মাধ্যম নয়, লক্ষ্য আল্লাহওয়ালা হওয়া
মাধ্যম নয়, লক্ষ্য আল্লাহওয়ালা হওয়া
[ দীনের দাওয়াতের কোনো নির্দিষ্ট পদ্ধতি নির্ধারণ করেননি, বরং হিকমতের সাথে দেওয়ার আদেশ দিয়েছেন। নামাজের মতো ইবাদতে নির্দিষ্ট পদ্ধতি রয়েছে, কিন্তু দাওয়াতে অবস্থা বুঝে করতে হয়। আজান আল্লাহ সরাসরি শেখাননি, সাহাবারা মাশওয়ারা করে স্বপ্নের মাধ্যমে শিখেছেন। উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু ফজরের আজানে 'আস-সালাতু খাইরুম মিনান নাওম' বৃদ্ধি করেন এবং উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহু জুমার দ্বিতীয় আজান প্রচলন করেন। আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু কুরআন সংকলনে প্রথমে দ্বিধা করলেও আল্লাহ তাঁর বক্ষ প্রশস্ত করে দেন—যা যুক্তিতে বোঝা থেকে ভিন্ন। ইতমিনান হলো দিলের গভীর প্রশান্তি, যা সাহাবারা প্রতিটি সিদ্ধান্তে অনুভব করতেন। দীনের কাজে মূল লক্ষ্য হলো আল্লাহওয়ালা হওয়া, তবলিগওয়ালা বা আলিম হওয়া নয়। প্রথম যুগে মাওলানা ইলিয়াস রহঃ ও মাওলানা জাকারিয়া রহঃ আল্লাহওয়ালা ছিলেন, তাই তাঁদের দেখে স্বতঃস্ফূর্তভাবে আল্লাহওয়ালা হওয়ার আগ্রহ জাগত। এখন সচেতনভাবে লক্ষ্য ঠিক রাখা প্রয়োজন যে তবলিগ উপলক্ষ্য, আল্লাহওয়ালা হওয়াই লক্ষ্য। মাদরাসা, পীরের ওজিফা, তবলিগ—সবই মাধ্যম, লক্ষ্য নয়; লক্ষ্য হলো আল্লাহর সাথে সম্পর্ক কায়েম করা। ব্যক্তিগত জীবনে শরিয়তের পাবন্দি এবং বিশেষত দুর্বলদের সাথে সুন্দর আচরণ আল্লাহওয়ালাদের বিশেষ পরিচয়। আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন, "তোমাদের মধ্যে দুর্বল আমার দৃষ্টিতে সবল"—এটি আখলাকের মূল উসুল।]
أعُوْذُ بِاللهِ مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّجِيْمِ، بِسْمِ اللهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيْمِ،
ادْعُ إِلِى سَبِيلِ رَبِّكَ بِالْحِكْمَةِ وَالْمَوْعِظَةِ الْحَسَنَةِ
.
আল্লাহ তায়ালা দীনের দিকে ডাকার আদেশ দিয়েছেন হিকমতের সাথে, কোনো বিশেষ পদ্ধতি নির্ধারণ করে দেননি। যেমন নামাজের ব্যাপারে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
صَلُّوا كَمَا رَأَيْتُمُونِي أُصَلِّي
ওইরকম নামাজ পড়ো, আমাকে যেরকম নামাজ পড়তে দেখছো।
এই কথা বলেননি যে হিকমতের সাথে নামাজ পড়ো, বুদ্ধি করে নামাজ পড়ো বা বুঝেশুনে নামাজ পড়ো, কোনোটাই বলেননি; বরং যেভাবে দেখছো ওইভাবে পড়ো। কিন্তু দাওয়াতের ব্যাপারে এই কথা বলা হয়নি যে, আমি যেভাবে দাওয়াত দিচ্ছি বা আমাকে যেরকম দেখো ওইরকম করো, বরং হিকমতের সাথে। আর এর জন্য কোনো তারতিবকে নির্ধারণ করে দেওয়া হয়নি। হিকমত কী, তাও বলে দেওয়া হয়নি।
তো সেইজন্য আল্লাহ তায়ালা বড় মেহেরবানি করে এটাকে সহজ রেখেছেন আর পরবর্তীকালে বিভিন্ন জামানায় বিভিন্ন অবস্থায় দীনের দাওয়াতের জন্য বিভিন্ন জিনিস এসেছে, যেগুলো রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যেভাবে করেছেন ওইটা ওইভাবেই আছে। এরকম নয় যে অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে নামাজের মধ্যে কিছু বাড়ানো হলো বা কমানো হলো; তা নয়। কারণ ইবাদতের মধ্যে আল্লাহ তায়ালা তার পদ্ধতি ইত্যাদি সব নির্ধারণ করে দিয়েছেন, এটা এইভাবেই থাকবে। ইবাদতে আনার জন্য বা ইবাদতকে রক্ষার জন্য যে দাওয়াত করা হয়, দাওয়াতের দুটো অংশ। একটা হচ্ছে যে যেইটুকু আছে ওইটাকে রক্ষা করা, আর ওইটাকে বাড়ানো, আরও বেশি যাতে আসে, দুটোই দাওয়াতের অংশের মধ্যে পড়ে। এটার কোনো নির্দিষ্ট পদ্ধতি নির্ধারণ করেননি, এটা খোলা, অবস্থা বুঝে করতে হয়।
নামাজের ব্যাপারে তো বলেছেন, যেরকম আমাকে দেখো নামাজ পড়তে, ওইরকম। আজান, ওইটা আল্লাহ তায়ালা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে দেখাননি, যেরকম জিব্রাইল আ. এসে নামাজ পড়া দেখিয়েছেন; রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজেই শিখেছেন আর এভাবে অন্যদের শিক্ষা দিয়েছেন।
আজানের ব্যাপারে আল্লাহ তায়ালা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে শিক্ষা দেননি, আর যেহেতু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এই ব্যাপারে আল্লাহর কাছ থেকে কিছু শেখেননি, তো রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামও শেখাননি, আজান কীভাবে দিতে হবে।
আজান হচ্ছে দাওয়াত, এটা মাশওয়ারা করে মাশওয়ারা করে তারা চিন্তাফিকির করলেন যে কীভাবে দাওয়াত দেওয়া যায়। আবার ওই কথা বলছি, নামাজ কোনো মাশওয়ারা করে বের করা হয়নি, যে নামাজ কীভাবে পড়বো বা ইবাদত কীভাবে করবো, সবাই মিলে চিন্তাফিকির করি। এখানে চিন্তাফিকিরের কোনো অবকাশ নেই; যেভাবে করতে হবে ওইভাবে করো।
কিন্তু দাওয়াতের ব্যাপারে সবাই মিলে চিন্তা করেছেন, চিন্তা করে তখনও কোনো সমাধান হয়নি, তারপর চলে গেছেন। তো আল্লাহ তায়ালা আব্দুল্লাহ ইবনে জায়েদ রা. আর উমর রা. দুজনকেই স্বপ্নের মধ্যে আজান দেখিয়েছেন।
আব্দুল্লাহ ইবনে জায়েদ রা. উনি এসে আগে বলেছেন যে আমি এরকম দেখলাম, তো রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিলাল রা.-কে ডাকলেন। আর ডেকে আজান দিতে বললেন। কীভাবে? যেরকম আব্দুল্লাহ ইবনে জায়েদ রা. বলে, এরকম নয় যে যেরকম আমি বলি, যেরকম আব্দুল্লাহ ইবনে জায়েদ রা. বলে সেভাবে। তো রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হায়াতে থাকতেই আজানের পদ্ধতি আল্লাহ তায়ালা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে দিয়ে না করিয়ে অন্য একজনকে দিয়ে করাচ্ছেন, চলল।
উমর রা. তার জামানায় অনুভব করলেন যে, ফজরের আজানে কিছু বৃদ্ধি করা দরকার, 'আস-সালাতু খাইরুম মিনান নাওম', তো বাড়ালেন এটা। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে কাজ করেননি, করতে দেননি, তো বাড়ালেন, সাধারণত এটাকে বিদআত বলে থাকে।
আজকাল মানুষ বিদআতের বড় গভীর জ্ঞান অর্জন করেছে। যে নামাজ পড়ে না, সেও বিদআত জানে। উমর রা. এটার প্রচলন দিলেন আর এতজন সাহাবে থাকতে কেউ বললেন না যে এটা বিদআত। আর বিদআতের ব্যাপারে উমর রা. নিজে সবচেয়ে বেশি কঠোর ছিলেন, কিন্তু প্রচলন দিলেন। কারণ দাওয়াতের মধ্যে এটা কোনো নির্ধারিত পদ্ধতি নয় যে, ওই পদ্ধতিই হতে হবে, এটা তো হিকমতের সাথে করা প্রয়োজন। বদল করা যাবে, তো করেছেন।
উসমান রা.-এর জামানায় লোকজন আরও বেড়ে গেল, জুমার নামাজে অনেক লোক আসে, অনেক দূর থেকে লোক আসে, তো জুমার নামাজে দুই আজানের প্রয়োজন অনুভব করলেন। তো উসমান রা. জুমার আরেক আজানের প্রচলন দিলেন, যেটা আজকেও করা হয়। প্রথম আজান আর তারপর খুতবার সময় আরেক আজান, আগে খুতবার যে আজান শুধু ওই আজানই ছিল, এটা উসমান রা. প্রচলন দিলেন। আবার ওই কথা, তখনও অনেক সাহাবে মজুদ, এটাকে বিদআত বলে ইনকার করেননি। উমর রা., আবু বকর রা.-এর জামানায় ইয়ামামার যুদ্ধে অনেক সাহাবে শহিদ হয়ে গেলেন, তাদের মধ্যে অনেক কারি, হাফিজ। আর আশঙ্কা হলো যে কোরআন হারিয়ে যাবে। কোরআন শরিফ এক কিতাবের আকারে লেখা ছিল না। উমর রা. এসে বললেন আবু বকর সিদ্দিক রা.-কে, কোরআন শরিফকে এক জায়গায় সংকলন করো। আবু বকর সিদ্দিক রা. উত্তর দিলেন, আমি কি ওই কাজ করবো, যে কাজের আমাকে আদেশ দেওয়া হয়নি? নতুন জিনিস, আর দীনের মধ্যে ওই উসুল খুব গুরুত্বপূর্ণ যে, নিজে থেকে কিছু না বানানো, যেটাকে বিদআত বলা হয়। এটা শরিয়তের খুব একটা গুরুত্বপূর্ণ উসুল।
যদি দেখা যায় অতীতের ধর্মগুলো, যেমন খ্রিষ্টান ধর্ম সবচেয়ে কাছের যেটা, দেখা যায় যে ওইটা এত বিকৃত হলো কেমন করে? যে ঈসা আ. যত তালিম দিয়েছিলেন, প্রায় সবগুলোর জায়গায় কোনো না কোনো বিদআত ঢুকে গেছে। তো এর জন্য শরিয়ত বিদআতের ব্যাপারে খুব সতর্ক। তো আবু বকর রা. তাকে বারবার বলতে থাকলেন তার প্রয়োজন সম্বন্ধে, আর এক পর্যায়ে গিয়ে আবু বকর রা. ওইটা মেনে নিলেন। তো তারা বললেন, হ্যাঁ, কথা তো ঠিক, করা দরকার। কিন্তু আবু বকর সিদ্দিক রা.-এর প্রথম উক্তি, যে এই ব্যাপারে কোনো আদেশ নেই, ওইটা কিন্তু বদলায়নি। এটা এরকম নয় যে খোঁজ করে একটা আদেশ জোগাড় করেছেন, তা নয়। আদেশ নেই কথা বিলকুল ঠিক, এটা ঠিক রয়েছে, কিন্তু আদেশ না থাকা সত্ত্বেও সংকলন করার ফয়সালা করলেন। এখানেই বোঝা যাচ্ছে যে, সব কথার আদেশ থাকবে না।
কিন্তু দাওয়াতের ব্যাপারে যে, ইচ্ছা করে, যা ইচ্ছা করে ফেলে দেবে তাও নয়; কিন্তু সেই মানাগুলো আছে, তাফসিলি জানতে হবে পরে। যেরকম এই কথা বলা হয় যে, কবিরা প্রায় দেখা যায় যে ভাষার প্রতিষ্ঠিত প্রচলিত ব্যাকরণের নিয়ম অনেক সময় লংঘন করে থাকেন। বড় বড় কবিরা বরং অনেক ক্ষেত্রে ওই লংঘন করে যেভাবে একটা বাক্য রচনা করেছেন, পরবর্তী সময়ে ওইটাই আইন হয়ে যায়। কিন্তু তাই বলে এটা নয় যে, যে-কেউ এলোমেলো বাক্য রচনা করে বলে যে আমি কবি; কিছু মৌলিক জ্ঞান থাকতে হবে, তার পরিপ্রেক্ষিতে কিছু করা যেতে পারে। আবু বকর সিদ্দিক রা. মানলেন, আর এই কথা বলেননি যে আমি কথা বুঝলাম, উমর রা. আমাকে বোঝালেন, আমি বুঝলাম। বরং এটা বললেন,
حَتَّى شَرَحَ اللهُ صَدْرِيْ
এই ব্যাপারে আল্লাহ তায়ালা আমার বক্ষকে প্রশস্ত করে দিলেন। বক্ষ প্রশস্ত করা আর বোঝা ভিন্ন জিনিস। বোঝা একটা যৌক্তিক পদ্ধতিতে কেউ বোঝে যে অমুক আয়াত অমুক হাদিসের পরিপ্রেক্ষিতে। একটা কথা এটা বোঝা হলো যে এই আয়াত থেকে এটা প্রমাণিত হয়, বা এই হাদিস থেকে এটা প্রমাণিত হয়, এই ফিকহের হুকুম থেকে এটা প্রমাণিত হয়—এগুলো হলো বোঝা।
আরেকটা জিনিস বিনা যুক্তিতে মেনে নেওয়া এটা হলো شَرَحَ اللهُ صَدْرِيْ। আল্লাহ তায়ালা উনার দিলের মধ্যে এটা দিলেন। তারা এই ধরনের লোক যে, আল্লাহ তায়ালা এসব পবিত্র দিলে কখনো ভুল কথা ঢালেন না। এই মাকামের সবাই নয় যে, আমার মন বলছে অতএব করে ফেলি। এটা তাদের খাস মাকাম যে, সেই মনের মধ্যে কোনো ভ্রান্ত কথা আসে না; মন পবিত্র। তো মন মেনে নিল, আর কোরআন শরিফ সংকলন করলেন। তো এভাবে পরবর্তী সময়ে আবার, এই যে মাদরাসা ইত্যাদির তালিমের পদ্ধতি, এগুলো রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দিয়ে যাননি, এবং যে সিলেবাস এগুলো দিয়ে যাননি। হাদিস, তাফসির, ফিকহ কোনোটাই দিয়ে যাননি; বরং সবই নতুন।
এখন দুনিয়ার যে-কোনো মাদরাসায় একটা পরীক্ষায় যদি একজন সাহাবেকে বসানো হয়, যে-কোনো সাহাবে, আবু বকর রা., উমর রা., মুয়াজ ইবনে জাবাল রা. হতে পারেন, উবাই ইবনে কাআব রা.-ও হতে পারেন, যে-কোনো সাহাবে হতে পারেন, কোনো একটা পরীক্ষায় যদি বসানো হয়, একেবারে প্রাথমিক হোক বা টাইটেল পরীক্ষা হোক বা হাদিস বা তাফসির হোক, প্রত্যেক পেপারে ফেল করবেন।
শুধু সামগ্রিকভাবে যে ফেল করবেন তা নয়, বরং স্বতন্ত্রভাবে প্রত্যেক পেপারে ফেল করবেন, একেবারে চ্যালেঞ্জ করে বলতে পারি, যেসব প্রশ্ন আসবে এর কোনো প্রশ্ন তাদের জানা ছিল না। তাফসির সম্বন্ধে যেসব প্রশ্ন, ইবনে কাসিরের তাফসিরের জীবনী, ইবনে কে, বা দাবি কে, জানি না।
হানাফি মাজহাব সম্বন্ধে, যে হানাফি আবার কী, তাও জানি না। সহিহ হাদিস কী, হাসান হাদিস কী। তো সহিহ হাদিস কী, হাসান হাদিস কী, তাও জানি না। কারণ এসব জিনিস পরবর্তী আবিষ্কার, সাহাবেদের জামানায় কোনোটা ছিল না। ব্যাকরণ, একেবারে প্রথম দিকের আরবি ব্যাকরণ, তো আরবি ব্যাকরণও তাদের জামানায় ছিল না। ব্যাকরণ, পরবর্তীকালে এটাকে গঠন করা হয়েছে। কোনোটাই তাদের জামানায় ছিল না। তার মানে এটা নয় যে এই জিনিসগুলো বাহুল্য, বর্তমানে এগুলো ছাড়া আবার হবেই না। এখন যদি কেউ দীন শিখতে চায়, তাহলে তার জন্য এসব জিনিস শেখা একেবারে অপরিহার্য; এ ছাড়া সে পারবে না।
প্রথমত আরবি ব্যাকরণ, সাহাবেরা ব্যাকরণ জানতেন না, কেন? তার প্রয়োজনই ছিল না। যে তার মাতৃভাষা জানে, ওর ব্যাকরণ জানার দরকার নেই। তো ব্যাকরণ একটা শৃঙ্খলা হিসেবে এটাকে অনেক পরে আবিষ্কার করা হয়েছে আলি রা.-এর জামানায়। আলি রা. আবুল আসাদ দিউযালি রহ. উনাকে বললেন যে ব্যাকরণ সংগঠন করো। তিনি আবার ওই কথা বলেছেন যে আমি কি ওই কাজ করবো, যে কাজ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম করেননি, করতে আদেশ দেননি? পরবর্তীকালে তিনি আবার করতে রাজি হলেন, কিন্তু অভিজ্ঞতার পরিপ্রেক্ষিতে। বর্তমানে যদি কেউ একজন ব্যাকরণ কিছু না জানে, আমাদের দেশে, যে ব্যাকরণ জানে এটা সহজেই বুঝতে পারে। যদি ব্যাকরণ না জানে, উলটাপালটা পড়বে।
إِنَّمَا يَخْشَى اللَّهَ مِنْ عِبَادِهِ الْعُلَمَا
যদি পড়ে একেবারে বিপরীত অর্থ হবে। যে ব্যাকরণ জানবে, ও সাথে সাথে বুঝতে পারবে যে এটা হতে পারে না, বরং এটা হওয়া দরকার
إِنَّمَا يَخْشَى اللَّهَ مِنْ عِبَادِهِ الْعُلَمَا
এখন তো আরবদের জন্যও ব্যাকরণ জানা দরকার। কারণ আরবরাও ভাষা জানে না, ওদের তাকেও স্কুলে-মাদরাসায় গিয়ে শিখতে হয়। যদি না জানে তো আরবরাও কোরআন শরিফ বুঝতে পারবে না, হাদিস শরিফ বুঝতে পারবে না। আজমিরা তো পারবেই না। এই সবগুলো পরবর্তীকালের প্রয়োজন, এ ছাড়া হবেই না। আর সাহাবেদের জামানায় ছিলও না, আর যেহেতু সাহাবেদের ছিল না, ওই জিনিস দীনের মূল লক্ষ্য হতে পারে না।
আল্লাহ তায়ালা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে মুকাম্মাল দীন দিয়েছেন,
الْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِينَكُمْ وَأَتْمَمْتُ عَلَيْكُمْ نِعْمَتِي وَرَضِيتُ لَكُمُ الإِسْلاَمَ دِينًا
তো আজ এতগুলো জিনিস, সরফ, নাহু, ফিকহ, হাদিস, তাফসির এগুলো জিনিস আমরা জরুরি বলছি আর এগুলোই ছিল না, আর এগুলোকে বাদ দিয়ে আল্লাহ তায়ালা দাবি করেছেন যে দীন পরিপূর্ণ—এ কথার কী অর্থ? এই যতগুলো জিনিস আছে যেগুলো পরবর্তী সময়ে প্রয়োজন হয়েছে, এগুলো কোনোটাই লক্ষ্য নয়, উপলক্ষ্য। কবরে, হাশরে কোনো জায়গায় ব্যাকরণ সম্বন্ধে কোনো প্রশ্ন হবে না, উসুলে ফিকহ সম্বন্ধে কোনো প্রশ্ন হবে না, উসুলে হাদিসের বিভিন্ন সংজ্ঞা সম্বন্ধে কোনো প্রশ্ন হবে না, হাসান কাকে বলে, মওদু কাকে বলে ইত্যাদি। কবরে, হাশরে, কারো কাছে কোনো প্রশ্ন হবে না।
অর্থাৎ যতগুলো জিনিস শেখানো হচ্ছে অতীব জরুরি, কবরে কিন্তু এই কোনোটার ব্যাপারে কোনো প্রশ্ন হবে না। প্রশ্ন তো ওইসব ব্যাপারে হবে যেগুলো সাহাবেদের সময় ছিল, যেগুলো দীনের আসল লক্ষ্য। কিন্তু ওই লক্ষ্য পর্যন্ত একজন এই পথ ছাড়া এখন তার জন্য যাওয়া মুশকিল, সেই হিসেবে এখন এগুলো জরুরি হয়ে গেছে। এখনও যেমন আমাদের অনেকের জন্য তবলিগে সময় লাগানো ইত্যাদি ছাড়া ওর জন্য দীন পাওয়া মুশকিল। কিন্তু এটা কোনো ফিকহি হুকুম নয়, চিল্লা দিতে হবে, তিন চিল্লা দিতে হবে। এগুলো কোনোটাই, মাকামি কাজ করতে হবে, পাঁচ কাজ করতে হবে, আড়াই ঘণ্টা কোনোটাই ফিকহি হুকুম নয়, কিন্তু জরুরি।
তো এই কথা বোঝা, প্রয়োজনের জন্য যে, যে জিনিস আসল নয়, উপলক্ষ্য হিসেবে করে, যদি ওর জ্ঞান না থাকে, এটাকে আসল মনে করতে আরম্ভ করবে। আর যদি এটাকে আসল মনে করতে আরম্ভ করে, তার স্বাভাবিক পরিণতি হলো যে, আসল যেটা ওইটাকে বাদ দিয়ে দেবে, ওইটা তার দেমাগ থেকে বের হয়ে যাবে।
ফাজায়েলের নামাজের বাবের মধ্যে বোধ হয় এক জায়গায় আছে, হজরত মাওলানা জাকারিয়া সাহেব রহ. বলেছেন যে জাহিল সুফিদের মধ্যে ওজিফার তো খুব ইহতিমাম আছে কিন্তু সুন্নতের ইহতিমাম নেই। তো ওজিফা যতগুলো, এগুলো ফালতু নয়, তবলিগের উসুল যেমন ফালতু নয়, মাদরাসার সিলেবাস ফালতু নয়, তো তরিকার ওজিফাগুলোও ফালতু নয়। যে যুক্তি দিয়ে মাদরাসার তালিম পদ্ধতিকে গ্রহণ করা যেতে পারে, যে যুক্তি দিয়ে তবলিগের এই কাজের মেহনতের পদ্ধতিকে গ্রহণ করা যেতে পারে, ওই হুবহু একই যুক্তি দিয়ে এই ওজিফাগুলোকে গ্রহণ করা যেতে পারে।
শরিয়তের খেলাফ না হয় এইটুকু শর্ত, আর মানুষের জন্য যেন উপকারী হয়, প্রয়োজনীয় উপকারী হয়, শরিয়তের খেলাফ যেন না হয়। কিন্তু এই ওজিফাকেই যদি সে অধিক গুরুত্ব দিতে আরম্ভ করে তাহলে তার স্বাভাবিক পরিণতি যেটা হচ্ছে যে, তার দিল থেকে সুন্নতের গুরুত্ব বের হয়ে যাবে, আর হয়ে গেছেও।
বিদআতিরা অনেকেই অনেক ওজিফা করে, কিন্তু সুন্নতের ইহতিমাম নেই। আর ওই মাপ নষ্ট হয়ে গেছে, তো এটা সব ময়দানে হতে পারে। অনেক ছাত্র আছে পড়াশোনা খুব ভালো করে, পরীক্ষায় ভালো রেজাল্ট করে, মাদরাসার ছাত্রের কথা বলছি স্কুল-কলেজের না, কিন্তু সে দীনদার নয়। হতে পারে যে নামাজই পড়ে না বা ওইমাত্রার নাও যদি হয় তা খুব একটা দীনের দিকে তার ইহতিমাম নেই। কিন্তু পরীক্ষার রেজাল্টের খুব ইহতিমাম, ক্লাস ঠিকমতো করা, বই ঠিকমতো পড়া, পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নেওয়া—এগুলোর তার খুব গুরুত্ব আছে, দীনের গুরুত্ব কম। অথচ এগুলোকে দেওয়া হয়েছে দীনের জন্য। আর মূল দীনের যখন গুরুত্ব কমে গেল, তখন এইসব জিনিস একেবারে ফালতু হয়ে গেল, অর্থহীন।
তো মাকসাদ ছুটে গেলে, দীন ছুটে যাবে। আলিম হয়ে যাবে, দীন ছুটে যাবে। পীর হয়ে যাবে, দীন ছুটে যাবে। তবলিগের মুরব্বী হয়ে যাবে। অঞ্চলে তবলিগে খুব দৌড়াদৌড়ি করে, সেই হিসেবে অঞ্চলের মধ্যেও সে একজন বিশিষ্ট তবলিগি হিসেবে পরিচিত। অন্যদের চেয়ে তারা নিজামুদ্দিন মারকাজে বেশি যাতায়াত থাকায় তুলনামূলকভাবে অধিক পরিচিত। সবারই মনে করে যে, তবলিগের ময়দানে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। কিন্তু যদি দীনের গুরুত্ব না থাকে, আল্লাহর কাছে সে গুরুত্বপূর্ণ হবে না। ঠিক যেরকম একজন খুব মেধাবী ছাত্র খুব ভালো পড়াশোনা করে, ভালো তাফসির লিখল, হাদিস লিখল, আরও কত কিছু লিখল, তার পুরো দুনিয়াতে খ্যাতি হতে পারে, মুফতি হিসেবে মুহাদ্দিস হিসেবে পরিচিতি হতে পারে; কিন্তু আল্লাহর সাথে তার তাআল্লুক না হয় তো সে আল্লাহওয়ালা হবে না। সব ময়দানে এই জিনিসগুলো।
আর যখন হতে আরম্ভ করে, সতর্ক থাকা আগে থেকেই যে আমার মাকসাদ আসলে দীনদার হওয়া, আল্লাহওয়ালা হওয়া; তবলিগওয়ালা হওয়া উপলক্ষ্য, লক্ষ্য নয়। তো এর ভেতর দিয়ে ছাত্র যেরকম মাদরাসায় পড়ছে, তো মাদরাসায় পড়ছে দীন পাওয়ার জন্য, মাদরাসা যদি ছেড়ে দেয় তাও হবে না, ভেগাবন্ড (Vagabond) হবে, আর যদি মাদরাসার মধ্যে ডুবে যায় তাও হবে না। পীরের ওজিফা আদায় করছে, ওই একই কথা আল্লাহকে পাওয়ার জন্য ওজিফা আদায় না করেও তাও হবে না, আর ওজিফা আদায় করাকে যদি লক্ষ্য মনে করে তো সেটাও হবে না।
তো লক্ষ্য সামনে থাকা দরকার। আর প্রথম প্রথম তো এটা অসুবিধা থাকে না, কিন্তু পরবর্তী সময়ে এই অসুবিধা বাড়তে আরম্ভ করে। যেমন হজরত মাওলানা ইলিয়াস রহ., উনি যখন তবলিগের কাজ করতে আরম্ভ করলেন তখন এই কথা কাউকে বলে দেওয়ার প্রয়োজন ছিল না যে, তবলিগওয়ালা হওয়া লক্ষ্য নয়, দীনদার হওয়া লক্ষ্য। কেন প্রয়োজন ছিল না, তবলিগে সময় লাগালেই সে চোখের সামনে মাওলানা ইলিয়াসকে দেখছে। আর মাওলানা ইলিয়াস রহ. সব সংজ্ঞা, মাপ অনুযায়ী, উনি তবলিগি না। কেন তবলিগি না, কারণ উনি তিন চিল্লা দেননি চিল্লাও দেননি, মাকামি কাজও করতেন না, যেগুলো করতেন সেগুলো কোনো উসুলের মধ্যে পড়ে না।
উনি ছিলেন আল্লাহওয়ালা, যার ফলে যে-ই তার কথামতো তিন দিন বা তিন চিল্লাই লাগাক না কেন, দেখবে তো উনাকে, আর উনাকে দেখার কারণে মনের মধ্যে আল্লাহওয়ালা হওয়ার শওক জাগবে, তবলিগওয়ালা হওয়ার শওক জাগবে না।
প্রায় সমসাময়িক হজরত মাওলানা জাকারিয়া সাহেব রহ. ছিলেন প্রায় একই সাথে। উনি তো আরও না, মাওলানা ইলিয়াস রহ. যদি কিছু তবলিগওয়ালা হন, তো মাওলানা জাকারিয়া সাহেব একেবারেই না। কিন্তু দেখবে তাদেরকে, আর তবলিগই তাদেরকে দেখাবে, আর তারা আল্লাহওয়ালা, যার ফলে তাদেরকে আলাদা করে বলে দেওয়ার প্রয়োজন নেই যে, করছো তবলিগ, তোমার কিন্তু লক্ষ্য তবলিগওয়ালা নয়, আল্লাহওয়ালা হওয়া—এ কথা বলে দেওয়ার প্রয়োজন ছিল না।
কিন্তু এখন যাকে দেখবে সে আল্লাহওয়ালা নয়, বরং তবলিগের বাইরে তার কোনো পরিচিতি নেই। বড় একটা অংশ শহরের হোক, গ্রামের হোক, যে-কোনো জায়গায়; ও আলিমও নয়, কোনো পীরও নয়, কোনো মুত্তাকি পরহেজগার হিসেবে বা অন্য কোনোভাবে তার অন্য কোনো পরিচিতি নেই। তার একমাত্র পরিচিতি দীনের ব্যাপারে এটাই, সে তবলিগওয়ালা। তো যে নতুন একজন আসবে, সে আরেক তবলিগওয়ালাকে দেখবে। সে আল্লাহওয়ালাকে চোখের সামনে দেখছে না। আর না দেখার কারণে আল্লাহওয়ালা হওয়ার আগ্রহ স্বতঃস্ফূর্তভাবে তার মনের মধ্যে জাগবে না। তো এইজন্য এটা সচেতনভাবে বলা দরকার, আর নিজের মধ্যে খেয়াল রাখা দরকার, যাতে তার দিল শুদ্ধ থাকে।
আর আসরের মধ্যে দেখা যাবে যেমন, আল্লাহওয়ালা হওয়া দুই ভাগের মধ্যে থাকে, তো একটা জামাত এলো, গরিব-মিসকিন ফকির-মিসকিন ধরনের জামাত, এই ধরনের জামাতকে সে খুব কদর করবে। শিক্ষিত নয়, গ্রামের গরিব, কথা বলতে পারে না, ছেঁড়া জামা, ময়লা জামা, এই জামাতকে সে খুব খাতির করবে। যেরকম যদি একেবারে মুরব্বীদের জামাত, ভি.আই.পি. জামাত, ভি.ভি.আই.পি. জামাত ইত্যাদি আসে, তাহলে যেরকম খাতির করবে, তো এই জামাতকে সে কম খাতির করবে না। দুটোই দুই কারণে করবে, বড়লোকদের জামাতকে খাতির করবে যে এদেরকে প্রয়োজন নয়, অন্য কোনো কারণে নয় যে, খাতির না করলে এরা টিকবে না। আর এদেরকে খাতির করবে যে, এরা আল্লাহওয়ালা হিসেবে গড়বে। যার দিলের মধ্যে আল্লাহওয়ালা হওয়ার জজবা দুর্বল, আর তবলিগের মধ্যে খ্যাতি অর্জন করার জজবা প্রবল, ও ফকির-মিসকিনদের জামাত এলে দেখতেই যাবে না। আর বড়লোকদের জামাত বা মুরব্বীদের জামাত হলে ও একেবারে তার চব্বিশ ঘণ্টা, তার গাড়িঘোড়া নিয়ে তার পেছনে দৌড়াবে।
যদি আল্লাহর সন্তুষ্টির গুরুত্ব যথেষ্ট থাকত, তাহলে ফকির-মিসকিনদের ব্যাপারে সে কম আগ্রহী হতো না। বা অন্য জিনিস, যে দেখা যায় যে জামাত এসেছে, উল্লেখযোগ্য বড়লোকদের জামাত, তো খুব যত্ন করে ধুমধামসে খাওয়াচ্ছে-দাওয়াচ্ছে, টাকা খরচ করছে। ওর প্রতিবেশী ওর আত্মীয়কে কোনোদিন দাওয়াত করে খাওয়ায়নি, যেটা সরাসরি শরিয়তের হুকুম আছে। ওর ঘনিষ্ঠ আত্মীয় আছে, তাদেরও খোঁজখবর করে না, এমনকি অনেকক্ষেত্রে তার পাওনাদারদের পাওনা দেয় না। অনেকে আছে পাওনাদারদের পাওনা দেয় না আর মুরব্বীদের হাদিয়া দেয়, তো আল্লাহকে রাজি করার চিন্তা থাকত তাহলে পাওনাদারদের হক আগে আদায় করত। অথচ মুরব্বীদের খাতিরটাতির করছে, যেখানে জাহিরিভাবে দুনিয়াবি কিছু নেই, তাহলে কেন দিচ্ছে? তো মনে হচ্ছে দুনিয়া পাওয়ার কিছু নেই, কিন্তু পাওয়ার কিছু আছে, পরিচিতি। অথচ তবলিগে যে প্রথম সময় লাগাতে আসে, ও কোনো দুনিয়ার লোভে আসেনি। এসেছে দীনের জন্য, কিন্তু পরবর্তীকালে আস্তে আস্তে করে তার দিক-নির্দেশনার মধ্যে ভ্রান্তি আসছে। সব নতুন যারা আসে, নতুন নতুন লোক, তারা সবাই বাইরে যাই হোক, তবলিগের বাইরের কাজকর্মের মধ্যে যত উলটাপালটা হোক, তবলিগের ব্যাপারে সে মুখলিস থাকে।
কিন্তু তবলিগে থাকে আর অন্যান্য জিনিস হাসিল করার যে চিন্তাফিকির মনের মধ্যে ঢোকে, এটা সব পুরোনোদের। এদের নতুন সময় তা ছিল না, কারণ নতুন অবস্থায় সে এটা চিন্তাফিকির করেইনি, আর সে-সময় দুনিয়া পাওয়ার কোনো পথও তার কাছে ছিল না, পরবর্তী সময়ে এসেছে। তো এগুলো খুব চর্চা করা, যত মানে অতিরিক্ত কোনোটাই নয়, খেয়াল রাখা দরকার এই যে, তবলিগের কাজ তো করা জরুরি, কিন্তু আমার লক্ষ্য যেন হয় আল্লাহর হুকুমের উপর আসা। নিজের ব্যক্তিগত জীবনকে দীনদারির মধ্যে আনা, আমার একেবারে গভীর ব্যক্তিগত জীবন।
রাসূলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন যে, তোমাদের মধ্যে উত্তম সে-ই, যে তার স্ত্রীর কাছে উত্তম, আর আমি আমার স্ত্রীর কাছে ভালো। এই কথার অনেক অর্থ আছে, আর এটাও একটা বিশেষ অর্থ যে, তার স্ত্রী, এমন ধরনের, এত কাছের লোক, ওকে ঠকাতে পারবে না। বাকি বাইরের লোককে হাদিয়াটাদিয়া দিয়ে, ধুমধাম্পা দিয়ে চলে, ধাপ্পা দেওয়া যায়। কিন্তু স্ত্রী এমন কাছের যে ওকে ধোঁকা দেওয়া যায় না। ওর কাছে যদি নিজেকে দীনদার হিসেবে প্রমাণ করতে চায়, তো ঠিকই দীনদার হতে হবে। কারণ ও একেবারে কাছে থেকে মনের ভেতর অবস্থা পর্যন্ত জানে। তো সেই অর্থে স্ত্রীর কাছে ভালো হওয়ার একটা বিশেষ গুরুত্ব আছে, অর্থাৎ কাছের লোকের কাছে।
আমাদের দেশের রেওয়াজ ছিল আগে, এখনো কিছু কিছু আছে, বিয়েটিয়ে, যখন কোনো সম্পর্ক করতে চায়, তো খোঁজ নেয় যে ঘরটা কীরকম ইত্যাদি। তার একটা তরিকা হচ্ছে যে এ বাড়িতে ঘরে যারা কাজ করে, তাদের কাছ থেকে রিপোর্ট (Report) নেয়। তো বাইরে খুব ভদ্র লোক হিসেবে খ্যাতি আছে, এটা বেশি নির্ভরযোগ্য নয়; ঘরের ভেতরে যারা কাজ করে, এরা ভালো করে চেনে যে ওর আচরণ ইত্যাদি কীরকম।
তো আমার অভ্যন্তরে, আমার অধীন লোকের কাছে, বিশেষ করে দুর্বল লোকের কাছে, আমার একেবারে পরিবারের ভেতর আমি দীনদার কি না, ওখানে আমি দীনের মাপে টিকছি কি না, এটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাইরে দূরের লোককে মুগ্ধ করে দেওয়া খুব একটা কঠিন কাজ নয়; একটু চালাক-চতুর হলে ওইটা পারা যায়। তো সেইজন্য ঘুরে-ফিরে আমাদেরকে এটার উপর ফিকির রাখা যে, আমি করবো তো তবলিগের কাজ, এ ছাড়া কোনো বিকল্প নেই, কিন্তু আমার লক্ষ্য আল্লাহওয়ালা হওয়া। আর আল্লাহওয়ালা হওয়ার জন্যেই আমার ব্যক্তিগত জীবনকে পুরোপুরি শরিয়তের মধ্যে আনা, তবলিগের উসুলের উপর নয়। তবলিগের উসুল উপলক্ষ্য, শরিয়তের পাবন্দি লক্ষ্য।
তো উসুল তো জরুরিও, কিন্তু এটাকে ওই মাত্রার জরুরি না বানাই যে, শরিয়তের আহকামই তার কাছে কম জরুরি হয়ে যায়। এটা এরকমই যে, যে-কোনো মানুষ কোনো একটা দিকে, যদি সে তার ধ্যানকে লাগায়, তো অন্য দিক থেকে তার ধ্যান সরে যাবে। এক দিকে তাকায় অন্য দিকে দেখে না। একটার গুরুত্ব দেয়, অন্যটার গুরুত্ব কমে যাবে। তো সেইজন্য তার গুরুত্বের ব্যাপারেও তার ওজন শুদ্ধ রাখা। একেবারে যদি কোনো উসুল না মানে, তো দুনিয়ার কোনো কাজই উসুল ছাড়া হয় না। ব্যবসাবাণিজ্য, চাকরিবাকরি কোনো কাজই উসুল ছাড়া হবে না। কিন্তু উসুলকেই যদি লক্ষ্য বানায়, তো সেটাও ভালো নয়। জাহিরিভাবে শরিয়তের পাবন্দি লক্ষ্য, এটাও লক্ষ্য নয়; শরিয়তের পাবন্দির মাধ্যমে আল্লাহর সাথে তার সম্পর্ক কায়েম ওইটা লক্ষ্য। ওইটা কোনো মাপার জিনিস নয়, কিন্তু শরিয়তের পাবন্দি বিচার করা, নিজেকে শরিয়তের মধ্যে রাখা যত পারা যায়। তো আল্লাহ তায়ালা আমাদের তাওফিক নসিব করুক সেইজন্য আমরা নিজেদেরকে, এটা অন্যকে বলার জিনিস নয়, কিন্তু নিজেদের মধ্যে খুব চিন্তাফিকির করি যে, আল্লাহর দিকে মুতাওয়াজ্জেহ আছি কি না; আমার ব্যক্তিগত জীবন, ব্যক্তিগত আচরণ সুন্নতের উপর আসছে কি না; শরিয়তের পাবন্দির মধ্যে আসছে কি না। আমার ঘনিষ্ঠ লোক যারা বিশেষ করে দুর্বল লোক যারা, তাদের সাথে আমার আখলাক ঠিক কি না। দুর্বল যে, সবার সাথে আখলাক সবারই ঠিক থাকবে, ও তো ঠ্যাকায় পড়ে ঠিক আছে। কিন্তু দুর্বল যে ওর সাথে আখলাককে ঠিক রাখা। সেইজন্য দুর্বলের কদর করা, এটা আল্লাহওয়ালাদের আখলাকওয়ালাদের একটা বিশেষ পরিচয়, যার কোনো জায়গায় কোনো মূল্য নেই।
আবু বকর রা. খলিফা হওয়ার পরে প্রথম যে খুতবা দিয়েছিলেন, প্রথম খুতবার মধ্যে কয়েকটা কথার মধ্যে এই কথাও একটা ছিল যে, তোমাদের মধ্যে দুর্বল যে, আমার দৃষ্টিতে সেই বেশি সবল, এটাও একটি কথা ছিল। আর এটা আখলাকের একটা বুনিয়াদি উসুল, দুর্বলকে কদর করা। আল্লাহ আমাদের তাওফিক নসিব করুক।
২৭শে নভেম্বর ২০০৭, মঙ্গলবার, অস্ট্রেলিয়াপ্রবাসী মিনার ভাইয়ের জামাতের নুসরতে, চট্টগ্রাম ব্যাটারিগলি মাদরাসা মসজিদে এশা নামাজ বাদ মুযাকারা
[সমাপ্ত]
মন্তব্য (...)
এ সম্পর্কিত আরও প্রবন্ধ
ফ্রান্সে তাবলীগের কাজের সুচনা
৮ ই ফেব্রুয়ারি ২০১৫, বাদ ঈশা মোজাকারা, মানিকদি বাজার মসজিদ, ঢাকা আল্লাহ তাআলার বড় মেহেরবানি যে, আল...
প্রফেসর হযরত মুশফিক আহমদ রহ.
১৭ জানুয়ারী, ২০২৬
৩২৭৩
আদরের ভাইটিকে বলছি
( দাওয়াত ও তাবলীগের মেহনতের আলোকিত পরশে দ্বীন পাওয়া প্রতিটি কলেজ বা ভার্সিটির জেনারেল শিক্ষিত ছাত্র ...
মাওলানা ডাঃ মোহাম্মদ মাসীহ উল্লাহ
১০ নভেম্বর, ২০২৪
১২৩৬১
আল্লাহর ইচ্ছায় নিজের ইচ্ছা: পরিপূর্ণ বান্দা হওয়ার পথ
[প্রদত্ত বয়ান থেকে সংগৃহীত] স্থান: বারিধারা ডি.ও.এইচ.এস. সময়: মাগরিবের পর :১০/০৬/২০০৬ তারিখ أعُوْذ...
প্রফেসর হযরত মুশফিক আহমদ রহ.
১২ জানুয়ারী, ২০২৬
২৩১৫
দ্বীনের মেহনতের ফায়দা নাকি দুনিয়া শিকারের ধান্দা
একজনের অসুখ হয়েছে, আর কিছুদিন পরপর সে তার নিজের স্বাস্থ্যের অবস্থার দিকে তাকায়। শক্তি বাড়ছে কিনা,...
প্রফেসর হযরত মুশফিক আহমদ রহ.
২৩ জানুয়ারী, ২০২৬
৩৯৫১
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন