দ্বীনের মেহনতের ফায়দা নাকি দুনিয়া শিকারের ধান্দা
দ্বীনের মেহনতের ফায়দা নাকি দুনিয়া শিকারের ধান্দা
৪ঠা মার্চ ২০১৫,
বাসাবো কদমতলা মসজিদ, ঢাকা
একজনের অসুখ হয়েছে, আর কিছুদিন পরপর সে তার নিজের স্বাস্থ্যের অবস্থার দিকে তাকায়। শক্তি বাড়ছে কিনা, ঘুম ঠিকমতো হচ্ছে কিনা, খাওয়ার রুচি হচ্ছে কিনা, শরীর ভালো লাগে কিনা? ব্যবসায়ী ব্যবসা করে, কিন্তু ব্যবসা করার জন্য ব্যবসা করে না। ব্যবসা করে লাভের জন্য। অন্য লোক তার দিকে তাকায়। তাকায় মানে কী? পাঁচ বছর ব্যবসা করার পর তার জামাকাপড়ের অবস্থা কেমন? কিন্তু যদি দেখে যে, আগের মতো এখনো ছেঁড়া গেঞ্জি, ছেঁড়া কাপড়, তাহলে বোঝা যায় যে ব্যবসা ঠিকমতো হচ্ছে না।
তো আমলের জন্য আমরা কী দেখব? যেখান থেকে বুঝব যে তার আমল হচ্ছে কিনা। রোগীকে কেউ জিজ্ঞাসা করল যে 'আপনার চিকিৎসার খবর কী?' সে বলল যে "আমি এতগুলো বড়ি খেয়েছি আর এতগুলো শিশি খেয়েছি"। এই বলাতে প্রশ্নের উত্তর হয় না। বলল যে, বড়ি খেয়েছ, শিশি খেয়েছ, শরীরের খবর কী? ভালো হয়েছ কিনা? যদি বলে যে, "শরীরের দিকে তো খেয়াল করিনি, কিন্তু ওষুধ ঠিকমতো খেয়েছি কিনা সেই হিসাব ভালোমতো আছে"। তো লোকে বলবে যে, লোকটা কী পাগল নাকি বোকা? বুদ্ধি তো খারাপ না, ওষুধের হিসাব রেখেছে। কিন্তু, একজন স্বাভাবিক সুস্থ মানুষ, সে তার শরীরের অবস্থার দিকে তাকাবে। যদি স্বাস্থ্য ভালো হয় তাহলে চিকিৎসা ভালো। কতগুলো বড়ি খেয়েছ তাতে কী আসে যায়!
ব্যবসা করছে যে, এত মাল এলো আর এত মাল গেল। এত মাল এলো আর এত মাল গেল ঠিক আছে, কিন্তু তোমার পকেটে টাকা থাকল কত? বাড়ির খরচ ঠিকমতো তুমি দিতে পারছ কিনা? বলল, "ওটা তো জানি না"। তো মাল কী এলো আর কী গেল, ঐটা দিয়ে কিসের কাজ যদি না জান?
তো দ্বীনের যে কাজই হোক, সেই কাজে আমাকে দেখতে হবে যে, সেটা আমাকে ফায়দা দিচ্ছে কিনা। এখন প্রশ্ন হচ্ছে প্রত্যেক জিনিসের ফায়দা।
ছাত্র পড়াশোনা করে নম্বর পাওয়ার জন্য। কলেজে ভর্তি হয়েছে, ক্লাস করছে। তাকে জিজ্ঞাসা করল, "তোমার পড়াশোনার খবর কী?" তো বলল যে, "অনেক টাকা পেয়েছি"। ক্লাস করে অনেক টাকা পেয়েছ কেমন করে? বলল যে, একটা গ্রুপের সাথে ঢুকেছি, তাতে ইনকাম ভালোই হয়। ওরা কিছু দিয়েছে। তো বুঝতে পেরেছে পড়াশোনা তো কিছুই হচ্ছে না। দুই দিন পর হয়তো জেলে যাবে, তাও যদি কিসমত ভালো থাকে, আর নাহলে লাশ পাওয়া যাবে একদিন রাস্তাঘাটে।
তো বুঝতে হবে যে কোন জিনিসের কী ধরনের লাভ? হাল চাষ করছি, কৃষি কাজ করছি আর লাভ হচ্ছে ফসল। পড়াশোনা করছে, তার লাভ হচ্ছে ডিগ্রি। দ্বীনের যে কাজ করছি ঐটার লাভ কী?
দ্বীনের কাজের প্রকৃত ফায়দা কী?
তো দ্বীনের কাজ করলাম। অমুক পীরের কাছে মুরিদ হয়েছি। নিয়মিত যাই। কেউ জিজ্ঞাসা করল, "পীরের কাছে যে মুরিদ হয়েছ, নিয়মিত যাও, ফায়দা কী হল?" উত্তরে যদি বলে, ফায়দা হল যে, এক প্লট জমি কিনেছি, একটা ফ্ল্যাটের অর্ডার দিয়েছি—এটা তো কোনো লাইনের কথা হল না। তারপর খোঁজ নিল যে পীরটা কে? সে কি জিকির করে নাকি স্মাগলিং করে? তো ফায়দার লাইন জানা দরকার, কী ফায়দা আমি আশা করি? অনেক সময় দ্বীনের কাজের মধ্যে থাকলে আর কী ফায়দা আশা করি ঐটাই জানি না।
কোনো এক জেলার একজন জিম্মাদার ব্যক্তি চিল্লায় গেছেন। চিল্লায় থাকা অবস্থায় উনার চাকরির প্রমোশন হয়েছে। ব্যাংকের ম্যানেজার ছিলেন, এজিএম হয়েছেন। তো ফিরে এসে দেখেন যে, প্রমোশন হয়ে গেছে। তো বয়ানের মধ্যে আল্লাহর পথের বরকতের কথা বলছে। 'আল্লাহর পথের গায়েবি নুসরাত (!) যে, জিএম ছিলাম আর এজিএম হয়ে গেছি'। একজন আলিম এই কথা শুনে বললেন, "এই লোকের উপর তো কুফরির ফতোয়া হয়ে যাবে"। সুদের ব্যাংকে চাকরি করে তার প্রমোশন হয়েছে, ওটাকে গায়েবি নুসরাত বলছে বা মদদ বলছে বা কিছু একটা বলছে আর ওর উপর তো ফতোয়া কুফরি! তবলিগে গেছে কি দ্বীনদার হওয়ার জন্য নাকি কাফির হওয়ার জন্য? তো আমি যদি না বুঝি যে আমি কী খুঁজছি, তাহলে তো উল্টো জিনিস খুঁজব।
চাবি হারানোর গল্প
খোঁজার গল্প আছে। ল্যাম্প পোস্টের নিচে, সন্ধ্যাবেলা। অল্পরাত। ল্যাম্প পোস্টের নিচে কিছু একটা খুঁজছে। ইতিমধ্যে প্রতিবেশী একজন এসে তার সাথেও শরিক হল। প্রতিবেশী শরিক হল, যেহেতু সাহায্য করার দরকার সেই হিসেবে। তো উনিও খুঁজতে আরম্ভ করলেন। বেশ কিছুক্ষণ খুঁজলেন। তারপর যিনি শরিক হয়েছেন জিজ্ঞাসা করলেন 'কী খুঁজছেন?' অনেকক্ষণ খোঁজার পর জিজ্ঞাসা করলেন। এতক্ষণ খুঁজেছেন তার সাথী হয়ে, কিন্তু কী খুঁজছেন তা জিজ্ঞাসা করেননি। ভেবেছেন উনিও খুঁজছেন, আমিও খুঁজি। তো জিজ্ঞাসা করলেন কী খুঁজছেন? বললেন যে 'চাবি'। চাবি হারিয়ে গেছে, চাবি খুঁজছি। তখন আবার খুঁজতে আরম্ভ করলেন। তখন আবার নিয়ত পরিবর্তন করলেন। আগে তো জানতেন না যে কী খুঁজছেন? এখন খুঁজছেন চাবি। কিছুক্ষণ খোঁজার পর পেলেন না, তখন আবার জিজ্ঞাসা করলেন, 'চাবি আপনি হারিয়েছেন কোথায়?' বললেন যে, 'বাড়ির ভিতরে'। তো হারিয়েছেন বাড়ির ভিতরে আর এখানে কেন খুঁজছেন? বললেন, 'এখানে লাইট আছে দেখা যাবে, বাড়ির ভিতরে যেখানে চাবি হারিয়েছে সেখানে অন্ধকার'!
তো আমাদের দ্বীনের মেহনত যদি এরকম হয় যে, ব্যস্ত হয়ে খুঁজছি ঠিকই, কিন্তু কী খুঁজছি, কোথায় খুঁজছি, কেন খুঁজছি তা জানি না, তাহলে এই খোঁজা দিয়ে কোথায় যাব? তবলিগ করল, চিল্লা দিল আর কয়েকদিন পর দেখা গেল বেশ ধনী হয়ে গেছে। আগে টাকা পয়সা সেরকম ছিল না, এখন অবস্থা বেশ ভালো। বহুত খায়ের বরকত দেখা যাচ্ছে। এগুলো বাস্তব ঘটনা। এই যে ব্যাংকের কথা বলা হল, এটা বাস্তব ঘটনা। আর কিছু কিছু লোক ভালো সম্পদশালী হয়ে যাচ্ছে, আর সে মনে করছে বরকত আসছে! শয়তান তো সাংঘাতিক ধাঁধার মধ্যে ফেলে দিয়েছে। জানার দরকার যে, আমি কী খুঁজছি, কী চাই? আর এই ভুলের মধ্যে আমরা বেশিরভাগ মানুষ পড়ে আছি।
আবু বকর সিদ্দিক (রা.)-এর দৃষ্টান্ত
তো একজন তবলিগে গেল। যাওয়ার আগে ওর বড় দোকান ছিল। বড় কাপড়ের দোকান। কাপড়ের বিরাট ব্যবসায়ী। তারপর আস্তে আস্তে করে চিল্লা দেয়, তিন চিল্লাও দেয়, মোকামি কাজ করে। আর এদিকে ব্যবসার অবনতি হচ্ছে। উন্নতি তো হচ্ছেই না, বরং ধীরে ধীরে অবনতি হচ্ছে। কিন্তু তার চিল্লা, তবলিগের কাজ এগুলো কমছে না, বরং বাড়ছে। বেশ কয়েক বছর পরে এমন অবস্থা হয়ে গেল যে, এখন ফেরিওয়ালা হয়েছে। যে একসময় বড় কাপড়ের ব্যবসায়ী ছিল, এখন কাঁধে কিছু কাপড় নিয়ে মহল্লায় ফেরি দিতে যায়। তো তার ঘটনা আলোচনার মধ্যে যে, এই লোক চিল্লাও দেয়, তিন চিল্লাও দেয়, তসবিহাত আদায় করে, হালাল ব্যবসাও করে। কিন্তু দোষ তো কিছুই দেখা যায় না। তখন সব বাকি যত তবলিগওয়ালারা আছে, পীর-দরবেশরা আছে সবাই চিন্তায় পড়ে যাবে যে ঘটনা কী? কেউ বলবে, 'মায়ের বদ দোয়া লেগেছে'। আবার কেউ বলবে, 'তবলিগ করেছে ঠিকই, কিন্তু মুরব্বিদের ইতা'আত করেনি, এজন্য পরিণতি খারাপ হয়েছে'। তো নিজ আন্দাজমতো ব্যাখ্যা দেবে।
সব শোনার পর যখন বলা হল যে, ঘটনা কিন্তু আবু বকর সিদ্দিক (রা.)-এর। সুবহানাল্লাহ। তখন বলে যে, 'ইয়ে মানে, হ্যাঁ, ওটার কেস আলাদা'। না বোঝার কারণে ভালো কী, মন্দ কী কিছুই বুঝে না।
আম কিনতে গেছে। আম যে বিক্রি করছে আর ক্রেতা, কারোরই আমের সম্পর্কে ভালো জ্ঞান নেই। আমের কোন অংশ খায়, আর কোন অংশ খায় না সেই ব্যাপারে অজ্ঞ। তো আম ছোট। কিন্তু বিক্রেতা বলছে, "আম ছোট হলে কী হবে, আঁটি কিন্তু মোটা আছে!" ক্রেতাও ভাবল যে, কথা তো ঠিক, তাহলে আম কিনি। তো এই জাতীয় যদি ক্রেতা হয় আর এই জাতীয় বিক্রেতা হয়, তাহলে মেহনত করছি কিন্তু কী চাই তাও জানি না, কী পাই তাও জানি না। আল্লাহ তা'আলা দিলেন, ভালো দিলেন না মন্দ দিলেন, তাও বুঝতে পারছি না। ভালো দিলেন আল্লাহ তা'আলা, অথচ আমি নারাজ! নারাজ হওয়ায় আল্লাহ তা'আলা রাগ প্রকাশ করলেন, আর খারাপ জিনিস দিলেন। এখন আমি সন্তুষ্ট! এজন্য আল্লাহওয়ালাদের জীবনের দিকে খুব বেশি করে তাকানো যে আমি চাই কী? তা না হলে মেহনত তো করব, কিন্তু কী চাই তাও জানি না। সেক্ষেত্রে বড় বিভ্রান্তির মধ্যে পড়ে যাব।
দৃষ্টান্ত হরেকরকম পাওয়া যাবে। এই তবলিগের মেহনতের মধ্যেই কিছু লোক পাওয়া যাবে, যাদের জীবন পাক হয়েছে। আগে ব্যবসায় ভেজাল করত, এখন আর ভেজাল করে না। আগে অনেক টাকা ছিল, এখন খুব টানাটানির সংসার, কিন্তু হালাল। আগে প্রচুর হারাম ছিল, এখন হালাল। সে নিজে বুঝে অতএব সে সন্তুষ্ট। তার কোনো অভিযোগ নেই। বরং মনে করে আল্লাহ তা'আলার বড় মেহেরবানি। কেন মেহেরবানি? কারণ আল্লাহ তা'আলাই বড় মেহেরবানি করে হালাল খাওয়ার তৌফিক দিয়েছেন। আগে হারাম খেতাম আর এখন হালাল খাই। তো বড় সন্তুষ্ট। ওর দিকেই তাকিয়ে আরেকজন বলবে যে, এই লোক তো তবলিগ করে ডুবে গেল! আগে গাড়ি ছিল আর এখন সাইকেলও নেই।
একবার রংপুর না কোনো অঞ্চলে সফরে ছিলাম, ভুলে গেছি। তো ওখানকার একজনের কথা বলল যে, কোনো এক সাথী চালের ব্যবসা করত। এক সময় ওর ট্রাক লোড করে চাল ঢাকায় আসত। এর মানে বেশ মোটা অঙ্কের ব্যবসা করে। যে ট্রাক পাঠাতে পারে সে তো আর ছোটখাটো ব্যবসায়ী না! তো তার বর্তমান অবস্থা হল এই যে, বাজার করার জন্য বাজারে গিয়ে আধা কেজি চাল কেনে। ঘরের মধ্যেও চাল নেই। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, এরকম হালতে তার হালভাব, কথাবার্তার ধরন কী? পেরেশান, অস্থির, নাকি সে মুতমাইন (সন্তুষ্ট) আছে? তারা বলল যে, সে মুতমাইন আছে। তো আলহামদুলিল্লাহ। সে ঠিক লাইনেই আছে। তা না হলে, সে পেরেশান হবে; আর বলবে, 'সর্বনাশ, এই তবলিগ করে আমার এই সর্বনাশ হয়ে গেছে'। কিন্তু সে মুতমাইন আছে আর মুতমাইন তবলিগের মেহনত করেই হয়েছে। নিশ্চয় সে চিনতে পারছে যে ভালো কী মন্দ কী? পরিমাণ অনেক কম কিন্তু অবস্থা সে বুঝতে পারছে।
আরেক জায়গায় তার একেবারে বিপরীত হয়। কিছুই ছিল না, আর কিছুদিনের মধ্যেই বিরাট এক বাড়ির মালিক হয়ে গেছে। তো চেনার দরকার যে আমি কী চাই?
এজন্য সাহাবাদের জীবনের দিকে খুব বেশি নজর রাখা। ফাযায়েলে সাদাকাতের যদি খুব বেশি চর্চা করি তাহলে সেটা আমাকে দিকনির্দেশনা দেবে যে, আমি কোথায় চলছি? দুর্ভাগ্যবশত, আমরা ফাযায়েলে সাদাকাতের চর্চা খুব কম করি। আর আল্লাহওয়ালাদের জীবনের চর্চাও খুব কম করি।
অনেক ক্ষেত্রে, বেশ বড় একটা অংশ তবলিগের দিকে ঠেলে বড় গলদ দিকনির্দেশনা দেয়। ছাত্রদের মধ্যে তো প্রচলিত কথা যে, ভালো রেজাল্ট করে ভালো পজিশনে যেতে হবে। 'ম্যাজিস্ট্রেট হও', এই হও, সেই হও। তবলিগে যাওয়ার আগে দুনিয়ার যে জজবা ছিল, তবলিগে যাওয়ার পরে ঐটা বেড়ে গেছে। কারণ, আগে তো তাকে কেউ এই ব্যাপারে তরগিব (উৎসাহ) দিত না। নিজে নিজেই। আর আগেও ভালো পজিশনের মূল্য তার কাছে ছিল, কিন্তু শুধু দুনিয়ার ফায়দা হিসেবে। এখন গিয়ে দেখছে যে, ভালো পজিশনে গেলে দুনিয়া তো আছেই, জান্নাতও কিনা যায়! এখন দেখছে, টাকা-পয়সা যার কাছে আছে, তবলিগের মুরব্বিদের কাছে তার হাই পজিশন, মাশওয়ারাতেও তার কথা খুব চলে। আর যার টাকা-পয়সা নেই, ও সেরকম পাত্তা পায় না, ও শুধু মোকামি কাজ করে। তাই, 'মারকাজে আমার দরকার আছে'।
এজন্য শুদ্ধ নির্দেশনা খুব জরুরি। আল্লাহওয়ালাদের সোহবত, আল্লাহওয়ালাদের জীবনের চর্চা, হায়াতুস সাহাবা, ফাযায়েলে সাদাকাত আর খুঁজে খুঁজে যেখানে কোনো নির্ভরযোগ্য লোক মনে হয় যে, দ্বীন বুঝে এরকম হালভাব-লক্ষণ, দোয়াও করা তাঁদেরকে পাবার জন্য। তো সেইসব লোকের সাথে সম্পর্ক বাড়ানো, যাতে আমি ভুল রাস্তায় না পড়ে যাই। দ্বীনের মধ্যে এসে যদি কেউ ভুলের মধ্যে পড়ে যায়, ওর তো আর সংশোধনের কোনো জায়গাই নেই। ঐ যে প্রচলিত একটা কথা আছে, যেই তেল দিয়ে ভূত নামাবে, সেই তেলেই যদি ভূতের আছর থাকে, তাহলে ভূত নামানোর জন্য যতই তেল দিক, ওতে ভূত বাড়বে আরো।
সেজন্য দ্বীনের ময়দান যেন পাক থাকে, পবিত্র থাকে, চেষ্টা দোয়া করতে থাকা।
**প্রথমত, সুন্নতের উপর আমরা ইহতেমাম করি।** গরিব মিসকিনের সাথে বেশি উঠাবসা করি। শরিয়তে এর খুব তাগিদ আছে। রিয়াদুস সালেহিন কিতাবের মধ্যে সম্পূর্ণ বাব আছে 'গরিব মিসকিনের সাথে উঠাবসা করা'। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এটাকে পছন্দ করতেন, তরগিব দিয়েছেন। এতে নিজের দ্বীনের মধ্যে মালের মোহ, পরিচিতি, খ্যাতির মোহ—ওগুলো কমবে।
আর যদি বড়লোকের সাথে বেশি উঠাবসা করা হয়, তো নিজের মনের ভিতর এগুলোর মোহ ঢুকবে। আর যখন এইসব মোহ ঢুকবে তখন তার বুদ্ধি নষ্ট হয়ে যাবে। ও তখন নিজেই সব কথাকে প্যাঁচাবে। তখন ওর মনে হবে যে, আমার অনেক টাকা দরকার। কিসের জন্য? বলে যে, দ্বীনের খেদমত করব।
দ্বীনের খেদমত কীরকম? এই যে, 'বাড়িতে মাস্তুরাতের জামাআত আনতে পারব। আর মাস্তুরাতে জামাআত আসলে, বিদেশের জামাআত আসলে যেহেতু তারা একটু ভালো পজিশনে থাকে, তাই বিরাট বাড়ি দরকার। বাড়ির গেটও দুটো আলাদা হবে। পুরুষের জন্য আলাদা গেট, মাস্তুরাতের জন্য আলাদা গেট। আর বড় গাড়ি হবে, যে গাড়ির কাঁচ এমন হবে যে, বাইরে থেকে ভিতর দেখা যায় না, পর্দা রক্ষা হবে। মাস্তুরাতের জামাআতগুলো যখন আনব তখন যেন কোনো অসুবিধা না হয়। এইসবগুলো পিউর আল্লাহর ওয়াস্তে, আমার নফসের কোনো তাকাজা নাই, এগুলো সব দ্বীনের খেদমত করবার জন্য!'
শয়তান বোঝায়। শুধু 'নিজের নফস চায়' তো ঐটাতে একটু কেমন কেমন লাগে বলতে! এজন্য 'দ্বীনের খেদমতের' কথা বলে। আর যদি ঐরকম বড় বাড়ি-গাড়ি থাকে তো মুরব্বিদেরও খেদমত করতে পারব, মুরব্বিদের দোয়া পাব। আর আল্লাহওয়ালাদের যে দোয়া পাওয়া যায়, ওতেই পার পেয়ে যাব। আর ভালো দোয়ার জন্য একটা ভালো গাড়ির দরকার। এই দুইনম্বর গাড়ি দিয়ে কোনো 'হাই ক্লাস' দোয়া (!) পাওয়া যাবে না। হাই ক্লাস দোয়া পেতে হলে হাই ক্লাস গাড়ির দরকার! তো ও এসব চক্করের মধ্যে পড়ে যায়। তার মানে, আল্লাহকে রাজি করতে হলে অনেক টাকার দরকার!
আর তার কাছে এসব কথা ঠিক মনে হবে, যেহেতু নিজের মন চাচ্ছে।
এজন্য ভাই আল্লাহর পথে বের হয়ে, শুধু বের হওয়া নয় বরং বের হওয়া, দোয়া করা আর আল্লাহওয়ালাদের সোহবত খোঁজা, গরিব মিসকিনদের সাথে বেশি উঠাবসা করা, ফাযায়েলে সাদাকাত পড়া, বিশেষ করে ঘরের মধ্যে ইনফিরাদিভাবে আর এটাকে বাড়ানো। ফাযায়েলে সাদাকাতের চর্চা যদি খুব থাকে তাহলে, ইনশাআল্লাহ ওটা আমার মধ্যে অনেক ভুল ত্রুটি কাটাবে। এই ফাযায়েলে সাদাকাতের কিতাব যে হযরত শাইখ রহ. লিখেছেন, কোনো ফালতু লেখেননি। অথচ ওটার কোনো চর্চাই নেই। এজন্য আল্লাহর পথে বের হওয়া। ঠিক আছে না ইনশাআল্লাহ!
---
**মূল বয়ান:** ৪ঠা মার্চ ২০১৫, বাসাবো কদমতলা মসজিদ, ঢাকা
মন্তব্য (...)
এ সম্পর্কিত আরও প্রবন্ধ
দাওয়াতের প্রাণ মুহাব্বত
[প্রদত্ত বয়ান থেকে সংগৃহীত] أعوذ بالله من الشيطان الرجيم بسم الله الرحمن الرحيم ، وَمَا أُمِرُوا إِ...
প্রফেসর হযরত মুশফিক আহমদ রহ.
১৭ জানুয়ারী, ২০২৬
২১৫০
জরুরত - মানুষের প্রয়োজন ও ইবাদত
(প্রদত্ত বয়ান হতে সংগৃহীত) স্থান: আলাইপুর মারকাজ মসজিদ, নাটোর তারিখ: ১৬ নভেম্বর,২০০৭ ,শুক্রবার ফজরে...
প্রফেসর হযরত মুশফিক আহমদ রহ.
২০ জানুয়ারী, ২০২৬
১৪০২
নিভৃতচারী আল্লাহওয়ালাদের খোঁজে
হজরতের গড়া ছোট্ট, অথচ সুন্দর মাদ্রাসা। মাদ্রাসা থেকে এক ছাত্রকে রাহবার হিসেবে সাথে নিয়ে যখন হজরতের ব...
মাওলানা ডাঃ মোহাম্মদ মাসীহ উল্লাহ
১০ নভেম্বর, ২০২৪
১০১৯৩
আল্লাহর হাতে সোপর্দ: দুশ্চিন্তামুক্ত জীবনের পথ
(প্রদত্ত বয়ান হতে সংগৃহীত اَلْحَمْدُ للهِ نَسْتَعِيْنُهُ وَنَعُوْذُ بِاللهِ مِنْ شُرُوْرِ أَنْفُسِن...
প্রফেসর হযরত মুশফিক আহমদ রহ.
২০ জানুয়ারী, ২০২৬
১৬৫৯
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন