প্রবন্ধ
দায়েমী সালাত বা সার্বক্ষণিক ধ্যান! বাউল মতবাদ। পর্ব—৪০
১৩ জানুয়ারী, ২০২৬
৭১৪২
০
ইসলামে নামাজ পাঁচ ওয়াক্ত ফরজ, যা বিভিন্ন হাদিসের মাধ্যমে সুস্পষ্ট ও অকাট্যভাবে প্রমাণিত।
বাউল ধর্মে কী বলে?
ফকির লালন বলেছে—
কায়েম উদ্ দ্বীন হবে কিসে অহর্নিশি ভাবছি বসে
দায়েমী নামাজের দিশে লালন ফকির কয়। —(অখণ্ড লালনসঙ্গীত, পৃ. ৬৩)
দায়েমি সালাতি যে জন,
শমন তাহার আজ্ঞাকারী। —(লালনভাষা অনুসন্ধান, খ. ১, পৃ. ১৫৭)
লালনের এই গানের ব্যাখ্যায় বাউল সম্প্রদায় লিখেছে—
সার্বক্ষণিক ভাবে ধ্যানস্থ অবস্থায় যিনি থাকেন আপন ইচ্ছে ছাড়া দৈহিক মৃত্যু তাকে কখনো স্পর্শ করতে পারে না। —(লালনভাষা অনুসন্ধান, খ. ১, পৃ. ১৫৭)
অর্থাৎ তারা বুঝাতে চায়—পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ এটা সঠিক নয়, বরং নামাজের মৌলিক বিষয় হলো, সারাক্ষণ আল্লাহর ধ্যান করা। তারা এটার নাম দিয়েছে ‘দায়েমী সালাত’ বা সার্বক্ষণিক নামাজ।
ইসলাম কী বলে?
কিছু বানোয়াট ধারণার প্রভাবে মনে হতে পারে ইসলামে ‘দায়েমী সালাত’ আছে। কিন্তু এটি সম্পূর্ণ ভুল। ইসলামে এমন কোনো নামাজ নেই যা চিরকাল বা যেকোনো সময় পড়া যায়। বরং, প্রতিটি নামাজের জন্য নির্ধারিত সময় বা ওয়াক্ত রয়েছে। সেই নির্ধারিত ওয়াক্তই পাঁচটি, যা ইসলামের মূল নিয়ম হিসেবে স্থির করা হয়েছে। যথা—ফজর, জোহর, আসর, মাগরিব এবং ইশা। প্রমাণস্বরূপ পবিত্র কুরআনও নামাজের ওয়াক্তের ব্যাপারে স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছে—
إِنَّ الصَّلَاةَ كَانَتْ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ كِتَابًا مَّوْقُوتًا
“নিশ্চয়ই সালাত মুসলিমদের এক অবশ্য পালনীয় কাজ নির্দিষ্ট ওয়াক্তে।” —(সুরা নিসা : ১০৩)
তাছাড়া হাদিস শরীফে এসেছে, হযরত উবাদাহ্ ইবনুস সামিত রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন—
خَمْسُ صَلَوَاتٍ افْتَرَضَهُنَّ اللَّهُ تَعَالَى
“পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ, যা আল্লাহ তাআলা (বান্দার জন্য) ফরয করেছেন।” —(সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নং : ৪২৫)
এছাড়াও, মিরাজে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ৫ ওয়াক্ত নামাজ প্রবর্তনের ইতিহাস সবারই পরিচিত।
বাউলদের দলীল কী?
মূলত বাউলরা যে আয়াতটি দ্বারা দলীল পেশ করে, সে আয়াতটি হলো—
الَّذِينَ هُمْ عَلَىٰ صَلَاتِهِمْ دَائِمُونَ
“যারা তাদের নামায আদায় করে নিয়মিত।” —(সুরা মাআরিজ : ২৩)
অর্থাৎ তারা এ আয়াতটি দ্বারা বুঝাতে চায়—নামাজ পাঁচ ওয়াক্ত নয়, বরং সর্বক্ষণ পড়তে হবে। অর্থাৎ এটি শুধু শারীরিক সালাত নয়, বরং মনের বা আত্মিক সালাত, যেখানে বান্দা সর্বদা আল্লাহর স্মরণে থাকে। তাদের এ ভ্রান্ত মতবাদের সুস্পষ্ট জবাব সাহাবী উকবা ইবনে আমের রা. থেকেই জানা যায়।।হযরত আবুল খায়ের রহি. বলেন,
سَأَلْنَا عُقْبَةَ بْنُ عَامِرٍ عَنْ قَوْلِ اللَّهِ تَعَالَى: ﴿الَّذِينَ هُمْ عَلَى صَلَاتِهِمْ دَائِمُونَ﴾ أَهُمُ الَّذِينَ يُصَلُّونَ أَبَدًا؟ قَالَ: لَا وَلَكِنَّهُ إِذَا صَلَّى لَمْ يَلْتَفِتْ عَنْ يَمِينِهِ وَلَا عَنْ شِمَالِهِ وَلَا مِنْ خَلْفِهِ
“আমরা সাহাবী হযরত উকবা ইবনে আমের রা.-কে জিজ্ঞাসা করলাম, এই আয়াতের অর্থ কি এই যে, যারা সর্বক্ষণ নামায পড়ে? তিনি বললেন—না, এই অর্থ নয়, বরং উদ্দেশ্য এই যে, যে ব্যক্তি শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত নামাযের দিকেই নিবিষ্ট থাকে এবং ডানে-বামে ও আগেপিছে তাকায় না।” —(তাফসীরে বাগাবী, খ. ৮ পৃ. ২২৪)
ইবনে কাসীর রহি. এই আয়াতের ব্যাখ্যা লিখতে গিয়ে বলেছেন—
وَقِيلَ: الْمُرَادُ بِالدَّوَامِ هَاهُنَا السُّكُونُ وَالْخُشُوعُ، كَقَوْلِهِ: ﴿قَدْ أَفْلَحَ الْمُؤْمِنُونَ الَّذِينَ هُمْ فِي صَلاتِهِمْ خَاشِعُونَ﴾ [الْمُؤْمِنُونَ: ١، ٢] . قَالَهُ عُتْبَةُ بْنُ عَامِرٍ وَمِنْهُ الْمَاءُ الدَّائِمُ، أَيِ: السَّاكِنُ الرَّاكِدُ.
“এবং বলা হয়—এখানে "স্থায়ী নামাজ" বলতে যা বোঝানো হয়েছে, তা হলো—স্থিরতা এবং খুশুর সাথে আদায় করা। যেমন (অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন : {যারা তাদের নামাজে বিনয়ী, তারাই সফলকাম} [আল-মু'মিনুন : ২]। উতবা ইবনে আমের এই মতটি বলেছেন এবং এ থেকেই "الْمَاءُ الدَّائِمُ" শব্দটি এসেছে, যার অর্থ স্থির এবং জমাট (পানি)।” —(তাফসীরে ইবনে কাসীর, খ. ৮ পৃ. ২২৬)
ইবনে কাসীর রহি. আরো বলেন,
قِيلَ: مَعْنَاهُ يُحَافِظُونَ عَلَى أَوْقَاتِهِمْ وَوَاجِبَاتِهِمْ. قَالَهُ ابْنُ مَسْعُودٍ، وَمَسْرُوقٌ، وَإِبْرَاهِيمُ النَّخَعِيُّ
“বলা হয়—এর অর্থ হলো, যারা নির্দিষ্ট সময়ে এবং ওয়াজীবসমূহে সচেতন (হয়ে যারা নামাজ আদায় করে)। আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. মাসরুক এবং ইব্রাহিম আন-নাখাঈ রহি. এমনটি বলেছেন।” —(তাফসীরে ইবনে কাসীর, খ. ৮ পৃ. ২২৬)
ইবনে কাসীর রহি. আরো বলেন,
وَقِيلَ: الْمُرَادُ بِذَلِكَ الَّذِينَ إِذَا عَمِلُوا عَمَلًا دَاوَمُوا عَلَيْهِ وَأَثْبَتُوهُ، كَمَا جَاءَ فِي الصَّحِيحُ عَنْ عَائِشَةَ، عَنْ رَسُولِ اللَّهِ ﷺ أَنَّهُ قَالَ: "أَحَبُّ الْأَعْمَالِ إِلَى اللَّهِ أَدْوَمُهَا وَإِنْ قَلّ". وَفِي لَفْظٍ: "مَا دَاوَمَ عَلَيْهِ صَاحِبُهُ"، قَالَتْ: وَكَانَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ إِذَا عَمِلَ عَمَلًا داوم عليه
“এবং বলা হয়—এর অর্থ হলো তারা, যারা যখন কোনো কাজ করে, তখন তাতে অটল থাকে এবং ধারাবাহিকতা বজায় রাখে, যেমনটি সহীহ হাদিসে আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন—আল্লাহর কাছে সর্বাধিক প্রিয় আমল সেটা, যা সদাসর্বদা নিয়মিত করা হয়। যদিও তা অল্প হয়।।” এবং অন্য বর্ণনায় আছে: “যার উপর আমলকারী অটল থাকে।” আয়েশা রা. বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন কোন কাজ করতেন, তখন তিনি তাতে ধারাবাহিকতা বজায় রাখতেন।” —(তাফসীরে ইবনে কাসীর, খ. ৮ পৃ. ২২৬)
কুরআনে ওয়াক্তিয়া নামাজের দলীল :
ইসলামে নামাজকে নির্দিষ্ট সময় বা ওয়াক্তে পড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এই ওয়াক্তের বিধান বিভিন্ন আয়াত ও হাদিস দ্বারা স্পষ্টভাবে প্রমাণিত। যেমন, আল্লাহ তাআলা বলেন—
وَسَبِّحْ بِحَمْدِ رَبِّكَ قَبْلَ طُلُوعِ الشَّمْسِ وَقَبْلَ غُرُوبِهَا ۖ وَمِنْ آنَاءِ اللَّيْلِ فَسَبِّحْ وَأَطْرَافَ النَّهَارِ لَعَلَّكَ تَرْضَىٰ
“এবং সূর্যোদয়ের আগে ও সূর্যাস্তের আগে নিজ প্রতিপালকের তাসবীহ ও হামদে রত থাকো এবং রাতের মুহূর্তগুলোতেও তাসবীহতে রত থাকো এবং দিনের প্রান্তসমূহেও, যাতে তুমি সন্তুষ্ট হয়ে যাও।” —(সুরা ত্ব-হা : ১৩০)
ইমাম জাসসাস রহি. এ আয়াতের তাফসীর করতে গিয়ে লিখেছেন—
وَهَذِهِ الآيَةُ مُنْتَظِمَةٌ لأَوْقَاتِ الصَّلَوَاتِ أَيْضًا
“এই আয়াতটি নামাজের ওয়াক্তের বিষয়েও প্রযোজ্য।” —(আহকামুল কুরআন লিল-জাসসাস, খ. ২ পৃ. ৩৩৪
আল্লামা তাকী উসমানী দা.বা. এই আয়াতের তাফসীরে লিখেছেন—
মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সান্তনা দেওয়া হচ্ছে যে, কাফেরগণ আপনার বিরুদ্ধে যেসব বেহুদা কথাবার্তা বলবে, তা নিয়ে কোনো প্রতিউত্তর দেওয়ার প্রয়োজন নেই। বরং, ধৈর্য ধারণ করুন এবং আল্লাহ তাআলার তাসবীহ ও গুণকীর্তনে লিপ্ত থাকুন। এর সর্বোত্তম পন্থা হলো সালাত আদায় করা।
অতএব, সূর্যোদয়ের আগে ফজরের নামাজ, সূর্যাস্তের আগে আসরের নামাজ, রাতের ইশা ও তাহাজ্জুদের নামাজ এবং দিনের প্রান্তে মাগরিবের নামাজ নিয়মিত আদায় করুন। এ নিয়ম অনুসরণ করলে আপনার পরিণাম সুখকর হবে এবং আপনি আনন্দ লাভ করবেন। এ কারণগুলো বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ—
১. এই কর্মের জন্য আপনাকে যে পুরস্কার দেওয়া হবে, তা অত্যন্ত মহিমান্বিত ও সুবিপুল।
২. এই পথ আপনাকে শত্রুর বিরুদ্ধে বিজয় নিশ্চিত করবে।
৩. এর ফলে আপনি শাফায়াতের মহামর্যাদায় আসীন হবেন।
ফলে, উম্মতের নাজাতপ্রাপ্তি আপনার মহানন্দের এক অপরিসীম উৎস হয়ে উঠবে।
কুরআনে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের আয়াত :
পবিত্র কুরআনে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের আয়াত রয়েছে। কিন্তু মূর্খতার কারণে বাউলরা খুঁজে পায় না। পেলেও ইসলামের প্রতি বিদ্বেষ থাকায় তারা তা স্বীকার করে না এবং তাদের অনুসারীদের জানতে দেয় না। অথচ পবিত্র কুরআনে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের আয়াত রয়েছে। দেখুন, মহান আল্লাহ বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لِيَسْتَأْذِنكُمُ الَّذِينَ مَلَكَتْ أَيْمَانُكُمْ وَالَّذِينَ لَمْ يَبْلُغُوا الْحُلُمَ مِنكُمْ ثَلَاثَ مَرَّاتٍ ۚ مِّن قَبْلِ صَلَاةِ الْفَجْرِ وَحِينَ تَضَعُونَ ثِيَابَكُم مِّنَ الظَّهِيرَةِ وَمِن بَعْدِ صَلَاةِ الْعِشَاءِ
“হে মুমিনগণ, তোমাদের মালিকানাধীন দাস-দাসীগণ এবং তোমাদের মধ্যে যারা এখনও সাবালকত্বে পৌঁছেনি, সেই শিশুগণ যেন তিনটি সময়ে (তোমাদের কাছে আসার জন্য) অনুমতি গ্রহণ করে ফজরের নামাজের আগে, দুপুর বেলা যখন তোমরা পোশাক খুলে রাখো এবং ইশার নামাযের পর।” —(সুরা নূর : ৫৮) এই আয়াতে তিন ওয়াক্তের কথা সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে—
১. ফজর।
২. জোহর।
৩. ইশা।
বাকি থাকলো ফজর এবং মাগরিব। নিচের আয়াতটি দেখুন। মহান রব্ব বলেন—
فَسُبْحَانَ اللَّهِ حِينَ تُمْسُونَ وَحِينَ تُصْبِحُونَ
“সুতরাং আল্লাহর তাসবীহতে লিপ্ত থাকো, যখন তোমরা সন্ধ্যায় উপনীত হও এবং যখন তোমরা ভোরের সম্মুখীন হও।” —(সুরা রূম : ১৭)
এ আয়াতে মাগরিব এবং ফজরের কথা বলা হলো। বাকি থাকলো শুধু আসরের নামাজ। নিচের আয়াতটি দেখুন। মহান রব্ব বলেন,
وَالۡعَصۡرِ
“আছরের কসম।” —(সুরা আছর : ১)
আয়াতটির তাফসীর করতে গিয়ে হযরত মুকাতিল রহি. বলেন,
هو قسم بصلاة العصر وهي الوسطى
“এটি আছরের নামাজের কসম, যা মধ্যবর্তী নামাজ (বলে পরিচিত)।” —(তাফসীরে কুরতুবী, খ. ২২ পৃ. ৪৬৪)
সুতরাং এ আয়াতগুলো থেকে ৫ ওয়াক্ত নামাজের স্পষ্টত উল্লেখ্য পাওয়া যায়। তাছাড়াও একই আয়াতে ৫ ওয়াক্ত নামাজের দলীলও পাওয়া যায়। মহান রব্ব বলেন—
أَقِمِ الصَّلَاةَ لِدُلُوكِ الشَّمْسِ إِلَىٰ غَسَقِ اللَّيْلِ وَقُرْآنَ الْفَجْرِ ۖ إِنَّ قُرْآنَ الْفَجْرِ كَانَ مَشْهُودًا
“(হে নবী,) সূর্য হেলার সময় থেকে রাতের অন্ধকার পর্যন্ত নামায কায়েম করো এবং ফজরের সময় কুরআন পাঠে যত্নবান থাকো। স্মরণ রেখো, ফজরের তিলাওয়াতে ঘটে থাকে সমাবেশ।” —(সুরা ইসরা : ৭৮)
এই আয়াতে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের কথা বলা আছে। খুব খেয়াল করুন—أَقِمِ الصَّلَاةَ لِدُلُوكِ الشَّمْسِ (সূর্য হেলার সময় নামাজ পড়ো) অংশে ৩ ওয়াক্ত নামাজের কথা আছে। কারণ, সূর্য তিনবার ঢলে। মাথার ওপর থেকে যখন ঢলে যায়, তখন জোহরের নামাজ। মাথার ওপর থেকে ঢলে অস্তে যাওয়ার আগে মাঝ বরাবর যখন আরেকটি ঢলা দেয়, তখন আছরের নামাজ এবং একেবারে যখন অস্তমিত হতে শেষ ঢলা দেয়, তখন মাগরিব। আর إِلَىٰ غَسَقِ اللَّيْلِ (রাতের অন্ধকার পর্যন্ত) বলতে ইশার নামাজ। আর, قُرْآنَ الْفَجْرِ (ফজরের কুরআন) বলতে এখানে ফজরের কথা উল্লেখ্যই রয়েছে। সুতরাং এই একই আয়াত দ্বারা ৫ ওয়াক্ত নামাজের কথা বলা হয়েছে। তারপরও যদি কেউ ৫ ওয়াক্ত নামাজের দলীল কুরআন থেকে না পায়, তাহলে সে মূর্খতার চরম শিখরে পৌঁছে গিয়েছে।
রাসুল সা.-কী দায়েমী সালাতের কথা বলেছেন?
পবিত্র কুরআন ও সুন্নাহর কোথাও দায়েমী সালাত বলতে কোনো নামাজের কথা নেই। অথচ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নামে মিথ্যাচার করে লালন ফকির লিখেছে—
মোর্শেদের হুকুম মানো দায়েমী নামাজ জানো
রসুলে যে ফরমান লালন তাই রচে। —(অখণ্ড লালনসঙ্গীত, পৃ. ৬৫)
অর্থাৎ, দায়েমী সালাতের কথা নাকি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন! অথচ এটা তাদের সম্পূর্ণ বানোয়াট কথা। কারণ, মিরাজের হাদিসে এসেছে, হযরত আনাস ইবনে মালিক রা. থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
فَأَوْحَى اللَّهُ إِلَىَّ مَا أَوْحَى فَفَرَضَ عَلَىَّ خَمْسِينَ صَلاَةً فِي كُلِّ يَوْمٍ وَلَيْلَةٍ فَنَزَلْتُ إِلَى مُوسَى صلى الله عليه وسلم فَقَالَ مَا فَرَضَ رَبُّكَ عَلَى أُمَّتِكَ قُلْتُ خَمْسِينَ صَلاَةً . قَالَ ارْجِعْ إِلَى رَبِّكَ فَاسْأَلْهُ التَّخْفِيفَ فَإِنَّ أُمَّتَكَ لاَ يُطِيقُونَ ذَلِكَ فَإِنِّي قَدْ بَلَوْتُ بَنِي إِسْرَائِيلَ وَخَبَرْتُهُمْ . قَالَ فَرَجَعْتُ إِلَى رَبِّي فَقُلْتُ يَا رَبِّ خَفِّفْ عَلَى أُمَّتِي . فَحَطَّ عَنِّي خَمْسًا فَرَجَعْتُ إِلَى مُوسَى فَقُلْتُ حَطَّ عَنِّي خَمْسًا . قَالَ إِنَّ أُمَّتَكَ لاَ يُطِيقُونَ ذَلِكَ فَارْجِعْ إِلَى رَبِّكَ فَاسْأَلْهُ التَّخْفِيفَ . - قَالَ - فَلَمْ أَزَلْ أَرْجِعُ بَيْنَ رَبِّي تَبَارَكَ وَتَعَالَى وَبَيْنَ مُوسَى - عَلَيْهِ السَّلاَمُ - حَتَّى قَالَ يَا مُحَمَّدُ إِنَّهُنَّ خَمْسُ صَلَوَاتٍ كُلَّ يَوْمٍ وَلَيْلَةٍ لِكُلِّ صَلاَةٍ عَشْرٌ فَذَلِكَ خَمْسُونَ صَلاَةً
“এরপর আল্লাহ তাআলা আমার উপর যে ওহী করার তা ওহী করলেন। আমার উপর দিনরাত মোট পঞ্চাশ ওয়াক্ত সালাত ফরজ করলেন, এরপর আমি মুসা আ.-এর কাছে ফিরে আসলাম। তিনি আমাকে বললেন, আপনার প্রতিপালক আপনার উপর কি ফরজ করেছেন। আমি বললাম, পঞ্চাশ ওয়াক্ত সালাত। তিনি বললেন, আপনার প্রতিপালকের নিকট ফিরে যান এবং একে আরো সহজ করার আবেদন করুন। কেননা আপনার উম্মত এ নির্দেশ পালনে সক্ষম হবে না। আমি বনী ইসরাঈলকে পরীক্ষা করেছি এবং তাদের বিষয়ে আমি অভিজ্ঞতা লাভ করেছি।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তখন আমি আবার প্রতিপালকের কাছে ফিরে গেলাম এবং বললাম—হে আমার রব্ব, আমার উম্মতের জন্য এ হুকুম সহজ করে দিন। পাঁচ ওয়াক্ত কমিয়ে দেয়া হলো। তারপর মুসা আ.-এর নিকট ফিরে এসে বললাম, আমার থেকে পাঁচ ওয়াক্ত কমানো হয়েছে। তিনি বললেন, আপনার উম্মত এও পারবে না। আপনি ফিরে যান এবং আরো সহজ করার আবেদন করুন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এভাবে আমি একবার মুসা আ. ও একবার আল্লাহর মাঝে আসা-যাওয়া করতে থাকলাম। শেষে আল্লাহ তাআলা বললেন—হে মুহাম্মাদ, যাও; দিন ও রাতে পাঁচ ওয়াক্ত সালাত নির্ধারণ করা হলো। প্রতি ওয়াক্ত সালাতে দশ ওয়াক্ত সালাতের সমান সাওয়াব রয়েছে। এভাবে (পাঁচ ওয়াক্ত হলো) পঞ্চাশ ওয়াক্ত সালাতের সমান।” —(সহিহ মুসলিম, হাদিস নং : ১৬২)
এজন্য হযরত উবাদাহ্ ইবনুস সামিত রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন—
خَمْسُ صَلَوَاتٍ افْتَرَضَهُنَّ اللَّهُ تَعَالَى
“পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ, যা আল্লাহ তাআলা (বান্দার জন্য) ফরয করেছেন।” —(সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নং : ৪২৫)
হাদিস শরীফ থেকে আমরা সুস্পষ্টভাবে জানতে পারলাম—রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উম্মতকে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায়ের কথা বলেছেন। অথচ ফকির লালন লা'নাতুল্লাহি আলাইহি দাবি করেছে—“মোর্শেদের হুকুম মানো, দায়েমী নামাজ জানো, রসুলে যে ফরমান লালন তাই রচে” এটি কি নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নামে সুস্পষ্ট মিথ্যাচার নয়?
মন্তব্য (...)
এ সম্পর্কিত আরও প্রবন্ধ
ইলমে দীন ও আধুনিক শিক্ষার সমন্বয় ভাবনা
[প্রদত্ত বয়ান থেকে সংগৃহীত] আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন,اليوم أكملت لكم دينكم وأتممت عليكم نعم...
ঈমানের মেহনত : পরিচয় ও পদ্ধতি
[প্রদত্ত বয়ান থেকে সংগৃহীত] হামদ ও সালাতের পর.. মুহতারাম হাযেরীন! আল্লাহ তা'আলা বান্দাদের জন্য চারট...
তাহাফফুযে খতমে নবুওত ও কাদিয়ানী সম্প্রদায়
الحمد لله نحمده ونستعينه ونستغفره ونؤمن به ونتوكل عليه،ونعوذ بالله من شرور أنفسنا ومن سيئات أعمالنا،...
মুসলমানদের অধঃপতনের মূল কারণ
...
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন