ইতাআত ও তার সীমারেখা
ইতাআত ও তার সীমারেখা
[আল্লাহ তাআলা প্রত্যেক জিনিস মেপে সৃষ্টি করেছেন এবং ভালো জিনিসেরও অতিরিক্ত ক্ষতিকর। মাপ নষ্ট হওয়ার কারণে আগের ধর্মগুলো বিকৃত হয়েছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইতাআত ও মহব্বত দীনের মৌলিক বিষয়, তবে এরও সীমা আছে। তাঁকে সিজদা করা যাবে না এবং তাঁর সামনে দাঁড়ানোও নিষিদ্ধ। সাহাবারা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সিদ্ধান্তের পরও মতামত দিতেন এবং তিনি মেনে নিতেন, যা আমাদের কাছে বেয়াদবি মনে হলেও সঠিক। সাহাবাদের কথাবার্তা ছিল সরল ও সাফ, কোনো মুনাফিকি ছিল না। আদব হলো দিল থেকে মহব্বতের বহিঃপ্রকাশ, কিন্তু তোষামোদ বা চাপলুসি হলো মুনাফিকি। বিদআতি পীরেরা সীমাহীন সম্মানকে কাজে লাগিয়ে মুরিদদের শোষণ করে এবং মুরিদরা "আমার পীরের ব্যাপার আলাদা" বলে সব গ্রহণ করে। মাওলানা থানভি রহঃ মুরিদকে লাথি মেরে সীমা শিখিয়েছেন এবং মাওলানা ইলিয়াস রহঃ ছোট মাওলানা ইনামুল হাসান রহঃ-এর সংশোধন গ্রহণ করেছেন। পীরকে মুরিদদের সাথে পরামর্শ করে চলতে হয় এবং শরিয়তের সীমার মধ্যে থাকতে হয়। এক আমীর মামুরদের আগুনে ঝাঁপ দিতে বললে তারা অমান্য করেছিল এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছিলেন মানলে জাহান্নামে যেত। মানার পাশাপাশি না মানাও শিখতে হবে—শরিয়তের সীমার মধ্যে আনুগত্য করতে হবে, নমশূদ্রদের মতো অন্ধ আনুগত্য নয়।]
৩রা মার্চ ২০১৫, বাদ এশা মোয়াক্কারা, বাসাবো কদমতলা মসজিদ, ঢাকা
ۣ وَخَلَقَ کُلَّ شَیۡءٍ فَقَدَّرَہٗ تَقۡدِیۡرًا
(সূরা ফুরকান: আয়াত ২)
আল্লাহ তাআলা প্রত্যেক জিনিসকে মেপেছেন। শুধু মেপেছেন তা নয়, ভাল করে মেপেছেন, মাপার মতো করে মেপেছেন। দুনিয়াতেও দেখা যায় যে, মাপ জিনিসটা বড় গুরুত্বপূর্ণ।
ঘি খুব ভাল জিনিস, কিন্তু অতিরিক্ত ঘি হয়ে গেলে খাবার নষ্ট হয়ে যাবে। ভাল জিনিস হলেই যে খুব বাড়ানো যায়, তা কিন্তু নয়। দীনের মধ্যে এই মাপ নষ্ট হয়ে যাবার কারণে আগের ধর্মগুলো নষ্ট হয়েছে।
আল্লাহ তাআলা ভাল আমল দিয়েছেন, কিন্তু আমলগুলোর মধ্যে সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছেন। নামাজ সবচেয়ে বড় আমল, কিন্তু প্রত্যেকদিনই কিছু সময় আছে, যে সময় নামাজ নিষিদ্ধ। এটা এই কারণে যে, মাপের যে মৌলিক নিয়ম আছে, ওইটা সম্বন্ধে বান্দা যেন জ্ঞান রাখে। নামাজ ভাল, তাই বলে যে যখন তখন পড়বে তা কিন্তু নয়। রোজা রমজানে ফরজ, অন্য সময় নফল, কিন্তু কয়েকদিন আবার হারাম। এটা সব আমলে প্রযোজ্য যে, তার একটা মাপ আছে। মাপ নষ্ট হয়ে গেলে দীন নষ্ট।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইতাআত— দীনের একটা মৌলিক জিনিস। আর সেই ইতাআতের সাথে মহব্বত আছে, আর মহব্বতের স্বাভাবিক একটা বহিঃপ্রকাশ হচ্ছে আদাব।
বাস্তবতা হচ্ছে, মানুষ যাকে ভালবাসে তাকে সম্মান করে। কিন্তু ওখানে সীমা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। এক হচ্ছে যে সিজদা করতে পারবে না। অন্যান্য ধর্মে এই সীমা লঙ্ঘন করা হয়েছে। ঈসা (আ.) কে খ্রিষ্টানরা গড-ই বানিয়ে দিয়েছে। তো রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সিজদা করা যাবে না। বরং এর চেয়ে আরও কঠোর। মজলিসে কেউ এলে আমাদের অভ্যাস আছে দাঁড়িয়ে যাই, এটাও শরিয়ান জায়েজ নয়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ক্ষেত্রেও জায়েজ নয়। এক মজলিসে গিয়েছিলেন আর তারা দাঁড়িয়েছিলেন, তো রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিষেধ করে দিয়েছেন। তো এই সম্মান করার ব্যাপারেও একটা সীমানা আছে যে, এর চেয়ে বেশি না।
তিনজন সাহাবী একবার নিজেদের মধ্যে ঠিক করলেন যে, তাঁরা একেকজন একেক আমল করবেন। নামাজ পড়তে থাকবে আর ঘুমাবে না, সারারাত নামাজ পড়বো। রোজা রাখবে আর খাবে না। আর, বিয়ে-শাদি করবে না। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শুনে বললেন,
"আমি নামাজও পড়ি আর ঘুমাই। আর রোজাও রাখি আর খাই। আর মেয়েলোককে বিবাহ করি। আর যে আমার সুন্নাত থেকে সরে যায় সে আমাদের মধ্যে নয়"।
তো কড়া নিষেধ করা হয়েছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনে বহু ঘটনা আছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোনো ব্যাপারে একটা সিদ্ধান্ত দিয়েছেন, আর সিদ্ধান্ত হয়ে যাবার পরে কেউ বলেছেন যে, এরকম না ওইরকম করুন, তো আল্লাহর রাসূল মেনে নিতেন। কথার গুরুত্ব অনেক সহজ হতো, যদি সিদ্ধান্তের আগে হতো। কিন্তু ফায়সালা করে ফেলেছেন আর ফায়সালা করার পরে এসে বলেছেন যে, এরকম না করে ওইরকম করলে ভাল হয়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মেনে নিতেন। বহুবার।
আমাদের কাছে এই অধিকাংশ জিনিসই, যেটা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি সাহাবীদের আচরণ ছিল, সেটা বেয়াদবি মনে হবে। ব্যক্তি বা আচরণের ব্যাপারেও ওইরকম। (এক সাহাবী) রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে খাবারের দাওয়াত করলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিজ্ঞাসা করলেন, "শুধু আমি, নাকি আয়েশাও?" "না, শুধু আপনি, একা"। "না, তাহলে যাবো না"। উনিও আর বললেন না। কথাবার্তা একেবারে সাফ। কোনো দুনম্বরি নাই। পরে আবার এসে দাওয়াত দিলেন। আবার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "আমি একা, নাকি আয়েশাও?" "না, আপনি একা"। "তাহলে আসবো না"। তো গেলেন না। তৃতীয়বার আবার দাওয়াত দিলেন। আবার ওই একই কথা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন। উনি বললেন, "না, শুধু আপনি একা"।
আমাদের মেজাজ হলো কাউকে দাওয়াত দিতে গেলাম, আর সে যদি বলে যে আয়েশাও থাকবে নাকি। আমরা হলে বলতাম, "আরে বলেন কি! উনি তো আসবেনই"। বের হয়ে পরে মনে করবে 'আরে কী ফ্যাসাদেই না পড়লাম'! আমাদের মেজাজের মধ্যে নিফাক ঢুকে আছে। অথচ সাহাবাদের সব কথা পরিষ্কার, সাফ।
আর আমরা যেটাকে আদব বলি, ওইটা আদবের চেয়ে বেশি তোষামোদ। তোষামোদ হচ্ছে মুনাফিকি জিনিস। আর আদব— ওইটা ঈমানি জিনিস। পার্থক্য হলো আদব ভিতর থেকে মহব্বতের বহিঃপ্রকাশ, কোনো নকল নেই, আর তোষামোদ হচ্ছে কাউকে পুশ করে অন্য কোনো কিছু উসূল করে নেওয়ার নাম।
তোষামোদে যদি ভাল কিছু বলা হয়, তবে সেটাও ভাল নয়। মুনাফিকরা এসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বললেন,
"মুনাফিকরা আপনার কাছে এসে বলে: আমরা সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আপনি নিশ্চয়ই আল্লাহর রাসূল। আল্লাহ জানেন যে, আপনি অবশ্যই আল্লাহর রাসূল এবং আল্লাহ সাক্ষ্য দিচ্ছেন যে, মুনাফিকরা অবশ্যই মিথ্যাবাদী"।
এখানে মিথ্যা হলো কেমন করে? তারা তো রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে রাসূলই বললেন। তাহলে মিথ্যা কেমন করে? মিথ্যা এই অর্থে যে, তারা মন থেকে বলেনি, মুনাফিকি। আমরা যেটাকে সাধারণত আদাব বলি, ওইটা আদাব নয়, ওইটা চাপলুসি। উর্দুতে চাপলুসি বলে। দীনের কারণে নয়, বরং তার পদের কারণে, তার পজিশনের কারণে, এক কথায় তেল লাগানো। আর আরবিতে শব্দ হচ্ছে 'মুদাহিন'। সুফিয়ান সওরি (رح) এর কথা, "যে সবার কাছে প্রিয়, বেশিরভাগ সম্ভাবনা সে মুদাহিন হবে"। মুদাহিন হলো তোষামোদকারী।
তো রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বদরের সময় এক জায়গা নির্ধারণ করলেন যে আমরা এখানে থাকবো। হুব্বাব ইবনে মুনজির (রা.) বললেন যে, এখানে থাকাতে অসুবিধা হবে, চলুন আমরা ওখানে যাই, পায়ের নিচে মাটি থাকবে, পানি পাওয়া যাবে ইত্যাদি। তো রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গ্রহণ করলেন। একটা ফায়সালা হয়ে যাবার পরে আবার অন্য কেউ গিয়ে এই যে কথা বলল, উনিও মনে করেননি যে এটা বেয়াদবি আর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উনাকে ধমক দেননি যে ফায়সালা হয়ে গেছে, আবার নতুন কথা কেন? বরং উনিও বললেন আর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গ্রহণ করলেন।
আবু হুরায়রা রাদিআল্লাহু আনহুকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পাঠালেন জুতা মোবারক দিয়ে, "যে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলেছে, তাকে জান্নাতের সুসংবাদ দাও"। উমর রাদিআল্লাহু আনহু উনাকে ধাক্কা দিলেন আর বাধা দিলেন। এসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞাসা করলেন আপনি পাঠিয়েছেন নাকি? কথা সাফ হলো যে উনিই পাঠিয়েছেন, কোনো সন্দেহ নাই। কিন্তু উমর রাদিআল্লাহু আনহু বললেন যে, এরকম বলবেন না, এতে মানুষ আমল করা ছেড়ে দিবে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা মেনে নিলেন।
সফরে খাবার নাই। কায়েস ইবনে সাদ ইবনে উবাদা রাদিআল্লাহু আনহু, উনি সফরের সাথীদের যে উট ছিল, সেই উট বাকিতে কিনে জবাই করে খাওয়াতেন। সাথে দাম নেই, কিন্তু মদিনায় গিয়ে দিয়ে দেবেন। উনার বাপও নামকরা দাতা ছিলেন, ছেলেও সেরকম। তো বাকিতে কিনে খাওয়াবেন। রওয়ানা হয়েছেন উটকে জবাই করার জন্য, উমর রাদিআল্লাহু আনহু দেখলেন আর বললেন, 'তুমি কোথায় যাচ্ছ'?
'উট জবাই করতে'।
'কেন'?
'লোকের খাবার নাই, তাদেরকে উট জবাই করে খাওয়াবো'।
'না, তা হবে না'।
'রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ইজাজত নিয়েছি'।
'না, চল'।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর অনুমতি নিয়ে এসে জবাই করতে যাচ্ছেন আর উমর রাদিআল্লাহু আনহু ধরেছেন যে, আবার চল। গিয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে গিয়ে বললেন, 'উট দিবেন না, উট খেয়ে ফেললে আমরা যাবো কেমন করে'? অথচ উনি অনুমতি দিয়ে দিয়েছেন, সেটা উমর রাদিআল্লাহু আনহু জানেন। তো সাহাবাদের মেজাজের মধ্যে একটা জিনিস ছিল যে দীনি বিষয়ে একটা কথা বলার পরেও নিজের মতামতকে পেশ করতেন।
এক সাহাবী নামাজে লোকমা দিয়েছেন। এক থা মনে করেননি যে, উনি আল্লাহর রাসূল, সেহেতু উনি ভুল করলেও ঠিক। তা নয়। উবাই ইবনে কাব রাদিআল্লাহু আনহু লোকমা দিয়েছেন। আল্লাহর রাসূল চার রাকাআত নামাজ দুই রাকাআত পড়ে শেষ করে দিয়েছেন। আমরা বয়ানের মধ্যে বলি যে, নামাজের মধ্যে কোনো ধ্যান নাই। একজন দোকানদার, সে বলল যে তিন রাকাআত হয়েছে। কেন, তিন রাকাআত হয়েছে কেন? বলল, 'আমার চার দোকানের হিসাব চার রাকাআতে শেষ করি, আর তিন দোকানের হিসাব শেষ হয়েছে, চার দোকান হয়নি'।
নামাজের মধ্যে রাকাআতের ভুল করা চূড়ান্ত গাফলতি। চূড়ান্ত গাফলতি। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রাকাআতের মধ্যে ভুল করলেন। শুধু ভুল নয়, চার রাকাআত দুই রাকাআতে শেষ করে দিলেন। তিন রাকাআত হলে একটা কথা ছিল। নামাজের শেষে যুল ইয়াদাইন (রা.) বললেন, 'ইয়া রাসূলুল্লাহ, নামাজের নিয়ম বদলে গেল নাকি আপনি ভুল করলেন'। নিয়ম তো বদলায়নি। তাহলে কী ভুল? আবু বকর সিদ্দীক (রা.) উনার সমর্থন করলেন আর বললেন যে, দুই রাকাআতে নামাজ শেষ করে দিয়েছেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মেনে নিলেন।
কিবলাতে ভুল, নামাজে ভুল— আল্লাহর নবীর এই ভুলগুলো হয় কেমন করে?
এই ভুলের ভিতর দিয়েও বড় একটা শিক্ষা আছে, সংশোধন কেমন করে করতে হয়, আর সংশোধনের প্রয়োজন সব জায়গায় আছে। আল্লাহর রাসূলের যদি সংশোধনের দরকার থাকে তাহলে বাদ থাকলো কে? আর যদি সংশোধনের মেজাজের মধ্যে উম্মত না থাকে, তাহলে ঐ উম্মত অশুদ্ধপথে ধ্বংস হবে।
মুয়াবিয়া (রা.), উনার খেলাফতের জমানায় জুমআ পড়ে ঘোষণা করলেন, 'গণিমতের মালও আমার, জমিও আমার'। গনিমত, যেটা আওয়ামের সম্পদ, আর উনি দাবি করছেন যে এইটা আমার। অথচ এটা শুদ্ধ না। কারণ এটা আওয়ামের। কেউ কিছু বলল না। দ্বিতীয় জুমআয় আবার এই এলান করলেন। কেউ কিছু বলল না। তৃতীয় জুমআয় আবার এলান করলেন, একজন আপত্তি করল। বলল এটা আপনার নয়, এটা আওয়ামের। উনাকে ডাকা হলো। উপস্থিত যারা ছিল তারা ভেবেছে যে, 'ও জিন্দা আর আসবে না। মুয়াবিয়া রাদিআল্লাহু আনহু তাকে ডেকে নিয়ে খুব শোকর আদায় করলেন, খুব কাঁদলেন আর বললেন তুমি আমাকে রক্ষা করলে। কেন? উনি বললেন, "রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন যে, আমার পরে একদল শাসক হইবে, যাদের অন্যায় কথার প্রতিবাদ করতে কেউ সাহস পাবে না, এমন শাসক এমনভাবে দোজখে প্রবিষ্ট হবে, যেমন ভাবে বানরের পাল একের পেছনে এক সারিবদ্ধভাবে একদিকে ধাবিত হয়। এক জুমআতে আমি বললাম, কেউ সংশোধন করল না। আমার তো ভয় হলো যাদের ব্যাপারে বলা হয়েছে যে, ধ্বংস হোক, আমি তাদের মধ্যে পড়লাম কিনা। দ্বিতীয় জুমআতে যখন আবার এলান করলাম, আবার কেউ আমাকে আপত্তি করল না, তখন আমি নিশ্চিতই হয়ে গেলাম। তৃতীয় জুমআতে যখন এলান করলাম, তখন তুমিই আপত্তি করলে। আল্লাহর ফজলে আমি আশা করি যে আমি এখনো জাহান্নামির মধ্যে হইনি"। উনি জেনে শুনে এলান করছেন। দেখতে চাচ্ছিলেন ঐ হাদিস অনুযায়ী যে, কেউ আপত্তি করে কিনা। আর যদি আপত্তি না করে, তাহলে হাদিস অনুযায়ী সে জাহান্নামি। জাহান্নামি মেজাজ হলো এই তোষামোদ করবে, সত্য হোক বা মিথ্যা, নিজের জানের ভয়ে হোক বা অন্য কোনো ভয়ে সে সেই কথা বলবে না। আর দীনের মেজাজ হলো এই যে, আল্লাহর রাসূলেরই যদি ভুল ধরে তাহলে আর বাকি থাকলো কে!
উমর (রা.) বিভিন্ন সময় বিভিন্ন আইন বানিয়েছেন, তারমধ্যে একাধিকবার উনি সংশোধন করেছেন। বিবাহের যে দেনমোহর থাকে, উনার সময় মানুষ বেশি বেশি দেনমোহর দিতে আরম্ভ করল। যেটা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জমানায় ছিল না। কিন্তু আস্তে আস্তে প্রতিযোগিতা বাড়লো। কিছু বড়লোকি দেখানো। উমর (রা.) নির্ধারণ করে দিলেন যে, দেনমোহর এত পরিমাণের বেশি হবে না। একটা পরিমাণ নির্ধারণ করে দিলেন। মদিনার এক মহিলা বলল, "হে উমর, তোমার কথা মানবো নাকি আল্লাহর কথা মানবো, আল্লাহ তাআলাই বলেছেন যে কিনতার পরিমাণ যদি দিয়ে থাক, তাও ফেরত নিও না। তার মানে কিনতার পরিমাণে দেওয়া যায়। আর তুমি বলছ, দেওয়া যাবে না"। উমর (রা.) শোকর আদায় করলেন আর বললেন, "তুমি আমাকে বাঁচিয়েছ"। আর এই কথাও বললেন, "দেখা যায় যে মদিনার মহিলারাও উমরের চেয়ে বেশি ইলম রাখে"।
এক হলো যে সাধারণ মানুষের মধ্যে এই মেজাজ থাকা দরকার যে, 'ভুল হতে পারে আর তার সংশোধন করা দরকার। অপরদিকে প্রধান যারা আছেন, তাদের এই মেজাজ থাকা দরকার' যে 'আমি ভুলের ঊর্ধ্বে না, আমিও জবাবদিহিতার মুখাপেক্ষী'। মাওলানা ইলিয়াস (رح) খুব তাগিদ এনেছেন এই কথাটায় 'আমি তোমাদের নিগরানির মুখাপেক্ষী'। হযরত উমর (রা.)-ও সাহাবাদের এই কথা খুব বলতেন, 'আমি তোমাদের নজরদারির মুখাপেক্ষী। নজর রাখবে যে কোথায় কোনো ভুল ত্রুটি হচ্ছে, সংশোধন করে দিবে'। উনি নিজে আবু বকর সিদ্দীক (রা.)-র খুব ভুল ধরতেন। আবু বকর সিদ্দীক (রা.)-র ভুল যদি উনিই ধরেন, তাহলে উনার ভুল ধরবে কে? আওয়ামকে বারবার প্রমাণ করেছেন যে, তোমরা নজর রাখবে। শয়তান মানুষকে তার বিভিন্ন ফাঁদের মধ্যে ফেলে, আর এইটাও একটা ফাঁদ যে নেতৃস্থানীয় যারা আছে, এদেরকে অধিক শ্রদ্ধার উপরে উঠায়। নাসারারা ঈসা আলাইহিস সালামকে এতই সম্মান, শ্রদ্ধা করতে আরম্ভ করলো যে করতে করতে একেবারে আল্লাহর পুত্রই বানিয়ে দিল! ঐ যে সীমা লঙ্ঘন করল।
পরবর্তীতে দুনিয়াতে, বিশেষ করে আমাদের দেশে বহুত বড় মুসিবত হচ্ছে বিদআত। আর বিদআতের মূল হচ্ছে ভণ্ড পীরকে মহব্বত। তার মধ্যে কিছু গুণ থাকে। কিন্তু এটাকে এমন সীমার ঊর্ধ্বে নিয়ে যায় যে, এর পরের ওর ব্যাপারের এত বেশি আস্থা, এত বেশি শ্রদ্ধা তৈরি হয় যে, 'উনার ভুল ধরা যাবে না'।
ধরা যাক, আমার পীর সাহেব। আমার অমুক পীর সাহেবের কাছে মহিলাও আসে, পুরুষও আসে। তো মহিলাদের প্রথম প্রথম মাথায় হাত দেয়। তারপর আস্তে আস্তে পিঠেও হাত দেয়। মুরিদ দেখেই। কখনো কখনো মুরিদের স্ত্রী, কখনো তার নিজের মেয়েও থাকে। কিন্তু আশেপাশে অন্যরা দোয়া পড়তে থাকে আর পীরও ভাবে দেখি কতদূর যাওয়া যায়! সুযোগ সন্ধানে সে নিজেই থাকে। আর শয়তান তাকে বুঝায় যে, 'হুজুর এইসব ব্যাপারে কত পাক, তুমি ধারণাই করতে পারবে না। নাউজুবিল্লাহ! নাউজুবিল্লাহ! তার দিল পাক, তোমার দিল নাপাক। সেজন্য তুমি খারাপ ধারণা করছ। নাউজুবিল্লাহ! নাউজুবিল্লাহ! তুমি তওবা কর'। এভাবে ধীরে ধীরে হয়।
আমি শুনেছি, নিজে কাউকে ওইরকম দেখিনি। রাজশাহী অঞ্চলে নাকি এখনো ওইরকম পীর আছে, যাদের বিশেষ বিশেষ কিছু মুরিদ তার বউকে, তার মেয়েকে পীরের কাছে রাতে পাঠায়। এটা হলো কেমন করে? শয়তান এই সম্মান, শ্রদ্ধাকে এত উপরে উঠিয়েছে যে, পীরদের ক্যাপিটালই ওইটা।
এই প্রসঙ্গে একটা ঘটনা মনে পড়ল। একবার একজন এক ঘটনা বলছিল যে মুরিদ তার পীরের কাছে গিয়ে বলল যে, আমি স্বপ্ন দেখলাম দুইটা পাত্র। এক পাত্রে মধু আর আরেক পাত্রে ময়লা। আমার হাত ময়লা পাত্রে আর আপনার হাত মধুর পাত্রে। পীর বলল যে, তোমার দিল নাপাক, তুমি যেহেতু দুনিয়ার মধ্যে, তাই ময়লা পাত্রে হাত। মুরিদ বলল, আমি এখনো শেষ করিনি। স্বপ্নে আরো দেখলাম, আপনার মধুমাখা হাত আমি চেটে খাচ্ছি আর আমার ময়লা মাখা হাত আপনি চেটে খাচ্ছেন। পীর তখন আর কী বলবে! বলল যে শয়তান তোমাকে ঐ স্বপ্ন দেখিয়েছে।
যে মুরিদ, ও তো দেখছে যে পীর জায়গা নিচ্ছে, হারাম খাচ্ছে, ধোকা দিচ্ছে। সবচেয়ে বড় কথা, ও নিজেই তো টাকা দিচ্ছে। ওর তো বোঝা উচিত যে পীর যদি হয় আল্লাহওয়ালা, তাহলে তো মালের মহব্বত থাকার কথা না। কিন্তু শয়তান ওকে বুঝিয়েছে যে, 'আমার পীরের ব্যাপার আলাদা'। ওইটার উপরেই দুনিয়ার সব বিদআতি। এই একটা কথাতেই সব নষ্ট। জানে যে আল্লাহ ছাড়া কাউকে সিজদা করা যাবে না, কিন্তু পীরকে সিজদা করে। একেবারে সিজদাই করে! ওকে যদি জিজ্ঞাসা করা হয় যে, 'সিজদা করা কি ঠিক'? ও বলবে, 'না'। 'তাহলে তুমি যে করলে'? তখন বলবে, 'ওইটা আলাদা'।
সম্মান, শ্রদ্ধা, ভালবাসা, আদাব সবকিছুর একটা মাপ আছে। মাপের বাইরে চলে যাবে, ওইটা আর দীন থাকবে না। অন্যান্য বেদীনিরা এইটাকেই বাড়াতে চায়, তাদের নিজেদের সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর জন্য। এরা চায় তাদের টাকা-পয়সা, সম্পদ ইত্যাদির ব্যাপারে যেন কেউ প্রশ্ন করতে না পারে তা নিশ্চিত করা। মুরিদের নামে মহিলাদের সাথে যা ইচ্ছা তারা যেন করতে পারে আর তাদের এই দোষ যেন কেউ না ধরে। এইজন্য বলা হয় যে, 'দিল থেকে শ্রদ্ধা কর, তোমার চোখের দেখা ভুল'। এই কথাগুলো যে বলছি, এগুলো বানানো কথা নয়। বাস্তবে এইসব কথা দিয়েই চালানো হয়। বছরের পর বছর চালানো হয়। আর কোনো সীমা নাই।
মহিলাদেরকে নিয়ে কতদূর পর্যন্ত যায়, ওইটার কোনো সীমা নাই। আরো না জানি কত কী আছে! অথচ এরা সব মেনে নেয়। সমর্থন করে। অন্য কায়দায় উদ্বুদ্ধ করে আর বলে যে, তোমার বউকে পাঠাও। বউকে পাঠাতে বলে আর এও বলে যে, তুমি কি খারাপ ধারণা করছো নাকি? তোমার দিল নাপাক, তাই তুমি খারাপ ধারণা করছ। বলে, সরাসরি এই ভাষায় হয়তো বলে না, কিন্তু ঘুরেফিরে এগুলোই বলে।
আল্লাহ তাআলা আমাদের দীন দিয়েছেন, ওইটা বড়ই সুন্দর। থানভি (رح) মসজিদের মধ্যে দশ টাকার নোট দিয়ে দুইটা পাঁচ টাকার নোট নিলেন। আমরা জানি মসজিদের ভিতর বিকিকিনি জায়েজ নয়। আর নোট ভাঙানো বিকিকিনির মাসআলার মধ্যেই পড়ে। কারণ, একটা দশ টাকার নোট দিয়ে দুইটা পাঁচ টাকার নোট কিনা হলো। (থানভি (رح) এর) মুরিদ উপস্থিত ছিল। মুরিদ বলে দিল যে বিকিকিনির মধ্যে মাসআলা। আমার দেশের মুরিদ হলে বলত 'বহুত সওয়াব হবে', বিকিকিনি ওইটাতো আলাদা জিনিস। অথচ এই ব্যাপারে পীর-মুরিদান শুদ্ধ হওয়া উচিত। আমাদের দেশের মেজাজ ভিন্ন। শুদ্ধ-অশুদ্ধ পার্থক্যই করতে পারে না, গোটা দেশের উল্লেখযোগ্য মানুষ বিদআতে লিপ্ত।
এক মুরিদ থানভি (رح) এর কাছে গিয়েছেন। উনি তখন শুয়ে ছিলেন। তো গিয়ে পা টিপতে আরম্ভ করেছেন। উনি বললেন পা টিপার দরকার নাই। তবুও টিপছে। উনি নিষেধ করেই যাচ্ছেন। আর উনি পা টিপছেন আর বলছেন 'আমার মন চায়'। আবার পা টিপছেন। পায়ের কাছেই মুরিদ ছিল, থানভি (رح) পা তুলে জোরেসে দিয়েছেন এক লাথি! মুরিদ আশ্চর্য হয়ে গেছে। পা টিপা আপাতত বন্ধ হয়ে গেছে। মুরিদকে কাছে ডাকলেন আর বললেন, "আমাকে জিজ্ঞাসা করলেনা যে কেন মারলাম?" মুরিদ বলল, "কেন?" উনি বললেন, "আমার মন চায়"। তো তরবিয়ত করেছেন আর যেভাবে করা দরকার সেইভাবে।
মাওলানা ইলিয়াস (রح) ট্রেনে যাচ্ছিলেন। থার্ড ক্লাসের টিকিট কিনে ভিড়ের কারণে বাধ্য হয়ে উঠেছেন সেকেন্ড ক্লাসে। টিটি এসেছে আর এসে বকাবকি করেছে। উনিও পাল্টা জবাব দিয়েছেন আর বললেন যে, টিকিটের অতিরিক্ত ভাড়া তো দেওয়াই হচ্ছে। খাদিম ছিলেন মাওলানা ইনামুল হাসান (رح), ছোট বাচ্চা। উনি হাদিস শুনিয়ে দিলেন।
'ইন্না লিসাহিবিল হাক্কি মাকালা'
'হক যার আছে, তার কথা বলার অধিকার আছে'
অর্থাৎ, টিটির কথা বলার অধিকার আছে, আপনার নাই। অত ব্যাখ্যা করেননি, শুধু এই কথা বলে তাই বুঝিয়েছেন। মাওলানা ইলিয়াস (رح) বুঝতে পারলেন আর পরের স্টেশনে গিয়ে টিটির কাছে মাফ চেয়ে নিলেন। কোথায় মাওলানা ইলিয়াস (رح) আর কোথায় মাওলানা ইনামুল হাসান (رح)! বয়সের কত পার্থক্য! কিন্তু বুঝতে পেরেছেন যে, এই জায়গায় মাওলানা ইলিয়াস (رح) এর কাজ অশুদ্ধ, তো ছোট হওয়া সত্ত্বেও সাথে সাথে সংশোধন করে দিয়েছেন। এমন না যে, এটা বেয়াদবি।
আমাদের সমঝ এত নিম্নমানের! রাজশাহীর একজন ডাক্তার, ও আমার পরিচিত, কাকরাইলে এসে বসেছেন। তো উনি, আব্দুল মুকিত সাব, ডাক্তার ইব্রাহিম সাব ছিলেন। অনেক আগের কথা। কী প্রসঙ্গে যেন কথা হচ্ছে। তো আব্দুল মুকিত সাব (رح) বললেন যে, 'মধুতে ডায়াবেটিস রোগীর ক্ষতি হয় না'। ডাক্তার ইব্রাহিম প্রচলিত চিকিৎসাশাস্ত্র অনুযায়ী বললেন যে 'ডায়াবেটিস রোগীর মধুতে ক্ষতি হয়'। আব্দুল মুকিত সাব (رح) বললেন, 'আপনি ইডিয়টের মতো কথা বলছেন'। রাজশাহীর যে ডাক্তার, ডাক্তার হওয়ার কারণে ডাক্তার ইব্রাহিম সাহেবের পরিচিতি, সমাজে তার মান-সম্মান ইত্যাদির ব্যাপারে ভাল করে জানেন। কথা ওখানেই শেষ হলো।
এর বেশ কিছুদিন পরে টঙ্গীতে ছাত্রদের ইজতেমা ছিল। আগে ছাত্রদের ইজতেমা হতো। তো সেই ছাত্র ইজতেমার সময় একজন বিশিষ্ট মেহমান আমার পাশেই ছিলেন। তো আমি সেই রাজশাহীর ডাক্তার, তাকে পুরাতন সাথী হিসেবে কিছু কথা, কথা মানে দীনি কথা বলার জন্য বললাম। তো উনি কথা প্রসঙ্গে বললেন যে, 'ডাক্তার ইব্রাহিম সাহেব আব্দুল মুকিত সাহেবের রুমে এসেছিলেন আর বললেন যে ডায়াবেটিসের রোগীদের ক্ষতি হয় মধু খেলে, তো আব্দুল মুকিত সাহেব বলেছিলেন যে, আপনি ইডিয়টের মতো কথা বলছেন। আল্লাহ তাআলা তাবলীগের জিম্মাদার হিসেবে, পুরানো জিম্মাদার হিসেবে আব্দুল মুকিত সাহেবকে কত মর্যাদা দিয়েছেন যে, ডাক্তার ইব্রাহিম সাহেবকে ইডিয়ট বলতে পারে'! আমি এই কথা শুনে 'থ' হয়ে গেলাম!
একজন মানুষ কত আহাম্মক হতে পারে যে চিন্তাসীমার বাইরে। আব্দুল মুকিত সাহেবকে আমি দোষ দিই না। এইজন্য দোষ দিইনা, যেহেতু ভুল মানুষের হতেই পারে। বেফাস কথা ভুল করে বের হয়ে যেতেই পারে।
আদবওয়ালা মানুষও চূড়ান্ত বেয়াদবি করে ফেলতে পারে। একজন সবার কাছে সম্মানি ব্যক্তি এসেছেন, উনার কাছেই এসেছেন, মেহমান হিসেবে মাথায় তুলে রাখা আখলাকের দাবি। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর আদেশ 'তোমার কাছে যখন কোনো সম্মানিত ব্যক্তি আসে, তখন তাকে সম্মান কর'। এইসব নিয়ম ভংগ করেছেন যখন এই কথা বলেছেন যে, 'আপনি ইডিয়টের মতো কথা বলছেন'। আবার বলছি যে, আব্দুল মুকিত সাহেবের দোষ দিই না। ভুল মানুষের হতেই পারে। দোষ হলো ঐ আহাম্মকের, যে এইটাকে গুণ মনে করছে। আমি অবাক হয়ে গেলাম যে, মানুষ কত আহাম্মক হতে পারে! যেখানে একজন মেহমান, সম্মানিত ব্যক্তি এসেছেন, তার সামনে অভদ্র, নিম্নমানের ভাষা ব্যবহার করে তাকে অপমান করছে আর সে বলছে, "মাশাআল্লাহ, মাশাআল্লাহ, আল্লাহ তাআলা উনাকে কত মর্তবা দিয়েছেন"!
এটা এইজন্য যে গোটা পরিবেশ এমন, গল্পদের প্রতি শয়তান আমাদের ভাল লাগার জন্য এমন সব কথা শিখিয়েছে যে, 'আমার মুরব্বী যা বলেন, আমার শাইখ যা করেন, আমার পীর যা করেন ওইটাই ঠিক। তা সে চোরই হোক, ডাকাতই হোক, বদ আখলাকই হোক, যেটাই হোক'। আর শয়তান এইভাবেই চালায়।
এইজন্য ভাই, মেহেরবানি করে আল্লাহ তাআলা আমাদের দীন দিয়েছেন, দীনের মধ্যে বড় জরুরি হলো, যেটা দুনিয়াবি কাজের মধ্যেও জরুরি যে, সীমানা বুঝি। দুনিয়ার কাজেও সীমানা যদি না খুঁজে, তাহলে দুনিয়ার কাজও করতে পারবে না। রান্নাতে ডিম ভাজল আর ওইটাতে খুব ঝাল। তো নষ্ট হয়ে গেল। প্রত্যেক জিনিসের তার সীমা আছে। দীনের মধ্যে বড় একটা অংশ হচ্ছে যে তার মহব্বতের, আদবের প্রতি বিশেষ লক্ষ্য রাখা। একটা ছোট বাচ্চাকে যদি অধিক আদর করা হয়, নষ্ট হয়ে যাবে। আবার একেবারেই না করা হয়, শুধু শাসনই করতে থাকি— তাও নষ্ট হয়ে যাবে। একটা মাপ আছে। শাসনও করতে হবে, স্নেহও করতে হবে। বড়দের ক্ষেত্রেও তাই। যে বড় তার সাথে ভালবাসা, আদব এগুলোও রক্ষা করতে হবে, তবে তার সীমানার মধ্যে।
পীরকে সংশোধন মুরিদরা করবে। পীরের তো আর পীর নাই। বয়স হয়ে গেছে, ইন্তেকাল করেছেন। একজন মুরিদ পীরের কথা শুনবে। কিন্তু পীর স্বাধীন নাকি? মোটেই না। পীরকে মুরিদদের সাথে পরামর্শ করে চলতে হয়। মাওলানা ইনামুল হাসান (رح) কে দেখেছি যে, নিজের চালচলন, কোনো ব্যাপারেই একেবারেই স্বাধীন ছিলেন না। পুরো পাবন্দ ছিলেন। কার পাবন্দ ছিলেন? সাথী যারা আছেন তাদের পাবন্দ ছিলেন। তারা যেভাবে বলে। তো সব জিনিসেরই নিয়ম আছে।
ইতাআত বা মুরব্বীদেরকে মানা, তাদেরকে সম্মান, শ্রদ্ধা করা, এগুলো যেন শরিয়তসম্মত হয়। নমশূদ্ররা যে রকম ব্রাহ্মণদেরকে মানে, ওইরকম নয়। মানলেই যদি জান্নাত পাওয়া যায়, তাহলে নমশূদ্ররা আগে জান্নাত পেত। ওরা যেরকম ব্রাহ্মণদেরকে মানে, দুনিয়ার ইতিহাসে এরকম মানা পাওয়া যায় না। কিন্তু ঐ মানা দিয়ে জাহান্নামেই যাবে।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক জামাত পাঠালেন। সেই জামাতের আমীর এক কুন্ডলি আগুন করে মামুরদের বললেন যে, আগুনে ঝাঁপ দাও। তারা কেউ মানল না। ফিরে এসে কারিগজারি শুনালেন।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন,
'ঐ আগুনে যদি তোমরা ঝাঁপ দিতে, তাহলে ওখান থেকে আর কোনো দিন বের হতে না'। অর্থাৎ এই আগুন তাঁদের জাহান্নামের আগুনই হতো। উনাদেরকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আগে থেকেই সাবধান করে দেননি। এরকম যদি হতো যে, জামাআত পাঠানোর আগে মামুরদের আগেই বলে দিয়েছেন যে, এই আমীর কিন্তু একটু পাগলা। কিন্তু কোনো ধরনের সাবধান করেননি। আমীর আমীরই। আমীরের ব্যাপারে, মানার ব্যাপারে, ইতাআতের ব্যাপারে যত কথা আছে, সব এই আমীরের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। কিন্তু ঐ মামুরদের আমীরকে মানার ব্যাপারে সীমানা কী, এইটা দেখানোর জন্য আল্লাহ তাআলা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দিয়ে এটা করালেন। আমরা যদি সাধারণ মানুষ হতাম, তাহলে হয়তো বুঝতাম যে আমীর নির্বাচনই ভুল হয়েছে। বলতাম, এই আমীরকে আমীর বানানোই ঠিক হয়নি। কিন্তু এই নির্বাচন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামই করেছেন। আল্লাহ তাআলা এই ঘটনার মাধ্যমে এই উম্মতকে জানাতে চান যে, যে রকম মানা শিখতে হবে, তেমনি না মানাও শিখতে হবে।
মাওলানা সাঈদ আহমদ খান সাহেব এই মিসাল দিতেন, আর তারপর এই কথা বলতেন যে, 'মাশাআল্লাহ, তোমাদের দেশের লোক বহুত মানলেওয়ালা'। 'বহুত মানলেওয়ালা' বলার সময় লম্বা টান দিয়ে, খোঁচা দিয়ে বলতেন। আর মিসাল দিয়েছিলেন, শীতের রাতে এক আমীর মামুরকে বলেছিলেন যে পুকুরের মধ্যে ডুবে থাক, তো ঠিকই সারারাত্রি ডুবে ছিলেন। এই কথা বলে বলতেন, 'বহুত মানলেওয়ালা'। অথচ উচিত ছিল অমান্য করা। অমান্য করারও হুকুম আছে। তো ওইটা দেখানোর জন্য আল্লাহ তাআলা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দিয়ে এই ঘটনা ঘটালেন। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে তৌফিক নসিব করুন।
দীন যেন দীন হিসেবে, সীমানা বুঝে মানতে পারি। নামাজ যত বড় আমলই হোক না কেন, কিছু কিছু সময় আছে যখন নামাজ পড়া যাবে না। কিছু কিছু দিন আছে রোজা রাখা যাবে না। তো আমলের ব্যাপারেও ওইরকম, মানার ব্যাপারেও ওইরকম। এইজন্য মেহনত করে নিজেকে হুশিয়ার বানাই।
[সমাপ্ত]
মন্তব্য (...)
এ সম্পর্কিত আরও প্রবন্ধ
প্রত্যাশা-হিসাব ও তাওয়াক্কুল-বরকত
"যে আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্য পথ বের করে দেন এবং তাকে এমন উৎস থেকে রিজিক দেন যা সে কল্পনাও ক...
প্রফেসর হযরত মুশফিক আহমদ রহ.
১৭ জানুয়ারী, ২০২৬
৩৮৮২
নিভৃতচারী আল্লাহওয়ালাদের খোঁজে
হজরতের গড়া ছোট্ট, অথচ সুন্দর মাদ্রাসা। মাদ্রাসা থেকে এক ছাত্রকে রাহবার হিসেবে সাথে নিয়ে যখন হজরতের ব...
মাওলানা ডাঃ মোহাম্মদ মাসীহ উল্লাহ
১০ নভেম্বর, ২০২৪
১১৪৯৫
দ্বীনের মূল লক্ষ্য: মাহবুবিয়্যাত অর্জন
আল্লাহ তাআলা রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে যখন পাঠালেন পুরো দুনিয়ার হেদায়েতের জন্...
প্রফেসর হযরত মুশফিক আহমদ রহ.
১৫ জানুয়ারী, ২০২৬
৪০৮১
অনলাইন দাওয়াহ
অনলাইনে দাওয়াহর মূল উদ্দেশ্য কী? মূল টার্গেট অডিয়েন্স কারা? লেখালেখিসহ অন্যান্য কন্টেন্টের কোন উদ্...
আসিফ আদনান
১০ নভেম্বর, ২০২৪
১৬০৭৩
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন