প্রবন্ধ
লাইলাতুল কদর : ফজিলত, তাৎপর্য ও পাওয়ার সহজ পদ্ধতি
২১ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
১৩৮৯৫
০
আল্লাহ তাআলা সারা বছরের সব নূর জমা করেছেন রমজানে, রমজানের সব নূর জমা করেছেন শেষ দশকে, আর সেই নূরের সারাংশ তিনি রেখে দিয়েছেন লাইলাতুল কদরের এক রাতের মধ্যে।
ভাবুন একবার—একটা রাত, কিন্তু তার ভেতরে পুরো বছরের নূর!
আমাদের দুর্ভাগ্য কী জানেন? আমরা রাতটা পাই, কিন্তু কদরটা করি না। কবির ভাষায়
میں ہی کم بخت غافل تھا، تو مجھ سے غافل نہ تھا
تو نے مجھ کو وہ سب دیا جس کے میں قابل نہ تھا
‘আমি ছিলাম গাফেল, কিন্তু তুমি গাফেল ছিলে না।
আমি যার যোগ্য ছিলাম না, তুমিই আমাকে তাই দিয়ে দিলে।’
ভাইয়েরা, যদি আমরা সত্যিই লাইলাতুল কদরের ‘কদর’ করতে পারি—এই এক রাতের ইবাদতেই আল্লাহর নৈকট্যের এমন দূরত্ব পার হওয়া যায়, যা অন্য হাজার রাতেও সম্ভব না। যেমন আজকে একটা বিমান—এক রাতেই সেই পথ পাড়ি দেয়, যে পথ আগে মানুষ মাসের পর মাসেও পাড়ি দিতে পারতো না।
اَلْحَمْدُ لِلّهِ وَكَفَى وَسَلَامٌ عَلَى عِبَادِهِ الَّذِيْن َاصْطَفَى اَمَّا بَعْدُ! فَاَعُوْذُ بِاللهِ مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّجِيْمِ. بِسْمِ اللهِ الرَّحْمنِ الرَّحِيْمِ. إِنَّا أَنزَلْنَاهُ فِي لَيْلَةِ الْقَدْرِ
بَارَكَ اللهُ لِيْ وَلَكُمْ فِي الْقُرْآنِ الْعَظِيْمِ، وَنَفَعَنِيْ وَإِيَّاكُمْ بِمَا فِيْهِ مِنَ اْلآيَاتِ وَالذِّكْرِ الْحَكِيْمِ. وجَعَلَنِيْ إِيَّاكُمْ مِنَ الصَّالِحِينَ.
أَقُوْلُ قَوْلِيْ هَذَا أَسْتَغْفِرُ اللهَ لِيْ وَلَكُمْ وَلِسَائِرِ الْمُسْلِمِيْنَ. فَاسْتَغْفِرُوْهُ، إِنَّهُ هُوَ الْغَفُوْرُ الرَّحِيْمُ.
اَللَّهُمَّ صَلِّ عَلَى سَيِّدِنَا مُحَمَّدٍ وَّعَلَى آلِ سَيِّدِنَا مُحَمَّدٍ وَّبَارِكْ وَسَلِّمْ
ভূমিকা
মুহতারাম হাজিরীন! আজকের এই নীরব রাতের আলোচনায় আমরা কথা বলব এক আশ্চর্যজনক রাত নিয়ে। এক এমন রাত, যে রাত অন্ধকার যুগকে আলোর যুগে বদলে দিয়েছিল। আমরা কথা বলব ‘লাইলাতুল কদর’ নিয়ে। এই রাতের হাকীকত, মহত্ত্ব ও ফজিলত এবং আমাদের জীবনে এর দাবি ও করণীয় কী—সেসব নিয়ে।
আল্লাহ তাআলার দরবারে দোয়া—তিনি যেন এই নগণ্য বান্দাকে সঠিক ও সত্য কথা বলার তাওফিক দেন এবং আমাদের সবাইকে সে অনুযায়ী আমল করার শক্তি দান করেন—আমীন।
লাইলাতুল কদর কী?
লাইলাতুল কদর মূলত আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে মানবজাতির জন্য ক্ষমা ও মুক্তির এক মহিমান্বিত রাত।
একটু কল্পনা করুন...একটা সময় ছিল, যখন পৃথিবীর আকাশে হিদায়াতের তারা ছিল না, মানুষের হৃদয়ে আল্লাহর ভয় ছিল না, জুলুম ছিল শক্তির পরিচয়, আর গুনাহ ছিল জীবনের স্বাভাবিক রুটিন। মানুষ মানুষকে পিষ্ট করত, মেয়েদের জীবন্ত কবর দিত, মদ ছিল গর্বের বিষয়, আর রবকে ভুলে যাওয়া ছিল সভ্যতার নাম। ঠিক সেই ভয়ংকর অন্ধকারের মাঝখানে আল্লাহ তাআলা হঠাৎ করে মানবজাতির দিকে রহমতের দৃষ্টি দিলেন। রমজানের এক রাতে তিনি কুরআন নাযিল করলেন। সেই রাত ছিল—লাইলাতুল কদর।
সেই রাতে আকাশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ল রহমতের মেঘ, হেরা গুহার দিকে নেমে এলো আল্লাহর করুণা, আর রহমাতুল লিল আলামিন ﷺ-এর ওপর নাযিল হলো প্রথম ওহি—আল্লাহর কালাম, আল্লাহর বার্তা।
সেই প্রথম আয়াতে আল্লাহ তাআলা মানুষকে ইলমের দিকে ডাকলেন। বললেন
اقْرَأْ بِاسْمِ رَبِّكَ الَّذِي خَلَقَ
পড়ো, তোমার রবের নামে—যিনি সৃষ্টি করেছেন। [সূরা আলাক : ১]
কারণ, যখন ইলমের আলো জ্বলে ওঠে, তখন অন্ধকার আপনাতেই সরে যায়। অজ্ঞতা দূর হয়, গুনাহের পর্দা ছিঁড়ে যায়। এর ফলেই মানুষ পায় শান্তি, নিরাপত্তা, সম্মান, পারস্পরিক অধিকার, ভ্রাতৃত্ব ও ভালোবাসা। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়—ঠিক এভাবেই বদলে গিয়েছিল মানবসমাজ।
শবে কদর ও কুরআন নাযিল
মানবতার মুক্তির এই মহান ঘটনা ঘটেছিল রমজানের লাইলাতুল কদরে কুরআন নাযিলের মাধ্যমে।
আল্লাহ তাআলা বলেন
شَهْرُ رَمَضَانَ الَّذِي أُنزِلَ فِيهِ الْقُرْآنُ هُدًى لِّلنَّاسِ وَبَيِّنَاتٍ مِّنَ الْهُدَىٰ وَالْفُرْقَانِ
রমজান সেই মাস, যে মাসে কুরআন নাযিল করা হয়েছে—যা মানুষের জন্য হিদায়াত এবং সত্য-মিথ্যার স্পষ্ট মানদণ্ড। [সূরা বাকারা : ১৮৫]
আর অন্য জায়গায় বলেন
إِنَّا أَنزَلْنَاهُ فِي لَيْلَةِ الْقَدْرِ
নিশ্চয়ই আমি এই কুরআনকে লাইলাতুল কদরে নাযিল করেছি। [সূরা কদর : ১]
এর ব্যাখ্যায় ওলামায়ে কেরাম বলেন—
১. এক অর্থে, পুরো কুরআন লাইলাতুল কদরে লওহে মাহফুজ থেকে দুনিয়ার আসমানে নাযিল করা হয়, তারপর প্রয়োজন অনুযায়ী ২৩ বছরে ধীরে ধীরে নবী ﷺ-এর হৃদয়ে নাযিল হয়।
২. আরেক অর্থে, প্রথম ওহির সূচনা এই রাতেই হয়েছিল। এই হিসেবে লাইলাতুল কদর হলো—সেই রাতের স্মারক, যে রাতে মানুষ মুক্তি পেয়েছিল কুসংস্কার, মূর্তিপূজা, জুলুম, অজ্ঞতা ও গোমরাহি থেকে।
লাইলাতুল কদর—উম্মতে মুহাম্মাদীর বিশেষ বৈশিষ্ট্য
আল্লাহ তাআলা এই উম্মতের উপর অগণিত অনুগ্রহ করেছেন। এ উম্মতকে এমন কিছু বিশেষ মর্যাদা ও সহজ বিষয় দেওয়া হয়েছে, যা পূর্ববর্তী উম্মতদের ছিল না। তার অন্যতম—লাইলাতুল কদর।
আল্লামা কুরতুবী রহ. উল্লেখ করেন—পূর্ববর্তী উম্মতদের মধ্যে কেউ তখনই আল্লাহর কাছে বড় ইবাদতগুজার বলে গণ্য হতো, যখন সে এক হাজার মাস ইবাদত করত। এক হাজার মাস মানে—৮৩ বছর ৪ মাস। তাদের আয়ু দীর্ঘ ছিল, তাই দীর্ঘ ইবাদত তাদের জন্য সহজ ছিল। কিন্তু আমাদের উম্মতের গড় আয়ু তুলনামূলক কম। তাই আল্লাহ তাআলা সহজ করে দিলেন—একটি রাত দান করলেন, যা এক হাজার মাসের চেয়েও শ্রেষ্ঠ।
এ সুবাদে আল্লামা কুরতুবী রহ. হযরত ইবনু মাসউদ রাযি. থেকে একটি বর্ণনা উল্লেখ করেন—রাসূলুল্লাহ ﷺ বনি ইসরাঈলের এক ব্যক্তির কথা বলেন, যিনি এক হাজার মাস আল্লাহর পথে জিহাদ করেছিলেন।
সাহাবাগণ এ কথা শুনে বিস্মিত ও ঈর্ষান্বিত হলেন—তারা ভাবলেন, আমরা তো এত দীর্ঘ আমল করতে পারব না!
তখন আল্লাহ তাআলা সূরা আল-কদর নাযিল করলেন—এ উম্মতের জন্য বিশেষ অনুগ্রহস্বরূপ। [তাফসির কুরতুবী, সূরা কদর]
সুতরাং লাইলাতুল কদর উম্মতে মুহাম্মাদীর জন্য আল্লাহ তাআলার বিশেষ উপহার।
লাইলাতুল কদরের ফজিলত
লাইলাতুল কদর অত্যন্ত মহিমান্বিত ও বরকতময় এক রাত। এই রাতের মর্যাদা ও গুরুত্ব বোঝানোর জন্য আল্লাহ তাআলা কুরআন মাজিদে এর নামে একটি সম্পূর্ণ সূরা নাযিল করেছেন—সূরা কদর।
এই রাতের গুরুত্বের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করে আল্লাহ তাআলা প্রশ্ন করেছেন
وَمَا أَدْرَاكَ مَا لَيْلَةُ الْقَدْرِ
তুমি কি জানো, লাইলাতুল কদর কী? [সূরা কদর : ২]
কুরআনে এভাবে প্রশ্ন সাধারণত তখনই করা হয়, যখন কোনো বিষয়ের মহত্ত্ব মানুষের হৃদয়ে গভীরভাবে বসিয়ে দেওয়া উদ্দেশ্য হয়, যখন মানুষকে সেই বিষয়ের প্রতি আগ্রহী ও আকৃষ্ট করতে চাওয়া হয়।
এরপর আল্লাহ তাআলা বলেন
لَيْلَةُ الْقَدْرِ خَيْرٌ مِّنْ أَلْفِ شَهْرٍ
লাইলাতুল কদর এক হাজার মাসের চেয়েও উত্তম। [সূরা কদর : ৩]
এখানে লক্ষণীয় বিষয় হলো—আল্লাহ তাআলা বলেননি, লাইলাতুল কদর কতটা উত্তম; বরং শুধু বলেছেন, এক হাজার মাসের চেয়েও উত্তম। এর দ্বারা বোঝা যায়, এই রাতের ফজিলতের কোনো সীমা নেই; এর বরকত ও কল্যাণ অগণিত।
এরপর আল্লাহ তাআলা জানিয়েছেন—এই রাতে হযরত জিবরাইল আ. ও অন্যান্য ফেরেশতা আল্লাহর আদেশে সব ধরনের কল্যাণ ও রহমত নিয়ে পৃথিবীতে অবতরণ করেন। এই রাত সম্পূর্ণ শান্তি ও নিরাপত্তার রাত। আর এই শান্তি, রহমত ও বরকতের ধারা ফজর উদয় হওয়া পর্যন্ত অব্যাহত থাকে।
লাইলাতুল কদরের ফজিলত সম্পর্কে হযরত আবু হুরাইরা রাযি. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন
مَنْ قَامَ لَيْلَةَ الْقَدْرِ إِيمَانًا وَاحْتِسَابًا غُفِرَ لَهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِهِ
যে ব্যক্তি ঈমান ও সওয়াবের আশা নিয়ে লাইলাতুল কদরে ইবাদতে দাঁড়ায়, তার পূর্ববর্তী সব গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হয়। [সহীহ বুখারী : ১৯০১]
হক্কুল্লাহ, হক্কুল ইবাদ ও ছোট গুনাহ মাফ হওয়া সম্পর্কে
মুহতারাম হাজিরীন! এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখা জরুরি। কুরআন-হাদিসে আমরা শুনি—অমুক আমলে গুনাহ মাফ, তমুক ইবাদতে গুনাহ মাফ। কিন্তু মনে রাখতে হবে—ইবাদতের মাধ্যমে যেসব গুনাহ মাফের কথা বলা হয়, সেগুলো মূলত আল্লাহর হক আর ছোট গুনাহ। পক্ষান্তরে মানুষের হক—কারো টাকা, কারো সম্মান, কারো অধিকার—এইগুলো লাইলাতুল কদরের ইবাদতে এমনিই মাফ হয়ে যায় না।
এখানে একটা বড় ভুল ধারণা আছে। অনেকে ভাবে—এখন মানুষের হক মারি, কথা কাটাকাটি করি, জুলুম করি... লাইলাতুল কদর এলে সারারাত ইবাদত করবো—সব ঠিক হয়ে যাবে।
না ভাই, হক্কুল ইবাদে এভাবে ক্লিয়ারেন্স সার্টিফিকেট মেলে না। এটা কোনো দুনিয়াবি আদালত না—যেখানে কিছু লেনদেন করে ফাইল বন্ধ করে দেওয়া যায়। আল্লাহর আদালতে হয় পুরোপুরি ইনসাফ, নয়তো পুরোপুরি ফজল ও করুণা।
ইনসাফের নিয়ম কী? যার হক নষ্ট করেছ—তার হক আদায় করতে হবে। অথবা সে নিজে মাফ করলে তবেই মাফ। আর আল্লাহর হকের ব্যাপারে—যেসব বড় গুনাহ আছে, সেগুলোর জন্যও চাই সত্যিকারের তাওবা।
হ্যাঁ, আল্লাহ চাইলে করুণা দেখিয়ে তাওবা ছাড়াও মাফ করে দিতে পারেন—কিন্তু আমরা করুণার ওপর ভরসা করে গুনাহ করতে পারি না। আমাদের জন্য নিয়ম হলো—তাওবা।
মুজাদ্দিদে আলফে সানি রহ.
ইমাম রাব্বানি, মুজাদ্দিদে আলফে সানি রহ. কী সুন্দর কথা বলেছেন—
আল্লাহ তাআলা সারা বছরের সব নূর জমা করেছেন রমজানে, রমজানের সব নূর জমা করেছেন শেষ দশকে, আর সেই নূরের সারাংশ তিনি রেখে দিয়েছেন লাইলাতুল কদরের এক রাতের মধ্যে।
ভাবুন একবার—একটা রাত, কিন্তু তার ভেতরে পুরো বছরের নূর! আমাদের দুর্ভাগ্য কী জানেন? আমরা রাতটা পাই, কিন্তু কদরটা করি না। কবির ভাষায়
میں ہی کم بخت غافل تھا، تو مجھ سے غافل نہ تھا
تو نے مجھ کو وہ سب دیا جس کے میں قابل نہ تھا
আমি ছিলাম গাফেল, কিন্তু তুমি গাফেল ছিলে না।
আমি যার যোগ্য ছিলাম না, তুমিই আমাকে তাই দিয়ে দিলে।
ভাইয়েরা, যদি আমরা সত্যিই শবে কদরের 'কদর' করতে পারি—এই এক রাতের ইবাদতেই আল্লাহর নৈকট্যের এমন দূরত্ব পার হওয়া যায়, যা অন্য হাজার রাতেও সম্ভব না।
যেমন আজকে একটা বিমান—এক রাতেই সেই পথ পাড়ি দেয়, যে পথ আগে মানুষ মাসের পর মাসেও পাড়ি দিতে পারতো না।
আল্লাহ তাআলা আমাদের লাইলাতুল কদরের 'কদর' করার তাওফিক দিন, আর আমাদের আমলগুলো কবুল করে নিন—আমীন।
কেন এই রাতের নাম লাইলাতুল কদর?
আল্লাহ তাআলা নিজেই এই রাতের নাম রেখেছেন—লাইলাতুল কদর। প্রশ্ন হলো, কেন এর নাম লাইলাতুল কদর?
‘লাইলাতুন’ অর্থ রাত। আর ‘কদর’ অর্থ মর্যাদা, সম্মান, উচ্চ অবস্থান। আমরা যেমন বলি—অমুক ব্যক্তির সমাজে অনেক কদর আছে; অর্থাৎ তার মর্যাদা মানুষ স্বীকার করে। তেমনি এই রাতও তার অসীম ফজিলত ও বরকতের কারণে অত্যন্ত মর্যাদাবান।
ফার্সি ভাষায় রাতকে বলা হয় ‘শব’। এ জন্যই আমরা একে শবে কদর বলি। কিন্তু নাম যাই বলি, অর্থ একই—মর্যাদার রাত।
এই রাত কেন মর্যাদাবান?
কারণ এ রাতে নাজিল হয়েছে কুরআন—আল্লাহ তাআলার কালাম। আর আল্লাহ তাআলা হলেন আহকামুল হাকিমীন—সর্বশ্রেষ্ঠ বিধানদাতা। যেমন তাঁর সত্তা মহান, তেমনি তাঁর কালামও মহান।
আরবদের একটি প্রবাদ আছে
كلامُ الملوكِ مُلوكُ الكلام
রাজাদের কথা নিজেই কথার রাজা।
তাহলে চিন্তা করুন—যিনি সকল রাজাধিরাজ, যিনি মালিকুল মুলক, যিনি রব্বুল আলামিন—তাঁর কালাম কত মহান!
সেই মহামহিম কালাম যখন একটি নির্দিষ্ট রাতে নাজিল হয়েছে, তখন সেই রাতের মর্যাদা কত উচ্চে উঠে গেছে—তা কি ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব?
এই কারণেই এ রাতের নাম হয়েছে লাইলাতুল কদর—মর্যাদার রাত, মহিমার রাত, বরকতের রাত।
অতএব, কুরআনের নুযূলই এই রাতকে ‘কদরওয়ালা’ বানিয়েছে। কালামের মহিমা রাতকে মহিমান্বিত করেছে।
কুরআন ও রমজানের গভীর সম্পর্ক
একারণে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর যুগ থেকে আজ পর্যন্ত উম্মাহর ইতিহাস লক্ষ্য করলে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়—রমজান ও কুরআনের মধ্যে এক অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক রয়েছে। কুরআন তিলাওয়াত তো সারা বছরই হয়, কিন্তু রমজান এলে তার মাত্রা বহুগুণ বেড়ে যায়। ঘরে ঘরে, মসজিদে মসজিদে, তারাবির কাতারে—কুরআনের সুর ভেসে ওঠে।
রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর নিজস্ব আমলও ছিল এমনই। প্রতি বছর রমজান মাসে হযরত জিবরীল আ. তাঁর কাছে এসে কুরআনের ‘দাওর’ (পুনরাবৃত্তি পাঠ) করতেন—তিনি তিলাওয়াত করতেন, আর জিবরীল আ. তা শুনতেন।
কেন এই বিশেষ গুরুত্ব? কারণ—এই রমজান মাসেরই এক বরকতময় রজনীতে, লাইলাতুল কদরে, কুরআনুল কারীম নাজিল হয়েছে। অতএব, রমজান হলো কুরআনের মাস—নুযূলের মাস, নবায়নের মাস, সম্পর্ক পুনর্গঠনের মাস।
কুরআন একটি জীবন্ত মু‘জিযা
ভাইয়েরা! একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আমাদের গভীরভাবে বোঝা দরকার—কুরআনুল কারীম আমাদের প্রিয় নবী ﷺ-এর সমস্ত মু‘জিযার মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ মু‘জিযা।
রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর জীবনে অসংখ্য মু‘জিযা প্রকাশিত হয়েছে—চাঁদ দ্বিখণ্ডিত হওয়া, আঙুলের ফাঁক দিয়ে পানি প্রবাহিত হওয়া, খাদ্যের বৃদ্ধি, গাছের কান্না—এসব ছিল দৃশ্যমান, সময়সাপেক্ষ মু‘জিযা। কিন্তু সেগুলো তাঁর জীবদ্দশার সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল। তিনি ইন্তিকাল করার পর সেগুলো ঐতিহাসিক ঘটনা হয়ে গেছে।
কিন্তু কুরআন? কুরআন একটি জীবন্ত মু‘জিযা। এটি চিরন্তন। এর ই‘জায (অলৌকিকতা) যুগে যুগে, নতুন নতুন দিক দিয়ে প্রকাশিত হতে থাকবে। আল্লাহ তাআলা কুরআনের অলৌকিকতা প্রমাণ করার জন্য একটি স্থায়ী চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছেন। তিনি ঘোষণা করেছেন
وَإِنْ كُنْتُمْ فِي رَيْبٍ مِمَّا نَزَّلْنَا عَلَىٰ عَبْدِنَا فَأْتُوا بِسُورَةٍ مِّنْ مِثْلِهِ
যদি তোমাদের সন্দেহ থাকে আমি আমার বান্দার উপর যা নাজিল করেছি সে বিষয়ে, তবে এর মতো একটি সূরা নিয়ে আসো। [সূরা বাকারা : ২৩]
এ চ্যালেঞ্জ শুধু সে সময়ের আরব কবি ও ভাষাবিদদের জন্য ছিল না; এটি কিয়ামত পর্যন্ত আগত সমগ্র মানবজাতির জন্য। চৌদ্দশত বছর পেরিয়ে গেছে। ভাষাবিদ, দার্শনিক, সাহিত্যিক—কেউ এই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে সফল হতে পারেনি। আর কখনও পারবেও না।
অন্যান্য মু‘জিযা আজ ইতিহাস। কিন্তু কুরআন আজও আমাদের মাঝে জীবন্ত, সংরক্ষিত ও অবিকৃত। কারণ এর সংরক্ষণের দায়িত্ব স্বয়ং আল্লাহ নিয়েছেন। তিনি ঘোষণা করেছেন
إِنَّا نَحْنُ نَزَّلْنَا الذِّكْرَ وَإِنَّا لَهُ لَحَافِظُونَ
নিশ্চয়ই আমিই এ ‘যিকর’ (কুরআন) অবতীর্ণ করেছি, এবং আমিই এর সংরক্ষণকারী। [সূরা হিজর : ৯]
দেখুন—সংরক্ষণের দায়িত্ব কোনো মানুষ, কোনো প্রতিষ্ঠান, কোনো জাতির নয়। এ দায়িত্ব স্বয়ং রব্বুল আলামিন গ্রহণ করেছেন।
কুরআন এত মহিমান্বিত কেন?
কুরআনের এই মহিমার মূল কারণ—এটি কোনো মানুষের রচনা নয়, এটি কোনো দার্শনিক গ্রন্থ নয়; এটি সৃষ্টিজগতের মালিকের কালাম।
تَنْزِيلٌ مِنْ رَبِّ الْعَالَمِينَ
এটি অবতীর্ণ হয়েছে সমস্ত জগতের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে। [সূরা আল-ওয়াকিয়া: ৮০]
যার কারণে আল্লাহ তাআলা তার অবতরণের জন্য বছরের বারো মাসের মধ্যে একটি বিশেষ মাস নির্বাচন করেছেন
شَهۡرُ رَمَضَانَ الَّذِىۡٓ اُنۡزِلَ فِيۡهِ الۡقُرۡاٰنُ
রমজান মাস—যে মাসে কুরআন নাযিল হয়েছে। [সূরা বাকারা : ১৮৫]
শুধু মাস নয়—রমজানের মধ্যেও একটি বিশেষ রাত নির্বাচন করা হয়েছে
إِنَّا أَنْزَلْنَاهُ فِي لَيْلَةِ الْقَدْرِ
নিশ্চয়ই আমি এটিকে (কুরআনকে) লাইলাতুল কদরে নাযিল করেছি। [সূরা কদর : ১]
আর যে উম্মাহর জন্য এই কুরআন নাজিল হয়েছে, তাকেও আল্লাহ তাআলা শ্রেষ্ঠ ঘোষণা করেছেন
كُنتُمْ خَيْرَ أُمَّةٍ أُخْرِجَتْ لِلنَّاسِ
তোমরাই শ্রেষ্ঠ উম্মাহ, যাদের মানুষের কল্যাণের জন্য প্রকাশ করা হয়েছে। [সূরা আলে ইমরান : ১১০]
অর্থাৎ—কালাম শ্রেষ্ঠ, মাস শ্রেষ্ঠ, রাত শ্রেষ্ঠ, উম্মাহ শ্রেষ্ঠ। এ সম্মান কি ছোট কোনো বিষয়?
কুরআনের প্রভাব কি আমাদের হৃদয়ে পড়ে?
কিন্তু একটি প্রশ্ন আমাদের নিজেদের কাছে করা দরকার—কুরআনের প্রভাব কি আমাদের হৃদয়ে পড়ে?
আল্লাহ তাআলা বলেন
لَوْ أَنْزَلْنَا هَذَا الْقُرْآنَ عَلَى جَبَلٍ لَرَأَيْتَهُ خَاشِعًا مُتَصَدِّعًا مِنْ خَشْيَةِ اللَّهِ
যদি আমি এই কুরআন কোনো পাহাড়ের উপর নাযিল করতাম, তবে তুমি দেখতে—আল্লাহর ভয়ে তা অবনত হয়ে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যেত। [সূরা হাশর : ২১]
পাহাড়ও যদি কুরআনের প্রভাবে ভেঙে যেতে পারে, তাহলে আমাদের হৃদয় কেন নড়ে না?
এটি কুরআনের দুর্বলতা নয়—এটি আমাদের অন্তরের কঠোরতার প্রমাণ। গুনাহ অন্তরকে কঠোর করে দেয়। আল্লাহ তাআলা বলেন
كَلَّا بَلْ رَانَ عَلَى قُلُوبِهِمْ مَا كَانُوا يَكْسِبُونَ
বরং তাদের কৃতকর্মের কারণেই তাদের অন্তরে মরিচা পড়ে গেছে। [সূরা মুতাফ্ফিফীন : ১৪]
তাই আমাদের প্রয়োজন—কুরআনের দিকে ফিরে যাওয়া। শুধু তিলাওয়াত নয়; বোঝা, অনুভব করা এবং জীবনে বাস্তবায়ন করা।
আল্লাহ তাআলা কুরআনের শুরুতেই বলেছেন
ذَٰلِكَ الْكِتَابُ لَا رَيْبَ فِيهِ ۛ هُدًى لِّلْمُتَّقِينَ
এ সেই কিতাব, যাতে কোনো সন্দেহ নেই; এটি মুত্তাকীদের জন্য হিদায়াত। [সূরা বাকারা : ২]
অর্থাৎ কুরআন হিদায়াতের কিতাব। কিন্তু হিদায়াত পেতে হলে অন্তরকে প্রস্তুত করতে হয়।
‘লাইলাতুল কদর’ নামের প্রথম কারণ
এবার ‘লাইলাতুল কদর’ নামের প্রথম কারণটি বুঝি। ‘কদর’ শব্দের অর্থ মর্যাদা, সম্মান, উচ্চ অবস্থান। কুরআন যেহেতু সর্বশ্রেষ্ঠ কালাম, আর এই কুরআন যে রাতে নাজিল হয়েছে—স্বাভাবিকভাবেই সেই রাতও বিশেষ মর্যাদা লাভ করেছে।
অতএব, কুরআনের নুযূলের কারণেই রাতটি ‘কদরওয়ালা’—মহামূল্যবান ও সম্মানিত।
দ্বিতীয় কারণ
মুহতারাম হাজিরীন! এবার দ্বিতীয় দিকটি বুঝি।
‘কদর’ শব্দের আরেকটি অর্থ হলো—সংকীর্ণতা বা সংকুচিত হওয়া। এই অর্থেও কুরআনে শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে। যেমন রিযিক সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেন
اللَّهُ يَبْسُطُ الرِّزْقَ لِمَنْ يَشَاءُ وَيَقْدِرُ
আল্লাহ যাকে চান তার রিযিক প্রশস্ত করে দেন, আর যাকে চান সংকুচিত করে দেন। [সূরা রা‘দ : ২৬]
এ আয়াতে একটি মূলনীতি বলা হয়েছে—রিযিক সম্পূর্ণ আল্লাহর মাশিয়্যাত (ইচ্ছা)-এর উপর নির্ভরশীল। কার হাতে কত রিযিক যাবে, কতটুকু যাবে—সবই আল্লাহর সিদ্ধান্তে। মানুষ হাজার চেষ্টা করলেও পাবে ততটুকুই, যতটুকু আল্লাহ চান।
এ নীতি কেবল মুমিনের ক্ষেত্রে নয়—কাফির-মুমিন সবার ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য।
ইতিহাসে আমরা দেখি—কিছু নবী ছিলেন সম্রাট, যেমন দাউদ আ. ও সুলাইমান আ.। আবার কিছু নবী দারিদ্র্যের মধ্যেও জীবন কাটিয়েছেন।
প্রাচুর্য ও সংকট—দুটিই পরীক্ষা। রিযিকের প্রশস্ততা একটি পরীক্ষা—মানুষ কি শোকর আদায় করে, নাকি কারুনের মতো অহংকার করে বলে, ‘এ তো আমারই কৃতিত্ব’? আর রিযিকের সংকীর্ণতা আরেকটি পরীক্ষা—মানুষ কি সবর করে, নাকি হতাশ হয়ে আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ে যায়?
তাহলে ‘লাইলাতুল কদর’ কেন? যেহেতু ‘কদর’-এর একটি অর্থ সংকীর্ণতা; তাই আলেমগণ বলেছেন—লাইলাতুল কদরকে এ নাম দেওয়ার একটি কারণ হলো—এই রাতে এত বিপুল সংখ্যক ফেরেশতা পৃথিবীতে অবতীর্ণ হন যে, তাদের আধিক্যে যেন পৃথিবীই সংকীর্ণ হয়ে যায়।
সূরা কদরে বলা হয়েছে
تَنَزَّلُ الْمَلَائِكَةُ وَالرُّوحُ فِيهَا بِإِذْنِ رَبِّهِم مِّن كُلِّ أَمْرٍ
সে রাতে ফেরেশতাগণ ও রূহ (জিবরীল) তাদের রবের নির্দেশে প্রত্যেক বিষয়ে অবতরণ করেন। [সূরা কদর : ৪]
অতএব ‘কদর’ মানে মর্যাদা—কারণ কুরআন নাযিল হয়েছে। আর ‘কদর’ মানে সংকীর্ণতা—কারণ ফেরেশতাদের নুযূলে জমিন ভরে যায়।
এই দুই অর্থ মিলেই লাইলাতুল কদর—মর্যাদার রাত, বরকতের রাত, ফেরেশতায় পরিপূর্ণ রাত।
তৃতীয় কারণ
‘কদর’ শব্দের আরেকটি অর্থ হলো—তাকদীর। অর্থাৎ, আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে নির্ধারিত সেই ফয়সালা, যা তাঁর ইচ্ছানুযায়ী সৃষ্টিজগতে বাস্তবায়িত হয়।
লাইলাতুল কদরে এক বিশেষ বিষয় ঘটে—এই রাতে বার্ষিক তাকদীরের নথি ফেরেশতাদের হাতে তুলে দেওয়া হয়, যাতে তারা সারা বছর আল্লাহর নির্দেশ অনুযায়ী তা কার্যকর করে। সূরা আদ-দুখানে আল্লাহ তাআলা বলেন
فِيهَا يُفْرَقُ كُلُّ أَمْرٍ حَكِيمٍ أَمْرًا مِّنْ عِندِنَا
সে রাতে প্রত্যেক প্রজ্ঞাপূর্ণ বিষয়ের পৃথক সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়—আমার পক্ষ থেকে আদেশস্বরূপ। [সূরা দুখান : ৪]
অর্থাৎ—কার কত রিযিক হবে, কার কত আয়ু অবশিষ্ট, কী ঘটনা ঘটবে, কোনো বান্দার জীবনে কী পরিবর্তন আসবে—যে সিদ্ধান্ত আল্লাহ তাআলা পূর্ব থেকেই লাওহে মাহফূজে নির্ধারণ করে রেখেছেন, তার বাস্তবায়নের নির্দেশ এ রাতেই ফেরেশতাদের অর্পণ করা হয়। এই কারণেও এ রাতের নাম—লাইলাতুল কদর; তাকদীর নির্ধারণ ও বণ্টনের রাত।
চতুর্থ কারণ
কিছু আলেম আরেকটি সুন্দর দিক উল্লেখ করেছেন। একজন গুনাহগার মুমিন—যে সারা বছর অবহেলায় কাটিয়েছে, কিন্তু ভাগ্যক্রমে লাইলাতুল কদর পেয়ে গেল, আর সে যদি সত্যিকার অর্থে এ রাতের কদর করে—তাওবা, ইস্তিগফার ও ইবাদতে রাত কাটায়—তাহলে আল্লাহ তাআলা তার গুনাহ মাফ করে দেন।
অর্থাৎ, এই রাতের ইবাদত বান্দার ‘কদর’—তার মর্যাদা—আল্লাহর কাছে বাড়িয়ে দেয়। এই অর্থেও এটি—লাইলাতুল কদর।
লাইলাতুল কদর গোপন রাখার রহস্য
এই রাতের মহিমা এতই অপরিসীম যে, আল্লাহ তাআলা ইচ্ছাকৃতভাবেই একে গোপন রেখেছেন। যেমন তিনি তাঁর অসংখ্য সুন্দর নামের মধ্যে ইসমে আযম গোপন রেখেছেন, তেমনি বছরের অসংখ্য রাতের মধ্যে লাইলাতুল কদরকে রহস্যে আবৃত রেখেছেন।
ওলামায়ে কেরাম বলেন, এ গোপনীয়তার পেছনে রয়েছে গভীর হিকমত।
১. গুনাহ থেকে বান্দাকে রক্ষা করার রহস্য
মানুষের স্বভাব এক নয়। কিছু মানুষ আছে, যারা গুনাহ ছাড়া থাকতে পারে না। যদি নির্দিষ্ট করে বলে দেওয়া হতো—এই রাতটাই লাইলাতুল কদর, তাহলে গুনাহে অভ্যস্ত কিছু লোক হয়তো সেই রাতেও গুনাহে লিপ্ত হতো। ফলে তারা আরও বড় গজবের উপযুক্ত হয়ে যেত। তাই বান্দাদের প্রতি দয়া করেই আল্লাহ তাআলা এ রাতকে নির্দিষ্ট করে জানাননি।
২. তলব, আবদিয়্যাত ও অস্থিরতার শিক্ষা
আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দার তলব (খোঁজ) ভালোবাসেন। তিনি ভালোবাসেন বান্দার আবদিয়্যাত (দাসত্ব)। এই কারণেই লাইলাতুল কদরকে গোপন রাখা হয়েছে। যেন মানুষ সারা বছর তার অপেক্ষায় থাকে, রমজানে তাকে খোঁজে, শেষ দশকে তাকে অনুসন্ধান করে, বিশেষ করে বেজোড় রাতগুলোতে জেগে থাকে।
যদি নির্দিষ্ট করে দেওয়া হতো—অমুক রাতটাই লাইলাতুল কদর, তাহলে আমরা কী করতাম? এক রাত জেগে বাকি রাতগুলো নিশ্চিন্তে ঘুমাতাম।
কিন্তু আল্লাহ সেটা চাননি। তিনি চেয়েছেন—অন্তত শেষ দশ রাত জুড়ে একটু অস্থিরতা থাকুক। ঘুমাতে যাওয়ার আগে মনে প্রশ্ন জাগুক—যদি আজ রাতটাই হয়? এই ‘যদি’—ই আল্লাহ চান। এই অনিশ্চয়তাই ইবাদত বাড়ায়। এই অপেক্ষাই বান্দাকে আল্লাহর দিকে টানে। ফলে বান্দারই উপকার। কারণ, সে বেশি সময় ইবাদতে কাটাবে, বেশি সময় আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক গড়বে।
আল্লাহ আমাদের শেখাতে চেয়েছেন—তাঁকে পেতে হলে খুঁজতে হয়। খুঁজতে হলে জাগতে হয়। জাগতে হলে হৃদয়কে অস্থির করতে হয়। আর সেই অস্থিরতার মধ্যেই লুকিয়ে আছে কদরের আসল স্বাদ।
বিষয়টি একটি সহিহ হাদিসে খুব সুন্দরভাবে এসেছে—হযরত আনাস রাযি. বর্ণনা করেন, হযরত উবাদা ইবন সামিত রাযি. তাঁকে জানান যে, রাসূলুল্লাহ ﷺ একদিন লাইলাতুল কদরের নির্দিষ্ট সময় জানাতে বের হয়েছিলেন। কিন্তু তখন দুইজন মুসলমানের মধ্যে ঝগড়া শুরু হয়ে যায়। তখন নবীজি ﷺ বললেন
إِنِّي خَرَجْتُ لأُخْبِرَكُمْ بِلَيْلَةِ الْقَدْرِ، وَإِنَّهُ تَلاَحَى فُلاَنٌ وَفُلاَنٌ فَرُفِعَتْ وَعَسَى أَنْ يَكُونَ خَيْرًا لَكُمُ الْتَمِسُوهَا فِي السَّبْعِ وَالتِّسْعِ وَالْخَمْسِ
আমি তোমাদের লাইলাতুল কদরের খবর দিতে বের হয়েছিলাম, কিন্তু অমুক ও অমুকের ঝগড়ার কারণে তা উঠিয়ে নেওয়া হয়েছে। সম্ভবত এটিই তোমাদের জন্য কল্যাণকর। তোমরা সপ্তম, নবম ও পঞ্চম রাতে (অর্থাৎ শেষ দশকের বেজোড় রাতগুলোতে) তা খোঁজো। [সহীহ বুখারী : ৪৯]
এ হাদিসে উল্লেখিত ‘সম্ভবত এটিই তোমাদের জন্য কল্যাণকর’—এর মাধ্যমে আমাদের শেখানো হয়েছে যে, কোনো বিষয় আমাদের কাছে অপছন্দনীয় হলেও সেটার ভেতরেই আল্লাহ তাআলা কল্যাণ রেখে দিতে পারেন। এই একই নীতিই আল্লাহ তাআলা কুরআনে বলেছেন
عَسَىٰ أَن تَكْرَهُوا شَيْئًا وَهُوَ خَيْرٌ لَّكُمْ ۖ وَعَسَىٰ أَن تُحِبُّوا شَيْئًا وَهُوَ شَرٌّ لَّكُمْ
হতে পারে তোমরা কোনো বিষয় অপছন্দ করছ, অথচ সেটাই তোমাদের জন্য ভালো। আর হতে পারে তোমরা কোনো বিষয় পছন্দ করছ, অথচ সেটাই তোমাদের জন্য ক্ষতিকর। আল্লাহ জানেন, তোমরা জানো না। [সূরা বাকারা : ২১৬]
এ ছাড়াও লাইলাতুল কদরের গোপনীয়তার মধ্যে অসংখ্য হিকমত রয়েছে, যার প্রকৃত জ্ঞান একমাত্র আল্লাহ তাআলার কাছেই।
একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা
উক্ত হাদিস থেকে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা পাওয়া যায়—দুইজন মুসলমানের ঝগড়ার কারণে এত বড় বরকতময় রাতের নির্ধারণ তুলে নেওয়া হলো! এজন্য ঝগড়া শুধু কথা কাটাকাটি না। এটা বরকত খেয়ে ফেলে। ঘরের ভেতর, মসজিদের ভেতর, সমাজের ভেতর।
এ কারণেই রাসূলুল্লাহ ﷺ পারস্পরিক ঝগড়াকে الحالقة (মুণ্ডনকারী) বলেছেন। [আবু দাউদ : ৪৯১৯] কারণ এটি মানুষের চুল নয়; বরং দীন, ঐক্য ও উম্মাহর শক্তিকে মুণ্ডন করে ফেলে। ঝগড়া হলে উম্মাহ একসাথে থাকে না, দুর্বল হয়ে পড়ে।
তাবেয়ী আবদাহ ইবন আবু লুবাবা রহ. বলেন
إِذَا رَأَيْتَ الرَّجُلَ لَجُوْجاً، مُمَارِياً، مُعْجَباً، بِرَأْيِهِ فَقَدْ تَمَّتْ خَسَارَتُهُ
যখন কাউকে নিজের সিদ্ধান্তের ব্যাপারে একগুঁয়েমী করতে, বিতর্কে লিপ্ত হতে এবং দম্ভ করতে দেখবে, তখন বুঝবে যে, তার সর্বনাশ পূর্ণতা লাভ করেছে। [সিয়ারু আ‘লামিন নুবালা : ৫/৫২৬]
লাইলাতুল কদরের সন্ধান
লাইলাতুল কদর আল্লাহ তাআলা গোপন রেখেছেন, নির্দিষ্ট করে দেননি। ইতোপূর্বে আপনারা জেনেছেন—এর পেছনে অনেক হিকমত আছে। এই কারণেই রাসূলুল্লাহ ﷺ আমাদের সাধারণ নির্দেশ দিয়েছেন
تَحَرَّوْا لَيْلَةَ الْقَدْرِ فِي الْعَشْرِ الْأَوَاخِرِ مِنْ رَمَضَانَ
রমজানের শেষ দশকে লাইলাতুল কদর অনুসন্ধান করো। [মুয়াত্তা মালিক : ৬৯৩]
আরেক হাদিসে এসেছে
تَحَرَّوْا لَيْلَةَ القَدْرِ في الوِتْرِ مِنَ العَشْرِ الأوَاخِرِ مِن رَمَضَانَ
রমজানের শেষ দশকের বেজোড় রাতগুলোতে তা খুঁজে নাও। [সহীহ বুখারী : ২০১৭]
অর্থাৎ ২১, ২৩, ২৫, ২৭ ও ২৯—এই রাতগুলো বিশেষ গুরুত্বের।
নির্দিষ্ট কোনো তারিখ কি জানা আছে?
প্রখ্যাত মুহাদ্দিস হাফিয ইবনু হাজর আসকালানি রহ. লাইলাতুল কদরের তারিখ নিয়ে বহু মতামত উল্লেখ করেছেন। তবে প্রায় সবার একমত—নিশ্চিত ও চূড়ান্ত তারিখ কারো জানা নেই। তবে অধিকাংশ আলেমের ধারণা—এটি শেষ দশকের বেজোড় রাতগুলোর মধ্যে হয়। আর ২৭তম রাতের ব্যাপারে বিশেষভাবে বেশি মত পাওয়া যায়।
২৭তম রাত কি নিশ্চিত?
২৭তম রাত নিশ্চিত নয়। তবে এ ব্যাপারে সহিহ মুসলিমে হযরত উবাই ইবনু কা‘ব রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন
وَاللَّهِ إِنِّي لَأَعْلَمُهَا ...وَأَكْثَرُ عِلْمِي هِيَ لَيْلَةُ سَبْعٍ وَعِشْرِينَ
আল্লাহর কসম! আমি জানি—সম্ভবত সেটি সাতাশের রাত। [সহীহ মুসলিম : ৭৬২]
তবে এটি তাঁর দৃঢ় ধারণা ছিল, নিশ্চিত ওহি নয়।
কিছু সূক্ষ্ম ইশারা
কিছু আলেম কুরআনের সূরা কদরের ভেতর থেকেও সূক্ষ্ম ইঙ্গিত খুঁজে বের করেছেন। সূরা কদরে আল্লাহ তাআলা বলেন
سَلَامٌ هِيَ حَتَّىٰ مَطْلَعِ الْفَجْرِ
‘এটি শান্তিময়—ফজর উদয় হওয়া পর্যন্ত।’
এখানে هِيَ শব্দটি সূরার গণনায় ২৭তম শব্দ হিসেবে আসে। এ থেকে কেউ কেউ ইঙ্গিত নিয়েছেন যে, শবে কদর ২৭ রমজান হতে পারে।
আরেকটি সুন্দর সূক্ষ্ম ইঙ্গিত কিছু আলেম উল্লেখ করেছেন—সূরা কদরে لَيْلَةُ الْقَدْرِ বাক্যটি তিনবার এসেছে। لَيْلَةُ الْقَدْرِ এই শব্দগুচ্ছে ৯টি অক্ষর। ৯*৩ = ২৭। এ হিসাব থেকেও কেউ কেউ ২৭ তারিখের দিকে ইঙ্গিত করেছেন।
একটি চমৎকার ঘটনা
তাফসিরে কুরতুবিতেও একটি সুন্দর ঘটনা আছে।
একদিন হযরত উমর রাযি. সাহাবাদের জিজ্ঞেস করলেন, ‘লাইলাতুল কদর কোন রাত?’
সবাই বললেন, والله أعلم ‘আল্লাহই ভালো জানেন।’
সেখানে তরুণ আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস রাযি. উপস্থিত ছিলেন। তাঁকে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বললেন, আমি ‘সাত’ সংখ্যার মধ্যে একটি বিশেষ মিল দেখেছি। আল্লাহ সৃষ্টি করেছেন—
— সাত আসমান
— সাত জমিন
— তাওয়াফ সাত চক্কর
— সাফা-মারওয়ার সাঈ সাত চক্কর
— রমিতে সাত কংকর
— সিজদার অঙ্গ সাতটি।
অনুরূপভাবে মানুষের সৃষ্টির ধাপগুলোও কুরআনে সাতভাবে এসেছে। আল্লাহ তাআলা বলেন
وَلَقَدْ خَلَقْنَا الْإِنسَانَ مِن سُلَالَةٍ مِّن طِينٍ
আমি মানুষকে মাটির সারাংশ থেকে সৃষ্টি করেছি।
ثُمَّ جَعَلْنَاهُ نُطْفَةً فِي قَرَارٍ مَّكِينٍ
অতঃপর আমি তাকে শুক্রবিন্দু রূপে এক সংরক্ষিত আধারে স্থাপন করেছি।
ثُمَّ خَلَقْنَا النُّطْفَةَ عَلَقَةً
পরে আমি শুক্রবিন্দুকে পরিণত করেছি জমাট বাঁধা রক্তে।
فَخَلَقْنَا الْعَلَقَةَ مُضْغَةً
অতঃপর রক্তপিন্ডকে পরিণত করেছি মাংসপিন্ডে।
فَخَلَقْنَا الْمُضْغَةَ عِظَامًا
অতঃপর মাংসপিণ্ডকে পরিণত করেছি হাড্ডিতে।
فَكَسَوْنَا الْعِظَامَ لَحْمًا
অতঃপর হাড্ডিকে আবৃত করেছি মাংস দিয়ে।
ثُمَّ أَنشَأْنَاهُ خَلْقًا آخَرَ ۚ فَتَبَارَكَ اللَّهُ أَحْسَنُ الْخَالِقِينَ
অবশেষে ওকে গড়ে তুলেছি অন্য এক সৃষ্টি রূপে; অতএব নিপুণতম স্রষ্টা আল্লাহ কতই না মহান। [সূরা মুমিনূন : ১২-১৪]
আলোচ্য আয়াতসমূহে মানব সৃষ্টির সাতটি স্তর উল্লেখ করা হয়েছে।
— সর্বপ্রথম স্তর سُلَالَةٍ مِّن طِينٍ মাটির সারাংশ।
— দ্বিতীয় نُطْفَةً বীর্য।
— তৃতীয় عَلَقَةً জমাট রক্ত,
— চতুর্থ مُضْغَةً মাংসপিণ্ড।
— পঞ্চম عِظَامًا হাড্ডি।
— ষষ্ঠ لَحْمًا অস্থিকে মাংস দ্বারা আবৃতকরণ।
— সপ্তম خَلْقًا آخَرَ সৃষ্টিটির পূর্ণত্ব অর্থাৎ রূহ সঞ্চারকরণ।
সূরা ‘আবাসা’-তেও খাদ্যের প্রসঙ্গে এসেছে
فَلْيَنْظُرِ الإِنْسَانُ إِلَى طَعَامِهِ. فَأَنبَتْنَا فِيهَا حَبًّا. وَعِنَبًا وَقَضْبًا. وَزَيْتُونًا وَنَخْلًا. وَحَدَائِقَ غُلْبًا. وَفَاكِهَةً وَأَبًّا
মানুষ তার খাদ্যের ব্যপারটাই ভেবে দেখুক না কেন। আমি প্রচুর পরিমাণে পানি বর্ষণ করি।তারপর যমীনকে বিদীর্ণ করে দেই। অতঃপর তাতে আমি উৎপন্ন করি-শস্য, আঙ্গুর ও শাক-সবজি, যায়তূন ও খেজুর, আর ঘন বৃক্ষ পরিপূর্ণ বাগবাগিচা, আর নানান জাতের ফল আর ঘাস-লতাপাতা। [সূরা ‘আবাসা : ২৪-৩০]
আলোচ্য আয়াতসমূহে খাদ্যের ব্যপারটা সাতটি বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে
১. حَبًّا শস্য,
২. عِنَبًا আঙ্গুর,
৩. قَضْبًا শাক-সবজি,
৪. زَيْتُونًا যায়তূন,
৫. نَخْلًا খেজুর,
৬. حَدَائِقَ غُلْبًا ঘন বৃক্ষ পরিপূর্ণ বাগবাগিচা,
৭. وَفَاكِهَةً وَأَبًّا নানান জাতের ফল ও ঘাস-লতাপাতা।
এই সব মিল দেখে আব্দুল্লাহ ইবন আব্বাস রাযি. বললেন, যেহেতু লাইলাতুল কদর শেষ দশকে, তাই সাতের হিসাবে ২৭তম রাত বেশি উপযুক্ত মনে হয়।
এ কথা শুনে হযরত উমর রাযি. প্রশংসা করে বললেন, তোমরা এই তরুণের মতো বিশ্লেষণও করতে পারলে না! [তাফসির কুরতুবী, সূরা মুমিনূন]
কী করবে একজন মুমিন?
তবে মনে রাখতে হবে—এগুলো নিশ্চিত দলিল নয়; বরং ইশারা মাত্র। কুরআন বা সহীহ হাদিসে স্পষ্টভাবে ২৭ তারিখ নির্ধারণ করে দেওয়া হয়নি।
তাহলে কী করবে একজন মুমিন?
হাকীমুল উম্মাহ হযরত মাওলানা আশরাফ আলী থানভী রহ. একটি অত্যন্ত কার্যকর কথা বলেছেন—যে ব্যক্তি শবে কদরের নিয়তে রাত জেগে ইবাদত করবে, তার নিয়তের কারণে ইনশাআল্লাহ সে শবে কদরের সওয়াব পাবে। কারণ, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন
إِنَّمَا الْأَعْمَالُ بِالنِّيَّاتِ
সমস্ত আমল নিয়তের ওপর নির্ভরশীল। [সহীহ বুখারী : ১]
অর্থাৎ, যদি বান্দা আন্তরিকভাবে ধারণা করে—আজ হয়তো লাইলাতুল কদর। তারপর এ নিয়তে ইবাদত করে, তাহলে আল্লাহ তাঁর নিয়তের মর্যাদা দেবেন। একজন ফারসি কবি খুব সুন্দরভাবে বলেছেন
اے خواجہ! چه جوئی ز شب قدر نشانی
هر شب، شب قدر است اگر قدر بدانی
হে বন্ধু! তুমি কেন শবে কদরের আলামত খুঁজে বেড়াও?
তুমি যদি কদর করতে জানো—তবে প্রতিটি রাতই তোমার জন্য শবে কদর।
লাইলাতুল কদর পাওয়ার সহজ পদ্ধতি
আমাদের শায়খ ও মুরশিদ মাহবুবুল ওলামা হযরত মাওলানা পীর জুলফিকার আহমদ নকশবন্দী রহ. বলেন
‘লাইলাতুল কদরের বরকত পাওয়ার একটি খুব সহজ কিন্তু গভীর রহস্য আছে। যে ব্যক্তি আল্লাহ তাআলার ক্ষমা চায়, তার জন্য প্রথম কাজ হলো—নিজের অন্তর পরিষ্কার করা। কারও প্রতি রাগ, হিংসা, বিদ্বেষ বা অভিযোগ মনে জমে থাকলে তা বের করে দেওয়া। আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য সবাইকে ক্ষমা করে দেওয়া।’
তিনি বলেন
‘এটা কোনো সাধারণ কথা নয়। এটা সেই হীরা-মুক্তার মতো নসিহত—যা আল্লাহর ওলিদের মাহফিল থেকে পেয়েছি।’
‘যে ব্যক্তি শেষ দশ রাতের কোনো রাতে জেগে ইবাদত কওে এবং নিজের বুককে হিংসা ও রাগমুক্ত করে, আশা করা যায়—হাশরের দিন আল্লাহ তাআলা এই আমলটাকেই বাহানা বানিয়ে তাকে ক্ষমা করে দেবেন।’
আরেকটি সূক্ষ্ম কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ রহস্য
আমাদের শায়খ ও মুরশিদ বলেন, অনেকেই মনে মনে চায়—আমি যদি লাইলাতুল কদরের রাতে ইবাদত করতে না-ও পারি, তবু যেন তার সাওয়াব পাই। এই আশা প্রায় সবার অন্তরেই থাকে। আর আল্লাহ তাআলা দয়ালু—তিনি এই সুযোগও রেখেছেন।
আল্লাহ তাআলা বলেন
تَنَزَّلُ الْمَلَائِكَةُ وَالرُّوحُ فِيهَا بِإِذْنِ رَبِّهِمْ مِنْ كُلِّ أَمْرٍ . سَلَامٌ
‘সে রাতে ফেরেশতারা ও রূহ (জিবরীল আ.) তাদের রবের অনুমতিতে সকল কল্যাণ নিয়ে অবতীর্ণ হন। সে রাত শান্তিময়।’
কিন্তু এই বরকত ঠিক কখন শুরু হয়—কোন রাতে, কোন সময়—তা কেউ জানে না। তবে আল্লাহ তাআলা একটি ইশারা দিয়েছেন
هِيَ حَتَّى مَطْلَعِ الْفَجْرِ
‘এই বরকত ফজর উদয় হওয়া পর্যন্ত অব্যাহত থাকে।’
এখান থেকেই সহজ সমাধানটি বোঝা যায়। যখনই লাইলাতুল কদর হবে—তার বিশেষ বরকত শুরু হয়ে সুবহে সাদিক পর্যন্ত অবশ্যই থাকবে। অতএব আমরা যারা দুর্বল মুমিন, যারা সারা রাত জেগে ইবাদত করতে পারি না—আমরা যখন সাহরির জন্য উঠি, যদি তখন অল্প হলেও দুই রাকাত তাহাজ্জুদ পড়ে নিই, কিছুক্ষণ আল্লাহকে ডাকি, ক্ষমা চাই—ইনশাআল্লাহ, আমরাও লাইলাতুল কদরের ইবাদতের সওয়াব থেকে বঞ্চিত হবো না।
সংক্ষেপে বললে—
- অন্তর পরিষ্কার করুন
- মানুষকে ক্ষমা করুন
- সাহরির সময় কিছু ইবাদত করুন
ইনশাআল্লাহ, লাইলাতুল কদর পেয়ে যাবেন। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে লাইলাতুল কদরের বরকত নসিব করুন। আমীন।
লাইলাতুল কদরের দোয়া
লাইলাতুল কদর সম্পর্কে একটি অত্যন্ত সুন্দর হাদিস আছে। উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়শা রাযি. একদিন রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে জিজ্ঞেস করলেন
يَا رَسُولَ اللَّهِ! أَرَأَيْتَ إِنْ عَلِمْتُ أَيُّ لَيْلَةٍ لَيْلَةُ الْقَدْرِ مَا أَقُولُ فِيهَا؟
‘হে আল্লাহর রাসূল! যদি আমি বুঝতে পারি কোন রাতটি লাইলাতুল কদর, তাহলে সে রাতে কী দোয়া করব?’
রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন, তুমি বলবে
اللَّهُمَّ إِنَّكَ عَفُوٌّ كَرِيمٌ تُحِبُّ الْعَفْوَ فَاعْفُ عَنِّي
‘হে আল্লাহ! আপনি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু, আপনি ক্ষমা করতে ভালোবাসেন—অতএব আমাকে ক্ষমা করুন।’ [তিরমিযী : ৩৫১৩]
কী অপূর্ব প্রশ্ন! হাদিসে আছে, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন
حُسْنُ السُّؤَالِ نِصْفُ الْعِلْمِ
সুন্দর প্রশ্ন করা জ্ঞানের অর্ধেক। [শু‘আবুল ঈমান : ৬৫৬৮]
সাধারণ প্রশ্ন যে কেউ করতে পারে। কিন্তু যথাযথ, গভীর ও সঠিক প্রশ্ন সেই-ই করতে পারে—যার অন্তরে কিছু জ্ঞান, কিছু বোধ, কিছু উপলব্ধি আছে।
এই কারণেই অসংখ্য সাহাবি ও তাবেঈন হযরত আয়শা রাযি.-এর কাছ থেকে ইলম অর্জন করেছেন। তাঁর প্রশ্নগুলো ছিল গভীর, সূক্ষ্ম এবং উম্মতের জন্য পথনির্দেশক।
কেন এই দোয়া?
খেয়াল করুন—রাসূল ﷺ আয়শা রাযি.-কে দীর্ঘ কোনো দোয়া শেখাননি। বরং ছোট, কিন্তু সর্বব্যাপী এক দোয়া শিখিয়েছেন। এই দোয়ার মধ্যে আছে—
দুনিয়ার আফিয়াত (নিরাপত্তা ও কল্যাণ)
আখিরাতের মাগফিরাত (ক্ষমা ও মুক্তি)
লাইলাতুল কদর তো একটি মাগফিরাতের রাত, একটি আফিয়াতের রাত। তাই দোয়াটিও এমন—যেখানে ক্ষমা ও কল্যাণ—দুটোই চাওয়া হয়েছে। আর ক্ষমা ও আফিয়াতের চেয়ে বড় চাওয়া নেই
হযরত আবু দারদা রাযি. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন
مَا سَأَلَ الْعِبَادُ شَيْئًا أَفْضَلَ مِنْ أَنْ يَغْفِرَ لَهُمْ وَيُعَافِيَهُمْ
বান্দারা ক্ষমা ও আফিয়াতের চেয়ে উত্তম কিছু কখনো প্রার্থনা করেনি। [মুসনাদ বাযযার : ৪০৯০]
আর লাইলাতুল কদরের এই দোয়ায় তো সেই কথাই বলা হচ্ছে।
লাইলাতুল কদরের দোয়ার গভীর তাৎপর্য
আরিফ বিল্লাহ হযরত মাওলানা শাহ হাকীম আখতার রহ. এই দোয়ার একটি সূক্ষ্ম ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি বলেন
এই দোয়ায় প্রথমেই রাসূলুল্লাহ ﷺ আল্লাহ তাআলার প্রশংসা ও সিফাত উল্লেখ করতে শিখিয়েছেন। কারণ একটি মূলনীতি আছে
ثَنَاءُ الْكَرِيمِ دُعَاءٌ
‘কোনো দয়ালু সত্তার প্রশংসা করাও এক ধরনের দোয়া।’
যার কাছে কিছু চাইতে হয়, তার সেই গুণের প্রশংসাই আগে করা হয়।
রাসূল ﷺ উম্মতের জন্য ক্ষমা চাইতে চেয়েছেন, তাই আল্লাহর ‘আফুউ’ (ক্ষমাশীল) সিফাতকে সামনে এনেছেন।
اللَّهُمَّ إِنَّكَ عَفُوٌّ
‘হে আল্লাহ! নিশ্চয়ই আপনি অত্যন্ত ক্ষমাশীল।’
অর্থাৎ—আপনি বারবার, অগণিতভাবে ক্ষমা করেন।
কিছু বর্ণনায় আছে
اللَّهُمَّ إِنَّكَ عَفُوٌّ كَرِيمٌ
এখানে ‘কারীম’ শব্দটি যোগ করা হয়েছে। কেন? কারণ ‘কারীম’ অর্থ—
الَّذِي يُعْطِي بِدُونِ الِاسْتِحْقَاقِ وَالْمِنَّةِ
‘যিনি অযোগ্যকেও দান করেন, বিনিময় বা দাবি ছাড়াই।’
অর্থাৎ—বান্দা যোগ্য হোক বা না হোক, পাপী হোক বা নেককার—যেহেতু আল্লাহ তাআলা ‘কারীম’ হলে, তাই তাকে বঞ্চিত করেন না।
এ যেন গুনাহগারদের জন্য আশার দরজা খুলে দেওয়া।
تُحِبُّ الْعَفْوَ ‘আপনি ক্ষমা করতে ভালোবাসেন।’ এর অর্থ—
أَنْتَ تُحِبُّ ظُهُورَ صِفَةِ الْعَفْوِ عَلَى عِبَادِكَ
‘হে রব! আপনি আপনার বান্দাদের ওপর ক্ষমার সিফাত প্রকাশ করতে ভালোবাসেন।’
অর্থাৎ—ক্ষমা করা আপনার কাছে শুধু একটি কাজ নয়—এটি আপনার প্রিয় কাজ। তাই আমরা যেন বলছি, ‘হে আল্লাহ! আপনি তো ক্ষমা করতে ভালোবাসেন, তাহলে আমাদের উপর আপনার সেই প্রিয় কাজটি প্রয়োগ করুন।’ [মাওয়াহিবে রাব্বানিয়া : ৯০]
মাওলানা জালালুদ্দিন রুমি রহ. বলেন
اے محب عفو!از ما عفو کن
اے طبیب رنج! ناسور کہن
হে ক্ষমাপ্রেমী রব! আমাদের ক্ষমা করুন।
হে পুরনো ক্ষতের চিকিৎসক! আমাদের অন্তরের পাপের ক্ষত সারিয়ে দিন।
পাপ আসলে একটি পুরনো রক্তাক্ত ক্ষতের মতো—বাহ্যিকভাবে শুকনো মনে হয়, ভেতরে ভেতরে পচতে থাকে। ক্ষমা ছাড়া সেই ক্ষত সারবে না।
এই দোয়া কেন এত মূল্যবান?
মোট কথা, এই দোয়া কেন এত মূল্যবান? কেননা, এই দোয়া—
- সংক্ষিপ্ত
- সহজ
- কিন্তু সর্বব্যাপী
এর মধ্যে আছে—
- গুনাহ মাফ
- অন্তরের পরিশুদ্ধি
- দুনিয়ার নিরাপত্তা
- আখিরাতের মুক্তি
যদি লাইলাতুল কদরের মতো মাকবুল রাতে এই দোয়া কবুল হয়ে যায়—তাহলে মানুষের জীবনের মোড় ঘুরে যায়। কারণ, আল্লাহর ‘কারীমি শান’ অদ্ভুত! তিনি যখন কাউকে ক্ষমা করেন, তখন শুধু শাস্তি মওকুফ করেন না; বরং তাকে নিজের প্রিয় বানিয়ে নেন। আর যাকে আল্লাহ ভালোবাসেন— তাকে আর কেউ অপমানিত করতে পারে না।
এক বিস্ময়কর ঘটনা—তাওবার মর্যাদা
রেওয়ায়েতে একটি আশ্চর্য ঘটনা বর্ণিত আছে। হযরত মূসা আ.-এর যুগে এক যুবক ছিল—অত্যন্ত অবাধ্য, পাপাচারী ও বেপরোয়া। পুরো জনপদ তার আচরণে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিল। অবশেষে মানুষ তাকে নগর থেকে বের করে দেয়। সে নির্জন প্রান্তরে গিয়ে একা বসবাস শুরু করে। সেখানেই তার মৃত্যু হয়।
এদিকে হযরত মূসা আ.-এর প্রতি ওহি নাযিল হলো, ‘আমার এক ওলি (প্রিয় বান্দা) অমুক স্থানে ইন্তেকাল করেছে। সেখানে গিয়ে তাকে গোসল দাও, জানাযা পড়াও এবং ঘোষণা করো—যে তার জানাযায় শরিক হবে, সে মাগফিরাতের হকদার হবে।’
ঘোষণা শুনে বনী ইসরাঈলের অনেক মানুষ সমবেত হলো। কিন্তু যখন নির্ধারিত স্থানে পৌঁছাল, সবাই হতবাক! এ তো সেই যুবক—যাকে তারা পাপের কারণে সমাজচ্যুত করেছিল!
হযরত মূসা আ.-ও বিস্মিত হলেন। আল্লাহর দরবারে কারণ জানতে চাইলেন।
ওহির মাধ্যমে জানানো হলো, ‘হে মূসা! মানুষ যা বলেছে তা সত্য—সে পাপীই ছিল। কিন্তু যখন সবাই তাকে ত্যাগ করল, সে সম্পূর্ণ অসহায় হয়ে পড়ল। মৃত্যুর আগে সে গভীর অনুতাপে, বিনয়ের সাথে এ দোয়া করেছিল
إلهِي عَبْدٌ مِنْ عِبَادِكَ، غَرِيبٌ فِي بِلادِكَ، لَوْ عَلِمْتُ أَنَّ عَذَابِي يَزِيدُ فِي مُلْكِكَ، وَعَفْوَكَ عَنِّي يَنْقُصُ مِنْ مُلْكِكَ، لَمَا سَأَلْتُكَ الْمَغْفِرَةَ، وَلَيْسَ لِي مَلْجَأٌ وَلَا رَجَاءٌ إِلَّا أَنْتَ، وَقَدْ سَمِعْتُ فِي مَا أَنْزَلْتَ أَنَّكَ قُلْتَ: إِنِّي أَنَا الْغَفُورُ الرَّحِيمُ. فَلَا تُخَيِّبْ رَجَائِي
‘হে আমার রব! আমি আপনার এক বান্দা, আপনার রাজ্যে এক অসহায় আগন্তুক। যদি জানতাম, আমাকে শাস্তি দিলে আপনার রাজত্ব বৃদ্ধি পাবে, আর আমাকে ক্ষমা করলে তা কমে যাবে—তাহলে কখনোই ক্ষমা চাইতাম না। কিন্তু আপনি ছাড়া আমার আর কোনো আশ্রয় নেই। আপনার কিতাবে আপনি নিজেই বলেছেন—আমি তো ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। তাই আমার আশাকে ব্যর্থ করবেন না।’
এই দোয়ার পর আল্লাহ তাআলা শুধু তাকে ক্ষমাই করেননি; বরং তাকে নিজের ওলি বানিয়ে নিয়েছেন। [ইবন কুদামা, কিতাবুত তাওয়বীন : ৫৬]
সুবহানাল্লাহ! আমরা অনেক সময় মানুষকে তার অতীত দিয়ে বিচার করি। কিন্তু আল্লাহ বান্দাকে তার শেষ মুহূর্তের তাওবা দিয়ে মূল্যায়ন করেন। এক মুহূর্তের সত্যিকারের অনুতাপ জীবনের বহু বছরের পাপ ধুয়ে দিতে পারে।
শবে কদরের সুযোগ
শবে কদরে আল্লাহর রহমতের দরজা শুধু খোলে না; বরং খুব সহজও হয়ে যায়। এই রাত—
ক্ষমার রাত
তাওবা আল্লাহর দিকে ফিরে আসার রাত
চোখের পানির দাম পাওয়ার রাত
আজ যদি অন্তর থেকে বলা যায়
اللَّهُمَّ إِنَّكَ عَفُوٌّ كَرِيمٌ تُحِبُّ الْعَفْوَ فَاعْفُ عَنِّي
তাহলে হয়তো আমরাও সেই যুবকের মতো অপ্রত্যাশিতভাবে প্রিয় বান্দার কাতারে শামিল হয়ে যেতে পারি।
আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে রমজান ও লাইলাতুল কদরের প্রকৃত কদর দান বানান। আমাদের তাওবা কবুল করুন। আমীন—ইয়া রাব্বাল আলামীন।
وَاخِرُ دَعْوَانَا أَنِ الْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِين
মন্তব্য (...)
এ সম্পর্কিত আরও প্রবন্ধ
শবে ক্বদরের ফযীলত ও হাসিলের উপায়
শবে ক্বদর এমন একটি মহা পূণ্যময় রজনী যা আল্লাহ তা‘আলা বিশেষ অনুগ্রহে একমাত্র উম্মতে মুহাম্মাদীকে প্রদ...
বিশ রাকাত তারাবী কি বিদআত!
প্রজন্ম পরম্পরায় চলে আসা হারামাইন শরীফাইনের আমল তারাবীর বিষয়ে প্রজন্ম পরম্পরায় চলে আসা মসজিদে হারাম ...
তারাবী তাহাজ্জুদ ভিন্ন নামাযঃ এক নামায বলা তারাবীহ অস্বিকার করার নিফাকী পদ্ধতি
কোন কিছুকে অস্বিকার করার পদ্ধতি দু’টি। যথা- ১ পরিস্কার শব্দে অস্বিকার করা। ২ মুনাফিকীর সাথে অস্বিকার...
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন