বিলাসিতামুক্ত জীবন ও দীনের দায়িত্ব
বিলাসিতামুক্ত জীবন ও দীনের দায়িত্ব
[আল্লাহ তাআলা আরব জাতিকে দীনের দায়িত্বের জন্য বহু আগে থেকেই বিলাসিতা থেকে দূরে রেখে প্রস্তুত করেছেন। বিলাসিতা সরাসরি হারাম না হলেও এর পরিণতি অত্যন্ত ক্ষতিকর এবং জাতিকে ধ্বংস করে দেয়। কুরআনে বলা হয়েছে, আল্লাহ যখন কোনো জনপদ ধ্বংস করতে চান, তখন সেখানে বিলাসীদের প্রাধান্য দেন এবং তারা নাফরমানি করে। বিলাসিতা মানুষকে বিদ্রোহী ও অহংকারী করে, যার ফলে সে আল্লাহর আদেশ অমান্য করে। আল্লাহ ইব্রাহিম আলাইহিস সালামকে বিলাসী শাম থেকে মরুভূমি মক্কায় পাঠান এবং জুরহুম যাযাবর কবিলার সাথে সম্পর্ক স্থাপন করেন। যাযাবরদের মেজাজ ছিল সম্পদ জমানোর পরিবর্তে সম্পদ কমানোর, যা তাদের বিলাসিতা থেকে দূরে রাখে। আরবরা রোমান ও শামীয় বিলাসী সমাজে ব্যবসা করতে গেলেও অহংকারবশত তাদের কাছ থেকে কিছু শিখত না, ফলে বিলাসিতার প্রভাব থেকে রক্ষা পায়। আরবদের কাছে মান-সম্মান সম্পদ দিয়ে নির্ধারিত হতো না; বনু হাশিম গরিব হলেও সবচেয়ে সম্মানিত ছিল। তারা হাজিদের সেবায় সম্পদ ব্যয় করে দরিদ্র হয়েছিল, কিন্তু সম্মান কমেনি। আরবরা রান্নাবান্না, খাওয়া-দাওয়ার বিলাসিতা জানত না এবং তাদের শক্তিশালী শরীর ও মনোবল ছিল। লোভ বা ভয়ে তাদের নিয়ন্ত্রণ করা যেত না, ফলে তারা কালেমার জন্য জান দিতে প্রস্তুত ছিল। আল্লাহ এমন বিলাসিতামুক্ত জাতিকেই দীনের দায়িত্ব দিয়েছন]
১৮ মে, দারুল মাআরিফ মাদ্রাসা, চট্টগ্রাম।
তালিমের পর মুজাকারা।
اَلحَمْدُ للهِ نَسْتَعِيْنُهُ وَنَعُوْ
ذُ بِاللهِ مِنْ شُرُوْرِ أَنْفُسِنَا وَمِنْ سَيِّئَاتِ أَعْمَالِنَا، مَن يَّهْدِهِ اللهُ فَلَا مُضِلَّ لَهُ وَمَنْ يُّضْلِلْهُ فَلَا هَادِيَ لَهُ. وَأَشْهَدُ أَنْ لَا إلهَ إلَّا الله وَأَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُوْلُهُ.
فَأَعُوْذُ بِاللهِ مِنَ الشَّيْطَان الرَّجِيْمِ، بِسْمِ اللهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيْم.
اَللهُ يَعْلَمُ حيْثُ يَجْعَلُ رِسَالَتَهُ.
أمَّا بَعْدُ.
اَللهُ يَعْلَمُ حيْثُ يَجْعَلُ رِسَالَتَهُ
'আল্লাহ তাআলা ভালো জানেন তার রিসালাত কোথায় দিবেন।'
আরব জাতির আইয়্যামে জাহেলিয়্যাতের ইতিহাস, তাদের খারাপ আচরণ ইত্যাদি নানান ধরনের নেতিবাচক মনোভাব থাকার কারণে অনেক সময় মনের মধ্যে প্রশ্ন জাগে, আল্লাহ তাআলা এদেরকে কেন নির্বাচন করলেন! মূলত আল্লাহ তাআলার কোনো ভুল করে নয় যে, বাইচান্স তাদের মধ্যে গিয়ে পড়ে গিয়েছে; বরং আল্লাহ তাআলা ভালো করে জেনে বুঝে তাদেরকে নির্বাচন করেছেন আর তারাই উপযুক্ত।
হাদিস শরিফে আছে, আলমে আরওয়াহে আল্লাহ তাআলা রুহগুলোকে দেখেছেন আর রাসূল সা.-এর সঙ্গী হওয়ার জন্য আলমে আরওয়াহে-ই তাদেরকে নির্বাচন করেছিলেন অর্থাৎ, তারা নির্বাচিত।
আইয়্যামে জাহেলিয়্যাতে যারা নির্বাচিত, তারা কিসের উপর নির্বাচিত?
মূলত আল্লাহ তাআলা তাদেরকে এই দাওয়াতের কাজের জন্য, দীনের কাজের জন্য প্রস্তুত করেছেন বহু আগে থেকেই। আর সেই প্রস্তুতির বিভিন্ন অংশের মধ্যে একটি অংশ এটিও ছিল যে, তাদেরকে বিলাসী মেজাজ থেকে দূরে রাখা।
বিলাসিতা এমন ধরনের জিনিস যা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সরাসরি নিজে হারাম নয়। বিলাসিতাকে কোনো হারামের মাসআলার মধ্যে ফেলানো মুশকিল; কিন্তু তার পরিণতি হারামের চেয়েও বেশি ক্ষতিকারক। অনেকগুলো জিনিস নিজে হারাম নয়, অর্থাৎ অতিবেশি ক্ষতিকর নয়; কিন্তু তার পরিণতি খুবই বেশি ক্ষতিকর। বিলাসিতা তার মধ্যে একটি। একেবারে ধ্বংস করে দিবে। ইরশাদ হয়েছে:
وَإِذَا أَرَدْنَا أَنْ نُهْلِكَ قَرْيَةً أَمَرْنَا مُتْرَفِيهَا فَفَسَقُوا فِيهَا فَحَقَّ عَلَيْهَا الْقَوْلُ فَدَمَّرْنَاهَا تَدْمِيرًا
'আমি যখন কোনো জনপদকে ধ্বংস করার সিদ্ধান্ত নেই, তখন তাদের বিলাসীদেরকে আদেশ প্রধান করি আর তারা অমান্য করে থাকে। আর তাদের এই অমান্যের কারণে আমি তাদেরকে ধ্বংস করি ধ্বংসের মতো।'
যদিও আল্লাহ তাআলা বলেছেন আর তারা অমান্য করে—এমনটি নয়; বরং এই বৈশিষ্ট্যের উপর তাদের ধ্বংস করা হয়। আসল অর্থ হলো এটাই।
সে বৈশিষ্ট্যগুলো কী? তাদের মধ্যে বিলাসীদেরকে আদেশ দেই আর তারা নাফরমানি করে। বিলাসিতা মানুষকে নাফরমানিতে উদ্বুদ্ধ করে, বিদ্রোহ করায়। কার সাথে বিদ্রোহ করায়?
وَلَوْ بَسَطَ اللَّهُ الرِّزْقَ لِعِبَادِهِ لَبَغَوْا فِي الْأَرْضِ وَلَكِنْ يُنَزِّلُ بِقَدَرٍ مَا يَشَاءُ.
'বান্দার জন্য আল্লাহ তাআলা যদি রিজিক প্রশস্ত করে দিতেন তাহলে তারা পৃথিবীতে বিদ্রোহ করত, তাই আল্লাহ তাআলা মেপে মেপে দেন যাতে তারা বিদ্রোহী না হয়ে যায়।'
তো প্রাচুর্য মানুষের মধ্যে বিদ্রোহ আনে। বিদ্রোহীর মেজাজ হয়ে থাকে অহংকারী। আর তখন সে অহংকারের কারণেই অমান্য করে। অন্যের কথা মানাই তার কাছে খারাপ লাগে, চাই তা শুদ্ধ হোক বা অশুদ্ধ হোক। বিলাসিতা, অহংকার, প্রাচুর্য—এগুলো খুব কাছাকাছি বিষয়। অন্যভাবে ইরশাদ হয়েছে:
وَإِذَا أَرَدْنَا أَنْ نُهْلِكَ قَرْيَةً أَمَّرْنَا مُتْرَفِيهَا فَفَسَقُوا فِيهَا فَحَقَّ عَلَيْهَا الْقَوْلُ فَدَمَّرْنَاهَا تَدْمِيرًا
'আমি যখন কোনো জনপদকে ধ্বংস করতে চাই, তখন তাদের মাঝে বিলাসিতাকে ব্যাপক করে দেই, বাড়িয়ে দেই। আর তখন তাদেরকে ধ্বংস করি ধ্বংসের মতো।'
[সূরা ইসরা: ১৬]
أَمَّرْنَا মিমের উপর তাশদিদ দিয়ে। আর অন্য আরেক জায়গায় আছে:
وَإِذَا أَرَدْنَا أَنْ نُهْلِكَ قَرْيَةً آمَرْنَا مُتْرَفِيهَا فَفَسَقُوا فِيهَا فَحَقَّ عَلَيْهَا الْقَوْلُ فَدَمَّرْنَاهَا تَدْمِيرًا
'আমি যখন কোনো জনপদকে ধ্বংস করতে চাই, তখন তাদের মাঝে বিলাসীদেরকে প্রাধান্য দেই আর তারা আমীর হয়ে যায়। (মানুষ তাদেরকে অনুসরণ করে থাকে) আর তখন তাদেরকে ধ্বংস করি ধ্বংসের মতো।'
[সূরা ইসরা: ১৬]
এর মোকাবেলায় একেবারে এর বিপরীত জীবন হচ্ছে একেবারে খুব সহজ-সরল জীবন। যেখানে তার বিলাসিতা তো দূরে থাকুক, তার প্রয়োজনই ভালো করে মিটে না। বিলাসিতার অর্থ হচ্ছে, প্রাচুর্য আর বসতি। দুটোর মধ্যে কোনো একটি যদি না থাকে তাহলে তাকে বিলাসিতা বলে চলে না। সম্পদ আছে প্রচুর, কিন্তু তারা স্থির থাকে না। চলাফেরা করে স্থান বদল করে চলেছে; আজ এখানে, কাল ওখানে—এটা বিলাসিতা নয়। আর স্থির আছে; কিন্তু সম্পদ নেই, এরাও বিলাসী নয়। বিলাসী হয় তখন যখন স্থির এবং সম্পদশালী হয়ে থাকে। আর এ জন্য সবসময় উত্তম জায়গা হচ্ছে উর্বর জমি। উর্বর জমিতে যখন কেউ বসতি গড়ে, তখন সম্পদও পায় আর ওখানে স্থিরও হয়। আর স্থিরভাবে বসতি গড়ে আর ধীরে ধীরে নানান ধরনের সম্পদ সংগ্রহ, সম্পদ জমানো, সম্পদমুখী জীবন, আরাম-আয়েশের নানান উপাদানে নিমগ্ন হয়ে যাওয়া। আর যখন বিলাসী হবে তখন নেতৃত্ব ধীরে ধীরে পুরুষ থেকে মহিলাদের হাতে চলে যাবে। কারণ সম্পদের যত্ন মহিলা করে থাকে। পুরুষ উপার্জন করে কিন্তু সম্পদের যত্ন মহিলারা করে। আর যে যত্ন করে, তার নিজেরই ততবেশি গুরুত্ব বাড়ে।
অনেক কোম্পানিতে ডিরেক্টরের অফিসটি সাদাসিধে হয়ে থাকে। যদিও অনেক বড় কোম্পানি; কিন্তু আলিশান জিনিসপত্র ও কার্পেট ইত্যাদি নেই। কেউ জিজ্ঞাসা করলো যে, এখানে দামি কার্পেট নেই কেন? উত্তর এলো, বেশি দামি কার্পেট রাখলে অফিসে যিনি বসেন, তিনিও নিজেকে দামি মনে করতে আরম্ভ করেন।
নেবো দুটি বাড়ি... দুজন দারোয়ান। এক দারোয়ান একটি ভাঙা বাড়ির দারোয়ান অপরদিকে অন্যজন একটি বিশাল আলিশান ভবনের দারোয়ান। দুই দারোয়ান যদিও দুই বাড়ির দারোয়ান আর দুজনের বেতনও সমান; কিন্তু যে ভাঙা বাড়ির দারোয়ান, সে কথা বলার সময় একটু নরম স্বরে কথা বলে। আর যে বিশাল বাড়ির দারোয়ান, তার বেতন অন্যজনের সমান হওয়া সত্ত্বেও পেছনে বিরাট বাড়ি থাকার কারণে ওর হাবভাব-ই আলাদা। তো গরিব দারোয়ানের স্ত্রী, সে নরম-শরম থাকে। মানুষ যতবেশি ধনাঢ্যশালী হবে, তার বেগম সাহেবের ততবেশি দাপট বাড়তে থাকে। আর সে যতবেশি সম্পদের কাছে হবে, ততবেশি তার দাপট হবে। সম্পদ থেকে যতবেশি দূরে যাবে, তার দাপট ততবেশি কমতে থাকবে। আর মানুষ সফরে থাকলে নরম হয়ে যায়। সফরে যখন যায় তখন হিম্মত-সাহসের দরকার হয়, আর মহিলারা তখন পুরুষ মানুষের অধীনে চলে। তো বিলাসী এবং এক স্থানে স্থির কওম, যখন কোনো উর্বর জায়গাতে বসবাস করে, তখন তারা বিলাসী হয়ে যায় এবং এক জায়গায় স্থির হয়ে প্রাচুর্য জমা করতে থাকে।
প্রাচুর্য দুটোই বানায়, বিলাসীও বানায়, স্থিরও বানায়। আর এভাবে তাদেরকে নারীর অধীনে আনে। কওমে সাবা বড় উর্বর দেশের কওম ছিল। খুব ফসল হতো। তারা বিলাসীও ছিল এবং তারা রানী বিলকিসের অধীনে ছিল, কোনো রাজার অধীনে নয়। সব সভ্যতাগুলো মানুষের মাঝে বিলাসিতা বাড়ায় বা বিলাসিতা বাড়ারই নাম সভ্যতা। সভ্যতার মানে হচ্ছে জীবন যাত্রার মান নির্ণয় করা। উন্নত মানের জীবন... নিম্নমানের জীবন... স্ট্যান্ডার্ড অব লিভিং বলে: হাই স্ট্যান্ডার্ড... লো স্ট্যান্ডার্ড... ইত্যাদি। এগুলোর মানদণ্ড কী? কী দিয়ে মাপে? এগুলা মাপে বিলাসিতা দিয়ে। যেমন চিনির পরিমাণ... সমাজে চিনি কতটুকু খাওয়া হয়? এটি দিয়েও অনেকটা বিলাসিতা মাপা যাবে। জন প্রতি লবণ কতটুকু খায়—এটা দিয়ে বিলাসিতা মাপা যাবে না। কারণ, লবণ প্রয়োজনীয় জিনিস, ধনীও খায়, গরিবও খায়। বিলাসী যারা তারাও খায়, যারা বিলাসী না তারাও খায়। বরং এর বিপরীত। যারা শ্রমিক, তারা বেশি লবণ খায়। ঘাম বেশি বের হয়, এর মাধ্যমে লবণ বেশি বের হয়ে যায়, তাই লবণ খায়ও বেশি। আর যারা বসে থাকে, তারা লবণ কম খায়। এইজন্য বেশি লবণ খাওয়া, এটি বিলাসিতা তো নয়ই, মান-সম্মানের বিষয়ও নয়; বরং এটি বেইজ্জতির বিষয়, চাষাভুষার ব্যাপার।
আমার পরিচিত এক ছেলে... ওর ভাই ইংল্যান্ডের ডাক্তার। ও বিয়ে করেছে তুলনামূলক গ্রামে, কিন্তু এক বড় লোকের মেয়েকে। তো সে লবণ বেশি খায়। তো তার এই লবণ বেশি খাওয়ার কারণে ওর স্বামী ওকে তালাক-ই দিয়ে দিয়েছে যে, 'চাষার মতো লবণ খায়।' সেটা দিয়ে সমাজের জীবন-যাত্রার মান মাপা যাবে না; কিন্তু চিনি দিয়ে মাপা যাবে। এমনিভাবে মাপা যাবে যেগুলো অতিরিক্ত নিঃস্প্রয়োজন, যেমন চিনি, চা, কফি, বিছানা, কার্পেট ইত্যাদি জিনিস দিয়ে। একটি কওম যতবেশি বিলাসিতার মধ্যে যাবে, নিস্প্রয়োজনীয় জিনিসের মূল্য তত বাড়বে, আর সে অনুপাতে স্বাভাবিকভাবে প্রয়োজনীয় জিনিসের মূল্য কমবে।
কিছুটা এমন যে, প্রয়োজনীয় জিনিস সে ব্যবহারই করবে না। যেমন যদি কৃষক হয়, তবে পরিশ্রম অতিরিক্ত করার কারণে লবণ বেশি খেয়ে থাকে, কিন্তু এই বিলাসিরা চিনি বেশি খাবে, লবণ কম খাবে। এইজন্য লবণের দাম হয়তো কমেই যেতে পারে। আর চিনির দাম বাড়তে থাকবে। আর যতবেশি বিলাসী হবে, ধীরে ধীরে তার সর্বপ্রবণতায় হবে নারীসুলভ আচরণ।
আরবে দৈহিক শক্তি আর জোর গলায় কথা বলা খুবই সম্মান ও কদরের ছিল। একবার এক গোত্রের প্রতিনিধি রাসূল সা.-এর সাথে সাক্ষাতের জন্য এলো। সম্ভবত বনু নাজরানের। তো বনু নাজরানের প্রতিনিধি তাদের গোত্র সম্বন্ধে কিছু কথা বললো। রাসূল সা. প্রতি উত্তরের জন্য এক সাহাবীকে বললেন। অতঃপর ওই সাহাবী উত্তর দিলেন। বনু নাজরানের প্রতিনিধি যখন কথা বলেছিল তো খুব জোর গলায় বাহাদুরের মতো বক্তব্য পেশ করেছিল তাদের কওমের ইতিহাস, বাহাদুরি আর ঐতিহ্য। এর প্রত্যুত্তরে সাহাবী যখন বললেন, তো তিনি ওই প্রতিনিধির চেয়ে জোরালো কণ্ঠে উত্তর দিলেন। যখন মজলিস সমাপ্ত হলো, তখন বনু নাজরান এ কথা স্বীকার করলো যে, ওর কণ্ঠ আমাদের চেয়ে ভালো। এর মোকাবেলায় সমাজ যত সভ্য হবে, পুরুষের কণ্ঠস্বর তত নিম্ন হবে আর ধীরে ধীরে মহিলাদের কণ্ঠস্বর তত উঁচু হবে। তো চলতে-ফিরতে সাদাসিধা কওমের মধ্যে মহিলাদের কণ্ঠ বেশি শোনা যায়। আর সমাজের যতবেশি উচ্চ স্তরে যাওয়া হয়, সেখানে পুরুষের কণ্ঠস্বর ততবেশি শোনা যায় না, যতবেশি মহিলাদের কণ্ঠস্বর শোনা যায়। আর তার দাপটও বাড়তে থাকে। আর এভাবে সবকিছু পরিবর্তন হয়ে যায়।
জামে আযহার যখন আরম্ভ হলো, তখনকার কায়রো আর বর্তমান কায়রোর মধ্যে অনেক পার্থক্য। এখনকার কায়রো হলো বিলাসী শহর। যেটা ছিল জামে আল আযহার, ধীরে ধীরে সেটা হয়ে গেল জামিয়াতুল আযহারিয়্যাহ। গোটা জাতি নারীসুলভ হয়ে গেল।
এরপর আর ওরা নাড়াচড়া করতে পারে না। মহিলাদের মতো ওরা পর্দার মধ্যে থাকে। জামা-কাপড় নিয়েই ব্যস্ত থাকে। প্রসিদ্ধ ওই কথার মতো হয়ে গেল যে, 'মোগল সম্রাট পালাতে পারলো না; কারণ জুতা পরানোর মতো খাদেম ছিল না।' কায়রোর উপরও এরকম ট্যাগ বসল।
যারা বিলাসী নয়, তাদের জন্য হরকত শর্ত, এখান থেকে ওখানে যাওয়া। বিলাসীদের কতকিছুই না প্রয়োজন—এখানের দুধ কেমন, ওখানের পানি কেমন, ওখানে কী খাবো ইত্যাদি। আমেরিকানরা ভিয়েতনামে হেরে গেল পেপসিকোলা কোকাকোলার মতো না হওয়ার কারণে। এ পানি তারা সহ্যই করতে পারে না। ফ্রান্স থেকে একটি জামাত এসেছিল সাতক্ষীরার দিকে। ওদের তাশকিলে আমিও ছিলাম। তো তারা পানি নিয়ে কী যে পেরেশান। তখন বোতল-টোতল আমাদের নিকট বেশি ছিল না। তো সাতক্ষীরার শ্যামনগরের দিকে তাশকিল হলো। আমরা শহরেই ছিলাম। যতদিন শহরে ছিলাম, ওখানকার ডিসি ইত্যাদিরা তাদের বাড়ির ফিল্টার থেকে নিয়মিত পানি পাঠাতেন। তারপর যখন শ্যামনগর গেলাম, তখনও তিনি নিয়মিত ইহতেমাম করে পানি পাঠিয়েছিলেন। ডিসির বাড়ি থেকে পানি কতদিন এনে খাবে! এরপর তারা অসুস্থ হয়ে গেল। আর যে অভ্যস্ত, তার তো কোনো অসুবিধা নেই। পুকুর আছে, পানি খাবে। সে তো আর অসুস্থ হবে না।
আল্লাহ তাআলা এই কওমের জন্য বিলাসিতা তো অনেক দূরের কথা, তার থেকে হাজারো মাইল দূরে রেখেছেন। এগুলোর সাথে তারা সম্পৃক্তই ছিল না। আশেপাশের সব জাতিগুলো, রোম পারস্য বিলাসিতার মধ্যে ডুবে ছিল। এর মোকাবেলায় আরবরা তাদের ধারে কাছেই ছিল না। খাওয়া-ইত্যাদি কোনো ব্যাপারেই তারা বিলাসী ছিল না। এক তো হলো মানুষ জিনিসের উপর নির্ভরশীল হয়ে যায়। আর যখন বিলাসী সমাজ হয় তখন এই বিলাসিতা মর্যাদার মাপকাঠি হয়ে দাঁড়ায়। এটি আরো বেশি খারাপ। এক তো হলো, আমার মিষ্টি খাওয়া পছন্দের জিনিস আর দ্বিতীয় হলো, মিষ্টি খাওয়াটা মর্যাদার জিনিস। কেক মজা লাগলো, তাই খেলাম; কিন্তু কেক খাওয়াটা সম্মানের বিষয়, এটি দ্বিতীয় ধাপে হয় আর এটি আরো অনেকবেশি ক্ষতিকর। এটি মান-সম্মানের ব্যাপার। তো মান-সম্মানের মানদণ্ড অন্যদিকে চলে যাওয়া এটি মানুষের মেজাজের মধ্যে নিফাক পয়দা করে। ইরশাদ হয়েছে:
الْعِزَّةُ لِلَّهِ وَلِرَسُولِهِ وَلِلْمُؤْمِنِينَ وَلَكِنَّ الْمُنَافِقِينَ لَا يَعْلَمُونَ
'ইজ্জত আল্লাহর, আল্লাহর রাসূলের এবং মুমিনের; কিন্তু মুনাফিকরা জানে না।'
অর্থাৎ, এই তিন জিনিসের মধ্যে আল্লাহ তাআলা ইজ্জত রেখেছেন। আল্লাহর সাথে সম্পর্ক, রাসূল সা.-এর সাথে সম্পর্ক আর ঈমানের সাথে সম্পর্ক। এই তিন জিনিস হচ্ছে ইজ্জত ও সম্মানের মানদণ্ড। অন্য কিছুর মধ্যে ইজ্জত দেখা তথা ধন-সম্পদ, সমাজ, রাজা, বাদশাহ, প্রজা—এই সব জিনিসের মধ্যে ইজ্জত দেখা হলো নিফাকের বৈশিষ্ট্য। বিলাসী সমাজ যদি হয় তবে বিলাসিতার মধ্যেও ইজ্জত মনে করে। যদি মোটা ভাত বা পান্তা ভাত খায় তবে লুকিয়ে খাবে আর দেখাতে চাইবে দামিটা যে, আমরা ভাত-টাত খাই না, পুডিং খাই। আর এভাবেই নিফাক সৃষ্টি হয়।
কওমের মধ্যে যখন নিফাক সৃষ্টি হয় তো ওদের মধ্যে বিশ্বস্ততা থাকে না; কারো কাছেই না। এমনকি স্বামীকেও বিশ্বাস করে না। একজন আরেকজনের সাথে ধোঁকাবাজি করে। ছেলেমেয়েরা মা-বাবাকে বিশ্বাস করে না, মা-বাবা সন্তানকে বিশ্বাস করে না। বিশ্বস্ততার একেবারে মারাত্মক অবনতি ঘটে। আর এই সবকিছু বিভিন্ন দিক দিয়ে পরোক্ষভাবে আংশিকভাবে হলেও বিলাসিতার সাথে জড়িত। সমাজে বিলাসিতা যখন আসবে, তখন ধীরে ধীরে বিস্তৃততাও হারাবে।
আল্লাহ তাআলা সাহাবাদেরকে যে নির্বাচন করেছেন, তারা এরকম নয় যে, ওই মুহূর্তে তাদেরকে হাতের নাগালে পেয়েছেন বিধায় নির্বাচন করেছেন; বরং বহু আগে থেকেই তাদের ট্রেনিং আরম্ভ হয়েছে। ট্রেনিং আরম্ভ ইব্রাহিম আ. থেকে। ইব্রাহিম আ. শাম দেশে ছিলেন, তাঁকে মরুভূমিতে পাঠালেন যে, ওখানে গিয়ে বসবাস করো। ওখানে নিয়ে গিয়ে ট্রেনিং দিয়ে আস্তে আস্তে কয়েক পুরুষ পরে তাদেরকে সাহাবা বানানো হবে, কিন্তু তাদের কয়েক পুরুষ আগে থেকেই ট্রেনিং দেওয়া আরম্ভ করেছেন। কারণ, বিলাসিতা ইত্যাদিও কয়েক পুরুষেই ভালো করে জমে। এ কথা শুনেছি তবে আল্লাহ জানে কতটুকু সত্য যে, বাদশাহ শাহ জাহানকে যে খাসি খাওয়ানো হতো, ওই খাসিকে জন্মের পর থেকেই ঘাস খাওয়াতে দেওয়া হতো না; বরং আপেল-আঙুর ইত্যাদি খাওয়ানো হতো। কারণ, যে খাসি ঘাস খেয়েছে, ওর গোস্তের মধ্যে এমন এক দুর্গন্ধ হয় যে, ওই গোস্ত বাড়িতে আনলে শাহ জাহান টিকতেই পারত না। তো সেজন্য জন্ম থেকেই তার খাবার বদলে ফেলা হতো। জানি না, এই ঘটনা সত্য কি না; কিন্তু অতিরঞ্জিত যদিও হয়ে থাকে, তবুও খুব বেশি হবে না।
এ ঘটনাটি একেবারে হুবহু না হলেও এর ধারেখাছেরই হবে। তো বিলাসিতা-ও ধাপে ধাপে বাড়ে। আর এর মোকাবেলায় তাকে যদি শক্ত মেজাজের উপর ওঠাতে হয়, তো সেটাও হঠাৎ করে পারা যাবে না, আগে থেকে ধীরে ধীরে প্রস্তুত করতে হবে। তো আল্লাহ তাআলা সাহাবায়ে কেরামের ক্ষেত্রে বহু আগে থেকেই প্রস্তুত করেছেন। মোটা ভাত, মোটা কাপড়... এইজন্য যারা পোলাও ভাত খেয়ে অভ্যস্ত তাদের জন্য ইটির ভাত খাওয়াই মুশকিল হয়ে যাবে। আমাদের ভাই উসমান গনি... ওর বাড়িতে কামলা রেখেছিল। আর ওই কামলাদেরকে ওই নরম চালের ভাত দিয়েছে। ভাত খেয়ে ওরা অভিযোগ করল যে, কী ভাত, চাবাতে চাবাতে মাড়ি ব্যাথা হয়ে যায়, কিন্তু পেট তো ভরে না! অর্থাৎ, ওরা তো শক্ত চাল খেয়ে অভ্যস্ত ছিল।
গাঙ্গুহি রহ. কোনো এক সময় কাবা শরিফ তাওয়াফ করছিলেন। হারাম শরিফের কাছে এক অন্ধ লোক বসে ছিল। গাঙ্গুহি রহ.-এর গায়ে ছিল মখমলের কুর্তা। খুব নরম ও মিহি কাপড়ের ছিল। তো ওই অন্ধ লোকের পাশ দিয়ে অতিক্রম করার সময় অন্ধ লোকটি বলে উঠল, 'খাসিন খাসিন।' গাঙ্গুহি রহ. খেয়াল করেননি। তো তিনি তাওয়াফ করে যখন দ্বিতীয়বার অন্ধ লোকটির পাশ্ব অতিক্রম করছিলেন তখন সে অন্ধ লোকটি বলে উঠলো, 'খাসিন খাসিন।' কিন্তু এবারও তিনি খেয়াল করেননি। তৃতীয়বার তাওয়াফ করে ঘুরে অন্ধ লোকটির পাশ দিয়ে অতিক্রম করছিলেন তখন অন্ধলোকটি বলে উঠলো, 'খাসিন খাসিন', তখন তিনি খেয়াল করলেন যে, তাকে লক্ষ্য করে বলা হচ্ছে আর তিনি মখমলের কুর্তা গায়ে। তখনই তিনি সেই মখমলের কুর্তাটি খুলে ফেললেন। আল্লাহ তাআলার ওয়ালা আছে যে,
وَالَّذِينَ جَاهَدُوا فِينَا لَنَهْدِيَنَّهُمْ سُبُلَنَا
'যে দেখতে চায়, তাকে দেখানো হয়।'
তো আল্লাহ তাআলা তাকে ওই অন্ধ লোকের মাধ্যমে তাকে সতর্ক করে দিলেন।
আমার মনে পড়ে একটি ঘটনা যে, হাজি আব্দুর রহমান... উনি পুরনো সাথী, মোটা কাপড় পরিধান করতেন। একবার কাকরাইলে উনার সাথে সাক্ষাৎ হলে দেখলাম খুব দামি কাপড় উনার গায়ে। অতপর আমি উনাকে গাঙ্গুহি রহ.-এর ঘটনাটি শোনালাম। তারপর থেকে উনি ওই দামি পোশাক আর পরিধান করেননি।
উমর রা. যখন বায়তুল মাকদিসে এলেন, তো উনার ইস্তেকবালের জন্য আবু উবায়দা ইবনুল জাররাহ রা. ভালো জামা-কাপড় এবং ভালো ঘোড়া নিয়ে এলেন। কোনো কোনো রেওয়ায়েতে বলা হয় যে, উমর রা. সেই জামা কাপড় পরেননি আবার কোনো কোনো রেওয়ায়েতে বলা হয় যে, উনি জামা-কাপড় পড়েছিলেন এরপর খুলে ফেলেন। বা সেই ঘোড়ায় আরোহণ করেছিলেন, এরপর আবার নেমে পড়েন। সে ঘোড়াটি ছিল তুর্কি ঘোড়া। মূলত ঘোড়াকে ট্রেনিং দেওয়া হয়। আর যে জাতীয় ট্রেনিং দেওয়া হয়, সে ওই জাতীয় চাল চালে। এক তো হলো শুধু চলা। আর অপরটি হলো, শান-শওকতে চলা। রাজা-বাদশাহদের যে ঘোড়াগুলো থাকে, সেগুলো শুধু চলে না, শান-শওকতের সাথে চলে। বিশেষ ঢঙ্গে চলে যাতে বোঝা যায় যে, এটি যেমনতেন ঘোড়াও নয় আর এর যেমনতেন সওয়ারিও নয়। তো উমর রা. যখন ঘোড়াটিতে উঠলেন তখন ঘোড়াটি সেই শান-শওকতের সাথে রাজকীয় চালে চলতে আরম্ভ করলো। উমর রা. সেই ঘোড়াটিকে ধমক দিলে বললেন, এই জাতীয় চাল সে কোত্থেকে শিখেছে! অতঃপর তিনি নেমে পড়লেন। এরপর ওই ঘোটাটিতে তিনি আর উঠেননি। তো সাহাবায়ে কেরামগণ সবধরনের বিলাসিতা থেকে কঠোরভাবে যোজন যোজন দূরে ছিলেন। এর বিপরিতে তারা বিলাসিতার মধ্যে বড় বিপদ অনুভব করতেন।
ইরান থেকে মুজাহিদ বাহিনী ফিরে এসেছে। গনিমতের মালের মধ্যে কিছু হালুয়াও ছিল। উমর রা.-এর সম্মুখে ওই হালুয়া পেশ করা হলো। উমর রা. ওই হালুয়া খেলেন। এত মজা লাগলো যে, আল্লাহর কসম করে বললেন, 'ওয়াল্লাহি, এই ধরনের জিনিসের জন্য পিতা পুত্রকে হত্যা করবে, পুত্র পিতাকে হত্যা করবে।' কী বড় বিপদের কথা! বিলাসিতা মহব্বত নষ্ট করে, লোভ বৃদ্ধি করে আর মানুষ বিলাসিতার অতলে ডুবে যায়। কোনো কাজ করতে পারে না, সবসময় বিলাসিতার চক্করের মধ্যে থাকে।
আরব অঞ্চলের মধ্যে অতীতে শাম, সিরিয়া মিসর ইত্যাদি অঞ্চল ছিল ধনাঢ্যশীলদের এলাকা। আর সৌদি ও কুয়েত ইত্যাদি অঞ্চল ছিল গরিবদের। এখন অবস্থা হয়েছে একেবারে এর বিপরীত; কিন্তু এরপরও ওই সৌদি ইত্যাদি এলাকাগুলোতে টাকা প্রচুর কিন্তু ওদের মেজাজ এখন পর্যন্ত বিলাসী নয়, কুয়েতিদেরও। তাদের খাওয়া-দাওয়াও সহজ। ভাতের মতো ইত্যাদি আর বড় একটি গোশতের টুকরো নিবে। এগুলোই ধুমধাম করে রান্নাবান্না করবে। আর শামীয় এবং মিসরীয়রা এগুলো খাবেই না। ওদের খাবারকে রীতিমতো ফন বা শাস্ত্র বলে... ওদের সম্বন্ধে বলা হয় যে, ওদের মহিলারা সকালবেলা রান্নাঘরে ঢুকে সারাদিন রান্নাঘরে থাকে আর রাত্রিবেলায় খায়। আর ওরা খুব স্থূল স্বাস্থ্যেরও হয়ে থাকে। এর মোকাবেলায় দীন পছন্দ করে যে, খেলে বা না খেলে কোনো পরোয়া নেই। কিছুটা হলেই হলো। আর ক্ষুধা যখন থাকে, সবকিছুই মজা লাগে।
আল্লাহ তাআলা ইব্রাহিম আ.-কে প্রথম পাঠালেন সেই শামদেশ থেকে মক্কাতে। মরুভূমি, পানির লেশমাত্র নেই। ওই মরুভূমিতে জানই বাঁচবে না, বিলাসিতা তো অনেক পরের কথা। আল্লাহ তাআলা জমজম দিলেন তো জান বেঁচে গেল। পানি যেখানে পাওয়া যায়, পাখিরা সেখানে ভিড় করে। পানি খেতে তো সেগুলো আসবেই। তো সেই মরুভূমিতে জুরহুম নামে একটি যাযাবর কবিলা ছিল। তারা মক্কার পাশ দিয়ে যাচ্ছিল। তারা পাখি লক্ষ্য করে ভাবলো যে, এখানে পানি আছে। অতপর তারা সেখানে উপস্থিত হয়ে বসতি গড়ার ইচ্ছাপোষণ করলো। হাজেরা আ.-এর কাছে অনুমতি চাইলো, হাজেরা আ. সেই পানি ব্যবহারের অনুমতি দিলেন। তারা বসতি স্থাপন করলো। জুরহুম কবিলার এক মেয়েকে ইসমাইল আ. বিয়ে করলেন। ইব্রাহিম আ. মুহাজির, ইসমাইল আ.ও মুহাজির আর বিয়ে করলেন এক যাযাবর কওমে। যাযাবর কওমের লোকরা সম্পদশালী হয় না। কারণ সম্পদ তো সওয়ার করে নিয়ে যেতে হবে। তাই তাদের লক্ষ্য থাকে, জিনিসপত্র যত কম করা যায়। ফার্সিতে যাযাবরদেরকে বলা হয় খানাবেদৌশি। খানা মানে ঘর, আর দোশ মানে পিঠ। অর্থাৎ, ওর ঘর ওর পিঠে। তো যে তার বাড়িকে পিঠে নিয়ে চলে সে তার বাড়িকে কমাতে চাইবে, বাড়াতে তো চাইবেই না। তো খানাবেদৌশিদের জিনিস জমা করার প্রবণতা নেই; বরং কমানোর মেজাজে থাকে। আর জিনিস জমা করার মধ্যে তারা মানসম্মানও দেখে না। সফরের মধ্যেই তাদের সম্মান। সম্পদ জমানোর মধ্যে সম্মান নয়।
আরবদের মধ্যে ঘোড়া, উট হলো মর্যাদার জন্তু। ঘোড়াওয়ালা... উটওয়ালা অহংকারী হয়ে থাকে। উটের গল্প করে... ঘোড়ার গল্প করে... এগুলো প্রদর্শন করে। গরু যদি কারো কাছে থাকেও, তবে সেগুলো পেছনে লুকিয়ে রাখতো অর্থাৎ এগুলো খুবই বেইজ্জতের জিনিস। জিহাদ ছেড়ে দেওয়ার হাদিসটির মধ্যে আছে যে, রাসূল সা. বলেছেন,
وأَخَذْتُمْ أَذْنَابَ الْبَكْرِ
'তোমরা যখন গরুর লেজ ধরবে।' অর্থাৎ, গরুর লেজ ধরা চূড়ান্ত বেইজ্জতের জিনিস। অতএব যখন জিহাদ ছাড়বে, তো আল্লাহ তাআলা তোমাদেরকে লাঞ্ছিত করবেন, জিল্লতির মধ্যে ফেলবেন। আরবরা উটে চলাচল করতো। উটের উপর চলাচল করাকে গৌরব মনে করতো। তো আল্লাহ তাআলা তাদেরকে এমন এক জায়গায় পাঠিয়েছেন, যেখানে সম্পদ জমা করার মধ্যে নয়, সম্পদ থেকে মুক্ত থাকার মধ্যেই সম্মান। ঘরবাড়ি নেই, যেটুকু আছে, সেগুলো পিঠের উপর নিয়েই চলা।
তো আল্লাহ তাআলা এই জুরহুম কবিলার কন্যা আর ইসমাইল আ.-এর মাধ্যমে আরম্ভ করলেন কুরাইশ গোত্রের উৎপত্তি। আর পরবর্তীতে তাদেরকে সর্বদা ওই চলার মধ্যেই রাখা হয়েছে। তারা ব্যবসা করতেন। তাদের জীবিকা ওই ব্যবসার মধ্যেই রেখেছিলেন। কখনো শীতের মৌসুমে, কখনো গরমের মৌসুমে তারা ব্যবসায়ী পণ্য নিয়ে ছুটে চলতেন।
ব্যবসা করতে তারা যেতেন ওই বিলাসী কওমদের মাঝে। উত্তরে রোম, দক্ষিণে শাম ইত্যাদিতে। এগুলো ছিল ধনীদের এলাকা; সেগুলো ছিল উর্বর আর বিলাসী কওমের চারণভূমি। এখানে সমূহ বিপদ ছিল যে, আরবদেরকে ওদের মধ্যে গিয়ে বিকিকিনি করতে হয় আর এতে দেখা সাক্ষাৎও হয়ে যায়। এখন এভাবে ওদের বিলাসিতার আসর আরবদের উপরও পড়তে পারে। আল্লাহ তাআলা এগুলো থেকেও বড় আজিবভাবে তাদের রক্ষা করলেন। এই আরবদের পেটে ভাত নেই, পিঠে জামা নেই, পায়ে জুতা নেই কিন্তু ছিল অহংকারে ভরা। এতই অহংকারী যে, নিজ জাত ছাড়া বাকি সবাইকে ওরা পশু বিচার করতো। আর এ কারণে ওরা ওই বিলাসী কওমের কাছে যেত ঠিকই; কিন্তু অহংকারের কারণে তাদের কাছ থেকে কিছুই শিখতো না। তাচ্ছিল্য করে বলতো, এইসব পশুর কাছ থেকে আমি শিখবো!
ব্যবসা করতে গেলে গণনা করতে হয় আর আরবরা যেত সেই রোমানদের কাছে, শামীয়দের কাছে যারা যুগ যুগ ধরে গণিতের চর্চা করে আসছে। কিন্তু আরবরা ব্যবসা করতে ওদের কাছে গেলেও শেষ পর্যন্ত তারা গণনা শেখেনি এই মনোভাবের কারণে যে, 'ওই সব জাতির কাছ থেকে আমি শিখবো!' শেষ পর্যন্ত তারা লেখাপড়া শেখেনি তাদের অহংকারের কারণে। তো এভাবে আল্লাহ তাআলা অন্যদের আসর থেকে আরবদেরকে নিরাপদ রাখেন।
রাসূল সা.-কে আল্লাহ তাআলা তাদের মধ্যে পাঠালেন। আইয়্যামে জাহেলিয়্যাতেও তাদের মাঝে মান-সম্মান ইত্যাদি বিষয়টি জড়িত ছিল বড় পরিবার বনাম ছোট পরিবার; কিন্তু বড় পরিবার আর ছোট পরিবারের মান-সম্মান নির্ণয়ের পদ্ধতিটি সম্পদ দিয়ে হতো না। দুনিয়ার বেশিরভাগ সমাজে সম্পদ দিয়ে মাপা হয় যে, পরিবারটি সম্ভ্রান্ত পরিবার নাকি নন সম্ভ্রান্ত পরিবার। কী দিয়ে মাপা হতো? সম্পদ দিয়ে। আবার কিছু লোক এমনও আছে যে, ওরা নতুন টাকাওয়ালা হয়েছে। বড় পরিবার নয়, সম্ভ্রান্ত পরিবার নয়, কিন্তু ওরা মাটি বেঁচে হঠাৎ টাকাওয়ালা হয়ে গিয়েছে। এদেরকে খুব তাচ্ছিল্যের নজরে দেখা হয়। ঠেকায় পড়ে ওদের কাছে চাইতেও হয়, আবার তাদের প্রতি তাচ্ছিল্য রয়েছে।
কারণ টাকা হচ্ছে কাঁচা টাকা আর আমরা হচ্ছি পাকা বংশীয় পরিবার। তো ওরা পাকা বংশীয় পরিবার হয়েছে কী দিয়ে? ঘুরে ফিরে এর উত্তর হলো, আমার দাদার দাদার বাড়িতে পাকা বাড়ি ছিল। আর এদের মাত্র নতুন পাকা বাড়ি হয়েছে। সুতরাং মাপদণ্ড সেই একই যে, আমার টাকা আগের আর ওর টাকা পরের। এইজন্য আমরা সম্ভ্রান্ত পরিবার আর ওরা নন সম্ভ্রান্ত পরিবার। মানদণ্ড ঘুরে ফিরে সেই একই। এই যে সম্ভ্রান্ত পরিবার হয়েছে, এটি হালাল টাকা দিয়ে হয়েছে নাকি হারাম টাকা দিয়ে হয়েছে—এর কোনো খোঁজ করার দরকার মনে করছে না। আমাদের এই দেশে যারা সম্ভ্রান্ত পরিবার হয়েছে, নামকরা পরিবার, এরা বেশিরভাগ হয়েছে ইংরেজদের দালালি করে; কিন্তু এতে কোনো দোষ নেই। টাকা পেয়েছে ব্যাস্ সম্ভ্রান্ত পরিবার।
আরবদের কাছে আইয়্যামে জাহেলিয়্যাতে এই মাপ ছিল না। রাসূল সা. ছিলেন কুরাইশদের মাঝে বনু হাশিম গোত্রের। বনু হাশিম সবচেয়ে বেশি মর্যাদাসম্পন্ন গোত্র ছিল; কিন্তু একেবারেই গরিব। এই গরিব হওয়ার কারণে সমাজে তাদের মান-মর্যাদা কিছুই কমেনি। আরো অনেক ধনী ছিল, কিন্তু বনু হাশিমের সম্মান সবচেয়ে বেশি ছিল গরিব হওয়া সত্ত্বেও। দুয়েক পুরুষ আগে বনু হাশিমের কাছে খুব টাকা ছিল। হাজিদের নানান ধরনের খিদমত বণ্টন হতো, তো বনু হাশিমের দায়িত্বে ছিল হাজিদেরকে পানি পান করানোর। এটি দায়িত্ব নয়, অধিকার। কারণ সবাই চায় পানি পান করাতে। যে কাউকে এই অধিকার দেওয়া হয় না। তখন হাজিকে পানি পান করানোকে দায়িত্ব বা বোঝা মনে করতো না, বরং এটিকে অনেক সম্মানের অধিকার মনে করতো। যখন তারা হাজিদেরকে পানি পান করানোর দায়িত্ব পেলেন, তখন শুধু পানিই পান করাতেন না, সাথে মধুর শরবতও পান করাতেন।
আরবে বহু আগে থেকেই মধু পাওয়া যেত। নানান ধরনের দামি দামি মধু ইত্যাদি ছিল। বনু হাশিম মধুর শরবত পান করাতেন। আর ওই মধু কিনতে গিয়ে বনু হাশিমের সব সম্পত্তি শেষ হয়ে গেল। কিনে কিনে হাজিদেরকে মধু খাওয়াতেন। টাকা পয়সা চলে যাওয়া বা গরিব হয়ে যাওয়ার কোনো পরোয়া ছিল না। কারণ তারা টাকাকে শুধু ব্যবহারের জিনিস হিসেবে দেখতেন, এটাকে মান-মর্যাদা হিসেবে দেখতো না। আমাদের কাছে টাকার ব্যবহারিক মূল্যের চেয়ে মর্যাদার মূল্য অনেক বেশি। একটি বাড়ি কিনার সময় এই বাড়িতে আরামে ঘুমাতে পারবো কি পারবো না—এটা দেখার চাইতে দেখা হয় যে, এ ব্যাপারে লোকে কী বলবে। গাড়ি কিনার সময় এই গাড়িতে আমার ব্যবহারিক উপকারিতা কী হবে—এর চেয়ে বেশি দেখে বাইরের সৌন্দর্য কেমন, লোকে কী বলবে ইত্যাদি ইত্যাদি। তো আল্লাহ তাআলা এই উম্মতকে এনেছেন চলতি ফিরতি কওম থেকে যাদের কাছে খাওয়া-দাওয়া ইত্যাদির বিলাসিতা কিছুই ছিল না।
আরবরা তো রান্নাবান্না ইত্যাদি জানতোই না, শুধু কিছু কিছু নির্দিষ্ট কিছু রান্নাই তারা জানতো আর এতেই তারা অভ্যস্ত ছিল। দুনিয়ার সব জায়গায় অভাবের কারণে মানুষ যে কষ্ট পায়, সেটি না খেয়ে থাকার কারণে নয়; বরং তার বেশিরভাগ কষ্টই মানসিক যে, আমি এতই হতভাগা হলাম! এইটুকু টাকা উপার্জন করতে পারলাম না!! এটি যে বেইজ্জতের জিনিস—এটাতেই তার বেশি কষ্ট। একবেলা খেতে পারলাম না, এই না খাওয়ার কষ্টের চেয়ে লোকের কাছে যে বেইজ্জত হলাম, এই কষ্টটাই তার বেশি। আরবদের কাছে এই কষ্ট কোনো কষ্টই ছিল না। একবেলা খেতে পারেনি তো খায়নি। শরীরেও কোনো সমস্যা হয়নি। আর তাদের শরীরও ছিল মজবুত শক্ত। সহ্যও করতে পারতো।
প্রথম প্রথম যখন রমজান শরিফের আগে আশুরার রোজা রাখা হতো। —রমজান শরিফের বিধান অবতীর্ণের পূর্বে আশুরার রোজার বিধান ছিল।— আশুরার রোজা যখন রাখতেন তো মায়েরা না জেনে তাদের নতুন নতুন বাচ্চাদেরকেও রোজা রাখাতেন। আর আল্লাহ তাআলা তাদেরকে এমন শক্তি দিয়েছেন যে, এই বাচ্চাদেরকে রোজা রাখানো হলেও মারা যেত না। নরম কওমের কেউ হলে যদি একদিন না খাওয়ানো হতো তবে কমপক্ষে আধামরা হয়ে যেত। আর তাদের হিম্মতও ছিল, বাচ্চাও সহ্য করতে পারতো। তারা ছিল মজবুত মনোবলওয়ালা কওম। যাদের খাওয়া-দাওয়ার ঠেকা থাকে, তাদের মনোবল কমে যায়। যখন বলা হবে, 'তোমাকে ভাত দিবো না; ঘর থেকে বের করে দিবো'—এই সব ভয় যখন দেখানো হবে তো ও ঘাবড়ে যাবে। আর যারা ঘরেই থাকে না, তাদের ঘর থেকে বের করে দেওয়ার ভয় আর কী!
মেওয়াতিদের মধ্যে এইসব সিফাত কিছু কিছু ছিল। প্রথম প্রথম মেওয়াতি জামাতগুলো যখন দিল্লিতে আসতো তো তাদের মসজিদে থাকতে হতো। দিল্লিতে খোলা জায়গা নেই বললেই চলে। মেওয়াতিরা মসজিদে ঘুমাতে পারতো না যদি ছাদ ভেঙে পড়ে! এর আগে তারা ছাদের নিচে কখনো ঘুমায়নি। আর তাদের নিকট এরচেয়েও বেশি কষ্টের ছিল বাথরুম। কারণ তারা খোলা জায়গায় প্রাকৃতিক কাজ সম্পন্ন করতে অভ্যস্ত ছিল। তাদের কথা ছিল, 'ঘরের ভেতর এ কাজ কেমন করে করবো!' তাদের নিকট ঘর বলতে শোয়ার ঘরই ছিল।
আল্লাহ তাআলা এই আরবদের কাছে দীন দিয়েছেন। এই জাতীয় মানুষকে ভয় দেখানো বড় কঠিন। কী দিয়ে ভয় দেখাবে! তোমার ভাত বন্ধ করে দিবো! ভয় পায় না। তোমার বাড়িতে যাওয়া বন্ধ করে দিবো! বাড়িই তো নেই, কোত্থেকে বের করবে। ওদেরকে ভয় দেখানো বড়ই মুশকিল। এইজন্য তাদেরকে কেউ কাবু করতে পারতো না। মানুষ যে মানুষকে কাবু করে, এই লোভ বা ভয় দেখিয়েই কাবু করে থাকে। আর যে লোভের দিকে যায় না, আবার ভয়ও করে না, ওকে কাবু করা বড়ই কঠিন। তাই আরবদেরকে কেউ নিয়ন্ত্রণ করতে পারতো না। এমনভাবে যারা জীবন পরিচালিত করতো, তাদেরকেই আল্লাহ তাআলা এই কালেমার জন্য জান দেওয়া-নেওয়ার নেয়ামত দান করলেন। এটিও তাদের জন্য বহু আগে থেকেই প্রস্তুত করা হয়েছে।
আইয়্যামে জাহেলিয়্যাতে যারা জান দিতো, জান নিতো কোনো জমির জন্য নয়। আরবদের ব্যাপারে হামেশাই শোনা যায় যে, তাদের ঝগড়া যুগ যুগ ধরে চলতে থাকতো। গোটা আরব ইতিহাস খুঁজে পাওয়া যাবে না যে, আইল তোলা নিয়ে তাদের মাঝে ঝগড়া হয়েছে, জমি নিয়ে ঝগড়া হয়েছে; বরং তাদের ঝগড়া হয়েছে কথা নিয়ে যে, তোর দাদা আমার দাদাকে এই কথা কেন বলেছে! তো ওরা আগে থেকেই কথার উপর জান দেওয়া-নেওয়া জানতো। ইসলাম আসার পরে ওই কথার উপরেই জান দেওয়া-নেওয়া হলো। এখন তাদের নীতি হলো:
لِتَكُونَ كَلِمَةَ اللهِ هِيَ الْعُلْيَا.
'আল্লাহর কথা, এটাই উপরে থাকবে।'
আগে ছিল, আমার কথা, আমার বাপের কথা, এটাই উপরে থাকবে। এইজন্য তারা যুগ যুগ ধরে লড়াই করতো। এর পরিবর্তে এখন তাদের নীতি হলো, আল্লাহর কথা উপরে থাকবে। মূল বিষয়টি হলো, 'কথা।' সেজন্য এই কওম আগে থেকেই এই দীনকে নিয়ে চলার জন্য বড় অংশে প্রস্তুত ছিল।
একবার এক সাহাবী রাসূল সা.-কে জিজ্ঞাসা করলেন, মুসলমান কৃপণ হতে পারে কি না? রাসূল সা. উত্তরে বললেন, হ্যাঁ, পারে। সাহাবী জিজ্ঞাসা করলেন, মুসলমান কাপুরুষ হতে পারে কি না? রাসূল সা. উত্তরে বললেন, হ্যাঁ, পারে। সাহাবী জিজ্ঞাসা করলেন, মুসলমান মিথ্যাবাদী হতে পারে কি না? রাসূল সা. উত্তরে বললেন, না। মুসলমান কৃপণ হতে পারে, কাপুরুষ হতে পারে কিন্তু মিথ্যুক হতে পারে না। আইয়্যামে জাহেলিয়্যাতে কুরাইশরা মিথ্যা কথা বলা জানতো না। তাদের মাঝে খুন-খারাবি হতো; কিন্তু খুন কে করেছে, এটা ধরা তাদের কোনো সমস্যা ছিল না। ও নিজেই স্বীকারোক্তি দিতো যে, আমিই খুন করেছি। ওরা এটা গোপন করতো না। মিথ্যা কথা তারা জানতোই না। তো এইসব বুনিয়াদি সিফাত তাদের মাঝে আগে থেকেই ছিল। আর সব বিষয়ে তারা ছিল পরিষ্কার। তো আল্লাহ তাআলা ওই কওমকে হাজার বছর ধরে ট্রেনিং দিয়েছেন। বাদশাহ শাহ জাহানের বকরিকে আপেল খাইয়ে ট্রেনিং দেওয়া হয়েছে তিন বছরের। এরপর মোটা হয়ে গেলে জবেহ করে দেওয়া হয়েছে আর আরবদেরকে ট্রেনিং দেওয়া হয়েছে ইব্রাহিম আ. থেকে বা তারচেয়েও আগে থেকে বলা যেতে পারে। আল্লাহই জানেন কত তম পুরুষ থেকে। তাদেরকে প্রস্তুত করা হয়েছে দুনিয়া এবং সম্পদকে তুচ্ছ দেখানোর জন্য। সম্পদের প্রতি তাদের তাচ্ছিল্য ছিল। সম্পদ ছিল না ঠিকই, কিন্তু সম্পদ জমা করার প্রবণতাও ছিল না।
আরবে ডাকাতি ইত্যাদি খুব হতো। তো তাদের মাঝেও সাআলিব নামে সর্বহারা জাতীয় এক দল ছিল, যারা ডাকাতি ইত্যাদি করে বেড়াত। মাআদি কারিব রা. এই সাআলাবাদের একজন ছিলেন। এদের যেহেতু ডাকাতি করাই পেশা, তারা এরা খুবই দৌড়াতে পারতো। তাদের জন্য এটি খুবই স্বাভাবিক বিষয় ছিল যে, ঘোড়া দৌড়ে তাদেরকে ধরতে পারত না, বরং তারা দৌড়ে ঘোড়াকে ধরে ফেলতে পারত। তো তারা এরকম দৌড়ানেওয়ালা কওম ছিল। তো এই সাআলিবরা ডাকাতি করে উট নিয়ে গেল। এখন এই উট যে রেখে রেখে খাবে, তা নয়। দূর নিরাপদ জায়গায় নিয়ে গিয়ে জবাই করে আশপাশের যত গ্রাম আছে, সবাইকে দাওয়াত করে খাইয়ে শেষ করে দিত। গ্রামে হোক বা শহরে হোক, বসতিতে হোক, চোর হোক বা ডাকাত হোক, জমা করার প্রবণতা কারোই ছিল না; বরং তৎক্ষণাৎই শেষ করে দিত। সুতরাং পরবর্তীতে দেখা গেল, তাদের এইসব মেজাজ দীনের জন্য বড়ই উপকারী।
মানুষ এই চিন্তা করে করে মরে যে, ভবিষ্যতে কী হবে। আর যার ভবিষ্যতের কোনো চিন্তাই নেই, ওর জন্য তো দুনিয়া অনেক সহজ। মানুষ যত ওজর আর পেরেশানি করে, তার সবকিছু ঘুরেফিরে সেই ভবিষ্যৎ নিয়েই। তো আল্লাহ তাআলা পুরো কওমকে বহু আগে থেকেই প্রস্তুত করেছেন। তারা নির্বাচিত। তারা সম্পদকে কদর করেন না, মিথ্যা বলেন না, ভয় পান না, তারা অতিথিপরায়ণ; তারা দুর্বলদের সাহায্য করেন। এগুলো বহু আগে থেকেই তাদের মাঝে প্রচলিত। আল্লাহ তাআলা তাদেরকে এই সিফাতগুলো দিয়েছেন। এই সিফাতগুলো দিয়েই তারা দীনকে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছেন। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে এরকম সিফাতওয়ালা হওয়ার তাওফিক দান করুন।
سُبْحَانَ اللهِ وَبِحَمْدِهِ سُبْحَانَكَ اللهم أَسْتَغْفِرُكَ وَأَتُوْبُ إِلَيْهِ
মন্তব্য (...)
এ সম্পর্কিত আরও প্রবন্ধ
আল্লাহর হাতে সোপর্দ: দুশ্চিন্তামুক্ত জীবনের পথ
ছোট বাচ্চাকে নিয়ে মা-বাবা সফর করছেন। সফরে ট্রেনের ঝামেলা ইত্যাদি নানান অসুবিধায় মা-বাবা পেরেশান! ব...
প্রফেসর হযরত মুশফিক আহমদ রহ.
২০ জানুয়ারী, ২০২৬
৩৯৩৫
প্রত্যাশা-হিসাব ও তাওয়াক্কুল-বরকত
"যে আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্য পথ বের করে দেন এবং তাকে এমন উৎস থেকে রিজিক দেন যা সে কল্পনাও ক...
প্রফেসর হযরত মুশফিক আহমদ রহ.
১৭ জানুয়ারী, ২০২৬
৩৮৮২
আল্লাহর ইচ্ছায় নিজের ইচ্ছা: পরিপূর্ণ বান্দা হওয়ার পথ
[প্রদত্ত বয়ান থেকে সংগৃহীত] স্থান: বারিধারা ডি.ও.এইচ.এস. সময়: মাগরিবের পর :১০/০৬/২০০৬ তারিখ أعُوْذ...
প্রফেসর হযরত মুশফিক আহমদ রহ.
১২ জানুয়ারী, ২০২৬
২৩১৫
আদরের ভাইটিকে বলছি
( দাওয়াত ও তাবলীগের মেহনতের আলোকিত পরশে দ্বীন পাওয়া প্রতিটি কলেজ বা ভার্সিটির জেনারেল শিক্ষিত ছাত্র ...
মাওলানা ডাঃ মোহাম্মদ মাসীহ উল্লাহ
১০ নভেম্বর, ২০২৪
১২৩৬১
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন