِنْ يَوْمِ الْجُمُعَةِ، هَدَانَا اللّٰهُ لَهُ وَأَضَلَّ النَّاسَ عَنْهُ
অর্থ: "এমন কোনো দিনের ওপর সূর্য উদিত বা অস্তমিত হয় না, যা জুমআর দিন অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ। আল্লাহ আমাদের এই দিনের পথ দেখিয়েছেন এবং অন্য উম্মতদের এ থেকে বঞ্চিত রেখেছেন। অন্যান্য জাতিসমূহ এ বিষয়ে আমাদের পশ্চাদ্ধাবনকারী। শুক্রবার আমাদের, ইহুদিদের জন্য শনিবার আর খ্রিস্টানদের জন্য রবিবার।" (মুসনাদে আহমদ: ১০৭২৩)
এই হাদিস থেকে প্রতীয়মান হয় যে, জুমআর দিনের মর্যাদা ও মাহাত্ম্য উম্মতে মুহাম্মাদীর জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে এক বিশেষ উপহার। এই দিনের বিশেষ মুহূর্তগুলোতে দোয়া কবুল হওয়া এবং ইবাদতের যে সুযোগ এই উম্মত পেয়েছে, তা থেকে পূর্ববর্তী উম্মতগণ মাহরুম ছিলেন।
সহজ ও সাবলীল জীবনবিধান লাভ
উম্মতে মুহাম্মাদীর প্রতি আল্লাহর অন্যতম শ্রেষ্ঠ নেয়ামত হলো তাদের জন্য প্রদত্ত সহজ ও সুন্দর জীবনব্যবস্থা। পূর্ববর্তী অনেক উম্মতের ওপর পরীক্ষা হিসেবে যে সব কঠিন বিধান ও বোঝা চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল, এই উম্মতকে দয়া করে সেসব থেকে মুক্তি দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেন:
{هُوَ اجْتَبَاكُمْ وَمَا جَعَلَ عَلَيْكُمْ فِي الدِّينِ مِنْ حَرَجٍ مِلَّةَ أَبِيكُمْ إِبْرَاهِيْمَ }
অর্থ: "তিনি তোমাদেরকে মনোনীত করেছেন এবং ধর্মের ব্যাপারে তোমাদের ওপর কোনো কঠোরতা বা সংকীর্ণতা আরোপ করেননি; এটি তোমাদের পিতা ইবরাহীমের ধর্মাদর্শ।" (সূরা হজ: ৭৮)
এই আয়াত থেকে প্রতীয়মান হয় যে, ইসলাম কোনো সংকীর্ণ বা দুঃসাধ্য জীবনবিধান নয়। মহান আল্লাহ তাঁর বান্দাদের সামর্থ্যের অতিরিক্ত কোনো বোঝা যেমন চাপাননি, তেমনি ধর্ম পালনের পথকেও অত্যন্ত প্রশস্ত ও সহজ করে দিয়েছেন। এই বিশেষ সহজ শরীয়ত লাভ করা এই শেষ উম্মতের জন্য এক বিরল সৌভাগ্যের বিষয়।
হিসাব-নিকাশের ময়দানে অগ্রাধিকার
কিয়ামতের বিভীষিকাময় পরিস্থিতিতে যখন সকল মানুষ চরম উৎকণ্ঠার মধ্যে থাকবে, তখন উম্মতে মুহাম্মাদীর মর্যাদা ও সম্মান বিশেষভাবে ফুটে উঠবে। সময়ের হিসেবে এই উম্মত সবার শেষে এলেও বিচারকার্যের জন্য তাদেরই সবার আগে ডাকা হবে। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ইরশাদ করেছেন:
نَحْنُ آخِرُ الْأُمَمِ، وَأَوَّلُ مَنْ يُحَاسَبُ، يُقَال:أَيْنَ الْأُمَّةُ الْأُمِّيَّةُ، وَنَبِيُّهَا؟ فَنَحْنُ الْآخِرُونَ الْأَوَّلُونَ
অর্থ: "সৃষ্টির পর্যায়ক্রমে আমরা সবার শেষে আসা উম্মত, কিন্তু বিচারের ময়দানে আমাদেরই সবার আগে হিসাব নেওয়া হবে। সেদিন ঘোষণা করা হবে, উম্মী উম্মত এবং তাদের নবী কোথায়? সুতরাং আমরা কালানুক্রমে সবার শেষে হলেও হিসাব প্রদানের ক্ষেত্রে সবার অগ্রগামী থাকবো।" (সুনানে ইবনে মাজাহ: ৪২৯০)
উক্ত হাদিসটি গভীরভাবে লক্ষ করলে বোঝা যায়, মহান আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রিয় রাসূলের খাতিরে এই উম্মতকে অন্যান্য সকল জাতির ওপরে এমন এক মর্যাদা দান করেছেন, যার ফলে দীর্ঘ অপেক্ষার ক্লান্তি থেকে বাঁচিয়ে সবার আগে তাদের চূড়ান্ত ফয়সালার ব্যবস্থা করা হবে।
পুলসিরাত পারাপারে অগ্রাধিকার
হিসাব-নিকাশ সম্পন্ন হওয়ার পর কিয়ামতের এক কঠিন পর্যায় হলো জাহান্নামের ওপর স্থাপিত পুলসিরাত পার হওয়া। ঈমান ও আমলের জ্যোতি নিয়ে এই উম্মতই সবার আগে এই বিপদসংকুল পথ অতিক্রম করার বিরল সম্মান লাভ করবে। নবীজি (ﷺ) ইরশাদ করেছেন:
وَيُضْرَبُ الصِّرَاطُ بَيْنَ ظَهْرَيْ جَهَنَّمَ، فَأَكُونُ أَنَا وَأُمَّتِي أَوَّلَ مَنْ يُجِيزُهَا
অর্থ: "জাহান্নামের দুই পিঠের মাঝে পুলসিরাত স্থাপন করা হবে; আর আমি এবং আমার উম্মতই হবো প্রথম দল, যারা সেটি অতিক্রম করবে।" (সহীহ বুখারী: ৭৪৩৭)
এই হাদিস থেকে প্রতীয়মান হয় যে, সেদিন যখন প্রতিটি পদক্ষেপে মানুষের স্খলন ঘটবে, তখন এই উম্মতকে আল্লাহ তাআলা সবার আগে সাফল্যের তীরে পৌঁছে যাওয়ার সুযোগ করে দিবেন। নবীজি (ﷺ)-এর পবিত্র ইমামত ও নেতৃত্বে এই উম্মত সবার আগে পুলসিরাত পার হবে।
জান্নাতে প্রবেশের ক্ষেত্রে অগ্রগণ্যতা
যেহেতু উম্মতে মুহাম্মাদীর হিসাব সবার আগে হবে এবং তারা পুলসিরাতও সবার আগে পার হবে, তাই জান্নাতে প্রবেশের মহিমান্বিত মুহূর্তেও তারাই সবার অগ্রভাগে থাকবে। এ সম্পর্কে নবী কারীম (ﷺ) থেকে বর্ণিত হয়েছে:
نَحْنُ الْآخِرُونَ الْأَوَّلُونَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ، وَنَحْنُ أَوَّلُ مَنْ يَدْخُلُ الْجَنَّةَ
অর্থ: "সময়ের হিসেবে আমরা শেষে এলেও কিয়ামতের দিন আমরাই অগ্রগামী থাকবো এবং আমরাই প্রথম দল হিসেবে জান্নাতে প্রবেশ করবো।" (সহীহ মুসলিম: ৮৫৫)
এই হাদিস থেকে প্রতীয়মান হয় যে, জান্নাতের সুশীতল ছায়ায় প্রথম পা রাখার আনন্দ ও সৌভাগ্য মহান আল্লাহ এই উম্মতের জন্যই গচ্ছিত রেখেছেন। দুনিয়ায় যেমন এই উম্মত শ্রেষ্ঠত্বের অধিকারী, আখেরাতের চূড়ান্ত পুরস্কার লাভেও তারা হবে অগ্রগণ্য।
জান্নাতবাসীদের মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠতা
উম্মতে মুহাম্মাদীর শ্রেষ্ঠত্ব কেবল আগে প্রবেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং জান্নাতের বিশাল জনসমষ্টির সিংহভাগই হবে এই উম্মতের অন্তর্ভুক্ত। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসঊদ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) একদা সাহাবীগণকে লক্ষ্য করে আল্লাহর শপথ করে বললেন:
وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ، إِنِّي أَرْجُو أَنْ تَكُونُوا رُبُعَ أَهْلِ الجَنَّةِ فَكَبَّرْنَا، فَقَالَ: أَرْجُو أَنْ تَكُونُوا ثُلُثَ أَهْلِ الجَنَّةِ فَكَبَّرْنَا، فَقَالَ:أَرْجُو أَنْ تَكُونُوا نِصْفَ أَهْلِ الجَنَّةِ فَكَبَّرْنَا
অর্থ: "সেই সত্তার শপথ যাঁর হাতে আমার প্রাণ! আমি আশা করি যে তোমরা হবে সমগ্র জান্নাতবাসীদের এক-চতুর্থাংশ। আমরা তা শুনে আল্লাহু আকবার ধ্বনি দিলাম। অতঃপর তিনি বললেন, আমি আশা করি তোমরা হবে সমগ্র জান্নাতবাসীর এক-তৃতীয়াংশ। আমরা পুনরায় আল্লাহু আকবার বললাম। তারপর তিনি বললেন, আমি আশা করি তোমরা হবে সমগ্র জান্নাতবাসীর অর্ধেক। আমরা আবার আল্লাহু আকবার ধ্বনি দিয়ে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলাম।" (সহীহ বুখারী: ৩৩৪৮)
উক্ত হাদিসটি গভীরভাবে লক্ষ করলে বোঝা যায়, জান্নাতের ব্যাপ্তি আসমান ও জমিনের সমান হওয়া সত্ত্বেও তার অর্ধেক জনবলই হবে নবীজি (ﷺ)-এর উম্মত। পূর্ববর্তী সকল নবীর উম্মত মিলে হবে অর্ধেক, আর উম্মতে মুহাম্মাদী একাই হবে বাকি অর্ধেক। এই সংখ্যাতাত্ত্বিক শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করে যে, এই উম্মতের প্রতি আল্লাহর রহমত কত ব্যাপক ও অসীম।
বিনা হিসেবে জান্নাত লাভের সৌভাগ্য
কিয়ামতের ময়দানে বিচার ও জান্নাতে প্রবেশের ক্ষেত্রে অগ্রগণ্য হওয়ার পাশাপাশি এই উম্মতের এক বিশাল দলকে আল্লাহ তাআলা বিনা হিসেবে জান্নাত লাভের এক বিশেষ মর্যাদায় ভূষিত করবেন। নবী কারীম (ﷺ) ইরশাদ করেছেন:
هٰؤُلَائِ أُمَّتُكَ، وَمَعَ هَؤُلَائِ سَبْعُونَ أَلْفًا يَدْخُلُونَ الجَنَّةَ بِغَيْرِ حِسَابٍ
অর্থ: "এরা আপনার উম্মত এবং তাদের সঙ্গে এমন সত্তর হাজার লোক রয়েছে, যারা কোনো প্রকার হিসাব ছাড়াই জান্নাতে প্রবেশ করবে।" (সহীহ বুখারী: ৫৭৫২)
পরবর্তীকালে আল্লাহর পক্ষ থেকে এই সুসংবাদের পরিধি আরও বিস্তৃত করা হয়েছে। নবীজি (ﷺ) থেকে বর্ণিত অন্য এক হাদিসে এসেছে:
وَعَدَنِي رَبِّي سُبْحَانَهُ أَنْ يُدْخِلَ الْجَنَّةَ مِنْ أُمَّتِي سَبْعِينَ أَلْفًا، لَا حِسَابَ عَلَيْهِمْ، وَلَا عَذَابَ، مَعَ كُلِّ أَلْفٍ سَبْعُونَ أَلْفًا، وَثَلَاثُ حَثَيَاتٍ مِنْ حَثَيَاتِ رَبِّي عَزَّ وَجَلَّ
অর্থ: "আমার প্রতিপালক আমার সাথে ওয়াদা করেছেন যে, তিনি আমার উম্মতের সত্তর হাজার মানুষকে কোনো প্রকার হিসাব ও আজাব ছাড়াই জান্নাতে প্রবেশ করাবেন। আবার এই সত্তর হাজারের প্রত্যেকের সাথে আরও সত্তর হাজার করে মানুষ থাকবে এবং আমার প্রতিপালকের তিন আঁজলা পরিমাণ লোকও বিনা হিসেবে জান্নাতে যাবে।" (সুনানে ইবনে মাজাহ: ৪২৮৬)
এই হাদিস থেকে প্রতীয়মান হয় যে, মহান আল্লাহ এই উম্মতের ওপর তাঁর রহমতের দ্বার এতটাই অবারিত করেছেন যে, অগণিত মুমিন কোনো প্রকার কঠিন জেরার মুখোমুখি না হয়েই সরাসরি জান্নাতের চিরস্থায়ী জীবন লাভ করবে।
জান্নাতী নেতৃবৃন্দের বিশেষ সম্মান
জান্নাতের অধিবাসী হওয়ার পাশাপাশি জান্নাতের বিভিন্ন স্তরের নেতৃবৃন্দও হবে এই উম্মতের শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিবর্গ। নারী, যুবক এবং প্রবীণদের জন্য জান্নাতে যে বিশেষ নেতৃত্বের মর্যাদা ঘোষণা করা হয়েছে, তার সবটুকুই উম্মতে মুহাম্মাদীর গৌরব। হযরত আলী (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) হযরত আবু বকর ও হযরত ওমর (রা.) সম্পর্কে ইরশাদ করেছেন:
أَبُو بَكْرٍ وَعُمَرُ سَيِّدَا كُهُولِ أَهْلِ الْجَنَّةِ مِنَ الْأَوَّلِينَ وَالْآخِرِينَ، إِلَّا النَّبِيِّينَ وَالْمُرْسَلِينَ
অর্থ: "আবু বকর ও ওমর নবী ও রাসূলগণ ব্যতীত জান্নাতের সকল প্রবীণ বা বয়োজ্যেষ্ঠদের সরদার হবেন, যারা প্রথম থেকে শেষ যুগ পর্যন্ত আগমন করেছে।" (সুনানে ইবনে মাজাহ: ৯৫)
একইভাবে জান্নাতের নারীদের মর্যাদা সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) হযরত ফাতিমা (রা.)-কে উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন:
أَمَا تَرْضَيْنَ أَنْ تَكُونِي سَيِّدَةَ نِسَاءِ أَهْلِ الجَنَّةِ
অর্থ: "হে ফাতিমা! তুমি কি এতে সন্তুষ্ট নও যে, তুমি জান্নাতের সকল নারীর নেত্রী বা সরদারনী হবে?" (সহীহ বুখারী: ৩৬২৪)
যুবকদের মর্যাদা বর্ণনা করতে গিয়ে নবীজি (ﷺ) ইরশাদ করেছেন:
الحَسَنُ وَالحُسَيْنُ سَيِّدَا شَبَابِ أَهْلِ الجَنَّةِ
অর্থ: "হাসান ও হুসাইন হবে জান্নাতের সকল যুবকের সরদার।" (সুনানে তিরমিযী: ৩৭৬৮)
এই হাদিসগুলো প্রমাণ করে যে, জান্নাতেও বিভিন্ন উচ্চপর্যায়ে এই উম্মতের শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিরাই নেতৃত্ব দেবেন, যা সামগ্রিকভাবে পুরো উম্মতের জন্যই এক অনন্য গৌরবের স্মারক।
সমগ্র জমিনকে ইবাদতগাহ ও পবিত্রতার মাধ্যম হিসেবে লাভ
ইবাদত-বন্দেগির ক্ষেত্রে উম্মতে মুহাম্মাদীকে এমন কিছু সুযোগ দেওয়া হয়েছে যা পূর্ববর্তী কোনো উম্মতের জন্য বৈধ ছিল না। হযরত জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ইরশাদ করেছেন:
أُعْطِيتُ خَمْسًا لَمْ يُعْطَهُنَّ أَحَدٌ قَبْلِي:نُصِرْتُ بِالرُّعْبِ مَسِيرَةَ شَهْرٍ، وَجُعِلَتْ لِي الأَرْضُ مَسجِدًا وَطَهُورًا، فَأَيُّمَا رَجُلٍ مِنْ أُمَّتِي أَدْرَكَتْهُ الصَّلاَةُ فَلْيُصَلِّ، وَأُحِلَّتْ لِي المَغَانِمُ وَلَمْ تَحِلَّ لِأَحَدٍ قَبْلِي
অর্থ: "আমাকে এমন পাঁচটি বৈশিষ্ট্য দান করা হয়েছে, যা আমার পূর্বে আর কাউকে দেওয়া হয়নি। আমাকে এক মাসের দূরত্বের পথ পর্যন্ত শত্রুর মনে ভীতি সৃষ্টি করে সাহায্য করা হয়েছে; সমগ্র জমিনকে আমার জন্য নামাজের জায়গা (মসজিদ) ও পবিত্রতা অর্জনের মাধ্যম (তায়াম্মুমের মাটি) বানানো হয়েছে। সুতরাং আমার উম্মতের যে কেউ যেখানেই নামাজের ওয়াক্ত পাবে, সেখানেই যেন নামাজ আদায় করে নেয়। আর আমার জন্য গনিমত বা যুদ্ধলব্ধ মাল হালাল করা হয়েছে, যা আগে কারো জন্য হালাল ছিল না।" (সহীহ বুখারী: ৩৩৫)
এই হাদিস থেকে প্রতীয়মান হয় যে, উম্মতে মুহাম্মাদীর ইবাদত কেবল নির্দিষ্ট কোনো উপাসনালয়ে সীমাবদ্ধ নয়। বরং মহান আল্লাহ এই উম্মতের জন্য পুরো পৃথিবীকেই ইবাদতের উপযুক্ত এবং মাটিকে পবিত্রতা অর্জনের সহজ বিকল্প হিসেবে নির্ধারণ করে দিয়েছেন।
অল্প আমলে বিশাল সওয়াব ও প্রতিদান লাভ
উম্মতে মুহাম্মাদীর জন্য মহান আল্লাহর আরেকটি বিশেষ অনুগ্রহ হলো, তিনি এই উম্মতের জন্য অল্প আমলে অধিক সওয়াব লাভের অবারিত সুযোগ রেখেছেন। সময়ের সংক্ষিপ্ততা সত্ত্বেও ইবাদতের গুরুত্ব ও ফজিলত বাড়িয়ে দিয়ে এই উম্মতকে পূর্ববর্তী দীর্ঘজীবী উম্মতদের সমকক্ষ বা তাদের চেয়েও অগ্রগামী করে দিয়েছেন। উদাহরণস্বরূপ, লাইলাতুল কদরের এক রাতের ইবাদতকে এক হাজার মাসের ইবাদতের চেয়েও শ্রেষ্ঠ ঘোষণা করা হয়েছে। (সূরা কদর)। এছাড়া বিভিন্ন বিশেষ দিনে নফল রোজা ও আমলের মাধ্যমে বিশাল সওয়াবের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। নবী কারীম (ﷺ) ইরশাদ করেছেন,
صِيَامُ يَوْمِ عَرَفَةَ، أَحْتَسِبُ عَلَى اللهِ أَنْ يُكَفِّرَ السَّنَةَ الَّتِي قَبْلَهُ، وَالسَّنَةَ الَّتِي بَعْدَهُ
ইয়াওমে আরাফার রোযার বিষয়ে আমি আল্লাহর কাছে আশাবাদী, তিনি এর দ্বারা এর আগের এক বছরের ও পরের এক বছরের গোনাহ মাফ করবেন। (সহীহ মুসলিম: ১১৬২)
তেমনিভাবে রমজানের রোজা শেষ করে শাওয়ালের ছয়টি রোজা রাখার গুরুত্ব বর্ণনা করতে গিয়ে নবীজি (ﷺ) ইরশাদ করেছেন, এটি 'সিয়ামুদ দাহর' বা সারা বছর রোজা রাখার সমান সওয়াব বয়ে আনে। (সহীহ মুসলিম: ১১৬৪)। আবার আশুরার রোজার মাধ্যমে এক বছরের গুনাহ মাফের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। (সহীহ মুসলিম: ১১৬২)। কেবল সময় নয়, স্থানের বরকতেও এই উম্মত অগ্রগামী। মক্কার হারামে এক নামাজ এক লক্ষ নামাজের সমান এবং মসজিদে নববীতে এক নামাজ এক হাজার নামাজের সমান সওয়াব বহন করে। (মুসনাদে আহমদ: ১৫২৭১)
এই হাদিসগুলো প্রমাণ করে যে, মহান আল্লাহ এই উম্মতের ওপর তাঁর রহমতের ভাণ্ডার উন্মুক্ত করে দিয়েছেন, যেন তারা অল্প সময়ের হায়াতেও নেক আমলের পাল্লাকে ভারী করে আখেরাতের উচ্চ মাকাম লাভ করতে পারে।
পাঁচ ওয়াক্ত নামাজে পঞ্চাশ ওয়াক্তের সওয়াব
উম্মতে মুহাম্মাদীর জন্য ইবাদতের সহজীকরণ ও বিশাল প্রতিদানের অন্যতম বড় প্রমাণ হলো দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ। মিরাজের মহিমান্বিত রজনীতে উম্মতের ওপর প্রথমে পঞ্চাশ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ করা হলেও পরবর্তীতে আল্লাহর পক্ষ থেকে তা কমিয়ে পাঁচ ওয়াক্তে নামিয়ে আনা হয়। কিন্তু মহান দয়ালু প্রতিপালক এর সওয়াব বা প্রতিদান পঞ্চাশ ওয়াক্তের সমানই রেখে দিয়েছেন। (সহীহ মুসলিম: ১৬২)
এই হাদিসের অন্তর্নিহিত তাৎপর্য হলো, উম্মতে মুহাম্মাদীর দৈনন্দিন রুটিনকে সহজ করার পাশাপাশি তাদের আমলনামায় সওয়াব বৃদ্ধির পথ আল্লাহ তাআলা নিজের পক্ষ থেকেই করে দিয়েছেন। এটি মূলত এই উম্মতের শ্রেষ্ঠত্বের প্রতি আল্লাহ তায়ালার এক অনন্য স্বীকৃতি।
পথভ্রষ্টতা থেকে সুরক্ষা ও নিশ্চয়তা
ব্যক্তিগতভাবে এই উম্মতের কোন কোন সদস্য ভুল করতে পারে, কিন্তু এই উম্মত সামগ্রিকভাবে কখনো কোনো ভ্রান্ত বিষয়ের ওপর একমত হবে না। এটি এই উম্মতের আকিদাগত বিশুদ্ধতা রক্ষার এক ঐশী গ্যারান্টি। নবী কারীম (ﷺ) ইরশাদ করেছেন:
إِنَّ اللّٰهَ لَا يَجْمَعُ أُمَّتِي أَوْ قَالَ: أُمَّةَ مُحَمَّدٍ صَلَّي اللّٰهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَلٰى ضَلَالَةٍ، وَيَدُ اللّٰهِ مَعَ الجَمَاعَةِ
অর্থ: "নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা আমার উম্মতকে অথবা মুহাম্মদ (ﷺ)-এর উম্মতকে কোনো ভ্রষ্টতা বা ভুল পথের ওপর ঐক্যবদ্ধ করবেন না; আর আল্লাহর সাহায্য জামাআতের বা ঐক্যবদ্ধ সম্প্রদায়ের ওপর থাকে।" (সুনানে তিরমিযী: ২১৬৭)
এই হাদিস থেকে প্রতীয়মান হয় যে, এই উম্মতের বিজ্ঞ আলেম সমাজ ও বড় জামাত যখন কোনো একটি বিষয়ে একমত হবে, তখন তাকে ভ্রষ্টতা মনে করার কোনো অবকাশ নেই। উম্মতের এই সম্মিলিত বিবেককে আল্লাহ তাআলা গোমরাহি থেকে মুক্ত রেখেছেন, যা সত্য পথ সন্ধানী মুমিনদের জন্য এক পরম আশ্রয়স্থল।
উম্মতে মারহুমা বা রহমতপ্রাপ্ত জাতি
উম্মতে মুহাম্মাদীর প্রতি আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহের আরেকটি দিক হলো তাদের 'উম্মতে মারহুমা' বা রহমতপ্রাপ্ত জাতি হিসেবে আখ্যায়িত করা। এই উম্মতের ভুলভ্রান্তি ও গোনাহের কাফফারা দুনিয়াতেই বিভিন্ন বিপদ-আপদ ও পরীক্ষার মাধ্যমে করিয়ে নেওয়া হয়, যেন আখেরাতে তারা পরিচ্ছন্ন অবস্থায় আল্লাহর সামনে দাঁড়াতে পারে। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) থেকে বর্ণিত হয়েছে:
أُمَّتِي هَذِهِ أُمَّةٌ مَرْحُومَةٌ، لَيْسَ عَلَيْهَا عَذَابٌ فِي الْآخِرَةِ، عَذَابُهَا فِي الدُّنْيَا الْفِتَنُ، وَالزَّلَازِلُ، وَالْقَتْلُ
অর্থ: "আমার এই উম্মত হলো একটি রহমতপ্রাপ্ত উম্মত। আখেরাতে তাদের ওপর (অন্যান্য উম্মতের মতো) আজাব হবে না। দুনিয়াতে বিভিন্ন ফিতনা, ভূমিকম্প এবং হত্যা বা যুদ্ধের শিকার হওয়াই হবে তাদের আজাব ও গুনাহের কাফফারা।" (সুনানে আবী দাউদ: ৪২৭৮)
এই হাদিস থেকে প্রতীয়মান হয় যে, দুনিয়াবী জীবনে মুমিনদের ওপর আগত দুঃখ-কষ্ট মূলত আল্লাহর অসন্তুষ্টির প্রতীক নয়, বরং তা বান্দাকে আখেরাতের কঠিন আজাব থেকে মুক্তি দেওয়ার এক করুণাময়ী ঐশী কৌশল।
অস্তিত্ব বিলীন হওয়া থেকে ঐশী সুরক্ষা
পৃথিবীর ইতিহাসে বহু জাতি ও ধর্ম এসেছে যাদের নাম আজ কেবল ইতিহাসের পাতায় সীমাবদ্ধ। কিন্তু উম্মতে মুহাম্মাদীর জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে এই প্রতিশ্রুতি রয়েছে যে, এই উম্মতকে পৃথিবী থেকে কেউ পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন বা ধ্বংস করতে পারবে না। হযরত সাওবান (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ইরশাদ করেছেন,
إِنِّي سَأَلْتُ رَبِّي لِأُمَّتِي أَنْ لَا يُهْلِكَهَا بِسَنَةٍ عَامَّةٍ، وَأَنْ لَا يُسَلِّطَ عَلَيْهِمْ عَدُوًّا مِنْ سِوَى أَنْفُسِهِمْ، فَيَسْتَبِيحَ بَيْضَتَهُمْ، وَإِنَّ رَبِّي قَالَ: يَا مُحَمَّدُ إِنِّي إِذَا قَضَيْتُ قَضَاءً فَإِنَّهُ لَا يُرَدُّ، وَإِنِّي أَعْطَيْتُكَ لِأُمَّتِكَ أَنْ لَا أُهْلِكَهُمْ بِسَنَةٍ عَامَّةٍ، وَأَنْ لَا أُسَلِّطَ عَلَيْهِمْ عَدُوًّا مِنْ سِوَى أَنْفُسِهِمْ، يَسْتَبِيحُ بَيْضَتَهُمْ، وَلَوِ اجْتَمَعَ عَلَيْهِمْ مَنْ بِأَقْطَارِهَا
আমি আল্লাহর কাছে আবেদন করেছি যেন আমার উম্মতকে ব্যাপক দুর্ভিক্ষ দিয়ে ধ্বংস না করা হয় এবং তাদের ওপর বহিরাগত এমন কোনো শত্রু চাপিয়ে না দেওয়া হয় যারা তাদের অস্তিত্বকে মিটিয়ে দেবে। আল্লাহ তাআলা তাঁর এই দোয়া কবুল করেছেন। (সহীহ মুসলিম: ২৮৮৯)
এই হাদিস থেকে প্রতীয়মান হয় যে, বিশ্বজুড়ে ইসলামের বিরুদ্ধে নানামুখী ষড়যন্ত্র ও প্রতিকূলতা থাকলেও এই উম্মত কিয়ামত পর্যন্ত টিকে থাকবে। কোনো বাতিল শক্তিই এই উম্মতের প্রদীপকে পুরোপুরি নিভিয়ে দিতে সক্ষম হবে না, যা এই জাতির টিকে থাকার এবং শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রাখার এক ঐশী নিশ্চয়তা।
ফেরেশতাদের ন্যায় কাতারবন্দী হওয়ার বিশেষ মর্যাদা
সালাত বা নামাজের মধ্যে উম্মতে মুহাম্মাদীর কাতারবন্দী হওয়ার পদ্ধতিটিও আল্লাহর কাছে অত্যন্ত প্রিয় এবং এটি ফেরেশতাদের ইবাদতের পদ্ধতির সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ। এই বিশেষ সম্মান অন্য কোনো জাতির ক্ষেত্রে দেওয়া হয়নি। নবীজি (ﷺ) ইরশাদ করেছেন:
فُضِّلْنَا عَلَي النَّاسِ بِثَلَاثٍ: جُعِلَتْ صُفُوفُنَا كَصُفُوفِ الْمَلَائِكَةِ
অর্থ: "আমাদেরকে তিনটি বিষয়ে অন্য মানুষের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দেওয়া হয়েছে; তন্মধ্যে একটি হলো আমাদের কাতারসমূহকে ফেরেশতাদের কাতারের ন্যায় সুশৃঙ্খল করা হয়েছে।" (সহীহ মুসলিম: ৫২২)
এই হাদিস থেকে প্রতীয়মান হয় যে, মুসলিম উম্মাহ যখন নামাজে বা নেক কাজে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাতারবদ্ধ হয়, তখন তারা আসমানী ফেরেশতাদের মহান শৃঙ্খলারই প্রতিচ্ছবি হয়ে ওঠে। এই ঐক্য ও শৃঙ্খলা এই উম্মতের এক অনন্য আধ্যাত্মিক বৈশিষ্ট্য।
উম্মতে মুহাম্মাদীর এত এত বৈশিষ্ট্য ও শ্রেষ্ঠত্ব কোনো দৈব ঘটনা নয়, বরং এটি মহান আল্লাহর বিশেষ চয়ন ও অনুগ্রহের ফল। তিনি তাঁর অসীম প্রজ্ঞা দিয়ে যাকে ইচ্ছা সম্মানিত করেন। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:
{وَرَبُّكَ يَخْلُقُ مَا يَشَاء وَيَخْتَارُ مَا كَانَ لَهُمُ الْخِيَرَةُ}
অর্থ: "আর আপনার পালনকর্তা যা ইচ্ছা সৃষ্টি করেন এবং (যাকে ইচ্ছা) মনোনীত করেন; (মর্যাদা প্রদানের ক্ষেত্রে) তাদের কোনো (পছন্দ করার) অধিকার নেই।" (সূরা কাসাস: ৬৮)
সুতরাং শ্রেষ্ঠ নবীর শ্রেষ্ঠ উম্মত হওয়া আমাদের জন্য এক বিশাল নেয়ামত ও শুকরিয়ার বিষয়। তবে এই শ্রেষ্ঠত্বের সাথে মিশে আছে গুরুদায়িত্ব। 'খাইরে উম্মত' বা শ্রেষ্ঠ জাতির মর্যাদা তখনই সার্থক হবে, যখন আমরা ব্যক্তিগত পর্যায়ে এবং সমাজ ও রাষ্ট্রের সকল ক্ষেত্রে সৎ কাজের আদেশ ও মন্দ কাজের নিষেধের (আমর বিল মা’রুফ ও নাহি আনিল মুনকার) সেই মহান দায়িত্ব পালন করব। আল্লাহ তাআলা আমাদের এই উম্মতের মর্যাদা অনুধাবন করে আখেরাতে তাঁর রহমত ও জান্নাত লাভের তাওফিক দান করুন। আমীন।
মন্তব্য (...)
এ সম্পর্কিত আরও প্রবন্ধ
মানুষ ও তার ভাষা : একটি দার্শনিক বিশ্লেষণ
...
যেভাবে বিজিত হল ইস্তাম্বুল!
...
“তালেবানের বিজয়: আল্লাহর সাহায্যের এক নিদর্শন”
সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ তা'আলার জন্য। ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর আমেরিকার ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার ধ্বংসের...
সীরাত পাঠের প্রয়োজনীয়তা
যে কোনও নির্মাণকার্যের জন্য নির্মাতাকে কোন মডেল বা আদলের অনুসরণ করতে হয়। অন্যথায় সে নির্মাণকার্য স...
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন