বাউল ধর্মের মূলে নাস্তিক্যবাদের মানবধর্ম চর্চা! বাউল মতবাদ। পর্ব—৪৭
বাউল ধর্মের মূলে নাস্তিক্যবাদের মানবধর্ম চর্চা! বাউল মতবাদ। পর্ব—৪৭
আমরা সাধারণত মনে করি নাস্তিকদের কোনো ধর্ম নেই। কিন্তু এ ধারণা সঠিক নয়—নাস্তিকরা মূলত মানববাদী, মানবধর্মের অনুসারী। তাদের মূল থিম হলো ‘মানবতা’। মানবতার আড়ালেই তাদের মূল মিশন ‘নাস্তিকতা’। আশ্চর্যের বিষয় হলো—সুফিবাদের নামে এই বাউলরা বাস্তবে নাস্তিকতারই চর্চা করে থাকে। দেখুন, ফকির লালন মানবধর্মের পক্ষ নিয়ে লিখেছে—
সব লোকে কয় লালন কী জাত সংসারে,
লালন বলে জেতের কী রূপ দেখলাম না এ নজরে।
কেউ মালা কেউ তসবি গলায় তাইতে কী জাত ভিন্ন বলায়,
যাওয়া কিংবা আসার বেলায় জেতের চিহ্ন কার রয় রে।
যদি সুন্নত দিলে হয় মুসলমান নারীলোকের কী হয় বিধান,
বামন চিনি পৈতা প্রমাণ বামনি চিনি কিসে রে।
জগৎ বেড়ে জেতের কথা লোকে গৌরব করে যথাতথা,
লালন সে জেতের ফাতা ডুবায়েছে (বিকায়েছে) সাধ বাজারে। —(বাউলসাধনা, পৃ. ৩১)
প্রকৃতপক্ষে লালন ছিলেন মানবধর্মের মানুষ। লালনের দর্শনই ছিলো মানব মুক্তির দর্শন। অর্থাৎ তিনি একজন নিরেট মানবতাবাদী ও সকল সামাজিক ধর্ম-বর্ণ-প্রথা-গোত্র-জাত-কুল, উঁচু-নিচু-ছোটো-বড় ইত্যাদি মানুষে মানুষে কোনো ভেদাভেদে বিশ্বাস করতেন না। —(মহাত্মা লালন, পৃ. ২৬)
আমরা অখণ্ডভাবে শাঁইজীর সত্যধর্ম তথা মানবধর্মমূলক সঙ্গীতচর্চাকে বিকশিত করার প্রয়াসে আপসহীন। ফকির লালন শাঁই মুক্তছন্দ মহাসমুদ্রের মতো চিরপ্রবাহমান সত্য যা অখণ্ড এবং সর্বব্যাপ্ত কোরান। —(অখণ্ড লালনসঙ্গীত, পৃ. ৮১)
সাঁইজি (জনৈক্য সাধু) আপনার কাছে একটি বিষয় জানতে চাই যে, কেউ বলে ফকির লালন শাহ মুসলমান ছিলেন আবার কেউ বলে তিনি হিন্দু ছিলেন। আসলে তিনি কোন ধর্মের মানুষ ছিলেন? যদি একটু বলেন
জনৈক্য সাধু : (একটু হেসে বললেন) ওরে বাবারে, মূলত সাঁইজি ছিলেন গুরুবাদী মানব-দর্শনের মানুষ। আর এটাই সত্যি। —(মহাত্মা লালন, পৃ. ৪৭)
ফকির লালনের মত পথ ও পদ এমনই এক মানবিক দার্শনিক ও আধ্যাত্মিক গুরুবাদী মত পথ যেখানে হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, জাত-পাত-গোত্র ও বর্ণের সামান্যতম ভেদাভেদ নেই। এই মতে শুধু প্রেম ভালোবাসা এবং গুরু ভজনাই মূল সাধনা। —(মহাত্মা লালন, পৃ. ৩৩)
সমগ্র মানবজাতি একজাতি। সবার একধর্ম দ্বীনে ইসলাম তথা মানবধর্ম। কিন্তু দেশকালভাষার বিবর্তনে, ইন্দ্রিয়-রিপু তথা খণ্ড খণ্ড আমিত্বের স্থূল প্ররোচনায় মানুষে মানুষে ভেদাভেদের দেয়াল উঠেছে। বংশের নামে, গোত্রের দোহাই দিয়ে, জাতের বড়াই ফলাতে গিয়ে মানববিশ্বকে বিভক্ত ও বিপন্ন করে ফেলা হয়েছে। —(অখণ্ড লালনসঙ্গীত, পৃ. ৫৯)
ফকির লালন সাঁই মনে-প্রাণে বিশ্বাস করতেন যে, এই কথিত সমাজে বিদ্যমান যে ভেদাভেদ জাত-পাত-শ্রেণি-বৈষম্য-ধর্ম তা মানুষে মানুষে সম্পর্ক গড়তে বড় বাধা স্বরূপ। এবং ইহা সকল মানুষের মিলনে বাধার পাচিল হয়ে দাঁড়াচ্ছে। ফলে লালন সাঁই এসব তেমন একটা মানতেন না। ফকির লালনের কাছে প্রেম-ভালোবাসা-মানবতাই ছিলো মুখ্য। আমরাতো এই সমাজই চাই। লালন এই মানবিক সমাজেরই স্বপ্ন দেখতেন। আমরা তাই দ্বিধাহীনভাবে বলতে পারি যে, লালনের দর্শন শুধু গুরুবাদী দর্শনই না, ইহা মানবধর্মের দর্শনও বটে। মানুষ জীবন সমাজ নিয়ে লালনের মাঙ্গলিকভাবনা, মহৎচিন্তা, প্রেমময় কামনা এসবই মানবধর্মেরই জয়গান। —(মহাত্মা লালন, পৃ. ১১৪)
সুতরাং এটা প্রতিয়মান হলো—বাউলরা মূলত নাস্তিকদের মানবধর্মের অনুসারী।
ইসলাম কী বলে?
‘মানবধর্ম’ নামক এই ধারণার চর্চা মূলত নাস্তিকদের মধ্যেই পরিলক্ষিত হয়। মানবতার আড়ালে তাদের প্রকৃত মিশন হলো—ইসলামকে পৃথিবী থেকে উৎখাত করা। মিষ্টি ও আকর্ষণীয় কথার মোড়কে বিষ ছড়িয়ে দেওয়াই ইসলামবিদ্বেষী নাস্তিকদের প্রধান কৌশল। আর এই লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য বিভিন্ন মহল সক্রিয়ভাবে কাজ করে যাচ্ছে। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—‘আহলে কুরআন’, ‘হেযবুত তওহীদ’ এবং ‘বাউল’ সম্প্রদায়।
মনে রাখতে হবে—বর্তমানে ইসলাম ধর্ম ছাড়া অন্য কোনো ধর্ম পালন করা জায়েয নয়। তা ইহুদি-খ্রিস্টান ধর্মই হোক কিংবা ইসলামবিদ্বেষীদের রচিত তথাকথিত ‘মানবধর্ম’। কারণ, মহান রব্ব সুস্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন—
أَفَغَيْرَ دِينِ اللّهِ يَبْغُونَ وَلَهُ أَسْلَمَ مَن فِي السَّمَاوَاتِ وَالأَرْضِ طَوْعًا وَكَرْهًا وَإِلَيْهِ يُرْجَعُونَ
“তারা কি আল্লাহর দ্বীনের পরিবর্তে অন্য দ্বীন তালাশ করছে? আসমান ও যমীনে যা কিছু রয়েছে স্বেচ্ছায় হোক বা অনিচ্ছায় হোক, তাঁরই অনুগত হবে এবং তাঁর দিকেই ফিরে যাবে।” —(সুরা আলে ইমরান : ৮৩)
وَمَن يُشَاقِقِ الرَّسُولَ مِن بَعْدِ مَا تَبَيَّنَ لَهُ الْهُدَى وَيَتَّبِعْ غَيْرَ سَبِيلِ الْمُؤْمِنِينَ نُوَلِّهِ مَا تَوَلَّى وَنُصْلِهِ جَهَنَّمَ وَسَاءتْ مَصِيرًا
“যে কেউ রাসুলের বিরুদ্ধাচারণ করে, তার কাছে সরল পথ প্রকাশিত হওয়ার পর এবং সব মুসলমানের অনুসৃত পথের বিরুদ্ধে চলে, আমি তাকে ঐ দিকেই ফেরাব যে দিক সে অবলম্বন করেছে এবং তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবো। আর তা নিকৃষ্টতর গন্তব্যস্থান।” —(সুরা নিসা : ১১৫)
ইমাম ইবনুল কায়্যিম রহি. বলেন,
وقد جاء القرآن، وصحّ الإجماع بأن دين الإسلام نسخ كل دين كان قبله، وأن من التزم ما جاءت به التوراة والإنجيل، ولم يتبع القرآن، فإنه كافر، وقد أبطل الله كل شريعة كانت في التوراة والإنجيل وسائر الملل، وافترض على الجن والإنس شرائع الإسلام، فلاحرام إلا ما حرمه الإسلام، ولا فرض إلا ما أوجبه الإسلام
“কুরআনে বর্ণিত এবং উম্মাহর ইজমায় প্রতিষ্ঠিত, ‘দ্বীনে ইসলাম পূর্ববর্তী সকল দ্বীনকে রহিত করে দিয়েছে এবং যে ব্যক্তি তাওরাত ও ইনজিলের বিধি-বিধানকে জীবনবিধান বানিয়ে নেবে আর কুরআনের অনুসরণ ছেড়ে দেবে, সে কাফের।’ তাওরাত, ইনজিল ও অন্য সকল ধর্মের প্রতিটি বিধান আল্লাহ তাআলা বাতিল করে দিয়েছেন এবং মানুষ ও জ্বিন জাতির উপর ইসলামী শরীয়তের বিধি-বিধান ফরজ করেছেন। সুতরাং হারাম শুধু তা-ই, যা ইসলাম হারাম করেছে। ফরজ শুধু তা-ই, যা ইসলাম ফরজ করেছে।” –(আহকামু আহলিয যিম্মাহ, খ. ১ পৃ. ১৯৮)
বি. দ্র. এ বিষয়ে দুটি বিশেষ কথা জানা জরুরি—
এক. মানবতার কাজ করা ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ ও মর্যাদাপূর্ণ আমল। তবে মানবসেবা করাই পুরো ইসলাম নয়। ইসলামে রয়েছে বহু বিধান, আকিদা ও ইবাদত। অতএব ‘মানবতার কাজই একমাত্র ধর্ম’—এমন আবিষ্কার কোনোভাবেই সহিহ বা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
মন্তব্য (...)
এ সম্পর্কিত আরও প্রবন্ধ
কুরআনের চেয়ে মুমিন দামী! হেযবুত তওহীদ। পর্ব–১৬
পবিত্র কুরআন সরাসরি আল্লাহপাকের কালাম। পৃথিবীর সব কিছু মাখলুক হলেও আল্লাহ-র কালাম মাখলুক নয়। সুতরাং ...
মুফতী রিজওয়ান রফিকী
৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৫
৪০৩৩
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন