গুরুদের মৃত্যু নেই! গুরুদের মৃত্যু তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন! বাউল মতবাদ। পর্ব ৩০—৩১
গুরুদের মৃত্যু নেই! গুরুদের মৃত্যু তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন! বাউল মতবাদ। পর্ব ৩০—৩১
গুরুদের মৃত্যু নেই!
প্রত্যেক সৃষ্টির বিনাশ রয়েছে। যার সৃষ্টি আছে, তার সমাপ্তিও আছে। যার জন্ম আছে, তার মৃত্যুও সুনিশ্চিত।
বাউল ধর্মে কী বলে?
ডক্টর আনোয়ারুল করীম লিখেছেন—
বাউলেরা বিশ্বাস করেন, গুরুর কোনো মৃত্যু নেই। তিনি কেবল দেহরক্ষা করতে পারেন। তিনি চিরঞ্জীব। তাই তারা যে 'ওরস' বা সাধুসেবা উদ্যাপন করে তার অর্থ এই যে, গুরু তাঁর মনের মানুষের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়ে তাঁর মধ্যেই বিলীন হয়ে যান। বাউলেরা গুরুসর্বস্ব। —(বাংলাদেশের বাউল, পৃ. ২১-২২)
ইসলাম কী বলে?
প্রত্যেক জীব মরণশীল। মহান আল্লাহ বলেন,
كُلُّ نَفْسٍ ذَائِقَةُ الْمَوْتِ ۖ ثُمَّ إِلَيْنَا تُرْجَعُونَ
“জীব মাত্রকেই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে। তারপর তোমাদের সকলকে আমারই কাছে ফিরিয়ে আনা হবে।” —(সুরা আনকাবুত : ৫৭)
وَلِكُلِّ أُمَّةٍ أَجَلٌ ۖ فَإِذَا جَاءَ أَجَلُهُمْ لَا يَسْتَأْخِرُونَ سَاعَةً ۖ وَلَا يَسْتَقْدِمُونَ
“প্রত্যেক সম্প্রদায়ের জন্য এক নির্দিষ্ট সময় আছে। যখন তাদের সেই নির্দিষ্ট সময় এসে পড়ে, তখন তারা এক মুহূর্তও বিলম্ব করতে পারে না এবং ত্বরাও করতে পারে না।” —(সুরা আরাফ : ৩৪)
أَيْنَمَا تَكُونُوا يُدْرِككُّمُ الْمَوْتُ وَلَوْ كُنتُمْ فِي بُرُوجٍ مُّشَيَّدَةٍ
“তোমরা যেখানেই থাকো (এক দিন না এক দিন) মৃত্যু তোমাদের নাগাল পাবেই, চাই তোমরা সুরক্ষিত কোন দুর্গেই থাকো না কেন।” —(সুরা নিসা : ৭৮)
সুতরাং অবধারিতভাবে প্রত্যেককেই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে। এই মহাবিশ্বের কোনো শক্তি, কোনো মর্যাদা, কোনো ক্ষমতাই মৃত্যুর হাত থেকে কাউকে রক্ষা করতে পারবে না। এমনকি মৃত্যুর দূত মালাকুল মউত আলাইহিস সালামও একদিন মৃত্যুবরণ করবেন। মৃত্যুহীন কেবল একজনই—এক চিরঞ্জীব, চিরস্থায়ী সত্তা। তিনি হলেন একমাত্র আল্লাহ। কুরআনে কারীমে মহান আল্লাহ তাআলা এ সত্যই ঘোষণা করে বলেন—
كُلُّ مَنْ عَلَيْهَا فَانٍ وَيَبْقَىٰ وَجْهُ رَبِّكَ ذُو الْجَلَالِ وَالْإِكْرَامِ
“ভূ-পৃষ্ঠে যা-কিছু আছে, সবই ধ্বংস হবে। বাকি থাকবে কেবল তোমার প্রতিপালকের গৌরবময়, মহানুভব সত্তা।” —(সুরা রহমান : ২৬-২৭)
সুতরাং একমাত্র চিরঞ্জীব সত্তা হলেন আল্লাহ তাআলা। অতএব, কোনো গুরু বা মুরশিদকে চিরঞ্জীব মনে করা সরাসরি আল্লাহর সঙ্গে শিরক।
গুরুদের মৃত্যু তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন!
মৃত্যুর স্রষ্টা যিনি—সেই আল্লাহর কুদরতি হাতেই প্রতিটি প্রাণের মৃত্যু নিয়ন্ত্রিত। মানুষের নিজস্ব কোনো ক্ষমতা নেই একে ত্বরান্বিত কিংবা বিলম্বিত করার।
বাউল ধর্মে কী বলে?
তাদের মহাগুরু ফকির লালন বলেছে—
দায়েমি সালাতি যে জন
শমন তাহার আজ্ঞাকারী ॥
সার্বক্ষণিক ভাবে ধ্যানস্থ অবস্থায় যিনি থাকেন আপন ইচ্ছে ছাড়া
দৈহিক মৃত্যু তাকে কখনো স্পর্শ করতে পারে না। সাধারণ মানুষ মৃত্যুর আকস্মিকতায় ভীত হয়ে পড়ে। কিন্তু দায়েমি সালাতি সাধক যখন ইচ্ছে মৃত্যুকে আহ্বান করেন কেবল তখনই তা কার্যকর হয়ে থাকে। সালাতের ধ্যান দ্বারা জন্মমৃত্যুর উপর বিজয়ী অর্থাৎ সৃষ্টির উপর আজ্ঞাকারী হবার সুযোগ শুধু গুরুর অনুগত শিষ্যেরই আছে, সাধারণ মানুষের নেই। —লালনভাষা অনুসন্ধান, খ. ১ পৃ. ১৫৭
অর্থাৎ তাদের দাবি—মৃত্যু নাকি সাধকদের নিয়ন্ত্রণাধীন। এই ধারণার নাম তারা দিয়েছে ‘পর্দা গ্রহণ’। তাদের মতে, সাধকরা যখন ইচ্ছা করে, তখনই পর্দা গ্রহণ করে, অর্থাৎ স্বেচ্ছায় মৃত্যু বরণ করে। তাদের বিশ্বাস অনুযায়ী, পুরো বিষয়টি সম্পূর্ণরূপে সাধকদের হাতেই নিয়ন্ত্রিত।
ইসলাম কী বলে?
ইসলামের দৃষ্টিতে মানুষের জীবন ও মৃত্যু একমাত্র আল্লাহর ইচ্ছা ও কুদরতের অধীন। নির্ধারিত সময় উপস্থিত হলে কেউ তা প্রতিহত করতে পারে না, দমনও করতে পারে না। মৃত্যুর জন্য কোনো নির্দিষ্ট বয়স, সময়, জাতপাত কিংবা শ্রেণি নেই—যখন আল্লাহর হুকুম আসে, তখন সেখান থেকে পলায়ন করা বা একে এক মুহূর্তের জন্যও পিছিয়ে দেওয়া কারও পক্ষে সম্ভব নয়। মহান রব্ব বলেন—
وَمَا كَانَ لِنَفْسٍ أَن تَمُوتَ إِلَّا بِإِذْنِ اللَّهِ كِتَابًا مُّؤَجَّلًا
“কোনো ব্যক্তির এখতিয়ারে নয় যে, আল্লাহর হুকুম ছাড়া তার মৃত্যু আসবে, নির্দিষ্ট এক সময়ে তার আগমন লিখিত রয়েছে।” —(সুরা আলে ইমরান : ১৪৫)
هُوَ يُحْيِي وَيُمِيتُ وَإِلَيْهِ تُرْجَعُونَ
“তিনিই (আল্লাহ) জীবন দান করেন এবং তিনিই মৃত্যু ঘটান। তাঁরই কাছে তোমাদের সকলকে ফিরিয়ে নেয়া হবে।” —(সুরা ইউনুস : ৫৬)
সুতরাং, জন্ম ও মৃত্যুর একচ্ছত্র মালিক একমাত্র আল্লাহ তাআলাই। কারণ, এই সৃষ্টি, এই জীবন এবং এই মৃত্যুর স্রষ্টা একমাত্র তিনিই। তাঁর ইচ্ছা ও হুকুম ছাড়া কেউ জন্ম নিতে পারে না, আবার কেউ মৃত্যুবরণও করতে পারে না। এ প্রসঙ্গে মহান রব্ব আরও ঘোষণা করে বলেন—
تَبَارَكَ الَّذِي بِيَدِهِ الْمُلْكُ وَهُوَ عَلَىٰ كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ الَّذِي خَلَقَ الْمَوْتَ وَالْحَيَاةَ لِيَبْلُوَكُمْ أَيُّكُمْ أَحْسَنُ عَمَلًا ۚ وَهُوَ الْعَزِيزُ الْغَفُورُ
“মহিমাময় সেই সত্তা, যার হাতে গোটা রাজত্ব। তিনি সবকিছুর উপর পরিপূর্ণ শক্তিমান। যিনি মৃত্যু ও জীবন সৃষ্টি করেছেন তোমাদেরকে পরীক্ষা করার জন্য যে, কর্মে তোমাদের মধ্যে কে উত্তম। তিনিই পরিপূর্ণ ক্ষমতার মালিক, অতি ক্ষমাশীল।” —(সুরা মূলক : ১-২)
তাছাড়া, হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমার রা. সূত্রে বর্ণিত, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
مَفَاتِيحُ الْغَيْبِ خَمْسٌ لاَ يَعْلَمُهَا إِلاَّ اللهُ لاَ يَعْلَمُ مَا تَغِيضُ الأَرْحَامُ إِلاَّ اللهُ وَلاَ يَعْلَمُ مَا فِي غَدٍ إِلاَّ اللهُ وَلاَ يَعْلَمُ مَتَى يَأْتِي الْمَطَرُ أَحَدٌ إِلاَّ اللهُ وَلاَ تَدْرِي نَفْسٌ بِأَيِّ أَرْضٍ تَمُوتُ إِلاَّ اللهُ وَلاَ يَعْلَمُ مَتَى تَقُومُ السَّاعَةُ إِلاَّ اللهُ
“অদৃশ্যের চাবি পাঁচটি, যা আল্লাহ্ ব্যতীত অন্য কেউ জানে না।
১. মায়ের পেটে কী লুকিয়ে আছে তা জানেন একমাত্র আল্লাহ।
২. আগামীকাল কী ঘটবে তাও জানেন একমাত্র আল্লাহ।
৩. বৃষ্টিপাত কখন হবে তাও আল্লাহ ব্যতীত অন্য কেউ জানে না।
৪. কে কোন্ ভূমিতে মারা যাবে তা আল্লাহ ব্যতীত অন্য কেউ জানে না।
৫. ক্বিয়ামাত (কিয়ামত) কখন ঘটবে আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না।” —(সহিহ বুখারী, হাদিস নং : ৭৩৭৯)
সুতরাং এত সুস্পষ্ট আয়াত ও হাদিসকে অস্বীকার করে যারা এই আকিদা লালন করে যে ‘সাধকের মৃত্যু তার নিজের হাতেই নিয়ন্ত্রিত’—তারা স্পষ্ট কুফরিতে লিপ্ত।
মন্তব্য (...)
এ সম্পর্কিত আরও প্রবন্ধ
কুরআনের চেয়ে মুমিন দামী! হেযবুত তওহীদ। পর্ব–১৬
পবিত্র কুরআন সরাসরি আল্লাহপাকের কালাম। পৃথিবীর সব কিছু মাখলুক হলেও আল্লাহ-র কালাম মাখলুক নয়। সুতরাং ...
মুফতী রিজওয়ান রফিকী
৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৫
৩৪৮১