পীর, নবী ও আল্লাহ একজনই! বাউল মতবাদ! পর্ব—৬
পীর, নবী ও আল্লাহ একজনই! বাউল মতবাদ! পর্ব—৬
আল্লাহ তাআলা এক ও অদ্বিতীয় সত্তা, যাঁর কোনো অংশীদার নেই। না তাঁর সঙ্গে, না তাঁর সিফাতে—কারো শরীক হতে পারে। তিনি অনন্য এবং অতুলনীয়।
বাউল ধর্মে কী বলে?
লালন ফকির বা বাউল মতবাদের আকিদা বা বিশ্বাস হলো— পীর, রাসুল ও আল্লাহ একজনই। নাউযুবিল্লাহ! দেখুন, লালন ফকির কী লিখেছে—
নবি চেনা রসুল জানা ও দিনকানা তোর ভাগ্যে জোটে না
আল্লাহ, মোহাম্মদ, নবি তিনে হয় একজনা। —লালনভাষা অনুসন্থান, খ. ২ পৃ. ১৮২
লালনের এই শিরকি বক্তব্যের ব্যাখ্যা করতে গিয়ে লালনভক্ত আবদেল মান্নান তার বইয়ে লিখেছে—
মহানবির দেহত্যাগের পর নবির ঘোষিত ‘মাওলা’ আলীকে (আঃ) অগ্রাহ্য করার জন্যে আবু বকর মাওলাইয়াতকে পাশ কাটিয়ে ‘আহলে সুন্নত ওয়াল জামাত’ নামক ফ্যাকড়া তৈরি করে ফতুয়া দিলো ‘আল্লাহ ও রসুলকে দুটি পৃথক সত্তা বলে । এ কথা সরাসরি কোরানবিরোধী । কারণ কোরান বলেন: যারা আল্লাহ ও রসুলের মধ্যে পার্থক্য করে তারা স্পষ্টত কাফের। আবু বকর, ওমর, ওসমান, আয়েশা, মাবিয়া, এজিদের সুন্নতি মুসলমানদের সাথে এক্ষেত্রে অহাবিদের মৌলিক দূরত্ব নেই। -লালনভাষা অনুসন্ধান খ. ২ পৃ. ১৮১-১৮২
লালন লিখেছে—
যেহি মোর্শেদ সেহি রসুলাল্লাহ, সাবুদ কোরান কালামুল্লাহ
আশেকে বলিলে আল্লাহ তাও হয় সে৷ —অখণ্ড লালনসঙ্গীত, পৃ. ৬৫
যেহি মুরশিদ সেই তো রসুল, ইহাতে নাই কোনো ভুল, খোদাও সে হয়।
এমন কথা লালন কয় না কোরানে কয়। —অখণ্ড লালনসঙ্গীত : পৃ. ৬৩
আবদেল মাননান আরও লিখেছে—
‘কোরান বলেন, “যারা আল্লাহ ও রসুলের মধ্যে পার্থক্য করে তারা নির্ভেজাল কাফের”। অথচ প্রচলিত ও অতিচর্চিত রাজতান্ত্রিক-সাম্রাজ্যবাদী সংস্করণের কোরানে অদ্বৈতসত্তা আল্লাহ আর রসুলকে সম্পূর্ণ দুইভাবে বিভক্ত করে পৃথক দুটি সত্তা হিসেবে দেখিয়ে থাকে। আবু বকর-ওমর-ওসমানদের সৃষ্ট কুটিল চক্রান্তে নবীকে আল্লাহ্ থেকে আলাদা বানিয়ে সাধারণ মানুষের পর্যায়ে নামিয়ে আনা হয়। তাই এখনও প্রতিদিন পাঁচবার আজানের পর নবীকে বেহেস্তে পাঠানোর জন্যে আল্লাহর কাছে মোনাজাত করে থাকে বেওকুফেরা। তার উপর অহাবী-অসুর কঠিমোল্লারা তো মোর্শেদ বা গুরুসত্তার কোনও স্বীকৃতিই মানতে নারাজ। কিন্তু শাইজী লালনের দিব্যদৃষ্টিতে মোর্শেদ-রসুল-আল্লাহ্ একই অখণ্ড মহাসত্তার বিকাশ তথ্য ওয়াহাদানিয়াত। সর্বেশ্বরবাদ বা একেশ্বরবাদের মানেও তাই। আরবীয় জাতীয় সাম্রাজ্যবাদ আল্লাহ এবং রসুলকে নিজেদের খণ্ডাত্মক ধারণা ও স্বার্থবশে দাঁড় করিয়েছে পৃথক পৃথক অস্তিত্ব বলে । আর শাঁইজী বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া এই তিন সত্তাকে গেঁথেছেন একসুতোয়। “এমন কথা লালন কয় না কোরানে কয়”-এর সূক্ষ্ম তাৎপর্য হলো, লালন শাহর বাক্যমাত্রই কোরানবাক্য। মনগড়া কোনও কথা।’ —অখণ্ড লালনসঙ্গীত, পৃ. ৮২-৮৩
অর্থাৎ, লালন ফকির বা বাউলদের মতবাদ হলো—আল্লাহ, রাসুল ও পীর-মুরশিদ একই সত্তা, আলাদা কিছু নয়।
ইসলাম কী বলে?
প্রথমত জেনে নেয়া উচিত—এ আকিদা মূলত খ্রিস্টানদের। বাইবেল বলে—
‘যীশু হচ্ছেন মাংসে আগত ঈশ্বর, মানুষের দেহে ঈশ্বর।’—(যোহন ১:১, ১৪)
আস্তাগফিরুল্লাহ! কতইনা গর্হিত ও ভয়াবহ উক্তি এটা! পীর ও রাসুলকে আল্লাহ বা আল্লাহকে পীর বা রাসুল মনে করার এই জঘন্য আকীদা সরাসরি ইসলামের মূলভিত্তিতে কুঠারাঘাতের চেষ্টা। লালন ফকিরের এই গানগুলো তাওহীদ, রেসালাত, কুরআন-সুন্নাহ এবং ইসলামের মৌলিক আকীদা প্রত্যাখ্যান করে, সবকিছুকে অস্বীকার করে এক ধরনের কুহকভরা, মরমিয়া নান্দনিকতার মোড়কে বলা হয়েছে—যা স্পষ্টভাবে শিরক, কুফর, নিফাক ও গোমরাহীর সীমা অতিক্রম করেছে।
আফসোস! সেই সমস্ত কুফরী ও শিরকী বিশ্বাসকে উৎখাত করার জন্যই ইসলামের আগমন ঘটেছিল, অথচ লালনের গানে সেগুলো বারবার প্রকাশ পায়; আরও আফসোসের বিষয়, যে এই দুর্বাক্যপূর্ণ গানগুলো সম্মান ও পৃষ্ঠপোষকতা পর্যন্ত লাভ করেছে।
প্রিয় পাঠক, একটু ভাবুন তো—যদি আল্লাহ, রাসুল ও মুরশিদ একজনেই হয়ে থাকে, তাহলে তাওহীদ, অর্থাৎ একাত্ববাদকে বহুত্ববাদের মধ্যে রূপান্তরিত করে আল্লাহকে একাধিক সত্তায় ভাগ করার সমান হয়ে যায় না? অথচ মহান রব্ব এক ও অদ্বিতীয়, যাঁর কোনো শরীক নেই, যাঁর কোনো আকার নেই, এবং যাঁর কোনো তুলনা নেই। এ বিষয়ে কিছু আয়াত এখানে পেশ করা হলো। আল্লাহ তাআলা বলেন—
وَإِلَٰهُكُمْ إِلَٰهٌ وَاحِدٌ ۖ لَّا إِلَٰهَ إِلَّا هُوَ الرَّحْمَٰنُ الرَّحِيمُ
“তোমাদের মাবুদ একই মাবুদ, তিনি ছাড়া অন্য কোনো মাবুদ নেই। তিনি সকলের প্রতি দয়াবান, পরম দয়ালু।” —(সুরা বাকারা : ১৬৩)
لَّقَدْ كَفَرَ الَّذِينَ قَالُوا إِنَّ اللَّهَ ثَالِثُ ثَلَاثَةٍ ۘ وَمَا مِنْ إِلَٰهٍ إِلَّا إِلَٰهٌ وَاحِدٌ ۚ وَإِن لَّمْ يَنتَهُوا عَمَّا يَقُولُونَ لَيَمَسَّنَّ الَّذِينَ كَفَرُوا مِنْهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ
“এবং তারাও নিশ্চয়ই কাফির হয়ে গিয়েছে, যারা বলে, ‘আল্লাহ তিনজনের মধ্যে তৃতীয় জন।’ অথচ এক ইলাহ ব্যতীত কোনো ইলাহ নেই। তারা যদি তাদের এ কথা থেকে বিরত না হয়, তবে তাদের মধ্যে যারা কুফরীতে লিপ্ত হয়েছে, তাদেরকে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি স্পর্শ করবে।” —(সুরা মায়িদা : ৭৩)
يَا أَهْلَ الْكِتَابِ لَا تَغْلُوا فِي دِينِكُمْ وَلَا تَقُولُوا عَلَى اللَّهِ إِلَّا الْحَقَّ ۚ إِنَّمَا الْمَسِيحُ عِيسَى ابْنُ مَرْيَمَ رَسُولُ اللَّهِ وَكَلِمَتُهُ أَلْقَاهَا إِلَىٰ مَرْيَمَ وَرُوحٌ مِّنْهُ ۖ فَآمِنُوا بِاللَّهِ وَرُسُلِهِ ۖ وَلَا تَقُولُوا ثَلَاثَةٌ ۚ انتَهُوا خَيْرًا لَّكُمْ ۚ إِنَّمَا اللَّهُ إِلَٰهٌ وَاحِدٌ ۖ سُبْحَانَهُ أَن يَكُونَ لَهُ وَلَدٌ ۘ لَّهُ مَا فِي السَّمَاوَاتِ وَمَا فِي الْأَرْضِ ۗ وَكَفَىٰ بِاللَّهِ وَكِيلًا
“হে কিতাবীগণ, নিজেদের ধর্মে অতিরিক্ত সীমালঙ্ঘন কোরো না এবং আল্লাহর সম্পর্কে সত্য ছাড়া অন্য কোনো কথা বলো না। মারইয়ামের পুত্র ঈসা মাসীহ শুধুমাত্র আল্লাহর রাসূল; তিনি আল্লাহর একটি কালিমা, যা তিনি মারইয়ামের কাছে প্রেরণ করেছিলেন, এবং তিনি এক রূহ, যা আল্লাহর পক্ষ থেকে সৃষ্টি হয়েছিল। সুতরাং, তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলগণের প্রতি ঈমান আনো এবং বলো না—“তিন।” এ ধরনের অভিযোগ থেকে বিরত থাকো। এটাই তোমাদের কল্যাণ। আল্লাহ একমাত্র মাবুদ; তাঁর কোনো পুত্র নেই, এবং তিনি সবদিক থেকে পরিপূর্ণ পবিত্র। আকাশমণ্ডল ও পৃথিবীতে যা কিছু আছে, সবই তাঁরই। সমস্ত সৃষ্টির তত্ত্বাবধানের জন্য আল্লাহ যথেষ্ট।” —সুরা নিসা : ১৭১
أَئِنَّكُمْ لَتَشْهَدُونَ أَنَّ مَعَ اللَّهِ آلِهَةً أُخْرَىٰ ۚ قُل لَّا أَشْهَدُ ۚ قُلْ إِنَّمَا هُوَ إِلَٰهٌ وَاحِدٌ وَإِنَّنِي بَرِيءٌ مِّمَّا تُشْرِكُونَ
“সত্যিই কি তোমরা এই সাক্ষ্য দিতে পারো যে, আল্লাহর সাথে অন্যান্য মাবুদও আছে? বলে দাও, আমি তো (এরূপ) সাক্ষ্য দেবো না। বলে দাও, তিনি তো একই মাবুদ। তোমরা যে সকল জিনিসকে তাঁর শরীক সাব্যস্ত করো, আমি তাদের থেকে বিমুখ।” —(সুরা আনআম : ১৯)
اتَّبِعْ مَا أُوحِيَ إِلَيْكَ مِن رَّبِّكَ ۖ لَا إِلَٰهَ إِلَّا هُوَ ۖ وَأَعْرِضْ عَنِ الْمُشْرِكِينَ
“(হে নবী,) তোমার প্রতিপালকের পক্ষ হতে তোমার প্রতি যে ওহী পাঠানো হয়েছে, তুমি তারই অনুসরণ করো। তিনি ছাড়া কোনো মাবুদ নেই। যারা (আল্লাহর সঙ্গে) শিরক করে, তাদের অগ্রাহ্য করো।” —(সুরা আনআম : ১০৬)
اللَّهُ لَا إِلَٰهَ إِلَّا هُوَ الْحَيُّ الْقَيُّومُ ۚ لَا تَأْخُذُهُ سِنَةٌ وَلَا نَوْمٌ ۚ لَّهُ مَا فِي السَّمَاوَاتِ وَمَا فِي الْأَرْضِ
“আল্লাহ তিনি, যিনি ছাড়া কোনো মাবুদ নেই, যিনি চিরঞ্জীব, (সমগ্র সৃষ্টির) নিয়ন্ত্রক, যাঁর কখনও তন্দ্রা পায় না এবং নিদ্রাও নয়, আকাশমণ্ডলে যা-কিছু আছে (তাও) এবং পৃথিবীতে যা-কিছু আছে (তাও) সব তাঁরই।” —(সুরা বাকারা : ২৫৫)
شَهِدَ اللَّهُ أَنَّهُ لَا إِلَٰهَ إِلَّا هُوَ وَالْمَلَائِكَةُ وَأُولُو الْعِلْمِ قَائِمًا بِالْقِسْطِ ۚ لَا إِلَٰهَ إِلَّا هُوَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ
“আল্লাহ স্বয়ং এ বিষয়ের সাক্ষ্য দেন এবং ফিরিশতাগণ ও জ্ঞানীগণও যে, তিনি ছাড়া কোন মাবুদ নেই, যিনি ইনসাফের সাথে (বিশ্ব জগতের) নিয়ম-শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ করছেন। তিনি ছাড়া অন্য কেউ ইবাদতের উপযুক্ত নয়। তাঁর ক্ষমতা পরিপূর্ণ এবং হিকমতও পরিপূর্ণ।” —(সুরা আলে ইমরান : ১৮)
وَمَا مِنْ إِلَٰهٍ إِلَّا اللَّهُ ۚ وَإِنَّ اللَّهَ لَهُوَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ
“আল্লাহ ছাড়া কোনো মাবুদ নেই এবং নিশ্চয়ই আল্লাহ পরাক্রান্ত, প্রজ্ঞাময়।” —(সুরা আলে ইমরান : ৬২)
لَوْ كَانَ فِيهِمَا آلِهَةٌ إِلَّا اللَّهُ لَفَسَدَتَا ۚ فَسُبْحَانَ اللَّهِ رَبِّ الْعَرْشِ عَمَّا يَصِفُونَ
“যদি আসমান ও যমীনে আল্লাহ ছাড়া অন্য মাবুদ থাকতো, তবে উভয়ই ধ্বংস হয়ে যেত। সুতরাং তারা যা বলছে, আরশের মালিক আল্লাহ তা থেকে সম্পূর্ণরূপে পবিত্র।” —(সুরা আম্বিয়া : ২২)
فَاطِرُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ ۚ جَعَلَ لَكُم مِّنْ أَنفُسِكُمْ أَزْوَاجًا وَمِنَ الْأَنْعَامِ أَزْوَاجًا ۖ يَذْرَؤُكُمْ فِيهِ ۚ لَيْسَ كَمِثْلِهِ شَيْءٌ ۖ وَهُوَ السَّمِيعُ الْبَصِيرُ
“তিনি আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর সৃষ্টিকর্তা। তিনি তোমাদেরই মধ্য হতে তোমাদের জন্য জোড়া সৃষ্টি করেছেন এবং চতুষ্পদ জন্তুদের মধ্যেও সৃষ্টি করেছেন জোড়া। এর মাধ্যমে তিনি তোমাদের বংশ বিস্তার করেন। কোনো জিনিস নয় তার অনুরূপ। তিনিই সব কথা শোনেন, সবকিছু দেখেন।” —(সুরা আশ্-শুরা : ১১)
প্রিয় পাঠক, উপরিউক্ত আয়াতসমূহ থেকে সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয় যে, মহান আল্লাহ এক ও অদ্বিতীয়। তাঁর সঙ্গে অন্য কাউকে শরীক করার কাহিলতা স্বয়ং আল্লাহ প্রত্যাখ্যান করেছেন। উপরন্তু, এই সব আয়াত নাযিল হয়েছে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর। যদি আল্লাহ এবং রাসুল একই সত্তা হতেন, তাহলে এই আয়াতগুলোর নবীজি আলাইহিস সালামের ওপর নাযিল হওয়ার কোনো অর্থই থাকতো না।
মন্তব্য (...)
এ সম্পর্কিত আরও প্রবন্ধ
ফিরিস্তা এবং দেবতা একই জিনিষ! হেযবুত তওহীদ। পর্ব–১০
সমস্ত মুসলামানকে আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও আসমানী কিতাবের মতো ফেরেশতাদের অস্ত...
মুফতী রিজওয়ান রফিকী
৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৫
৩৫০৯
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন