গুরুর ধ্যান করে সিজদা করা! বাউল মতবাদ। পর্ব—২৮
গুরুর ধ্যান করে সিজদা করা! বাউল মতবাদ। পর্ব—২৮
সিজদা—মহান আল্লাহর নৈকট্য লাভের এক অতীব গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। এই সিজদার একমাত্র ও নিঃশর্ত হকদার কেবল আল্লাহ তাআলা।
বাউল ধর্মে কী বলে?
তাদের মৌলিক কাজের মধ্যে অন্যতম হলো—সিজদার সময় পীরের ধ্যান করে সিজদা করতে হবে। লালন ফকির লিখেছে—
মন তুমি গুরুর চরণ ভুলো না
গুরু বিনে এ ভুবনে,
পারে যাওয়া যাবে না।
পারের সম্বল লাগবে না,
এমন পাগল আর দেখি না
ফকির লালন বলে মন রসনা,
করো গুরুর বন্দনা। —মহাত্মা লালন, পৃ. ৮১
ফকির লালন আরও বলেছে—
গুরুর চরণ অমূল্য ধন, বাঁধো ভক্তিরসে
মানব জনম সফল হবে
গুরু উপদেশে।
পারাপারের খবর জানো,
জেনে মহৎ গুরুকে মানো
লালন বলে ভাবছো কেনো,
পড়ে মায়ার ফাঁসে। —(মহাত্মা লালন, পৃ. ৮০)
এসব গানের সারমর্ম হিশাবে তারা লিখেছে—
ফকির লালনের মত পথ ও পদ এমনই এক মানবিক দার্শনিক ও আধ্যাত্মিক গুরুবাদী মত পথ যেখানে হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, জাত-পাত-গোত্র ও বর্ণের সামান্যতম ভেদাভেদ নেই। এই মতে শুধু প্রেম ভালোবাসা এবং গুরু ভজনাই মূল সাধনা। -(মহাত্মা লালন, পৃ. ৩৩)
বাউল মুন্সী মনিরুদ্দীন লিখেছে—
আলিপ খাড়া রুকু হায়,
দালে আসন মীম সজিদায়
মুর্শিদ রূপে ধ্যান করে
কর সজিদা সময় যায়৷ —(বাউলসাধনা, পৃ. ৬৪)
এ গানের ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ‘বাউলসাধনা’ বইয়ে লেখা হয়েছে—
‘আলিপ” মানে সোজা ও ‘রুকু' মানে হাঁটুতে যাওয়া । তারপর সিজদার সময় মুর্শিদ রূপ ধ্যান করতে হবে। সেই ধ্যান করতে পারলে চোখের সামনে আল্লাহরূপী মুর্শিদ উপস্থিত হন। আর সেই আল্লাকেই হাজির-নাজির রেখে সেজদা করতে হবে। সঠিক পদ্ধতিতে সাধন-ভজন করতে না পারলে রংপুরের বাজার অর্থাৎ দুনিয়ার ভবপুরে আসাটাই বৃথা। বাউলসাধনায় মুর্শিদ ভজনা প্রধান শর্ত। কারণ মুর্শিদ ভালো-মন্দের সন্ধান দেন। ষড়রিপু থেকে কীভাবে নিজের মনকে নিয়ন্ত্রণ রাখা সম্ভব, কিংবা কীভাবে দমসাধনা করতে হয়—সবকিছুর নির্দেশনা মুর্শিদ তাঁর শিষ্যকে শিখিয়ে দেন। কামনদী থেকে কীভাবে উতরে বস্তুসাধন করা যায়, সেটাও আয়ত্তে আনতে হলে মুর্শিদের সাহায্য প্রয়োজন। তাই বাউলসাধনায় মুর্শিদ ভজনার বিকল্প নেই। —(বাউলসাধনা, পৃ. ৬৫)
বাউলদের মতো মাইজভাণ্ডারীদের মৌলিক গ্রন্থের অন্যতম গ্রন্থ ’রত্নভাণ্ডার’-এ লেখা আছে—
অধীন হাকিম বাণী- রোজা নামাজ হক জানি,
রুকু আর সজিদা করি মুর্শিদ চরণেরে। —(রত্নভাণ্ডার শের নং- ৩১; পৃ. ২২)
এজন্য লালন একাডেমির সাবেক পরিচালক ডক্টর আনোয়ারুল করীম লিখেছেন—
বাউলেরা বস্তুনিষ্ঠ। গুরুকে তারা বস্তুরূপে পূজা করে। লালনের আখড়ায় যেভাবে বাউলেরা তাদের ভক্তি-অর্ঘ্য বা পূজা দিয়েছে তা নিম্নরূপ :
আখড়ার ভেতর ঢুকবার দ্বারে প্রথমে দাঁড়িয়ে এবং পরে খাদেম বা গুরুর সম্মুখে বসে দুই হাতের আঙ্গুলকে ত্রিকোণ আকৃতি, যা স্ত্রীজননাঙ্গসদৃশ এমন অবস্থায় খাদেম বা গুরুর চোখে চোখ রেখে তাঁরা তাঁদের নিজস্ব পন্থায় প্রণাম বা ভক্তি জানায়। তারপর জুতা-খড়ম থাকলে তা খুলে খালি পায়ে আখড়ায় প্রবেশ করে এবং কবরে সেজদায় উপনীত হয়। অতঃপর সঙ্গে আনা খাদ্যদ্রব্য, চাল ডাল টাকা পয়সা ইত্যাদি মাজারের খাদেমের হাতে দেয় অথবা সিন্দুক থাকলে তাতে অর্থ প্রদান করেন। এরপর খাদেম একটি নির্দিষ্ট স্থানে তাকে ও তার সঙ্গিনীর বসার ব্যবস্থা করে। একে বাউলেরা ‘আসন' বলে। এই ‘আসন’ তাঁরা কোনো অবস্থাতে পরিবর্তন করে না। —(বাংলাদেশের বাউল, পৃ. ২১)
ইসলাম কী বলে?
গুরুকে সিজদা করা যদি বৈধ হতো, তবে সর্বপ্রথম সাহাবায়ে কেরাম রাদিয়াল্লাহু আনহুম নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর প্রতিই সিজদা আদায় করতেন। অথচ, হযরত শাহর ইবনে হাউশাব রহি. বলেন,
لقي سلمان رسول الله صلى الله عليه وسلم في بعض فجاج المدينة فسجد له فقال: لا تسجد لي يا سلمان واسجد للحي الذي لا يموت
“হযরত সালমান ফারসী রা. নবীজির সা. সাথে মাদীনার কোনো এক গলিতে দেখা হলে সিজদা দিলেন। অতঃপর নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁকে বললেন—হে সালমান, আমাকে সিজদা দেবে না। এমন সত্ত্বাকে সিজদা দাও, যিনি চিরঞ্জীব।” —(তাফসীরে আবী হাতেম, হাদিস নং : ১৫২৯১)
এই হাদিস থেকে স্পষ্টভাবে জানা যায়, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কেও সিজদা করা ইসলামে নিষিদ্ধ। কারণ, মহান আল্লাহপাক নিজেই ঘোষণা করেছেন—
فَاسْجُدُوا لِلَّهِ وَاعْبُدُوا
“এখনও( সময় আছে) আল্লাহর সামনেই সিজদায় ঝুঁকে পড়ো এবং তাঁর বন্দেগীতে লিপ্ত হও।” —(সুরা নাজম : ৬২)
অপর আয়াতে মহান আল্লাহপাক বলেন—
وَأَنَّ الْمَسَاجِدَ لِلَّهِ فَلَا تَدْعُوا مَعَ اللَّهِ أَحَدًا
“এবং (আমার কাছে ওহী এসেছে যে,) সিজদাসমূহ আল্লাহরই প্রাপ্য। সুতরাং আল্লাহর সাথে অন্য কারও ইবাদত করো না।” —(সুরা জ্বিন : ১৮)
এই আয়াতের ব্যাপারে হযরত সাঈদ ইবনে যুবাইর রহি. বলেন,
نَزَلَتْ فِي أَعْضَاءِ السُّجُودِ، أَيْ: هِيَ لِلَّهِ فَلَا تَسْجُدُوا بِهَا لِغَيْرِهِ
“এই আয়াতটি সিজদার অংঙ্গ সম্পর্কে অবতীর্ণ হয়েছে, যার অর্থ—এগুলো আল্লাহর জন্য, তাই তোমরা এগুলো দিয়ে তাঁকে ছাড়া অন্য কাউকে সিজদা করো না।” —(উমদাতুত তাফাসীর, খ. ৩ পৃ. ৫৮৯
সুতরাং আল্লাহ ছাড়া আর কাউকে সিজদাহ করা বৈধ নয়। অন্তরে গুরুর কল্পনা করারও কোনো সুযোগ নেই। কারণ, হাদিস শরীফে এসেছে, হযরত জিবরাঈল আ. একদিন এসে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে প্রশ্ন করলেন—
مَا الإِسْلاَمُ قَالَ " الإِسْلاَمُ أَنْ تَعْبُدَ اللَّهَ وَلاَ تُشْرِكَ بِهِ، وَتُقِيمَ الصَّلاَةَ، وَتُؤَدِّيَ الزَّكَاةَ الْمَفْرُوضَةَ، وَتَصُومَ رَمَضَانَ ". قَالَ مَا الإِحْسَانُ قَالَ " أَنْ تَعْبُدَ اللَّهَ كَأَنَّكَ تَرَاهُ، فَإِنْ لَمْ تَكُنْ تَرَاهُ فَإِنَّهُ يَرَاكَ
“ইসলাম কী?’ তিনি বললেনঃ ‘ইসলাম হলো—আপনি আল্লাহর ইবাদত করবেন এবং তাঁর সাথে অংশীদার স্থাপন করবেন না, সালাত প্রতিষ্ঠা করবেন, ফরজ যাকাত আদায় করবেন এবং রমাদান-এর সিয়ামব্রত পালন করবেন।’ ঐ ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলেন, ‘ইহসান কী?’ তিনি বললেন—আপনি এমনভাবে আল্লাহর ‘ইবাদাত করবেন যেন আপনি তাঁকে দেখছেন, আর যদি আপনি তাঁকে দেখতে না পান তবে (মনে করবেন) তিনি আপনাকে দেখছেন।” —(সহিহ বুখারী, হাদিস নং : ৫০)
এ হাদিসে সুস্পষ্টভাবে নির্দেশ করা হয়েছে—সিজদার মুহূর্তে কল্পনা ও ধ্যান একমাত্র আল্লাহ তাআলার প্রতিই নিবদ্ধ থাকবে। অথচ বাউলরা ধ্যান করে গুরুর প্রতি। তাহলে এটি কি সুস্পষ্ট শিরক নয়? নিন্মের ঘটনাটির দিকে একটু গভীরভাবে লক্ষ্য করুন—
إن أمية بن خلف وأبا جهل بن هشام ورجالا من قريش أتوا رسول الله - صلى الله عليه وآله وسلم - فقالوا : تعال فتمسح آلهتنا وندخل معك في دينك ، وكان رسول الله - صلى الله عليه وآله وسلم - يشتد عليه فراق قومه ويحب إسلامهم ، فرق لهم ، فأنزل الله
“উমাইয়া ইবনে খালাফ, আবু জাহল এবং কুরাইশদের কিছু লোক আল্লাহর রাসূল সা.-এর কাছে এসে বললো—হে মুহাম্মাদ, আসো, আমাদের দেবতাদের স্পর্শ করো, তাহলে আমরা তোমার সাথে তোমার ধর্মে প্রবেশ করবো। (আর বাস্তবতা তো এই ছিলো যে,) আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছ থেকে তাঁর কওম ভিন্ন হওয়ার কারণে তাঁর জন্য পরিস্থিতি অনেক কঠিন হয়ে পড়েছিলো, এজন্য তাদের ইসলাম গ্রহণকে তিনি পছন্দ করতেন, তাই তিনি তাদের আবেদনের প্রতি নমনীয়তা প্রকাশ করেছিলেন। অতঃপর সর্বশক্তিমান আল্লাহ এই (নিন্মোক্ত) আয়াতটি নাযিল করলেন।” —(ফাতহুল বয়ান ফি মাকাসিদিল কুরআন, খ. ৪ পৃ. ১৫৯)
وَإِنْ كَادُوا لَيَفْتِنُونَكَ عَنِ الَّذِي أَوْحَيْنَا إِلَيْكَ لِتَفْتَرِيَ عَلَيْنَا غَيْرَهُ ۖ وَإِذًا لَاتَّخَذُوكَ خَلِيلًا وَلَوْلَا أَنْ ثَبَّتْنَاكَ لَقَدْ كِدْتَ تَرْكَنُ إِلَيْهِمْ شَيْئًا قَلِيلًا إِذًا لَأَذَقْنَاكَ ضِعْفَ الْحَيَاةِ وَضِعْفَ الْمَمَاتِ ثُمَّ لَا تَجِدُ لَكَ عَلَيْنَا نَصِيرًا
“(হে নবী,) আমি তোমার কাছে যে ওহী পাঠিয়েছি, কাফেরগণ তোমাকে তা থেকে বিচ্যুত করার উপক্রম করছিল, যাতে তুমি এর পরিবর্তে অন্য কোনো কথা রচনা করে আমার নামে পেশ করো। সেক্ষেত্রে তারা তোমাকে অবশ্যই নিজেদের পরম বন্ধু বানিয়ে নিতো। আমি যদি তোমাকে অবিচলিত না রাখতাম, তবে তুমিও তাদের দিকে খানিকটা ঝুঁকে পড়ার উপক্রম করতে। আর তা হলে আমি দুনিয়ায়ও তোমাকে দ্বিগুণ শাস্তি দিতাম এবং মৃত্যুর পরও দ্বিগুণ। অতঃপর আমার বিরুদ্ধে তুমি কোন সাহায্যকারী পেতে না।” —(সুরা ইসরা : ৭৩-৭৫)
সুতরাং স্পষ্টই বুঝা যায়—মূর্তি তো নিজে নিষ্পাপ; তার কোনো ইচ্ছা নেই, কোনো অপরাধও নেই। তবু সেই নিস্পাপ মূর্তিকে সিজদা করাই যদি জঘন্য শিরক হয়, তবে একজন পাপাচারী পীরকে সিজদা দেওয়া কী ভয়াবহ শিরক হবে না? তার চেয়ে বড় মুশরিক আল্লাহর জমিনে আর কে হতে পারে?
মন্তব্য (...)
এ সম্পর্কিত আরও প্রবন্ধ
কুরআনের তাফসীর পড়া যাবে না! হেযবুত তওহীদ পর্ব–১৭
যদি কেউ বড় শিক্ষিত হয়, তবে তার বক্তব্য বুঝতে হলে নিশ্চয় জ্ঞানী হতে হয়, অথবা জ্ঞানীদের থেকে বুঝে নিতে...
মুফতী রিজওয়ান রফিকী
৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৫
৪৪৬৯