কুরআন আল্লাহর কিতাব নয়! বাউল মতবাদ! পর্ব—৯
কুরআন আল্লাহর কিতাব নয়! বাউল মতবাদ! পর্ব—৯
আমাদের হাতে থাকা পবিত্র কুরআন আল্লাহর নাযিলকৃত কিতাব। লওহে মাহফুজ থেকে নবুওয়াতের ২৩ বছরে পর্যায়ক্রমে নাযিল হওয়া এ কিতাব আমাদের হাতে হাফেজদের সীনার পাশাপাশি কাগজে লিপিবদ্ধ ও সংরক্ষিত।
বাউল ধর্মে কী বলে?
তাদের দাবি হলো—কাগজের কোনো গ্রন্থকে আল্লাহর কিতাব বলে না। দেখুন, তারা লিখেছে—
লালনদেহ কেতাব : শাঁইজির বাণী জাগ্রত কোরান
স্রষ্টার বিকাশ বিজ্ঞানকে কেতাব বলে, কাগুজে কোনো গ্ৰন্থকে নয় । কেতাবের তথা জীবন রহস্য বিজ্ঞানের আংশিক প্রকাশ বা কিছু কথা হলো কোরান । —লালনদর্শন, পৃ. ১২৯
অর্থাৎ বাউলরা বুঝাত চায়—আমাদের হাতে যে কাগজের কুরআন আছে, এটাকে কুরআন বলে না, বরং যে-সকল বিষয় স্রষ্টাকে প্রকাশ করে সেগুলোই কুরআন।
ইসলাম কী বলে?
কুরআন বলা হয়—যা পাঠ করা হয়। ইসলামী পরিভাষায় যে ওহী তিলাওয়াত করা হয়, তাকে কুরআন বলে। এই কুরআন আমাদের হাতে কাগজে লিপিবদ্ধ অবস্থায় বিদ্যমান। লালন অনুসারী বাউলরা এই কাগুজে কুরআনকে অস্বীকার করে। অথচ কুরআনের ওপর ঈমান রাখা আমাদের ওপর ফরজ করা হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন,
وَالَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ وَآمَنُوا بِمَا نُزِّلَ عَلَىٰ مُحَمَّدٍ وَهُوَ الْحَقُّ مِن رَّبِّهِمْ ۙ كَفَّرَ عَنْهُمْ سَيِّئَاتِهِمْ وَأَصْلَحَ بَالَهُمْ
“আর যারা ঈমান এনেছে ও সৎকর্ম করেছে এবং মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর প্রতি যা-কিছু অবতীর্ণ হয়েছে আর সেটাই তো তাদের প্রতিপালকের পক্ষ হতে আগত সত্য তা আন্তরিকভাবে মেনে নিয়েছে, আল্লাহ তাদের পাপসমূহ ক্ষমা করে দিয়েছেন এবং তাদের অবস্থা সংশোধন করে দিয়েছেন।” —(সুরা মুহাম্মাদ : ২)
কিন্তু যারা আল্লাহ তাআলান কোনো একটি আয়াতকে অস্বীকার করে, তাদের ব্যাপারে মহান আল্লাহ বলেন,
إِنَّ الَّذِينَ كَذَّبُوا بِآيَاتِنَا وَاسْتَكْبَرُوا عَنْهَا لَا تُفَتَّحُ لَهُمْ أَبْوَابُ السَّمَاءِ وَلَا يَدْخُلُونَ الْجَنَّةَ حَتَّىٰ يَلِجَ الْجَمَلُ فِي سَمِّ الْخِيَاطِ ۚ وَكَذَٰلِكَ نَجْزِي الْمُجْرِمِينَ
“নিশ্চয়ই যারা আমার আয়াতসমূহ প্রত্যাখ্যান করেছে এবং অহংকারের সাথে তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে, তাদের জন্য আকাশের দরজাসমূহ খোলা হবে না এবং তারা জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না, যতক্ষণ না সুঁইয়ের ছিদ্র দিয়ে উট প্রবেশ করে। এভাবেই আমি অপরাধীদেরকে (তাদের কৃতকর্মের) বদলা দেই।” —(সুরা আরাফ : ৪০)
وَالَّذِينَ كَفَرُوا بِآيَاتِ اللَّهِ وَلِقَائِهِ أُولَٰئِكَ يَئِسُوا مِن رَّحْمَتِي وَأُولَٰئِكَ لَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ
“যারা আল্লাহর আয়াতসমূহ ও তাঁর সাক্ষাতকে অস্বীকার করেছে, তারাই আমার রহমত থেকে নিরাশ হয়ে গেছে। তাদের জন্য আছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি।” —(সুরা আনকাবুত :২৩)
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا آمِنُوا بِاللَّهِ وَرَسُولِهِ وَالْكِتَابِ الَّذِي نَزَّلَ عَلَىٰ رَسُولِهِ وَالْكِتَابِ الَّذِي أَنزَلَ مِن قَبْلُ ۚ وَمَن يَكْفُرْ بِاللَّهِ وَمَلَائِكَتِهِ وَكُتُبِهِ وَرُسُلِهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ فَقَدْ ضَلَّ ضَلَالًا بَعِيدًا
“হে মুমিনগণ, ঈমান রাখো আল্লাহর প্রতি, তাঁর রাসুলের প্রতি, যে কিতাব তাঁর রাসুলের উপর নাযিল করেছেন তার প্রতি এবং যে কিতাব তার আগে নাযিল করেছেন তার প্রতি। যে ব্যক্তি আল্লাহকে, তাঁর ফিরিশতাগণকে, তাঁর কিতাবসমূহকে, তাঁর রাসূলগণকে এবং পরকালকে অস্বীকার করে, সে বহু দূরের ভ্রষ্টতায় পথভ্রষ্ট হয়ে যায়।” —(সুরা নিসা : ১৩৬)
সুতরাং যারা কুরআনে কারীমকে কাগুজে কুরআন বলে অস্বীকার করে, তারা সুস্পষ্ট কাফের এবং বেঈমান।
‘দেল কুরআন’ :
বাউলরা মূলত ‘দেল কুরআন’ নামে একটা নতুন কুরআনের আবিস্কার করেছে। তারা আমাদের হাতে থাকা কাগুজে কুরআন বিশ্বাস করে না, বরং তাদের দাবী হলো—আসল কুরআন ছিনায় থাকে। যাকে দেল কুরআন বলে। এ সম্পর্কে তারা লিখেছে—
মহানবীর উচ্চতর মহাজ্ঞানের দরজা, তাঁর নবুয়ত, বেলায়েত ও রেসালতের সুযোগ্য অধিকারী রসুল বা নিয়োজিত প্রতিনিধি মাওলা আলী (করমুল্লাহ)। কিন্তু ওমর, আবু বকর, ওসমান, আয়েশা, আবু সুফিয়ান, মাবিয়া গং গোত্রীয় চক্রান্তে রসুলতত্ত্ব তথা নবীর আদর্শিক মোকামের অধিবাসী বা আহলে বাইতের আধ্যাত্মিক কর্তৃত্ব ও কোরান জোর করে কেড়ে নেয়। —অখণ্ড লালনসঙ্গীত, পৃ. ৯৩
অর্থাৎ আসল কুরআন সাহাবায়ে কেরাম রা. গুপ্ত করে দিয়েছেন। এ বিষয়ে লালন একাডেমির সাবেক পরিচালক ডক্টর আনোয়ারুল করীম লিখেছেন—
এই (বাউল) ধর্ম বাতেনী ধর্ম এবং তাদের সাধনা গুহ্য সাধনা। এরা কোরান শরীফে বিশ্বাস করে, তবে সে কোরান লিখিত নয়। তারা বলেন, কোরান রয়েছে তাদের ছিনায় ছিনায়। একে তারা ‘দেল কোরান’ নামে অভিহিত করেছে। —(বাংলাদেশের বাউল, পৃ. ১৪৭)
অথচ আল্লাহর দীন সবার সামনে স্পষ্ট, তাঁর কুরআনও দিবালোকের চেয়েও উজ্জলভাবে আমাদের কাছে তিনি দিয়ে গেছেন। হাদিস শরীফে এসেছে—
أن عمر بن الخطاب أتى النبي صلى الله عليه و سلم بكتاب أصابه من بعض أهل الكتاب فقال يا رسول الله إني أصبت كتابا حسنا من بعض أهل الكتاب قال فغضب وقال امتهوكون فيها يا بن الخطاب فوالذي نفسي بيده لقد جئتكم بها بيضاء نقية لا تسألوهم عن شيء فيخبروكم بحق فتكذبوا به أو بباطل فتصدقوا به والذي نفسي بيده لو كان موسى حيا ما وسعه إلا أن يتبعني
হযরত উমর ইবনে খাত্তাব রা. নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর খেদমতে কোনো আহলে কিতাব (ইহুদীদের) থেকে একটি কিতাব নিয়ে আসলেন। তিনি বললেন—ইয়া রাসূলুল্লাহ, আমি একজন আহলে কিতাব থেকে একটি সুন্দর কিতাব পেয়েছি। বর্ণনাকারী বলেন, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম (হযরত উমর রা. এই কিতাব দেখে) রাগান্বিত হয়ে গেলেন এবং বললেন, হে উমর ইবনে খাত্তাব! তোমরা কি তাতে হয়রান হয়ে পড়েছ? যার কুদরতী হাতে আমার প্রাণ তার কসম! নিশ্চয় আমি তোমাদের নিকট স্বচ্ছ উজ্জ্বল দীন নিয়ে এসেছি। তাদেরকে কোনো বিষয় সম্পর্কে জিজ্ঞেস করো না। তাহলে তারা সত্য সম্পর্কে তোমাদেরকে অবহিত করবে, আর তোমরা তা মিথ্যাপ্রতিপন্ন করবে। অথবা মিথ্যা সম্পর্কে অবহিত করবে, আর তোমরা তা সত্য বলে মেনে নিবে। যেই সত্ত্বার হাতে আমার প্রাণ সেই যাতের কসম! যদি হযরত মুসা (আ.) জীবিত থাকতেন তাহলে তাঁর পক্ষেও আমার দীনের অনুসরণ ব্যতীত কোন সুযোগ থাকতো না। —(মুসনাদে আহমাদ : হাদিস নং : ১৫১৫৬)
সুতরাং যে দীন স্বচ্ছ ও উজ্জ্বল সে দীনের কিতাব গুপ্ত বা ‘দেল কুরআন’ এমনটা দাবি করার পেছনে তাদের গভীর ষড়যন্ত্র রয়েছে। অর্থাৎ ধর্মের নামে নিজেদের মনমতো নতুন নতুন বিষয় আবিস্কার করে স্বার্থসিদ্ধি করাই তাদের মূল টার্গেট।