শুদ্ধতা বনাম দক্ষতা: অর্থপূর্ণ জীবনের পথ
শুদ্ধতা বনাম দক্ষতা: অর্থপূর্ণ জীবনের পথ
[ আল্লাহ মানুষকে প্ররিশ্রমের ময়দানে পাঠিয়েছেন এবং দুই ধরনের পথ রয়েছে—সিরাতুল মুস্তাকিম যা নিজেকে শুদ্ধ করে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের এবং গোমরাহির পথ যা মানুষের সন্তুষ্টি অর্জনের। শুদ্ধ জীবন আল্লাহকে সন্তুষ্ট করে এবং অর্থপূর্ণ, আর দক্ষতাভিত্তিক জীবন মানুষকে মুগ্ধ করে কিন্তু অর্থহীন। মানুষকে খুশি করার জন্য দক্ষতা প্রদর্শন সার্কাসের মতো—সাময়িক প্রশংসা পায় কিন্তু স্থায়ী মূল্য নেই। ফ্যাশন দ্রুত পরিবর্তিত হয় এবং আজকের জনপ্রিয় বিষয় আগামীকাল অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যায়। অতীতের সব সভ্যতা দক্ষতা নিয়ে গর্ব করেছে কিন্তু শুদ্ধতার অভাবে ধ্বংস হয়েছে। আল্লাহ শুদ্ধতার কদর করেন, দক্ষতার নয়—মুসা আলাইহিস সালাম তোতলা হলেও কালিমুল্লাহ উপাধি পেয়েছেন কারণ তাঁর কথা শুদ্ধ ছিল। নবীরা শুদ্ধ জীবনের দাওয়াত দিয়েছেন, দক্ষ জীবনের নয়। শিশুদের মক্তবের পরিবর্তে কেজিতে পাঠানো শুদ্ধতার বদলে দক্ষতাকে বেছে নেওয়া। মানুষের প্রশংসা বা তিরস্কারে প্রভাবিত হওয়া মানে সার্কাসের মঞ্চে থাকা, যেখান থেকে বের হওয়া জরুরি। রশিদ আহমদ গাঙ্গুহি রহঃ খেলাফত পেয়েছিলেন যখন মানুষের প্রশংসা ও তিরস্কার তাঁর কাছে সমান হয়ে গিয়েছিল। নামাজ, রোজা, তবলিগ—সবকিছু যদি মানুষের প্রশংসার জন্য হয় তবে তা সার্কাসে পরিণত হয়, আল্লাহর ইবাদত থাকে না। নবীরা কারো প্রশংসা বা তিরস্কারে প্রভাবিত হতেন না, তাই সহজে মাফ করতে পারতেন। জীবনকে শুদ্ধ করতে এবং মানুষের প্রশংসা-তিরস্কার থেকে মুক্ত হতে বারবার আল্লাহর পথে বের হতে হবে]
৫ অক্টোবর ২০০৭ (২২শে রমজান) শুক্রবার, আসর নামাজের পর মৌলভীবাজার মারকাজ মসজিদে স্যার কথাগুলো আলোচনা করেন।
أعُوْذُ بِاللهِ مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّجِيْمِ، بِسْمِ اللهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيْمِ،
إِيَّاكَ نَعْبُدُ وَإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ
اهْدِنَا الصِّرَاطَ الْمُسْتَقِيمَ
صِرَاطَ الَّذِينَ أَنْعَمْتَ عَلَيْهِمْ غَيْرِ الْمَغْضُوبِ عَلَيْهِمْ وَلَا الضَّالِّينَ
وَقَالَ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ : يَا أَيُّهَا النَّاسُ، قُوْلُوْا لَا إلهَ إِلاَّ اللهُ تفْلِحُوْنَ، أَوْ كَمَا قَالَ عَلَيْهِ الصَّلاَةُ وَالسَّلَامُ.
দুনিয়াতে আল্লাহ তায়ালা মানুষকে পরিশ্রমের ময়দানে পাঠিয়েছেন। আর দুনিয়ার সব মানুষ পরিশ্রম করে।
لَقَدْ خَلَقْنَا الْإِنْسَانَ فِيْ كَبَدٍ
তাকে সৃষ্টিই করা হয়েছে পরিশ্রমের মধ্যে। আর পরিশ্রম বিভিন্ন ধরনের, বিভিন্ন লক্ষ্য সামনে রেখে, বিভিন্ন ধরনের পরিশ্রম। এই পরিশ্রমগুলোর মধ্যে দুটো, দুই প্রধান ধরন: এক হচ্ছে আল্লাহ তায়ালা আম্বিয়া আলাইহিস সালামকে যেটা দিয়ে পাঠিয়েছেন, সব নবীদের একটা মেহনত একটা লাইন বলা যেতে পারে, যেটাকে সোজা পথ বলা হয়েছে, সিরাতুল মুস্তাকিম বলা হয়েছে।
যে পরিশ্রমের লক্ষ্য নিজেকে সাজানো বলা যেতে পারে, নিজেকে শুদ্ধ করা, নিজেকে সুন্দর বানানো। সুন্দর ওই অর্থে যে, যে সৌন্দর্য আল্লাহর কাছে পছন্দনীয়, আল্লাহর দৃষ্টিতে যেন সে সুন্দর হয়, ওইভাবে নিজেকে সাজানো, নিজের আচরণের মধ্যে শুদ্ধতা আনা। আল্লাহ তায়ালা শুদ্ধকেই পছন্দ করেন। তার কথা শুদ্ধ, তার কাজ শুদ্ধ, তার চিন্তা, তার মনের অনুভূতি শুদ্ধ। তো এই শুদ্ধতা অর্জনের জন্য একটা মেহনত, যেটা বলা যেতে পারে যে, নিজেকে মনেপ্রাণে অন্তরে নিজেকে সাজানো; যেন আল্লাহর কাছে সে পছন্দসই হয়ে যায়, গ্রহণযোগ্য হয়ে যায়, তো এটা একটা সোজা একটা মেহনত।
আর এই মেহনত যারা করে, নিজেকে যারা শুদ্ধ বানাতে পারে, আল্লাহ যাদেরকে পছন্দ করেন, আল্লাহর দৃষ্টিতে যারা সুন্দর হয়ে যায়, আল্লাহ যাদেরকে কবুল করে নেন, আল্লাহ তাদের উপর সন্তুষ্ট হয়ে যান, এটাই যাদেরকে আল্লাহ তায়ালা গ্রহণ করেন। 'সিরাতাল্লাযিনা আনআমতা আলাইহিম' যাদেরকে তুমি পুরস্কৃত করেছ, পুরস্কার দান করেছ, কারণ তারা তোমাকে সন্তুষ্ট করতে পেরেছে। পুরস্কার যে দেয় তাকে সন্তুষ্ট করতে হয়। পরীক্ষার খাতায় যে পরীক্ষা করছে, খাতা যে দেখছে তার সন্তুষ্টির উপর নম্বর পাওয়া নির্ভর করে; অন্য একজন সন্তুষ্ট হলো, তাতে কিছু হয় না।
তাদের উপর, আবার পরিষ্কার করে বলে দিয়েছেন: ওই পথে নয়, যে পথে যারা চলেছে তাদের উপর তুমি অসন্তুষ্ট হয়েছ—غَيْرِ الْمَغْضُوبِ عَلَيْهِمْ وَلَا الضَّالِّينَ; এরাই পথহারা। তো এই হলো প্রধান পথ, যে পথের পথিকরা আল্লাহকে সন্তুষ্ট করতে পেরেছে, আল্লাহ তাদেরকে পছন্দ করেছেন।
আর আরেকটা দুনিয়াতে বড় পরিচিত পথ গোমরাহির। গোমরাহির পথ তো দুনিয়াতে হাজারো ধরনের আছে—যেরকম সত্য কথা একটাই, মিথ্যা কথার কোনো সংখ্যা নেই, সব কথাই এর বাইরের। শুদ্ধ একটাই, ভুলের কোনো সংখ্যা নাই, একটা অঙ্ক দেওয়া হলো, তো শুদ্ধ উত্তর তো একটাই, ভুল উত্তর কতটা আছে, তার তো কোনো সীমাসংখ্যা নাই। তো এ ছাড়া বাইরের যত পথ আছে অসংখ্য, কিন্তু সেই অসংখ্য পথগুলোর মধ্যেও একটা বিশেষ প্রবাহ আছে, যেটাকে বড় পরিচিত হওয়ার কারণে নিজেদের মধ্যে পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও মোটামুটি তাদের মধ্যে সামঞ্জস্য আছে, যে পথ আল্লাহর সন্তুষ্টির দিকে নেয়নি, কিন্তু উপস্থিত মানুষের সন্তুষ্টি অর্জন করতে পেয়েছে। তৎকালীন বা তার পরবর্তীকালের মানুষ কোনো কারণে এটা বড় সুন্দর।
যদিও মানুষের বিচারবোধ স্থির নয়, বড় দ্রুত পরিবর্তন হয়। এরপরেও মোটামুটিভাবে মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পেরেছে সাময়িকভাবে হলেও, কারণ তার সাময়িক কিছু দক্ষতার কারণে। আর মানুষের দৃষ্টি যে আকর্ষণ করে, ওইটা তো উপস্থিত কোনো আচরণের কারণ; বড়দের দৃষ্টি আকর্ষণ করা ছোট বাচ্চাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করার মধ্যে নীতিগত খুব বড় পার্থক্য নয়।
ছোট বাচ্চারা তার সামনে কেউ সোজাভাবে হেঁটে গেল, তো নজরে পড়ে না; কিন্তু কেউ ডিগবাজি খেলো, তো বাচ্চারা বড় লক্ষ্য করে, ওই দিকে আকৃষ্ট হয়। অনেক সময় সন্তুষ্ট হয়, খুশি হয়, হাসে, আর বাচ্চাদেরকে হাসাবার জন্যে মা-বাপ যারা ভালোবাসে, মামা-চাচা ইত্যাদি নানান ধরনের উদ্ভট সব ডিগবাজি করে। বাচ্চারা খুব খুশি হয়। তো ওই নীতিতে বোঝা যাবে, বড়রা মোটামুটি ওই একই নীতিতে খুশ হয়, শুধু ডিগবাজির পার্থক্য একটু। ছোট বাচ্চারা খুব সহজ ধরনের ডিগবাজিতে খুশ হয়ে যায়, বড়দেরকে খুশ করতে হলে বড় উল্লেখযোগ্য ধরনের ডিগবাজির দরকার, যেগুলোকে সার্কাস বলা হয়। এ ছাড়া বলবে, এ তো আমরাই পারি, গুরুত্ব দেয় না। ছোটখাটো অঙ্ক সবাই পারে, বড় ধরনের অঙ্ক যদি করতে পারে, তবে তাকে গণিতশাস্ত্রবিদ, বৈজ্ঞানিক ইত্যাদি হিসেবে তাকে গ্রহণ করে। বড় ধরনের একটা সে একটা ডিগবাজি খেতে পেরেছে। সব ব্যাপারে কথাবার্তা ওইরকম, অল্পস্বল্প সাজিয়ে কথা বলা এটা তো সবাই পারে; কিন্তু যারা খুব সুন্দর করে কথা সাজাতে পারে, উপস্থিত শ্রোতারা মুগ্ধ হয়ে যায়, তো তারা সাহিত্যিক হয়, কবি হয়। কিন্তু এই কোনোটার পিছনেরই কোনো লক্ষ্য থাকে না। ছোট বাচ্চা আছে, তো বাচ্চাকে হাসাবার জন্য ওর বাপ উলটপালট অনেক কাজ করছে, কেউ যদি দেখে যেই উদ্ভট আচরণ তোমার কেন? তো সে বলে, আমিও বুঝতে পারছি এটা একটা অর্থহীন জিনিস, কিন্তু বাচ্চা হাসছে আর ওর হাসি দেখে আমার ভালো লাগে, ওকে খুশ করবার জন্য।
তো মানুষ অনেক কিছু করে মানুষকে খুশ করবার জন্য, কিন্তু যাদেরকে খুশ করবার জন্য করল, তাদের হাতে বেশি কিছু নেই, কিছুক্ষণ পরে চলে যায়। বাচ্চা যেরকম দুদিন পরে বড় হয়ে যায়, তো ডিগবাজি দিয়ে বাচ্চাকে একসময় খুশ করতে পেরেছে, ওই ডিগবাজি দিয়ে কিছুদিন পরে আর বাচ্চাকে খুশ করা যায় না। কারণ ওর রুচির পরিবর্তন হয়ে গেছে। এই জন্য দুনিয়ার যত মেহনতগুলো আছে, বারবার এদের মধ্যে পরিবর্তনের প্রয়োজন হয়; কখনো বড় দ্রুত, কখনো ধীরে ধীরে। বর্তমান জামানায় দুনিয়ার সবকিছু খুব দ্রুত চলে, সেইজন্য ফ্যাশনও পরিবর্তন হয়ে যায়; মাসের হিসেবে, এমনকি সপ্তাহের হিসেবে পর্যন্ত।
আর আগে কিছুদিন আগে যে আচরণ বড় সুন্দর ছিল, যে পোশাককে বড় সুন্দর হিসেবে গ্রহণ করেছে, ওইটা এখন Out of Fashion (আউট অব ফ্যাশন) হয়ে গেছে, ওগুলো এখন রিলিফে চলে যায়। তো বিদেশে কোনো এক খ্রিস্টান মিশনারি সংস্থা আছে, পাদরিরা ওরা তো দুনিয়ার সাথে তেমন একটা যোগাযোগ রাখে না, কিন্তু একজন পাদরি বলছিল, বর্তমান চলতি ফ্যাশনকে খুব ভালো না বলতে পারলেও Out of Fashion (আউট অব ফ্যাশন) কী, ফ্যাশনের বহির্ভূত কী, তা আমরা জানি, কেমন করে? যে আমাদের এখানে যে কাপড়গুলো আছে, সেই কাপড়েই বুঝতে পারি, এটা এখনের ফ্যাশনে নয়, ওগুলো রিলিফে দিয়ে দেয়। বিভিন্ন দেশের রিলিফওয়ালাদের হাতে যখন চলে যায়, যখন রিলিফওয়ালাদের কাছে একটা ফ্যাশনের পোশাক আসতে আরম্ভ করে, একটা বিশেষ ডিজাইনের, তো বুঝতে পারে যে, তা এখন ফ্যাশন-বহির্ভূত, সেজন্য আমাদের কাছে পাঠিয়ে দিয়েছে।
তো মানুষ মেহনত করে সাময়িকভাবে খুশ হয়, কিন্তু এটার পেছনে কোনো অর্থ থাকে না, যেটাকে আমভাবে বলা হয় দক্ষতা। মানুষ বড় মুগ্ধ হয়, দুনিয়াতে এদের বড় কদর, কিন্তু আল্লাহ তায়ালা বলেন, এরা পথহারা।
وَالشُّعَرَاء يَتَّبِعُهُمُ الْغَاوُونَ
أَلَمْ تَرَ أَنَّهُمْ فِي كُلِّ وَادٍ يَهِيمُونَ
কবিরা, 'তারা পথহারা। আর তোমরা কি দেখো না যে, প্রত্যেক জায়গায় অন্ধের মতো হাটিরাচ্ছে।' পথ চলছে যে, কিন্তু কোনো মাকসাদে পৌঁছাতে পারে না, তো সে অন্ধের মতো চলে। এক বাদশার দরবারে এক কবি এলেন, আর এসে বাদশার প্রশংসায় কসিদা শোনালেন। প্রশংসায় যে কবিতা রচনা করা হয়, আরবিতে সেইসব কবিতার ধরনকে কসিদা বলে। আরবি-সাহিত্যে খুব প্রচলিত একটা ধরন, খুব পরিচিত একটা ধরন কবিতার, যেখানে কারো প্রশংসা করা হয়। তো কবি, কবি তো কবির মতোই কথা বলবে—তোমার সিংহাসন আকাশের ঊর্ধ্বে, তোমার রাজ্য বিশ্বজগতে জড়িয়ে আছে ইত্যাদি। তো খুব উন্নত মানের কসিদা শুনাল, সিংহাসন তার আকাশের ঊর্ধ্বে, গ্রহ-নক্ষত্র পার হয়ে গেছে তার রাজ্য। বাদশা সেও এগুলো শুনল। রসিক মানুষ, খুব খুশ হলো, উন্নত মানের কবিতা শোনানো হয়েছে। আর কবিকে বলল, তুমি আগামী দিন এলে তোমাকে উপযুক্ত পুরস্কার দেবো। পরের দিন কবি গেলেন বাদশার দরবারে, এর আগে সারারাত ছেলে-মেয়ে, বউ-বাচ্চাকে নিয়ে নানান রঞ্জনা-কল্পনা চলল যে, বাদশা বলেছে উপযুক্ত পুরস্কার দেবো, তো কত হতে পারে একটু ধারণা কিছু তো করা যায়।
বাড়ি কিনবে, গাড়ি কিনবে, শাড়ি কিনবে, খেলনা কিনবে, কারো কোনো অভাব নেই, সব কেনার পরেও তো কিছু রয়ে যাবে। বাচ্চাদের পছন্দেরই, রাত ওই আনন্দের মধ্যে কাটল। সকালবেলা গেলেন, দরবারে গিয়ে হাজির হলেন। তো বাদশাহ ওইদিকে আর লক্ষ্যই করেননি। উনি কিছুক্ষণ পরে যখন বাদশাহ লক্ষ্য করেননি, নিজেই বলল, মহারাজ আপনি আসতে বলেছিলেন। 'হ্যাঁ', এই বলে মহারাজ আবার অন্য কাজে ব্যস্ত হয়ে গেলেন। এদিকে আবার খেয়াল করছেন না। আবার কিছুক্ষণ পরে যখন অধৈর্য হলেন, কিছুক্ষণ পরে আবার একটু, রাজার কাছে তো বেশি বলাও যায় না, আবার বলল যে, আপনি যে আসতে বলেছিলেন, 'হ্যাঁ', এটা বলে আবার নিজের কাজে ব্যস্ত হয়ে গেলেন মহারাজ। তো শেষ পর্যন্ত বললেন যে, আপনি বলেছিলেন যে পুরস্কার দেবেন, 'হ্যাঁ তো কী হয়েছে?' 'কী হয়েছে মানে? পুরস্কার দেবেন।' 'তুমি একটা সুন্দর কথা বললে, আমি একটা সুন্দর কথা বললাম, তোমার কথাতে আমি খুশ হলাম, আমার কথাতে তুমি খুশ হলে, আর কী? তুমি একটা কথা বললে আমার ভালো লাগল, আমি তোমাকে একটা সুন্দর কথা বললাম, তোমারও ভালো লাগল।' কিন্তু ওই সাময়িক ভালো লাগার পরেও মানুষের কিছু বাকি রয়ে যায়, যদি ওখানেই শেষ হয়ে যেত, তো সমস্যা ছিল না।
রাজা তাকে বললেন উপযুক্ত পুরস্কার দেবো, আর তার মৃত্যু এসে গেল, জীবন শেষ হয়ে গেল, এরপর আর চাওয়ার কিছু বাকি নেই, তাহলে তো কোনো সমস্যা নয়। কিন্তু মানুষের জীবন যে এই সাময়িক আনন্দ-বেদনা এগুলো পার হওয়ার পরেও রয়ে যায়, ও তো এর চেয়ে বেশি চায়।
নিজে যতটুকু দিয়েছে, ততটুকু পেলে তো সন্তুষ্ট ছিল, আমি সুন্দর কথা বললাম, রাজা খুশ হয়ে গেল; রাজা সুন্দর কথা বললেন, আমি খুশ হয়ে গেলাম। ওখানেই যদি শেষ হয়ে যেত, তাহলে তো কোনো সমস্যা ছিল না। কিন্তু মানুষের জীবন যে আরো লম্বা, এই সীমানা অতিক্রম করে চলে যায় আরো। আরো বেশি সে চায়, এর ভেতর কিছু একটা সীমানা লংঘন করে যায় যে, কথার সীমানা শেষ হয়ে গেছে, এখন বাস্তব সত্যতা চায়। তখন এই কবিদের কোনো কথা আর চলে না। তার একটা বাস্তব, সত্য জীবনের সম্মুখীন যখন সে হয়,
فَكَشَفْنَا عَنكَ غِطَاءكَ فَبَصَرُكَ الْيَوْمَ حَدِيدٌ
তোমার চোখের সব পর্দা এখন দূর হয়ে গেছে, আর তোমার দৃষ্টি এখন খুব তীক্ষ্ণ। তো ওই পর্দার ভেতরেই যদি জীবনটা শেষ হয়ে যেত, তাহলে তো কোনো সমস্যা ছিল না। কিন্তু পর্দার বাইরেও একটা জীবন আছে। আর আছে বলেই এই কবিদের কথাগুলো একসময় গিয়ে অর্থহীন হয়ে যায়। তো কবি বলতে শুধু কবি নয়, দুনিয়ার সব দক্ষতা ওইটা অর্থহীন হয়ে যায়।
শিশু যদি সারা জীবনই শিশু রয়ে যেত, তো সারা জীবনই ওই তুচ্ছ কথা নিয়ে হাসতে পারত। কিন্তু কিছুদিন পরে সে আর শিশু থাকে না, আর সেইজন্যে ওই অর্থহীন কথা দিয়ে তাকেও আর খুশ করা যায় না, আর বাপও আর ওইটা নিয়ে ব্যস্ত থাকতে পারে না। এখন তার আরো কিছু সত্য জিনিসের চাহিদা আছে। তো আল্লাহ তায়ালা আম্বিয়া আলাইহিমুস সালাতুস সালামদের পাঠিয়েছেন ওই সাময়িকভাবে ডিগবাজি খেয়ে খুশি হওয়ার পথ থেকে সুন্দর কথা দিয়ে সন্তুষ্ট হওয়া, সন্তুষ্ট করে দেওয়া; অর্থাৎ এই সার্কাসের জীবন থেকে মানুষকে উদ্ধার করে একটা সত্য জীবনের পথ দেখাবার জন্য। কারণ, সার্কাসওয়ালা সার্কাস দেখাল, কিন্তু সার্কাস দেখানোর পরেও যে দেখাচ্ছে, তারও একটা সত্য জীবন আছে এর বাইরে, পাশাপাশি যারা দেখছে আর হাসছে, ওই এক ঘণ্টা দু-ঘণ্টা পার হয়ে যাওয়ার পরে এদেরও বাইরের জীবন আছে।
আর ওই সার্কাস দেখানোর সময়টাতে তার কিন্তু ওইটা ওখানে আর কার্যকরী হচ্ছে না। সাময়িকভাবে হাসল, কিন্তু ওই হাসা দিয়ে নিজের সমস্যার সমাধান হয় না, অন্যেরও সমস্যার সমাধান করা যায় না। যারা হাসল তারাও বুঝল না কেন হাসল, আর যে হাসাল সে ও বুঝল না, কেন হাসাল। পরবর্তী সময়ে সে নিজেই প্রশ্ন করে, আমি কী নিয়ে হাসলাম আর কী দিয়ে হাসালাম। আর তার অর্থ যখন খোঁজ করে আর পায় না, বড় পেরেশান হয়, বড় দুঃখের কান্না কাঁদতে হয়। যে হাসল তারাও জানে না কেন হাসছে। ওই বাচ্চা ওকে যদি জিজ্ঞেস করা হয়, তুমি যে এত হাসলে, এই ডিগবাজি খাওয়াতে কেন হাসলে? বাচ্চা যদি কথা বলতে পারত, তো বলত, বাস আমার হাসি লাগল তাই হাসলাম। এর চেয়ে বেশি আর উত্তর দিতে পারবে না, এর বেশি আর কিছু নেই। আর মানুষ ভুল করে ওই হাসির মধ্যে আর আনন্দের মধ্যে সুখ খোঁজে।
সুরসুরি দিয়ে মানুষ হাসে, আর বাইরে থেকে যখন দেখে যে সে হাসছে, তো তারা হয়তো ভাবে যে, এই লোকটা কী আনন্দে আছে। কিন্তু যাকে সুরসুরি দিচ্ছে এবং সেই কারণে সেই হাসছে, হাসছে ঠিকই, কিন্তু কোনো আনন্দ পাচ্ছে না, রীতিমতো কষ্টের জিনিস। ছোট বাচ্চাদের একটা বয়স থাকে, খুব বেশি সুরসুরি লাগে, আমার খুব বেশি লাগত। তো আমার সম্পর্কে এক বাচ্চা ছিল, বয়সে আমার চেয়ে বড়, আমাকে বড় জ্বালাত এটা নিয়ে। খুব বেশি সুরসুরি দিত, আর খিলখিল করে হাসতাম আর পেরেশান হয়ে যেতাম, ওকে দেখলেই আমার ভয় লাগত। ওর আপন ভাইয়ের সাথে মৌলভীবাজার সেদিন দেখা হয়েছে।
তো বাইরে থেকে দেখে মনে হবে যে, বড় আনন্দ, কিন্তু আসলে মোটেই আনন্দের নয়, রীতিমতো কষ্টের জিনিস। আমার মনে আছে, সুরসুরি দেওয়া অনেকেরই মনে থাকবার কথা। ছোট বয়সে সুরসুরি লাগে, বড় বয়সে ওইটা কেটে যায়। কষ্ট লাগে কিন্তু হাসে। এক ধরনের গ্যাস আছে Laughing (লাফিং) গ্যাস নাকি কী যেন একটা নাম বলে। ওই গ্যাস যদি কাউকে নিঃশ্বাস নেওয়ানো হয়, সেও সেরকম খিলখিল করে হাসতে থাকে; কিন্তু যদি বেশি দেওয়া হয়, ও হাসতে হাসতে মরে যাবে। কষ্ট, মৃত্যু কারো জন্যই কোনো আনন্দের জিনিস নয়, মৃত্যু সবসময়ই কষ্টের পথে আসে। কিন্তু ওর এক উদ্ভট জিনিস দিয়ে বাহ্যিক একটা, ওইটা হাসি না, ওইটা মনে হয় হাসি, মানুষ এই ধাঁধায় পড়ে যায়।
গভর্নর জেনারেল ছিলেন, পাকিস্তানেরই একজন। তো তার এডিসি বলে, গভর্নর জেনারেল তাদের সাথে বা প্রেসিডেন্ট তাদের সাথে আর্মির পক্ষ থেকে একজন থাকে, এয়ার ফোর্সের পক্ষ থেকে একজন থাকে, নেভির পক্ষ থেকে থাকে, আর সিভিল তো ইত্যাদি আছেই, তাদের সার্বক্ষণিক দেখাশোনার জন্য। তার মধ্যে এয়ার ফোর্সের পক্ষ থেকে ছিলেন এয়ার কমোডর ডগার, পাকিস্তান এয়ার কোর্সের একসময়কার খুব নামকরা অফিসার, এখানে ঢাকাতে ইস্ট পাকিস্তানের বেজ কমান্ডার একসময় ছিলেন। পরবর্তীকালে খুব তবলিগের মেহনত করেছেন।
একসাথে অনেক সময়ই লাগিয়েছি। আমার সাথে খুব ঘনিষ্ঠতাও ছিল। এয়ার কমোডর ডগার ওই গভর্নর জেনারেলের সাথে, বয়স তার খুব কম ছিল, আর গভর্নর জেনারেলের অনেক বয়স, তো নানা-নাতি ধরনের সম্পর্ক হয়ে গেল, আর খুব ঘনিষ্ঠতাও হয়ে গেল। একেবারেই বাড়ির ভেতরে পরিবারের একজন সদস্য হিসেবেই থাকতেন। গভর্নর জেনারেল উনি রাত্রিবেলা মালিশ-টালিশ করাতেন, হাত পা এগুলোতে। আর বিশেষ করে লম্বা সময় গালের মালিশ করাতেন। এয়ার কমোডর ডগার সাহেব একদিন জিজ্ঞেস করলেন: স্যার, অনেককেই নানান ধরনের মালিশ করতে করাতে দেখেছি, মাথা মালিশ এগুলো খুব পরিচিত, পা টিপে দেওয়া, মাথা মালিশ করা, তবে কাউকে গাল মালিশ করাতে দেখিনি, আপনি কেন এত গাল মালিশ করান? তো উনি বললেন যে, ভাই সারাদিন হাসতে হাসতে গালে ব্যথা হয়ে যায়, তো রাত্রিবেলা ওগুলো মালিশ করে ব্যথা সারাতে হয়। তো সারাদিন হাসছে, দেখে তো মনে হবে যে বড় আনন্দ; কিন্তু ওইটা কোনো আনন্দের ব্যাপার নয়, একটা এক ধরনের কাজ তার, গভর্নর জেলারেল হিসেবে এটা তার প্রধান ডিউটি। তো মানুষ ধাঁধায় পড়ে যায়। তাকে হাসতে দেখে, হাসে হাসায়, ধাঁধায় পড়ে যায়। আর পুরা দুনিয়া যখন এই ধাঁধার মধ্যে থাকে, তো কেউ আর থাকে না, যে তাকে বোঝাবে যে, তুমি ধাঁধার মধ্যে আছ, ওখান থেকে বের হয়ে আসো। আর এইভাবে তার জীবন শেষ হয়ে যায়।
তো গল্প আছে এক ধরনের, যারা কৌতুক-বিশেষজ্ঞ, মানুষকে হাসাতে পারে, যাদেরকে Comedian (কমিডিয়ান) বলে। বড় নামকরা তার হাসির দৃশ্যগুলো, বিখ্যাত। তো যে কোম্পানির সাথে তার কাজ, একদিন গিয়ে দেখে যে, আজকে রাতে যে দর্শকরা আসবে, অনেক দামি টিকেট দিয়ে বড় বড় দর্শকরা আসবে, আর সে গিয়ে কিছুক্ষণ তার এই মানুষকে হাসাবার কৌতুক ইত্যাদি শোনাবে। সে বড় বিখ্যাত। তার মেয়ে ছিল, একটাই মেয়ে, সেই মেয়ে মারা গেছে, আর সেইজন্য সে সেদিন বড় ব্যথিত ছিল। আর ওই হাসাবার আগে থেকেই সাইন করা আছে, যদিও সে ওজর পেশ করেছে যে, আজ আমি পারবো না। আমি খুব ব্যথিত। স্বাভাবিকভাবে তার মেয়ে মারা গেছে, বাপের ব্যথা তো লাগবেই। কিন্তু কোম্পানি বলে যে, এখন কেমন করে এটা হবে? টিকিট বিক্রি হয়ে গেছে, লোক এসে যাবে, আর আমি কেমন করে বলি যে, আজ শো ক্যানসেল। এতে বিরাট ব্যাপার হয়ে যাবে। শেষ পর্যন্ত তাকে অনুরোধ করল যে, কিছু না, তুমি শুধু স্টেজে গিয়ে লোককে এই কথাটা বলো, আমার মেয়ে মারা গেছে, আমি বড় দুঃখিত; কৌতুক আজ আমি শোনাতে পারছি না। এই কথা বলে ওজর পেশ করে চলে আসো। অন্তত আমি বাঁচলাম, নইলে আমাকে আক্রমণ করবে। তো তা-ই হলো, স্টেজে গেল, তো নামকরা Comedian যেহেতু, ওর স্টেজে আসার সাথে সাথেই সেই হাততালির রোল। কথা আরম্ভ করল। কথা আরম্ভ করেছেই কি না করেছে, মানুষ হাসিতে লুটোপুটি খায়।
কারণ আগে থেকেই মানুষের একটা প্রস্তুতি থাকে সেইভাবেই। আর যখন সে তার দুঃখের কথা শুনাল যে, আমার মেয়ে মারা গেছে, বড় ব্যথিত, তখন একেবারে গোটা হল হাসির রোলে। তো সবাইকে হাসিয়ে সে কাঁদবে যে, কান্নার জন্যও তো সঙ্গীর প্রয়োজন। তো বেচারা গোটা দুনিয়া খুঁজে একজন মানুষ পাচ্ছে না, যে ওর একটু দরদি হবে। সবাই হাসছে। তো দুনিয়াতে সবাই ধোঁকার মধ্যে পড়ে যায়, সে এত হাসতে পারে, এত হাসাতে পারে।
কী আনন্দের তার জীবন! কত আনন্দের মধ্যেই যাচ্ছে! কিন্তু যদি তার ভেতরে যেতে পারত, আর এক না একসময় তাকে ভেতরে যেতে হয়। যদি এইভাবেই শেষ হয়ে যেত, তাহলে তো কোনো সমস্যাই ছিল না। কিন্তু একসময় তাকেও তার ভেতরে যেতে হয়, নিজের দিকে তাকাতে হয়, তার কাছের জন্যে যেতে হয়, এই স্টেজ থেকে একসময় বের হয়ে যেতে হয়। স্টেজ যদি শেষ হয়ে যেত, তো সমস্যা ছিল না। কিন্তু এসময় বের হয়ে যেতে হয়। আর বের হয়ে যাবার পরে তখন সে নিজের দিকে তাকায় যে, হায়! আমি কোথায় কী করলাম!
আমি কোথায় হারিয়েছি! আল্লাহ তায়ালা আম্বিয়া আলাইহিমুস সালামকে পাঠিয়েছেন মানুষকে প্রথম থেকেই বের করবার জন্য যে, এই স্টেজের ধাঁধায় তুমি পড়ে যেয়ো না। ওই কবিদের কবিতার মধ্যে ডুবে যাওয়া, একসময় তোমাকে এখান থেকে বের হয়ে সত্য কথা বলতে হবে, ওই মিথ্যা রচনা করে করে নানান কথা শোনালাম, কিন্তু তোমাকে একদিন সত্য কথার সম্মুখীন হতে হবে। আর এই যে নানার রঙের নানান কথা বলছ, ওই দর্শকরাও চলে গেছে, আর তোমারও স্টেজের জীবন শেষ হয়ে গেছে; এখন সত্যি কথা বলার পালা। কিন্তু যে ওই সারা জীবন কবিতার চর্চাই করেছে, ও তো সত্য কথা বলাও ভুলে গেছে। সত্য কথা বলতে ও জানে না। তো আল্লাহ তায়ালা আম্বিয়া আলাইহিমুস সালামদেরকে পাঠিয়েছেন, আর তারা এসে মানুষকে প্রথম এই কবিতার আসর থেকে বের করেছেন।
রাসূল কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যেরকম সরাসরি মক্কার জীবন একটা কবিতার জীবন ছিল, যদিও বড় কঠিন জীবন ছিল, কিন্তু কবিতার জীবন ছিল। আর অনেক সময় মানুষ, অনেক সময় কী, প্রায়ই বাস্তব বিপদ থেকে বেদনা থেকে দূরে যাওয়ার জন্যই এগুলোর আশ্রয় নেয়। নেশা করা, গাঁজা খাওয়া, নানান ধরনের শিল্প ইত্যাদি চর্চা করা, এটা বাস্তবতা থেকে পালাবার জন্যই করে থাকে। কিন্তু এটা বেশি দিন তাকে বাঁচিয়ে রাখতে পারে না। সেইজন্য শিল্পজগতে যারা খুব বিখ্যাত নামি নামি শিল্পীরা, একসময় গিয়ে আর ওখানে সে তার ঠাঁই পাচ্ছে না, আর অন্য কোথাও তার যাওয়ার জায়গাও নেই, তাই আত্মহত্যাই করেছে। এটা এই জামানাতেও, আর আগের জামানাতেও ছিল। আর নবীরা এসেছেন আর প্রথম থেকেই ডেকেছেন যে, ওই আসরের মধ্যে যেয়ো না।
তো রাসূল কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এসে, মক্কার জীবন একটা ওই কবিতার আসরের জীবন ছিল, বড় কঠিন জীবন, নানান ধরনের বিপদের জীবন, আর এই সব বিপদ দেখে তারা মনে করত যে, এই কবিতার আসরই আমার আশ্রয়। নেশাখোররা সেরকম মনে করে, যে নেশার মজলিশই আমার আশ্রয়, এর মধ্যে আমি যতক্ষণ ডুবে থাকতে পারি। ক্যানসার রোগী তার নেশা কেটে গেলেই আবার ক্যানসারের কথা মনে পড়ে, সেই জন্য আবার সে নেশার মধ্যে ডুবে যায়, কিন্তু একসময় এটা কেটে যাবে। আর এটাতে ডুবে থাকা সম্ভব নয়। তো মক্কার জীবন একটা কবিতার জীবন ছিল। বড় কবিতার চর্চা ছিল। আর এক-একজনকে ওখান থেকে বের করে এনে এনে তাদেরকে সত্য জীবনের দিকে আনা হয়েছে। এই কবিতার আসর তোমাকে ওখানে থেকে সারা জীবন চালাতে পারবে না।
দুনিয়াতে মানুষ যেটাকে সভ্যতা বলে, সব সভ্যতাই বিভিন্ন আকারে মূলত নীতিগত দিক থেকে মৌলিকভাবে কবিতারই আসর। একটা জিনিস করে, এটার অর্থ কিছু জিজ্ঞেস করা হয়, তো সেও জানে না। বর্তমান সভ্যতা ফ্রান্স এই ব্যাপারে বড় অগ্রগামী। অন্যান্যরা ফ্রান্সের পেছনে চলে; যদিও ক্ষমতা-অর্থ সবদিক থেকে এখন অন্যান্য অনেক দেশের পেছনে পড়ে গেছে, কিন্তু দুনিয়ার ফ্যাশনের চূড়ান্ত এখনো ফ্রান্সেই। আর ফ্যাশনই হচ্ছে সভ্যতা। সভ্যতার মূলত অন্য কোনো অর্থই নেই। ফ্যাশন যে একটা কেন ভালো, একটা চলতি জিনিস, এটাই ফ্যাশন, এইজন্যই ভালো, এ ছাড়া অন্য কোনো উত্তরই নেই। কোনো ধরনের উপকারিতার কারণেই নয়, অন্য কোনো মাপে নয়, এটা এখন চলছে। সভ্যতা ওই জিনিস যে, এটা এখন চলছে, তো সেইজন্যে এটার মূল্য; অন্য কোনো মূল্য নেই, ওর কোনো অর্থ নেই। গোটা দুনিয়া ফ্রান্সকে তাদের মুরব্বী মানে, আর ফ্রান্সের গৌরব কী, আইফেল টাওয়ার। যারা যায় ওখান থেকে ছোট্ট একটা আইফেল টাওয়ার কিনে নিয়ে আসে। ছবি টাঙায় তো এটারই টাঙায়। সবাই জানে। যে-ই যাবে, ফ্রান্স গেল আর আইফেল টাওয়ার দেখল না! হায়! হায়! হায়! তোমার যাওয়াই বৃথা। বাড়িতেই বসে থাকতে, ফ্রান্স গিয়ে তোমার কী লাভ হলো, আইফেল টাওয়ার যখন দেখতে পেলে না। তো চূড়ান্ত কথা, যদি জিজ্ঞেস করা হয়, এটা কেন করা হয়েছে? কী উপকার? এর কোনো উত্তর নেই। ব্যস একটা কথা বলল, ওই কবি যেরকম এরকম এসে বলল যে, তোমার সিংহাসন আকাশ ভেদ করে চলে গেছে, আর তোমার সাম্রাজ্য গ্রহ-নক্ষত্রে ছড়িয়ে আছে। কোথা থেকে বলল? কী যুক্তিতে বলল? কী দলিল আছে? কী সত্যতা আছে? তোমার শুনে ভালো লাগল। টাওয়ার একটা বানালাম, তোমারও হাততালি দিলে, ব্যস এটাই শেষ; এর বাইরে কিছুই নেই।
আল্লাহ তায়ালা আম্বিয়া আলাইহিমুস সালামকে পাঠিয়েছেন, মানুষকে উদ্ধার করা জন্য—এই অর্থহীন শ্রম থেকে, পরিশ্রম থেকে, জীবন থেকে, যে সে মনে করে যে, বড় ভালো কিছু করে যাচ্ছে তার থেকে। যেহেতু তার চারপাশের মানুষ হাততালি দিচ্ছে। আর তারাও তার মতো অবুঝ, কিন্তু একদিন তাকে সত্য জীবনের সম্মুখীন হতে হবে, সত্য বিচারের সম্মুখীন হতে হবে, আর সেদিন সে ডানে-বাঁয়ে তাকিয়ে কিছু পাবে না।
قُلْ هَلْ نُنَبِّئُكُمْ بِالأَخْسَرِينَ أَعْمَالاً
الَّذِينَ ضَلَّ سَعْيُهُمْ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَهُمْ يَحْسَبُونَ أَنَّهُمْ يُحْسِنُونَ صُنْعًا
আল্লাহ তায়ালা রাসূলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলেছেন যে, 'বলে দিন—আমি তোমাদেরকে তার ব্যাপারে জানাবো কি, যে তার পরিশ্রমের ব্যাপারে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত; তার ব্যাপারে তোমাকে অবগত করবো কি, যে তার মেহনতের ব্যাপারে, তার শ্রমের ব্যাপারে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত?' তারা কারা?
الَّذِينَ ضَلَّ سَعْيُهُمْ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَهُمْ يَحْسَبُونَ أَنَّهُمْ يُحْسِنُونَ صُنْعًا
'যারা দুনিয়াতে তার পরিশ্রমকে নষ্ট করল, আর সে ভাবছে বড় ভালো কাজ করে যাচ্ছে।' তামাসকিরো তামাশা দেখছে, হাততালি দিচ্ছে, আর সে ভাবছে আমি বড় কিছু করে যাচ্ছি, কিন্তু কিছুদিন পরে এই তামাসকিরো চলে যাবে। আর তামাসকিরো যখন চলে যেতে আরম্ভ করে, যারা অধৈর্য, দুনিয়াতেই টিকতে পারে না, আত্মহত্যা করে। এমন দুনিয়াতে জগৎ আছে, বড় বিখ্যাত, কোনো কোনো ধরনের তামাসকির, কিন্তু যখন তার বয়স একটা সীমা অতিক্রম করে যাচ্ছে আর সে ভাবতে পারছে যে, এই তামাশা দেখানো আর চলবে না, দর্শক আস্তে আস্তে করে সরে যাচ্ছে, অন্যদের দিকে এখন তাকাতে আরম্ভ করেছে, যে বয়সে আমি দেখাতে পারতাম সেই বয়স অতিক্রম করতে আরম্ভ করছি; তো এটা তার জন্য এত বেদনাদায়ক যে, আর সহ্য করতে পারেনি, ব্যস আত্মহত্যা। কিন্তু আত্মহত্যা করে যাবে কই। আরেক বাজারের সামনে গিয়ে তাকে হাজির হতে হবে। আত্মহত্যা করেই যদি এটা শেষ হয়ে যেত, তাহলে একটা সমাধান ছিল। কিন্তু শেষ তো হয় না। এক সত্য জীবনের সম্মুখীন তাকে হতে হবে।
আল্লাহ তায়ালা বড় মেহেরবানি করে আম্বিয়া আলাইহিমুস সালামদের পাঠিয়েছেন, যে তারা এসে মানুষকে এই ধাঁধা থেকে বাঁচিয়েছেন। কবিরা, যারা তার কবিতার মজলিশের মধ্যে বড় ভালো কবিতা রচনা করছে, আর সে মনে করে যে ব্যস এই বাজারে আমিই আছি, আর কে আছে, তাদেরকেও এই কথা বলা হয়নি—
قُلْ هَلْ نُنَبِّئُكُمْ بِالأَخْسَرِينَ أَعْمَالاً
الَّذِينَ ضَلَّ سَعْيُهُمْ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَهُمْ يَحْسَبُونَ أَنَّهُمْ يُحْسِنُونَ صُنْعًا
আরবে কবিতার বড় চর্চা ছিল, আর তাদের মধ্যে বড়ই উল্লেখযোগ্য ছিল ইমরুল কায়েস। চলে তো গেছে, তার তামাশাও শেষ হয়ে গেছে, কিন্তু শেষ হয়ে যায়নি। দুনিয়ার এই মজলিশ ভেঙে গেছে, এই হাট ভেঙে গেছে, বড় যা বাকি রয়েছে। রাসূলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইমরুল কায়েস সম্বন্ধে জানিয়েছেন, সে এক পতাকা নিয়ে তার পেছনে একটা বাহিনীকে নিয়ে আর সবার সেনাপতি হয়ে জাহান্নামে যাবে। তো তারাও মুগ্ধ হয়েছে, ওর পিছনে যাবে, কিন্তু পিছনে গিয়ে গিয়ে যাবে জাহান্নাম পর্যন্ত। আর নিজে ওদেরকে জাহান্নাম পর্যন্ত নিয়ে গেল। যারা বাঁচতে পেরেছে, তারা বড় ভাগ্যবান। তো রাসূলে সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন এসে সত্য জীবনের সন্ধান দিলেন, তো মক্কার কবিতার সব আসর ভেঙে গেল। আর মক্কা ফতহ হয়ে গেল আর কবিতার আসরও ভেঙে গেল। এরপরে ওই ধরনের জিনিস ছিল, কিন্তু কবিতা আর ছিল না।
কবি ছিলেন আব্দুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা রাদিয়াল্লাহু আনহু, আরো কিছু কবিরা ছিলেন। যখন এই আয়াত নাজিল হলো যে, কবিরা এরাই তো পথহারা, আর তোমরা কি দেখো না যে, অন্ধকারের মধ্যে তারা হাটিরাচ্ছে। আল্লাহ তায়ালার নারাজি আয়াত যখন নাজিল হলো, মুসলমানদের মধ্যে, সাহাবাদের মধ্যে যারা কবি ছিলেন, তারা বড় ভয় পেলেন। আর রাসূলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে দৌড়ে এলেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ! আমরা তো শেষ হয়ে গেছি! তার মধ্যে আব্দুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা রাদিয়াল্লাহু আনহুও ছিলেন। আমরা তো ধ্বংস হয়ে গেছি। রাসুলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, না, তোমরা তাদের মধ্যে না। যারা আল্লাহকে স্মরণ করে, তার পরবর্তী আয়াত,
أَلَمْ تَرَ أَنَّهُمْ فِي كُلِّ وَادٍ يَهِيمُونَ
এর পরের আয়াতটা কী?
إِلاَّ الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ وَذَكَرُوا اللَّهَ كَثِيرًا وَانتَصَرُوا مِن بَعْدِ مَا ظُلِمُوا وَسَيَعْلَمُ الَّذِينَ ظَلَمُوا أَيَّ مُنقَلَبٍ يَنقَلِبُونَ
কিন্তু যারা ঈমান এনেছে, নেক আমল করে, আর সবচেয়ে বড় কথা হলো وَذَكَرُوا اللَّهَ كَثِيرًا আল্লাহকে বড় জিকির করে, তো আল্লাহকে যখন স্মরণ করে এবং যে কথা বলছে ওই কথা বাহ্যিকভাবে কাব্যের সাথে সামঞ্জস্য থাকলেও ওইটা আসলে কবিতা নয়।
কবিতার কবিদের মাপকাঠিতে নয়, কিন্তু শরিয়তের দৃষ্টিতে কবিতা ওইটাকে বলে, যেটা অবধারিতভাবে অর্থহীন। নইলে বাহ্যিক রূপ যেই গুলো আছে, সুন্দর কথা, তো রাসূল কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কথা, কোরআন শরিফের কথার চেয়ে বেশি শুদ্ধ কোনো কথা হতে পারে? কিন্তু এগুলোকে কবিতা বলা হয় না, অর্থহীন না হওয়ার কারণে। তো আব্দুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা রাদিয়াল্লাহ আনহু যদিও বাহ্যিকভাবে কবি ছিলেন, কিন্তু ইসলামের পরে আর কবি ছিলেন না, কারণ তার কথা আর অর্থহীন ছিল না। ইসলামের পরে যে কথাগুলো বলতেন, সত্য কথা বলতেন; মিথ্যা নয়, অর্থহীন নয়। তো সেই অর্থে আর কবিতা ছিল না। কিন্তু এই অর্থপূর্ণ কথা যে কথা আল্লাহ তায়ালা পছন্দ করেন, এই কথা যদি ছন্দ দিয়ে দেওয়া যায় আর ওইটা কবিতার আওতার মধ্যে পড়েও না।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মেহনতের পরে মক্কার কবিতার আসর একেবারেই ভেঙে গেছে; আর ছিল না। এর পরে যে কথাগুলো বলেছেন, সত্য কথাগুলো বলেছেন। ছন্দ হয়তো মিলেছে, কিন্তু ছন্দ মিলাবার জন্য অর্থহীন কথা তা না; বরং সত্য কথা বলতে গিয়ে যদি ছন্দের সাথে মেলে, তো কোনো অসুবিধা নেই। কিন্তু মূলত অর্থপূর্ণ কথা কেন وَذَكَرُوا اللَّهَ كَثِيرًا, আল্লাহর বড় বেশি জিকির করে, তো তারাই বিপদ থেকে মুক্ত।
আল্লাহ তায়ালা আম্বিয়া আলাইহিমুস সালাতু ওয়াসসালামকে পাঠিয়েছেন, মানুষকে আল্লাহর জিকিরের দিকে ডাকবার জন্য। যে আল্লাহর সামনে তোমাকে একদিন হাজির হতে হবে, সেই দিনের জন্য প্রস্তুতি নাও। আর মানুষ তার যোগ্যতা তার সার্থকতা সবকিছুকে খরচ করে দিচ্ছে অর্থহীন সাময়িকভাবে হাততালি পাওয়ার জন্য, মানুষের প্রশংসা পাওয়ার জন্য। হারুনুর রশিদ রহমতুল্লাহির কাছে এক ব্যক্তিকে আনা হলো, সে একটা দক্ষতা অর্জন করেছে যে, একটা সুঁইকে তার মুখের উপর দাঁড় করাতে পারে বড় সুঁই, আর ছোট আরেক সুঁইকে দূর থেকে নিক্ষেপ করে সেই সুঁইয়ের ছিদ্র দিয়ে পার করিয়ে দিতে পারে। আশ্চর্য কথা, তো তাকে আনা হলো, আর যেই যা কিছু করতে পারে তাকে বাদশার সামনেই তাকে আনা হয়, বাদশাকে দেখাবার সেও আগ্রহী থাকে, রাজদরবারে যায়। হারুনুর রশিদের দরবারে আনা হলে, সে তার খেলা দেখাল, বাদশা বড় মুগ্ধ হলেন আর ১০০ স্বর্ণমুদ্রা পুরস্কার দেওয়ার আদেশ দিলেন; কিন্তু হারুনুর রশিদ রহমতুল্লাহি আলাইহি, উনি একদিকে বাদশাও ছিলেন, অপরদিকে খলিফাও ছিলেন, বাদশা হিসেবে তো স্বর্ণমুদ্রা পুরস্কার দিলেন, আর খলিফা হিসেবে জল্লাদকে বললেন ওকে ১০০ দোররা মারতে। তো পুরস্কার পেয়ে তো খুশি হলো, আবার দোররা কেন? দোররা এইজন্য যে, তোমার মূল্যবান জীবনকে এই সুঁইকে দাঁড় করানোর পিছনে নষ্ট করতে তোমাকে এই পথ কে দেখিয়েছে? এই জীবন কি এতই তুচ্ছ যে, একটা সুঁইয়ের পিছনে তোমার জীবনকে শেষ করে দেবে?
আল্লাহ তায়ালা বড় মূল্যবান জীবন দিয়ে পাঠিয়েছেন, দুনিয়ার বেশিরভাগ মানুষ তার জীবনকে যেভাবে ব্যয় করে, হয়তো-বা দুনিয়াতে সে প্রশংসাও পেয়ে যায়। কোনো মা যদি জানত যে, এটার জন্য আমার এই ছেলেকে প্রসব দেওয়া, তাহলে মা তার প্রসব-বেদনাতে রাজি হতো না। এত কষ্টের প্রসব দিয়ে সে খেলার মধ্যে জীবনকে শেষ করবে, আর হাততালি পাওয়ার জন্য! দরকার নেই, আমার ছেলেও দরকার নেই, এই প্রসব-বেদনা সহ্য করারও আমার দরকার নেই। কিন্তু মায়েরা যে প্রসব-বেদনা সহ্য করে, যে বড় আশা সামনে রেখে সহ্য করে, এ তো তুচ্ছ জীবনের জন্য নয়। কিন্তু আফসোসের কথা যে, বেশিরভাগ মানুষ ওইভাবে তার জীবনকে শেষ করে দেয় যে, মা জানলে তার জন্য প্রসব-বেদনা সইতে রাজি হতো না। আল্লাহ তায়ালা রাজি হবেন না। আর একদিন তাকে হিসাব দিতে হবে।
আল্লাহ তালালা বড় মেহেরবানি করে আম্বিয়া আলাইহিমুস সালাতু আসসালামদেরকে পাঠিয়েছেন মানুষকে এই অর্থহীন জীবন থেকে উদ্ধার করে তাকে তার লক্ষ্যের দিকে পৌঁছাবার জন্য, যেন সে তার জীবনকে শুদ্ধ করে। আর মানুষ দক্ষতাকেই সে তার লক্ষ্য বানিয়েছে। গোটা সভ্যতা, শুধু বর্তমান আধুনিক সভ্যতা নয়, দুনিয়ার ইতিহাসে অতীতেও যে বিভিন্ন সভ্যতাগুলো এসেছে আর চলে গেছে, এসেছে, গর্ব করেছে, আনন্দ বোধ করেছে, হেসেছে তার দক্ষতা নিয়ে, আর শুদ্ধতার অভাবের কারণে বিলুপ্ত হয়ে গেছে। তার কোনো চিহ্ন বাকি নেই। সব সভ্যতার একই ইতিহাস। সাময়িকভাবে সে তার দক্ষতা নিয়ে আনন্দিত হয়েছে, কিন্তু শুদ্ধতার অভাবের কারণে বিলুপ্ত হয়ে গেছে।
আল্লাহ তায়ালা আম্বিয়া আলাইহিমুস সালামকে পাঠিয়ে বলেছেন, জীবনকে শুদ্ধ বানাও, আর দুনিয়ার মানুষকে শুদ্ধ জীবনের দাওয়াত দাও। শুদ্ধ কথা যদি দক্ষতার সাথে নাও হয়, কিন্তু কথা যদি শুদ্ধ হয়, আল্লাহর কাছে বড় কদর আছে। আল্লাহ শুদ্ধতার কদর করেন, দক্ষতার নয়। আর সব সার্কাসের দর্শকরা ওরা দক্ষতার কদর করে, শুদ্ধতার নয়। শুদ্ধতার যদি একটু প্রশংসা করত, তাহলে ওই সার্কাস দেখতে কেউ যেত না। কিন্তু সার্কাসের দর্শকরা, তারা শুদ্ধতার দিকে তাদের নজর নেই; দক্ষতার দিকে তাদের নজর। ওরা দক্ষতাতে মুগ্ধ হয়ে যায়। গোটা সভ্যতা, সব সভ্যতাগুলো ওই একটা সার্কাস। তাদের দক্ষতাতেই মুগ্ধ হয়ে যায়, শুদ্ধতার ব্যাপারে কোনো প্রশ্ন করে না; কিন্তু প্রশংসা না করুক, আল্লাহ তায়ালা তো দেখছেন, আল্লাহ তায়ালা ওই জাতিকে মুছে ফেলেন। আর এইভাবেই অতীতের সব জাতিগুলো ধ্বংস হয়েছে।
فَكَأَيِّن مِّن قَرْيَةٍ أَهْلَكْنَاهَا وَهِيَ ظَالِمَةٌ فَهِيَ خَاوِيَةٌ عَلَى عُرُوشِهَا وَبِئْرٍ مُّعَطَّلَةٍ وَقَصْرٍ مَّشِيدٍ
কত জাতিকে আমি ধ্বংস করে দিয়েছি!
فَكَأَيِّن مِّن قَرْيَةٍ أَهْلَكْنَاهَا وَهِيَ ظَالِمَةٌ
তারা জালিম ছিল, তাদের আচরণ শুদ্ধ ছিল না। জালিম এটাই, শুদ্ধ নয়, তারা জালিম ছিল, শুদ্ধ ছিল না। তাদের রাজমহলগুলো, রাজমহলগুলো এখন ভেঙে স্তূপ হয়ে পড়ে আছে। তার ঘাটগুলো পরিত্যক্ত, ওই ঘাটে কেউ যায় না, ওই জাতি ধ্বংস হয়ে বিলুপ্ত হয়ে গেছে। কেন?
أَفَلَمْ يَسِيرُوا فِي الأَرْضِ فَتَكُونَ لَهُمْ قُلُوبٌ يَعْقِلُونَ بِهَا أَوْ آذَانٌ يَسْمَعُونَ بِهَا فَإِنَّهَا لا تَعْمَى الأَبْصَارُ وَلَكِن تَعْمَى الْقُلُوبُ الَّتِي فِي الصُّدُورِ
তারা দুনিয়াতে কি ভ্রমণ করত না? ভ্রমণের দিকে হয়তো এই কারণেও ইঙ্গিত যে, এর আগে যে জাতিগুলো এসেছিল, তাদের দিকে কেন তাকাল না, যাতে তারাও একটু বুঝতে পারত। যাতে তাদের এমন দল হতো, যা দিয়ে সে বোঝে; এমন কান হতো, যা দিয়ে সে শোনে। অর্থাৎ অর্থের কথা শোনে, অর্থপূর্ণ কথা শোনে—বুঝেশুনে। কিন্তু তারা তাকায়নি, যার ফলে তার দল অন্ধ হয়ে গেছে, আর ওরা ধ্বংস হয়ে গেছে। তো এর আগে বহু সভ্যতা এসেছে আর বহু সভ্যতা বিলুপ্ত হয়ে গেছে, ধ্বংস হয়ে গেছে। কারণ তাদের জীবন শুদ্ধ ছিল না। তাহলে কী করল যে, তাদের দক্ষতা ছিল, দক্ষতা দিয়ে নামকরা সভ্যতা গড়ে তুলেছে, শুদ্ধতার অভাবের কারণে বিলুপ্ত হয়ে গেছে।
আল্লাহ তায়ালা আম্বিয়া আলাইহিমুস সালাতুস সালামদেরকে পাঠিয়েছেন শুদ্ধ জীবনের দিকে। শুদ্ধতা যদি থাকে, দক্ষতা নাও থাকে, আল্লাহর কাছে সে পুরা মাফ পাবে। কারণ আল্লাহ তায়ালা দক্ষতাকে কোনোই মূল্য দেন না। এরকম নয় যে, কিছু মূল্য দেন, মোটেই দেন না। যদি দিতেন তাহলে মুসা আলাইহিস সালাতু সালামকে কালিমুল্লাহ উপাধি দিতেন না—যদি আল্লাহর কাছে দক্ষতার কিছুটাও মূল্য থাকত। কিন্তু মুসা আলাইহিস সালাম কথার ব্যাপারে বড়ই অদক্ষ ছিলেন, তোতলা ছিলেন; কিন্তু কথা ছিল শুদ্ধ, আল্লাহ তায়ালা তাকে বড়ই কদর করেছেন। আর তাকেই আল্লাহ তায়ালা কালিমুল্লাহ বানিয়েছেন। তো আল্লাহ তায়ালা সব নবীদেরকে শুদ্ধ জবান দিয়ে পাঠিয়েছেন; দক্ষতা দিয়ে নয়। আর দুনিয়ার মানুষ এই ধাঁধার মধ্যে পড়ে যায় যে, প্রথমেই সে দক্ষতাকে লক্ষ্য বানিয়ে চলতে আরম্ভ করে। এই মা তার ছোট বাচ্চাকে যে প্রাইমারিতে পাঠিয়েছে, যে কেজিতে পাঠিয়েছে, কোথায় কোথায় নার্সারিতে পাঠিয়েছে, তার জীবনকে শুদ্ধ করার জন্য নয়; তাকে দক্ষ বানাবার জন্য। তো প্রথম থেকেই শুদ্ধ নয় একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছে। মক্তবে তাকে ডাকা হচ্ছে, কিন্তু মা-বাপ মক্তবে পাঠাতে রাজি নয়। কারণ মক্তবে ডাকা হচ্ছে শুদ্ধ জীবনের দিকে, আর কেজিতে ডাকা হচ্ছে দক্ষ জীবনের দিকে। আর পরবর্তীকালে প্রত্যেকে যদি তার মাকসাদ পর্যন্ত যেতে পারে, তাহলে এরা শুদ্ধ জীবন গড়ে তোলে, শুদ্ধ জীবন গড়ে তোলে; দক্ষ জীবন নয়। দক্ষতা না থাকার কারণে সে বড় বাড়িও বানাতে পারে না, বড় গাড়িও কিনতে পারে না, বড় ধনীও হতে পারে না, সমাজের কাছে সে বড় হাততালিও অর্জন করতে পারে না; কিন্তু শুদ্ধ হওয়ার কারণে আল্লাহ তার উপর সন্তুষ্ট হয়ে যান।
তো নবীরা শুদ্ধ জীবনের দাওয়াত দিয়েছেন। আমরা ভাই বড় গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিজেদের ব্যাপারেও নিই, আর দুনিয়ার ব্যাপারে নিই, আমার নিজের সন্তানের ব্যাপারেও নিই যে, আমি আমার জীবনকে শুদ্ধ বানাবো। এর জন্য প্রয়োজন হয় দক্ষতার পথ ছাড়ো। ওই সার্কাস নয়, সার্কাস দিয়ে মানুষ তো মুগ্ধ হয়ে যায়, কিন্তু কত দিন? বিরাট বাড়ি বানাবে, অনেক টাকাপয়সা, অনেকে বিভিন্নভাবে সমাজের দৃষ্টি আকর্ষণ করিতে পারল। কিছুদিন পরে এই সবগুলো ছেড়ে চলে যাবে। যারা তাকে দেখে মুগ্ধ হয়েছে, তার বাড়ি দেখে মুগ্ধ হয়েছে, তারা তার বাড়ির দিকে তাকাতেই থাকবে, কিন্তু ও তো কবরে চলে গেছে। এই দর্শক দিয়ে কী করবে? কী ফায়দা হবে? বা হাশরের ময়দানে কী ফায়দা হবে? সেই জন্য এই ধাঁধার মধ্যে না পড়া; বরং প্রথম থেকেই তৈয়ার হই, যেখানে আমার আসল জীবন, ওইটাকে সুন্দর করি।
এই জন্য ভাই আল্লাহর পথে বের হই, ঠিক না ভাই, ইনশাআল্লাহ। সবাই নিয়ত করি একেবারে মৌলিকভাবে আমার জীবনকে পরিবর্তন করতে। ওই মানুষের প্রশংসার পেছনে দৌড়ানো, যেটা মূলত একটা সার্কাসের মনোভাব, ওইটা থেকে নিজেকে উদ্ধার করবার চেষ্টা করা। কিন্তু কোনোভাবেই নিজেকে ছুটাতে পারছি না, যতই চেষ্টা করি না কেন, ঘুরে-ফিরে যখন আবার মানুষ প্রশংসা করে তো আবার ফুলি। নামাজ, রোজা, হজ, জাকাত—সবকিছু করার পরে আবার যখন কেউ এসে প্রশংসা করে, যে ব্যাপারেই হোক না কেন, এমনকি নামাজের ব্যাপারেই প্রশংসা করে; কেউ এসে বলল, আপনার নামাজ এত সুন্দর! এত ধীরতার সাথে এত স্থিরভাবে নামাজ পড়েন! আমরা তো এমনভাবে নামাজ পড়তে পারি না! ফুলে গেল, ও বুঝতে পারল না যে, ওর নামাজ নিয়ে সে সার্কাস দেখাচ্ছে। এটা সে নিজেই বুঝতে পারেনি।
নামাজ পড়তে আরম্ভ করেছিল আল্লাহর জন্য, আর যখন আরেক জনের প্রশংসাতে সে খুশ হয়ে গেল, ওইটা সার্কাসের হয়ে গেল; ওইটা আল্লাহর নামাজ থাকল না। ও টেরও পাচ্ছে না, শয়তান কোথা থেকে কোথায় নিয়ে গেল। কেউ তাকে বিদ্রুপ করল, আবার রেগে গেল, অসন্তুষ্ট হলো, একই কথা। যদি সে সার্কাসের লোকই না হতো, তো প্রশংসাতে-বা সন্তুষ্ট হবে কেন আর বিদ্রুপেই অসন্তুষ্ট হবে কেন? কিন্তু যে এটা থেকে নিজেকে বাঁচাতে পারে, সে বড় বাঁচা বেঁচে গেছে।
কার কথা আমি ঠিকমতো জানি না, হয়তো রশিদ আহমদ গাঙ্গুহি রহমতুল্লাহির কথা হতে পারে। উনি বায়াত হওয়ার কিছুদিন পরেই খেলাফত পেয়েছিলেন, ৪০ দিনের মধ্যেই সম্ভবত। আর যতটুকু মনে আছে, কিছুদিন, জিকির ইত্যাদিও তত বেশি করেননি। উনি যখন প্রথম বায়াত হন, মোহাজেরে মক্কী রহমতুল্লাহি আলাইহির কাছে, বায়াত হওয়ার সময় একথা বললেন যে, হজরত আমি বেশি জিকির ইত্যাদি করতে পারবো না, তো ওই শর্ত করেই বায়াত হয়েছেন যে, বেশি জিকির করতে পারবে না। আগে থেকেই প্রস্তুতি নেই এটার জন্য, অল্পস্বল্প জিকির তাকে দিলেন।
কারণ আগে শর্ত নিয়েছেন যে, বেশি জিকির করতে পারবেন না। অল্পই দিলেন, অল্প কিছু করলেন, কিছুদিন পরে গিয়ে বললেন যে, বেশি ফায়দা কিছু দেখতে পাচ্ছি না, তবে এটা যে, মানুষের প্রশংসা আর মানুষের তিরস্কার এটা আমার কাছে সমানই লাগে। মোহাজেরে মক্কী রহমতুল্লাহি আলাইহি এর চেয়ে বেশি বোধহয় কিছু চানওনি, আর এইটুকুতেই খেলাফত দেওয়া যথেষ্ট মনে করেছেন যে, মানুষের প্রশংসা আর মানুষের তিরস্কার আমার কাছে সমানই লাগে। তো আর দরকার নেই।
স্টেজ থেকে বের হয়ে যদি যেতে পারে একবার, তাহলে নিজে থেকেই শুদ্ধ পথ খুঁজে পেয়ে যাবে। কিন্তু ওখান থেকে বের করা, ওই মদের আসর থেকে যদি বের করা যায়, তো ছেলে তো মেধাবী, তার অনেক যোগ্যতা আছে; ওই আসর থেকে বের করতে পারলে ও পথ নিজেই বের করতে পারবে। তো নবীরা এই আসর থেকেই বের করতেন। আর যখন বললেন যে, মানুষের প্রশংসা আর মানুষের তিরস্কার আমার কাছে সমান লাগে, এটাতেই বুঝতে পারলেন যে, ও তো স্টেজ থেকেই বের হয়ে গেছে। এর পরে ও নিজেই পথ পাবে। তো আমরা এই স্টেজের জীবন থেকে নিজেকে বের করবার চেষ্টা করি। আমি এখানে সার্কাস দেখাতেও আসিনি, সার্কাস দেখতেও আসিনি। আল্লাহর সামনে নিজেকে হাজির করবার প্রস্তুতির জন্য এসেছি। মানুষ আমার সার্কাস দেখে হাসল না কাঁদল, ওইটা থেকে নিজেকে উদ্ধার করি। এইজন্য মানুষের প্রশংসা মানুষের তিরস্কার এটা থেকে নিজেকে মুক্ত করি, কিন্তু বারবার চেষ্টা করার পরেও মুক্ত হতে পারছি না।
এমনকি তবলিগে ৩ চিল্লা দেওয়ার পরেও বলে, 'অঞ্চলের লোকজন বলে, মাশাআল্লাহ তবলিগ তো আমাদের অঞ্চলের অনেকেই করে, কিন্তু আপনার মতো এরকম জানতেড়ো তবলিগ কে করতে পারে?' ফুলে গেলাম। তবলিগ আরম্ভ করেছিলাম আল্লাহর জন্য, আর কখন এসে এটা মানুষের জন্য সার্কাস দেখাতে আরম্ভ করেছি, টেরও পাইনি। সার্কাস দেখাবার জন্য তো তবলিগ করিনি; আরম্ভ করেছিলাম আল্লাহর জন্য, কখন যেন সার্কাসে ঢুকে পড়েছি।
এই জন্য ভাই বারবার করে নিজেকে উদ্ধার করার চেষ্টা করা, যেন আমি আল্লাহর ওয়াস্তেই করি, আল্লাহর সামনেই নিজেকে হাজির করতে পারি। এই জন্য বারবার করে আল্লাহর পথে যেতে হবে, ঠিক না, ইনশাআল্লাহ। যতক্ষণ পর্যন্ত নিজেকে সম্পূর্ণ মুক্ত করতে না পারি, যেন মানুষের প্রশংসা আর মানুষের তিরস্কার সমানই লাগে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কত প্রশংসাই করেছে, তাতেও কোনো পরিবর্তন তার মধ্যে আসেনি। কোনো নবীরই আসত না। সেইজন্য নবীরা এত সহজে মানুষুলকে মাফ করে দিতে পারতেন। কারণ তার প্রশংসাও কোনো মূল্য রাখে না, তার তিরস্কার কোনো মূল্য রাখে না। যখন তিরস্কার করেছে, এমনকি কত ক্ষতি করেছে, রাগ লাগেনি। রাগের, প্রশংসার প্রত্যাশী যে, সে যদি তার বিরুধাচরণ পায়, তবেই-না সে রাগ করবে। আশা করেছিলাম প্রশংসা করবে আর বলল খারাপ, খুব রাগ লাগল। যে আশাই করেনি, ওর খারাপ লাগবেই-বা কি? কোনো নবী কারো প্রতিশোধ নেননি। এইজন্য যে, ওর কাছে কিছু চাইই না, তো প্রতিশোধ কিসের নেবেন?
আল্লাহর পথে বের হই আমরা আল্লাহর ওয়াস্তে নিজের জীবনকে বানাই, ঠিক না ভাই, ইনশাআল্লাহ। এই জন্য আবার নিয়ত করি যে, ইনশাআল্লাহ ৩ চিল্লা দেবো যারা, আল্লাহর মেহেরবানিতে আগেই ৩ চিল্লা দিয়েছি, তারা প্রত্যেক বছর ৩ চিল্লার নিয়ত করি। যারা আগে ৩ চিল্লা দিইনি, তারা এখন থেকে ৩ চিল্লার নিয়ত করি। [দোয়া]। আগে যারা ৩ চিল্লা দিয়েছি, তারা দাঁড়িয়েছি, নাম লিখাবার দরকার নেই, বসে যাই। এখানকার যারা চিল্লার জন্য বা ৩ চিল্লার জন্য নিয়ত করছি, তারা নাম লেখাই, মৌলভীবাজারের যারা। [দোয়া]।
سُبْحَانَ الله وَبِحَمْدِهِ، سُبْحَانَكَ اللَّهُمَّ وَبِحَمْدِكَ نَشْهَدُ أَنْ لا إِلَهَ إِلا أَنْتَ ، نَسْتَغْفِرُكَ وَ نَتُوبُ إِلَيْكَ.
سُبْحَانَ رَبِّكَ رَبِّ الْعِزَّةِ عمَّا يَصِفُوْنَ، وَسَلاَمٌ عَلَى الْمُرْسَلِيْنَ، وَالْحَمْدُ للهِ رَبِّ الْعَالَمِيْنَ، آمِيْن.
[সমাপ্ত]
মন্তব্য (...)
এ সম্পর্কিত আরও প্রবন্ধ
কাজ ও আমল: বাস্তবতা ও গায়েবের নিরিখে
দুনিয়ার মানুষ কাজে ব্যস্ত। আল্লাহ তাআলা আম্বিয়া আলাইহিমুস সালামকে পাঠিয়েছেন মানুষকে কাজ থেকে সরিয...
প্রফেসর হযরত মুশফিক আহমদ রহ.
২০ জানুয়ারী, ২০২৬
৩৭৩৯
দাওয়াতের প্রাণ মুহাব্বত
আল্লাহ তাআ’লা আমাদেরকে ইখলাসের হুকুম দিয়েছেন। ইবাদতের মধ্যে যেমন ইখলাস দিয়েই তার মূল্য। পরিমাণে খুবই...
প্রফেসর হযরত মুশফিক আহমদ রহ.
১৭ জানুয়ারী, ২০২৬
৩৬৫০
আল্লাহর হাতে সোপর্দ: দুশ্চিন্তামুক্ত জীবনের পথ
ছোট বাচ্চাকে নিয়ে মা-বাবা সফর করছেন। সফরে ট্রেনের ঝামেলা ইত্যাদি নানান অসুবিধায় মা-বাবা পেরেশান! ব...
প্রফেসর হযরত মুশফিক আহমদ রহ.
২০ জানুয়ারী, ২০২৬
৩৯৩৫
জরুরত - মানুষের প্রয়োজন ও ইবাদত
আল্লাহ তায়ালা বলেন: وَأْمُرْ أَهْلَكَ بِالصَّلَاةِ وَاصْطَبِرْ عَلَيْهَا لَا نَسْأَلُكَ رِزْقًا نَّ...
প্রফেসর হযরত মুশফিক আহমদ রহ.
২০ জানুয়ারী, ২০২৬
৩৬৩৮
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন