প্রবন্ধ
বাউল ধর্মে পুনর্জন্মবাদ! আধ্যাত্মবাদ, সুফিবাদ বা বিশুদ্ধিমার্গ! বাউল মতবাদ। পর্ব—২৫-২৬
১০ জানুয়ারী, ২০২৬
১৮৬৫
০
বাউল ধর্মে পুনর্জন্মবাদ!
এ সম্পর্কে আলোচনার আগে আমাদের জানতে হবে—মানুষ মৃত্যুবরণ করার পর প্রথমে ‘আলমে বরযখ’—অর্থাৎ কবরের জগতে অবস্থান করে। এরপর কবরের জগতেই তাকে পুনরায় জীবিত করা হবে। সেখানে সওয়াল-জওয়াব অনুষ্ঠিত হবে এবং শাস্তি বা শান্তির ফায়সালা নির্ধারিত হবে। অতঃপর তাকে হাশরের ময়দানে উপস্থিত করা হবে। সেখানেই হবে হিসাব-নিকাশ; তারপর তার আমল অনুযায়ী সে জান্নাত অথবা জাহান্নামে প্রবেশ করবে। এটিই ইসলামের মৌলিক আকিদা ও কনসেপ্ট। কিন্তু মানুষ মৃত্যুর পর পুনরায় এই পৃথিবীতেই জন্মগ্রহণ করবে—এমন বিশ্বাস নাস্তিক বুদ্ধদেবের আবিষ্কৃত পুনর্জন্মবাদ বলে পরিচিত। এটি কোনো মুসলমানের আকিদা হতে পারে না। কেননা, আল্লাহ তাআলা বলেন—
حَتَّىٰ إِذَا جَاءَ أَحَدَهُمُ الْمَوْتُ قَالَ رَبِّ ارْجِعُونِ لَعَلِّي أَعْمَلُ صَالِحًا فِيمَا تَرَكْتُ ۚ كَلَّا ۚ إِنَّهَا كَلِمَةٌ هُوَ قَائِلُهَا ۖ وَمِن وَرَائِهِم بَرْزَخٌ إِلَىٰ يَوْمِ يُبْعَثُونَ
“পরিশেষে যখন তাদের কারও মৃত্যু উপস্থিত হয়ে যায়, তখন সে বলে, “হে আমার প্রতিপালক, আমাকে ফিরে পাঠিয়ে দিন, যাতে আমি যে দুনিয়া ছেড়ে এসেছি সেখানে গিয়ে সৎকাজ করতে পারি।” কখনোই না। এটি কেবল একটি কথার কথা, যা সে মুখে উচ্চারণ করে মাত্র। তাদের সামনে রয়েছে ‘বরযখ’, যা পুনরুত্থানের দিন পর্যন্ত বিদ্যমান থাকবে।” —(সুরা মুমিনুন : ৯৯–১০০)
এই আয়াতে সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, জন্মান্তরবাদ, পুনর্জন্মবাদ বা রূপান্তরবাদ একটি কুফরী মতবাদ এবং কুরআনে কারীমের সুস্পষ্ট বিরোধীতা। কারণ, মানুষের মৃত্যুর পর তাকে আর দ্বিতীয়বার এই পৃথিবীতে প্রেরণ করা হবে না। অতএব, যারা এ ভ্রান্ত আক্বিদা পোষণ করে, তারা ইসলামের মৌলিক বিশ্বাস থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়ে। কারণ, এ বিশ্বাসের মাধ্যমে কিয়ামত, কবর, হাশর, পুলসিরাত, জান্নাত ও জাহান্নামের বাস্তবতাকে কার্যত অস্বীকার করা হয়। অথচ, ইসলামের দৃষ্টিতে কবরের আজাব সত্য, কিয়ামত সত্য, হাশরের ময়দান সত্য, হিসাব-নিকাশ সত্য এবং জান্নাত ও জাহান্নামও চিরসত্য।
বাউল ধর্মে আধ্যাত্মবাদ, সুফিবাদ বা বিশুদ্ধিমার্গ!
‘বিশুদ্ধিমার্গ’ বৌদ্ধ দর্শনমতে দুঃখাদি থেকে মুক্তিলাভের সাধনাপথ। ‘বিশুদ্ধিমার্গ’ শব্দের শাব্দিক অর্থ—বিশুদ্ধ পথ। বৌদ্ধ দর্শনের মূল বক্তব্য হলো: জগৎ অনিত্য, দুঃখময় ও অনাত্ম। সুতরাং অনিত্যকে অনিত্যরূপে, দুঃখকে দুঃখরূপে এবং অনাত্মকে অনাত্মরূপে দেখার যে প্রজ্ঞাদৃষ্টি, তাকেই বিশুদ্ধিমার্গ বলা হয়। বৌদ্ধ দর্শন অনুযায়ী, বিশুদ্ধিমার্গই সর্বদুঃখ থেকে মুক্তি পাওয়ার একমাত্র পথ। এ কারণেই এ পথকে বিমুক্তিমার্গ বা বিমুক্তিপথ নামেও আখ্যায়িত করা হয়েছে। পালি ভাষায় একে বলা হয়—‘বিমুক্তিমার্গ’।
বিশুদ্ধিমার্গের অনুশীলন বিভিন্ন মেয়াদের হয়ে থাকে; যেমন—এক সপ্তাহ, এক মাস, তিন মাস ইত্যাদি। বর্তমানে বাংলাদেশের বিভিন্ন বৌদ্ধ বিহারে এ সাধনার জন্য স্থায়ী অনুশীলন কেন্দ্রও গড়ে উঠেছে। চিত্তের মল পরিশোধনের মাধ্যমে বিমুক্তিমার্গ লাভের প্রত্যাশায় বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের বিভিন্ন বয়সের নারী-পুরুষ এসব কেন্দ্রে আয়োজিত ভাবনায় অংশগ্রহণ করে। [সুমন কান্তি বড়ুয়া]
তাছাড়া, বিশুদ্ধিমার্গ (Visuddhimagga) হলো থেরবাদ বৌদ্ধধর্মের একটি গুরুত্বপূর্ণ পালি গ্রন্থ। ‘বিশুদ্ধিমার্গ’ শব্দের অর্থ—‘বিশুদ্ধির পথ’ বা ‘সম্পূর্ণ শুদ্ধির পথ’। গ্রন্থটি পঞ্চম শতাব্দীতে বুদ্ধঘোষ কর্তৃক রচিত। এটি ত্রিপিটকের শিক্ষা ও ধ্যানপদ্ধতির একটি বিস্তারিত ও সুসংবদ্ধ সারসংক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত। দুঃখ থেকে মুক্তিলাভের লক্ষ্যে এই গ্রন্থে তিনটি মৌলিক ভিত্তির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে—শীল (নৈতিকতা), সমাধি (চিত্তের একাগ্রতা) এবং প্রজ্ঞা (জ্ঞান)। এই তিনের সমন্বয়ের মাধ্যমেই সম্পূর্ণ শুদ্ধি ও মুক্তির পথ নির্দেশ করা হয়েছে। (সংগৃহীত)
বৌদ্ধ :
‘বুদ্ধদেব’ মূলত বস্তুবাদী চেতনায় বিশ্বাসী একজন নাস্তিক ছিলো। সে স্রষ্টায় বিশ্বাসী ছিলো না; তদুপরি আখেরাতেও তার কোনো বিশ্বাস ছিলো না। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী মানুষ প্রকৃত অর্থে মৃত্যুবরণ করে না; বরং পুনরায় জন্মগ্রহণ করে। তার বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করতে গেলে আলোচনা দীর্ঘ হয়ে যাবে। সংক্ষেপে এক কথায় বলা যায়—বুদ্ধদেব আদ্যন্ত নাস্তিক ছিলো। তার এই চেতনার উপরই যে ধর্মীয় দর্শন গড়ে উঠেছে, সেটিই ‘বৌদ্ধ ধর্ম’। এই প্রেক্ষাপটেই সৌদি আরবের সর্বোচ্চ ফতওয়া বোর্ড ‘আল-লাজনাতুত দায়েমা লিল বুহুসিল ইলমিয়্যাহ ওয়াল ইফতা’-এর এক ফতওয়ায় বলা হয়েছে—
بوذا ليس نبيا، بل كان كافرا فيلسوفا يتنسك على غير دين سماوي
“বুদ্ধ কোনো নবী নন; বরং তিনি একজন কাফির ও দার্শনিক ছিলেন। তিনি কোনো আসমানী ধর্মের অনুসরণ না করে ভিন্ন পদ্ধতিতে সাধনা করতেন।” —(ফতওয়া লাজনাতিদ দায়েমা লিল বুহুসিল ইসলামিয়া, খ. ২৬, পৃ. ৪৫; ফতওয়া নং : ২১০০৪)
সুতরাং নাস্তিক্যবাদী বৌদ্ধ চেতনা যাদের ধর্মের মৌলিক চেতনার অংশ ও মূলভিত্তি, সেই বাউলদের মুসলিম মনে করার কোনো সুযোগ নেই।
মন্তব্য (...)
এ সম্পর্কিত আরও প্রবন্ধ
ইলমে দীন ও আধুনিক শিক্ষার সমন্বয় ভাবনা
[প্রদত্ত বয়ান থেকে সংগৃহীত] আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন,اليوم أكملت لكم دينكم وأتممت عليكم نعم...
তাহাফফুযে খতমে নবুওত ও কাদিয়ানী সম্প্রদায়
...
মুসলমানদের অধঃপতনের মূল কারণ
...
ইয়াহুদী-খ্রিস্টানদের বহুমুখী ষড়যন্ত্র মুসলিম উম্মাহর করণীয়
কুরআন-হাদীসে ইয়াহুদী-খ্রিস্টানের পরিচয় ইয়াহুদী জাতি পৃথিবীর প্রাচীনতম জাতি। আল্লাহ তা'আলা হযরত নূহ আ...
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন