লালনই আল্লাহ! বাউল মতবাদ। পর্ব—৩৪
লালনই আল্লাহ! বাউল মতবাদ। পর্ব—৩৪
এক আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই। তিনি কারো মতো নন, এবং তাঁর সমকক্ষ কেউ নেই। তিনি খালেক; বাকি সকলই মাখলুক। মাখলুককে খালেক বলা শুধুমাত্র শিরকই নয়, বরং চরম হাস্যকর ধৃষ্টতা।
বাউল ধর্মে কী বলে?
তাদের বিশ্বাস হলো—বাউল সম্প্রদায় সকল গুরুকে আল্লাহ মনে করলেও স্পেশালি তারা লালনকে আল্লাহ বলে বিশ্বাস করে এবং লালনের মধ্যেই আল্লাহর গুনাবলী বিদ্যমান। দেখুন, তারা দাবী করেছে—
লালনকে কোনো ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বরূপে ধরে নিয়ে আমরা এগোতে পারি না। আমাদের কাছে তিনি চিরন্তন, শাশ্বত মূলসত্তা। -লালনদর্শন, পৃ. ১০৩
পরিদৃশ্যমান সমস্ত সৃষ্টিরাজ্যের মধ্যে আমরা যা কিছু আকার-আকৃতির মধ্যে প্রকাশিত হতে দেখি তার নিয়ন্তা লালন। তিনি সৃষ্টির মহারাজা। তাঁর দেহের মধ্যে সকল কালের সকল জ্ঞানী মহাপুরুষ লুকিয়ে আছেন। তাঁর মনের মধ্যেই চেতন-অচেতন অখণ্ডকালের জ্ঞান। সেটা অদৃশ্যজগত বা বাতেনজগত। প্রতিটি দৃশ্যের বা জাহেরের পেছনে মূলশক্তিরূপে কাজ করে অদৃশ্যশক্তি বা বাতেন। লালন শাহ সেই বাতেন জগতের মহারাজা। সেজন্যে স্থুল দৃষ্টিধারী জীব তাঁর মাহাত্ম্য টের পায় না কিছুই। সমস্ত সৃষ্টি রহস্যের আকররূপে লালনদেহই বিশ্বদেহ। —লালনদর্শন, পৃ. ১২৯
লালন শাহকে বাউলেরা পীর দেবতাজ্ঞানে পূজা করে । তাই তাঁর ‘ওরসে’ ‘সাধুসেবা’য় তাদের আগমন এবং ভক্তি অর্পণ বাউলদের ধর্মের অঙ্গ এবং গুরু যে-উৎসব অর্থাৎ দোলপূর্ণিমা অনুষ্ঠান পালন করেছেন সে-সময়ে সেখানে উপস্থিত থাকা তাদের ধর্মীয় বিশ্বাস। —বাংলাদেশের বাউল, পৃ. ২১
অর্থাৎ তারা বুঝাতে চায়—
১. লালনই ‘চিরন্তন’ অর্থাৎ যার কোনো বিনাশ নেই।
২. ‘মূলসত্ত্বা’ মানে লালনই মূল অর্থাৎ আল্লাহ।
৩. লালনই সৃষ্টির আকর এবং মহারাজা, অর্থাৎ সৃষ্টির স্রষ্টা।
৪. অদৃশ্যের সকল খবর লালন জানে।
ইসলাম কী বলে?
প্রথমত জেনে নেয়া উচিত—এ আকিদা মূলত খ্রিস্টানদের। বাইবেলে আছে—
যীশু হচ্ছেন মাংসে আগত ঈশ্বর, মানুষের দেহে ঈশ্বর। —(যোহন ১:১, ১৪)
এই একই আকিদা লালন করে বাউল সম্প্রদায়। তাদের এ আকিদা কোনোভাবেই মুসলিমরা ধারণ করতে পারে না। নিন্মে প্রত্যেকটি বিষয়ে আলোচনা করা হলো—
এক-দুই. ‘লালনই ‘চিরন্তন’ ও ‘মূলসত্ত্বা’ :
তাদের দাবী ছিলো—লালনই ‘চিরন্তন’ অর্থাৎ যার কোনো বিনাশ নেই। অথচ পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে—
اللّٰهُ لَاۤ اِلٰهَ اِلَّا هُوَ الۡحَـىُّ
“আল্লাহ তিনি, যিনি ছাড়া কোনও মাবুদ নেই, যিনি চিরঞ্জীব।” —(সুরা বাকারা : ২৫৫)
كُلُّ مَنْ عَلَيْهَا فَانٍ وَيَبْقَىٰ وَجْهُ رَبِّكَ ذُو الْجَلَالِ وَالْإِكْرَامِ
“ভূ-পৃষ্ঠে যা-কিছু আছে, সবই ধ্বংস হবে। বাকি থাকবে কেবল তোমার প্রতিপালকের গৌরবময়, মহানুভব সত্তা।”—(সুরা রহমান : ২৬-২৭)
وَلَا تَدْعُ مَعَ اللَّهِ إِلَٰهًا آخَرَ ۘ لَا إِلَٰهَ إِلَّا هُوَ ۚ كُلُّ شَيْءٍ هَالِكٌ إِلَّا وَجْهَهُ ۚ لَهُ الْحُكْمُ وَإِلَيْهِ تُرْجَعُونَ
“এবং আল্লাহর সঙ্গে অন্য কোন মাবুদকে ডেকো না। তিনি ছাড়া কোন মাবুদ নেই। সবকিছুই ধ্বংসশীল, কেবল আল্লাহর সত্তাই ব্যতিক্রম। শাসন কেবল তাঁরই এবং তাঁরই কাছে তোমাদেরকে ফিরিয়ে নেওয়া হবে।”—(সুরা কাসাস : ৮৮)
এই আয়াতত্রয় থেকে জানতে পারলাম—আল্লাহই একমাত্র চিরন্তন ও অবিনাশী সত্ত্বা এবং তিনিই মূল সত্ত্বা। অথচ বাউলদের বিশ্বাস হলো ‘লালনই চিরন্তন ও মূলসত্ত্বা’। এটা কী সুস্পষ্ট শিরক নয়?
তিন. লালনই সকল সৃষ্টির লালনই আকর এবং মহারাজা!
তাদের আরেকটা দাবী ছিলো—লালনই সকল সৃষ্টির লালনই আকর এবং মহারাজা! অর্থাৎ সকল সৃষ্টির স্রষ্টা লালন। অথচ মহান রব্ব বলেন,
هُوَ الَّذِي خَلَقَ لَكُم مَّا فِي الْأَرْضِ جَمِيعًا
“তিনিই সেই সত্তা, যিনি পৃথিবীতে যা-কিছু আছে তা তোমাদের জন্য সৃষ্টি করেছেন।”—(সুরা বাকারা : ২৯)
اللَّهُ الَّذِي خَلَقَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ وَمَا بَيْنَهُمَا فِي سِتَّةِ أَيَّامٍ
“আল্লাহ সেই সত্তা, যিনি আকাশমণ্ডলী, পৃথিবী ও এর মধ্যবর্তী যাবতীয় বস্তু ছয় দিনে সৃষ্টি করেছেন।” —(সুরা সাজদা : ৪)
الَّذِي أَحْسَنَ كُلَّ شَيْءٍ خَلَقَهُ
“তিনি যেসব বস্তু সৃষ্টি করেছেন, তার প্রত্যেকটিকে করেছেন সুন্দর।” —(সুরা সাজদা : ৭)
সুতরাং সমস্ত সৃষ্টির একমাত্র স্রষ্টা মহান আল্লাহ। তাঁর সাথে অন্য কাউকে শরীর করা সরাসরি শিরক।
চার. অদৃশ্যের জ্ঞান :
তাদের আরেকটা দাবি ছিলো—বাতেন বা অদৃশ্যের সকল জ্ঞান লালন ফকির জানে। অথচ গুপ্ত ও প্রকাশ্য সকল জ্ঞান একমাত্র আল্লাহ তাআলাই জানেন। পবিত্র কুরআনে কয়েকটি আয়াত পেশ করলাম। মহান রব্ব বলেন,
هُوَ اللَّهُ الَّذِي لَا إِلَٰهَ إِلَّا هُوَ ۖ عَالِمُ الْغَيْبِ وَالشَّهَادَةِ ۖ هُوَ الرَّحْمَٰنُ الرَّحِيمُ
“তিনিই আল্লাহ, যিনি ছাড়া কোন মাবুদ নেই। তিনি গুপ্ত ও প্রকাশ্য সব কিছুর জ্ঞাতা। তিনি সকলের প্রতি দয়াবান, পরম দয়ালু।” —সুরা হাশর : ২২
ذَٰلِكَ عَالِمُ الْغَيْبِ وَالشَّهَادَةِ الْعَزِيزُ الرَّحِيمُ
“তিনি (আল্লাহ তাআলা) গুপ্ত ও প্রকাশ্য বস্তুর জ্ঞাতা। তিনি পরাক্রমশালী, পরম দয়ালু।” —(সুরা সাজদা : ৬)
وَعِندَهُ مَفَاتِحُ الْغَيْبِ لَا يَعْلَمُهَا إِلَّا هُوَ ۚ وَيَعْلَمُ مَا فِي الْبَرِّ وَالْبَحْرِ ۚ وَمَا تَسْقُطُ مِن وَرَقَةٍ إِلَّا يَعْلَمُهَا وَلَا حَبَّةٍ فِي ظُلُمَاتِ الْأَرْضِ وَلَا رَطْبٍ وَلَا يَابِسٍ إِلَّا فِي كِتَابٍ مُّبِينٍ
“আর তাঁরই (আল্লাহর) কাছে আছে অদৃশ্যের কুঞ্জি। তিনি ছাড়া অন্য কেউ তা জানে না। স্থলে ও জলে যা-কিছু আছে, সে সম্পর্কে তিনি অবহিত।” —(সুরা আনআম : ৫৯)
এছাড়াও হযরত আয়িশাহ রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন,
وَمَنْ حَدَّثَكَ أَنَّهُ يَعْلَمُ الْغَيْبَ فَقَدْ كَذَبَ وَهُوَ يَقُولُ لاَ يَعْلَمُ الْغَيْبَ إِلاَّ اللهُ
“আর যে ব্যক্তি তোমাকে বলে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গায়েব জানেন, সেও মিথ্যা বললো। কেননা, আল্লাহ্ বলেন, গায়িব জানেন একমাত্র আল্লাহ্।”—(সহিহ বুখারী, হাদিস নং : ৭৩৮০)
মন্তব্য (...)
এ সম্পর্কিত আরও প্রবন্ধ
ফিরিস্তা এবং দেবতা একই জিনিষ! হেযবুত তওহীদ। পর্ব–১০
সমস্ত মুসলামানকে আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও আসমানী কিতাবের মতো ফেরেশতাদের অস্ত...
মুফতী রিজওয়ান রফিকী
৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৫
৩৪৭৬
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন