মহব্বতের কুরবানি: আল্লাহর ভালোবাসা অর্জন
মহব্বতের কুরবানি: আল্লাহর ভালোবাসা অর্জন
[যার সাথে সম্পর্ক হয়, তার সাথে সামঞ্জস্য বৃদ্ধি পায় এবং যার সাথে সামঞ্জস্য বেশি, তার সাথে সম্পর্ক সহজ হয়। দীনের মূল প্রাণ হলো আল্লাহর সাথে সম্পর্ক এবং ঈমান মানে আল্লাহকে ভালোবাসা। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে পাঠানো হয়েছে আল্লাহর মহব্বত পাওয়ার পথ দেখাতে; আল্লাহকে ভালোবাসলে রাসূলের অনুসরণ করতে হবে, তাহলে আল্লাহ তাকে ভালোবাসবেন। আল্লাহ মানুষকে একটি দিল দিয়েছেন, একদিকে ভালোবাসা বাড়লে অন্যদিকে কমবে। আল্লাহর ভালোবাসা পেতে হলে অন্যান্য ভালোবাসা থেকে দিলকে মুক্ত করতে হবে। নবীদের জীবনে বাহ্যিক নির্ভরশীলতা ও অভ্যন্তরীণ মহব্বত উভয় থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে। ইব্রাহিম আলাইহিস সালামকে দেশ ও সন্তান ত্যাগের আদেশ এবং মুসা আলাইহিস সালামকে লাঠি ফেলার আদেশ এর উদাহরণ। রমজানে খাওয়া, বিশ্রাম ও পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন থাকার উমুমি হুকুম সবার জন্য রয়েছে। প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য খুসুসি (বিশেষ) হুকুম রয়েছে, যা বিভিন্ন মাধ্যমে জানানো হয়। আবু তালহা রাদিয়াল্লাহু আনহুর মতো প্রিয় বস্তু সদকা করে আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করতে হবে। বাহ্যিক জিনিস এবং মনের আকাঙ্ক্ষা উভয়ই কুরবানি করতে হবে। মনের প্রিয় আশা-আকাঙ্ক্ষা আল্লাহর কাছে সদকা করে তাঁর মহব্বত চাওয়ার দোয়া করতে হবে। এতে কোনো টাকা খরচ হয় না, কিন্তু আল্লাহর নৈকট্য অর্জন সহজ হয়।]
২রা অক্টোবর ২০০৭ (১৯শে রমজান) মঙ্গলবার, জোহর বাদ কনকপুর বাজার জামে মসজিদ, মৌলভীবাজারে মুযাকারা
أعُوْذُ بِاللهِ مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّجِيْمِ، بِسْمِ اللهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيْمِ،
صِبْغَةَ اللَّهِ وَمَنْ أَحْسَنُ مِنَ اللَّهِ صِبْغَةً وَنَحْنُ لَهُ عَابِدونَ
আল্লাহ তায়ালা এই নিয়ম প্রতিষ্ঠিত করেছেন যে, যার সাথে সম্পর্ক হয়, তার সাথে ক্রমেই সামঞ্জস্য, আচার-আচরণ, অর্থাৎ সবকিছুর ব্যাপারে তার সাথে সামঞ্জস্য বাড়ে। আবার অপরদিকে যার সাথে যত বেশি সামঞ্জস্য আছে, তার সাথে তত বেশি সহজে সম্পর্ক হয়। একজন ঝাল খায়, একজন ঝাল খায় না।
এরকম দুজনের মধ্যে সম্পর্ক হয়ে গেল। বন্ধুত্ব হতে পারে। বিয়েশাদির কারণে হতে পারে, একজন নারী একজন পুরুষ বা অন্য বিভিন্নভাবে হতে পারে কিন্তু সম্পর্ক হলো, একজন ঝাল বেশি খায়, একজন ঝাল খায় না। সম্পর্ক যখন হয়ে গেল একসাথে থাকে, তখন দেখা যাবে যে, তাদের অভ্যাসের মধ্যে কিছু পরিবর্তন আসছে। হয় ঝাল যে খেত না, সে ঝাল খাওয়াতে অভ্যস্ত হয়ে যাচ্ছে, বা যে খেত সে ঝাল খাওয়া ছেড়ে দিচ্ছে। কিন্তু একই অবস্থায় চলে আসবে। ওইরকম পোশাক-আশাকের মধ্যেও দুজন বন্ধু। তারা স্বতন্ত্রভাবে জামা কিনল, ফিরে আসার পরে দেখা যাচ্ছে যে তাদের দুজনেরই জামা একই ধরনের। মিলে গেল। মনে হয় ওই যে ঘটনাক্রমে। ঘটনাক্রমে নয়, দুইজনের একসাথে থাকার কারণে একই ধরনের রুচি হয়ে গেছে, সেই কারণে তারা দুইজনেই একই জিনিসকে পছন্দ করেছে। সম্পর্কের কারণে।
আল্লাহ তায়ালা দীন দিয়েছেন আল্লাহর সাথে সম্পর্ক বাড়ানোর জন্য। দীনের প্রধান জিনিস, প্রাণ হচ্ছে আল্লাহর সাথে সম্পর্ক। ঈমান—আল্লাহকে মহব্বত করার নাম।
وَالَّذِينَ آمَنُواْ أَشَدُّ حُبًّا لِّلّهِ
আল্লাহ তায়ালা রাসূলে কারিম সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লামকে পাঠিয়েছেন, দুনিয়ার মানুষকে আল্লাহর মহব্বত পাওয়ার পথ দেখানোর জন্য।
إِن كُنتُمْ تُحِبُّونَ اللَّهَ فَاتَّبِعُونِي يُحْبِبْكُمُ اللَّهُ
যদি তোমরা আল্লাহকে ভালোবাসো, আমার অনুসরণ করো, আল্লাহ তোমাকে ভালোবাসবেন। লক্ষ্য কী, আল্লাহর ভালোবাসার পাত্র হওয়া। তার জন্য রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যা-কিছু নিয়ে এসেছেন,
جَمِيْعُ مَا جَاءَ بِهِ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ
আখলাক হোক, ইবাদত হোক, মোয়ামালাত হোক, মোয়াশারাত হোক—সবগুলোর শেষ হচ্ছে আল্লাহর মোহাব্বতের পাত্র হওয়া। আর এই জিনিস কে চাইবে, যে নিজেই আল্লাহকে ভালোবাসে। যে আল্লাহকে ভালোবাসে, সেই আল্লাহর ভালোবাসা পেতে চায়। দুনিয়ার মানুষের মধ্যে এই নিয়ম, আমি যদি কাউকে ভালোবাসি, আমি চাই সে যেন আমাকে ভালোবাসে। তো আল্লাহ তায়ালা দুনিয়া সৃষ্টি করেছেন আল্লাহর উসুল সম্পর্কে বোঝানোর জন্য। দীনও এটাই, যদি আমি আল্লাহকে ভালোবাসি তাহলে আমি চেষ্টা করবো আল্লাহর ভালোবাসা পাওয়ার জন্য, আর ওই চেষ্টার নাম হচ্ছে দীন। আর যেটা নিয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এসেছেন, যদি তোমরা আল্লাহকে ভালোবাসো, আমার অনুসরণ করো, আল্লাহ তোমাকে ভালোবাসবেন।
সম্পূর্ণ দীনের সংজ্ঞা এই এক আয়াতের মধ্যে দিয়ে দেওয়া হয়েছে। যে আল্লাহর ভালোবাসা পেতে চায়, আর ভালোবাসার দাবি হচ্ছে অন্যান্য ভালোবাসাগুলোকে ছাড়া। দিল আল্লাহ তায়ালা একটা দিয়েছেন, চোখ দিয়েছেন দুটো, কান দুটো, অনেকগুলো দুটো দুটো করে আছে, কিন্তু দিল একটা। আর শুধু একটা নয়, এটা যে এক এটা ভালো করে বুঝিয়েও দিয়েছেন। বলেও দিয়েছেন। আল্লাহ তায়ালা কোরআন শরিফের মধ্যে কোনো এনাটমি (Anatomy) শেখাননি। কিন্তু দিলের ব্যাপারে একটু শিখিয়েছেন,
مَّا جَعَلَ اللَّهُ لِرَجُلٍ مِّن قَلْبَيْنِ فِي جَوْفِهِ
এক দেহের মধ্যে দুই কলব নেই, একটা। ভালোবাসা এই দিলেই যায়, এক ভালোবাসা বাড়বে, অন্য ভালোবাসা কমবে। কেউ দ্বিতীয় বিয়ে করতে চাইলে তার প্রথম স্ত্রী কখনো সন্তুষ্ট হয় না। কেন হয় না, তার মানে আমার প্রতি তার ভালোবাসা কমে যাবে। এটা হতেই হবে। কেউ যদি বলে, না। মিথ্যা বলছে, হতেই পারে না। কোনো দিকে ভালোবাসা যাবে তো অন্যদিকে ভালোবাসা কমবে। যদি আল্লাহকে ভালোবাসতে চায়, যে ভালোবাসার পরিপ্রেক্ষিতে সে দীনের উপর চলতেই রাজি হবে, যে ভালোবাসা আমি চাইবো, ওইটা তো তখনই চাইবো যদি আমি আল্লাহকে ভালোবাসি। আমি নিজেই যদি আল্লাহকে না ভালোবাসি, তো আল্লাহর ভালোবাসা আমি কেন চাইবো। আর আমি যে ভালোবাসি, সেটাকে আগে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। তার জন্য নিজের ভালোবাসার জিনিসকে ছাড়তে শেখা।
لَنْ تَنَالُوا الْبِرَّ حَتَّى تُنْفِقُوْا مِمَّا تُحِبُّوْنَ
আল্লাহর নৈকট্য বা আল্লাহর দৃষ্টিতে পবিত্রতা অর্জন করতে পারবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত নিজের প্রিয় জিনিসকে আল্লাহর পথে খরচ না করো। এর জন্য সব জায়গায়, দীনের আরম্ভ হচ্ছে, নিজের প্রিয় জিনিসকে খরচ করা। প্রিয় বিভিন্ন ধরনের হয়। যার উপর মানুষ নির্ভর করে ভালোবাসার উৎপত্তিও হয় নির্ভরশীলতা থেকে, পরে ধীরে ধীরে বাড়ে। কিন্তু দুনিয়ার নানান ধরনের জিনিসের প্রথম সম্পর্ক তারপর সেটা ধীরে ধীরে বাড়ে—দেশ, সন্তান, পেশা। পেশা একজন মানুষ আরম্ভ করে, একটা চাকরি আরম্ভ করল, চাকরি তো আরম্ভ করেছে একটা প্রয়োজনে। পরবর্তী সময়ে এই প্রয়োজনের সম্পর্ক থাকতে থাকতে, থাকতে থাকতে, একসময় তার মনের সাথে সম্পর্ক হয়ে যায়। আর সম্পর্ক হয়ে যাওয়ার পরে তারপর যদি সে রিটায়ার্ডও করে, এখন তার চাকরির সাথে কোনো সম্পর্ক নেই। কিন্তু যারা চাকরি করেছে, রিটায়ার্ড করার পরে যত দিন তার সম্ভব সে খোঁজখবর নিতে থাকে যে, কার প্রমোশন হলো, কার ডিমোশন হলো, কার ট্রান্সফার হলো। কে উপরে গেল, কে সিনিয়র হলো, কে জুনিয়র হলো, এগুলোর খোঁজখবর নিতেই থাকে। তার এগুলো জানার কোনো প্রয়োজন নেই। কিন্তু আগে প্রয়োজনে করত, কিন্তু পরে তার নেশার মতো হয়েছে। এটা যেন নেশা হয়ে গেছে।
একবার ঢাকায় এক বড় সিনিয়র অফিসার, হয়তো আই জি-টাই জি ছিলেন। বা এই জাতীয়, তাঁর বাসায় গাস্টে গিয়েছি। তখন নির্বাচনের মৌসুম। সম্ভবত নির্বাচন চলছে বা এ ধরনের একটা কিছু জাতীয় নির্বাচন। গিয়ে দেখি তিনি মহা ব্যস্ত। রিটায়ার্ড করেছেন প্রায় দশ বছর আগে, মানে রিটায়ার্ড যে করেছেন এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। এল পি আর, টেল পি আর এগুলো ভালো করে শেষ হয়ে গেছে। প্রায় দশ বছর হয়ে গেছে বোধ হয়, রিটায়ার্ড করেছেন। তো এই নির্বাচনের ব্যাপারে তিনি বিভিন্ন ধরনের চার্ট-টার্ট ইত্যাদি এগুলো বানিয়েছেন। নিজেই সব গুলো কুলিয়ে উঠতে পারছেন না, নিজের পেনশনের টাকা দিয়ে একজন সেক্রেটারিও রেখেছেন। সরকার তো বেতন দেয় না, আগে তো সরকার বেতন দিত। সেক্রেটারি রাখতে পারতেন। এখন নিজের পকেটের টাকা দিয়ে সেক্রেটারি রেখেছেন, তো সে তাঁকে সাহায্য করছেন। এই চার্ট-টার্ট এগুলো করার ব্যাপারে। আর কে কোথায় নির্বাচন করছে, কে কত ভোট পেলো-টেলো, এগুলো রীতিমতো একটা বিরাট চার্ট করে সম্পূর্ণ ঘর দখল করা। বিভিন্ন দেয়াল-টেবিলে চার্ট-টার্ট ইত্যাদি। এগুলো করে আর মহা ব্যস্ত হয়ে এগুলো তিনি স্টাডি করছেন। এই দায়িত্ব তাকে কেউ দেয়নি, আর এর জন্য তাকে কেউ এক পয়সা দেয় না। নিজের পকেটের পয়সা খরচ করতে হবে, কিন্তু ওই একটা সম্পর্ক হয়ে গেছে, বেতন না দিলে কি হবে, কারণ আমার দায়িত্ব তো আছে।
এক বিয়েতে এক ছেলে গিয়েছে। তার আত্মীয়স্বজন কিছু নয়, তো বিয়ের বাড়িতে কে জিজ্ঞাসা করেছে যে, আপনি কার পক্ষে, আপনাকে কে দাওয়াত দিয়েছে। তো বললেন যে, আমাকে কোনো দাওয়াত করেনি। কিন্তু আমার একটা বিবেচনা আছে তো। তো যদিও তারা বলেনি, মেয়ের বাপও বলেনি, ছেলের বাপও বলেনি, কিন্তু নিজ একটা দায়িত্ব-বিবেচনায় সে খেতে এসেছে। সেরকম তাঁকে কেউ বলছে না যে, তুমি নির্বাচনের খোঁজখবর করো। কিন্তু তাঁর একটা বিবেচনা আছে। সে হিসেবে ব্যস্ত হয়ে এগুলোর খোঁজখবর করছেন, মহব্বত লেগে গেছে। এগুলো ছাড়তে পারছে না। আর এই যে ছাড়তে না পারা, এটা জাহিরিভাবে মনে হয় যে এমনকি, কোনো মুফতিকে জিজ্ঞাসা করা হয় যে, নির্বাচনের খোঁজ নেওয়া হারাম না কি, মুফতিও হারাম বলবে না। কিন্তু দিলকে মেরে ফেলে, দিল মুর্দা হয়ে গেছে, এই দিল আল্লাহর দিকে তাকাতেই পারবে না, আল্লাহ তো অনেক বড়। এমনকি, এর কারণে নিজের মা-বাবা, সন্তানের ভালোবাসাও কমে যাবে। তো দিল মুর্দা হয়ে যায়। এর মোকাবিলায় মহব্বতের জিনিস যখন ছাড়ে, তো তার এ পাত্র খালি হলো। পাত্র যদি খালি হয় তো সেখানে অন্য কিছু ঢালা সম্ভব হয়, দিই না দিই পরবর্তী কথা। কিন্তু পাত্র তো খালি হলো। এই জন্য দীনের সব মেহনতের মধ্যে প্রধান জিনিসগুলো ছিল, তার মহব্বতের জিনিস বা সম্পর্কের জিনিস, যেখান তার নির্ভরশীলতা আছে, এগুলোকে ত্যাগ করা।
ইব্রাহিম আলাইহিস সালামের উপর প্রথম হুকুম, উর্বর দেশ ত্যাগ করো। মুসা আলাইহিস সালামের উপর প্রথম হুকুম, লাঠির উপর তুমি নির্ভরশীল, أتوكأ عليه 'এর উপর আমি হেলান দিই।' অর্থাৎ আমি নির্ভরশীল, এটা ছাড়ো। রাসূলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নির্ভরশীলতা আছে, ওই কুরাইশই তাঁর শত্রু হয়ে গেল। সব নবীদের জীবনে, আর এটা হামেশা চলছে। একবার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মজলিশে আবু তালহা রাদিয়াল্লাহু আনহু এলেন, আর ওই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কোরআন শরিফের এই আয়াত তেলাওয়াত করলেন
لَنْ تَنَالُوا الْبِرَّ حَتَّى تُنْفِقُوْا مِمَّا تُحِبُّوْنَ
আল্লাহর নৈকট্য পাবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত তুমি তোমার মহব্বতের জিনিসকে না ছাড়ো, না খরচ করো। আবু তালহা রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ, আল্লাহ তায়ালা আমার মহব্বতের জিনিস চান, বললেন যে হ্যাঁ, আল্লাহ তায়ালা মহব্বতের জিনিস চান। আবু তালহা রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ, আমার মহব্বতের জিনিস হচ্ছে বাইরাহা। এই যে, আমার সবচেয়ে প্রিয় জিনিস আমি এটাই আল্লাহর রাস্তায় সদকা করলাম। দিয়ে দিলেন, সবচেয়ে মহব্বতের জিনিস।
একবার করলেই যে, শেষ হয়ে যাবে তা নয়। ইব্রাহিম আলাইহিস সালাম একসাথে দুই প্রিয় জিনিসকে ছাড়লেন। একটার সাথে বাহ্যিক জীবনের নির্ভরশীল, অপরটার সাথে মনের নির্ভরশীলতা। বাহ্যিক নির্ভরশীলতা হলো উর্বর দেশ, যেখান থেকে খাওয়ার, পান করার সব বন্দোবস্ত হয়। মানুষের জীবিকা এটা মানুষের কাছে অত্যন্ত প্রিয়। তার বেঁচে থাকা বেশি প্রিয়, না তার সন্তান বেশি প্রিয়, এটা নির্ণয় করা সম্ভব নয়। মানুষ প্রচুর দেখা যাবে সন্তানের জন্য জীবন দিয়ে দেয়। আবার এটাও পাওয়া যাবে যে, জান বাঁচানোর জন্য সন্তানকে মেরে ফেলে। দুটোই বড় প্রবল। নিজের জান নিয়ে যখন টানাটানি পড়ে তো কোলের ছেলেকেও ফেলে দেয়, আবার ছেলের জন্য নিজের জীবনকেও ছেড়ে দেয়। দুটোই প্রবল জিনিস।
আর আল্লাহ তায়ালা ইব্রাহিম আলাইহিস সালামকে প্রথমেই দুটোর উপর হুকুম দিলেন, যেখান থেকে রিজিক সেটা ছাড়ো, আর সন্তানকে ছাড়ো, মনের সম্পর্ক, জাহিরি নির্ভরশীলতার সম্পর্ক দুটোই ছাড়লেন। মুসা আলাইহিস সালামকে, সব নবীদের জীবনে এই ২ জিনিস পাওয়া যাবে যে, জাহিরি নির্ভরশীলতা আর অভ্যন্তরীণ মনের নির্ভরশীলতা। এই দুই জিনিস থেকেই আল্লাহ পাক তাঁকে সরাচ্ছেন। সব অলি-আল্লাহদের জীবনেও তা পাওয়া যাবে। এটা একেবারে ওজু করার মতো। যেমন কোনো নামাজি পাওয়া যাবে না, যে বিনা ওজুতে নামাজ পড়ে। তো কোনো আল্লাহওয়ালাকে পাওয়া যাবে না, যে বিনা ওজুতে আল্লাহওয়ালা হয়েছে। আর এটা হচ্ছে আল্লাহওয়ালাদের ওজু। আল্লাহওয়ালা হওয়ার দিলের ওজু এটাই যে, অন্যের মোহব্বত থেকে দিলকে মুক্ত করা। হামেশা আল্লাহ তায়ালা এটা তারতিব রেখেছেন। মানুষের জাহিরি জগতের নির্ভরশীলতা যেটা, সেটা তো আরম্ভ হয় প্রয়োজন থেকে। জায়েজ প্রয়োজন থেকে। এমনকি শরিয়তের হুকুম থেকে, ধীরে ধীরে সেটা বাড়ে। আর মুসলমানের জন্য আল্লাহ তায়ালা এই জন্য রমজানের হুকুম দিয়েছেন। এই যে হুকুম ইব্রাহিম আলাইহিস সালামের, যে দেশ ত্যাগ করো, সন্তানকে ত্যাগ করো, এটা খুসুসি হুকুম, শুধু তার জন্য। আল্লাহ তায়ালা মানুষের উপর দুই ধরনের হুকুম দিয়ে থাকেন; কিছু উমুমি, কিছু খুসুসি। নবীদের খুসুসি হুকুমগুলো তো কোরআন শরিফের মধ্যে উল্লেখিত, আমাদের খুসুসি হুকুমগুলো উল্লেখিত কোরআন শরিফেও নয়, হাদিসেও নয়। কিন্তু প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য খুসুসি আহকাম আছে, যখন সে সেই হুকুম বোঝার জন্য প্রস্তুত হয়, আল্লাহ তায়ালা তখন তার কাছে ওই হুকুম পাঠান বিভিন্নভাবে। হয় উস্তাদের মাধ্যমে আসবে, না হয় শায়েখ এর মাধ্যমে আসবে, না হয় অন্য লোকের মাধ্যমে আসবে, না হয় তার দিলের ভেতর নিজে থেকে জাগবে। তো সবার জন্য উমুমি হুকুমও আছে, খুসুসি হুকুমও আছে। একেবারে প্রাথমিক প্রয়োজনের যে জিনিসগুলো, এগুলোকে ছাড়ো।
রমজান শরিফে আল্লাহ তায়ালা খাওয়া, বিশ্রাম, নারী, এই তিন প্রাথমিক জিনিসগুলো ছাড়ার হুকুম দিয়েছেন। দিনের বেলায় খাওয়া ত্যাগ করা, রাতের বিশ্রাম ছাড়ো আর পরিবার থেকে আলাদা থাকা। আর একেবারে যে ইতিকাফে চলে গেল পরিপূর্ণভাবে। এর আগ পর্যন্ত ধীরে ধীরে কিছু প্রস্তুত হওয়া। এগুলো হলো উমুমি হুকুম, সবাই এগুলো করবে। নামাজের জন্য যেরকম, উমুমি নামাজ হচ্ছে যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নামাজের যে অংশটুকু দেখা যায়, ওই দেখার অংশটুকু পড়ে নেওয়া। কিয়াম দেখা যায়, রুকু দেখা যায়, সেজদা দেখা যায়, এগুলো করো। উমুমি সাধারণ। তারপরে খুসুসি হচ্ছে আল্লাহর ধ্যান, আর ইহসান ইত্যাদি পয়দা করা। ধীরে ধীরে সেটার জন্য যাকে যেটা ছাড়তে হবে, ওইটা ছাড়ার মাধ্যমে আল্লাহর সাথে সম্পর্ক বাড়ানো, আল্লাহর দিকে তার ধ্যান যাওয়া। মনকে অন্য জিনিস থেকে মুক্ত করা। কিন্তু উমুমি হচ্ছে তাকবিরে তাহরিমা বলা, কিয়াম করা, রুকু করা, তারপর সেজদা করা। ওইরকম খুসুসি আহকাম হচ্ছে, দিলকে বিভিন্ন ধরনের সম্পর্ক থেকে মুক্ত করা। সবার জন্য উমুমি হুকুম হচ্ছে, রোজা রাখা, রমজান শরিফের আহকামগুলো আদায় করা।
উমুমি জিনিস ওইগুলোই থাকে, যেগুলোর সবার জন্য। দেশে যেরকম সাক্ষরতা, তো যেসব দেশে শিক্ষা বাধ্যতামূলক সেখানেও M.Sc. বাধ্যতামূলক নয়, একেবারে নিম্ন মানের, যেটা ন্যূনতম সেটা বাধ্যতামূলক। যাতে নিজের নাম লিখতে পারে, পড়তে পারে ইত্যাদি। মোটামুটি এটুকু। আমেরিকায় শিক্ষা বাধ্যতামূলক এবং তারা দাবি করে তাদের দেশে সবাই শিক্ষিত। এই দাবি একেবারে মিথ্যাও নয়, এরপরেও বাজারে বড়সংখ্যক লোক জিনিস কিনে, যে লেখা আছে লেখা পড়ে না, ওই লেখা পড়া ওর জন্য বড় ঝামেলার জিনিস। ওরা শিক্ষিত মানুষ, দেশের স্ট্যাটিস্টিক্সে শিক্ষিত লোক। কিন্তু একটা জিনিসের শুধু নাম পড়বে এইটুকুও তার কাছে বড় বেশি ঝামেলার মনে হয়। তার চেয়ে সহজ ওর, স্টেট বার দেখে কেনা। এইজন্য বাস্তব ঘটনা রয়েছে যে, শরবত মনে করে শ্যাম্পু কিনেছে, লেখা আছে শ্যাম্পু, কিন্তু ওইটুকু পড়বে না। কারণ, ওই পড়া এগুলো ওই শিক্ষিত প্রফেসরদের কাজ। তো বাধ্যতামূলক শিক্ষা যেরকম এটা সবার কাছ থেকে দাবি করা হয় না যে, সে M.Sc. পাশ হবে, এইটুকু যদি করে নিতে পারে যে, শুধু নামটা পড়তে পারে বা কোনো রকমে লিখতে পারে।
ওইরকম শরিয়তও সবার কাছ থেকে দাবি করে না যে, তাদের নামাজের মধ্যে ইহসানের কাইফিয়াত হবে। কিন্তু সবার কাছ থেকে এইটুকু দাবি করা হয় যে, পাঁচ ওয়াক্ত ফরজ নামাজটা আদায় করে নাও। আল্লাহর সাথে তার গভীর সম্পর্ক হবে। এটা সবার কাছ থেকে দাবি করা হয় না, কিন্তু রমজান শরিফের রোজাটা রেখে দাও, এটা সবার কাছ থেকে দাবি করা হয়। এমন কি এটাও চাওয়া হয়—কিন্তু শর্ত নয়—যে, দিনের বেলায় রোজা রেখে গিবত করবে না। বেশিরভাগ ফকিহদের মতে, গিবত অন্যায়, গুনাহ, কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু গিবত করলে রোজা কাজা করতে হবে না, যদিও কোনো কোনো ইমামের মতে কাজা করতে হবে না, যদিও কোনো কোনো ইমামের মতে কাজাও করতে হয়। কিন্তু বেশিরভাগদের মতে নয়। তো সবার কাছ থেকে এইটুকুই চাওয়া হয়। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে ন্যূনতম যেটুকু দিয়েছেন—নামাজ আদায় করা, আল্লাহর উপর ঈমান, ধীরে ধীরে দিলকে খালি করে অগ্রসর হওয়া, নবীরা, অলি-আল্লাহরা যেরকম হয়েছেন। আর সেই অগ্রসর হওয়ার পথ হলো, নিজের মোহব্বতের জিনিসগুলোকে ছাড়া। যত বেশি আমি আমার মহব্বতের জিনিসকে আল্লাহর ওয়াস্তে ছাড়তে পারবো, ইনশাআল্লাহ তত বেশি আমি আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করতে পারবো।
আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে দীন দিয়েছেন, আর দীনের প্রাণই হচ্ছে আল্লাহকে ভালোবাসা। আল্লাহর ভালোবাসার পাত্র হওয়ার আকাঙ্ক্ষা করা, ওই আকাঙ্ক্ষা যার কাছে আছে, সে-ই তো রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পথে চলবে।
যে-ই এই কথার আকাঙ্ক্ষী যে, يُحْبِبْكُمُ, আল্লাহ তোমাকে ভালোবাসবে, এই কথা যার কাছে আকাঙ্ক্ষী, ও তো বাকি কাজগুলো করবে। এইভাবে এইভাবে, এইভাবে পড়াশোনা করো, তো পড়াশোনা করলে কী হবে, তো ফার্স্টক্লাস পাবে। যার এই ফার্স্টক্লাস পাওয়ার ব্যাপারে আকাঙ্ক্ষী, ও তো এই কাজগুলো করবে। আর যে বলে ফার্স্টক্লাসের দরকার নেই, ওর কথা এখানেই শেষ হলো।
এক বাড়িতে এক মহিলা কাজ করে, আর ছোট একটা ছেলে। ওই বাড়িতে তারা কাজ করে, ওরা তো অ, আ, ক, খ কোনোটাই জানে না। গৃহিণী অবসর সময়ে তাদেরকে কিছু অ, আ, ক, খ শেখানোর ইচ্ছা। কিছু বই-পেন্সিল এগুলো কিনেও দিয়েছিলেন, আর সন্ধ্যাবেলায় তাদের দুজনের স্কুল। একদিন, দুইদিন, তিনদিন গেল ওই ছেলে আর আসবে না। ওই মহিলা যে একটু বয়স্ক ছিলেন, ছেলে যেটা একটু ছোট, তো ওই ছেলেকে সাথে করে ডাকছেন যে, আয় পড়তে যাই। তো ওই ছেলে ওকে বলছে যে, যাও তুমি জজ-ব্যারিস্টার হবে তুমি পড়ো গিয়ে, আমি জজ-ব্যারিস্টার হবো না। তো জজ-ব্যারিস্টার যদি হতেই না চায়, এরপরে তো আর তাকে পড়ানো যাবে না। আকাঙ্ক্ষী হতে হবে। ব্যবসা করলে লাভ হবে, এই কথা যার কাছে গুরুত্বপূর্ণ যে, লাভ হবে, সে ব্যবসা করবে। এইভাবে কৃষিকাজ করলে ফসল ভালো হবে, বেশি ফসল হবে—এই কথার যার কাছে গুরুত্ব আছে যে, ভালো ফসল হবে, সে এই পদ্ধতিগুলো মানবে। যার কাছে এই কথারই মূল্য নেই, সে কোনোটাই মানবে না। তো যে আল্লাহর মহব্বত পাওয়ার ব্যাপারে আকাঙ্ক্ষী যে, আল্লাহ তোমাকে ভালোবাসবে, ও তো দীনের উপর চলবে। আর ওই আকাঙ্ক্ষায় যার কাছে নেই, তার কাছে তো বাকি সব কথা বৃথা। আর দীন হলো আল্লাহর মহব্বত পাওয়ারই জিনিস। তো সেইজন্য প্রধান জিনিস হলো যে, আমি আল্লাহর মহব্বত পাওয়ার ব্যাপারে আকাঙ্ক্ষী হবো। এই জন্য আমি আমার দিলকে অন্যান্য মহব্বত থেকে খালি করবো। যে মালের ব্যাপারে আকাঙ্ক্ষী, সম্মানের ব্যাপারে আকাঙ্ক্ষী, বিলাসী জীবনের ব্যাপারে আকাঙ্ক্ষী, মানুষের কাছে পরিচিত হওয়ার ব্যাপারে আকাঙ্ক্ষী, তো হাজারও আকাঙ্ক্ষা দিলের মধ্যে যার ভরা আছে, সে আল্লাহর মহব্বতের কি আকাঙ্ক্ষী হবে? এর জন্য দিলকে খালি করতে হবে। এর জন্য দীনের মেহনতের মধ্যে বড় একটা অংশ হচ্ছে, দিলকে খালি করা। আর দিলকে খালি করার একটা জাহিরি সূরত হচ্ছে, তার বাহ্যিক মহব্বতের জিনিসগুলোকে ছাড়া। যেমন এই বাগানকে ছাড়া, কিন্তু আসল হলো দিলের গভীর সম্পর্ক যেগুলো আছে সেগুলোকে ছাড়া।
আল্লাহ তায়ালা ইব্রাহিম আলাইহিস সালামকে বাগান ছাড়ার কথা বলেননি, বরং দেশ ত্যাগ করে মরুভূমিতে চলে যেতেই বলেছেন। আর ছেলেকে কোলে নিয়ে বলেননি যে, ছেলের মহব্বত ছাড়ো, বরং ওকে দূর পাঠিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু দূরে গেলেও কী হবে, মহব্বত তো রয়ে যায়। দূরে ঠিকই দেখাসাক্ষাৎ হচ্ছে না, কিন্তু মন তো টানে। তারও চিকিৎসা করেছেন। যে মন টানে দূরে থাকলে, তো ঠিক আছে কাছে যাও, আর ওকে গিয়ে জবাই করো। ইসমাইল আলাইহিস সালামকে জবাই করা উদ্দেশ্য নয়, কিন্তু নিজের দিল থেকে ছেলের মহব্বতকে জবাই করা উদ্দেশ্য। যেরকম আল্লাহ তায়ালা ইসমাইল আলাইহিস সালামকে জবাই করালেন ঠিকই, কিন্তু ইসমাইল আলাইহিস সালামকে জীবিত রেখে দিলেন। মুসা আলাইহিস সালামকে লাঠি ফেলালেন ঠিকই, বাকি জীবন মুসা আলাইহিস সালামের হাতে সবসময় লাঠি ছিল। ফেরাউনের কাছে যখন গেছেন তখনও লাঠি আছে হাতে, সমুদ্রের কাছে যখন গেছেন তখনও হাতে লাঠি। সমুদ্রের এপারে যখন চলে গেছেন তখনও লাঠি হাতে আছে। তো ইব্রাহিম আলাইহিস সালামের যেরকম ছেলেকে ছাড়িয়ে ছেলের মহব্বত ছাড়িয়েছেন, মুসা আলাইহিস সালামেরও এরকম লাঠি ফেলাননি, লাঠি ফেলিয়ে লাঠির সাথে যে সম্পর্ক বা নির্ভরশীলতা, তাকে ফেলেছেন। আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে দীন দিয়েছেন। আমরাও যে যার উপর নির্ভরশীল ওইটাকে ছাড়ানোর চেষ্টা করি। আবু তালহা রাদিয়াল্লাহু আনহু যে জিনিস করেছেন, আজ আমাদের উপরও এটা আছে। আমরাও নিজে নিজে খুঁজে বের করি যে, আমার মহব্বতের জিনিস কী? এক তো হলো কথা, আর এক তো হলো তাশকিল। দীনের এই মেহনতের মধ্যে।
আগের জামানার আল্লাহওয়ালারা ওয়াজ করতেন, আর হজরত মাওলানা ইলিয়াস রহমাতুল্লাহ আলাইহিকে আল্লাহ তায়ালা তার দিলের মধ্যে এ কথাকে ঢাললেন যে, ওয়াজ করেই ছেড়ে দেওয়া নয়, বরং এটা আমলের তাশকিলের মধ্যে আনো। নাহলে কথা বাষ্প হয়ে উড়ে যাবে। আর এইজন্য আল্লাহ তায়ালা এ কথার মধ্যে এত ফায়দা দিয়েছেন যে, কথার পরেই তাশকিল। তো আমরা যে মহব্বত মহব্বত মহব্বতের কথাগুলো বলছি, এ কথাগুলোর তাশকিল কী? তাশকিল আমি, নিজে নিজে তাশকিল করি। আমি দেখি আমার কাছে মহব্বতের জিনিস কী। দুইভাবে দেখা, বাহ্যিক জিনিস, অভ্যন্তরীণ আকাঙ্ক্ষা। দুটো জিনিস আমাদের কাছে বড় গুরুত্বপূর্ণ।
কিছু বাইরের জিনিস যেগুলো আমি ভালোবাসি, আর কিছু ভেতরে তার স্বপ্ন। ছাত্র তার মনের স্বপ্ন আছে যে, বিরাট ভালো রেজাল্ট করবে। ভালো রেজাল্ট করার পরে এটা করবে, এটা করবে, ওইটা করবে। এগুলো তার কিছু স্বপ্ন আছে। ব্যবসা যে করে ব্যবসার লাইনে তার কিছু স্বপ্ন, কিছু আকাঙ্ক্ষা, কিছু পরিকল্পনা ইত্যাদি আছে। যেগুলো খুব পরিষ্কার থাকে না, মোটামুটি ঝাপসা ধরনের থাকে। কাছেরগুলো একটু পরিষ্কার, ইমিডিয়েট (Immediate) টা হলো ভালো রেজাল্ট আর এর যত দূরে যায়, তত দূরে একটু ঝাপসা। ওই শিল্পীরা যে ছবি আঁকে, কাছের গাছগুলোতে পাতাগুলো পরিষ্কার দেখা যায়, আর দূরের গাছ যেগুলো, সেগুলোতে শুধু নীল দেখা যায়। তো মানুষের স্বপ্ন, আকাঙ্ক্ষা, কল্পনা এগুলোও ওইরকম। কাছেরগুলো তো একেবারে খুব ভালো করে নির্দিষ্ট যে, পরীক্ষায় এত নম্বর পেতে চায়, আর দূরের যেইগুলো আছে, সেগুলো ঝাপসা ধরনের।
যে আল্লাহকে পেতে চায়, সে তার বাইরের হাতের জিনিস, ওইটাও কিছু কুরবানি করুক। আর মনের কিছু কল্পনা, ওইটাও কিছু কুরবানি করুক। যদিও কুরবানির সাথে আল্লাহর মহব্বতের জন্য দোয়া করতে পারে। আল্লাহ তায়ালা ইনশাআল্লাহ বহুত বড় নিয়ামত তাকে দেবেন। কুরবানি কী? আবু তালহা রাদিয়াল্লাহু আনহু যে-সকল মূল্যবান বাগানকে সদকা করে দিলেন, আমরাও নিজে নিজে আমাদেরকে দেখি যে, আমার কাছে প্রিয় আমার কী আছে। আর সদকা করার নিয়ত করি। এটা অন্য কাউকে বলারও দরকার নেই। কাগজে লেখারও দরকার নেই। কিন্তু নিজের, আমার জানা আছে, আমার কোনটা। নিজে নিজে মনে মনে এটা চিন্তা করে সদকা করি। এটা তো হলো জিনিস, আর এর চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ, আমার মনের ভেতর আমার কিছু আকাঙ্ক্ষা আছে, কিছু কল্পনা, কিছু আশা ইত্যাদি আছে। ওইটার মোকাবিলায় আল্লাহর কাছে আমি দোয়া করি। এই দোয়া যদি আমি করতে পারি, আমার মনের ভেতর যে জিনিস আছে, বড় বেশি আকাঙ্ক্ষী, এ আল্লাহ আমি এই আকাঙ্ক্ষা ছেড়ে দিলাম। আর এর বদলে তুমি আমাকে তোমার মহব্বত দাও। যদি কেউ দিল থেকে তার মনের বড় প্রিয় জিনিসকে মনে মনে ছেড়ে দেওয়ার দোয়া করতে পারে। বাইরে থেকে কিছুই দেখা যাচ্ছে না, কিন্তু মনে মনে বিরাট কুরবানি। কারণ, প্রত্যেকের মনের ভেতর যে জিনিসের সে স্বপ্ন দেখে, যেইটার আকাঙ্ক্ষী সেটাও সে ছাড়তে চায় না। মুখে উচ্চারণ করতেও রাজি নয় যে, এটা যেন চলে যায়। একজনের একটা গরু আছে, তো এই গরুকে সদকা করে দাও, আল্লাহ তায়ালা তোমাকে দীন দেবে। করতে রাজি আছে, হ্যাঁ রাজি আছি। তো দোয়া করো যে, আয় আল্লাহ, আমি গরুকে সদকা করলাম, আর তোমার মহব্বত বিনিময়ে দাও। তো দোয়াও করে দিলো কিন্তু গরু কিন্তু ছাড়ল না। কিন্তু এই একই কথা তাকে বলা হয়, তোমার ছেলেকে জবাই করার কোনো দরকার নেই। ইব্রাহিম আলাইহিস সালামের উপর হুকুম ছিল। আমাদের শরিয়তে এরকম হুকুম নেই যে, ছেলের গলায় ছুরি দেবে, কিন্তু তুমি শুধু এটুকু দোয়া করো যে, হে আল্লাহ তুমি আমার ছেলেকে নিয়ে নাও আর বিনিময়ে তোমার মহব্বত দান করো। এই দোয়া করতে রাজি নয়। গরুর ব্যাপারে রাজি আছে কিন্তু যদি বলা যায় যে, গরু আমি নেবো না। শুধু তুমি মুখে বলো যে, হে আল্লাহ, গরু নিয়ে নাও আর তোমার মহব্বত দিয়ে দাও। সে খুশি খুশি বলে দেবে, গরু নেবে না তো, না না গরু নেবে না, গরু নেবে না কিন্তু মুখে আমি বলতে হলে ও রাজি। তো ছেলের ব্যাপারে একই কথা বলো, ছেলেকে নেবে না। কিন্তু শুধু তুমি মুখে এই দোয়া করো, হে আল্লাহ, তুমি ছেলেকে নিয়ে নাও আর তোমার মহব্বতকে দিয়ে দাও, তো এই দোয়া উচ্চারণ করতে রাজি হবে না। এত ভয় লাগে, যদি কবুল হয়ে যায়, সেইজন্য উচ্চারণ করতেও রাজি নয়। তো আল্লাহ তায়ালা আমাদের মহব্বতের জিনিসের, আমার দোয়ার ভেতর চান যে, হে আল্লাহ, তুমি তোমার মহব্বত আমাকে দান করো। এর জন্য আমার মহব্বতের কিছু নিয়ে নাও। তো ছেলে পর্যন্ত দোয়া করতে না পারি, ঠিক আছে, এ ছাড়াও আমার কাছে কিছু আছে। চাকরি, ব্যবসা আরও অন্যান্য জিনিস আছে। তো মহব্বতের জিনিসকে, নিজের মনের ভেতর যেইটা আছে, ওইটাকে মনে মনে আল্লাহকে দিয়ে দিই।
সদকা করে দিই, আর আল্লাহর কাছে বিনিময় চাই। আয় আল্লাহ, তুমি এর মোকাবিলায় তোমার মহব্বত দান করো। যদি ওইটুকু মনে মনে করতে পারি ইনশাআল্লাহ, ওই একধাপে অনেক উপরে চলে যেতে পারবো। পয়সা একটাও খরচ হয় না, কিন্তু জিনিস সহজ হয়। আল্লাহ তায়ালা আমাদের তাওফিক নসিব করুক। আমিন।
سُبْحَانَ الله وَبِحَمْدِهِ، سُبْحَانَكَ اللَّهُمَّ وَبِحَمْدِكَ نَشْهَدُ أَنْ لا إِلَهَ إِلا أَنْتَ ، نَسْتَغْفِرُكَ وَ نَتُوبُ إِلَيْكَ.
[সমাপ্ত]
মন্তব্য (...)
এ সম্পর্কিত আরও প্রবন্ধ
আদরের ভাইটিকে বলছি
( দাওয়াত ও তাবলীগের মেহনতের আলোকিত পরশে দ্বীন পাওয়া প্রতিটি কলেজ বা ভার্সিটির জেনারেল শিক্ষিত ছাত্র ...
মাওলানা ডাঃ মোহাম্মদ মাসীহ উল্লাহ
১০ নভেম্বর, ২০২৪
১২৫০৪
বাহ্যিক উন্নতি নাকি আত্মিক সমৃদ্ধি?
আল্লাহ তাআলা নেক আমলের আদেশ দিয়েছেন এবং এর বিনিময়ে সুন্দর জীবন দান করার ওয়াদা করেছেন। সুন্দর জীবন...
প্রফেসর হযরত মুশফিক আহমদ রহ.
২০ জানুয়ারী, ২০২৬
৩৯৮৬
নফি ও ইসবাত: দ্বীনের মৌলিক ভিত্তি
[প্রদত্ত বয়ান থেকে সংগৃহীত] بِسْمِ اللهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ، فَاعۡلَمۡ اَنَّہٗ لَاۤ اِلٰہَ اِلّ...
প্রফেসর হযরত মুশফিক আহমদ রহ.
১২ জানুয়ারী, ২০২৬
২৫৯৯
দ্বীনের মেহনতের ফায়দা নাকি দুনিয়া শিকারের ধান্দা
একজনের অসুখ হয়েছে, আর কিছুদিন পরপর সে তার নিজের স্বাস্থ্যের অবস্থার দিকে তাকায়। শক্তি বাড়ছে কিনা,...
প্রফেসর হযরত মুশফিক আহমদ রহ.
২৩ জানুয়ারী, ২০২৬
৪০১৯