প্রবন্ধ
ইসলামে নিয়তের শক্তি: নেক ইচ্ছাতেই অশেষ সওয়াব
২৪ জুন, ২০২৬
৩৫৭
০
ভূমিকা
ইসলামি জীবনব্যবস্থায় 'নিয়ত' বা অন্তরের সংকল্পের গুরুত্ব অপরিসীম। ইসলাম কেবল মানুষের বাহ্যিক আমল বা কাজের ওপর নির্ভর করে না, বরং সেই কাজের পেছনে লুকিয়ে থাকা অন্তরের উদ্দেশ্যকে সবচেয়ে বেশি মূল্যায়ন করে। একটি সাধারণ কাজও বিশুদ্ধ নিয়তের কারণে বিশাল ইবাদতে পরিণত হতে পারে, আবার নিয়তের ত্রুটির কারণে অনেক বড় আমলও আল্লাহর দরবারে প্রত্যাখ্যাত হতে পারে।
নিয়ত সকল আমল বা কাজের মূল ভিত্তি
ইসলামে যেকোনো কাজের ভালো বা মন্দ হওয়ার মাপকাঠি হলো নিয়ত। নিয়ত ছাড়া কোনো ইবাদত বা নেক আমল আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য হয় না। মানুষের প্রতিটি কাজের প্রতিদান তার অন্তরের ইচ্ছার ওপর ভিত্তি করে দেওয়া হবে।
উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন:
إِنَّمَا الأَعْمَالُ بِالنِّيَّاتِ، وَإِنَّمَا لِكُلِّ امْرِئٍ مَا نَوَى
অর্থ: "প্রত্যেক কাজ নিয়তের সাথে সম্পর্কিত। আর মানুষ তার নিয়ত অনুযায়ী ফল পাবে।" (সহিহ বুখারি, হাদীস: ১)
ইবাদত কবুলের প্রধান শর্ত হলো ইখলাস (একনিষ্ঠতা)
মহান আল্লাহ তাআলা মানুষকে কেবল তাঁরই ইবাদতের জন্য সৃষ্টি করেছেন। তবে সেই ইবাদত অবশ্যই 'ইখলাস' বা একনিষ্ঠ নিয়তের সাথে হতে হবে। লোক দেখানো বা দুনিয়ার কোনো স্বার্থ হাসিলের উদ্দেশ্যে করা ইবাদত আল্লাহ তাআলা গ্রহণ করেন না।
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা নির্দেশ দিয়ে বলেন:
وَمَا أُمِرُوا إِلَّا لِيَعْبُدُوا اللَّهَ مُخْلِصِينَ لَهُ الدِّينَ
অর্থ: "তাদেরকে কেবল এই আদেশই করা হয়েছিল যে, তারা আল্লাহর ইবাদত করবে, আনুগত্যকে একনিষ্ঠভাবে তাঁরই জন্য খালেস রাখে।" (সূরা আল-বাইয়্যিনাহ, আয়াত: ৫)
বিশুদ্ধ নিয়তে অল্প আমলই নাজাতের জন্য যথেষ্ট
নিয়ত যদি আল্লাহর জন্য শতভাগ খাঁটি হয়, তবে পরকালে মুক্তির জন্য অল্প আমলই যথেষ্ট। হযরত মুয়াজ ইবনে জাবাল (রা.)-কে রাসূলুল্লাহ (সা.) নসিহত করে বলেন:
أَخْلِصْ دِينَكَ يَكْفِكَ الْعَمَلُ الْقَلِيلُ
অর্থ: "তোমার দ্বীনের ব্যাপারে নিষ্ঠাবান হও। তাহলে অল্প আমলই তোমার (মুক্তির) জন্য যথেষ্ট হবে।" (আত্-তারগীব ওয়াত্-তারহীব, হাদীস: ৪)
পরকালে আমলের পরিমাণের চেয়ে নিয়তের বিশুদ্ধতা বেশি মূল্যায়ন করা হবে। তাই প্রতিটি কাজের আগে নিজেকে জিজ্ঞাসা করুন— আমি কার জন্য কাজটি করছি?
সুতরাং প্রতিটি কাজের আগে নিয়তকে কেবল আল্লাহর জন্য একনিষ্ঠ করা আমাদের একান্ত কর্তব্য এবং জরুরি কাজ।
লোক-দেখানো আমল ধ্বংসের কারণ
নিয়ত যদি হয় লোক দেখানো বা খ্যাতি অর্জনের জন্য, তবে বড় আমলকারী ঠিকানাও হবে জাহান্নাম। হাদীস শরীফে বর্ণিত হয়েছে, কেয়ামতের দিন এক শহিদকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে তার নিয়তের ত্রুটির কারণে।
হাদীস শরীফে বর্ণিত হয়েছে,
إِنَّ أَوَّلَ النَّاسِ يُقْضَى يَوْمَ الْقِيَامَةِ عَلَيْهِ رَجُلٌ اسْتُشْهِدَ فَأُتِيَ بِهِ فَعَرَّفَهُ نِعَمَهُ فَعَرَفَهَا قَالَ فَمَا عَمِلْتَ فِيهَا قَالَ قَاتَلْتُ فِيكَ حَتَّى اسْتُشْهِدْتُ . قَالَ كَذَبْتَ وَلَكِنَّكَ قَاتَلْتَ لأَنْ يُقَالَ جَرِيءٌ . فَقَدْ قِيلَ . ثُمَّ أُمِرَ بِهِ فَسُحِبَ عَلَى وَجْهِهِ حَتَّى أُلْقِيَ فِي النَّارِ
অর্থ: কিয়ামতের দিন সর্বপ্রথম যার বিচার করা হবে, সে হচ্ছে এমন একজন যে শহীদ হয়েছিল। তাঁকে হাযির করা হবে এবং আল্লাহ তাঁর নিআমত রাশির কথা তাকে বলবেন এবং সে তার সবটাই চিনতে পারবে (এবং যথারীতি তার স্বীকারোক্তিও করবে।) তখন আল্লাহ তাআলা বলবেনঃ এর বিনিময়ে কি আমল করেছিলে? সে বলবে, আমি আপনার (সন্তুষ্টির) জন্য যুদ্ধ করেছি এমন কি শেষ পর্যন্ত শহীদ হয়েছি। তখন আল্লাহ তাআলা বলবেনঃ তুমি মিথ্যা বলেছো। তুমি বরং এ জন্যেই যুদ্ধ করেছিলে যাতে লোকে তোমাকে বলে তুমি বীর। তা তো বলা হয়েছে। এরপর নির্দেশ দেওয়া হবে। সে মতে তাকে উপুড় করে হেঁচড়িয়ে নিয়ে যাওয়া হবে এবং জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। (সহিহ মুসলিম, হাদীস: ১৯০৫)
শহীদ হওয়া ইসলামের অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ ইবাদত। কিন্তু নিয়তে যদি মানুষের কাছে খ্যাতি অর্জন বা লোকদেখানোর মোহ (রিয়া) থাকে, তবে এসব বিশাল আত্মত্যাগও সম্পূর্ণ বরবাদ হয়ে যায়। রিয়া বা লৌকিকতার কারণে সওয়াবের বদলে আল্লাহর ক্রোধ নেমে আসে এবং চরম পরিণতি হিসেবে এসব বড় আমলকারীকেও জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।
রিয়া বা লোকদেখানো আমলকারীদের প্রতি আল্লাহ তাআলা এতটাই রাগান্বিত যে, কিয়ামতের দিন কাফির, মুশরিক, চোর ও ব্যভিচারীর মতো মারাত্মক অপরাধীদেরও আগে সর্বপ্রথম রিয়াকারীদের বিচার করা হবে। আল্লাহ আমাদের এই ভয়াবহ ব্যাধি থেকে রক্ষা করুন। আমিন।
আমলের শুদ্ধতা নির্ভর করে নিয়তের শুদ্ধতার উপর, আর নিয়তের শুদ্ধতা নির্ভর করে অন্তরের শুদ্ধতার উপর।
খাঁটি নিয়তের পাশাপাশি সুন্নাহর অনুসরণও অত্যন্ত জরুরি
মহান আল্লাহর দরবারে বান্দার যেকোনো নেক আমল কবুল হওয়ার মূল ভিত্তি হলো দুটি—প্রথমত, কাজটি একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে খাঁটি নিয়তে করা; এবং দ্বিতীয়ত, আমলটি সঠিকভাবে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ বা দেখানো পদ্ধতি অনুযায়ী সম্পন্ন করা।
কুরআনে কারীমের বহু আয়াতে আল্লাহ তাআলা তাঁর রাসূলের অনুসরণ ও অনুকরণকে ফরয বা আবশ্যক করে দিয়েছেন। যেমন কুরআনে বর্ণিত হয়েছে,
یٰۤاَیُّہَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡۤا اَطِیۡعُوا اللّٰہَ وَاَطِیۡعُوا الرَّسُوۡلَ وَلَا تُبۡطِلُوۡۤا اَعۡمَالَکُمۡ
অর্থ: “হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহর আনুগত্য করো এবং রাসূলের আনুগত্য করো, আর তোমরা তোমাদের আমলগুলোকে বরবাদ করো না।” (সূরা মুহাম্মদ: ৩৩)
নবী কারীম ﷺ তাঁর সুন্নাহর পরিপন্থী যেকোনো নতুন আবিষ্কৃত আমলকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করার ঘোষণা দিয়েছেন। যেমন হাদীসে বর্ণিত হয়েছে,
مَنْ عَمِلَ عَمَلًا لَيْسَ عَلَيْهِ أَمْرُنَا فَهُوَ رَدٌّ
অর্থ: “যে ব্যক্তি এমন আমল করল যার ব্যাপারে আমার নির্দেশ নাই তা প্রত্যাখ্যাত।” (সহীহ মুসলিম, হদীস: ১৭১৮)
আব্দুল্লাহ ইবন মাসউদ (রা.) বলেন:
«لا ينفع قول إلا بعمل، ولا عمل إلا بقول، ولا قول وعمل إلا بنية، ولا نية إلا بموافقة السنة»
“আমল ছাড়া কথা উপকারী হয় না, কথা ছাড়া আমল উপকারী হয় না, নিয়ত ছাড়া কথা ও আমল উপকারী হয় না, আর সুন্নাহর অনুসরণ ছাড়া নিয়তও উপকারী হয় না।” (কিতাবুল ইবানা আন উসুলিদ দিয়ানা- ১১\২৬)
বিখ্যাত তাবেয়ি ফুযাইল ইবনে ইয়ায (রহ.) আল্লাহর বাণী, {لِيَبْلُوَكُمْ أَيُّكُمْ أَحْسَنُ عَمَلًا} (যাতে তিনি তোমাদের পরীক্ষা করেন যে, আমলে তোমাদের মধ্যে কে সবচেয়ে উত্তম।) (সূরা আল-মুলক: ২)
এর ব্যাখ্যা করতে গিয়ে একটি স্বর্ণালী কথা বলেছেন:
"أَخْلَصُهُ وَأَصْوَبُهُ" “অর্থাৎ (উত্তম আমল হলো) যা সবচেয়ে বেশি খাঁটি (ইখলাসপূর্ণ) এবং সবচেয়ে বেশি সঠিক।”
লোকেরা জিজ্ঞেস করল: “হে আবু আলী! সবচেয়ে বেশি খাঁটি এবং সবচেয়ে বেশি সঠিক বলতে কী বোঝায়?”
তিনি উত্তর বললেন:
"إِنَّ الْعَمَلَ إِذَا كَانَ خَالِصاً وَلَمْ يَكُنْ صَوَاباً لَمْ يُقْبَلْ، وَإِذَا كَانَ صَوَاباً وَلَمْ يَكُنْ خَالِصاً لَمْ يُقْبَلْ حَتَّى يَكُونُ خَالِصاً صَوَاباً، وَالْخَالِصُ أَنْ يَكُونَ لِلَّهِ وَالصَّوَابُ أَنْ يَكُونَ عَلَى السُّنَّةِ".
অর্থ: নিশ্চয়ই আমল যদি খাঁটি হয় কিন্তু সঠিক না হয়, তবে তা কবুল করা হবে না। আবার যদি সঠিক হয় কিন্তু খাঁটি না হয়, তখনও তা কবুল করা হবে না—যতক্ষণ না তা একই সাথে খাঁটি ও সঠিক উভয়ই হয়।
আর ‘خالص’ - “খাঁটি” হলো যা একমাত্র আল্লাহর জন্য করা হয়, এবং ‘صواب’ - “সঠিক” হলো যা সুন্নাহ অনুযায়ী সম্পন্ন হয়।(খুতুওয়াতুন ইলাস-সা‘আদাহ - ১\১৩)
অতএব, আমরা যে আমলই করি না কেন–তাতে সফল হতে হলে আমাদের অন্তরে খাঁটি নিয়ত এবং কাজের পদ্ধতিটি সুন্নাহ অনুযায়ী হচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত করতে হবে। এই দুইয়ের সমন্বয়েই কেবল একটি আমল আল্লাহর দরবারে মকবুল বা গৃহীত হয়।
কেবল সৎ ইচ্ছাতেই পূর্ণ সওয়াব লাভ
এটি উম্মতে মুহাম্মদীর প্রতি মহান আল্লাহর এক বিশাল অনুগ্রহ যে, কোনো মুমিন বান্দা যদি নেক কাজের শুধু নিয়ত বা সংকল্প করে, কিন্তু কোনো কারণে তা বাস্তবায়ন করতে নাও পারে, তবুও আল্লাহ তাআলা তাকে পূর্ণ সওয়াব দান করেন।
ইবনু আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন:
مَنْ هَمَّ بِحَسَنَةٍ فَلَمْ يَعْمَلْهَا كَتَبَهَا اللَّهُ لَهُ عِنْدَهُ حَسَنَةً كَامِلَةً
অর্থ: "যে ব্যক্তি কোন সৎ কাজের ইচ্ছা করল, কিন্তু তা বাস্তবে পরিণত করল না, আল্লাহ তাআলা তাঁর কাছে এর জন্য পূর্ণ নেকী লিপিবদ্ধ করবেন।" (সহিহ বুখারি, হাদীস: ৬৪৯১)
বিশুদ্ধ নিয়তে জাগতিক কাজও ইবাদতে পরিণত হয়
ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। বেঁচে থাকার জন্য আমাদের চাকরি, ব্যবসা, খাবার গ্রহণ, ঘুমানো বা পরিবারের পেছনে অর্থ ব্যয়, এমনকি পারস্পরিক লেনদেন ও সামাজিক আচরণের ক্ষেত্রেও নিয়ত জরুরি; যেমন বেচাকেনায় সততা বজায় রাখা, স্ত্রীর সাথে উত্তম আচরণ করা এবং সন্তানদের সংশোধনের পেছনে সওয়াবের নিয়ত রাখা ইত্যাদি। এসব নিছক দুনিয়াবি কাজ হলেও, অন্তরে যদি আল্লাহর সন্তুষ্টি ও হালাল উপার্জনের নিয়ত থাকে, তবে এসব জাগতিক কাজও ইবাদত হিসেবে গণ্য হয়।
সাদ ইবনু আবি ওয়াক্কাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন:
وَإِنَّكَ لَنْ تُنْفِقَ نَفَقَةً تَبْتَغِي بِهَا وَجْهَ اللَّهِ إِلَّا أُجِرْتَ بِهَا، حَتَّى مَا تَجْعَلُ فِي فِي امْرَأَتِكَ
অর্থ: "আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্য তুমি যে কোন ব্যয় কর না কেন, তোমাকে তার বিনিময় দেওয়া হবে। এমনকি যা তুমি তোমার স্ত্রীর মুখে তুলে দিবে (তারও প্রতিদান পাবে)।" (সহিহ বুখারি, হাদীস: ৫৬)
অভ্যাসগত আমল অপারগতার কারণে ছুটলেও নিয়তের কারণে সওয়াব পাবে
কোনো ব্যক্তি যদি সবসময় কোনো নেক আমল করে অভ্যস্ত থাকে, কিন্তু হঠাৎ অসুস্থতা, সফর বা অন্য কোনো অপারগতার কারণে তা করতে না পারে, তবে তার বিশুদ্ধ নিয়তের কারণে আল্লাহ তাআলা তাকে ওই আমল করার সমান সওয়াব দান করেন।
আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তাবুক যুদ্ধে যাওয়ার পথে রাসূলুল্লাহ (সা.) সাহাবীদের বলেন:
«إِنَّ بِالْمَدِينَةِ أَقْوَامًا، مَا سِرْتُمْ مَسِيرًا، وَلاَ قَطَعْتُمْ وَادِيًا إِلَّا كَانُوا مَعَكُمْ» ، قَالُوا: يَا رَسُولَ اللَّهِ، وَهُمْ بِالْمَدِينَةِ؟ قَالَ: «وَهُمْ بِالْمَدِينَةِ، حَبَسَهُمُ العُذْرُ»
অর্থ: "মদীনাতে এমন সম্প্রদায় রয়েছে যারা কোন দূরপথ ভ্রমন করেনি, এবং কোন উপত্যকাও অতিক্রম করেনি তবুও তারা তোমাদের সাথে (সাওয়াবে) শরীক রয়েছে। সাহাবায়ে কিরাম (রাযিঃ) আরয করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! তারা তো মদীনায়-ই অবস্থান করছিল। তখন তিনি বললেন, তারা মদীনায়ই রয়ে গেছে, তবে ওযর তাদের আটকে রেখেছিল।" (সহিহ বুখারি, হাদীস: ৪৪২৩)
নিয়তের ত্রুটি বা 'রিয়া' আমলকে ধ্বংস করে দেয়
নিয়ত যদি আল্লাহর সন্তুষ্টির বদলে মানুষকে দেখানো বা দুনিয়ার খ্যাতি অর্জনের জন্য হয়, তবে সেই আমল আল্লাহর কাছে মূল্যহীন হয়ে যায়। ইসলামে একে 'রিয়া' বা লোক-দেখানো আমল বলা হয়, যা ছোট শিরক হিসেবে গণ্য।
রাসূলুল্লাহ সা. রিয়ার ব্যপারে বলেছে,
قَالَ إِنَّ أَخْوَفَ مَا أَخَافُ عَلَيْكُمْ الشِّرْكُ الْأَصْغَرُ قَالُوْا وَمَا الشِّرْكُ الْأَصْغَرُ يَا رَسُوْلَ اللهِ؟ قَالَ الرِّيَاءُ
অর্থ: আমি তোমাদের বেলায় যে জিনিসটার সবচেয়ে বেশী আশংকা করি। সেটা হচ্ছে ছোট শির্ক। সাহাবায়ে কেরাম জিজ্ঞাসা করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! ছোট শিকের অর্থ কি? তিনি উত্তর দিলেন, সেটা হচ্ছে রিয়া। (অর্থাৎ, কোন নেক কাজ মানুষকে দেখানোর জন্য করা)। (মা'আরিফুল হাদীস, হাদীস: ১৫৫)
রিয়া বা লোকপ্রদর্শনের উদ্দেশ্যে আমল সম্পর্কে হাদীস শরীফে ইরশাদ হয়েছে,
عَنْ شَدَّادِ ابْنِ اَوْسٍ : قَالَ سَمِعْتُ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ " مَنْ صَلَّى يُرَائِي فَقَدْ أَشْرَكَ ، وَمَنْ صَامَ يُرَائِي فَقَدْ أَشْرَكَ ، وَمَنْ تَصَدَّقَ يُرَائِي فَقَدْ أَشْرَكَ " (رواه احمد)
অর্থ: হযরত শাদ্দাদ ইবন আউস (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, তিনি রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে বলতে শুনেছেন: যে দেখানোর জন্য নামায পড়ল, সে শিরক করল, যে দেখানোর জন্য রোযা রাখল, সে শিরক করল এবং যে দেখানোর জন্য দান-খয়রাত করল, সে শিরক করল। (মা'আরিফুল হাদীস, হাদীস: ২৫৩)
অন্যত্রে বর্ণিত হয়েছে, আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত একটি হাদীসে কুদসিতে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:
أَنَا أَغْنَى الشُّرَكَاءِ عَنِ الشِّرْكِ، مَنْ عَمِلَ عَمَلاً أَشْرَكَ فِيهِ مَعِي غَيْرِي تَرَكْتُهُ وَشِرْكَهُ
অর্থ: "আমি শিরক হতে শরীকদের মধ্যে সর্বাধিক বেপরোয়া। যদি কোন ব্যক্তি কোন আমল করে এবং এতে আমি ব্যতিরেকে অন্য কাউকে শরীক করে, তবে আমি তাকে ও তাঁর শিরককে (শরীক ও শিরকী কাজকে) তাঁর অবস্থায় ছেড়ে দেই।" (সহিহ মুসলিম, হাদীস: ২৯৮৫)
নিয়ত গোপন রাখা এবং নিরন্তর আত্মশুদ্ধি
অন্তরের নিয়ত একটি গোপন বিষয়, যা কেবল আল্লাহই জানেন। শয়তান সবসময় মানুষের নিয়তকে নষ্ট করার চেষ্টা করে। তাই একজন মুমিনের দায়িত্ব হলো সবসময় নিজের নিয়ত যাচাই করা এবং তা গোপন রেখে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কাজ করে যাওয়া। আমাদের অনুসরনিয় আলেমগণ নিয়ত বিশুদ্ধ রাখার ব্যাপারে কঠোর সাধনা করতেন।
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা অন্তরের খবর সম্পর্কে সতর্ক করে বলেন:
قُلْ إِن تُخْفُوا مَا فِي صُدُورِكُمْ أَوْ تُبْدُوهُ يَعْلَمْهُ اللَّهُ
অর্থ: "(হে রাসূল! মানুষকে) বলে দাও, তোমাদের অন্তরে যা-কিছু আছে, তোমরা তা গোপন রাখ বা প্রকাশ কর, আল্লাহ তা অবগত আছেন।" (সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ২৯)
প্রখ্যাত তাবেঈ সুফিয়ান সাওরী (রহ.) নিয়তের কঠিন সাধনা সম্পর্কে বলতেন, "আমি আমার নিয়তের চেয়ে কঠিন কোনো কিছুর মুকাবিলা করিনি, কারণ তা বারবার আমার বিরুদ্ধে পরিবর্তিত হতে চায়।"
আমাদের জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত মহামূল্যবান। নিয়তের মাধ্যমে আমরা খুব সহজেই আমাদের দৈনন্দিন জীবনের ছোট ছোট কাজগুলো দিয়েও আখেরাতের জন্য বিশাল সওয়াবের পাহাড় গড়তে পারি। তাই প্রতিটি কাজ শুরু করার আগে এক মুহূর্তের জন্য হলেও নিজের মনের দিকে তাকানো এবং নিয়তকে কেবল মহান আল্লাহর জন্য নির্দিষ্ট করা আমাদের একান্ত কর্তব্য।
শেষ নসিহত
- প্রতিদিন ঘুম থেকে উঠে নেক কাজের নিয়ত করুন।
- সন্তান লালন-পালনকে দ্বীনের খেদমতের নিয়ত করুন।
- উপার্জনে হালাল রিজিকের নিয়ত করুন।
- ইলম অর্জন আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য করুন।
- খাবার গ্রহণের সময় ইবাদতের জন্য শরীরে শক্তি সঞ্চয়ের নিয়ত করুন।
- রাতের ঘুমের সময় তাহাজ্জুদ ও ফজরের নামাজ আদায়ের নিয়ত করুন।
- পরিবারকে সময় দেওয়াকে রাসূল (সা.)-এর সুন্নাহ পালন ও আপনজনদের হক আদায়ের নিয়ত করুন।
- কারো সাথে হাসিমুখে কথা বলাকে সদকা ও মুমিন ভাইয়ের মন খুশি করার নিয়ত করুন।
- রাস্তা দিয়ে চলার সময় মানুষের কষ্টদায়ক বস্তু সরিয়ে ফেলার নিয়ত রাখুন।
- অসুস্থ বা বিপন্ন মানুষের সেবাকে আল্লাহর নৈকট্য ও দয়া লাভের মাধ্যম হিসেবে নিয়ত করুন।
প্রতিটি কাজের আগে বলুন: “আমি এই কাজটি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য করছি।”
সবশেষে সর্বদা মনে রাখবেন, আমার জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত, প্রতিটি কাজ যেন কেবল মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই হয়।
আল্লাহ আমাদের সকল আমলকে ইখলাসপূর্ণ নিয়ত ও সুন্নাহর ভিত্তিতে কবুল করুন। আমীন।
মন্তব্য (...)
এ সম্পর্কিত আরও প্রবন্ধ
ঈমানের মূল ভিত্তি ইসলামী আকায়েদ
...
ঝাড়ফুঁক-তাবীয : একটি দালীলিক বিশ্লেষণ (১ম পর্ব)
...
স্রষ্টা ও তাঁর অস্তিত্ব
...
মূর্তি ও ভাস্কর্য : যুগে যুগে শিরকের সর্ববৃহৎ প্রণোদনা
...
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন