সহশিক্ষা বর্জনের মানত পূরণের শরয়ী বিধান ও করণীয়
প্রশ্নঃ ১৭০৯১৭. আসসালামুআলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ, অসুস্থ হলে মানত করেছিলাম যে সহশিক্ষায় থাকবোনা।একটু সুস্থ হলে আবার পড়াতে পাঠাতে চাচ্ছে বাসা থেকে।কিন্তু এখন প্রাইভেট এ দিলে সেখানেও সহশিক্ষা।তাই আমার করনীয় কী?
উত্তর
و علَيْــــــــــــــــــــكُم السلام ورحمة الله وبركاته
بسم الله الرحمن الرحيم
সহশিক্ষা থেকে বেঁচে থাকা আবশ্যক। যেখানে নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশার সুযোগ তৈরি হয়, এমন পরিবেশে পড়াশোনা, চাকরি বা কাজকর্ম করা জায়েয নয়। মানত না করলেও পর্দা রক্ষা ও ফিতনা থেকে বেঁচে থাকার স্বার্থে সহশিক্ষা পরিহার করা আবশ্যক।
পর্দা ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ ফরজ বিধান। তাই এ বিষয়ে মানত করা হোক বা না হোক, সর্বাবস্থায় দৃষ্টির হেফাজত করা, নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা পরিহার করা এবং শরিয়তের গুরুত্বপূর্ণ এই পর্দার বিধান মেনে চলা আবশ্যক।
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন,
قُلۡ لِّلۡمُؤۡمِنِیۡنَ یَغُضُّوۡا مِنۡ اَبۡصَارِہِمۡ وَیَحۡفَظُوۡا فُرُوۡجَہُمۡ ؕ ذٰلِکَ اَزۡکٰی لَہُمۡ ؕ اِنَّ اللّٰہَ خَبِیۡرٌۢ بِمَا یَصۡنَعُوۡنَ
وَقُلۡ لِّلۡمُؤۡمِنٰتِ یَغۡضُضۡنَ مِنۡ اَبۡصَارِہِنَّ وَیَحۡفَظۡنَ فُرُوۡجَہُنَّ وَلَا یُبۡدِیۡنَ زِیۡنَتَہُنَّ اِلَّا مَا ظَہَرَ مِنۡہَا وَلۡیَضۡرِبۡنَ بِخُمُرِہِنَّ عَلٰی جُیُوۡبِہِنَّ
অর্থ: মুমিন পুরুষদের বল, তারা যেন তাদের দৃষ্টি অবনত রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হেফাজত করে। এটাই তাদের জন্য শুদ্ধতর। তারা যা-কিছু করে আল্লাহ সে সম্পর্কে পরিপূর্ণ অবগত।
এবং মুমিন নারীদের বল, তারা যেন তাদের দৃষ্টি অবনত রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হেফাজত করে এবং নিজেদের ভূষণ অন্যদের কাছে প্রকাশ না করে, যা আপনিই প্রকাশ পায় তা ছাড়া এবং তারা যেন তাদের ওড়নার আঁচল নিজ বক্ষদেশে নামিয়ে দেয়।”
সূরা আন-নূর, আয়াত নং : ৩০–৩১
একান্ত কোনো প্রয়োজন হলে পর্দার আড়াল থেকেই কথা বলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَإِذَا سَأَلْتُمُوهُنَّ مَتَاعًا فَاسْأَلُوهُنَّ مِنْ وَرَاءِ حِجَابٍ ذَٰلِكُمْ أَطْهَرُ لِقُلُوبِكُمْ وَقُلُوبِهِنَّ
অর্থ: তোমরা যখন তাঁদের কাছে কোনো কিছু চাইবে, তখন পর্দার আড়াল থেকে চাইবে। এটাই তোমাদের ও তাঁদের অন্তরের জন্য অধিক পবিত্র।
সূরা আল-আহযাব, আয়াত নং ৫৩
অপর আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন,
فَلَا تَخْضَعْنَ بِالْقَوْلِ فَيَطْمَعَ الَّذِي فِي قَلْبِهِ مَرَضٌ
অর্থ: তোমরা কথাবার্তায় এমন কোমলতা অবলম্বন করো না, যাতে অন্তরে ব্যাধি রয়েছে এমন ব্যক্তি প্রলুব্ধ হয়।
সূরা আল-আহযাব, আয়াত নং ৩২
হাদিসে রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন
لاَ يَخْلُوَنَّ رَجُلٌ بِامْرَأَةٍ، وَلاَ تُسَافِرَنَّ امْرَأَةٌ إِلَّا وَمَعَهَا مَحْرَمٌ
অর্থ: কোনো পুরুষ যেন অপর কোনো মহিলার সঙ্গে নির্জনে অবস্থান না করে এবং কোনো নারী যেন কোনো মাহরাম সঙ্গী ছাড়া সফর না করে।
সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩০০৬; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৩৪১
অপর হাদিসে রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,
مَا تَرَكْتُ بَعْدِي فِتْنَةً أَضَرَّ عَلَى الرِّجَالِ مِنَ النِّسَاءِ
অর্থ: আমার পরে পুরুষদের জন্য নারীদের চেয়ে অধিক ক্ষতিকর ফিতনা আমি রেখে যাইনি।
সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৫০৯৬
এ জাতীয় অনেক আয়াত ও হাদিসে পর্দার গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। সুতরাং মানত করা হোক বা না হোক, সর্বাবস্থায় পর্দার এই গুরুত্বপূর্ণ বিধান মেনে চলা আবশ্যক। এবং সহশিক্ষাসহ নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশার সুযোগ তৈরি হয় এমন পরিবেশ পরিহার করা আবশ্যক।
পিতা-মাতা এমন পরিবেশে যেতে বললেও এক্ষেত্রে তাদের কথা মান্য করা যাবে না। হাদিসে রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,
لاَ طَاعَةَ فِي مَعْصِيَةٍ، إِنَّمَا الطَّاعَةُ فِي المَعْرُوفِ
অর্থ: আল্লাহর নাফরমানির কাজে কোনো আনুগত্য নেই। আনুগত্য করতে হবে কেবল বৈধ কাজে।
সহীহ বুখারী, হাদিস নং ৭২৫৭
তবে তাদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার বা রাগারাগি করা যাবে না। বরং তাদেরকে বুঝানোর চেষ্টা করা উচিত। সহশিক্ষা নেই, এমন প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনার ব্যবস্থা করার চেষ্টা করা উচিত।
আল্লাহ তাআলার কাছে বেশি বেশি দুআ করতে থাকা উচিত, যাতে আল্লাহ তাআলা গুনাহমুক্ত জীবনযাপন করার তাওফিক দান করেন।
উল্লেখ্য, মানত সহিহ হওয়ার জন্য একটি শর্ত হলো, যে কাজের মানত করা হয়েছে সেটি আগে থেকেই তার উপর আবশ্যক না হওয়া। আরেক শর্ত হলো, সেটি ইবাদতে মাকসুদা হওয়া। আর সহশিক্ষা পরিহার করা যদিও সওয়াবের কাজ, কিন্তু তার মধ্যে মানত সহীহ হওয়ার এ শর্ত না পাওয়া যাওয়ার কারণে আপনার মানতটি সহিহ হয়নি। সুতরাং সহশিক্ষা জায়েয না হওয়া সত্ত্বেও যদি আপনি সহশিক্ষায় অংশগ্রহণ করেন, এ কারণে আপনার মানত ভঙ্গের কাফফারা দেওয়া লাগবে না।
তথ্যসূত্র :
والمنذور يلزمه "إذا اجتمع فيه" أي المنذور "ثلاثة شروط" أحدها "أن من جنس واجب" بأصله وإن حرم ارتكابه لوصفه كصوم يوم النحر "و" الثاني "أن يكون مقصودا" لذاته لا لغيره كالوضوء "و" الثالث أن يكون "ليس واجبا" قبل نذره بإيجاب الله تعالى كالصلوات الخمس والوتر.
حاشية الطحطاوي على مراقي الفلاح، ٦٩٢
وَاعْلَمْ بِأَنَّهُمْ صَرَّحُوا بِأَنَّ شَرْطَ لُزُومِ النَّذْرِ ثَلَاثَةٌ كَوْنُ الْمَنْذُورِ لَيْسَ بِمَعْصِيَةٍ وَكَوْنُهُ مِنْ جِنْسِهِ وَاجِبٌ وَكَوْنُ الْوَاجِبِ مَقْصُودًا لِنَفْسِهِ قَالُوا فَخَرَجَ بِالْأَوَّلِ النَّذْرُ بِالْمَعْصِيَةِ وَالثَّانِي نَحْوُ عِيَادَةِ الْمَرِيضِ وَالثَّالِثِ مَا كَانَ مَقْصُودًا لِغَيْرِهِ حَتَّى لَوْ نَذَرَ الْوُضُوءَ لِكُلِّ صَلَاةٍ لَمْ يَلْزَمْ وَكَذَا لَوْ نَذَرَ سَجْدَةَ التِّلَاوَةِ
البحر الرائق شرح كنز الدقائق ٢/٣١٦
(ومنها) أن يكون قربة مقصودة، فلا يصح النذر بعيادة المرضى وتشييع الجنائز والوضوء والاغتسال ودخول المسجد ومس المصحف والأذان وبناء الرباطات والمساجد وغير ذلك وإن كانت قربا؛ لأنها ليست بقرب مقصودة ويصح النذر بالصلاة والصوم والحج والعمرة والإحرام بهما والعتق والبدنة والهدي والاعتكاف ونحو ذلك؛ لأنها قرب مقصودة
بدائع الصنائع في ترتيب الشرائع ٥/٨٢
والله اعلم بالصواب
উত্তর দাতা:
উস্তাজ, ইদারাতুত্ তাখাসসুস ফিল উলূমিল ইসলামিয়া, আজিমপুর
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন