প্রবন্ধ
নাস্তিকতা প্রসঙ্গে কিছু সিগনিফিকেন্ট পয়েন্ট
২০ জানুয়ারী, ২০২৬
৭৩৭৮
০
নাস্তিকরা—অর্থাৎ যারা সৃষ্টিকর্তাকে মানে না—যখন আল্লাহর অস্তিত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলে, তখন তারা বিজ্ঞানকে ঢাল বানিয়ে কথা বলে। কিš‘ তাদের যুক্তির শুরুতেই একটি বড় দুর্বলতা আছে—এটা যদি ধরতে পারেন, পুরো আলোচনা সহজ হয়ে যায়।
যদি কেউ আপনাকে বলে আল্লাহ নেই, তখন আপনি সিম্পলি জিজ্ঞেস করুন—এই মহা বিশ্ব কীভাবে তৈরি হলো?
দেখবেন, তাদের প্রায় সবাই উত্তর দেবে—মহাবিশ্বে শুরুতে পদার্থ (matter) ছিল, তারপর আকস্মিক এক মহা-বিস্ফোরণ হয়, যা Big Bang নামে পরিচিত। সেখান থেকেই সব সৃষ্টি হয়েছে। তখনই মূল প্রশ্ন করুন—তুমি কেন অনুমান করে বলছ যে ‘পদার্থ’ ছিল? এই অনুমানের প্রমাণ কোথায়? এখানে তারা একদম চুপ হয়ে যাবে। কারণ বিগ ব্যাংয়ের আগে কী ছিল—এই প্রশ্নের কোনো সায়েন্টিফিক জবাব নেই। সায়েন্স নিজেই বলে—We don't know.
যদি কেউ আপনাকে বলে আল্লাহ নেই, তখন আপনি সিম্পলি জিজ্ঞেস করুন—এই মহা বিশ্ব কীভাবে তৈরি হলো?
দেখবেন, তাদের প্রায় সবাই উত্তর দেবে—মহাবিশ্বে শুরুতে পদার্থ (matter) ছিল, তারপর আকস্মিক এক মহা-বিস্ফোরণ হয়, যা Big Bang নামে পরিচিত। সেখান থেকেই সব সৃষ্টি হয়েছে। তখনই মূল প্রশ্ন করুন—তুমি কেন অনুমান করে বলছ যে ‘পদার্থ’ ছিল? এই অনুমানের প্রমাণ কোথায়? এখানে তারা একদম চুপ হয়ে যাবে। কারণ বিগ ব্যাংয়ের আগে কী ছিল—এই প্রশ্নের কোনো সায়েন্টিফিক জবাব নেই। সায়েন্স নিজেই বলে—We don't know.
اَلْحَمْدُ لِلّهِ وَكَفَى وَسَلَامٌ عَلَى عِبَادِهِ الَّذِيْن َاصْطَفَى اَمَّا بَعْدُ! فَاَعُوْذُ بِاللهِ مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّجِيْمِ. بِسْمِ اللهِ الرَّحْمنِ الرَّحِيْمِ. أَفِي اللَّهِ شَكٌّ فَاطِرِ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ
بَارَكَ اللهُ لِيْ وَلَكُمْ فِي الْقُرْآنِ الْعَظِيْمِ، وَنَفَعَنِيْ وَإِيَّاكُمْ بِمَا فِيْهِ مِنَ اْلآيَاتِ وَالذِّكْرِ الْحَكِيْمِ. وجَعَلَنِيْ إِيَّاكُمْ مِنَ الصَّالِحِينَ.
أَقُوْلُ قَوْلِيْ هَذَا أَسْتَغْفِرُ اللهَ لِيْ وَلَكُمْ وَلِسَائِرِ الْمُسْلِمِيْنَ. فَاسْتَغْفِرُوْهُ، إِنَّهُ هُوَ الْغَفُوْرُ الرَّحِيْمُ.اَللَّهُمَّ صَلِّ عَلَى سَيِّدِنَا مُحَمَّدٍ وَّعَلَى آلِ سَيِّدِنَا مُحَمَّدٍ وَّبَارِكْ وَسَلِّمْ.
হামদ ও সালাতের পর!
তারা বলে—শুরুতে পদার্থ ছিল। তাদের এ দাবীর কোনো প্রমাণ নেই। শুধু অনুমান। আমরা বলি—শুরুতে আল্লাহ ছিলেন এবং তিনি সৃষ্টি করেছেন।
তারা জিজ্ঞেস করে—আল্লাহকে কেন মানবে? তাহলে আপনি জিজ্ঞেস করুন—তোমরা যে পদার্থ ছিল—এটা কেন মানো? প্রমাণ কোথায়?
তাদের কথিত পদার্থ—অন্ধ, বধির, জড়, মৃত, বুদ্ধিহীন। আমাদের আল্লাহ—সর্বশক্তিমান, দেখেন, শোনেন, জ্ঞানী, পরিকল্পনাকারী, জীবনদাতা।
এক কথায়, নাস্তিকেরা শুরুতেই ভিত্তিহীন অনুমান করে নেয়—‘পদার্থ ছিল।’ আর সে জায়গাটাই তাদের দুর্বলতম অংশ। আপনি যদি শুরুতেই এ পয়েন্টটা ধরতে পারেন, তাহলে তারা পরের কোনো যুক্তিতে দাঁড়াতে পারবে না।
আল্লাহ তাআলা বলেন
অন্যত্র বলেন
ইমাম আবু হানিফা রহ.
দুনিয়ার ইতিহাসে এমন কিছু ঘটনা আছে, যা ঈমানকে শক্ত করে, বুদ্ধিকে আলো দেয়, আর অন্তরে তাওহীদের সজীবতা ফিরিয়ে আনে। এমনই একটি ঘটনা শুনুন—
ঘটনাটি খলিফা হারুনুর রশীদের দরবারের। এক দিন এক নাস্তিক গর্বভরে খলিফার দরবারে এসে দাঁড়াল। তার চোখে অহংকার, কণ্ঠে চ্যালেঞ্জ। সে বলল, ‘হে আমীরুল মুমিনীন! আপনাদের আলেমরা বলে—এ পৃথিবীর একজন স্রষ্টা আছে। আজ আমি আপনাদের শ্রেষ্ঠ আলেমকে পরাস্ত করে প্রমাণ করব—এই মহাবিশ্বের কোনো স্রষ্টা নেই।’
দরবার নিস্তব্ধ। খলিফা ইমাম আবু হানিফা রহ.-কে ডেকে পাঠালেন। ইমাম বললেন, ‘আমি যোহরের পর আসব।’
যোহরের পর যখন ইমাম দরবারে এলেন—দেখলেন চারদিক ভরা লোক, উঁচু আসনে খলিফা, এবং মাঝখানে দাঁড়িয়ে সেই নাস্তিক।
নাস্তিক প্রশ্ন করল, ‘হে আবু হানিফা! দেরি করলে কেন? ভয় পেয়েছিলে নাকি?’
ইমাম বললেন, ‘না, ভয় পাইনি। পথেই এক অদ্ভুত ঘটনা ঘটেছে। আমার বাড়ি দজলা নদীর ওপারে। নদীর তীরে এসে দেখি একটি পুরনো ভাঙা নৌকা পড়েছিল। তক্তা আলাদা, দড়ি ছিঁড়ে গেছে। আমি তাকিয়ে আছি—হঠাৎ দেখি সেই তক্তাগুলো নিজেরাই নড়তে লাগল! একটার সঙ্গে আরেকটা লেগে গেল! আর কিছুক্ষণের মধ্যেই পুরনো নৌকাটি একেবারে ঠিক হয়ে গেল! কেউ বানালো না, কোনো নৌকারিগর নেই, কেউ হাতও দেয়নি—তবুও নৌকা তৈরি হয়ে গেল! আমি তাতে উঠে নদী পার হয়ে এখানে এসেছি।’
এই কথা শুনে দরবারে হাসির রোল পড়ে গেল। নাস্তিক লোকটি তো হো হো করে হাসতে লাগল। সে বলল, ‘লোকেরা দেখো! তোমাদের যুগের বড় আলেম নাকি বলে—ভাঙা নৌকা নিজে নিজে তৈরি হয়ে যায়! এর চেয়ে মিথ্যে কথা আছে?’
ইমাম আবু হানিফা রহ. তখন গম্ভীর কণ্ঠে বললেন, ‘হে নাস্তিক! যদি একটি নৌকা নিজে নিজে তৈরি হতে পারে—এই কথাটাকে তুমি মিথ্যে বলছ—তাহলে বলো, আকাশের তারা, সূর্য-চন্দ্র, পাহাড়, নদী, বাতাস, মানুষের মস্তিষ্ক, এই দুর্দান্ত ব্যব¯’াপনা—এসব কীভাবে নিজে নিজে তৈরি হলো? নৌকা নিজে নিজে হয় না—এ কথা তুমি মানো। তাহলে মহাবিশ্ব নিজে নিজে হলো—এ কথা কীভাবে মানো!’
নাস্তিক এক বাক্যও বলতে পারল না। তার মুখ শুকিয়ে গেল। তার যুক্তি ভেঙে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গেল।
দরবারের সিংহাসন থেকে হারুনুর রশীদ বললেন, যে ব্যক্তি সত্যকে অস্বীকার করে, মানুষকে বিপথে ডাকে—তার ¯’ান এই দেশে নেই। নাস্তিক শাস্তি পেল।
সম্মানিত উপস্থিতি! আজকের আলোচনার শুরুতেই আমি আপনাদের হৃদয়ে একটি অত্যন্ত সূক্ষ্ম কিন্তু শক্তিশালী সত্য পৌঁছে দিতে চাই। আর তা হলো—সন্দেহ থেকে নিজেকে বাঁচানো।
দেখুন, ঈমানের সবচেয়ে কোমল জায়গা হলো বিশ্বাস—আর সবচেয়ে বড় শত্রু হলো সন্দেহ।
অথচ আমাদের তরুণ প্রজন্মকে বিজ্ঞান ও দর্শনের নামে এমন কিছু ধারণা শেখানো হচ্ছে, যা তাদের মনকে ধর্ম নিয়ে সংশয়ে ফেলে দেয়।
সংশয়—এটা ঈমানের শত্রু
সংশয় বা সন্দেহ—এটা যেহেতু ঈমানের শত্রু, তাই কুরআন মজিদের শুরুতেই আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেছেন
অর্থাৎ আল্লাহ তাআলা প্রথমেই ‘সন্দেহের দরজা’ বন্ধ করে দিয়েছেন। তারপর বলেছেন
যার হৃদয়ে সন্দেহের দানা বাঁধে, সে কখনোই আল্লাহর সত্যিকারের পরিচয় পায় না। তাহলে সে কীভাবে আল্লাহর সামনে বিনম্র হয়ে দাঁড়াবে? কীভাবে ইবাদতে মনোযোগী হবে?
দেখুন, ঈমানের সবচেয়ে কোমল জায়গা হলো বিশ্বাস—আর সবচেয়ে বড় শত্রু হলো সন্দেহ।
অথচ আমাদের তরুণ প্রজন্মকে বিজ্ঞান ও দর্শনের নামে এমন কিছু ধারণা শেখানো হচ্ছে, যা তাদের মনকে ধর্ম নিয়ে সংশয়ে ফেলে দেয়।
সংশয়—এটা ঈমানের শত্রু
সংশয় বা সন্দেহ—এটা যেহেতু ঈমানের শত্রু, তাই কুরআন মজিদের শুরুতেই আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেছেন
ذٰلِكَ الْكِتَابُ لَا رَيْبَ فِيهِ
এ সেই কিতাব—যাতে কোনো সন্দেহের স্থান নেই।অর্থাৎ আল্লাহ তাআলা প্রথমেই ‘সন্দেহের দরজা’ বন্ধ করে দিয়েছেন। তারপর বলেছেন
هُدًى لِّلْمُتَّقِينَ
এ কিতাব পথ দেখায় তাকওয়াবানদের। [সূরা বাকারা : ২]যার হৃদয়ে সন্দেহের দানা বাঁধে, সে কখনোই আল্লাহর সত্যিকারের পরিচয় পায় না। তাহলে সে কীভাবে আল্লাহর সামনে বিনম্র হয়ে দাঁড়াবে? কীভাবে ইবাদতে মনোযোগী হবে?
নাস্তিকদের তৈরি প্রশ্ন
আজ যারা নিজেদের ‘অতি শিক্ষিত’ বলে দাবি করে, অথচ আল্লাহ তাআলাকে অস্বীকার করে—তাদের তৈরি কিছু প্রশ্ন তরুণদের মনে ভূমিকম্প সৃষ্টি করে।
আজকের তরুণ প্রজন্মের দীনি জ্ঞান কম, ঈমান দুর্বল। যার কারণে এসব প্রশ্নে তারা বিভ্রান্ত হয়। সংশয়, ভয়, অস্থিরতায় বিপর্যস্ত হয়। তাই রাসূলুল্লাহ ﷺ আমাদের শিখিয়েছেন—শিরকের আগে সন্দেহ থেকে আশ্রয় চাইতে
আজ যারা নিজেদের ‘অতি শিক্ষিত’ বলে দাবি করে, অথচ আল্লাহ তাআলাকে অস্বীকার করে—তাদের তৈরি কিছু প্রশ্ন তরুণদের মনে ভূমিকম্প সৃষ্টি করে।
আজকের তরুণ প্রজন্মের দীনি জ্ঞান কম, ঈমান দুর্বল। যার কারণে এসব প্রশ্নে তারা বিভ্রান্ত হয়। সংশয়, ভয়, অস্থিরতায় বিপর্যস্ত হয়। তাই রাসূলুল্লাহ ﷺ আমাদের শিখিয়েছেন—শিরকের আগে সন্দেহ থেকে আশ্রয় চাইতে
اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنَ الشَّكِّ وَالشِّرْكِ وَالنِّفَاقِ وَالشِّقَاقِ وَسُوءِ الْأَخْلَاقِ
হে আল্লাহ! আমি তোমার কাছে আশ্রয় চাই—সন্দেহ থেকে, শিরক থেকে, মুনাফিকি থেকে, বিবাদ-বিভক্তি থেকে এবং নিকৃষ্ট চরিত্র থেকে। [ইতহাফুস সাদাতিল মুত্তাকীন : ৪/৩৪৮]কারণ সন্দেহ যদি ঢুকে যায়, শয়তান আর কোনো দরজা খুঁজে বেড়ায় না—এই এক দরজাই যথেষ্ট হয়ে যায় ঈমান নষ্ট করার জন্য।
নাস্তিকদের প্রশ্নের জবাব দেওয়ার সহজ উপায়
প্রিয় ভাইয়েরা! নাস্তিকরা—অর্থাৎ যারা সৃষ্টিকর্তাকে মানে না—যখন আল্লাহর অস্তিত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলে, তখন তারা বিজ্ঞানকে ঢাল বানিয়ে কথা বলে। কিন্তু তাদের যুক্তির শুরুতেই একটি বড় দুর্বলতা আছে—এটা যদি ধরতে পারেন, পুরো আলোচনা সহজ হয়ে যায়।
যদি কেউ আপনাকে বলে আল্লাহ নেই, তখন আপনি সিম্পলি জিজ্ঞেস করুন—এই মহা বিশ্ব কীভাবে তৈরি হলো?
দেখবেন, তাদের প্রায় সবাই উত্তর দেবে—মহাবিশ্বে শুরুতে পদার্থ (matter) ছিল, তারপর আকস্মিক এক মহা-বিস্ফোরণ হয়, যা Big Bang নামে পরিচিত। সেখান থেকেই সব সৃষ্টি হয়েছে।
তখনই মূল প্রশ্ন করুন—তুমি কেন অনুমান করে বলছ যে ‘পদার্থ’ ছিল? এই অনুমানের প্রমাণ কোথায়?
এখানে তারা একদম চুপ হয়ে যাবে। কারণ বিগ ব্যাংয়ের আগে কী ছিল—এই প্রশ্নের কোনো সায়েন্টিফিক জবাব নেই। সায়েন্স নিজেই বলে—We don't know.
তাদের দাবীর কোনো প্রমাণ নেইপ্রিয় ভাইয়েরা! নাস্তিকরা—অর্থাৎ যারা সৃষ্টিকর্তাকে মানে না—যখন আল্লাহর অস্তিত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলে, তখন তারা বিজ্ঞানকে ঢাল বানিয়ে কথা বলে। কিন্তু তাদের যুক্তির শুরুতেই একটি বড় দুর্বলতা আছে—এটা যদি ধরতে পারেন, পুরো আলোচনা সহজ হয়ে যায়।
যদি কেউ আপনাকে বলে আল্লাহ নেই, তখন আপনি সিম্পলি জিজ্ঞেস করুন—এই মহা বিশ্ব কীভাবে তৈরি হলো?
দেখবেন, তাদের প্রায় সবাই উত্তর দেবে—মহাবিশ্বে শুরুতে পদার্থ (matter) ছিল, তারপর আকস্মিক এক মহা-বিস্ফোরণ হয়, যা Big Bang নামে পরিচিত। সেখান থেকেই সব সৃষ্টি হয়েছে।
তখনই মূল প্রশ্ন করুন—তুমি কেন অনুমান করে বলছ যে ‘পদার্থ’ ছিল? এই অনুমানের প্রমাণ কোথায়?
এখানে তারা একদম চুপ হয়ে যাবে। কারণ বিগ ব্যাংয়ের আগে কী ছিল—এই প্রশ্নের কোনো সায়েন্টিফিক জবাব নেই। সায়েন্স নিজেই বলে—We don't know.
তারা বলে—শুরুতে পদার্থ ছিল। তাদের এ দাবীর কোনো প্রমাণ নেই। শুধু অনুমান। আমরা বলি—শুরুতে আল্লাহ ছিলেন এবং তিনি সৃষ্টি করেছেন।
তারা জিজ্ঞেস করে—আল্লাহকে কেন মানবে? তাহলে আপনি জিজ্ঞেস করুন—তোমরা যে পদার্থ ছিল—এটা কেন মানো? প্রমাণ কোথায়?
তাদের কথিত পদার্থ—অন্ধ, বধির, জড়, মৃত, বুদ্ধিহীন। আমাদের আল্লাহ—সর্বশক্তিমান, দেখেন, শোনেন, জ্ঞানী, পরিকল্পনাকারী, জীবনদাতা।
এক কথায়, নাস্তিকেরা শুরুতেই ভিত্তিহীন অনুমান করে নেয়—‘পদার্থ ছিল।’ আর সে জায়গাটাই তাদের দুর্বলতম অংশ। আপনি যদি শুরুতেই এ পয়েন্টটা ধরতে পারেন, তাহলে তারা পরের কোনো যুক্তিতে দাঁড়াতে পারবে না।
আল্লাহ তাআলা বলেন
أَفِي اللَّهِ شَكٌّ فَاطِرِ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ
আকাশ ও জমিনের সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর ব্যাপারে কি তোমাদের সন্দেহ থাকতে পারে? [সূরা ইবরাহীম : ১০]অন্যত্র বলেন
وَ مَا لَهُمۡ بِذٰلِكَ مِنۡ عِلۡمٍ ۚ اِنۡ هُمۡ اِلَّا یَظُنُّوۡنَ
আসলে এ ব্যাপারে তাদের কোনো জ্ঞানই নেই। তারা শুধু ধারণা করে। [সূরা জাসিয়া : ২৪]ইমাম আবু হানিফা রহ.
দুনিয়ার ইতিহাসে এমন কিছু ঘটনা আছে, যা ঈমানকে শক্ত করে, বুদ্ধিকে আলো দেয়, আর অন্তরে তাওহীদের সজীবতা ফিরিয়ে আনে। এমনই একটি ঘটনা শুনুন—
ঘটনাটি খলিফা হারুনুর রশীদের দরবারের। এক দিন এক নাস্তিক গর্বভরে খলিফার দরবারে এসে দাঁড়াল। তার চোখে অহংকার, কণ্ঠে চ্যালেঞ্জ। সে বলল, ‘হে আমীরুল মুমিনীন! আপনাদের আলেমরা বলে—এ পৃথিবীর একজন স্রষ্টা আছে। আজ আমি আপনাদের শ্রেষ্ঠ আলেমকে পরাস্ত করে প্রমাণ করব—এই মহাবিশ্বের কোনো স্রষ্টা নেই।’
দরবার নিস্তব্ধ। খলিফা ইমাম আবু হানিফা রহ.-কে ডেকে পাঠালেন। ইমাম বললেন, ‘আমি যোহরের পর আসব।’
যোহরের পর যখন ইমাম দরবারে এলেন—দেখলেন চারদিক ভরা লোক, উঁচু আসনে খলিফা, এবং মাঝখানে দাঁড়িয়ে সেই নাস্তিক।
নাস্তিক প্রশ্ন করল, ‘হে আবু হানিফা! দেরি করলে কেন? ভয় পেয়েছিলে নাকি?’
ইমাম বললেন, ‘না, ভয় পাইনি। পথেই এক অদ্ভুত ঘটনা ঘটেছে। আমার বাড়ি দজলা নদীর ওপারে। নদীর তীরে এসে দেখি একটি পুরনো ভাঙা নৌকা পড়েছিল। তক্তা আলাদা, দড়ি ছিঁড়ে গেছে। আমি তাকিয়ে আছি—হঠাৎ দেখি সেই তক্তাগুলো নিজেরাই নড়তে লাগল! একটার সঙ্গে আরেকটা লেগে গেল! আর কিছুক্ষণের মধ্যেই পুরনো নৌকাটি একেবারে ঠিক হয়ে গেল! কেউ বানালো না, কোনো নৌকারিগর নেই, কেউ হাতও দেয়নি—তবুও নৌকা তৈরি হয়ে গেল! আমি তাতে উঠে নদী পার হয়ে এখানে এসেছি।’
এই কথা শুনে দরবারে হাসির রোল পড়ে গেল। নাস্তিক লোকটি তো হো হো করে হাসতে লাগল। সে বলল, ‘লোকেরা দেখো! তোমাদের যুগের বড় আলেম নাকি বলে—ভাঙা নৌকা নিজে নিজে তৈরি হয়ে যায়! এর চেয়ে মিথ্যে কথা আছে?’
ইমাম আবু হানিফা রহ. তখন গম্ভীর কণ্ঠে বললেন, ‘হে নাস্তিক! যদি একটি নৌকা নিজে নিজে তৈরি হতে পারে—এই কথাটাকে তুমি মিথ্যে বলছ—তাহলে বলো, আকাশের তারা, সূর্য-চন্দ্র, পাহাড়, নদী, বাতাস, মানুষের মস্তিষ্ক, এই দুর্দান্ত ব্যব¯’াপনা—এসব কীভাবে নিজে নিজে তৈরি হলো? নৌকা নিজে নিজে হয় না—এ কথা তুমি মানো। তাহলে মহাবিশ্ব নিজে নিজে হলো—এ কথা কীভাবে মানো!’
নাস্তিক এক বাক্যও বলতে পারল না। তার মুখ শুকিয়ে গেল। তার যুক্তি ভেঙে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গেল।
দরবারের সিংহাসন থেকে হারুনুর রশীদ বললেন, যে ব্যক্তি সত্যকে অস্বীকার করে, মানুষকে বিপথে ডাকে—তার ¯’ান এই দেশে নেই। নাস্তিক শাস্তি পেল।
আল্লাহ আছে? দেখাও কোথায়!
নাস্তিকরা বারবার একটি কথাই বলে—আমরা তো চোখে দেখে বিশ্বাস করি। আল্লাহ আছে? দেখাও কোথায়! কেমন দেখতে? রঙ কেমন? আমরা না দেখে মানব না!
আমাদের অনেক তরুণ এই কথায় দ্বিধায় পড়ে যায়। কিন্তু আসল সত্য হলো—যারা বলে ‘আমরা শুধু দেখে বিশ্বাস করি’—তারা নিজেরাই হাজার জিনিস না দেখে বিশ্বাস করে!
তাই তাদের খুব সহজ একটা প্রশ্ন করুন, ‘তুমি কি বেঁচে আছো?’
সে বলবে, ‘হ্যাঁ, বেঁচে আছি।’
— তোমার বেঁচে থাকার কারণ কী?
নিশ্চয় সে বলবে, ‘আমার শরীরে রুহ আছে, তাই বেঁচে আছি।’
এবার তাকে বলুন, ‘ভালো, তাহলে আমাকে রুহটা দেখাও তো! কোথায় আছে? কেমন দেখতে? কোন রঙ? কোন আকার?’
প্রিয় ভাইয়েরা, একজন জীবিত মানুষ আর একজন মৃত মানুষকে পাশাপাশি রাখলে দু’জনকেই একই রকম মনে হয়। কিন্তু একজনের শরীরে রুহ আছে, আরেকজনের নেই। এই রুহ—
— চোখে দেখা যায় না,
— হাতে ধরা যায় না,
— কোনো রঙ নেই,
— কোনো আকৃতি নেই।
তবুও পৃথিবীর সবাই বিশ্বাস করে—রুহ আছে। কেন? কারণ তার প্রভাব ‘জীবন’ স্পষ্টভাবে দেখা যায়।
যদি একটা ক্ষুদ্র রুহকে সবাই না দেখে বিশ্বাস করে, তাহলে কিভাবে অসীম শক্তির মালিক, মহাবিশ্বের স্রষ্টা আল্লাহকে না-দেখে বিশ্বাস করাটা অস্বাভাবিক হয়?
একজন মানুষ বলে—আমার খুব ব্যথা হচ্ছে। বলুন তো এই ব্যথা কেউ দেখেছে? ব্যথা কি ছোট? বড়? লম্বা? মোটা? কোন রঙ? কেউ কি ব্যথাকে হেঁটে যেতে বা আসতে দেখেছে? না!
তবুও সবাই মানে—ব্যথা আছে। কারণ শরীর তার প্রভাব অনুভব করে।
অনুরূপভাবে আল্লাহকে চোখে দেখা না গেলেও হৃদয় তাঁর অস্তিত্ব অনুভব করে। ব্যথা অদৃশ্য—তবুও সত্যি। আল্লাহ অদৃশ্য—তবুও সবচেয়ে সত্য।
সব সত্য দেখা যায় না
সত্য এই যে—দুনিয়ার সব সত্য জিনিস চোখে দেখা যায় না। যেমন
হাওয়া দেখা যায় না—তবুও আছে।
ভালবাসা দেখা যায় না—তবুও অনুভব করি।
রুহ দেখা যায় না—তবুও মানি।
ব্যথা দেখা যায় না—তবুও অস্বীকার করি না।
তাহলে আল্লাহকে না-দেখা নিয়ে কেন এত প্রশ্ন?
শহীদ হাসানুল বান্না রহ.
মিশরের শহীদ হাসানুল বান্না রহ. তখন পঞ্চম শ্রেণীর ছাত্র। একজন নাস্তিক শিক্ষক এসে বললেন, ‘তোমরা কি আমাকে দেখ?’
ছাত্ররা বললো, ‘হ্যাঁ।’
শিক্ষক বললেন, ‘এর অর্থ হলো, আমি অস্তিত্বমান। এবার বলো, তোমরা কি আল্লাহকে দেখ?’
ছাত্ররা বললো, ‘না।’
শিক্ষক বললেন, ‘এর অর্থ হলো আল্লাহর কোনো অস্তিত্ব নেই।’
ছোট্ট বালক হাসানুল বান্না বললেন, ‘উস্তাদ! অনুমতি দিলে আমি আমার সহপাঠিদেরকে কিছু প্রশ্ন করতাম।’
শিক্ষক বললেন, ‘ঠিক আছে, করো।’
হাসানুল বান্না বললেন, ‘আচ্ছা, বন্ধুরা তোমরা কি আমাদের শিক্ষককে দেখতে পাচ্ছ?’
সবাই বললো, ‘দেখতে পাচ্ছি।’
হাসানুল বান্না বললেন, ‘তার মানে তিনি আছেন। এবার বলো, তোমরা কি আমাদের শিক্ষকের জ্ঞান দেখতে পাচ্ছ?’
সবাই বললো, ‘না।’
হাসানুল বান্না বললেন, ‘এর অর্থ তার জ্ঞান নেই। তিনি একজন উম্মাদ-পাগল।’
তখন শিক্ষক বলেছিলেন, ‘হাসান, আমিতো এভাবে ভাবি নি। তুমি আমার চোখ খুলে দিলে।’
রোম দেশের এক নাস্তিকের কিছু প্রশ্ন
ইমাম আবু হানিফা রহ.-এর আরেকটি ঘটনা মনে পড়ল। রোম দেশের এক নাস্তিক মুসলমানদের শহরে এসে ইসলামের আলেমদের সঙ্গে বিতর্কে বসলো। একে একে অনেক আলেম তার প্রশ্নের সামনে চুপ হয়ে গেলেন। শুধু ইমাম আবু হানিফা রহ.-এর উস্তাদ হাম্মাদ রহ. চেষ্টা করে যাচ্ছিলেন, কিন্তু তিনি আশঙ্কায় ছিলেন—যদি এই নাস্তিক তাকে পরাস্ত করে, তবে মানুষের চোখে ইসলামের মর্যাদা কমে যাবে।
সেদিন রাতে হাম্মাদ রহ. অদ্ভুত একটি স্বপ্ন দেখলেন—একটি ভয়ংকর শূকর একটি গাছের ডালপালা ও পাতাগুলো খেয়ে ফেলেছে। শুধু শিকড়টুকু অবশিষ্ট আছে। হঠাৎ গাছের গোড়া থেকে একটি বাঘশাবক বের হলো এবং সেই শূকরটিকে মেরে ফেলল।
ভোরে ইমাম আবু হানিফা তখনো শিশু বয়সে হলেও চমৎকার বুদ্ধির অধিকারী। তিনি তাঁর উস্তাদ হম্মাদের কাছে এসে দেখলেন—তিনি দুঃখে ভারাক্রান্ত। ইমাম জিজ্ঞেস করলেন, ‘উস্তাদ, আজ এত চিন্তিত কেন?’
হম্মাদ রহ. স্বপ্নের কথা এবং নাস্তিকের বিতর্কের কথা বললেন। ইমাম শুনে বললেন, ‘আলহামদুলিল্লাহ! স্বপ্নের শূকর হলো সেই নাস্তিক। গাছটি হলো ইলম, তার শাখাগুলো অন্যান্য আলেম, আর মূল হলো আপনি। আর গাছ থেকে বের হওয়া সেই বাঘশাবক—সেটি আমি। আল্লাহ তাআলার সাহায্যে আমি তাকে পরাজিত করবো।’
এরপর তারা দু’জনে মঞ্চে গেলেন। মিম্বরে বসে প্রতিপক্ষকে ডাকলেন। তখন ছোট্ট ইমাম আবু হানিফা সামনে আসলেন। নাস্তিক তাকে দেখে অবজ্ঞাভরে হাসল। ইমাম বললেন, ‘হাসা বন্ধ কর, কথা বল।’
নাস্তিক অবাক হয়ে প্রশ্ন করল, ‘যে সত্তার শুরু নেই, শেষ নেই—এমন কিছু কি করে থাকতে পারে?’
ইমাম জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুমি সংখ্যা চেনো?’
নাস্তিক বলল, ‘হ্যাঁ।’
ইমাম আবার বললেন, ‘এক-এর আগে কী আছে?’
নাস্তিক বলল, ‘কিছুই নেই, এক-ই শুরু।’
ইমাম বললেন, ‘যদি তোমার বানানো সংখ্যার জগতে এক-এর আগে কিছু না থাকে, তবে বাস্তবের ‘একক সত্য সত্তা’-র আগে কিছু থাকার কথা কিভাবে কল্পনা করলে!’
নাস্তিক দ্বিতীয় প্রশ্ন করল, ‘আল্লাহ কোন দিকে? সবকিছুই তো কোনো না কোনো দিকের মধ্যে থাকে!’
ইমাম বললেন, ‘একটি বাতি জ্বালালে আলো কোন দিকে যায়?’
সে বলল, ‘সকল দিকে সমানভাবে।’
ইমাম বললেন, ‘যদি সৃষ্ট আলোর কোনো দিক না থাকে, তবে নূর-সমূহের নূর—আল্লাহর দিকে নির্দিষ্ট কোনো দিক নির্ধারণ করতে চাইছ কেন!’
নাস্তিক তৃতীয় প্রশ্ন করল, ‘আল্লাহ কোন জায়গায় আছেন? প্রত্যেক অস্তিত্বেরই তো একটা স্থান লাগে!’
ইমাম কিছু দুধ আনতে বললেন এবং জিজ্ঞেস করলেন, ‘এতে কি মাখন আছে?’
সে বলল, ‘হ্যাঁ।’
— ‘মাখন কোন জায়গায় আছে?’
সে বলল, ‘দুধের ভেতরে সমানভাবে, কোনো নির্দিষ্ট স্থানে নয়।’
ইমাম বললেন, ‘যদি পরিবর্তনশীল একটি জিনিসের ভেতরে এমনভাবে অবস্থান সম্ভব হয়, তবে স্থায়ী ও চিরন্তন সৃষ্টিকর্তাকে স্থান দ্বারা কেন সীমাবদ্ধ করতে চাও!’
শেষে নাস্তিক প্রশ্ন করল, ‘আল্লাহ এখন কী নিয়ে ব্যস্ত?’
ইমাম বললেন, ‘এখন পর্যন্ত তুমি মঞ্চে বসে প্রশ্ন করলে, আর আমি নিচে দাঁড়িয়ে উত্তর দিলাম। এখন তুমি নেমে এসো, আমি উঠি।’
নাস্তিক নেমে এল। ইমাম মিম্বরে উঠে বললেন, ‘যখন মিম্বরে ভুল ধারণার মানুষ থাকে, তাকে নামিয়ে দেওয়া হয়; আর যখন সত্যবাদী ওঠে, তাকে উঁচু করা হয়—এটাই আল্লাহর প্রতিদিনের কাজ।’
নাস্তিক স্তব্ধ হয়ে গেল—তার কোনো জবাব রইল না। মানুষ তাকে ধরে শাস্তি দিল।
তখন সবাই বুঝল—এ শিশু বয়সেই যার এত প্রজ্ঞা, বড় হলে তার মর্যাদা কত উচ্চে পৌঁছবে!
কিছু সত্য ‘দৃষ্টিতে’ ধরা পড়ে না, ‘প্রভাবে’ ধরা পড়ে
মূলত কিছু সত্য আছে এমন যেগুলো ‘দৃষ্টিতে’ ধরা পড়ে না; ‘প্রভাবে’ ধরা পড়ে। যেমন
—রুহ তার প্রভাবে পরিচিত,
—ব্যথা তার প্রভাবে পরিচিত,
আর আল্লাহ তাঁর সৃষ্টির মাধ্যমে পরিচিত। আকাশের অপরিমেয় বিস্তার, পাহাড়ের দৃঢ়তা, মানব মস্তিষ্কের সূক্ষ্ম নিয়ন্ত্রণ, জীবনের প্রতিটি নিঃশ্বাস—সব একসঙ্গে বলে—একজন মহান স্রষ্টা আছেন...এবং তিনি-ই আল্লাহ!
কবি চমৎকার বলেছেন
একজন বেদুঈনকে একবার জিজ্ঞেস করা হলো, ‘আল্লাহর অস্তিত্বের প্রমাণ কী?’
বেদুঈন কোনো দার্শনিক ভাষা ব্যবহার করলেন না। তিনি তাঁর সহজ-সরল চোখে দেখা সত্যটাই বললেন
৭. আকৃতির বৈচিত্র্যে আল্লাহর কুদরতের মাহাত্ম্য
দেখুন, আল্লাহ তাআলা মানুষকে খুব অল্প কিছু অঙ্গ দিয়েই সৃষ্টি করেছেন—দুটি চোখ, একটি নাক, একটি মুখ, দু’টি কান, কপাল—মোটে চার-পাঁচটি উপাদান। তবুও আশ্চর্যের বিষয় হলো, পৃথিবীতে কোটি-কোটি মানুষ থাকা সত্ত্বেও একজনের মুখ আরেকজনের মুখের সঙ্গে কখনোই পুরোপুরি এক হয় না।
আপনি যদি কোনো চিত্রশিল্পীকে বলেন, ‘অনেকগুলো মানুষের ছবি আঁকো,’ তাহলে তিনি প্রথমে হয়তো দশ-পনেরোটি ভিন্ন মুখ আঁকতে পারবেন। কিন্তু পরে তিনি অনিবার্যভাবে একই রকম মুখ আঁকতে শুরু করবেন, কারণ উপাদানগুলো একই—চোখ, নাক, ঠোঁট, কপাল। মানুষের সীমাবদ্ধতা এখানে এসে থেমে যায়।
কিন্তু আল্লাহ তাআলার সৃষ্টি দেখুন—একই অঙ্গপ্রত্যঙ্গ, একই কাঠামো, তবুও প্রতিটি মানুষের চেহারা অন্যসব মানুষের চেহারা থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। এমনকি মানুষের আঙুলের ছাপও—যা এতটাই সূক্ষ্ম—কোটি মানুষের মধ্যেও কারো সঙ্গে কারো মেলেনা। এতো নিখুঁত বৈচিত্র্য কে দিতে পারে?
যদি সত্যিই সবকিছু ‘নিজে নিজেই’ তৈরি হতো, তাহলে সব মুখই এক ধরনের হতো। যেমন একটি মেশিন একই নকশায় বারবার জিনিস তৈরি করে—সবই একই আকৃতির।
কিন্তু যিনি প্রতিটি মানুষের রূপ আলাদা করে দিচ্ছেন, তিনিই আল্লাহ—সকল সৃষ্টির পরম কারিগর।
ডারউইনের বিবর্তনবাদ তত্ত্বের অসারতা
ডারউইনের বিবর্তন তত্ত্ব বলে—সৃষ্টিজগৎ নাকি নিজে নিজেই তৈরি হয়েছে। তারা দাবি করে, প্রথমে পানি ছিল, সেখান থেকে ছোট প্রাণী তৈরি হলো, তারপর ধীরে ধীরে নানা ধাপ পেরিয়ে বানর হলো, আর বানর থেকে মানুষ। কিন্তু এই কথার মধ্যেই বড় বড় অসঙ্গতি আছে।
তারা বলে, ‘এক ধরন থেকে আরেক ধরনে যেতে হাজার হাজার বছর লেগেছে।’ কিন্তু বানর থেকে মানুষ হওয়ার ক্ষেত্রে তারা বলে, ‘এটা খুব অল্প সময়েই হয়ে গেছে’। অথচ মানুষের দেহের সবচেয়ে কঠিন এবং জটিল অংশ হলো তার মস্তিষ্ক। শরীরের অন্যান্য অঙ্গ তৈরি হতেও যেহেতু হাজার হাজার বছর লাগার কথা বলা হয়, তাহলে সবচেয়ে জটিল মস্তিষ্কের ক্ষেত্রে আরও বেশি সময় লাগার কথা। কিন্তু এখানে তারা উল্টো বক্তব্য দেয়—সবচেয়ে কঠিন জিনিস নাকি খুব অল্প সময়েই তৈরি হয়ে গেল! এটাই তাদের বক্তব্যকে দুর্বল করে দেয়।
আরেকটি বিষয় হলো Missing Link। যখন জিজ্ঞাসা করা হয় বানর ও মানুষের মাঝামাঝি যে প্রাণী থাকার কথা—তা কোথায়? তখন তারা বলে, ‘মধ্যবর্তী অংশটি হারিয়ে গেছে’। সেই ‘হারানো প্রজাতি’ ছাড়া এই তত্ত্ব দাঁড়ায়ই না। অথচ সেই ধাপ তারা কখনোই দেখাতে পারেনি।
কুরআন স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে—মানুষ বানর থেকে হয়নি। বরং কিছু অবাধ্য, পাপিষ্ঠ মানুষকে আল্লাহ শাস্তিস্বরূপ বানর বানিয়ে দিয়েছিলেন। যদি মানুষ সত্যিই বানর থেকে তৈরি হতো, তবে কুরআনে কেন বলা হলো ‘আমরা বললাম, হয়ে যাও বানর’? কেন বলা হলো না—মানুষের রূপ হাওয়ার আগেই তারা বানর ছিল? কারণ সত্য একটাই—মানুষের সৃষ্টি আলাদা, আর বানর হওয়া ছিল শাস্তি।
মানুষ ও বানরের মাঝে কোনো কোনো মিল থাকা খুব স্বাভাবিক। কারণ যখন মানুষকে বিকৃত করে বানর করা হয়েছিল, তখন তার আগের স্বভাব বা গঠনের কিছু অংশ তো থাকবেই। কোনো জিনিস বিকৃত হলে আগের রূপের কিছু ছাপ থাকা স্বাভাবিক।
এইভাবে দেখা যায়—ডারউইনের তত্ত্ব নিজেই নিজের মধ্যে ফাঁপা, অসম্পূর্ণ এবং বৈপরীত্যে ভরা। আর কুরআনের বক্তব্য স্পষ্ট, সঙ্গত এবং যুক্তির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
পুরো ব্যবস্থাই তো আল্লাহ তাআলার
আজকাল অনেকে বলে, ‘এখন তো বিজ্ঞান এত উন্নত যে ডাক্তারকে বললে তিনি চাইলে ছেলে-সন্তানই দিয়ে দিতে পারেন।’ ঠিক আছে, ডাক্তার এটা করতে পারে। কিন্তু আসল কথা হলো, এখানে ডাক্তার বা বিজ্ঞানীর নিজের কোনো নতুন শক্তি নেই। তারা শুধু আল্লাহ তাআলা যে নিয়ম তৈরি করে রেখেছেন, সেই নিয়মটাই শিখে নিয়ে ব্যবহার করে।
ছেলে হবে কোন প্রক্রিয়ায়, মেয়ে হবে কোন প্রক্রিয়ায়—এসব পুরো ব্যবস্থাই তো আল্লাহ তাআলার বানানো। বিজ্ঞানীরা শুধু আল্লাহ তাআলার তৈরি সেই সিস্টেমটা স্টাডি করেছে। নিয়ম যখন আল্লাহ তাআলার—তাহলে কৃতিত্ব কার?
মানুষকে সবসময় একটা কথা বলা উচিত—‘তোমরা যদি সত্যিই নিজের ক্ষমতা দেখাতে চাও, তাহলে আল্লাহর নিয়ম বাদ দিয়ে নিজেদের নতুন নিয়ম বানাও। তারপর সেই নিয়মে একটা সন্তান তৈরি করে দেখাও।’
যতক্ষণ পর্যন্ত তারা আল্লাহর নিয়মই ব্যবহার করছে, ততক্ষণ পর্যন্ত সেটা আল্লাহর কৃতিত্বই থাকবে, মানুষের নয়।
দুনিয়ায় মানুষ অনেক বিষয় না দেখেই বিশ্বাস করে। কেউ বলে, ‘আমরা চাঁদে গিয়েছিলাম।’ আমরা কি তাদের সঙ্গে গিয়েছিলাম? না। তবুও খবর শুনে বিশ্বাস করি। তাহলে সৃষ্টিকর্তার দেওয়া বর্ণনাকে বিশ্বাস করতে এত দ্বিধা কেন?
ইসলামের শিক্ষা
ইসলাম মানুষকে চোখ খোলা রাখার শিক্ষা দেয়। চারপাশে তাকাতে বলে, চিন্তা করতে বলে।
আল্লাহ নিজেই বলেছেন
আর বলেছেন
অর্থাৎ আল্লাহ চান—মানুষ প্রকৃতির ভেতরে তাঁর শক্তির নিদর্শনগুলো দেখুক।
সবকিছুতেই প্রমাণ আছে—এগুলো মানুষের তৈরি কোনো নিয়ম নয়; এগুলো আল্লাহর কুদরতের নিখুঁত ব্যবস্থা। [সূরা গাশিয়া : ১৭-২০]
লতার কদু বড় আর গাছের আম ছোট কেন?
একজন মানুষ পথ চলতে চলতে প্রকৃতির দিকে তাকিয়ে নানা রকম চিন্তায় ডুবে ছিল। তার সামনে প্রথমে পড়ল একটি সরু, নরম লতা—যার উপর ঝুলছে বিশাল বিশাল কদু। দূর থেকে দেখলে মনে হয়, এই লতা যেন কষ্ট করে ওজন সামলাচ্ছে। সে থেমে বলল মনে মনে, ‘কী অদ্ভুত! এত পাতলা লতা আর তাতে এত বড় ফল!’
আরও কিছুদূর গেলে দেখল—একটি শক্ত, বিশাল আমগাছ। কিন্তু তার উপর ছোট ছোট আম। তার মনে আবার প্রশ্ন জাগল, ‘মানুষ বলে আল্লাহ আছেন... কিন্তু দেখো তো! কেমন অদ্ভুত আয়োজন! বড় গাছে ছোট ফল, আর ছোট লতায় বড় ফল!’ [নাউযুবিল্লাহ]
এমন চিন্তা করতে করতে সে আমগাছের নিচে শুয়ে পড়ল। গাছের পাতার ভেতর দিয়ে আলো ঝরে পড়ছিল তার মুখে। আর বাতাসের স্পর্শে তার চোখ ভার হয়ে এলো। সে ঘুমিয়ে গেল।
হঠাৎ উপর থেকে এক ছোট আম খুলে এসে তার মাথার পাশে জোরে লাগল। ব্যথায় সে চমকে জেগে উঠল। জেগে ওঠার সাথে সাথেই তার মনে যেন দরজার মতো এক উপলব্ধি খুলে গেল।
সে ফিসফিস করে বলল, ‘হে আল্লাহ... তোমার কাজ কত পরিপূর্ণ! যদি এই আমগুলো কদুর মতো বড় হত, আজ আমার মাথাটা থাকত না।’
কখনো কখনো আল্লাহ আমাদের বোঝানোর জন্য সামান্য একটা ধাক্কা দেন। আর সে ধাক্কা মানুষকে জাগায়—নিজের ভুল ধারণা থেকে, নিজের অন্ধত্ব থেকে, নিজের অহংকার থেকে।
মানুষ ভাবে সে বুঝে—আসলে সে শুধু দেখছে, বুঝছে না। কেননা আল্লাহর কাজ বোঝার জন্য চোখ নয়; হৃদয় লাগে।
আমরা কত কিছুই তো না-দেখে বিশ্বাস করি—হাওয়া, উষ্ণতা, চুম্বকীয় শক্তি, ভালোবাসা, মায়ের স্নেহ। এই সবই অদৃশ্য, তবুও কত বাস্তব, তাহলে যিনি সবকিছুর উৎস—তিনি অদৃশ্য হলেও কি কম বাস্তব?
ঈমান হলো মানুষের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ। এটি শুধু মাথার ধারণা নয়—এটি হৃদয়ের আলো। যার ভেতরে এই আলো থাকে, সে অন্ধকার রাস্তায়ও পথ খুঁজে পায়। আর যার ভেতরে আলো নেই, সে রোদ্দুরেও হারিয়ে যায়।
মানুষ আল্লাহকে নিশ্চিতভাবে অনুভব করে
একজন বড় বিজ্ঞানী—লর্ড কেলভিন—বলে গেছেন, ‘তুমি যত গভীর দেখবে, যত খুঁটিনাটি বুঝবে—শেষ পর্যন্ত বুঝতে বাধ্য হবে, একজন সৃষ্টিকর্তা আছেন। তিনি ছাড়া কিছুই ব্যাখ্যা করা যায় না।’
ঠিক তাই—যখন মানুষ মহাবিশ্বের দিকে ওপরে-ওপরে তাকায়, তখন সবকিছুই এলোমেলো মনে হয়। কিন্তু যখন সে গভীরে তাকায়—প্রতিটি পাতা, প্রতিটি রং, প্রতিটি সুবাস, প্রতিটি সুর—সবকিছু গেয়ে ওঠে, ‘একজন আছেন... যিনি আমাদের বানিয়েছেন।’
এই উপলব্ধি যখন হৃদয়ে বসে যায়, তখন মানুষ আর সন্দেহ করে না। তখন সে জানে—যিনি আমাকে সৃষ্টি করেছেন, তিনিই আমাকে দেখছেন, আমিই তাঁর কাছে ফিরব। তারপর সে মানুষটি বারবার আল্লাহর দিকে মাথা নামিয়ে বলল, ‘হে আল্লাহ, আমার ঈমানকে শক্ত কর। আমার ভিতরের আলোকে নিভতে দিও না। আমাকে সেই রাতগুলোর স্বাদ দাও যেখানে মানুষ তোমার কাছে সবচেয়ে নিকটে চলে যায়।’
আল্লাহ তাআলা মুসলিম উম্মাহকে ঈমানের ওপর অটল ও অবিচল থাকার তাওফিক দান করুন। সাদেক্বিন-সত্যবাদীদের সঙ্গে চলার এবং সুসম্পর্ক রাখার তাওফিক দান করুন। আমীন।
নাস্তিকরা বারবার একটি কথাই বলে—আমরা তো চোখে দেখে বিশ্বাস করি। আল্লাহ আছে? দেখাও কোথায়! কেমন দেখতে? রঙ কেমন? আমরা না দেখে মানব না!
আমাদের অনেক তরুণ এই কথায় দ্বিধায় পড়ে যায়। কিন্তু আসল সত্য হলো—যারা বলে ‘আমরা শুধু দেখে বিশ্বাস করি’—তারা নিজেরাই হাজার জিনিস না দেখে বিশ্বাস করে!
তাই তাদের খুব সহজ একটা প্রশ্ন করুন, ‘তুমি কি বেঁচে আছো?’
সে বলবে, ‘হ্যাঁ, বেঁচে আছি।’
— তোমার বেঁচে থাকার কারণ কী?
নিশ্চয় সে বলবে, ‘আমার শরীরে রুহ আছে, তাই বেঁচে আছি।’
এবার তাকে বলুন, ‘ভালো, তাহলে আমাকে রুহটা দেখাও তো! কোথায় আছে? কেমন দেখতে? কোন রঙ? কোন আকার?’
প্রিয় ভাইয়েরা, একজন জীবিত মানুষ আর একজন মৃত মানুষকে পাশাপাশি রাখলে দু’জনকেই একই রকম মনে হয়। কিন্তু একজনের শরীরে রুহ আছে, আরেকজনের নেই। এই রুহ—
— চোখে দেখা যায় না,
— হাতে ধরা যায় না,
— কোনো রঙ নেই,
— কোনো আকৃতি নেই।
তবুও পৃথিবীর সবাই বিশ্বাস করে—রুহ আছে। কেন? কারণ তার প্রভাব ‘জীবন’ স্পষ্টভাবে দেখা যায়।
যদি একটা ক্ষুদ্র রুহকে সবাই না দেখে বিশ্বাস করে, তাহলে কিভাবে অসীম শক্তির মালিক, মহাবিশ্বের স্রষ্টা আল্লাহকে না-দেখে বিশ্বাস করাটা অস্বাভাবিক হয়?
একজন মানুষ বলে—আমার খুব ব্যথা হচ্ছে। বলুন তো এই ব্যথা কেউ দেখেছে? ব্যথা কি ছোট? বড়? লম্বা? মোটা? কোন রঙ? কেউ কি ব্যথাকে হেঁটে যেতে বা আসতে দেখেছে? না!
তবুও সবাই মানে—ব্যথা আছে। কারণ শরীর তার প্রভাব অনুভব করে।
অনুরূপভাবে আল্লাহকে চোখে দেখা না গেলেও হৃদয় তাঁর অস্তিত্ব অনুভব করে। ব্যথা অদৃশ্য—তবুও সত্যি। আল্লাহ অদৃশ্য—তবুও সবচেয়ে সত্য।
সব সত্য দেখা যায় না
সত্য এই যে—দুনিয়ার সব সত্য জিনিস চোখে দেখা যায় না। যেমন
হাওয়া দেখা যায় না—তবুও আছে।
ভালবাসা দেখা যায় না—তবুও অনুভব করি।
রুহ দেখা যায় না—তবুও মানি।
ব্যথা দেখা যায় না—তবুও অস্বীকার করি না।
তাহলে আল্লাহকে না-দেখা নিয়ে কেন এত প্রশ্ন?
শহীদ হাসানুল বান্না রহ.
মিশরের শহীদ হাসানুল বান্না রহ. তখন পঞ্চম শ্রেণীর ছাত্র। একজন নাস্তিক শিক্ষক এসে বললেন, ‘তোমরা কি আমাকে দেখ?’
ছাত্ররা বললো, ‘হ্যাঁ।’
শিক্ষক বললেন, ‘এর অর্থ হলো, আমি অস্তিত্বমান। এবার বলো, তোমরা কি আল্লাহকে দেখ?’
ছাত্ররা বললো, ‘না।’
শিক্ষক বললেন, ‘এর অর্থ হলো আল্লাহর কোনো অস্তিত্ব নেই।’
ছোট্ট বালক হাসানুল বান্না বললেন, ‘উস্তাদ! অনুমতি দিলে আমি আমার সহপাঠিদেরকে কিছু প্রশ্ন করতাম।’
শিক্ষক বললেন, ‘ঠিক আছে, করো।’
হাসানুল বান্না বললেন, ‘আচ্ছা, বন্ধুরা তোমরা কি আমাদের শিক্ষককে দেখতে পাচ্ছ?’
সবাই বললো, ‘দেখতে পাচ্ছি।’
হাসানুল বান্না বললেন, ‘তার মানে তিনি আছেন। এবার বলো, তোমরা কি আমাদের শিক্ষকের জ্ঞান দেখতে পাচ্ছ?’
সবাই বললো, ‘না।’
হাসানুল বান্না বললেন, ‘এর অর্থ তার জ্ঞান নেই। তিনি একজন উম্মাদ-পাগল।’
তখন শিক্ষক বলেছিলেন, ‘হাসান, আমিতো এভাবে ভাবি নি। তুমি আমার চোখ খুলে দিলে।’
রোম দেশের এক নাস্তিকের কিছু প্রশ্ন
ইমাম আবু হানিফা রহ.-এর আরেকটি ঘটনা মনে পড়ল। রোম দেশের এক নাস্তিক মুসলমানদের শহরে এসে ইসলামের আলেমদের সঙ্গে বিতর্কে বসলো। একে একে অনেক আলেম তার প্রশ্নের সামনে চুপ হয়ে গেলেন। শুধু ইমাম আবু হানিফা রহ.-এর উস্তাদ হাম্মাদ রহ. চেষ্টা করে যাচ্ছিলেন, কিন্তু তিনি আশঙ্কায় ছিলেন—যদি এই নাস্তিক তাকে পরাস্ত করে, তবে মানুষের চোখে ইসলামের মর্যাদা কমে যাবে।
সেদিন রাতে হাম্মাদ রহ. অদ্ভুত একটি স্বপ্ন দেখলেন—একটি ভয়ংকর শূকর একটি গাছের ডালপালা ও পাতাগুলো খেয়ে ফেলেছে। শুধু শিকড়টুকু অবশিষ্ট আছে। হঠাৎ গাছের গোড়া থেকে একটি বাঘশাবক বের হলো এবং সেই শূকরটিকে মেরে ফেলল।
ভোরে ইমাম আবু হানিফা তখনো শিশু বয়সে হলেও চমৎকার বুদ্ধির অধিকারী। তিনি তাঁর উস্তাদ হম্মাদের কাছে এসে দেখলেন—তিনি দুঃখে ভারাক্রান্ত। ইমাম জিজ্ঞেস করলেন, ‘উস্তাদ, আজ এত চিন্তিত কেন?’
হম্মাদ রহ. স্বপ্নের কথা এবং নাস্তিকের বিতর্কের কথা বললেন। ইমাম শুনে বললেন, ‘আলহামদুলিল্লাহ! স্বপ্নের শূকর হলো সেই নাস্তিক। গাছটি হলো ইলম, তার শাখাগুলো অন্যান্য আলেম, আর মূল হলো আপনি। আর গাছ থেকে বের হওয়া সেই বাঘশাবক—সেটি আমি। আল্লাহ তাআলার সাহায্যে আমি তাকে পরাজিত করবো।’
এরপর তারা দু’জনে মঞ্চে গেলেন। মিম্বরে বসে প্রতিপক্ষকে ডাকলেন। তখন ছোট্ট ইমাম আবু হানিফা সামনে আসলেন। নাস্তিক তাকে দেখে অবজ্ঞাভরে হাসল। ইমাম বললেন, ‘হাসা বন্ধ কর, কথা বল।’
নাস্তিক অবাক হয়ে প্রশ্ন করল, ‘যে সত্তার শুরু নেই, শেষ নেই—এমন কিছু কি করে থাকতে পারে?’
ইমাম জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুমি সংখ্যা চেনো?’
নাস্তিক বলল, ‘হ্যাঁ।’
ইমাম আবার বললেন, ‘এক-এর আগে কী আছে?’
নাস্তিক বলল, ‘কিছুই নেই, এক-ই শুরু।’
ইমাম বললেন, ‘যদি তোমার বানানো সংখ্যার জগতে এক-এর আগে কিছু না থাকে, তবে বাস্তবের ‘একক সত্য সত্তা’-র আগে কিছু থাকার কথা কিভাবে কল্পনা করলে!’
নাস্তিক দ্বিতীয় প্রশ্ন করল, ‘আল্লাহ কোন দিকে? সবকিছুই তো কোনো না কোনো দিকের মধ্যে থাকে!’
ইমাম বললেন, ‘একটি বাতি জ্বালালে আলো কোন দিকে যায়?’
সে বলল, ‘সকল দিকে সমানভাবে।’
ইমাম বললেন, ‘যদি সৃষ্ট আলোর কোনো দিক না থাকে, তবে নূর-সমূহের নূর—আল্লাহর দিকে নির্দিষ্ট কোনো দিক নির্ধারণ করতে চাইছ কেন!’
নাস্তিক তৃতীয় প্রশ্ন করল, ‘আল্লাহ কোন জায়গায় আছেন? প্রত্যেক অস্তিত্বেরই তো একটা স্থান লাগে!’
ইমাম কিছু দুধ আনতে বললেন এবং জিজ্ঞেস করলেন, ‘এতে কি মাখন আছে?’
সে বলল, ‘হ্যাঁ।’
— ‘মাখন কোন জায়গায় আছে?’
সে বলল, ‘দুধের ভেতরে সমানভাবে, কোনো নির্দিষ্ট স্থানে নয়।’
ইমাম বললেন, ‘যদি পরিবর্তনশীল একটি জিনিসের ভেতরে এমনভাবে অবস্থান সম্ভব হয়, তবে স্থায়ী ও চিরন্তন সৃষ্টিকর্তাকে স্থান দ্বারা কেন সীমাবদ্ধ করতে চাও!’
শেষে নাস্তিক প্রশ্ন করল, ‘আল্লাহ এখন কী নিয়ে ব্যস্ত?’
ইমাম বললেন, ‘এখন পর্যন্ত তুমি মঞ্চে বসে প্রশ্ন করলে, আর আমি নিচে দাঁড়িয়ে উত্তর দিলাম। এখন তুমি নেমে এসো, আমি উঠি।’
নাস্তিক নেমে এল। ইমাম মিম্বরে উঠে বললেন, ‘যখন মিম্বরে ভুল ধারণার মানুষ থাকে, তাকে নামিয়ে দেওয়া হয়; আর যখন সত্যবাদী ওঠে, তাকে উঁচু করা হয়—এটাই আল্লাহর প্রতিদিনের কাজ।’
নাস্তিক স্তব্ধ হয়ে গেল—তার কোনো জবাব রইল না। মানুষ তাকে ধরে শাস্তি দিল।
তখন সবাই বুঝল—এ শিশু বয়সেই যার এত প্রজ্ঞা, বড় হলে তার মর্যাদা কত উচ্চে পৌঁছবে!
কিছু সত্য ‘দৃষ্টিতে’ ধরা পড়ে না, ‘প্রভাবে’ ধরা পড়ে
মূলত কিছু সত্য আছে এমন যেগুলো ‘দৃষ্টিতে’ ধরা পড়ে না; ‘প্রভাবে’ ধরা পড়ে। যেমন
—রুহ তার প্রভাবে পরিচিত,
—ব্যথা তার প্রভাবে পরিচিত,
আর আল্লাহ তাঁর সৃষ্টির মাধ্যমে পরিচিত। আকাশের অপরিমেয় বিস্তার, পাহাড়ের দৃঢ়তা, মানব মস্তিষ্কের সূক্ষ্ম নিয়ন্ত্রণ, জীবনের প্রতিটি নিঃশ্বাস—সব একসঙ্গে বলে—একজন মহান স্রষ্টা আছেন...এবং তিনি-ই আল্লাহ!
কবি চমৎকার বলেছেন
فَيا عَجَباً كَيفَ يُعصى الإِلَهُ
أَم كَيفَ يَجحَدُهُ الجاحِدُ
وَفي كُلِّ شَيءٍ لَهُ آيَةٌ
تَدُلُّ عَلى أَنَّهُ واحِدُ
وَلِلَّهِ في كُلِّ تَحريكَةٍ
وَتَسكينَةٍ أَبَداً شاهِدُ
أَم كَيفَ يَجحَدُهُ الجاحِدُ
وَفي كُلِّ شَيءٍ لَهُ آيَةٌ
تَدُلُّ عَلى أَنَّهُ واحِدُ
وَلِلَّهِ في كُلِّ تَحريكَةٍ
وَتَسكينَةٍ أَبَداً شاهِدُ
হে বিস্ময়! মানুষ কীভাবে অবাধ্য হয়
নিজেরই পালনকর্তার?
কীভাবে অস্বীকার করে তাঁকে,
যাকে অস্বীকার করার উপায়ই নেই?
প্রতিটি সৃষ্টির ভাঁজে ভাঁজে,
প্রতিটি কণার গভীরে গভীরে,
তাঁরই নিদর্শন ঝলমল করে—
ঘোষণা দেয়—তিনিই এক, তিনিই একমাত্র।
মানুষের প্রতিটি নড়াচড়ায়,
প্রতিটি থেমে যাওয়ায়,
প্রতিটি শ্বাসে-প্রশ্বাসে—
সদাই আছে এক সাক্ষ্য :
আল্লাহ রয়েছেন, আল্লাহই সত্য।
আল্লাহর অস্তিত্বের প্রমাণ কী?নিজেরই পালনকর্তার?
কীভাবে অস্বীকার করে তাঁকে,
যাকে অস্বীকার করার উপায়ই নেই?
প্রতিটি সৃষ্টির ভাঁজে ভাঁজে,
প্রতিটি কণার গভীরে গভীরে,
তাঁরই নিদর্শন ঝলমল করে—
ঘোষণা দেয়—তিনিই এক, তিনিই একমাত্র।
মানুষের প্রতিটি নড়াচড়ায়,
প্রতিটি থেমে যাওয়ায়,
প্রতিটি শ্বাসে-প্রশ্বাসে—
সদাই আছে এক সাক্ষ্য :
আল্লাহ রয়েছেন, আল্লাহই সত্য।
একজন বেদুঈনকে একবার জিজ্ঞেস করা হলো, ‘আল্লাহর অস্তিত্বের প্রমাণ কী?’
বেদুঈন কোনো দার্শনিক ভাষা ব্যবহার করলেন না। তিনি তাঁর সহজ-সরল চোখে দেখা সত্যটাই বললেন
اَلْبَعَرَةُ تَدُلُّ عَلَى الْبَعِيرِ
وَالرَّوْثُ عَلَى الْحَمِيرِ
وَآثَارُ الْأَقْدَامِ عَلَى الْمَسِيرِ
فَسَمَاءٌ ذَاتُ أَبْرَاجٍ
وَأَرْضٌ ذَاتُ فِجَاجٍ
وَبِحَارٌ ذَاتُ أَمْوَاجٍ
أَمَا تَدُلُّ عَلَى الصَّانِعِ الْحَلِيمِ الْعَلِيمِ الْقَدِيرِ؟
وَالرَّوْثُ عَلَى الْحَمِيرِ
وَآثَارُ الْأَقْدَامِ عَلَى الْمَسِيرِ
فَسَمَاءٌ ذَاتُ أَبْرَاجٍ
وَأَرْضٌ ذَاتُ فِجَاجٍ
وَبِحَارٌ ذَاتُ أَمْوَاجٍ
أَمَا تَدُلُّ عَلَى الصَّانِعِ الْحَلِيمِ الْعَلِيمِ الْقَدِيرِ؟
মাটিতে যদি উটের বিষ্ঠা দেখি, বুঝি—এখানে উট গেছে।
গাধার বিষ্ঠা দেখলে বুঝি—গাধা গেছে।
পায়ের ছাপ দেখলে বুঝি—কেউ হেঁটে গেছে।
তাহলে বলো—তারাগুলোতে ভরা আকাশ,
পথ-প্রান্তর জুড়ে বিস্তৃত পৃথিবী, ঢেউয়ে ভরা সমুদ্র—
এসব কি একজন নির্মাতা, একজন সুপরিকল্পনাকারী,
একজন সর্বশক্তিমান স্রষ্টার দিকে ইশারা করে না?
গাধার বিষ্ঠা দেখলে বুঝি—গাধা গেছে।
পায়ের ছাপ দেখলে বুঝি—কেউ হেঁটে গেছে।
তাহলে বলো—তারাগুলোতে ভরা আকাশ,
পথ-প্রান্তর জুড়ে বিস্তৃত পৃথিবী, ঢেউয়ে ভরা সমুদ্র—
এসব কি একজন নির্মাতা, একজন সুপরিকল্পনাকারী,
একজন সর্বশক্তিমান স্রষ্টার দিকে ইশারা করে না?
[আস-সাফিরী রহ., শারহুল বুখারী : ১/৪৬১]
ইমাম জা’ফর সাদিক রহ.
ইমাম জা’ফর সাদিক রহ.। এক ব্যক্তি তাঁর কাছে আল্লাহ সম্পর্কে জানতে চাইল। উত্তরে তিনি বলেন
লোকটি বলল, ‘করেছি।’
জা’ফর সাদিক রহ. প্রশ্ন করলেন
লোকটি উত্তর দিল, ‘হ্যাঁ।’
এবার জা’ফর সাদিক রহ. লোকটিকে প্রশ্ন করলেন
লোকটি বলল, ‘অবশ্যই। তখন একজনের প্রতিই আশা করেছিলাম।’
জা’ফর সাদিক রহ. বললেন
যে প্রশ্নের উত্তর নাস্তিকরা দিতে পারে না
সম্মানিত উপস্থিতি! নাস্তিকদের প্রতি একটি প্রশ্ন আছে—যার উত্তর তারা কখনোই দিতে পারে না। প্রশ্নটি হলো, ‘পশুর বাচ্চা যখন মায়ের পেট থেকে জন্মায় এবং পাখির বাচ্চা যখন ডিম ফেটে বের হয়, তখন তারা এত কিছু আগে থেকেই কীভাবে জানে? কীভাবে বাঁচতে হবে, কোথায় যেতে হবে, কোন্ দক্ষতা তার লাগবে—তাদের এসব জ্ঞান কে দেয়?’
এই স্বভাবজাত জ্ঞানকে বলা হয়—ফিতরী হিদায়াত। এর একমাত্র উত্তর হলো, একজন স্রষ্টা তাঁর প্রত্যেক সৃষ্টিকে নিজের জীবনযাপনের পথ আগেই শিখিয়ে দিয়েছেন। আর তিনিই হলেন—আল্লাহ তাআলা।
যেমন ধরুন, দুইটি ডিম—একটি হাঁসের, একটি মুরগির। বাইরে থেকে দেখলে দুটোই একই রকম। রং, আকার, গন্ধ—সব একই। আপনি দুটোই মুরগির নিচে রাখলেন। কিছুদিন পর বাচ্চা বের হলো।
এখন যদি হাঁসের বাচ্চাকে পানিতে রাখেন—সে টুপ করে নেমেই সাঁতার কাটতে শুরু করবে। আর মুরগির বাচ্চা পানিতে পড়লেই ডুবে যাবে।
কেন এমন হলো?
ডিম তো একই ছিল, পরিবেশও একই! তাহলে এই বিশাল পার্থক্য কোথা থেকে এলো?
উত্তর একটাই—যার জীবন পানি-নির্ভর, তাকে আল্লাহ তাআলা জন্মগতভাবেই সাঁতার শিখিয়ে দেন। আর যার জীবন মাটিতে, তাকে দেন ভিন্ন স্বভাব, ভিন্ন দিশা।
আল্লাহ তাআলা বলেন
ফিতরি হিদায়াত—স্রষ্টার অস্তিত্বের নান্দনিক প্রমাণ
ইমাম জা’ফর সাদিক রহ.। এক ব্যক্তি তাঁর কাছে আল্লাহ সম্পর্কে জানতে চাইল। উত্তরে তিনি বলেন
هَلْ رَكِبْتَ الْبَحْرَ يَوْمًا؟
‘তুমি কি সমুদ্রপৃষ্ঠে কখনো ভ্রমন করেছ?’লোকটি বলল, ‘করেছি।’
জা’ফর সাদিক রহ. প্রশ্ন করলেন
هَلْ هَاجَ بِكُمُ الْبَحْرُ حَتَّى أَيْقَنْتَ الْهَلَاكَ؟
‘কখনো কি এমন হয়েছিল যে, উত্তাল সমুদ্রের কবলে পড়ে তোমরা ধরে নিয়েছিলে যে, তোমাদের মৃত্যু নিশ্চিত?’লোকটি উত্তর দিল, ‘হ্যাঁ।’
এবার জা’ফর সাদিক রহ. লোকটিকে প্রশ্ন করলেন
أَمَا خَطَرَ بِبَالِكَ عِنْدَهَا أَنَّ هُنَاكَ مَن يَسْتَطِيعُ أَنْ يُنَجِّيَكُمْ إِذَا أَرَادَ؟
‘ওই বিপদসংকুল যাত্রায় তোমার হৃদয় এই আশায় কি একটুও আন্দোলিত হয়নি যে, ইচ্ছে করলে আমাদেরকে এই মহা বিপদ থেকে একজনই রক্ষা করতে পারেন?’লোকটি বলল, ‘অবশ্যই। তখন একজনের প্রতিই আশা করেছিলাম।’
জা’ফর সাদিক রহ. বললেন
فَذَاكَ هُوَ اللَّهُ
‘তিনিই হলেন আমাদের আল্লাহ।’ [আততাফসীর আলজামি’, সূরা ইউনুস : ২২]যে প্রশ্নের উত্তর নাস্তিকরা দিতে পারে না
সম্মানিত উপস্থিতি! নাস্তিকদের প্রতি একটি প্রশ্ন আছে—যার উত্তর তারা কখনোই দিতে পারে না। প্রশ্নটি হলো, ‘পশুর বাচ্চা যখন মায়ের পেট থেকে জন্মায় এবং পাখির বাচ্চা যখন ডিম ফেটে বের হয়, তখন তারা এত কিছু আগে থেকেই কীভাবে জানে? কীভাবে বাঁচতে হবে, কোথায় যেতে হবে, কোন্ দক্ষতা তার লাগবে—তাদের এসব জ্ঞান কে দেয়?’
এই স্বভাবজাত জ্ঞানকে বলা হয়—ফিতরী হিদায়াত। এর একমাত্র উত্তর হলো, একজন স্রষ্টা তাঁর প্রত্যেক সৃষ্টিকে নিজের জীবনযাপনের পথ আগেই শিখিয়ে দিয়েছেন। আর তিনিই হলেন—আল্লাহ তাআলা।
যেমন ধরুন, দুইটি ডিম—একটি হাঁসের, একটি মুরগির। বাইরে থেকে দেখলে দুটোই একই রকম। রং, আকার, গন্ধ—সব একই। আপনি দুটোই মুরগির নিচে রাখলেন। কিছুদিন পর বাচ্চা বের হলো।
এখন যদি হাঁসের বাচ্চাকে পানিতে রাখেন—সে টুপ করে নেমেই সাঁতার কাটতে শুরু করবে। আর মুরগির বাচ্চা পানিতে পড়লেই ডুবে যাবে।
কেন এমন হলো?
ডিম তো একই ছিল, পরিবেশও একই! তাহলে এই বিশাল পার্থক্য কোথা থেকে এলো?
উত্তর একটাই—যার জীবন পানি-নির্ভর, তাকে আল্লাহ তাআলা জন্মগতভাবেই সাঁতার শিখিয়ে দেন। আর যার জীবন মাটিতে, তাকে দেন ভিন্ন স্বভাব, ভিন্ন দিশা।
আল্লাহ তাআলা বলেন
الَّذِي أَعْطَىٰ كُلَّ شَيْءٍ خَلْقَهُ ثُمَّ هَدَىٰ
যিনি প্রতিটি সৃষ্টিকে তার উপযুক্ত গঠন দিয়েছেন, তারপর তাকে পথ দেখিয়েছেন। [সূরা ত্বা-হা : ৫০]ফিতরি হিদায়াত—স্রষ্টার অস্তিত্বের নান্দনিক প্রমাণ
- মাকড়সার বাচ্চা জন্মের কিছুক্ষণ পরেই জাল বুনতে শুরু করে। কেউ কি তাকে ‘ওয়ার্কশপ’ করিয়েছে? কেউ কি তার মাকে বলে দিয়েছে, ‘গর্ভে থাকতেই বাচ্চাকে জাল বোনা শেখাও’? না—এই দক্ষতা সে কোথাও শেখেনি; এটা তার ভেতরে জন্মগতভাবে স্থাপন করা জ্ঞান।
- প্রজাপতির পোনা প্রথমে শুঁড়ির মতো থাকে, তারপর সময় এলে ডানা মেলে ধরে, ফুলে বসে, ফুলের সঙ্গে নিজের রঙ ও স্বভাব মিলিয়ে নিতে জানে। এই জানা—জন্মের আগেই নির্ধারিত।
- কুমিরের বাচ্চা জন্মের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই পানি চিনে ফেলে। কীভাবে সাঁতার কাটতে হয়, কীভাবে শিকার ধরতে হয়—এসব কেউ শেখায়নি, কোনো প্রশিক্ষণ নেই, কোনো ক্লাস নেই। তবে এই জ্ঞান তার ভেতরে স্থাপন করল কে?
- সমুদ্রের তিমির বাচ্চা জন্মেই জানে তার মাকে কোথায় খুঁজতে হবে। তার দৃষ্টি, শ্রবণ, ইকোলোকেশন—সবই জন্মগত। কেউ তাকে শেখায় না; বরং মানুষ তাকিয়েই বিস্ময়ে থেমে যায়।
- মাছের বাচ্চা জন্মের মুহূর্ত থেকেই সাঁতার কাটে। কোনো শিক্ষক নেই, কোনো প্র্যাকটিস নেই, ভুল করে শোধরানোর সুযোগও নেই। তার জীবনই যেহেতু পানির উপর নির্ভরশীল—সাঁতার তার জন্মগত প্রাপ্তি, আর এই শেখানো—স্রষ্টার পক্ষ থেকেই।
- আমরা মানুষ—একটি গাড়ি চালাতে শিখতে মাসের পর মাস লেগে যায়, তাও গাড়ির বাম্পারে এক-দু’টা ডেন্ট পড়েই। কিন্তু পাখি? ডানা শক্ত হলেই আকাশে উড়ে যায়। কোচ নেই, প্রশিক্ষণ নেই, কোনো সিমুলেটর নেই। যদি পাখিদেরও পাইলটের মতো দীর্ঘ প্রশিক্ষণ নিতে হতো— তাহলে এ পৃথিবীর আকাশ চিরকালই খালি থাকত।
এটাই ফিতরি হিদায়াত—আর এটাই আল্লাহর অস্তিত্বের এক জীবন্ত প্রমাণ; যা দেখা যায়, বোঝা যায়, কিন্তু অস্বীকার করা যায় না।
কুরআন মজিদে কুদরতের নিদর্শন
কুরআন মজিদ নিজেই আমাদের সামনে এমন এক আয়াত পেশ করে—যেখানে বিষয়টি একেবারে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন
এই আয়াতই বলে দেয়—যে সত্যকে খুঁজতে চায়, তার জন্য পুরো পৃথিবী এবং তার নিজের ভেতরটাই এক খোলা কিতাব। শুধু চোখ খুলে দেখার প্রয়োজন। যেমন—
১. সূর্য-পৃথিবীর নিখুঁত দূরত্ব
পৃথিবী সূর্য থেকে প্রায় ১৫ কোটি কিলোমিটার দূরে। বিজ্ঞানীরা বলেন, এই দূরত্ব যদি সামান্যও কম-বেশি হতো, তাহলে—দূরত্ব কম হলে পৃথিবী আগুনের গোলা হয়ে যেত। কোনো গাছ, কোনো প্রাণ—কিছুই বাঁচতো না।
দূরত্ব বেশি হলে পৃথিবী বরফের সাগরে পরিণত হতো। সারাবছর বরফই বরফ। কোনো ফসল হতো না।
এখন প্রশ্ন হলো—এ দূরত্ব এত এক্স্যাক্টলি কেন ঠিক আছে? কে তিনি—যিনি ঠিক রেখেছেন?
আমরা মানুষ যখন গ্যাসের চুলার আগুনে হাঁড়ি বসাই, একটু দূরে-একটু কাছে করে ঠিক করি, যাতে খাবার পুড়ে না যায়, কাঁচা না থাকে।
তাহলে সূর্য নামের এই বিশাল আগুনের গোলার সাথে পৃথিবীর এই নিখুঁত দূরত্ব—এটা কি শুধু ‘এমনিতেই’ হয়ে গেছে? আল্লাহ তাআলা বলেন
২. পৃথিবীর ঘূর্ণন-ব্যালান্সিং
পৃথিবী প্রতি ঘণ্টায় প্রায় ১০০০ মাইল বেগে ঘুরছে। শুধু ভাবুন—একটা গাড়ির চাকার ব্যালান্স যদি সামান্য নষ্ট হয়, কী হয়? গাড়ি কাঁপে, গতি কমাতে হয়, যাত্রীরা ভয় পায়।
কিন্তু পৃথিবী? এত বিশাল গ্রহ, এমন স্পিডে ঘুরছে, তবুও আমরা একটুও কম্পন অনুভব করি না। কারণ পৃথিবীর ব্যালান্সিং পারফেক্ট।
এটা কি কোনো দুর্ঘটনায় হয়েছে? পৃথিবী কি নিজেই নিজেকে ব্যালান্স করে নিলো? না! তাহলে এই নিখুঁত ব্যালান্স কে দিলো? আল্লাহ তাআলা বলেন
৩. ওজোন লেয়ার—পথিবীর অদৃশ্য ঢাল
সূর্য থেকে যে ক্ষতিকর রশ্মি আসে, তার বেশিরভাগই জীবনের জন্য মারাত্মক। কিন্তু একটা অদৃশ্য প্রাচীর আছে—যে রশ্মিগুলোকে ঠেকিয়ে রাখে। এটির নাম Ozone Layer|
সেটা কি আমরা বানিয়েছি? না। তাহলে কে বানিয়েছে! পৃথিবী কি হঠাৎ করে ‘নিজেই সিদ্ধান্ত নিলো’ যে আমার সুরক্ষা লাগবে? না। তাহলে সুরক্ষা করছেন কে?
আল্লাহ তাআলা বলেন
৪. একই ভূমি, একই পানি—কিন্তু সৃষ্টি নানা রঙের
একই মাটি, একই পানি—তবুও দেখুন কী বিস্ময়! এক ফুল লাল রঙে ফুটে,
আরেকটি ফুল নীল রঙে, আরেকটি হলুদ হয়ে আকাশ-ধরিত্রী আলোকিত করে।
মাটির মধ্যকার উপাদানগুলো একই, পানি একই, তবুও রঙ, সৌরভ ও আকৃতিতে অসীম বৈচিত্র্য। একই মাটিতে জন্মানো ফলগুলোও—কারো স্বাদ টক, কারো মিষ্টি, কারো সুগন্ধ ভিন্ন, আবার কারো গঠন আলাদা। এই বৈচিত্র্য কি ‘নিজে নিজেই’ হতে পারে?
স্পষ্টই বোঝা যায়, প্রত্যেক রঙ, স্বাদ ও সৌন্দর্যের পিছনে একজন মহান স্রষ্টার সুদক্ষ নিপুণতা কাজ করছে।
৫. মানুষের শরীর—একটি অটোমেটেড সিস্টেম
আমাদের হৃদপিণ্ড প্রতি মিনিটে প্রায় ৭০ বার ধুকপুক করে। এক সেকেন্ডও বন্ধ থাকে না।
আমাদের ফুসফুস প্রতিদিন ২০ হাজার বার শ্বাস নেয়।
আমাদের চোখ প্রতি সেকেন্ডে লাখ লাখ তথ্য প্রসেস করে।
কুরআন মজিদ নিজেই আমাদের সামনে এমন এক আয়াত পেশ করে—যেখানে বিষয়টি একেবারে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন
وَفِي الْأَرْضِ آيَاتٌ لِّلْمُوقِنِينَ. وَفِي أَنفُسِكُمْ ۚ أَفَلَا تُبْصِرُونَ
পৃথিবীতে আছে নিদর্শন, তাদের জন্য—যারা দৃঢ় বিশ্বাসী। আর তোমাদের নিজেদের মধ্যেও (নিদর্শন আছে), তবু কি তোমরা দেখো না? [সূরা যারিয়াত : ২০, ২১}এই আয়াতই বলে দেয়—যে সত্যকে খুঁজতে চায়, তার জন্য পুরো পৃথিবী এবং তার নিজের ভেতরটাই এক খোলা কিতাব। শুধু চোখ খুলে দেখার প্রয়োজন। যেমন—
১. সূর্য-পৃথিবীর নিখুঁত দূরত্ব
পৃথিবী সূর্য থেকে প্রায় ১৫ কোটি কিলোমিটার দূরে। বিজ্ঞানীরা বলেন, এই দূরত্ব যদি সামান্যও কম-বেশি হতো, তাহলে—দূরত্ব কম হলে পৃথিবী আগুনের গোলা হয়ে যেত। কোনো গাছ, কোনো প্রাণ—কিছুই বাঁচতো না।
দূরত্ব বেশি হলে পৃথিবী বরফের সাগরে পরিণত হতো। সারাবছর বরফই বরফ। কোনো ফসল হতো না।
এখন প্রশ্ন হলো—এ দূরত্ব এত এক্স্যাক্টলি কেন ঠিক আছে? কে তিনি—যিনি ঠিক রেখেছেন?
আমরা মানুষ যখন গ্যাসের চুলার আগুনে হাঁড়ি বসাই, একটু দূরে-একটু কাছে করে ঠিক করি, যাতে খাবার পুড়ে না যায়, কাঁচা না থাকে।
তাহলে সূর্য নামের এই বিশাল আগুনের গোলার সাথে পৃথিবীর এই নিখুঁত দূরত্ব—এটা কি শুধু ‘এমনিতেই’ হয়ে গেছে? আল্লাহ তাআলা বলেন
وَالشَّمْسُ تَجْرِي لِمُسْتَقَرٍّ لَّهَا ذَلِكَ تَقْدِيرُ الْعَزِيزِ الْعَلِيمِ
আর সূর্য তার জন্যে নির্দিষ্ট ক’রে দেয়া জায়গায় গতিশীল—এটা পরাক্রমশালী, সর্বজ্ঞের নিয়ন্ত্রণ। [সূরা ইয়াসিন : ৩৮]২. পৃথিবীর ঘূর্ণন-ব্যালান্সিং
পৃথিবী প্রতি ঘণ্টায় প্রায় ১০০০ মাইল বেগে ঘুরছে। শুধু ভাবুন—একটা গাড়ির চাকার ব্যালান্স যদি সামান্য নষ্ট হয়, কী হয়? গাড়ি কাঁপে, গতি কমাতে হয়, যাত্রীরা ভয় পায়।
কিন্তু পৃথিবী? এত বিশাল গ্রহ, এমন স্পিডে ঘুরছে, তবুও আমরা একটুও কম্পন অনুভব করি না। কারণ পৃথিবীর ব্যালান্সিং পারফেক্ট।
এটা কি কোনো দুর্ঘটনায় হয়েছে? পৃথিবী কি নিজেই নিজেকে ব্যালান্স করে নিলো? না! তাহলে এই নিখুঁত ব্যালান্স কে দিলো? আল্লাহ তাআলা বলেন
وَمِنۡ ءَايَٰتِهِۦٓ أَن تَقُومَ ٱلسَّمَآءُ وَٱلۡأَرۡضُ بِأَمۡرِهِۦۚ
আর তাঁর নিদর্শনাবলীর মধ্যে রয়েছে, তাঁরই নির্দেশে আকাশ ও পৃথিবী স্থিতিশীল থাকে। [সূরা রুম : ২৫]৩. ওজোন লেয়ার—পথিবীর অদৃশ্য ঢাল
সূর্য থেকে যে ক্ষতিকর রশ্মি আসে, তার বেশিরভাগই জীবনের জন্য মারাত্মক। কিন্তু একটা অদৃশ্য প্রাচীর আছে—যে রশ্মিগুলোকে ঠেকিয়ে রাখে। এটির নাম Ozone Layer|
সেটা কি আমরা বানিয়েছি? না। তাহলে কে বানিয়েছে! পৃথিবী কি হঠাৎ করে ‘নিজেই সিদ্ধান্ত নিলো’ যে আমার সুরক্ষা লাগবে? না। তাহলে সুরক্ষা করছেন কে?
আল্লাহ তাআলা বলেন
اللَّهُ الَّذِي خَلَقَ سَبْعَ سَمَاوَاتٍ وَمِنَ الأَرْضِ مِثْلَهُنَّ يَتَنَزَّلُ الأَمْرُ بَيْنَهُنَّ لِتَعْلَمُوا أَنَّ اللَّهَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ وَأَنَّ اللَّهَ قَدْ أَحَاطَ بِكُلِّ شَيْءٍ عِلْمًا
তিনি আল্লাহ, যিনি সাত আসমান এবং অনুরূপ যমীন সৃষ্টি করেছেন; এগুলির মাঝে তাঁর নির্দেশ অবতীর্ণ হয় যেন তোমরা জানতে পার যে, আল্লাহ সর্ববিষয়ে ক্ষমতাবান এবং আল্লাহর জ্ঞানতো সব কিছুকে বেষ্টন করে আছে। [সূরা তালাক : ১২]৪. একই ভূমি, একই পানি—কিন্তু সৃষ্টি নানা রঙের
একই মাটি, একই পানি—তবুও দেখুন কী বিস্ময়! এক ফুল লাল রঙে ফুটে,
আরেকটি ফুল নীল রঙে, আরেকটি হলুদ হয়ে আকাশ-ধরিত্রী আলোকিত করে।
মাটির মধ্যকার উপাদানগুলো একই, পানি একই, তবুও রঙ, সৌরভ ও আকৃতিতে অসীম বৈচিত্র্য। একই মাটিতে জন্মানো ফলগুলোও—কারো স্বাদ টক, কারো মিষ্টি, কারো সুগন্ধ ভিন্ন, আবার কারো গঠন আলাদা। এই বৈচিত্র্য কি ‘নিজে নিজেই’ হতে পারে?
স্পষ্টই বোঝা যায়, প্রত্যেক রঙ, স্বাদ ও সৌন্দর্যের পিছনে একজন মহান স্রষ্টার সুদক্ষ নিপুণতা কাজ করছে।
৫. মানুষের শরীর—একটি অটোমেটেড সিস্টেম
আমাদের হৃদপিণ্ড প্রতি মিনিটে প্রায় ৭০ বার ধুকপুক করে। এক সেকেন্ডও বন্ধ থাকে না।
আমাদের ফুসফুস প্রতিদিন ২০ হাজার বার শ্বাস নেয়।
আমাদের চোখ প্রতি সেকেন্ডে লাখ লাখ তথ্য প্রসেস করে।
মস্তিষ্ক সুপার কম্পিউটারের চেয়েও দ্রুত কাজ করে।
এই পুরো সিস্টেম কে বানিয়েছে? আমরা তো নিজেকে বানাইনি! আমরা চাইলে নিজের হৃদপিণ্ডও খুলে আবার লাগাতে পারি না।
আল্লাহ তাআলা বলেন
৬. লোমের বৃদ্ধি—কুদরতের অনন্য কারিগরি
যারা বলে মানুষ নাকি ‘নিজে নিজেই’ তৈরি হয়েছে, তাদের কাছে সহজ একটা প্রশ্ন—যদি সত্যিই সবকিছু নিজে নিজে হতো, তাহলে প্রকৃতির নিয়ম সব জায়গায় এক হতো। শরীরের সব লোম একই গতিতে বাড়ত। কিন্তু দেখুন
কিন্তু বাস্তবতা কী? প্রতিটি স্থানের লোমকে আলাদা গতি দেওয়া হয়েছে—যেন মানুষ সবসময় স্বাভাবিক ও সুন্দর দেখায়। এই নিখুঁত সামঞ্জস্য কে স্থির করেছে? কে প্রতিটি ছোট্ট লোমকে আলাদা নিয়ম দিয়েছে? নিশ্চয়ই এক মহান সৃষ্টিকর্তা আছেন, যিনি পুরো ব্যবস্থাটিকে নিয়ন্ত্রণ করছেন।
৬. হাড়ের বৃদ্ধি—দক্ষ নিয়ন্ত্রণের আরেক প্রমাণ
এবার ভাবুন হাড়ের কথা। যদি মানবদেহের সব হাড় একই গতিতে বাড়ত, তাহলে কী হতো?
শিশুর একটি পায়ের হাড় কয়েক বছরের মধ্যে বহু গুণ বড় হয়, কারণ হাঁটার জন্য এটা প্রয়োজন। কিন্তু যদি একই অনুপাতে—
এই পুরো সিস্টেম কে বানিয়েছে? আমরা তো নিজেকে বানাইনি! আমরা চাইলে নিজের হৃদপিণ্ডও খুলে আবার লাগাতে পারি না।
আল্লাহ তাআলা বলেন
أَمْ خُلِقُوا مِنْ غَيْرِ شَيْءٍ أَمْ هُمُ الْخَالِقُونَ
তারা কি স্রষ্টা ছাড়া সৃষ্টি হয়েছে, না তারাই স্রষ্টা? [সূরা তুর : ৩৫]৬. লোমের বৃদ্ধি—কুদরতের অনন্য কারিগরি
যারা বলে মানুষ নাকি ‘নিজে নিজেই’ তৈরি হয়েছে, তাদের কাছে সহজ একটা প্রশ্ন—যদি সত্যিই সবকিছু নিজে নিজে হতো, তাহলে প্রকৃতির নিয়ম সব জায়গায় এক হতো। শরীরের সব লোম একই গতিতে বাড়ত। কিন্তু দেখুন
- দাড়ির লোম এক গতিতে বাড়ে,
- মাথার চুল অন্য গতিতে,
- চোখের পাপড়ির গতি ভিন্ন,
- ভ্রুর লোমের গতি আলাদা,
- বাহুর লোমের গতি আবার একদম আলাদা।
কিন্তু বাস্তবতা কী? প্রতিটি স্থানের লোমকে আলাদা গতি দেওয়া হয়েছে—যেন মানুষ সবসময় স্বাভাবিক ও সুন্দর দেখায়। এই নিখুঁত সামঞ্জস্য কে স্থির করেছে? কে প্রতিটি ছোট্ট লোমকে আলাদা নিয়ম দিয়েছে? নিশ্চয়ই এক মহান সৃষ্টিকর্তা আছেন, যিনি পুরো ব্যবস্থাটিকে নিয়ন্ত্রণ করছেন।
৬. হাড়ের বৃদ্ধি—দক্ষ নিয়ন্ত্রণের আরেক প্রমাণ
এবার ভাবুন হাড়ের কথা। যদি মানবদেহের সব হাড় একই গতিতে বাড়ত, তাহলে কী হতো?
শিশুর একটি পায়ের হাড় কয়েক বছরের মধ্যে বহু গুণ বড় হয়, কারণ হাঁটার জন্য এটা প্রয়োজন। কিন্তু যদি একই অনুপাতে—
- কানও বড় হতো, তাহলে আজ একজন মানুষের কান কয়েক ফুট লম্বা হয়ে যেত!
- দাঁতও একই হারে বাড়ত, তাহলে মানুষ মুখই বন্ধ করতে পারত না।
- মাথার খুলি পায়ের হাড়ের মতো বাড়ত, তাহলে মাথার আকৃতি বিকৃত হয়ে যেত।
- হাঁটার প্রয়োজন অনুযায়ী পায়ের হাড় বড় হয়,
- চিবানোর প্রয়োজন অনুযায়ী দাঁত ছোট থাকে,
- মুখের সৌন্দর্য বজায় রাখতে করোটি (মাথার হাড়) স্থির গতিতে বাড়ে।
৭. আকৃতির বৈচিত্র্যে আল্লাহর কুদরতের মাহাত্ম্য
দেখুন, আল্লাহ তাআলা মানুষকে খুব অল্প কিছু অঙ্গ দিয়েই সৃষ্টি করেছেন—দুটি চোখ, একটি নাক, একটি মুখ, দু’টি কান, কপাল—মোটে চার-পাঁচটি উপাদান। তবুও আশ্চর্যের বিষয় হলো, পৃথিবীতে কোটি-কোটি মানুষ থাকা সত্ত্বেও একজনের মুখ আরেকজনের মুখের সঙ্গে কখনোই পুরোপুরি এক হয় না।
আপনি যদি কোনো চিত্রশিল্পীকে বলেন, ‘অনেকগুলো মানুষের ছবি আঁকো,’ তাহলে তিনি প্রথমে হয়তো দশ-পনেরোটি ভিন্ন মুখ আঁকতে পারবেন। কিন্তু পরে তিনি অনিবার্যভাবে একই রকম মুখ আঁকতে শুরু করবেন, কারণ উপাদানগুলো একই—চোখ, নাক, ঠোঁট, কপাল। মানুষের সীমাবদ্ধতা এখানে এসে থেমে যায়।
কিন্তু আল্লাহ তাআলার সৃষ্টি দেখুন—একই অঙ্গপ্রত্যঙ্গ, একই কাঠামো, তবুও প্রতিটি মানুষের চেহারা অন্যসব মানুষের চেহারা থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। এমনকি মানুষের আঙুলের ছাপও—যা এতটাই সূক্ষ্ম—কোটি মানুষের মধ্যেও কারো সঙ্গে কারো মেলেনা। এতো নিখুঁত বৈচিত্র্য কে দিতে পারে?
যদি সত্যিই সবকিছু ‘নিজে নিজেই’ তৈরি হতো, তাহলে সব মুখই এক ধরনের হতো। যেমন একটি মেশিন একই নকশায় বারবার জিনিস তৈরি করে—সবই একই আকৃতির।
কিন্তু যিনি প্রতিটি মানুষের রূপ আলাদা করে দিচ্ছেন, তিনিই আল্লাহ—সকল সৃষ্টির পরম কারিগর।
ডারউইনের বিবর্তনবাদ তত্ত্বের অসারতা
ডারউইনের বিবর্তন তত্ত্ব বলে—সৃষ্টিজগৎ নাকি নিজে নিজেই তৈরি হয়েছে। তারা দাবি করে, প্রথমে পানি ছিল, সেখান থেকে ছোট প্রাণী তৈরি হলো, তারপর ধীরে ধীরে নানা ধাপ পেরিয়ে বানর হলো, আর বানর থেকে মানুষ। কিন্তু এই কথার মধ্যেই বড় বড় অসঙ্গতি আছে।
তারা বলে, ‘এক ধরন থেকে আরেক ধরনে যেতে হাজার হাজার বছর লেগেছে।’ কিন্তু বানর থেকে মানুষ হওয়ার ক্ষেত্রে তারা বলে, ‘এটা খুব অল্প সময়েই হয়ে গেছে’। অথচ মানুষের দেহের সবচেয়ে কঠিন এবং জটিল অংশ হলো তার মস্তিষ্ক। শরীরের অন্যান্য অঙ্গ তৈরি হতেও যেহেতু হাজার হাজার বছর লাগার কথা বলা হয়, তাহলে সবচেয়ে জটিল মস্তিষ্কের ক্ষেত্রে আরও বেশি সময় লাগার কথা। কিন্তু এখানে তারা উল্টো বক্তব্য দেয়—সবচেয়ে কঠিন জিনিস নাকি খুব অল্প সময়েই তৈরি হয়ে গেল! এটাই তাদের বক্তব্যকে দুর্বল করে দেয়।
আরেকটি বিষয় হলো Missing Link। যখন জিজ্ঞাসা করা হয় বানর ও মানুষের মাঝামাঝি যে প্রাণী থাকার কথা—তা কোথায়? তখন তারা বলে, ‘মধ্যবর্তী অংশটি হারিয়ে গেছে’। সেই ‘হারানো প্রজাতি’ ছাড়া এই তত্ত্ব দাঁড়ায়ই না। অথচ সেই ধাপ তারা কখনোই দেখাতে পারেনি।
কুরআন স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে—মানুষ বানর থেকে হয়নি। বরং কিছু অবাধ্য, পাপিষ্ঠ মানুষকে আল্লাহ শাস্তিস্বরূপ বানর বানিয়ে দিয়েছিলেন। যদি মানুষ সত্যিই বানর থেকে তৈরি হতো, তবে কুরআনে কেন বলা হলো ‘আমরা বললাম, হয়ে যাও বানর’? কেন বলা হলো না—মানুষের রূপ হাওয়ার আগেই তারা বানর ছিল? কারণ সত্য একটাই—মানুষের সৃষ্টি আলাদা, আর বানর হওয়া ছিল শাস্তি।
মানুষ ও বানরের মাঝে কোনো কোনো মিল থাকা খুব স্বাভাবিক। কারণ যখন মানুষকে বিকৃত করে বানর করা হয়েছিল, তখন তার আগের স্বভাব বা গঠনের কিছু অংশ তো থাকবেই। কোনো জিনিস বিকৃত হলে আগের রূপের কিছু ছাপ থাকা স্বাভাবিক।
এইভাবে দেখা যায়—ডারউইনের তত্ত্ব নিজেই নিজের মধ্যে ফাঁপা, অসম্পূর্ণ এবং বৈপরীত্যে ভরা। আর কুরআনের বক্তব্য স্পষ্ট, সঙ্গত এবং যুক্তির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
পুরো ব্যবস্থাই তো আল্লাহ তাআলার
আজকাল অনেকে বলে, ‘এখন তো বিজ্ঞান এত উন্নত যে ডাক্তারকে বললে তিনি চাইলে ছেলে-সন্তানই দিয়ে দিতে পারেন।’ ঠিক আছে, ডাক্তার এটা করতে পারে। কিন্তু আসল কথা হলো, এখানে ডাক্তার বা বিজ্ঞানীর নিজের কোনো নতুন শক্তি নেই। তারা শুধু আল্লাহ তাআলা যে নিয়ম তৈরি করে রেখেছেন, সেই নিয়মটাই শিখে নিয়ে ব্যবহার করে।
ছেলে হবে কোন প্রক্রিয়ায়, মেয়ে হবে কোন প্রক্রিয়ায়—এসব পুরো ব্যবস্থাই তো আল্লাহ তাআলার বানানো। বিজ্ঞানীরা শুধু আল্লাহ তাআলার তৈরি সেই সিস্টেমটা স্টাডি করেছে। নিয়ম যখন আল্লাহ তাআলার—তাহলে কৃতিত্ব কার?
মানুষকে সবসময় একটা কথা বলা উচিত—‘তোমরা যদি সত্যিই নিজের ক্ষমতা দেখাতে চাও, তাহলে আল্লাহর নিয়ম বাদ দিয়ে নিজেদের নতুন নিয়ম বানাও। তারপর সেই নিয়মে একটা সন্তান তৈরি করে দেখাও।’
যতক্ষণ পর্যন্ত তারা আল্লাহর নিয়মই ব্যবহার করছে, ততক্ষণ পর্যন্ত সেটা আল্লাহর কৃতিত্বই থাকবে, মানুষের নয়।
দুনিয়ায় মানুষ অনেক বিষয় না দেখেই বিশ্বাস করে। কেউ বলে, ‘আমরা চাঁদে গিয়েছিলাম।’ আমরা কি তাদের সঙ্গে গিয়েছিলাম? না। তবুও খবর শুনে বিশ্বাস করি। তাহলে সৃষ্টিকর্তার দেওয়া বর্ণনাকে বিশ্বাস করতে এত দ্বিধা কেন?
ইসলামের শিক্ষা
ইসলাম মানুষকে চোখ খোলা রাখার শিক্ষা দেয়। চারপাশে তাকাতে বলে, চিন্তা করতে বলে।
আল্লাহ নিজেই বলেছেন
سِيرُوا فِي الْأَرْضِ فَانْظُرُوا كَيْفَ بَدَأَ الْخَلْقَ ۚ ثُمَّ اللَّهُ يُنْشِئُ النَّشْأَةَ الْآخِرَةَ ۚ إِنَّ اللَّهَ عَلَىٰ كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ
তোমরা পৃথিবীতে ভ্রমণ কর, অতঃপর লক্ষ্য কর কীভাবে আল্লাহ সৃষ্টির সূচনা করেছেন, অতঃপর আল্লাহ সৃষ্টি করবেন পরবর্তী সৃষ্টি, আল্লাহ সকল বিষয়ের উপর ক্ষমতাবান। [সূরা আনকাবূত : ২০]আর বলেছেন
أَفَلَا يَنظُرُونَ إِلَى الْإِبِلِ كَيْفَ خُلِقَتْ. وَإِلَى السَّمَاءِ كَيْفَ رُفِعَتْ. وَإِلَى الْجِبَالِ كَيْفَ نُصِبَتْ وَإِلَى الْأَرْضِ كَيْفَ سُطِحَتْ
উটকে দেখো, কেমন করে তাকে সৃষ্টি করা হয়েছে। আকাশ দেখো, কীভাবে তা ঊর্ধ্বে স্থাপন করা হয়েছে? পর্বতমালা দেখো, কীভাবে তা স্থাপন করা হয়েছে? ভূপৃষ্ঠ দেখো, কীভাবে তাকে বিছিয়ে দেয়া হয়েছে? অর্থাৎ আল্লাহ চান—মানুষ প্রকৃতির ভেতরে তাঁর শক্তির নিদর্শনগুলো দেখুক।
সবকিছুতেই প্রমাণ আছে—এগুলো মানুষের তৈরি কোনো নিয়ম নয়; এগুলো আল্লাহর কুদরতের নিখুঁত ব্যবস্থা। [সূরা গাশিয়া : ১৭-২০]
লতার কদু বড় আর গাছের আম ছোট কেন?
একজন মানুষ পথ চলতে চলতে প্রকৃতির দিকে তাকিয়ে নানা রকম চিন্তায় ডুবে ছিল। তার সামনে প্রথমে পড়ল একটি সরু, নরম লতা—যার উপর ঝুলছে বিশাল বিশাল কদু। দূর থেকে দেখলে মনে হয়, এই লতা যেন কষ্ট করে ওজন সামলাচ্ছে। সে থেমে বলল মনে মনে, ‘কী অদ্ভুত! এত পাতলা লতা আর তাতে এত বড় ফল!’
আরও কিছুদূর গেলে দেখল—একটি শক্ত, বিশাল আমগাছ। কিন্তু তার উপর ছোট ছোট আম। তার মনে আবার প্রশ্ন জাগল, ‘মানুষ বলে আল্লাহ আছেন... কিন্তু দেখো তো! কেমন অদ্ভুত আয়োজন! বড় গাছে ছোট ফল, আর ছোট লতায় বড় ফল!’ [নাউযুবিল্লাহ]
এমন চিন্তা করতে করতে সে আমগাছের নিচে শুয়ে পড়ল। গাছের পাতার ভেতর দিয়ে আলো ঝরে পড়ছিল তার মুখে। আর বাতাসের স্পর্শে তার চোখ ভার হয়ে এলো। সে ঘুমিয়ে গেল।
হঠাৎ উপর থেকে এক ছোট আম খুলে এসে তার মাথার পাশে জোরে লাগল। ব্যথায় সে চমকে জেগে উঠল। জেগে ওঠার সাথে সাথেই তার মনে যেন দরজার মতো এক উপলব্ধি খুলে গেল।
সে ফিসফিস করে বলল, ‘হে আল্লাহ... তোমার কাজ কত পরিপূর্ণ! যদি এই আমগুলো কদুর মতো বড় হত, আজ আমার মাথাটা থাকত না।’
কখনো কখনো আল্লাহ আমাদের বোঝানোর জন্য সামান্য একটা ধাক্কা দেন। আর সে ধাক্কা মানুষকে জাগায়—নিজের ভুল ধারণা থেকে, নিজের অন্ধত্ব থেকে, নিজের অহংকার থেকে।
মানুষ ভাবে সে বুঝে—আসলে সে শুধু দেখছে, বুঝছে না। কেননা আল্লাহর কাজ বোঝার জন্য চোখ নয়; হৃদয় লাগে।
আমরা কত কিছুই তো না-দেখে বিশ্বাস করি—হাওয়া, উষ্ণতা, চুম্বকীয় শক্তি, ভালোবাসা, মায়ের স্নেহ। এই সবই অদৃশ্য, তবুও কত বাস্তব, তাহলে যিনি সবকিছুর উৎস—তিনি অদৃশ্য হলেও কি কম বাস্তব?
ঈমান হলো মানুষের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ। এটি শুধু মাথার ধারণা নয়—এটি হৃদয়ের আলো। যার ভেতরে এই আলো থাকে, সে অন্ধকার রাস্তায়ও পথ খুঁজে পায়। আর যার ভেতরে আলো নেই, সে রোদ্দুরেও হারিয়ে যায়।
মানুষ আল্লাহকে নিশ্চিতভাবে অনুভব করে
একজন বড় বিজ্ঞানী—লর্ড কেলভিন—বলে গেছেন, ‘তুমি যত গভীর দেখবে, যত খুঁটিনাটি বুঝবে—শেষ পর্যন্ত বুঝতে বাধ্য হবে, একজন সৃষ্টিকর্তা আছেন। তিনি ছাড়া কিছুই ব্যাখ্যা করা যায় না।’
ঠিক তাই—যখন মানুষ মহাবিশ্বের দিকে ওপরে-ওপরে তাকায়, তখন সবকিছুই এলোমেলো মনে হয়। কিন্তু যখন সে গভীরে তাকায়—প্রতিটি পাতা, প্রতিটি রং, প্রতিটি সুবাস, প্রতিটি সুর—সবকিছু গেয়ে ওঠে, ‘একজন আছেন... যিনি আমাদের বানিয়েছেন।’
এই উপলব্ধি যখন হৃদয়ে বসে যায়, তখন মানুষ আর সন্দেহ করে না। তখন সে জানে—যিনি আমাকে সৃষ্টি করেছেন, তিনিই আমাকে দেখছেন, আমিই তাঁর কাছে ফিরব। তারপর সে মানুষটি বারবার আল্লাহর দিকে মাথা নামিয়ে বলল, ‘হে আল্লাহ, আমার ঈমানকে শক্ত কর। আমার ভিতরের আলোকে নিভতে দিও না। আমাকে সেই রাতগুলোর স্বাদ দাও যেখানে মানুষ তোমার কাছে সবচেয়ে নিকটে চলে যায়।’
আল্লাহ তাআলা মুসলিম উম্মাহকে ঈমানের ওপর অটল ও অবিচল থাকার তাওফিক দান করুন। সাদেক্বিন-সত্যবাদীদের সঙ্গে চলার এবং সুসম্পর্ক রাখার তাওফিক দান করুন। আমীন।
وَاخِرُ دَعْوَانَا أَنِ الْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِين
মন্তব্য (...)
এ সম্পর্কিত আরও প্রবন্ধ
স্রষ্টা ও তাঁর অস্তিত্ব
...
আল্লামা মনযুর নোমানী রহঃ
১০ নভেম্বর, ২০২৪
৮২১৪ বার দেখা হয়েছে
ধর্মনিরপেক্ষতা ও ইসলাম : বিভ্রান্তি নিরসনে মুসলমানদের যা জানা দরকার
...
আল্লামা উবায়দুর রহমান খান নদভী
১১ নভেম্বর, ২০২৪
২১৩৪২ বার দেখা হয়েছে
ইলমে দীন ও আধুনিক শিক্ষার সমন্বয় ভাবনা
[প্রদত্ত বয়ান থেকে সংগৃহীত] আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন,اليوم أكملت لكم دينكم وأتممت عليكم نعم...
আল্লামা সাঈদ আহমাদ পালনপুরী রহঃ
১১ নভেম্বর, ২০২৪
১৯২০৬ বার দেখা হয়েছে
ঈমান ভঙ্গের কারণসমূহ
ওযু করার পর কিছু কাজ করলে যেমন ওযু নষ্ট হয়ে যায় , ঠিক তেমনিভাবে ঈমান আনার পরও কিছু কথা, কাজ ও বিশ্বা...
মুফতী আমীর হোসাইন
১১ নভেম্বর, ২০২৪
৪২২৫৯ বার দেখা হয়েছে
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন