প্রবন্ধ
ইখলাসে নাজাত, রিয়ায় ধ্বংস
৮ জুলাই, ২০২৬
৭০৬
০
ভূমিকা:
দুনিয়াতে দিন-রাত কঠোর পরিশ্রম করে গড়া কোনো বহুতল ভবনের ভিত্তি যদি নড়বড়ে হয়, তবে সামান্য আঘাতেই যেমন পুরো ভবনটি ধসে পড়ে; ঠিক তেমনি ইখলাসবিহীন পাহাড়সম আমলও পরকালে নিমিষেই ধুলিসাৎ হয়ে যায়।
পরকালীন মুক্তির মূল চাবিকাঠি হলো ‘ইখলাস’—অর্থাৎ, দুনিয়াবী স্বার্থ ও মানুষের প্রশংসা ত্যাগ করে প্রতিটি ভালো কাজ একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য করা। ইসলামে আমলের পরিমাণের চেয়ে অন্তরের খাঁটি ভাবকে বেশি প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। লোকদেখানো মানসিকতা (রিয়া) যেখানে মানুষের সারা জীবনের কষ্টকে পুড়িয়ে ছাই করে দেয়, সেখানে একনিষ্ঠ হৃদয়ের সামান্য আমলও বান্দার নাজাতের উছিলা হতে পারে। সংক্ষেপে, আমল ধ্বংসের এই ভয়াবহতা থেকে বাঁচতে এবং আখিরাতে মুক্তি পাওয়ার একমাত্র মাধ্যম হলো ইখলাস।
ইখলাস বা একনিষ্ঠতা কী?
ইখলাস শব্দের অর্থ হলো খাঁটি করা, পরিশুদ্ধ করা বা একনিষ্ঠ হওয়া।
শরিয়তের পরিভাষায়, মানুষের প্রশংসা, লোকদেখানো ভাব (রিয়া) বা দুনিয়াবি কোনো স্বার্থের তোয়াক্কা না করে, প্রতিটি ইবাদত ও কাজ শুধু মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে করাকেই ইখলাস বলে।
ইখলাস হলো আমলের আত্মা। আত্মা ছাড়া যেমন শরীরের কোনো মূল্য নেই, তেমনি ইখলাস ছাড়া ইবাদতের কোনো মূল্য নেই।
আল্লাহ তা’আলা বলেন,
وَوَ مَاۤ اُمِرُوۡۤا اِلَّا لِیَعۡبُدُوا اللّٰہَ مُخۡلِصِیۡنَ لَہُ الدِّیۡنَ
অর্থ: "তাদেরকে কেবল এই আদেশই করা হয়েছিল যে, তারা আল্লাহর ইবাদত করবে, আনুগত্যকে একনিষ্ঠভাবে তাঁরই জন্য খালেস রাখবে।" (সূরা আল-বাইয়্যিনাহ, আয়াত: ৫)
ইখলাসই আমল কবুল হওয়ার মূল ভিত্তি
আল্লাহর দরবারে কোনো আমল কবুল হওয়ার জন্য তা অবশ্যই ইখলাসপূর্ণ হতে হবে। নিয়তের সামান্য ত্রুটি পুরো আমলকে ধ্বংস করে দেয়। নিয়ত যদি খাঁটি হয়, তবে ছোট কাজও ইবাদতে পরিণত হয়।
রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন:
إِنَّ اللَّهَ لَا يَقْبَلُ مِنْ الْعَمَلِ إِلَّا مَا كَانَ لَهُ خَالِصًا وَابْتُغِيَ بِهِ وَجْهُهُ
অর্থ: "আল্লাহ কেবল সেই আমলই গ্রহণ করেন, যা একমাত্র তাঁর জন্য খাঁটি (ইখলাসপূর্ণ) হয় এবং যার মাধ্যমে তাঁর সন্তুষ্টি কামনা করা হয়।" (নাসায়ী, হাদীস: ৩১৪০)
ইখলাসের অভাব: লোকদেখানো আমল বা রিয়া
ইখলাসের সবচেয়ে বড় শত্রু হলো 'রিয়া' বা মানুষকে দেখানোর উদ্দেশ্যে আমল করা। কেউ যদি মানুষকে দেখানোর জন্য নামাজ পড়ে বা দান করে, তবে তা শিরকে পরিণত হয়। রিয়া মিশ্রিত আমলকারীর কোনো নাজাত নেই।
রাসূলুল্লাহ সা. রিয়ার ব্যপারে বলেছে,
قَالَ إِنَّ أَخْوَفَ مَا أَخَافُ عَلَيْكُمْ الشِّرْكُ الْأَصْغَرُ قَالُوْا وَمَا الشِّرْكُ الْأَصْغَرُ يَا رَسُوْلَ اللهِ؟ قَالَ الرِّيَاءُ
অর্থ: আমি তোমাদের বেলায় যে জিনিসটার সবচেয়ে বেশী আশংকা করি। সেটা হচ্ছে ছোট শির্ক। সাহাবায়ে কেরাম জিজ্ঞাসা করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! ছোট শিকের অর্থ কি? তিনি উত্তর দিলেন, সেটা হচ্ছে রিয়া। (অর্থাৎ, কোন নেক কাজ মানুষকে দেখানোর জন্য করা)। (মা'আরিফুল হাদীস, হাদীস: ১৫৫)
ইখলাসমুক্ত আমল বড় ইবাদতকেও ধুলিসাৎ করে দেয়
আমল যত বড়ই হোক না কেন, যদি তা আল্লাহর সন্তুষ্টির পরিবর্তে লোক-দেখানো, প্রশংসা লাভ বা অন্য কোনো পার্থিব উদ্দেশ্যে করা হয়, তবে সেই আমলের কোনো মূল্য আল্লাহর কাছে থাকে না। কিয়ামতের দিন এমন আমল ধুলিকণার মতো মূল্যহীন হয়ে যাবে।
কুরআনে বর্ণিত হয়েছে,
وَقَدِمۡنَاۤ اِلٰی مَا عَمِلُوۡا مِنۡ عَمَلٍ فَجَعَلۡنٰہُ ہَبَآءً مَّنۡثُوۡرًا
অর্থ: তারা (দুনিয়ায়) যা-কিছু আমল করেছে, আমি তার ফায়সালা করতে আসব এবং সেগুলোকে শূন্যে বিক্ষিপ্ত ধুলোবালি (-এর মত মূল্যহীন) করে দেব। (সূরাঃ আল ফুরকান, আয়াত নংঃ ২৩)
হাদীস শরীফে এসেছে,
إِنَّ أَوَّلَ النَّاسِ يُقْضَى يَوْمَ الْقِيَامَةِ عَلَيْهِ رَجُلٌ اسْتُشْهِدَ فَأُتِيَ بِهِ فَعَرَّفَهُ نِعَمَهُ فَعَرَفَهَا قَالَ فَمَا عَمِلْتَ فِيهَا قَالَ قَاتَلْتُ فِيكَ حَتَّى اسْتُشْهِدْتُ . قَالَ كَذَبْتَ وَلَكِنَّكَ قَاتَلْتَ لأَنْ يُقَالَ جَرِيءٌ . فَقَدْ قِيلَ . ثُمَّ أُمِرَ بِهِ فَسُحِبَ عَلَى وَجْهِهِ حَتَّى أُلْقِيَ فِي النَّارِ
অর্থ: কিয়ামতের দিন সর্বপ্রথম যার বিচার করা হবে, সে হচ্ছে এমন একজন যে শহীদ হয়েছিল। তাঁকে হাযির করা হবে এবং আল্লাহ তাঁর নিআমত রাশির কথা তাকে বলবেন এবং সে তার সবটাই চিনতে পারবে (এবং যথারীতি তার স্বীকারোক্তিও করবে।) তখন আল্লাহ তাআলা বলবেনঃ এর বিনিময়ে কি আমল করেছিলে? সে বলবে, আমি আপনার (সন্তুষ্টির) জন্য যুদ্ধ করেছি এমন কি শেষ পর্যন্ত শহীদ হয়েছি। তখন আল্লাহ তাআলা বলবেনঃ তুমি মিথ্যা বলেছো। তুমি বরং এ জন্যেই যুদ্ধ করেছিলে যাতে লোকে তোমাকে বলে তুমি বীর। তা তো বলা হয়েছে। এরপর নির্দেশ দেওয়া হবে। সে মতে তাকে উপুড় করে হেঁচড়িয়ে নিয়ে যাওয়া হবে এবং জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। (সহীহ মুসলিম, হাদীস: ১৯০৫)
একবার ভেবে দেখুন—যে ব্যক্তি আল্লাহর পথে যুদ্ধ করতে করতে শহীদ হয়েছে, বাহ্যিক দৃষ্টিতে যার আমল সর্বোচ্চ মর্যাদার বলে মনে হয়, সেও যদি ইখলাসহীন নিয়তের কারণে কিয়ামতের দিন প্রথম বিচারের আসরে লাঞ্ছিত হয়ে জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হয়, তাহলে আমাদের আমলের অবস্থা কী হবে?
ইখলাসযুক্ত আমল ছোট ইবাদতকেও পাহাড়সম বড় করে দেয়
ইখলাস এমন এক জাদুকরি শক্তি, যা বাহ্যিকভাবে অতি সাধারণ বা ছোট কাজকেও আল্লাহর কাছে পাহাড়সম বিশাল সওয়াবে পরিণত করে।
হাদীস শরীফে এসেছে,
«بَيْنَمَا كَلْبٌ يُطِيفُ بِرَكِيَّةٍ، كَادَ يَقْتُلُهُ العَطَشُ، إِذْ رَأَتْهُ بَغِيٌّ مِنْ بَغَايَا بَنِي إِسْرَائِيلَ، فَنَزَعَتْ مُوقَهَا فَسَقَتْهُ فَغُفِرَ لَهَا بِهِ»
অর্থ: "একটি কুকুর তৃষ্ণায় কাতর হয়ে কুয়ার চারপাশ ঘুরছিল। বনি ইসরাইলের এক ব্যভিচারী নারী তা দেখতে পেয়ে নিজের চামড়ার মোজায় পানি তুলে কুকুরটিকে পান করায়। তার এই (ইখলাসপূর্ণ) কাজের কারণে আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে দেন।" (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩৪৬৭)
বিখ্যাত তাবেয়ি আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক (রহ.) চমৎকার বলেছেন: "অনেক ছোট আমল নিয়তের কারণে মহান হয়ে যায়, আবার অনেক বড় আমল নিয়তের কারণে তুচ্ছ হয়ে যায়।" (খুতুওয়াতুন ইলাস-সা‘আদাহ - ১\১৪)
বাস্তব ঘটনা: ইখলাসের বরকতে গুহায় আটকে পড়া তিন যুবকের নাজাত
ইখলাস যে মানুষকে দুনিয়ার বিপদ থেকেও নাজাত দেয়, তার একটি চমৎকার বাস্তব ও ঐতিহাসিক ঘটনা (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২২৭২) ও (সহিহ মুসলিম, হাদীস: ২৭৪৩) বর্ণিত হয়েছে। প্রাচীনকালে তিন যুবক সফরে বেরিয়ে বৃষ্টির কারণে একটি পাহাড়ের গুহায় আশ্রয় নেয়। হঠাৎ পাহাড় থেকে একটি বিশাল পাথর ধসে পড়ে গুহার মুখ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। পাথর সরানোর কোনো উপায় না দেখে তারা নিজেদের জীবনের সবচেয়ে 'ইখলাসপূর্ণ' আমলের উসিলা দিয়ে আল্লাহর কাছে দু'আ করতে থাকে।
প্রথমজন; আল্লাহর জন্য তার বৃদ্ধ পিতা-মাতার প্রতি অকৃত্রিম সেবার কথা স্মরণ করে দু'আ করে।
দ্বিতীয়জন; আল্লাহর ভয়ে তার এক চাচাতো বোনের সাথে গুনাহের (জিনা) সুযোগ পেয়েও তা থেকে নিজেকে বিরত রাখার কথা উল্লেখ করে।
তৃতীয়জন; আল্লাহর জন্য তার এক শ্রমিকের না নেওয়া মজুরি ব্যবসায় খাটিয়ে বহু সম্পদ বানিয়ে পরে সেই শ্রমিককে পুরো সম্পদ বুঝিয়ে দেওয়ার সততার কথা উল্লেখ করে।
তারা প্রত্যেকেই দু'আর শেষে বলেছিল, "হে আল্লাহ! আমি যদি এই কাজটি কেবল আপনার সন্তুষ্টির (ইখলাসের) জন্যই করে থাকি, তবে আমাদের এই বিপদ থেকে উদ্ধার করুন।" তাদের এই খাঁটি ইখলাসের কারণে আল্লাহ বিশাল পাথরটি সরিয়ে দেন এবং তারা গুহা থেকে নাজাত পান। (সংক্ষিপ্ত ঘটনা)
সামাজিক জীবনে ইখলাসের প্রভাব ও কল্যাণ
যখন সামাজিক কর্মকাণ্ড, দানশীলতা এবং পারস্পরিক সেবার পেছনে ইখলাস বা খাঁটি নিয়ত থাকে, তখন সমাজ থেকে রেষারেষি, অহংকার ও লৌকিকতা দূর হয়ে যায়। নিঃস্বার্থভাবে মানুষের কল্যাণ করার মানসিকতা সমাজে যেমন শান্তি ফিরিয়ে আনে, তেমনি এর ফলে আল্লাহর পক্ষ থেকে বিশেষ রহমত ও বরকতও নাজিল হয়।
মহান আল্লাহ তাআলা খাঁটি অন্তরের বান্দাদের প্রশংসা করে পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেন:
إِنَّمَا نُطْعِمُكُمْ لِوَجْهِ اللَّهِ لَا نُرِيدُ مِنكُمْ جَزَاءً وَلَا شُكُورًا
অর্থ: "(এবং তাদেরকে বলে,) আমরা তো তোমাদেরকে খাওয়াই কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষে। আমরা তোমাদের কাছে কোন প্রতিদান চাই না এবং কৃতজ্ঞতাও না।" (সূরা আদ-দাহ্র, আয়াত: ৯)
কাউকে সাহায্য করার পর তার কাছ থেকে কখনো ধন্যবাদ বা ভালো আচরণের আশা করবেন না। মনে রাখবেন, আপনার এই নিঃস্বার্থ কাজের উত্তম প্রতিদান কেবল মহান আল্লাহর দরবারেই সযত্নে গচ্ছিত রয়েছে।
কীভাবে ইখলাস অর্জন করবেন?
ইখলাস অর্জন করা সহজ নয়, শয়তান প্রতিনিয়ত আমাদের নিয়ত নষ্ট করতে চায়। তাই আত্মশুদ্ধির জন্য নিচের নসিহতগুলো মেনে চলা জরুরি:
আমল গোপন রাখা: যে আমলগুলো জনসমক্ষে করা জরুরি নয় (যেমন নফল নামাজ, দান-সদকা, তাহাজ্জুদ), সেগুলো মানুষের চোখের আড়ালে করার চেষ্টা করুন।
বিশর ইবনুল হারিস (রহ.) বলেন:
"لَا تَعْمَلْ لِتُذْكَرَ، اكْتُمِ الْحَسَنَةَ كَمَا تَكْتُمُ السَّيِّئَةَ".
অর্থ: “আলোচিত হওয়ার (নাম কুড়ানোর) জন্য আমল করো না; তোমার নেক আমলকে সেভাবেই গোপন করো, যেভাবে তোমার মন্দ কাজকে গোপন করে থাকো।” (সিয়ারু আ'লামিন নুবালা - ৮\৪৯২)
প্রশংসার মোহ ত্যাগ করা: কোন কাজে মানুষ আপনাকে ভালো বলল নাকি খারাপ, তা নিয়ে মাথা ঘামাবেন না। আপনার লক্ষ্য থাকবে কেবল রবের সন্তুষ্টি।
আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেন:
إِنَّمَا نُطْعِمُكُمْ لِوَجْهِ اللَّهِ لَا نُرِيدُ مِنكُمْ جَزَاءً وَلَا شُكُورًا
অর্থ: "(এবং তাদেরকে বলে,) আমরা তো তোমাদেরকে খাওয়াই কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষে। আমরা তোমাদের কাছে কোন প্রতিদান চাই না এবং কৃতজ্ঞতাও না।" (সূরা আদ-দাহ্র, আয়াত: ৯)
নিজেকে ছোট মনে করা: নিজের আমল নিয়ে কখনো অহংকার করবেন না। সর্বদা ভয় রাখবেন যে, আমলটি আল্লাহর দরবারে কবুল হচ্ছে তো!
হাদীস শরীফে বর্ণিত হয়েছে,
مَنْ تَوَاضَعَ لِلَّهِ رَفَعَهُ اللَّهُ … وَمَنْ تَكَبَّرَ وَضَعَهُ اللَّهُ
অর্থ: যে ব্যক্তি আল্লাহর জন্য বিনয়ী হয়, আল্লাহ্ তার মর্যাদা বৃদ্ধি করে দেন। … পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি অহংকার করে, আল্লাহ্ তাকে হেয় করে দেন। (মিশকাত শরীফ - ৫১১৯)
কুরআনে বর্ণিত হয়েছে,
قُلْ إِنَّ صَلَاتِي وَنُسُكِي وَمَحْيَايَ وَمَمَاتِي لِلَّہِ
অর্থ: "বলে দাও, নিশ্চয়ই আমার নামায, আমার ইবাদত ও আমার জীবন-মরণ সবই আল্লাহর জন্য।" (সূরা আল-আনআম, আয়াত: ১৬২)
যখন আমাদের নামাজ, ইবাদত, জীবন ও মরণ—সবই একমাত্র আল্লাহর জন্য, তখন কোনো আমলেই লোক-দেখানো বা দুনিয়াবি স্বার্থের স্থান নেই। তাই প্রতিটি আমল ইখলাসের সঙ্গে একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে সম্পাদন করুন।
ইখলাসেই নিহিত পরকালীন নাজাত
নিয়ত যদি আল্লাহর জন্য শতভাগ খাঁটি হয়, তবে পরকালে মুক্তির জন্য অল্প আমলই যথেষ্ট। হযরত মুয়াজ ইবনে জাবাল (রা.)-কে রাসূলুল্লাহ (সা.) নসিহত করে বলেন:
أَخْلِصْ دِينَكَ يَكْفِكَ الْعَمَلُ الْقَلِيلُ
অর্থ: "তোমার দ্বীনের ব্যাপারে নিষ্ঠাবান হও। তাহলে অল্প আমলই তোমার (মুক্তির) জন্য যথেষ্ট হবে।" (আত্-তারগীব ওয়াত্-তারহীব, হাদীস: ৪)
পরকালে আমলের পরিমাণের চেয়ে নিয়তের বিশুদ্ধতা বেশি মূল্যায়ন করা হবে। তাই প্রতিটি কাজের আগে নিজেকে জিজ্ঞাসা করুন— আমি কার জন্য কাজটি করছি?
সুতরাং প্রতিটি কাজের আগে নিয়তকে কেবল আল্লাহর জন্য একনিষ্ঠ করা আমাদের একান্ত কর্তব্য এবং জরুরি কাজ।
আল্লাহর দরবারে বাহ্যিক রূপ নয়, অন্তরের পবিত্রতাই আসল
ইসলামে বাহ্যিক জৌলুসের চেয়ে অন্তরের শুদ্ধতা অনেক বেশি দামী। কেয়ামতের দিন মানুষের বাহ্যিক রূপ, ধন-সম্পদ বা দুনিয়ার বুক ফুলিয়ে চলা সম্মানের দিকে বিন্দুমাত্র তাকানো হবে না; বরং সেদিন বিচার করা হবে মানুষের ভেতরের জগত তথা তার নিয়তের পবিত্রতা এবং ইখলাসপূর্ণ আমল দিয়ে। যার আমল যত খাঁটি হবে, আল্লাহর কাছে তার সম্মান তত উঁচুতে থাকবে।
হাদীস শরীফে বর্ণিত হয়েছে,
قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم " إِنَّ اللَّهَ لاَ يَنْظُرُ إِلَى صُوَرِكُمْ وَأَمْوَالِكُمْ وَلَكِنْ يَنْظُرُ إِلَى قُلُوبِكُمْ وَأَعْمَالِكُمْ" .
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেনঃ নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের বাহ্যিক চাল-চলন ও বিত্ত-বৈভবের প্রতি নযর করেন না; বরং তিনি নযর করেন তোমাদের অন্তর ও আমলের প্রতি। (সহীহ মুসলিম, হাদীস: ২৫৬৪)
ইখলাসবিহীন আমলকারী হাশরের ময়দানে নিজেকে সম্পূর্ণ রিক্ত ও দেউলিয়া আবিষ্কার করবে। দুনিয়ার জীবনের মোহ ত্যাগ করে, প্রতিটি নিঃশ্বাসে আল্লাহর সন্তুষ্টি তালাশ করাই হলো মুমিনের কাজ। যে ব্যক্তি ইখলাসের সাথে একনিষ্ঠ হয়ে রবের সামনে হাজির হতে পারবে, তার জন্যই নির্ধারিত রয়েছে পরকালীন চিরস্থায়ী নাজাত ও জান্নাত।
ইখলাসের সুফলসমূহঃ
১. শয়তানের ধোঁকা ও কুমন্ত্রণা থেকে হেফাজতঃ قَالَ فَبِعِزَّتِكَ لَأُغْوِيَنَّهُمْ أَجْمَعِينَ - إِلَّا عِبَادَكَ مِنْهُمُ الْمُخْلَصِينَ (সূরা ছাদ, আয়াত: ৮২-৮৩)
২. আল্লাহর দরবারে আমল কবুল হওয়াঃ إِنَّ اللَّهَ لَا يَقْبَلُ مِنَ الْعَمَلِ إِلَّا مَا كَانَ لَهُ خَالِصًا وَابْتُغِيَ بِهِ وَجْهُهُ (সুনানে নাসায়ি, হাদিস: ৩১৪০)
৩. জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্তিঃ فَإِنَّ اللَّهَ قَدْ حَرَّمَ عَلَى النَّارِ مَنْ قَالَ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ، يَبْتَغِي بِذَلِكَ وَجْهَ اللَّهِ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৪২৫)
৪. ছোট আমলেও পাহাড়সম সওয়াব লাভঃ رُبَّ عَمَلٍ صَغِيرٍ تُعَظِّمُهُ النِّيَّةُ، وَرُبَّ عَمَلٍ كَبِيرٍ تُصَغِّرُهُ النِّيَّةُ (খুতুওয়াতু ইলাস-সা‘আদাহ - ১\১৪)
৫. দুনিয়ার কঠিন বিপদ-আপদ থেকে উদ্ধারঃ انْطَلَقَ ثَلاَثَةُ رَهْطٍ مِمَّنْ كَانَ قَبْلَكُمْ حَتَّى أَوَوْا المَبِيتَ إِلَى غَارٍ … فَانْفَرَجَتِ الصَّخْرَةُ، فَخَرَجُوا يَمْشُونَ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২২৭২)
৬. রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর শাফায়াত লাভঃ أَسْعَدُ النَّاسِ بِشَفَاعَتِي يَوْمَ الْقِيَامَةِ مَنْ قَالَ لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ، خَالِصًا مِنْ قَلْبِهِ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৯৯)
৭. আমল করতে না পারলেও পূর্ণ সওয়াব অর্জনঃ مَنْ سَأَلَ اللَّهَ الشَّهَادَةَ بِصِدْقٍ بَلَّغَهُ اللَّهُ مَنَازِلَ الشُّهَدَاءِ وَإِنْ مَاتَ عَلَى فِرَاشِهِ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৯০৯)
৮. অন্তরের প্রশান্তি ও দুনিয়াবি দুশ্চিন্তা থেকে মুক্তিঃ مَنْ كَانَتِ الآخِرَةُ هَمَّهُ جَعَلَ اللَّهُ غِنَاهُ فِي قَلْبِهِ وَجَمَعَ لَهُ شَمْلَهُ وَأَتَتْهُ الدُّنْيَا وَهِيَ رَاغِمَةٌ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২৪৬৫)
৯. গুনাহ ও পাপাচার থেকে বেঁচে থাকার শক্তি লাভঃ كَذَٰلِكَ لِنَصْرِفَ عَنْهُ السُّوءَ وَالْفَحْشَاءَ ۚ إِنَّهُ مِنْ عِبَادِنَا الْمُخْلَصِينَ (সূরা ইউসুফ, আয়াত: ২৪)
১০. মানুষের অন্তরে ভালোবাসা ও সম্মান সৃষ্টি হওয়াঃ إِنَّ الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ سَيَجْعَلُ لَهُمُ الرَّحْمَٰنُ وُدًّا (সূরা মারইয়াম, আয়াত: ৯৬)
আল্লাহ তাআলা আমাদের প্রতিটি কথায় ও কাজে ইখলাস দান করুন। আমিন।
মন্তব্য (...)
এ সম্পর্কিত আরও প্রবন্ধ
আপনি কি দ্বীনের খাদিম হতে চান?
...
আল্লাহর নিকট ইসলাহের তাওফীক প্রার্থনা করুন
...
উক্তি ও উপদেশ
...
আল্লাহওয়ালাদের তাযকেরায় দিল তাযা হয়
...
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন