দীনই যথেষ্ট
দীনই যথেষ্ট
(প্রদত্তা বয়ান থেকে সংগঠিত)
أَعُوْذُ بِاللهِ مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّجِيْمِ، بِسْمِ اللهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِيْمِ، مَنْ عَمِلَ صَالِحًا مِّن ذَكَرٍ أَوْ أُنثَىٰ وَهُوَ مُؤْمِنٌ فَلَنُحْيِيَنَّهُ حَيَاةً طَيِّبَةً وَلَنَجْزِيَنَّهُمْ أَجْرَهُم بِأَحْسَنِ مَا كَانُوا يَعْمَلُونَ
وَقَالَ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ : يَا أَيُّهَا النَّاسُ، قُوْلُوا لَا إِلٰهَ إِلَّا اللهُ تُفْلِحُوْا، أَوْ كَمَا قَالَ عَلَيْهِ الصَّلَاةُ وَالسَّلَامُ.
আল্লাহ তাআলা আম্বিয়া আলাইহিমুস সালামদেরকে পাঠিয়েছেন পুরো দুনিয়ার মানুষকে ঈমান এবং আমলের দাওয়াত দেওয়ার জন্য। আর এই কথার ওয়াদা দিয়ে যে, যে ঈমানওয়ালা ও আমলওয়ালা হবে, আল্লাহ তাআলা তাকে দুনিয়া এবং আখেরাতে ভালো জীবন দান করবেন। পুরো দুনিয়ার মানুষ এ ছাড়া আর কিছু চায়ও না। কাফের হোক, মুশরিক হোক আর মুমিন হোক, চায় সে ভালো জীবন। আল্লাহ তাআলা মানুষকে ওইটার ওয়াদা দিয়েই পাঠিয়েছেন, যেটা দুনিয়ার সব মানুষ চায়। আল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ, মুসলমানরা আল্লাহ তাআলার এই কথাকে মানে, আমরা তাদের মধ্যে যারা মানি, যদি মানলাম তারপর আবার ঈমানের মেহনতের প্রয়োজন কী? মানি, আলহামদুলিল্লাহ, কিছু তো দাবি করতে পারি, কিন্তু এই মানার মধ্যে অনেক ফাঁক রয়ে গেছে। আল্লাহ তাআলা যে ঈমানের দাওয়াত দিয়েছেন আর আমরা যেভাবে মানি, তার মধ্যে বেশকিছু দূরত্ব আছে। ওইটার ব্যাপারে একটু আলোচনা করার ইচ্ছা, যাতে সেই দূরত্বটা কী তা বুঝতে পারি এবং ওটাকে দূর করতে পারি, যাতে আমরা সম্পূর্ণভাবে ঈমানের ওপর আসতে পারি।
আল্লাহর হুকুম মানা এটাকে একজন মুসলমান, সাধারণ মুসলমান প্রয়োজনীয় মনে করে, জরুরি মনে করে। কিন্তু এটাকে যথেষ্ট মনে করে না। জরুরি মনে করা আর যথেষ্ট মনে করার মধ্যে পার্থক্য আছে। অনেক ঈমানদার মা-বাবা এরকম আছেন, মেয়েকে বিয়ে দেবেন, জামাই যেন নামাজি হয় এটা তিনি চান, বেনামাজি ছেলের কাছে বিয়ে দেবেন না। তার মনে এটা নয় যে, নামাজি হওয়াই যথেষ্ট। জরুরি ঠিক কিন্তু যথেষ্ট মনে করেন না। বেনামাজি ছেলের সাথে বিয়ে দেবেন না, কারণ নামাজি হওয়া জরুরি মনে করেন। কিন্তু নামাজি হলেই যে যথেষ্ট হলো তা নয়, এরপরেও আরও অনেক কিছু দেখবেন। উপার্জন দেখবেন, বংশ-পরিচয় দেখবেন, এটা নির্ভর করে কার কী ধরনের নজর, কিন্তু এই জরুরির আদায় হয়ে যাওয়ার পর আরও অনেক জিনিস দেখবেন। আর আল্লাহ তাআলা আম্বিয়া আলাইহিমুস সালামদেরকে পাঠিয়েছেন এই কথা দিয়ে নয় যে ঈমান জরুরি; বরং এই কথা দিয়েও যে, ঈমান যথেষ্ট। তো দুটো কথার মধ্যে অনেক পার্থক্য আছে। যে যথেষ্ট মনে করবে, সে তার সম্পূর্ণ শক্তি ঈমানের ওপর ঢালবে, অন্য কী হলো না হলো, তার প্রতি ততটা গুরুত্ব দেবে না। আর যে জরুরি মনে করে, সে তার আংশিক চিন্তা ঢালবে, আর অন্যান্য জিনিস যেগুলো জরুরি মনে করে, সেগুলোকেও সমানভাবে দেখবে।
আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু নিজ মেয়েদেরকে সূরা ওয়াকেয়া শিখিয়েছেন। তিনি তাদেরকে তাগিদ করেছেন যে, তারা যেন নিয়মিত সূরা ওয়াকেয়া পড়ে। কেউ একবার তাঁকে জিজ্ঞাসা করল যে, আপনার মেয়েদের জন্য কী বন্দোবস্ত করেছেন? তিনি বললেন যে, তাদেরকে আমি সূরা ওয়াকেয়া শিখিয়েছি এবং তারা পড়ে। মানে একটা ভালো নিশ্চিত বন্দোবস্ত হয়ে গেছে। এই যমানায় একজন মানুষ যেভাবে বলে যে, বাড়ি বানিয়ে দেওয়া হয়েছে, আর প্রতিটি মেয়ের নামে একটা বাড়ি দলিল করে দিয়ে দেওয়া হয়েছে, তো ইনশাআল্লাহ আল্লাহ তাআলা যেকোনোভাবে চালাবে। তো শেষে এই কথা বলছে যে আল্লাহ তাআলাই চালাবে, কিন্তু কিসের ওপর ভরসা করে? প্রতিটি মেয়ের নামে একটা বাড়ি দলিল করে দিয়ে দেওয়া আছে। একজন মুসলমান বর্তমানে যেভাবে একটা নিশ্চয়তার সাথে বলতে পারে যে, একটা ভালো বন্দোবস্ত— আমার পক্ষে যতটুকু সম্ভব ছিল হয়ে গেছে। এই যমানায়ও সাধারণ মানুষ, তার যদি কেউ মনে করা যাক ছেলে অসুস্থ হলো, বড় ধরনের রোগ, ক্যান্সার-ট্যান্সার হয়েছে, তো চিকিৎসা করাচ্ছে সাথে সাথে সদকা, খয়রাত, কুরআন শরিফের খতম পড়া ইত্যাদি করে। তো ওই যে সদকা-খয়রাত করছে, কুরআন শরিফ খতম পড়ছে, দোয়া করছে, তার মানে এটা নয় যে, এটাকে সে যথেষ্ট মনে করছে। তার প্রধান নজর তো চিকিৎসার দিকে। সাথে সাথে এগুলোও করছে। আর আল্লাহ তাআলা যে ঈমান দিয়েছেন, ওটা ওই ঈমানকেই যথেষ্ট বানিয়ে দিয়েছেন। এটা নয় যে, এটা আনুষাঙ্গিক, সাথে রাখার জিনিস। আমরা ব্যবসা-বাণিজ্য করি আর সাথে সাথে সূরা ওয়াকেয়াও পড়ি, আর আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু সূরা ওয়াকেয়া পড়াকে যথেষ্ট মনে করেছেন।
তো, শুধু একজন ব্যক্তি নয় পুরো উম্মতকে আল্লাহ তাআলা এই কথার ওপর উঠিয়েছেন যে আমল দিয়ে, দোয়া দিয়ে, আমাদের ছোট কাজ হোক, আর বড় কাজ হোক, যেন সমাধা করতে পারি। তুচ্ছ ব্যাপার, জুতার ফিতা ছিঁড়ে গেছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শিক্ষা দিয়েছেন যে, জুতার ফিতাও যদি ছিঁড়ে যায়, তো আল্লাহর কাছ থেকে চেয়ে নাও দোয়া করে। তার মানে এটা নয় যে, কেউ যদি পকেটের টাকা দিয়ে দোকান থেকে ফিতা কেনে, তাহলে গুনাহর কাজ করল, নাজায়েজ। না, গুনাহও নয়, নাজায়েজও নায়। তো যায়েজ টাকা দিয়ে দোকান থেকে কিনল যায়েজভাবে, এটা গুনাহও নয়, নাজায়েজও নয়; কিন্তু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যেটার দাওয়াত দিয়েছেন ওটা হচ্ছে আমল দিয়ে করো, ওটা উত্তম।
বদরের ময়দানে আল্লাহ তাআলা সাহাবাদের নিয়ে এসেছেন আর মুশরিকদের সাথে আল্লাহ তাআলা মোকাবেলা করিয়েছেন বিনা অস্ত্রে। মুসলমানদের কাছে সংখ্যাও ছিল না, অস্ত্রও ছিল না। আল্লাহ তাআলা এমনভাবেই করালেন। তার মানে এটা নয় যে, ঢাল-তলোয়ার ব্যবহার করা নাজায়েজ। কিন্তু আল্লাহ তাআলা বিনা অস্ত্রে বিনা আসবাবের সামনে তাদেরকে এনেছেন এবং ওই অবস্থায় ফাতাহ দিয়েছেন। দেখার জন্য যে আমল যথেষ্ট। إِذْ تَسْتَغِيثُونَ رَبَّكُمْ فَاسْتَجَابَ لَكُمْ 'তোমরা তোমাদের রবের যখন সাহায্য চাইলে, আল্লাহ তাআলা সাহায্য করলেন।' তো আম্বিয়া আলাইহিমুস সালামদেরকে পাঠিয়েছেন মানুষকে সম্পূর্ণভাবে আমলের ওপর ওঠাবার জন্য। জাগতিক কোনো নিয়ম কোনো শক্তির ওপর নির্ভরশীল না থাকা, এমনকি তার ওপর সম্পূর্ণও না থাকা। পুরাপুরি যেন ঈমানের ওপর সে ওঠে। এ জন্য আল্লাহ তাআলা এমন ইন্তেজাম করেছেন যে, সব আসবাব থেকে সরিয়ে দিয়েছেন, যাতে কেউ এ কথা মনে করতে না পারে যে, হ্যাঁ, আল্লাহ তাআলা সাহায্য করেছেন, কিন্তু তলোয়ারও ভালো ছিল; এই কথা বলার যেন কোনো অবকাশই না থাকে। যাতে মনে কোনো সন্দেহ না থাকে। সন্দেহমুক্তভাবে সম্পূর্ণভাবে আমলভিত্তিক জীবন।
দোয়া করে নামাজ পড়ে ব্যক্তি নামাজ বন্ধ করানো যায়, এ কথা কেউ শুনল। কারও কাছে গিয়ে জিজ্ঞাসা করল যে, এই কথা কি সত্য না কি? হ্যাঁ। কেমন করে করতে হয়? তো বলে দিলেন ভালো করে নামাজ পড়ে নিয়ে ভালো করে দোয়া করবে, ইনশাআল্লাহ বৃদ্ধি হবে। তবে একটু খেয়াল রাখবে যেন শাবান মাস হয়। নামাজ পড়ে দোয়া করলে বৃদ্ধি হয় ঠিক, কিন্তু শর্তও আছে, শাবান মাস হতে হবে। তো যে এই শর্তের সাথে এই দোয়া শেখাল, ও দোয়াও করবে, নামাজও পড়বে, বৃদ্ধিও হয়তো হয়ে যাবে, কিন্তু মনে মনে ভাববে যে শাবান মাস যদি না হতো তাহলে কী হতো। আর শাবান মাসে তো দোয়া ছাড়াই বৃদ্ধি হয়, তো ওটা আবার কী ধরনের দোয়া হলো। তো ওটা ওই ধরনের হলো যে, একটা পণ্ডিত ছিল খুব মূর্খ জানত, কেউ তাকে জিজ্ঞাসা করল যে, মুর্খ পড়ে একদল ভেড়াকে মেরে ফেলা যায় কি না? পণ্ডিত বলল, হ্যাঁ, এরকম খুব শক্তিশালী মন্ত্র আছে, মন্ত্র যদি পড়া হয় তো ভেড়াগুলো মরে যাবে, তবে একটু বিষও খাইয়ে দিয়ো। তো মন্ত্রে ভেড়া তো মরবে ঠিক, কিন্তু শর্তও আছে যে বিষ খাওয়াতে হবে। তো যাকে বলল যে, দোয়া করলে বৃদ্ধি নামাজ বন্ধ হয়ে যায় কিন্তু শাবান মাস হতে হবে, সে-ও এই কথায় বলবে যে, এই মন্ত্রের আবার কী মূল্য যে, যদি শাবান মাসই হতে হয়। তো যে-কেউ ভাববে যে, এই দোয়ার আবার কী শক্তি যে, শাবান মাসও লাগছে। শাবান মাসেই যদি করত তাহলে কী আর হতো না। তো যদি শাবান মাস না হতো তাহলে কী হতো, এটাই সবাই ভাববে যে, এই দোয়াই আবার কী হলো যে, শাবান মাসও লাগছে। ভালো মানেন কিন্তু জরুরি মনে করেন না।
আল্লাহ তাআলা আম্বিয়া আলাইহিমুস সালামদেরকে এই দুই কথার কোনো কথা দিয়েই পাঠাননি। বরং আল্লাহ তাআলা তো ওই কথা দিয়ে পাঠিয়েছেন যে, ঈমান যথেষ্ট। এটা ভালো তাও নয়, এটা জরুরি তাও নয়, এটা যথেষ্ট। যথেষ্ট মানে একটা ছেলে ঈমানদার, সম্পূর্ণভাবে ঈমানদার, মুত্তাকি, পরহেজগার, এরপরে আর তার কাছে জমি-জমা আছে কি না, ডিগ্রি আছে কি না, চাকরি আছে কি না, আর কিছু দেখার প্রয়োজনই নেই। এটা যথেষ্ট। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:
مَنْ عَمِلَ صَالِحًا مِّن ذَكَرٍ أَوْ أُنثَىٰ وَهُوَ مُؤْمِنٌ فَلَنُحْيِيَنَّهُ حَيَاةً طَيِّبَةً
আমরা বা বর্তমানের মুসলমানরা যারা আছি, আমাদের মধ্যেও অনেকে সূরা ওয়াকেয়া পড়ি বা আমরা আমাদের ছেলে-মেয়েদেরকে পড়তে বলছি, তারা পড়ে। কিন্তু নিজে যে সূরা ওয়াকেয়া পড়ছি এটাকে যথেষ্ট মনে করি না; বরং আমার ভরসা তো দোকানের ওপর, বেতনের ওপর, জমির ওপর; এমনকি রিটায়ার্ড যে করেছে তার পেনশনের ওপর। সূরা ওয়াকেয়া যে পড়ছে তাহলে ওটা কিসের? একটা অতিরিক্ত জিনিস, অতিরিক্ত সমর্থন। এটার ওপর সম্পূর্ণ ভরসা করছি না। আর আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু এটাকে যথেষ্ট মনে করেছেন। এখানে বড় পার্থক্য হলো যে, আল্লাহর হুকুম আদায় করা, ওটাকে যথেষ্ট মনে করা, আর আরেক হলো এটাকে ভালো মনে করা। আমরা অনেকে ভালো মনে করি, আরেক ধাপ আগে যায়। ভালোর চেয়ে আরও ভালো, প্রয়োজনীয় মনে করি, কিন্তু ঈমান দাবি করে আমি যেন যথেষ্ট মনে করি। ওই যে বললাম, একজন বাপ এরকম যে, মেয়েকে বিয়ে দেবেন তো ছেলে যদি নামাজি হয় তো ভালো, এটা ঈমানের এক স্তরের ঈমানদারিতে পৌঁছালেন। ভালোর মানেন কিন্তু জরুরি মনে করেন না। যদি অন্যান্য জিনিসে পছন্দ হয় তাহলে বেনামাজির কাছে বিয়ে দিয়ে দিলেন যে, বংশ-পরিচয় ভালো, চাকুরি ভালো, আর এই ভালো জিনিসের উপরে আর নামাজ পড়েই না বলে আর দিলাম না। কিন্তু ঈমান দাবি করে যে নামাজ, নামাজ বলতে আমি সম্পূর্ণ ঈমানদারির প্রতীক হিসেবে বলছি যে, একজন মানুষ ঈমানদার, মুত্তাকি, পরহেজগার, এরপরে আর তার মধ্যে উপার্জন আছে কি না, ডিগ্রি আছে কি না, বংশ-পরিচয় ভালো কি না, আর কিছু দেখবেই না, যত ভালো চাকরিই হোক না কেন, যত ভালোই ডিগ্রি হোক, যত সুন্দর চেহারা হোক, যত ভালো বংশ-পরিচয় হোক, বেনামাজির কাছে দেবোই না। তাঁর ঈমানদারি আরেক স্তরের উপরের, এটাকে জরুরি মনে করেন। আর আরেক স্তরের ঈমানদারি হবে যে, সব দিক খুবই পছন্দ হয়েছিল, কিন্তু নামাজ পড়ে না বলে আর দিলাম না। আরেক স্তর হলো যে, সব দিক খুব খারাপ হলেও সহ্য করবে যে, যা আছে ওটা ভালো, যেহেতু তার চাকরি ভালো, ডিগ্রি ভালো, চেহারা ভালো, বংশ-পরিচয় ভালো, তো যেরকম কথায় বলে যে সব দিক দিয়ে ভালো শুধু নামাজ পড়ে না, এ জন্য মন খারাপ যে সব স্বপ্ন ভানিশ। আর একজন হলেন যে, বেনামাজির কাছে দেবেন না যত ভালো পাত্র হোক, এটাকে জরুরি মনে করেছেন।
আল্লাহ তাআলা আম্বিয়া আলাইহিমুস সালামদেরকে পাঠিয়েছেন পুরো দুনিয়ার মানুষকে এই বিষয়ে আহ্বান করতে যাতে এক-একজন ব্যক্তি সুন্দর হয়। আর আল্লাহর নজরে যে সুন্দর হবে, মানুষের নজরেও সে সুন্দর হবে। আল্লাহ তাআলা মানুষকে দাওয়াতও দিয়েছেন ওই ব্যক্তিদের দিকে। ইরশাদ করেন: آمِنُوا كَمَا آمَنَ النَّاسُ 'তোমরা ঈমান আনো যেরকম মানুষরা ঈমান এনেছে।' তো আল্লাহ তাআলা আম্বিয়া আলাইহিমুস সালামদেরকে ওই ঈমান দিয়ে পাঠিয়েছেন, যে ঈমান যথেষ্ট। আর যদি ঈমান যথেষ্ট হয় তাহলে এরপরে আর তার কাছে জমি-জমা আছে কি না, উপার্জন আছে কি না, শিক্ষা আছে কি না, সবকিছু দেখার প্রয়োজন নেই। ঈমানই যথেষ্ট।
সাঈদ ইবনে মুসাইয়িব রহমাতুল্লাহি আলাইহি, বড় নামকরা তাবেয়ী ছিলেন। আল্লাহওয়ালা ছিলেন, আলিম ছিলেন, তো আলিমদের মজলিসে লোকজন আসতে থাকে ফায়দা নেওয়ার জন্য। কোনো একজন ব্যক্তি, বিশেষ শাগরেদ মধ্যখানে কয়েকদিন আসেননি, কিছুদিন পড়ে যখন আবার এলেন তো জিজ্ঞাসা করলেন যে, কী ব্যাপার, গত কয়েকদিন তোমাকে দেখলাম না। তো বললেন যে, আমার স্ত্রী অসুস্থ ছিলেন আর তারপর তিনি ইন্তেকালও করেছেন, তো সে জন্য ওই অসুস্থতার কারণে এবং ইন্তেকালের কারণে মধ্যখানে কয়েকদিন আসতে পারিনি। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন যে, তুমি আবার বিয়ে করেছ না কি? না, আর আমার কাছে দেবেই-বা কে, একেবারে গরিব মানুষ, একবেলা খাওয়ার বন্দোবস্তও নেই। তিনি বললেন যে, তুমি যদি পছন্দ করো তো আমিই দেবো, আপনি দেন তো আপনার অনুগ্রহ, তো ওই মজলিসেই বিয়ে দিয়ে দিলেন। তো বিয়ে পড়া তো হয়ে গেছে, এখন তিনি তাঁর, আবদুল্লাহ তাঁর নাম, ঘরে ফিরে গেছেন, আর গিয়ে চিন্তা করলেন বউকে এখন কেমন করে ঘরে তোলেন, অস্থিপরে প্রথম বেলা তো খাওয়া-দাওয়ার বন্দোবস্ত করতে হবে। ওই চিন্তার মধ্যেই ছিলেন, কিছুক্ষণ পরে সত্তরের দিকে বাপই মেয়েকে নিয়ে এসে ঘরে পৌঁছে দিলেন, আর যখন ঘরে পৌঁছিয়েছেন, তাঁর ঘরের আসবাবের মধ্যে শুকনো রুটির টুকরা ছিল আর জয়তুনের কিছু তেল ছিল। এ ছাড়া টাকা-পয়সাও নেই যে আরও কিছু কিনবেন। তো একেবারেই গরিব লোকের কাছে বিয়ে দিলেন। আমরা স্বাভাবিকভাবেই ধারণা করব যে বেচারা ঠিকায়, কোনো জামাই পাচ্ছে না, কী আর করবে, তো গরিবের কাছেই শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়েই দিতে হলো, তা নয়। তখনকার বাদশা ছিলেন আবদুল মালিক। আবদুল মালিক তার ছেলে—যিনি পরবর্তী সময়ে বাদশা হয়েছেন, সম্ভবত ওয়ালিদ—ওয়ালিদের জন্য বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছিলেন এই মেয়ের। আর আবদুল মালিকের বাদশাহি ছিল। ওই বাদশাহির ভেতর বা খেলাফতের ভেতরে এই বাংলাদেশের মতো অনেকগুলো বাংলাদেশ ঢুকে যাবে। বাংলাদেশ মোটামুটি হিসাবের মধ্যেই পড়বে না, এত প্রশস্ত ছিল, এদিকে সিটু পর্যন্ত প্রশস্ত, আর ওদিকে আফ্রিকার উত্তর অংশ পর্যন্ত। বর্তমানের সম্পূর্ণ মধ্যপ্রাচ্য যেটাকে বলা হয়, ওটা তো আছেই, তার চেয়ে আরও কিছু বেশি। সিটু পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্য বলা হয় না, পাকিস্তানের একটা অংশ পর্যন্ত আর আফ্রিকা পর্যন্ত যার অধীনে, আর সেই যুবরাজ তার জন্য প্রস্তাব দিলেন, আর সে যে পাগল মাতাল রোগী এমন কিছু নয়, সুস্থ স্বাভাবিক মানুষ; কিন্তু তার কাছে না দিয়ে ওই ছেলের কাছে দিলেন, যে প্রথম বেলা ঘরে নেওয়ার পরে শুকনো রুটির টুকরা আর জয়তুনের তেল ছাড়া আর কিছুই নেই। বাপও পাগল নয়, আর মেয়েও পাগল নয়। কেন? কারণ, ঈমান পরিপূর্ণ, এরপরে আর কিছু দেখার দরকার নেই, আর প্রয়োজন মনে করেনি। আর এই বিয়ে দেননি বলে বাদশা আবদুল মালিক অসন্তুষ্ট হয়েছেন, এই কথা তো আর বলা যায় না যে আমার ছেলের জন্য মেয়েকে বিয়ে দেননি, অন্য কোনো ছুটো করে তাকে শাস্তি দিয়েছেন শীতের সময় একশো কলসি ঠান্ডা পানি তার ওপর ঢালার, এরকম শাস্তি কিছু দেওয়া হয়েছে নানান ধরনের অজুহাত করে। রাগ লেগেছে, অহংকারের ওপর আঘাত লেগেছে যে, যুবরাজের জন্য তার মেয়ের প্রস্তাব দিলাম আর তিনি দিলেন না, তো অহংকারে যখন মানুষের লাগে তো ছটফট করে, কিন্তু কিছু করতেও পারে না।
সাঈদ ইবনে মুসাইয়িব রহমাতুল্লাহ আলাইহ ঈমানকে যথেষ্ট মনে করেছেন। এ জাতীয় সিদ্ধান্ত আমাদের জন্য বোধগম্য নয়। বুঝতেই পারব না যে কী ধরনের কথা হলো। কোথায় এক যুবরাজ, যার রাজ্য একেবারে সিটু থেকে আফ্রিকা পর্যন্ত প্রশস্ত, আর কোথায় ওই ব্যক্তি যে প্রথম বেলা শুকনো রুটির টুকরা ছিল আর জয়তুনের কিছু তেল ছিল। এ ছাড়া আর কিছু দিতে পারছে না তার নিকট সম্পদ নেই, তো তাকে বিয়ে দিলেন না দিয়ে ওখানে দিলেন, যে প্রথম বেলা ঘরে নেওয়ার পরে শুকনো রুটি আর জয়তুনের তেল ছাড়া আর কিছুই নেই। কেন? কারণ ঈমান পরিপূর্ণ হলে কিছু দেখার দরকার নেই।
আল্লাহ তাআলা আম্বিয়া আলাইহিমুস সালামদেরকে এই কথা দিয়ে পাঠিয়েছেন আর এই কথা দিয়ে পাঠিয়েছেন যে, ঈমান যথেষ্ট। ঈমান যথেষ্ট মানে একটা ছেলে ঈমানদার, সম্পূর্ণভাবে ঈমানদার, এরপরে আর তার কাছে জমি-জমা আছে কি না, ডিগ্রি আছে কি না, চাকরি আছে কি না, বংশ-পরিচয় কী, এরপরে আর কিছু দেখার প্রয়োজনই নেই। কোনো অসুবিধাই নেই।
সাঈদ ইবনে মুসাইয়িব রহমাতুল্লাহি আলাইহি, বড় নামকরা তাবেয়ী ছিলেন। আল্লাহওয়ালা ছিলেন, আলিম ছিলেন, তো আলিমদের মজলিসে লোকজন আসতে থাকে ফায়দা নেওয়ার জন্য। কোনো একজন ব্যক্তি, বিশেষ শাগরেদ মধ্যখানে কয়েকদিন আসেননি, কিছুদিন পড়ে যখন আবার এলেন তো জিজ্ঞাসা করলেন যে, কী ব্যাপার, গত কয়েকদিন তোমাকে দেখলাম না। তো বললেন যে, আমার স্ত্রী অসুস্থ ছিলেন আর তারপর তিনি ইন্তেকালও করেছেন, তো সে জন্য ওই অসুস্থতার কারণে এবং ইন্তেকালের কারণে মধ্যখানে কয়েকদিন আসতে পারিনি। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন যে, তুমি আবার বিয়ে করেছ না কি? না, আর আমার কাছে দেবেই-বা কে, একেবারে গরিব মানুষ, একবেলা খাওয়ার বন্দোবস্তও নেই। তিনি বললেন যে, তুমি যদি পছন্দ করো তো আমিই দেবো, আপনি দেন তো আপনার অনুগ্রহ, তো ওই মজলিসেই বিয়ে দিয়ে দিলেন।
তো বিয়ে পড়া তো হয়ে গেছে, এখন তিনি তাঁর, আবদুল্লাহ তাঁর নাম, ঘরে ফিরে গেছেন, আর গিয়ে চিন্তা করলেন বউকে এখন কেমন করে ঘরে তোলেন, অস্থিপরে প্রথম বেলা তো খাওয়া-দাওয়ার বন্দোবস্ত করতে হবে। ওই চিন্তার মধ্যেই ছিলেন, কিছুক্ষণ পরে সত্তরের দিকে বাপই মেয়েকে নিয়ে এসে ঘরে পৌঁছে দিলেন, আর যখন ঘরে পৌঁছিয়েছেন, তাঁর ঘরের আসবাবের মধ্যে শুকনো রুটির টুকরা ছিল আর জয়তুনের কিছু তেল ছিল। এ ছাড়া টাকা-পয়সাও নেই যে আরও কিছু কিনবেন। তো একেবারেই গরিব লোকের কাছে বিয়ে দিলেন।
আমরা স্বাভাবিকভাবেই ধারণা করব যে বেচারা ঠিকায়, কোনো জামাই পাচ্ছে না, কী আর করবে, তো গরিবের কাছেই শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়েই দিতে হলো, তা নয়। তখনকার বাদশা ছিলেন আবদুল মালিক। আবদুল মালিক তার ছেলে—যিনি পরবর্তী সময়ে বাদশা হয়েছেন, সম্ভবত ওয়ালিদ—ওয়ালিদের জন্য বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছিলেন এই মেয়ের। আর আবদুল মালিকের বাদশাহি ছিল। ওই বাদশাহির ভেতর বা খেলাফতের ভেতরে এই বাংলাদেশের মতো অনেকগুলো বাংলাদেশ ঢুকে যাবে। বাংলাদেশ মোটামুটি হিসাবের মধ্যেই পড়বে না, এত প্রশস্ত ছিল, এদিকে সিন্ধু পর্যন্ত প্রশস্ত, আর ওদিকে আফ্রিকার উত্তর অংশ পর্যন্ত। বর্তমানের সম্পূর্ণ মধ্যপ্রাচ্য যেটাকে বলা হয়, ওটা তো আছেই, তার চেয়ে আরও কিছু বেশি। সিন্ধু পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্য বলা হয় না, পাকিস্তানের একটা অংশ পর্যন্ত আর আফ্রিকা পর্যন্ত যার অধীনে, আর সেই যুবরাজ তার জন্য প্রস্তাব দিলেন, আর সে যে পাগল মাতাল রোগী এমন কিছু নয়, সুস্থ স্বাভাবিক মানুষ; কিন্তু তার কাছে না দিয়ে ওই ছেলের কাছে দিলেন, যে প্রথম বেলা ঘরে নেওয়ার পরে শুকনো রুটির টুকরা আর জয়তুনের তেল ছাড়া আর কিছুই নেই। বাপও পাগল নয়, আর মেয়েও পাগল নয়। কেন? কারণ, ঈমান পরিপূর্ণ, এরপরে আর কিছু দেখার দরকার নেই, আর প্রয়োজন মনে করেনি।
আর এই বিয়ে দেননি বলে বাদশা আবদুল মালিক অসন্তুষ্ট হয়েছেন, এই কথা তো আর বলা যায় না যে আমার ছেলের জন্য মেয়েকে বিয়ে দেননি, অন্য কোনো ছুটো করে তাকে শাস্তি দিয়েছেন শীতের সময় একশো কলসি ঠান্ডা পানি তার ওপর ঢালার, এরকম শাস্তি কিছু দেওয়া হয়েছে নানান ধরনের অজুহাত করে। রাগ লেগেছে, অহংকারের ওপর আঘাত লেগেছে যে, যুবরাজের জন্য তার মেয়ের প্রস্তাব দিলাম আর তিনি দিলেন না, তো অহংকারে যখন মানুষের লাগে তো ছটফট করে, কিন্তু কিছু করতেও পারে না।
সাঈদ ইবনে মুসাইয়িব রহমাতুল্লাহ আলাইহ ঈমানকে যথেষ্ট মনে করেছেন। এ জাতীয় সিদ্ধান্ত আমাদের জন্য বোধগম্য নয়। বুঝতেই পারব না যে কী ধরনের কথা হলো। কোথায় এক যুবরাজ, যার রাজ্য একেবারে সিন্ধু থেকে আফ্রিকা পর্যন্ত প্রশস্ত, আর কোথায় ওই ব্যক্তি যে প্রথম বেলা শুকনো রুটির টুকরা ছিল আর জয়তুনের কিছু তেল ছিল।
তো, শুধু একজন ব্যক্তি নয় পুরো উম্মতকে আল্লাহ তাআলা এই কথার ওপর উঠিয়েছেন যে আমল দিয়ে, দোয়া দিয়ে, আমাদের ছোট কাজ হোক, আর বড় কাজ হোক, যেন সমাধা করতে পারি। তুচ্ছ ব্যাপার, জুতার ফিতা ছিঁড়ে গেছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শিক্ষা দিয়েছেন যে, জুতার ফিতাও যদি ছিঁড়ে যায়, তো আল্লাহর কাছ থেকে চেয়ে নাও দোয়া করে। তার মানে এটা নয় যে, কেউ যদি পকেটের টাকা দিয়ে দোকান থেকে ফিতা কেনে, তাহলে গুনাহর কাজ করল, নাজায়েজ। না, গুনাহও নয়, নাজায়েজও নয়। তো যায়েজ টাকা দিয়ে দোকান থেকে কিনল যায়েজভাবে, এটা গুনাহও নয়, নাজায়েজও নয়; কিন্তু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যেটার দাওয়াত দিয়েছেন ওটা হচ্ছে আমল দিয়ে করো, ওটা উত্তম।
বদরের ময়দানে আল্লাহ তাআলা সাহাবাদের নিয়ে এসেছেন আর মুশরিকদের সাথে আল্লাহ তাআলা মোকাবেলা করিয়েছেন বিনা অস্ত্রে। মুসলমানদের কাছে সংখ্যাও ছিল না, অস্ত্রও ছিল না। আল্লাহ তাআলা এমনভাবেই করালেন। তার মানে এটা নয় যে, ঢাল-তলোয়ার ব্যবহার করা নাজায়েজ। কিন্তু আল্লাহ তাআলা বিনা অস্ত্রে বিনা আসবাবের সামনে তাদেরকে এনেছেন এবং ওই অবস্থায় ফাতাহ দিয়েছেন। দেখার জন্য যে আমল যথেষ্ট।
إِذْ تَسْتَغِيثُونَ رَبَّكُمْ فَاسْتَجَابَ لَكُمْ
'তোমরা তোমাদের রবের যখন সাহায্য চাইলে, আল্লাহ তাআলা সাহায্য করলেন।'
তো আম্বিয়া আলাইহিমুস সালামদেরকে পাঠিয়েছেন মানুষকে সম্পূর্ণভাবে আমলের ওপর ওঠাবার জন্য। জাগতিক কোনো নিয়ম কোনো শক্তির ওপর নির্ভরশীল না থাকা, এমনকি তার ওপর সম্পূর্ণও না থাকা। পুরাপুরি যেন ঈমানের ওপর সে ওঠে। এ জন্য আল্লাহ তাআলা এমন ইন্তেজাম করেছেন যে, সব আসবাব থেকে সরিয়ে দিয়েছেন, যাতে কেউ এ কথা মনে করতে না পারে যে, হ্যাঁ, আল্লাহ তাআলা সাহায্য করেছেন, কিন্তু তলোয়ারও ভালো ছিল; এই কথা বলার যেন কোনো অবকাশই না থাকে। যাতে মনে কোনো সন্দেহ না থাকে। সন্দেহমুক্তভাবে সম্পূর্ণভাবে আমলভিত্তিক জীবন।
দোয়া করে নামাজ পড়ে বৃদ্ধি নামানো যায়, এ কথা কেউ শুনল। কারও কাছে গিয়ে জিজ্ঞাসা করল যে, এই কথা কি সত্য না কি? হ্যাঁ। কেমন করে করতে হয়? তো বলে দিলেন ভালো করে নামাজ পড়ে নিয়ে ভালো করে দোয়া করবে, ইনশাআল্লাহ বৃদ্ধি হবে। তবে একটু খেয়াল রাখবে যেন শাবান মাস হয়। নামাজ পড়ে দোয়া করলে বৃদ্ধি হয় ঠিক, কিন্তু শর্তও আছে, শাবান মাস হতে হবে। তো যে এই শর্তের সাথে এই দোয়া শেখাল, ও দোয়াও করবে, নামাজও পড়বে, বৃদ্ধিও হয়তো হয়ে যাবে, কিন্তু মনে মনে ভাববে যে শাবান মাস যদি না হতো তাহলে কী হতো। আর শাবান মাসে তো দোয়া ছাড়াই বৃদ্ধি হয়, তো ওটা আবার কী ধরনের দোয়া হলো।
তো ওটা ওই ধরনের হলো যে, একটা পণ্ডিত ছিল খুব মূর্খ জানত, কেউ তাকে জিজ্ঞাসা করল যে, মন্ত্র পড়ে একদল ভেড়াকে মেরে ফেলা যায় কি না? পণ্ডিত বলল, হ্যাঁ, এরকম খুব শক্তিশালী মন্ত্র আছে, মন্ত্র যদি পড়া হয় তো ভেড়াগুলো মরে যাবে, তবে একটু বিষও খাইয়ে দিয়ো। তো মন্ত্রে ভেড়া তো মরবে ঠিক, কিন্তু শর্তও আছে যে বিষ খাওয়াতে হবে। তো যাকে বলল যে, দোয়া করলে বৃদ্ধি হয় কিন্তু শাবান মাস হতে হবে, সে-ও এই কথায় বলবে যে, এই মন্ত্রের আবার কী মূল্য যে, যদি শাবান মাসই হতে হয়। তো যে-কেউ ভাববে যে, এই দোয়ার আবার কী শক্তি যে, শাবান মাসও লাগছে। শাবান মাসেই যদি করত তাহলে কী আর হতো না।
তো যদি শাবান মাস না হতো তাহলে কী হতো, এটাই সবাই ভাববে যে, এই দোয়াই আবার কী হলো যে, শাবান মাসও লাগছে। ভালো মানেন কিন্তু জরুরি মনে করেন না। তো যে-কেউ ভাববে যে, এই দোয়ার আবার কী শক্তি, যদি শাবান মাসই হতে হয়। তো সে-ও এই কথায় বলবে যে, ওই দোয়ার আবার কী মূল্য, যদি বিষই খাওয়াতে হয়। তো যার কাছে গেল যে, দোয়া করলে বৃদ্ধি নামানো যায় কি না, সে লোক বুঝতে পারল যে তার সমস্যা কী, হ্যাঁ নামানো যায়। ঠিক আছে করে দেখান। এখন দেখানো যাবে না, শাবান মাসে এসো। এখনই দেখান, তখন ছিল শাবান মাস, এখন দেখানো যাবে না, শাবান মাসে এসো। শাবান মাসে তারপর তার কাছে গেল, নামাজ পড়ল, বৃদ্ধি হলো, তখন সে বুঝল, হ্যাঁ হয়। শাবান মাস পর্যন্ত কেন অপেক্ষা করল, যাতে মনের সন্দেহ দূর হয়। শাবান মাসেই যদি করত তাহলে ওই সন্দেহ রয়ে যেত। তো আল্লাহ তাআলা ওই জন্য সন্দেহ দূর করার জন্য সাহাবাদেরকে মোকাবেলা করিয়েছেন বিনা অস্ত্রে। অস্ত্র থাকা অবস্থায়ই যদি সাহায্য করতেন তাহলে দুর্বলমনা যারা, ওই যমানার না হোক, পরবর্তীকালের, তারা ভাবত যে, হ্যাঁ, আল্লাহ তো সাহায্য করেছেন ঠিক, কিন্তু অস্ত্রও ভালো ছিল। যাতে এই সন্দেহের অবকাশ না থাকে। যাতে মনে কোনো সন্দেহ না থাকে। সন্দেহমুক্তভাবে সম্পূর্ণভাবে আমলভিত্তিক জীবন।
ওই একই কারণে আল্লাহ তাআলা একইভাবে ইবরাহিম আলাইহিস সালামকে মরুভূমিতে পাঠিয়েছেন, আরবে যেখানে কোনো পানি পাওয়া যায় না, চাষাবাদ হয় না। আর নামাজ কায়েম করিয়েছেন, আর নামাজ কায়েম করানোর পরে আল্লাহ তাআলা হুকুম দিয়েছেন যে, দোয়া করো যে, তোমার আল্লাহ তাআলা ওই মরুভূমিতে যেন ফলের রিজিক খাওয়ান।
وَيَرْزُقْهُم مِّنَ الثَّمَرَاتِ لَعَلَّهُمْ يَشْكُرُونَ
'তাদেরকে ফলের রিজিক খাওয়ান, যাতে তারা শোকর আদায় করে।'
তো ফলের রিজিকের জন্য আল্লাহ তাআলা মরুভূমিতে পাঠালেন আর ওখানে নামাজ পড়ালেন, দোয়া করালেন ফলের রিজিক খাওয়ার জন্য, শাম দেশেই করলে কী অসুবিধা ছিল, শাম দেশে কি নামাজ হয় না? হ্যাঁ, শাম দেশে নামাজ হয়, শাম দেশে নামাজ পড়ছেন আর দোয়া করছেন, আর আল্লাহ তাআলা ফল খাওয়াচ্ছেনও; কিন্তু পরবর্তীকালে লোকেরা ভাবত যে, হ্যাঁ, শাম দেশ ছিল বলে। উর্বর দেশ, তো দোয়া করেছেন, দোয়াও কাজে লেগেছে। উর্বর দেশে যদি দোয়া করতেন তাহলে কি আর হতো? তো যাতে এই সন্দেহ করতে না পারে, আল্লাহ তাআলা এই ফলের রিজিকের জন্য দোয়া করালেন ঠিক, কিন্তু শাম দেশে উর্বর দেশে করালেন না, উর্বর আরবে করালেন। যাতে মনের সন্দেহ দূর হয়।
তো আল্লাহ তাআলা আয়াত নাজিল করেছেন যে, তোমরা যখন আল্লাহ তাআলার সাহায্য চাইলে তো আল্লাহ সাহায্য করলেন। কিন্তু এই আয়াত নাজিল করলেন বদরের যুদ্ধের পরে, যেখানে মুসলমানদেরকে নিরস্ত্রও করলেন, আর কাফেরদেরকে সশস্ত্রও করলেন, আর সশস্ত্র বাহিনী দিয়ে মোকাবেলা করালেন নিরস্ত্র বাহিনীর আর ফাতাহ দিলেন, তারপরে আল্লাহ তাআলা বললেন যে, আল্লাহ সাহায্য করেছেন। আর যদি কাফেরদেরও অস্ত্র আছে, মুসলমানদেরও অস্ত্র আছে, আর আল্লাহ সাহায্য করতেন, কিন্তু সন্দেহ রয়ে যেত।
তো আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে ঈমান দিতে চান, যে ঈমানের ওপর আমি নিঃসন্দেহে চলতে পারি। কোনো সন্দেহের অবকাশ না থাকে। যে আল্লাহ তাআলা আমাকে ভালো জীবন দিয়েছেন নেক আমলের ওপর। এরকম নয় যে, নেক আমলও আছে আর জমি-জমাও আছে। নেক আমলও আছে আর ভালো চাকরিও আছে, আর ভালো ডিগ্রিও আছে। এই সবগুলো জায়েজ। যদি কৃষিকাজ জায়েজভাবে হয়, তো জায়েজ, চাকরি করা জায়েজভাবে করলে তো জায়েজ, ব্যবসা জায়েজভাবে করলে তো জায়েজ। আর এগুলোকে নিষেধ করা হয়নি, সাহাবারা কৃষিকাজও করেছেন, চাকরিও করেছেন, সাহাবারা ব্যবসা-বাণিজ্যও করেছেন। কিন্তু নবীরা এসে দাওয়াত দিয়েছেন পরিপূর্ণ ঈমানের যে, আমলের ওপর যেন সম্পূর্ণভাবে ভরসা করে চলে। যে আমলের ওপর ভরসা করতে পারবে, সে যদিও আসবাবকে ব্যবহার করে, কিন্তু যদি মোকাবেলা হয়ে যায়, আসবাবকে ছাড়বে, আমলকে ছাড়বে না।
একজন ছাত্র তার নিজস্ব কিছু জমি-জমা আছে, বাপ মারা গেছে তো নিজেই তার জমি-জমা দেখাশোনা চাষাবাদ ইত্যাদি করে, আবার গিয়ে পড়াশোনাও করে, দুটোই চলছে একই সাথে। জমি দেখাশোনা করে, পড়াশোনাও করে। দুটোই একইসাথে চলা সমস্যা নয়, কিন্তু এমনই হলো যে তার ফাইনাল পরীক্ষা এবং তার ধান কাটা একই সময় পড়ল, তখন বোঝা যাবে যে সে আসল ছাত্র না আসল কৃষক। ওই সময় যে পাকা ধানকে ফেলে রেখে পরীক্ষা দিতে চলে গেল, তো সে আসলেই ছাত্র, সাথে সাথে কৃষিকাজও করে। টানাটানি যখন বাঁধল তো তার পরীক্ষা ছাড়ল না, আর পাকা ধান ছেড়ে দিলো। আর ওইরকম যে পরীক্ষা ছেড়ে দিলো কিন্তু পাকা ধান ছাড়ল না, বোঝা গেল আসলে সে কৃষক। সাথে পরীক্ষাও রেখেছিল, টানাটানির সময় ওটা ছেড়ে দিলো। তো যখন বন্যা এসেছে আর এক ছেলেকে সে ধরে রাখছে, আর আরেক হাত দিয়ে গাছের ডাল ধরতে হবে। তখন বোঝা যাবে যে, নিজের ছেলেকে কোনটা আর পালার ছেলেকে কোনটা। তার আগে নয়। যতক্ষণ পর্যন্ত সম্ভব ছিল দুটোকেই ধরে রেখেছে, কিন্তু এমন অবস্থায় আল্লাহ তাআলা নিয়ে গেলেন যে, এখন জান বাঁচাতে হলে এক বাচ্চাকে ছাড়তে হয় গাছের ডাল ধরার জন্য। তখন সে কোনটাকে ছাড়বে। তো আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে ঈমান দিয়েছেন কোনো অবস্থায়ই যেন আমল না ছাড়ি, সব আসবাব ছাড়তে পারি, আমলকে ছাড়বে না। যে আমলের ওপর ভরসা করে, সে আমলকে ধরে রাখতে পারবে, সব আসবাবকে ছাড়তে পারবে, যে আমলের ওপর ভরসা করে না।
আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে ঈমান দিয়েছেন যেন দুনিয়ার এই আসবাবের পর্দা থেকে নজর সরে যায় আর স্থায়ী জিন্দেগীর দিকে দৃষ্টি পতিত হয়। বদরের ময়দানেও পালায়নি, কোনো ময়দানে পালাননি, আর শুধু পালাননি নয়, বরং পুরোপুরি হিম্মতের সাথে লড়েছেন, খেজুরের ডাল দিয়ে তলোয়ারের মোকাবেলা করেছেন। যে খেজুরের ডাল দিয়ে তলোয়ারের মোকাবেলা করে আর ভয় না পায়, না পালিয়ে যায়, অন্য কোনো সময় সে পালাবে না।
এ জন্য ভাই আল্লাহর পথে বের হয়ে ওইরকম মজবুত ঈমানদারি অর্জন করার চেষ্টা করি, যাতে কোনো অবস্থায়ই পালিয়ে না যাই ঈমান থেকে। ঠিক আছে না ভাই ইনশাআল্লাহ, এ জন্য আমরা ৩ চিল্লা, চিল্লার জন্য আল্লাহর পথে বের হই। যাতে আমি আমার ঈমানকে মজবুত করতে পারি, ছাবিত।
يُثَبِّتُ اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا بِالْقَوْلِ الثَّابِتِ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَفِي الْآخِرَةِ
'আল্লাহ তাআলা মজবুত করেন মজবুত কথা দিয়ে।'
এ জন্য আল্লাহর পথে বের হই। ১ চিল্লা, ৩ চিল্লার জন্য যাই, বলি ইনশাআল্লাহ কারা কারা যাবে...
سُبْحَانَ اللهِ وَبِحَمْدِهِ ، سُبْحَانَكَ اللَّهُمَّ وَبِحَمْدِكَ ، نَشْهَدُ أَنْ لا إِلَهَ إِلا أَنْتَ ، نَسْتَغْفِرُكَ وَنَتُوبُ إِلَيْكَ. سُبْحَانَ رَبِّكَ رَبِّ الْعِزَّةِ عَمَّا يَصِفُونَ، وَسَلامٌ عَلَى الْمُرْسَلِينَ، وَالْحَمْدُ للهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ، آمِينَ.
বয়ানটি আবুল কাসেম ভাইয়ের সংগ্রহ থেকে, (স্থান, তারিখ ও সময় অস্পষ্ট)
মন্তব্য (...)
এ সম্পর্কিত আরও প্রবন্ধ
জরুরত - মানুষের প্রয়োজন ও ইবাদত
(প্রদত্ত বয়ান হতে সংগৃহীত) স্থান: আলাইপুর মারকাজ মসজিদ, নাটোর তারিখ: ১৬ নভেম্বর,২০০৭ ,শুক্রবার ফজরে...
প্রফেসর হযরত মুশফিক আহমদ রহ.
২০ জানুয়ারী, ২০২৬
১৪০২
দ্বীনের মূল লক্ষ্য: মাহবুবিয়্যাত অর্জন
[প্রদত্ত বয়ান থেকে সংগৃহীত] اَلحَمْدُ للهِ نَسْتَعِيْنُهُ وَنَعُوْذُ بِاللهِ مِنْ شُرُوْرِ أَنْفُسِ...
প্রফেসর হযরত মুশফিক আহমদ রহ.
১৫ জানুয়ারী, ২০২৬
২৬১৯
ফ্রান্সে তাবলীগের কাজের সুচনা
[প্রদত্ত বয়ান থেকে সংগৃহীত] ৮ ই ফেব্রুয়ারি ২০১৫, বাদ ঈশা মোজাকারা, মানিকদি বাজার মসজিদ, ঢাকা আল্লা...
প্রফেসর হযরত মুশফিক আহমদ রহ.
১৭ জানুয়ারী, ২০২৬
১৮৩৮
নফি ও ইসবাত: দ্বীনের মৌলিক ভিত্তি
[প্রদত্ত বয়ান থেকে সংগৃহীত] بِسْمِ اللهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ، فَاعۡلَمۡ اَنَّہٗ لَاۤ اِلٰہَ اِلّ...
প্রফেসর হযরত মুশফিক আহমদ রহ.
১২ জানুয়ারী, ২০২৬
১৭২৬
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন