প্রবন্ধ
ঈদুল ফিতর : ফজিলত, তাৎপর্য, শিক্ষা ও বিধান
৫৭২৩
০
যে জাতির চরিত্র যত উন্নত, যে সমাজের নৈতিক মান যত উঁচু, তাদের উৎসবও ততই শালীন, সুন্দর ও কল্যাণকর হয়। আর যেখানে নৈতিক অবক্ষয় গভীর, সেখানে উৎসবের মাঝেও সেই অবক্ষয়ের ছাপ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আসলে উৎসবই বলে দেয় একটি জাতি কী বিশ্বাস করে, কী মূল্যবোধ লালন করে। ঈদ আমাদের জন্য নিছক আনন্দের দিন নয়; ঈদ হলো ইবাদতের পর পুরস্কারের দিন। এক মাস সিয়াম, কিয়াম, তিলাওয়াত ও আত্মসংযমের পর আল্লাহ তাআলা ঈদের মাধ্যমে আমাদের সম্মানিত করেছেন। এখানে আনন্দ আছে—কিন্তু গুনাহের অনুমতি নেই; হাসি আছে—কিন্তু সীমালঙ্ঘন নেই; খুশি আছে—কিন্তু আল্লাহর নাফরমানি নেই।
এই ঈদ আমাদের শিক্ষা দেয়—একতা, ভ্রাতৃত্ব, কৃতজ্ঞতা ও পারস্পরিক সহমর্মিতা। ধনী-গরিব, বড়-ছোট—সবাই যেন এক কাতারে দাঁড়িয়ে আল্লাহর সামনে নিজেকে সমান মনে করি।
اَلْحَمْدُ لِلّهِ وَكَفَى وَسَلَامٌ عَلَى عِبَادِهِ الَّذِيْن َاصْطَفَى اَمَّا بَعْدُ! فَاَعُوْذُ بِاللهِ مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّجِيْمِ. بِسْمِ اللهِ الرَّحْمنِ الرَّحِيْمِ. وَإِذْ تَأَذَّنَ رَبُّكُمْ لَئِن شَكَرْتُمْ لَأَزِيدَنَّكُمْ ۖ وَلَئِن كَفَرْتُمْ إِنَّ عَذَابِي لَشَدِيدٌ
بَارَكَ اللهُ لِيْ وَلَكُمْ فِي الْقُرْآنِ الْعَظِيْمِ، وَنَفَعَنِيْ وَإِيَّاكُمْ بِمَا فِيْهِ مِنَ اْلآيَاتِ وَالذِّكْرِ الْحَكِيْمِ. وجَعَلَنِيْ إِيَّاكُمْ مِنَ الصَّالِحِينَ
أَقُوْلُ قَوْلِيْ هَذَا أَسْتَغْفِرُ اللهَ لِيْ وَلَكُمْ وَلِسَائِرِ الْمُسْلِمِيْنَ. فَاسْتَغْفِرُوْهُ، إِنَّهُ هُوَ الْغَفُوْرُ الرَّحِيْمُ.
اَللَّهُمَّ صَلِّ عَلَى سَيِّدِنَا مُحَمَّدٍ وَّعَلَى آلِ سَيِّدِنَا مُحَمَّدٍ وَّبَارِكْ وَسَلِّمْ
ভূমিকা
সম্মানিত উপস্থিতি! আজ আমরা সবাই এক পরম আনন্দ ও বরকতের দিনে একত্রিত হয়েছি—ঈদুল ফিতরের এই মহিমান্বিত দিনে। এই খুশির মুহূর্তে আমরা আল্লাহ তাআলার দরবারে দোয়া করি, তিনি যেন আমাদের জীবনে এমন আনন্দের সকাল বারবার ফিরিয়ে আনেন এবং রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের মাস রমজানুল মুবারকও যেন বারবার আমাদের জীবনে ফিরে আসে।
মানুষের জীবনে আনন্দ-উৎসবের প্রয়োজন
প্রিয় ভাইয়েরা! আল্লাহ রাব্বুল আলামিন মানুষকে এমন প্রকৃতি দিয়ে সৃষ্টি করেছেন যে, একটানা একই কাজ, একই নিয়ম ও একই ব্যস্ততা কখনো কখনো তাকে ক্লান্ত করে তোলে। তাই মানুষের জীবনে পরিবর্তন প্রয়োজন, বিশ্রাম প্রয়োজন, আনন্দ প্রয়োজন। আর ইসলাম—যা ফিতরাতের দীন—এই স্বাভাবিক চাহিদাকে অস্বীকার করেনি; বরং সঠিক দিকনির্দেশনার মাধ্যমে এই আনন্দকে পবিত্র ও অর্থবহ করে তুলেছে।
উৎসবের মাঝেই জাতির পরিচয়
এই কারণেই পৃথিবীর সব জাতি ও সমাজে কিছু নির্দিষ্ট দিন রয়েছে, যেগুলো তারা উৎসব হিসেবে পালন করে। তবে মনে রাখতে হবে—যে জাতির চরিত্র যত উন্নত, যে সমাজের নৈতিক মান যত উঁচু, তাদের উৎসবও ততই শালীন, সুন্দর ও কল্যাণকর হয়। আর যেখানে নৈতিক অবক্ষয় গভীর, সেখানে উৎসবের মাঝেও সেই অবক্ষয়ের ছাপ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আসলে উৎসবই বলে দেয় একটি জাতি কী বিশ্বাস করে, কী মূল্যবোধ লালন করে।
ঈদ শুধু আনন্দ নয়, পুরস্কারের দিন
ঈদ আমাদের জন্য নিছক আনন্দের দিন নয়; ঈদ হলো ইবাদতের পর পুরস্কারের দিন। এক মাস সিয়াম, কিয়াম, তিলাওয়াত ও আত্মসংযমের পর আল্লাহ তাআলা ঈদের মাধ্যমে আমাদের সম্মানিত করেছেন। এখানে আনন্দ আছে—কিন্তু গুনাহের অনুমতি নেই; হাসি আছে—কিন্তু সীমালঙ্ঘন নেই; খুশি আছে—কিন্তু আল্লাহর নাফরমানি নেই।
এই ঈদ আমাদের শিক্ষা দেয়—একতা, ভ্রাতৃত্ব, কৃতজ্ঞতা ও পারস্পরিক সহমর্মিতা। ধনী-গরিব, বড়-ছোট—সবাই যেন এক কাতারে দাঁড়িয়ে আল্লাহর সামনে নিজেকে সমান মনে করি।
চাঁদ রাতের প্রকৃত গুরুত্ব
দুঃখজনক বাস্তবতা হলো—আমাদের সমাজে চাঁদ রাতকে অনেক সময় এমন একটি রাত হিসেবে ধরা হয়, যেন এ রাতে শরিয়তের বিধিনিষেধ শিথিল হয়ে যায়। অথচ হাদিসে এই রাতকে বলা হয়েছে ‘লাইলাতুল জাইযাহ’, অর্থাৎ পুরস্কারের রাত। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন
وَيُغْفَرُ لَهُمْ فِي آخِرِ لَيْلَةٍ، قِيلَ: يَا رَسُولَ اللَّهِ! أَهِيَ لَيْلَةُ الْقَدْرِ، قَالَ: لا ، وَلَكِنَّ الْعَامِلَ إِنَّمَا يُوَفَّى أَجْرَهُ إِذَا قَضَى عَمَلَهُ
‘রমজানের শেষ রাতে আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দাদের ক্ষমা করে দেন।’ সাহাবায়ে কেরাম জিজ্ঞেস করলেন, ‘ইয়া রাসুলাল্লাহ! এটা কি লাইলাতুল কদর?’
তিনি ﷺ উত্তর দিলেন, ‘না, বরং শ্রমিক যখন তার কাজ শেষ করে, তখনই তাকে পুরো মজুরি দেওয়া হয়।’ [ মুসনাদ আহমদ : ৭৯০৪]
অর্থাৎ, রমজানের দীর্ঘ সাধনা ও ইবাদতের পূর্ণ প্রতিদান দেওয়া হয় এই চাঁদ রাতেই।
পরিশ্রম নষ্ট হওয়ার বেদনা
অনেক মানুষ পুরো রমজান তাকওয়া, সংযম ও ইবাদতের সঙ্গে কাটালেও—চাঁদ রাতে এসে খেল-তামাশা, অনর্থক ঘোরাঘুরি ও গুনাহের কাজে লিপ্ত হয়ে পড়ে। এতে করে এক মাসের সাধনা অনেক সময় পানিতে চলে যায়।
রমজান শেষ হতেই শয়তান আবার সক্রিয় হয়ে ওঠে। সে মানুষকে নেকির পথ থেকে সরিয়ে ফিসক-ফুজুরের দিকে টেনে নিতে চায়। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, অনেকেই তার এই প্রতারণার ফাঁদে পড়ে যায়।
চাঁদ রাত কীভাবে কাটানো উচিত?
আমরা প্রায়ই চাঁদ রাত কাটাই—বাজারে ঘোরাঘুরি করে, অপ্রয়োজনীয় কেনাকাটায় কিংবা অর্থহীন আড্ডায়। অথচ হাদিসে এই রাতে ইবাদতের বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন
مَنْ قَامَ لَيْلَتَيِ الْعِيدَيْنِ مُحْتَسِبًا لِلَّهِ ، لَمْ يَمُتْ قَلْبُهُ يَوْمَ تَمُوتُ الْقُلُوبُ
যে ব্যক্তি ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার রাতে জাগরিত থেকে আল্লাহর ইবাদত-বন্দেগীতে মশগুল থাকবে, তাহলে তার দিল কিয়ামতের দিন মরবে না। [ ইবন মাজাহ : ১৭৮২]
কিয়ামতের আতঙ্কের কারণে অন্যান্য লোকের অন্তর ঘাবড়ে গিয়ে মৃতপ্রায় হয়ে যাবে। কিš‘ দুই ঈদের রাতে ইবাদতকারীর অন্তর তখন ঠিক থাকবে, ঘাবড়াবে না। তাই আমাদের উচিত—
নফল নামায আদায় করা,
তাহাজ্জুদের চেষ্টা করা,
কুরআন তিলাওয়াত করা,
দোয়া ও ইস্তিগফারে সময় দেওয়া।
তাহলেই আমরা এই ‘পুরস্কারের রাত’-এর প্রকৃত বরকত লাভ করতে পারব।
ঈদুল ফিতরের অর্থ ও তাৎপর্য
ঈদুল ফিতর হলো—রমজান মাস পূর্ণ করার পর আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে পুরস্কার পাওয়ার দিন। এর চেয়ে বড় আনন্দ আর কী হতে পারে?
আলেমগণ বলেন, ‘ঈদ’ শব্দটি এসেছে ‘আউদ’ থেকে, যার অর্থ বারবার ফিরে আসা। ‘ফিতর’ অর্থ—রোজা ভাঙা।
যেহেতু এই দিনে রোজার সমাপ্তি ঘটে এবং আল্লাহ তাআলা রমজানের ইবাদতের প্রতিদান দেন, তাই একে বলা হয় ঈদুল ফিতর।
আব্দুল কাদের জিলানী রহ. বলেন
أَنَّهُ يَعُودُ الْعَبْدُ فِيهِ إِلَى التَّضَرُّعِ وَالْبُكَاءِ، وَيَعُودُ الرَّبُّ -عَزَّ وَجَلَّ- فِيهِ إِلَى الْهِبَةِ وَالْعَطَاءِ
ঈদকে ঈদ এজন্য বলা হয়, কেননা, এই দিনে বান্দা বিনয় ও কান্নাকাটির দিকে ফিরে আসে, আর প্রতিপালক ক্ষমা ও পুরস্কারের দিকে ফিরে আসেন। [গুনিয়াতুত তালেবীন : ২/২৯]
তিনি আরও বলেন
إِنَّمَا سُمِّيَ عِيدًا، لِأَنَّهُ يُقَالُ لِلْمُؤْمِنِينَ فِيهِ: عُودُوا إِلَى مَنَازِلِكُمْ مَغْفُورًا لَكُمْ
ঈদকে ঈদ এজন্য বলা হয়, কেননা, এই দিন মুমিনদের বলা হয়—নিজেদের ঠিকানায় ফিরে যাও, তোমাদের গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হয়েছে। [গুনিয়াতুত তালেবীন : ২/২৯]
মুসলমানদের আনন্দের দুই দিন
হযরত আনাস রাযি. বর্ণনা করেন
قَدِمَ رَسُولُ اللهِ ﷺ الْمَدِينَةَ وَلَهُمْ يَوْمَانِ يَلْعَبُونَ فِيهِمَا فَقَالَ مَا هَذَانِ الْيَوْمَانِ قَالُوا كُنَّا نَلْعَبُ فِيهِمَا فِى الْجَاهِلِيَّةِ فَقَالَ رَسُولُ اللهِ ﷺ إِنَّ اللهَ قَدْ أَبْدَلَكُمْ بِهِمَا خَيْرًا مِنْهُمَا يَوْمَ الأَضْحَى وَيَوْمَ الْفِطْرِ
রাসূলুল্লাহ ﷺ যখন মদিনায় আগমন করেন, তখন সেখানকার মানুষ দুটি দিন খেলাধুলায় কাটাত। তখন তিনি বললেন, আল্লাহ তাআলা তোমাদের সেই দুটি দিনের পরিবর্তে তার চেয়ে উত্তম দুটি দিন দিয়েছেন—ঈদুল আজহা ও ঈদুল ফিতর। [আবু দাউদ : ১১৩৬]
ইসলাম আনন্দকে নিষেধ করে না। বরং শরিয়তের সীমার মধ্যে থেকে আনন্দ করার অনুমতি দেয়। অন্যদেরও সেই আনন্দে শরিক করতে উৎসাহ দেয়। একই সঙ্গে মনে করিয়ে দেয়—মুমিন ব্যক্তি আনন্দের মুহূর্তেও তার রবকে ভুলে যায় না।
ঈদ—রমজানের উপহার
আলহামদুলিল্লাহ, পবিত্র রমজান মাস সম্পন্ন হয়েছে। আল্লাহ তাআলার তাওফিকেই আমরা এই বরকতময় মাসে নানাবিধ ইবাদত আদায় করতে পেরেছি—রোজা রেখেছি, তারাবিহ পড়েছি, কুরআন তিলাওয়াত করেছি, আর আল্লাহর কিছু সৌভাগ্যবান বান্দা ইতেকাফের সৌভাগ্যও অর্জন করেছেন। প্রত্যেকে নিজ নিজ সামর্থ্য অনুযায়ী রমজানের রহমত ও মাগফিরাত থেকে উপকৃত হয়ে আল্লাহর সš‘ষ্টি অর্জনের চেষ্টা করেছি।
এই ইবাদতগুলোর বিনিময়ে আল্লাহ তাআলা আমাদের জন্য পুরস্কার ও উপহারস্বরূপ ঈদুল ফিতরের দিনটি দান করেছেন। তাই এই দিনটি সব মুসলমানের জন্য আনন্দের—কারণ আল্লাহর তাওফিকেই আমরা রমজানের ইবাদতগুলো আদায় করতে পেরেছি।
বিশেষ করে রোজা—এটি এমন এক ইবাদত, যা পুরো বছরে কেবল রমজান মাসেই ফরজ করা হয়েছে। প্রত্যেক মুমিনেরই কামনা থাকে যেন সে রমজানের একটি রোজাও বাদ না দেয়। কিন্তু অনেক বান্দা আছেন, যাঁরা ডায়াবেটিসসহ নানা রোগে আক্রান্ত—যাদের জন্য দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকা অত্যন্ত কষ্টকর। তবুও তারা আল্লাহর সাহায্যে ধৈর্য ধারণ করে পূর্ণ রমজানের রোজা আদায় করে ফেলেন।
কারণ রমজানের রোজা যদি ছুটে যায়, তার প্রকৃত ক্ষতিপূরণ আর সম্ভব নয়। রমজানের রোজার যে ফজিলত ও মর্যাদা, তা অন্য সময়ের রোজায় পাওয়া যায় না। তাই যারা পূর্ণ রমজানের রোজা সম্পন্ন করার তাওফিক পান—এটি তাদের জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে এক বিশেষ নিয়ামত।
রমজান পূর্ণ হওয়ার পর কৃতজ্ঞতা আদায়
রমজান মাস আমরা ইবাদতের মাধ্যমে কাটাতে পেরেছি—এটি আমাদের যোগ্যতার কারণে নয়; বরং আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ ও তাওফিকের ফল। তাই রমজান সুন্দরভাবে সম্পন্ন হওয়ার পর আমাদের কর্তব্য হলো—আল্লাহ তাআলার শুকরিয়া আদায় করা। কৃতজ্ঞতা আদায় করলে আল্লাহ তাআলা নিয়ামত বাড়িয়ে দেন, আর অকৃতজ্ঞতা তাঁর গজব ও আজাবের কারণ হয়। কুরআনে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন
وَإِذْ تَأَذَّنَ رَبُّكُمْ لَئِن شَكَرْتُمْ لَأَزِيدَنَّكُمْ ۖ وَلَئِن كَفَرْتُمْ إِنَّ عَذَابِي لَشَدِيدٌ
আর স্মরণ করো, যখন তোমাদের রব ঘোষণা করেছিলেন—তোমরা যদি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো, তবে আমি অবশ্যই তোমাদের আরও বেশি দান করব। আর যদি অকৃতজ্ঞ হও, তবে নিশ্চয়ই আমার শাস্তি কঠোর। [সূরা ইবরাহীম : ৭]
সুতরাং রমজানের মতো মহান নেয়ামত দান করার জন্য আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা আমাদের জন্য অপরিহার্য।
রমজানের মহিমা ও মর্যাদা
রমজান কত মহান নেয়ামত—এর প্রমাণ এই যে, রাসূলুল্লাহ ﷺ দুই মাস আগেই রমজানের আগমনের অপেক্ষা করতেন। হাদিসে আরও এসেছে, রমজানের আগমণের এক বছর আগেই জান্নাতকে সাজানো হয় এই মাসের জন্য।
আব্দুল্লাহ ইবন উমর রাযি. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন
إِنَّ الْجَنَّةَ تُزَخْرَفُ لِرَمَضَانَ مِنْ رَأْسِ الْحَوْلِ إِلَى حَوْلِ قَابِلٍ
রমজানকে স্বাগত জানাবার জন্য বছরের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত জান্নাতকে সাজানো হতে থাকে। [মুসনাদ আহমদ : ৭৮৫৭]
যেমন আমরা কোনো সম্মানিত অতিথি আগমনের আগে ঘর পরিষ্কার করি, সাজাই, সুগন্ধি ব্যবহার করি এবং চেষ্টা করি যেন অতিথির কোনো কষ্ট না হয়—ঠিক তেমনি আল্লাহ তাআলা রমজান মাস এবং রমজানে রোজা পালনকারী মুমিন বান্দাদের জন্য আগেভাগেই বিশেষ ব্যবস্থা করে রাখেন।
ঈদের দিনের ফজিলত
আবদুল্লাহ ইবন আব্বাস রাযি. থেকে একটি দীর্ঘ হাদিস বর্ণিত হয়েছে। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন
فَإِذَا كَانَتْ لَيْلَةُ الْفِطْرِ سُمِّيَتْ تِلْكَ اللَّيْلَةُ لَيْلَةَ الْجَائِزَةِ
‘রমজানের শেষ রাতে, অর্থাৎ ফিতরের রাতেই হয় ‘লাইলাতুল জাইযাহ’—পুরস্কারের রাত।’
এরপর যখন ঈদের সকাল হয়, আল্লাহ তাআলা সব দেশে ফেরেশতাদের প্রেরণ করেন। তারা পৃথিবীতে নেমে রাস্তার মোড়ে মোড়ে দাঁড়িয়ে এমন উচ্চ কণ্ঠে ডাক দিতে থাকেন—যে ডাক মানুষ ও জিন ছাড়া আল্লাহর সৃষ্ট সবকিছুই শুনতে পায়। তারা বলতে থাকেন
يَا أُمَّةَ مُحَمَّدٍ! اخْرُجُوا إِلَى رَبٍّ كَرِيمٍ يُعْطِي الْجَزِيلَ ، وَيَعْفُو عَنِ الذَّنْبِ الْعَظِيمِ
‘হে মুহাম্মদ ﷺ-এর উম্মত! তোমরা বেরিয়ে এসো এমন এক মহান ও দয়ালু রবের দরবারে—যিনি প্রচুর দান করেন এবং বড় বড় গুনাহও ক্ষমা করে দেন।’
যখন বান্দারা ঈদগাহের দিকে বের হয়, তখন আল্লাহ তাআলা ফেরেশতাদের জিজ্ঞেস করেন
مَا جَزَاءُ أَجِيرٍ وَفَّى عَمَلَهُ ؟
‘যে শ্রমিক তার কাজ সম্পন্ন করেছে, তার প্রাপ্য কী?’
ফেরেশতারা উত্তর দেন
إِلَهَنَا وَسَيِّدَنَا! جَزَاؤُهُ أَنْ تُوَفِّيَهُ أَجْرَهُ
‘হে আমাদের রব ও মালিক! তার প্রাপ্য হলো—তার পূর্ণ মজুরি প্রদান করা।’
তখন আল্লাহ তাআলা বলেন
فَإِنِّي أُشْهِدُكُمْ يَا مَلَائِكَتِي أَنِّي قَدْ جَعَلْتُ ثَوَابَهُمْ مِنْ صِيَامِهِمْ شَهْرَ رَمَضَانَ وَقِيَامَهُ رِضَائِي وَمَغْفِرَتِي
‘হে আমার ফেরেশতারা! তোমরা সাক্ষী থাকো—আমি রমজান মাসের রোজা ও রাতের ইবাদতের প্রতিদান হিসেবে তাদের জন্য আমার সš‘ষ্টি ও ক্ষমাকে নির্ধারণ করেছি।’
এরপর আল্লাহ তাআলা বান্দাদের উদ্দেশে বলেন
يَا عِبَادِي سَلُونِي ، فَوَعِزَّتِي وَجَلَالِي لَا تَسْأَلُونِي الْيَوْمَ شَيْئًا فِي جَمْعِكُمْ لِآخِرَتِكُمْ إِلَّا أَعْطَيْتُكُمْ ، وَلَا لِدُنْيَاكُمْ إِلَّا نَظَرْتُ لَكُمْ
‘হে আমার বান্দারা! আজ তোমরা আমার কাছে চাও। আমার ইজ্জত ও মহিমার কসম! আজ তোমরা তোমাদের আখিরাতের জন্য যা চাইবে, আমি তা অবশ্যই দেব। আর দুনিয়ার ব্যাপারে যা চাইবে, আমি তাতেও তোমাদের কল্যাণের দিকেই দৃষ্টি দেব।’
আল্লাহ তাআলা আরও বলেন
فَوَعِزَّتِي لَأَسْتُرَنَّ عَلَيْكُمْ عَثَرَاتِكُمْ مَا رَاقَبْتُمُونِي ، فَوَعِزَّتِي لَا أَخْزِيكُمْ ، وَلَا أَفْضَحُكُمْ بَيْنَ يَدَيْ أَصْحَابِ الْحُدُودِ
‘আমার ইজ্জতের কসম! যতদিন তোমরা আমাকে ভয় করে চলবে, আমি তোমাদের ভুলত্রুটি ঢেকে রাখব। আমার ইজ্জতের কসম! আমি তোমাদের লাঞ্ছিত করব না, সীমা লঙ্ঘনকারীদের সামনে তোমাদের অপমান করব না।’
এরপর আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেন
انْصَرِفُوا مَغْفُورًا لَكُمْ قَدْ أَرْضَيْتُمُونِي ، وَرَضِيتُ عَنْكُمْ
‘ফিরে যাও—তোমাদের গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হয়েছে। তোমরা আমাকে সš‘ষ্ট করেছ, আর আমিও তোমাদের প্রতি সš‘ষ্ট হয়েছি।’
এ কথা শুনে ফেরেশতারা আনন্দিত হন এবং খুশি হন এই ভেবে—রমজান শেষে ঈদের দিনে আল্লাহ তাআলা এই উম্মতকে কী অপার দান ও সম্মান দান করছেন। [ বাইহাকী, শুআবুল ঈমান : ৩৪২১]
এই হাদিস আমাদের জানিয়ে দেয়—ঈদের দিন শুধু আনন্দের নয়; বরং আল্লাহর ক্ষমা, সš‘ষ্টি ও পুরস্কার পাওয়ার এক মহামূল্যবান দিন।
ওয়াহাব ইবন মুনাব্বিহ রহ. বলেন
خَلَقَ اللَّهُ الْجَنَّةَ يَوْمَ الْفِطْرِ، وَغَرَسَ شَجَرَةَ طُوبَى يَوْمَ الْفِطْرِ، وَاصْطَفَى جِبْرِيلَ -عَلَيْهِ السَّلَامُ- لِلْوَحْيِ يَوْمَ الْفِطْرِ، وَالسَّحَرَةُ وَجَدُوا الْمَغْفِرَةَ يَوْمَ الْفِطْرِ
আল্লাহ তাআলা ঈদুল ফিতরের দিনে জান্নাত সৃষ্টি করেছেন, ঈদুল ফিতরের দিনে জান্নাতের ‘তূবা’ বৃক্ষ রোপণ করেছেন, ঈদুল ফিতরের দিনে ওহী বহনের জন্য জিবরাঈল আ.-কে মনোনীত করেছেন এবং ফেরাউনের জাদুকরেরা ঈদুল ফিতরের দিনেই ক্ষমা লাভ করেছিলেন। [ গুনিয়াতুত তালেবীন : ২/২৯]
সালাফের দৃষ্টিতে প্রকৃত ঈদ কার জন্য?
নিশ্চয়ই উম্মতের সেই সব মানুষ অত্যন্ত সৌভাগ্যবান—যাঁরা রমজান মাস পেয়েছেন, নিজেদের সময়কে ইবাদতে আলোকিত করেছেন, পুরো মাস তাকওয়ার পথে চলেছেন এবং আল্লাহর দরবারে ক্ষমার আশায় হাত প্রসারিত করে রেখেছেন। ঈদ মূলত এমনই সৌভাগ্যবানদের জন্য—এখন তাদের শ্রমের পারিশ্রমিক পাওয়ার সময়।
তবে আল্লাহর নেক বান্দাদের বৈশিষ্ট্য ছিল—তারা কখনোই নিজেদের ইবাদত নিয়ে গর্ব করতেন না। বরং সবসময় আল্লাহর কাছে কবুলিয়াতের দোয়া করতেন এবং নিজেদের আমলের ব্যাপারে গভীর আত্মসমালোচনায় লিপ্ত থাকতেন। যেমন—
হাসান বসরী রহ.
হাসান বসরী রহ. বলেন
كُلُّ يَوْمٍ لَا يُعْصَى اللهُ فِيهِ فَهُوَ عِيدٌ، كُلُّ يَوْمٍ يَقْطَعُهُ المُؤْمِنُ فِي طَاعَةِ مَوْلَاهُ وَذِكْرِهِ وَشُكْرِهِ فَهُوَ لَهُ عِيدٌ
যে দিন আল্লাহর নাফরমানী করা হয় না—সে দিনই হলো ঈদ। যে দিন একজন মুমিন তার প্রভুর আনুগত্য, স্মরণ ও কৃতজ্ঞতায় কাটায়—সে দিনই তার জন্য ঈদ। [ ইবনু রজব, লাতায়েফুল মা‘আরেফ : ২৭৮]
আবদুল কাদের জিলানী রহ.
শায়খ আবদুল কাদের জিলানী রহ. কী বলেন? তিনি বলেন
لَيْسَ الْعِيدُ بِلُبْسِ النَّاعِمَاتِ، وَأَكْلِ الطَّيِّبَاتِ، وَمُعَانَقَةِ الْمُسْتَحْسَنَاتِ، وَالتَّمَتُّعِ بِاللَّذَّاتِ وَالشَّهَوَاتِ. لَكِنَّ الْعِيدَ بِظُهُورِ عَلَامَةِ الْقَبُولِ لِلطَّاعَاتِ، وَتَكْفِيرِ الذُّنُوبِ وَالْخَطِيئَاتِ، وَتَبْدِيلِ السَّيِّئَاتِ بِالْحَسَنَاتِ، وَالْبِشَارَةِ بِارْتِفَاعِ الدَّرَجَاتِ، وَالْخِلَعِ وَالطُّرَفِ وَالْهِبَاتِ وَالْكَرَامَاتِ، وَانْشِرَاحِ الصَّدْرِ بِنُورِ الْإِيمَانِ، وَسُكُونِ الْقَلْبِ بِقُوَّةِ الْيَقِينِ وَمَا ظَهَرَ عَلَيْهِ مِنَ الْعَلَامَاتِ
ঈদ নতুন পোশাক পরার নাম নয়, সুস্বাদু খাবার খাওয়ার নাম নয়, আকর্ষণীয় জিনিসে মগ্ন হওয়া, ভোগ-বিলাস ও প্রবৃত্তির আনন্দে ডুবে যাওয়াই ঈদ নয়। বরং ঈদ হলো—ইবাদত কবুল হওয়ার নিদর্শন প্রকাশ পাওয়া, গুনাহ ও ভুলত্রুটি মাফ হয়ে যাওয়া, মন্দ কাজ নেকিতে রূপান্তরিত হওয়া, মর্যাদা ও স্তর বৃদ্ধি পাওয়ার সুসংবাদ পাওয়া, আল্লাহর বিশেষ দান, অনুগ্রহ ও করুণা লাভ করা, ঈমানের নূরে বুক প্রশস্ত হওয়া, আর দৃঢ় বিশ্বাসের শক্তিতে হৃদয়ের প্রশান্তি লাভ করা—এবং এসবের স্পষ্ট আলামত নিজের ভেতর অনুভব করা। [ গুনিয়াতুত তালেবীন : ২/৩৪]
ইবন রজব হাম্বলী রহ.
প্রখ্যাত মুহাদ্দিস ইবন রজব হাম্বলী রহ. বলেন
لَيْسَ الْعِيْدُ لِمَنْ لَبِسَ الْجَدِيْدَ
إِنَّمَا الْعِيْدُ لِمَنْ طَاعَاتُهُ تَزِيْدُ
لَيْسَ الْعِيْدُ لِمَنْ تَجَمَّلَ بِاللِّبَاسِ وَالرُّكُوْبِ
إِنَّمَا الْعِيْدُ لِمَنْ غُفِرَتْ لَهُ الذُّنُوْبُ
ঈদ তার জন্য নয়, যে নতুন কাপড় পরেছে; বরং ঈদ তার জন্য—যার নেক আমল বেড়েছে।
ঈদ তার জন্য নয়, যে বাহ্যিক সাজে নিজেকে সুন্দর করেছে; বরং ঈদ তার জন্য—যার গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দেওয়া হয়েছে। [ ইবনু রজব, লাতায়িফুল মা‘আরিফ : ২৭৭]
সালফে সালেহীনের এই কথাগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয়—ঈদ কোনো একদিনের বাহ্যিক আনন্দের নাম নয়; বরং ঈদ হলো অন্তরের পরিবর্তন, আমলের উন্নতি এবং আল্লাহর নৈকট্য লাভের নাম।
ঈদ না ওয়ীদ?
আমাদের শায়খ ও মুরশিদ মাহবুবুল ওলামা পীর জুলফিকার আহমদ নকশবন্দী রহ. বলেন, ঈদ আমাদের জন্য হয় ‘ঈদ’ হবে—না হয় ‘ওয়ীদ’ হবে। ঈদ মানে তো খুশি। ওয়ীদ মানে শাস্তি । রমজানে যারা নিজেদের গুনাহ মাফ করিয়ে নিতে পেরেছে তাদের জন্য ঈদ। আর যারা মাফ করাতে পারে নি তাদের জন্য ওয়ীদ ।
এক বুযুর্গকে কেউ জিজ্ঞেস করল, হযরত! ঈদ কবে হবে? তিনি উত্তর দিলেন, যখন ‘দীদ’ হবে তখন ঈদ হবে। অর্থাৎ যখন প্রকৃত মাহবুব মহান আল্লাহর সাথে দেখা হবে তখন আমাদের ঈদ হবে।
ঈদ তার জন্য নয়
কবি চমৎকার বলেছেন
لَيْسَ العِيدُ لِمَنْ لَبِسَ الجَدِيدَ
وَإِنَّمَا العِيدُ لِمَنْ خَافَ الوَعِيدَ
وَلَيْسَ العِيدُ لِمَنْ تَبَخَّرَ بِالعُودِ
إِنَّمَا العِيدُ لِمَنْ تَابَ وَلَا يَعُودَ
وَلَيْسَ العِيدُ لِمَنْ نَصَبَ القُدُورَ
وَإِنَّمَا العِيدُ لِمَنْ سَعِدَ بِالمَقْدُورِ
لَيْسَ العِيدُ لِمَنْ تَزَيَّنَ بِزِينَةِ الدُّنْيَا
وَإِنَّمَا العِيدُ لِمَنْ تَزَوَّدَ بِزَادِ التَّقْوَى
لَيْسَ العِيدُ لِمَنْ رَكِبَ المَطَايَا
إِنَّمَا العِيدُ لِمَنْ تَرَكَ الخَطَايَا
ঈদ তার জন্য নয়, যে নতুন পোশাক পরেছে,
বরং ঈদ তার জন্য—যে আল্লাহর শাস্তিকে ভয় করেছে।
ঈদ তার জন্য নয়, যে সুগন্ধি ধূপ জ্বালিয়েছে,
বরং ঈদ তার জন্য—যে তাওবা করেছে এবং আর পাপে ফিরে যায় না।
ঈদ তার জন্য নয়, যে বড় বড় হাঁড়ি বসিয়েছে (ভোজের আয়োজন করেছে),
বরং ঈদ তার জন্য—যে আল্লাহ নির্ধারিত তাকদীরে সš‘ষ্ট।
ঈদ তার জন্য নয়, যে দুনিয়ার সাজে নিজেকে সজ্জিত করেছে,
বরং ঈদ তার জন্য—যে তাকওয়ার পাথেয় সংগ্রহ করেছে।
ঈদ তার জন্য নয়, যে বাহনে চড়েছে,
বরং ঈদ তার জন্য—যে গুনাহ ত্যাগ করেছে।
খলিফার সন্তানদের ঈদ
আমাদের ইসলামী ইতিহাস শিক্ষাায় ভরপুর অসংখ্য ঘটনা দ্বারা সমৃদ্ধ—যা আজকের সময়ে কল্পনা করাও আমাদের জন্য কঠিন। ঈদের প্রসঙ্গে এমনই একটি হৃদয়ছোঁয়া ঘটনা তুলে ধরছি।
ইসলামের পঞ্চম ন্যায়পরায়ণ খলিফা উমর ইবনে আবদুল আজিজ রহ.-এর জীবনের একটি ঘটনা ইতিহাসে প্রসিদ্ধ। একবার তাঁর খেলাফতকালে ঈদের দিনে মানুষ তাঁকে ঈদের শুভেচ্ছা জানাতে আসলেন। প্রথমে বড়রা এলেন, পরে শিশুরাও এল।
এই শিশুদের মধ্যেই ছিলেন তাঁর নিজের ছেলে। লক্ষ্য করার বিষয় ছিল—অন্য সব শিশু নতুন পোশাক পরলেও খলিফার ছেলে পরেছিল পুরোনো কাপড়। এই দৃশ্য দেখে আমিরুল মুমিনিনের চোখে অশ্রু নেমে আসে।
খলিফার নিষ্পাপ সন্তান বাবার কান্নার কারণ জানতে চাইলে তিনি বললেন, ‘বাছা, তোমাকে পুরোনো পোশাকে দেখে আমার মনে হলো, অন্য শিশুদের নতুন পোশাক দেখে হয়তো তোমার মন কষ্ট পেয়েছে।’
এ সময় যে উত্তরটি সেই শিশুটি দিল—তা ইতিহাসের পাতায় চিরদিনের জন্য লিপিবদ্ধ হয়ে আছে। তরবিয়তপ্রাপ্ত সন্তানটি বলল, ‘আব্বাজান! যার অন্তর ভাঙে, সে হলো সেই ব্যক্তি—যে আল্লাহকে চেনার পরও তাঁর নাফরমানি করে,
নিজের বাবা-মায়ের অবাধ্য হয়। আলহামদুলিল্লাহ, আমি তাদের অন্তর্ভুক্ত নই। প্রকৃত ঈদ তো তাদেরই—যারা আল্লাহর অনুগত ও সৎ বান্দা।’
ভাইয়েরা! এই ঘটনা আমাদের গভীরভাবে ভাবায়। উমর ইবনে আবদুল আজিজ রহ. ছিলেন সমগ্র মুসলিম বিশ্বের খলিফা—কোনো ছোট অঞ্চলের শাসক নন; বরং লক্ষ লক্ষ বর্গমাইল বিস্তৃত ইসলামী রাষ্ট্রের আমির। তবু তাঁর নিজের সন্তানের জন্য ঈদের দিনে নতুন পোশাকও ছিল না।
এর চেয়েও বিস্ময়কর বিষয় হলো—তাঁর সন্তানের আত্মিক ও নৈতিক প্রশিক্ষণ। সাধারণত অন্য শিশুদের নতুন পোশাক দেখে যে কোনো শিশুর মন খারাপ হয়ে যাওয়াই স্বাভাবিক। অথচ এই শিশুটি উল্টো বাবাকে সান্ত্বনা দিয়ে বলছে, ‘আমাদের মন খারাপ হওয়ার কী আছে, যখন আল্লাহর অনুগ্রহে আমরা গুনাহে লিপ্ত নই এবং বাবা-মায়ের অবাধ্য নই?’
নিশ্চয়ই ইতিহাসে এমন দৃষ্টান্ত খুবই বিরল। পরবর্তী যুগগুলো এ ধরনের উদাহরণ উপস্থাপন করতে প্রায়ই ব্যর্থ হয়েছে। [ক্বারনী, দুরুস ওয়া খুতাব : ৬/২৬]
গরিবের প্রতি সহমর্মিতা ও সাহায্য
ঈদের এই আনন্দঘন সময়ে আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হলো—নিজের আশপাশে, প্রতিবেশী ও আত্মীয়স্বজনদের দিকে তাকানো। খেয়াল করা দরকার, তাঁদের মধ্যে কেউ কি এমন আছেন—যিনি দারিদ্র্য ও অভাবের কারণে ঈদের আনন্দ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন?
যদি এমন কেউ থেকে থাকেন, তবে মনে রাখতে হবে—আমরা যতই সুন্দর পোশাক পরি, যতই বড় করে খাবারের আয়োজন করি, যতই ঈদের শুভে”ছা বিলিয়ে বেড়াই—গরিবকে বাদ দিয়ে আমাদের ঈদ কখনোই পূর্ণ ঈদ হতে পারে না। বরং এমন ঈদ প্রকৃত অর্থেই ঈদ হওয়ার যোগ্য নয়, যেখানে উম্মাহর সব শ্রেণির মানুষ শরিক হতে পারে না।
ঈদুল ফিতর মূলত আমাদের দরিদ্র ও অসহায় ভাইদের প্রতি সহানুভূতি ও সাহায্যের এক মহামূল্যবান সুযোগ। এ কারণেই শরিয়ত আমাদের এই দিনে সাদকাতুল ফিতর আদায়ের নির্দেশ দিয়েছে।
সাদকাতুল ফিতর
সাদকাতুল ফিতর প্রত্যেক সামর্থ্যবান মুসলমানের ওপর ওয়াজিব। আবদুল্লাহ ইবন আব্বাস রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন
فَرَضَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ زَكَاةَ الْفِطْرِ طُهْرَةً لِلصَّائِمِ مِنَ اللَّغْوِ وَالرَّفَثِ وَطُعْمَةً لِلْمَسَاكِينِ فَمَنْ أَدَّاهَا قَبْلَ الصَّلاَةِ فَهِيَ زَكَاةٌ مَقْبُولَةٌ وَمَنْ أَدَّاهَا بَعْدَ الصَّلاَةِ فَهِيَ صَدَقَةٌ مِنَ الصَّدَقَاتِ
রাসূলুল্লাহ ﷺ সাদকাতুল ফিতর ফরজ করেছেন রোজাদারকে অনর্থক কথা ও ভুলত্রুটি থেকে পবিত্র করার জন্য এবং দরিদ্রদের খাদ্যের ব্যবস্থা করার জন্য। যে ব্যক্তি নামাযের আগে তা আদায় করে, তার সাদকা কবুল হয়। আর যে নামাযের পরে আদায় করে—তা সাধারণ সাদকার অন্তর্ভুক্ত হয়। [ বন মাজাহ : ১৮২৭]
সাদকাতুল ফিতরের উপকারিতা—দু’পক্ষের জন্যই
এই হাদিস থেকে স্পষ্ট হয়—সদকাতুল ফিতর দুই পক্ষেরই উপকারে আসে।
দাতা’র জন্য উপকার
মানুষ হিসেবে চেষ্টা সত্ত্বেও রোজার সময় আমাদের দ্বারা কিছু অনর্থক কথা, ভুল বা ত্রুটি হয়ে যায়। সদকাতুল ফিতর আদায়ের মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা এসব ত্রুটি ক্ষমা করে দেন। ফলে রোজাগুলো পবিত্র, পরিপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে। এটি রোজা পালনের তাওফিক দান করার জন্য আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতার প্রকাশও বটে।
গ্রহীতার জন্য উপকার
অপরদিকে, সদকাতুল ফিতর দরিদ্র মানুষের জন্য কয়েক দিনের খাবারের ব্যবস্থা করে দেয়। এতে করে সেও অন্য মুসলমানদের সঙ্গে ঈদের আনন্দে শরিক হতে পারে। অতএব, এতে দাতা ও গ্রহীতা—উভয়েরই কল্যাণ নিহিত।
সদকাতুল ফিতরের মূল দর্শনই হলো—ঈদুল ফিতরের আনন্দ যেন কোনো দরিদ্র মুসলমানের জন্য অপূর্ণ না থাকে।
সাদকাতুল ফিতর কখন ও কীভাবে দেওয়া উত্তম?
সদকাতুল ফিতর যেকোনো সময় দেওয়া যায়, তবে সাধারণত রমজানের শেষ দিনগুলোতেই আদায় করা হয়। অনেকে ঈদের নামাযে যাওয়ার পথে ভিক্ষুকদের হাতে ফিতরা দিয়ে দেন—এটি উত্তম পদ্ধতি নয়। সবচেয়ে ভালো হলো—ঈদের আগেই সাদকাতুল ফিতর আদায় করা, যাতে দরিদ্ররাও ঈদের প্র¯‘তি নিতে পারে।
ফিতরার পরিমাণ ও দানের আদর্শ পদ্ধতি
সাধারণত গমের মূল্য অনুযায়ী ফিতরা দেওয়া হয়—এটি জায়েয। তবে সামর্থ্যবানদের জন্য উত্তম হলো—খেজুর বা কিশমিশের মূল্য অনুযায়ী ফিতরা দেওয়া। এতে করে গরিবদের আরও বেশি উপকার হয়।
এছাড়া যাঁরা স”ছল, তাঁদের উচিত—ফিতরার পাশাপাশি ঈদের দিনে অতিরিক্ত সাদকা ও দান-খয়রাত করা। কারণ এতে গরিবের ঘরে ঈদের হাসি ফুটবে। আর হতে পারে, কোনো অসহায়ের দোয়া আপনার জীবনেও নতুন সুখ বয়ে আনবে।
শাওয়াল মাসের ছয়টি রোজা
রমজান শেষ হওয়ার পর শাওয়াল মাসে ছয়টি রোজা রাখা মুস্তাহাব। হাদিসে এই রোজাগুলোর ব্যাপারে বিশেষ ফজিলত ও উৎসাহ দেওয়া হয়েছে।
আবু আইয়ুব আনসারি রাযি. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন
مَن صامَ رَمَضانَ ثُمَّ أتْبَعَهُ سِتًّا مِن شَوَّالٍ،كانَ كَصِيامِ الدَّهْرِ
যে ব্যক্তি রমজানের রোজা রাখল, এরপর শাওয়াল মাসে ছয়টি রোজা রাখল— সে যেন সারা বছর রোজা রাখল। [সহীহ মুসলিম : ১১৭৬]
এই ছয়টি রোজা একটানা রাখা যেতে পারে, আবার বিরতি দিয়েও রাখা যেতে পারে। অর্থাৎ, নিজের সুবিধা ও সামর্থ্য অনুযায়ী রাখা যায়।
আনন্দ হোক শরিয়তের সীমার ভেতরে
ঈদের দিন মূলত আমাদের একটি ধর্মীয় উৎসব। তাই এ দিনের সব কার্যক্রম হওয়া উচিত ধর্মীয় চেতনার আলোকে। তবে এটাও মনে রাখতে হবে—ইসলাম কখনো আনন্দ প্রকাশকে নিষেধ করেনি। তাকওয়া ও পরহেজগারির অর্থ কখনোই রুক্ষতা বা নিরানন্দ জীবন নয়। ইসলাম উৎসব ও বিনোদনের ক্ষেত্রে কিছু সীমারেখা টেনে দিয়েছে—যাতে লাগামহীন ভোগবিলাস ও নফসের অনুসরণ থেকে মানুষ বেঁচে থাকতে পারে। ঈদের শুরুই হয় দুই রাকাত নামাযের মাধ্যমে। এর অর্থ—মুসলমান তার আনন্দ, সংস্কৃতি ও সামাজিক জীবনে কখনোই আল্লাহর নির্দেশনা থেকে উদাসীন হতে পারেনা।
ঈদের দিনে বৈধ আনন্দের দৃষ্টান্ত
হযরত আয়শা রাযি. বর্ণনা করেন, একবার ঈদের দিনে তাঁর ঘরে দুটি কিশোরী যুদ্ধের সঙ্গীত গাইছিল। রাসূলুল্লাহ ﷺ ঘরে এসে চুপচাপ শুয়ে পড়লেন এবং মুখ অন্য দিকে ফিরিয়ে নিলেন।
এ সময় হযরত আবু বকর রাযি. এসে বললেন, ‘নবীজি ﷺ-এর নিকট শয়তানের বাদ্যযন্ত্র দফ বাজানো হচ্ছে’।
তখন রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁকে বললেন, ‘ওদের ছেড়ে দাও।’
এরপর ঈদের দিন ইথিওপীয় যুবকেরা মসজিদের আঙিনায় ঢাল ও বর্শা নিয়ে খেলাধুলা করছিল। রাসূলুল্লাহ ﷺ আয়শা রাযি.-কে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুমি কি এটা দেখতে চাও?’
তিনি বললেন, ‘জি।’
তখন রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁকে নিজের আড়ালে দাঁড় করালেন। আয়শা রাযি. তাঁর গালে নিজের গাল ঠেকিয়ে সেই খেলা দেখলেন। যখন তিনি দেখতে দেখতে ক্লান্ত হলেন, রাসূল ﷺ জিজ্ঞেস করলেন, ‘এতটুকুই যথেষ্ট?
তিনি বললেন, ‘জি।’
তখন রাসূল ﷺ তাঁকে যেতে দিলেন।
আরেক বর্ণনায় এসেছে, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, প্রত্যেক জাতির একটি উৎসবের দিন থাকে, আর আজ আমাদের ঈদের দিন।
ইসলামে ঈদের দিন নির্ধারণের হেকমত
ইসলামী ইতিহাসে এমন দিনের অভাব নেই, যেগুলো চাইলে মুসলমানরা প্রতি বছর আনন্দের সঙ্গে উদযাপন করতে পারত। এমন অনেক দিন আছে, যেগুলোর আনন্দ শুধু মুসলমানদের নয়—বরং পুরো সৃষ্টি জগতের জন্যই বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। যেমন—
১. সেই দিন সবচেয়ে সৌভাগ্যবান দিন, যেদিন গোটা বিশ্বের জন্য দয়া ও রহমতের প্রতীক, রাসূলুল্লাহ ﷺ জন্মগ্রহণ করেছিলেন।
২. আবার সেই মহান দিন, যেদিন তাঁকে নবুওয়ত ও রিসালাতের ভার অর্পণ করা হয়েছিল।
৩. সেই দিনটির মর্যাদাও অতুলনীয়, যেদিন তিনি হিজরত করে মদিনা নগরীতে প্রথম ইসলামী রাষ্ট্রের ভিত্তি ¯’াপন করেন।
৪. সেই দিনটির গৌরবও অনন্য, যেদিন মক্কা বিজয় লাভ করে এবং কাবাঘরের ছাদ থেকে প্রথমবারের মতো হযরত বিলাল রাযি.-এর কণ্ঠে আজানের ধ্বনি ভেসে আসে।
এভাবে সিরাতে নববী ও ইসলামী ইতিহাসে অসংখ্য উজ্জ্বল ও গৌরবোজ্জ্বল দিন রয়েছে, যেগুলো মুসলমানদের আনন্দ ও উৎসবের উপলক্ষ হতে পারত। কিš‘ লক্ষ করার বিষয় হলো—এই দিনগুলোর কোনো একটিকেও আল্লাহ তাআলা মুসলমানদের জন্য বার্ষিক উৎসব হিসেবে নির্ধারণ করেননি।
বরং আল্লাহ তাআলা তাঁর অপার প্রজ্ঞায় মুসলমানদের আনন্দ ও উৎসবের জন্য দুটি নির্দিষ্ট দিন নির্ধারণ করেছেন। এই দুটি দিন কোনো ঐতিহাসিক ঘটনার স্মৃতিচারণ নয়; বরং এমন দুটি সময়, যখন মুসলমানরা বছরে একবার করে আদায় করা দুটি মহান ইবাদত সম্পন্ন করে।
রমজান মাসের রোজা পূর্ণ হওয়ার পর পালিত হয় ঈদুল ফিতর। আর জিলহজ মাসে হজের ইবাদত সম্পন্ন হওয়ার পর আসে ঈদুল আজহা। তখন সারা বিশ্বের লক্ষ লক্ষ মুসলমান আরাফাতের ময়দানে দাঁড়িয়ে নিজেদের রবের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে। সৌভাগ্যবানরা ক্ষমার সুসংবাদ নিয়ে নতুন জীবনের সূচনা করে। আর যারা সরাসরি হজে অংশ নিতে পারেন না, তারা আল্লাহর সš‘ষ্টির উদ্দেশ্যে কুরবানির মাধ্যমে সেই আনন্দে শরিক হয়।
এ থেকেই বোঝা যায়—ইসলামে আনন্দ কোনো ঐতিহাসিক দিনের স্মরণ নয়; বরং আল্লাহর নির্দেশ মান্য করে বড় ইবাদত সম্পন্ন করার পর তাঁর পক্ষ থেকে পাওয়া এক বিশেষ সম্মান ও পুরস্কার।
ইসলামী উৎসবের বৈশিষ্ট্যসমূহ
১. নিজের আমল দিয়েই সম্মান অর্জন করতে হয়
ইসলামে ঈদের আনন্দ এমন কোনো ঘটনার সঙ্গে জড়িত নয়, যা শুধু অতীতে ঘটেছিল। বরং ঈদ সেই কাজগুলোর সঙ্গে সম্পর্কিত, যা মুসলমানরা নিজেরা প্রতি বছর পালন করে।
এর মাধ্যমে আমাদের শেখানো হয়—আনন্দ করার অধিকার তখনই আসে, যখন আমরা নিজেরা নেক কাজ করি। শুধু পূর্বপুরুষদের গৌরবের কথা মনে করে আনন্দ করার সুযোগ ইসলামে নেই। মানুষকে নিজের আমল দিয়েই সম্মান অর্জন করতে হয়।
تھے وہ آیا تمھارے ہی، مگر تم کیا ہو؟
ہاتھ پر ہاتھ دھرے منتظر فردا ہو
কাজ তারা করে গেছে, আর তুমি
কেবল আগামীর অপেক্ষায় বসে আছ।
অর্থাৎ, ইসলামে উৎসব আত্মসমালোচনা ও আত্মোন্নয়নের প্রেরণাও দেয়।
২. অযথা অপচয়ের কোনো স্থান নেই
দ্বিতীয়ত, ইসলামে আনন্দের সময় অপচয় পছন্দ করা হয় না। বরং বলা হয়েছে, নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী গরিব ও অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াতে। তাই ঈদুল ফিতরে ফিতরা দেওয়া ফরজ করা হয়েছে। রমজানে যাকাত ও সাদকা দেওয়ার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। আবার ঈদুল আজহায় কুরবানির গোশত গরিবদের দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, এমনকি কুরবানির পশুর চামড়ার টাকাও গরিবদের কাজে লাগানোর কথা বলা হয়েছে।
এর উদ্দেশ্য একটাই—যেন কোনো গরিব মুসলমান ঈদের আনন্দ থেকে বঞ্চিত না হয়। এই কারণেই দেখা যায়, ঈদের দিনে সমাজের সবচেয়ে দরিদ্র পরিবারটিও কিছুটা হলেও ভালো খেতে পারে, ভালো পরতে পারে এবং আনন্দের অংশ হতে পারে।
এটাই ইসলামী উৎসবের আসল সৌন্দর্য। এখানে অযথা অপচয়ের কোনো স্থান নেই; কিন্তু সহমর্মিতা, সাহায্য ও সবার সঙ্গে আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব পেয়েছে।
৩. শৃঙ্খলা, ভদ্রতা আর সৌন্দর্য
ইসলামে ঈদ-আনন্দের আরেকটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো শৃঙ্খলা, ভদ্রতা আর সৌন্দর্য। এখানে কোনো মিছিল নেই, কোনো র্যালি নেই, নেই পটকা, বাজি বা কানফাটা শব্দ। উত্তেজক স্লোগানও নেই। বরং শরিয়তের নির্দেশ অনুযায়ী মুসলমানরা ঈদের সকালে গোসল করে, পরিষ্কার কাপড় পরে, সুগন্ধি ব্যবহার করে শান্তভাবে ঈদগাহের দিকে যায়।
মুখে থাকে নরম কথা—নিজের বড়াই নয়, কারো নিন্দা নয়; শুধু আল্লাহর মহিমা ও প্রশংসা। তারপর সবাই একসঙ্গে দুই রাকাত নামায আদায় করে। নামায শেষে ধনী-গরিব, মালিক-মজুর, শাসক-শাসিত—সবাই একে অন্যকে বুকে জড়িয়ে ধরে। ভালোবাসা আর ভ্রাতৃত্বের এমন পরিবেশ তৈরি হয়, যা পুরো মুসলিম সমাজকে আলোকিত করে। এখানেই ইসলামী ঈদের আসল সৌন্দর্য।
আমরা কি সত্যিই আনন্দ করার যোগ্য হয়েছি?
দুঃখের বিষয় হলো—আজ অনেক সময় আমরা নিজেরাই এই সুন্দর শালীন পদ্ধতি ভুলে যা”িছ। অন্য জাতির অশালীন ও বিশৃঙ্খল উৎসবের অনুকরণ করছি। তাদের কাজকেই আমরা গর্বের সঙ্গে গ্রহণ করছি। এটা সত্যিই ভাবনার বিষয়।
এই দৃষ্টিকোণ থেকে ঈদ আমাদের সামনে একটি প্রশ্ন তুলে ধরে—আমাদের বর্তমান আমল ও চরিত্রের বিচারে আমরা কি সত্যিই আনন্দ করার যোগ্য হয়েছি?
ঈদুল ফিতর আসলে রমজানের এক মাসের আত্মশুদ্ধি ও প্রশিক্ষণের সফল সমাপ্তির পুরস্কার। এজন্যই হাদিসে ঈদের আগের রাতকে বলা হয়েছে ‘লাইলাতুল জাইযা’—অর্থাৎ পুরস্কারের রাত। তাই ঈদের দিন আমাদের শুধু আনন্দের নয়; বরং নিজেকে যাচাই করার দিনও—রমজান আমাদের চরিত্র, ইবাদত ও আচরণে যে শিক্ষা দিয়েছে, আমরা কি সত্যিই তা অর্জন করতে পেরেছি?
আরো কিছু বড় প্রশ্ন
ঈদের এই দিনটি আমাদের কাছে আরো কিছু বড় প্রশ্ন রেখে যায়—
আল্লাহর সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক কি সত্যিই আগের চেয়ে গভীর হয়েছে?
আমরা কি নিজের নফসকে দমন করতে শিখেছি?
ইবাদতে কষ্ট ও পরিশ্রম করার মানসিকতা কি আমাদের ভেতরে তৈরি হয়েছে?
আল্লাহর ভালোবাসার জন্য কি আমরা নিজের খারাপ চাওয়া-পাওয়াগুলো ছাড়তে পেরেছি?
আর যেভাবে ঈদের নামাযে আমরা সবাই এক কাতারে দাঁড়াই, সেভাবে কি দেশ, সমাজ ও উম্মাহর কল্যাণের জন্য একসঙ্গে থাকার কোনো দৃঢ় ই”ছা আমাদের মধ্যে জন্মেছে? কারণ মনে হিংসা, বিদ্বেষ আর ঘৃণা নিয়ে যদি আমরা একে অন্যের সঙ্গে মিলিত হই, তাহলে সেটা কীভাবে ঈদ হয়?
ঈদের দিনেও যদি আমাদের হৃদয় এক না হয়, তাহলে সেই আনন্দই বা কিসের?
যদি আমরা নিজের ভেতরে তাকিয়ে সৎভাবে দেখি এবং এসব প্রশ্নের অন্তত কিছু প্রশ্নের উত্তর ‘হ্যাঁ’ বলতে পারি, তাহলেই সত্যিকার অর্থে আমরা ঈদের শুভে”ছা পাওয়ার যোগ্য। তখনই এই ঈদ আমাদের জন্য বরকতময় হবে এবং আল্লাহর সš‘ষ্টির কারণ হবে।
কারণ ঈদ আল্লাহর এক বিশেষ অনুগ্রহ। আল্লাহ তাআলা বলেন
قُلْ بِفَضْلِ اللَّهِ وَبِرَحْمَتِهِ فَبِذَٰلِكَ فَلْيَفْرَحُوا هُوَ خَيْرٌ مِّمَّا يَجْمَعُونَ
তোমরা আল্লাহর দয়া ও রহমতের জন্যই আনন্দ করো; এটা দুনিয়ার সব সম্পদের চেয়েও উত্তম। [সূরা ইউনুস : ৫৮]
এই কথাই ঈদ আমাদের শেখায়—আল্লাহর সš‘ষ্টিতেই আছে আসল ঈদ, আসল আনন্দ।
কিš‘ যদি নিজের আমল যাচাই করে দেখি যে এসব প্রশ্নের উত্তর ‘না’, তাহলে শুধু বাহ্যিক আনন্দ আমাদের মানায় না। যারা রমজানের সম্মান রক্ষা করেনি, যারা এই পবিত্র সময় আল্লাহকে ভুলে গুনাহে ডুবে কাটিয়েছে—তাদের জন্য ঈদ আনন্দের নয়, বরং শিক্ষা নেওয়ার সময়।
তাই আজ সবচেয়ে বেশি দরকার—ঈদের দিনে নিজের হিসাব নিজে নেওয়া।
ঈদের দিনের সুন্নাতসমূহ
সম্মানিত উপস্থিতি! এ পর্যায়ে ঈদের দিনের সুন্নাতসমূহ আপনাদের সামনে শুনিয়ে দিচ্ছি—
১. মিসওয়াক করা
ইবনুল মুসাইয়াব রহ. বলেন
السِّوَاكُ فِي يَوْمِ الْعِيدِ سُنَّةٌ
ঈদের দিন মিসওয়াক করা সুন্নাত। [মুসান্নাফ আব্দুর রাজ্জাক ৩/৩০৮]
২. গোসল করা
নাফি রহ. বলেন
أَنَّ عَبْدَ اللَّهِ بْنَ عُمَرَ كَانَ يَغْتَسِلُ يَوْمَ الْفِطْرِ قَبْلَ أَنْ يَغْدُوَ إِلَى الْمُصَلَّى
ইবনু উমর রাযি. থেকে বর্ণিত যে, তিনি ঈদুল ফিতরের দিন ঈদগাহে যাওয়ার পূর্বে গোসল করতেন। [মুয়াত্তা ইমাম মালেক : ৬০৯]
৩. শরীয়তসম্মত সাজসজ্জা করা
জাবের রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবীজি ﷺ-এর এমন একটি জুব্বা ছিল যেটা তিনি দুই ঈদের সময় ও জুমার দিন পরতেন। [সহীহ ইবনে খুযাইমা : ১৭৬৫]
৪. সামর্থ অনুপাতে উত্তম পোশাক পরিধান করা
ইমাম বায়হাকী সহিহ সনদে বর্ণনা করেন যে, ইবনে উমর রাযি. ঈদের জন্য তার সবচেয়ে সুন্দর পোশাকটি পরতেন। [বায়হাকী : ১৯০১]
৫. সুগন্ধি ব্যবহার করা।
৬. ঈদুল ফিতরে ঈদগাহে যাবার আগে মিষ্টিজাতীয় যেমন খেজুর ইত্যাদি খাওয়া
তবে ঈদুল আযহাতে কিছু না খেয়ে ঈদের নামাযের পর নিজের কুরবানীর গোশত আহার করা উত্তম।
বুরাইদা রাযি. থেকে বর্ণিত, নবী করীম ﷺ ঈদুল ফিতরের দিনে না খেয়ে বের হতেন না, আর ঈদুল আজহার দিনে ঈদের নামাজের পূর্বে খেতেন না। সালাত থেকে ফিরে এসে কুরবানীর গোশত খেতেন। [মুস্তাদরাকে হাকেম : ৭৫৬০]
৭. সকাল সকাল ঈদগাহে যাওয়া
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন
إِنَّ أَوَّلَ مَا نَبْدَأُ بِهِ فِي يَوْمِنَا هَذَا أَنْ نُصَلِّيَ، ثُمَّ نَرْجِعَ فَنَنْحَرَ، مَنْ فَعَلَهُ فَقَدْ أَصَابَ سُنَّتَنَا
আমাদের এ দিনে আমরা সর্ব প্রথম যে কাজটি করবো তা হল (ঈদের) নামায আদায় করবো। এরপর ফিরে এসে আমরা কুরবানী করবো। যে ব্যাক্তি এভাবে তা আদায় করল সে আমাদের নীতি অনুসরণ করল। [মুসনাদ আহমদ : ১৪২২]
৮. ঈদুল ফিতরে ঈদগাতে যাওয়ার পূর্বে সদকায়ে ফিতর আদায় করা
ইবনু উমর রাযি. থেকে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ ﷺ লোকদেরকে ঈদের নামাযের উদ্দেশ্যে বের হওয়ার পূর্বেই সাদকাতুল ফিতর আদায় করার নির্দেশ দেন। [সহীহ বুখারী : ৫১৪৭]
৯. পায়ে হেঁটে ঈদগাহে যাওয়া
আলী রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, সুন্নাত হলো—ঈদগাহে পায়ে হেঁটে যাওয়া।
১০. ঈদের নামায ঈদগাহে আদায় করা, বিনা অপরাগতায় মসজিদে আদায় না করা
১১. যে রাস্তায় ঈদগাতে যাবে, সম্ভব হলে ফিরার সময় অন্য রাস্তা দিয়ে ফিরা
১২. ঈদের দিনে তাকবীর দেওয়া
এটি ঈদের দিনের মহান সুন্নাত। ঈদুল ফিতরের তাকবীর দেওয়ার সময় হ”েছ, ঈদের রাত থেকে শুরু করে ঈদের নামাযের ইমাম হাযির হওয়া পর্যন্ত।
তাকবীর দেওয়ার পদ্ধতি
মুসান্নাফ ইবনে আবি শাইবাতে সহিহ সনদে ইবন মাসউদ রাযি. থেকে উদ্ধ...ত হয়েছে যে, তিনি তাশরিকের দিনগুলোতে এভাবে তাকবীর দিতেন
اللَّهُ أَكْبَرُ، اللَّهُ أَكْبَرُ، لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ، وَاللَّهُ أَكْبَرُ، اللَّهُ أَكْبَرُ، وَلِلَّهِ الْحَمْدُ
[আল্লাহ মহান, আল্লাহ মহান। আল্লাহ্ ছাড়া সত্য কোন উপাস্য নেই। আল্লাহ্ মহান, আল্লাহ্ মহান। সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য।]
১৩. শুভেচ্ছা বিনিময় করা
ঈদের শিষ্টাচারের মধ্যে রয়েছে পরস্পরের মাঝে উত্তম পদ্ধতিতে শুভে”ছা বিনিময় করা। সে শুভে”ছার ভাষা যে ধরণেরই হোক না কেন। যেমন কেউ কেউ বলেন
تَقَبَّلَ اللَّهُ مِنَّا وَمِنْكُمْ صَالِحَ الْأَعْمَالِ
[আল্লাহ্ আমাদের ও আপনাদের নেক আমলগুলো কবুল করে নিন।]
কিংবা عيد مبارك (ঈদ মোবারক) কিংবা এ ধরণের অন্য যে কোনো বৈধ ভাষায়।
জুবাইর ইবন নুফাইর থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, ঈদের দিন নবীজি ﷺ-এর সাহাবীবর্গ যখন একে অপরের সাথে সাক্ষাত করতেন তখন বলতেন
تُقُبِّلَ مِنَّا وَمِنْكَ
[আমাদের আমল ও আপনার আমল কবুল হোক।] [আল-ফাতহ : ২/৪৪৬]
আল্লাহ তাআলা যেন আমাদের সবাইকে প্রকৃত অর্থে ঈদের আনন্দ দান করেন, তাঁর অসংখ্য নিয়ামতের কদর করার তাওফিক দেন, আমাদের মধ্যে ঐক্য, ভালোবাসা ও একে অপরের জন্য ত্যাগের মানসিকতা তৈরি করেন। শরিয়তের সীমার ভেতরে থেকে যেন আমরা ঈদের আনন্দ উপভোগ করতে পারি। আমীন।
وَاخِرُ دَعْوَانَا أَنِ الْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِين
মন্তব্য (...)
এ সম্পর্কিত আরও প্রবন্ধ
‘দানে ধন বাড়ে’
‘ দানে ধন বাড়ে ’, ‘ দান করে কেউ দরিদ্র হয় না ’- আমাদের সমাজে এসব কথা খুবই পরিচিত। ধার্মিক - অধার্ম...
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন