মিথ্য তথ্য দিয়ে নাগরিকত্ব গ্রহন প্রসঙ্গ
প্রশ্নঃ ১৫৬৭৫৩. আসসালামুআলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ, কন্ট্রাক মেরেজ করে সিটিজেন নিলে ওটাতো হারাম কাজ জানি তবে তওবা করলে ওই সিটিজেন রাখা যাবে?
৯ জুন, ২০২৬
ফেনী
উত্তর
و علَيْــــــــــــــــــــكُم السلام ورحمة الله وبركاته
بسم الله الرحمن الرحيم
সম্মানিত প্রশ্নকারী!
আগে হাদিসটি শুনুন।
হযরত আব্দুল্লাহ (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেনঃ
" إِيَّاكُمْ وَالْكَذِبَ فَإِنَّ الْكَذِبَ يَهْدِي إِلَى الْفُجُورِ وَإِنَّ الْفُجُورَ يَهْدِي إِلَى النَّارِ وَإِنَّ الرَّجُلَ لَيَكْذِبُ وَيَتَحَرَّى الْكَذِبَ حَتَّى يُكْتَبَ عِنْدَ اللَّهِ كَذَّابًا وَعَلَيْكُمْ بِالصِّدْقِ فَإِنَّ الصِّدْقَ يَهْدِي إِلَى الْبِرِّ وَإِنَّ الْبِرَّ يَهْدِي إِلَى الْجَنَّةِ وَإِنَّ الرَّجُلَ لَيَصْدُقُ وَيَتَحَرَّى الصِّدْقَ حَتَّى يُكْتَبَ عِنْدَ اللَّهِ صِدِّيقًا " .
তোমরা মিথ্যা পরিহার করবে। কেননা, মিথ্যা মানুষকে খারাপ কাজে লিপ্ত করে, আর অপকর্ম মানুষকে জাহান্নামে নিয়ে যাবে। যখন কোন ব্যক্তি মিথ্যা বলা শুরু করে, তখন বার-বার মিথ্যা বলার কারণে, আল্লাহর নিকটে তার নামটি ’মিথ্যাবাদী’ হিসাবে লিখিত হয়। এরপর তিনি বলেনঃ তোমরা সত্য কথা বলবে। কেননা, সত্য মানুষকে কল্যাণের দিকে নিয়ে যায় এবং কল্যাণ তাকে জান্নাতে প্রবেশ করায়। আর যখন কোন ব্যক্তি সত্য কথা বলতে থাকে, তখন সব সময় সত্য কথা বলার কারণে, আল্লাহর নিকটে তার নামটি ’সত্যবাদী’ হিসাবে লিখিত হয়।
সহিহুল বুখারী: হাদিস নং: ৬০৯৪
https://muslimbangla.com/hadith/5664
সুনানে আবু দাউদ, হাদীস নং: ৪৯০৪
https://muslimbangla.com/hadith/19251
ওপরের হাদিসে মিথ্যার ভয়াবহতা সম্পর্কে আলোকপাত করা হয়েছে।
প্রতারণার মাধ্যমে নাগরিকত্ব গ্রহণ করা এবং তা বহাল রাখা ইসলামের দৃষ্টিতে সম্পূর্ণ নাজায়েজ ও হারাম। মিথ্যা বিবাহের তথ্য দেওয়াও হারাম। কাজেই মিথ্যা তথ্য, জাল কাগজপত্র বা ধোঁকাবাজির আশ্রয় নিয়ে অর্জিত নাগরিকত্ব প্রত্যাহার করা বা তা সংশোধন করা শরঈ ও আইনি উভয় দিক থেকেই বাধ্যতামূলক।
পৃথিবীর প্রায় সব দেশের আইনেই বলা আছে, যদি কেউ প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে নাগরিকত্ব পায়, তবে তা পরবর্তীতে প্রমাণিত হলে রাষ্ট্র তা বাতিল বা প্রত্যাহার (Revocation) করার অধিকার রাখে।
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ أَنَّ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «مَنْ غَشَّ فَلَيْسَ مِنِّي».
অর্থ: হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন: "যে ব্যক্তি প্রতারণা বা জালিয়াতি করবে, সে আমার দলভুক্ত নয়।"
নাগরিকত্ব গ্রহণের সময় রাষ্ট্রকে মিথ্যা তথ্য দেওয়া মূলত এক প্রকার 'খেয়ানত' এবং চুক্তিভঙ্গ, যা ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।
قَالَ اللَّهُ تَعَالَى: {وَأَوْفُوا بِالْعَهْدِ إِنَّ الْعَهْدَ كَانَ مَسْئُولًا}، وَعَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «آيَةُ الْمُنَافِقِ ثَلَاثٌ: إِذَا حَدَّثَ كَذَبَ، وَإِذَا وَعَدَ أَخْلَفَ، وَإِذَا اؤْتُمِنَ خَانَ».
অনুবাদ: আল্লাহ তাআলা বলেন, "তোমরা অঙ্গীকার পূর্ণ করো, নিশ্চয়ই অঙ্গীকার সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।" (সূরা বনী ইসরাইল: ৩৪)। এবং নবীজী (ﷺ) বলেছেন, "মুনাফিকের আলামত তিনটি: যখন কথা বলে মিথ্যা বলে, ওয়াদা করলে ভঙ্গ করে এবং আমানত রাখলে খেয়ানত করে।"
সহীহ বুখারী, হাদিস নং: ৩৩।
https://muslimbangla.com/hadith/33
সৌদি আরবের সর্বোচ্চ ফতোয়া বোর্ড 'আল-লাজনাহতুদ দায়িমাহ'কে প্রশ্ন করা হয়েছিল যে, কোনো অমুসলিম দেশে মিথ্যা বা জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে নাগরিকত্ব বা রাজনৈতিক আশ্রয় নেওয়া যাবে কি না?
উত্তরে তারা স্পষ্ট করে বলেন:
النص: "لا يجوز الكذب ولا التزوير في الحصول على الجنسية أو الإقامة في أي بلد؛ لأن الكذب والتزوير محرمان في الشريعة الإسلامية في كل حال، ولما يترتب على ذلك من المفاسد والوقوع تحت طائلة العقوبات القانونية."
অনুবাদ: "কোনো দেশের নাগরিকত্ব বা আবাসন (Residency) পাওয়ার জন্য মিথ্যা বলা বা জালিয়াতি করা জায়েজ নেই। কারণ ইসলামি শরিয়তে মিথ্যা ও জালিয়াতি সব অবস্থাতেই হারাম। তা ছাড়া এর ফলে অনেক বড় ক্ষতি বা ফিতনা তৈরি হয় এবং ব্যক্তি আইনি শাস্তির মুখোমুখি হয়।"
فتاوى اللجنة الدائمة للبحوث العلمية والإفتاء (السعودية), খণ্ড: ২৩, পৃষ্ঠা: ৪১০, ফতোয়া নং: ২১১৮৪।
ইসলামি ফিকহের একটি বিখ্যাত মূলনীতি (Maxims) রয়েছে, যা এই ধরনের জালিয়াতি দ্বারা অর্জিত অধিকারকে বাতিল ঘোষণা করে। ইমাম ইবনে নুজাইম (রহ.) এটি উল্লেখ করেছেন:
«مَنْ تَعَجَّلَ شَيْئًا قَبْلَ أَوَانِهِ عُوقِبَ بِحِرْمَانِهِ»، وَفِي مَعْنَاهُ: «مَا بُنِيَ عَلَى بَاطِلٍ فَهُوَ بَاطِلٌ».
অনুবাদ: ফিকহি মূলনীতি: "যে ব্যক্তি শরীয়তসম্মত উপায় ছাড়া (জালিয়াতির মাধ্যমে) অসময়ে কোনো কিছু দ্রুত পেতে চায়, শাস্তি স্বরূপ সে তা থেকে বঞ্চিত হয়।" এর সমার্থক আরেকটি নীতি হলো: "যা কিছু বাতিলের (মিথ্যা/জালিয়াতি) ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে, তা বাতিল বলেই গণ্য হয়।"
الأشباه والنظائر لابن نجيم الحنفي, পৃষ্ঠা: ১৫২ (খণ্ড: ১)।
উপরিউক্ত বর্ণনা এবং রেফারেন্সসমূহ থেকে এটা স্পষ্ট হয়ে যায় যে, প্রতারণা করে নাগরিকত্ব গ্রহন করা জায়েজ নাই। কেউ নিলে তা প্রত্যাহার করা ওয়াজিব।
কাজেই প্রশ্নোক্ত ক্ষেত্রে করণীয় হলো, যিনি মিথ্যা তথ্য দিয়ে নাগরিকত্ব গ্রহন করেছেন প্রথমত তিনি এহেন গুনাহের কাজের জন্য আল্লাহ তায়ালার কাছে ক্ষমা চাইবেন।
দ্বিতীয়ত: সংশ্লিষ্ট দেশের আইনি কর্তৃপক্ষের কাছে গিয়ে বিষয়টি স্বীকার করে তা সংশোধন বা প্রত্যাহারের ব্যবস্থা করবেন।
والله اعلم بالصواب
উত্তর দাতা:
সাইদুজ্জামান কাসেমি
মুফতী ও মুহাদ্দিস, জামিয়া ইমাম বুখারী, উত্তরা, ঢাকা।
মুফতী ও মুহাদ্দিস, জামিয়া ইমাম বুখারী, উত্তরা, ঢাকা।
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন
এ সম্পর্কিত আরও জিজ্ঞাসা/প্রশ্ন-উত্তর
মাসায়েল-এর বিষয়াদি
আল কুরআনুল কারীম
৪
হাদীস ও সুন্নাহ
৬
তাসাউফ-আত্মশুদ্ধি । ইসলাহী পরামর্শ
৩
শরীআত সম্পর্কিত
১৫
ফিতনাসমুহ; বিবরণ - করণীয়
২
আখিরাত - মৃত্যুর পরে
৩
ঈমান বিধ্বংসী কথা ও কাজ
৬
ফিরাকে বাতিলা - ভ্রান্ত দল ও মত
২
পবিত্রতা অর্জন
৮
নামাযের অধ্যায়
১৯
যাকাত - সদাকাহ
৫
রোযার অধ্যায়
৬
হজ্ব - ওমরাহ
২
কাফন দাফন - জানাযা
৫
কসম - মান্নত
১
কুরবানী - যবেহ - আকীকা
৪
বিবাহ শাদী
৮
মীরাছ-উত্তরাধিকার
২
লেনদেন - ব্যবসা - চাকুরী
৯
আধুনিক মাসায়েল
৬
দন্ড বিধি
২
দাওয়াত ও জিহাদ
৩
ইতিহাস ও ঐতিহ্য
৬
সীরাতুন নবী সাঃ । নবীজীর জীবনচরিত
৩
সাহাবা ও তাবেঈন
৩
ফাযায়েল ও মানাকেব
৩
কিতাব - পত্রিকা ও লেখক
৩
পরিবার - সামাজিকতা
৭
মহিলা অঙ্গন
২
আখলাক-চরিত্র
২
আদব- শিষ্টাচার
১২
রোগ-ব্যধি। চিকিৎসা
২
দোয়া - জিকির
২
নাম। শব্দ জ্ঞান
৩
নির্বাচিত
২
সাম্প্রতিক
১
বিবিধ মাসআলা
১