মানুষের মধ্যেই আল্লাহ বিরাজমান! বাউল মতবাদ! পর্ব—২
মানুষের মধ্যেই আল্লাহ বিরাজমান! বাউল মতবাদ! পর্ব—২
ইসলামী আকিদা সূর্যের আলোর মতোই স্পষ্ট—এতে কোনো গোঁজামিল নেই, নেই কোনো অস্পষ্টতা। পবিত্র ইসলাম ধর্মে এক আল্লাহ সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও নির্ভ্রান্ত ধারণা প্রদান করা হয়েছে। তিনি সব সৃষ্টির ঊর্ধ্বে; তাঁকে সৃষ্টির গণ্ডির ভেতরে আবদ্ধ করা কখনোই সম্ভব নয়।
বাউল ধর্মে কী বলে?
তারা দাবি করে—‘মানুষের মধ্যেই আল্লাহ বিরাজমান’। এজন্য তারা ‘দেহসাধন’ নামে মানুষের পূঁজা করাকে ইবাদত মনে করে থাকে। নিন্মে তাদের কয়েকটা উক্তি পেশ করা হলো—
লালন লিখেছে—
গুরু তুমি পতিত পাবন পরম ঈশ্বর
অখণ্ড মন্ডলাকারং ব্যাপ্তং যেনো চরাচর।
আমি লালন এক শিরে,
ভাই বন্ধু নাই আমার জোড়ে
ভুগেছিলাম পত্রুজ্বরে,
মলম শাহ করেন উদ্ধার। —(মহাত্মা লালন, পৃ. ২৬)
এই গানে ‘পরম ঈশ্বর’ শব্দের মাধ্যমে সরাসরি গুরুকে আল্লাহ বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে৷ তাছাড়া আরও লিখেছে—
আমি সত্য হলে গুরু সত্য হবে; আমি সত্য না হলে গুরু সত্য কেমন করে হবে। আমার ভেতরেইতো গুরুর বসবাস। আমার রূপই পরম গুরুর রূপ প্রকাশ। মানুষ ভজার মধ্য দিয়ে মহান আল্লাহকে দয়াল রসুলকে সেই অধরা মনের মানুষের সন্ধান পাওয়া যায়, রূপসাধনে দেখা মেলে এবং সোনার মানুষ (গুরুসত্তা) হওয়া যায়। মহাত্মা লালন তাইতো বলেছেন—
ক্ষ্যাপা না জেনে তোর আপন খবর যাবি কোথায়!
আমি সত্য না হলে, গুরু সত্য হয় কোনকালে
আমি যেরূপ দেখ না সেরূপ দীন দয়াময়। —(মহাত্মা লালন, পৃ. ১১০)
জগতে মানুষকে ভজলে মানুষকে নমস্য জানলে সোনার মানুষ হওয়া যায়। মানুষ ভজার মধ্য দিয়েই সিদ্ধি লাভ এবং পরমাত্মার সাথে মিলন হয়। সুফিতত্ত্বে এই মাটির মানুষের হৃদয়ের মাঝেই জগৎগুরু মহান আল্লাহর বসবাস অর্থাৎ পরমাত্মার ঘর। তাই এই ঘর অতি পবিত্র। মহাপুরুষ মহাত্মা ফকির লালন সাঁহ মনে-প্রাণে বিশ্বাস করতেন যে, পৃথিবীর সকল মানব সন্তানের ভেতরে অধরা মনের মানুষ বাস করেন। ফলে নিরিখ বেঁধে সত্যমনে সাধনে তাকে লাভ করতে হবে। —(মহাত্মা লালন, পৃ. ১১০)
বাউলসাধক শাহ আবদুল করিম এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন—‘আমি
কখনোই আসমানি খোদাকে মান্য করি না। মানুষের মধ্যে যে খোদা বিরাজ করে আমি তার চরণেই পূজো দেই।' এ রকম বাউলদের প্রায় সবাই মানুষ ভজনার জয়গান গেয়েছেন। তাঁদের বিশ্বাস, মানুষের মধ্যেই সৃষ্টিকর্তা আসীন, তাই তাঁকে ভালোবাসলেই সৃষ্টিকর্তার ভালোবাসা পাওয়া সম্ভব। নেত্রকোনার বাউল জালালউদ্দীন খাঁর গানের একটি পঙক্তি তো রীতিমতো প্রবাদতুল্য—‘মানুষ থুইয়া খোদা ভজ, এই মন্ত্রণা কে দিয়াছে'। এই মানুষের মধ্যে সৃষ্টিকর্তাকে খোঁজার আকুলতা বাউলদের বস্তুবাদী চেতনার বিষয়টিই পরিস্ফুট হয়। —(বাউলসাধনা, পৃ. ৩০)
মানুষ ভজা, মানুষকে জ্ঞান করা, মানুষের মাঝে পরমের বসবাস-এই বিশ্বাসকে মনে প্রাণে রেখে মানুষগুরু কৃপার মধ্যেই রয়েছে ফকির সাধনার মূলবস্তু...এই জীবাত্মার ভেতরেই সেই পরম সুন্দর মহামহিম পরমাত্মার বসবাস। পরমকে পেতে হলে আগে জীবাত্মাকে সাধন করতে হয়। —(মহাত্মা লালন, পৃ. ৩৬)
অর্থাৎ এই বক্তব্যের মাধ্যমে তারা হুলুল-সংক্রান্ত শিরকপূর্ণ আকিদাকেই প্রচার করেছে।
ইসলাম কী বলে?
এ প্রসঙ্গে সঠিকভাবে জানতে হলে আগে ‘হুলুল আকিদা’ সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা থাকা জরুরি।
হুলুল : ‘হুলুল’ শব্দের অর্থ প্রবেশ করা— অর্থাৎ একটি বস্তু অন্য কোনো বস্তুর মাঝে নিজস্ব স্বকীয়তা বজায় রেখে অবস্থান করা। উদাহরণস্বরূপ, চিনি ও বালির মিশ্রণকে ধরা যায়; এই মিশ্রণে চিনি ও বালি তাদের নিজেস্ব সত্তা বজায় রেখে একত্রে মিলিত হয়।
হুলুলের আকিদা মূলত খ্রিস্টান ধর্মে প্রচলিত। তারা বিশ্বাস করে যে আল্লাহর সত্ত্বা হযরত ইসা (আ.)-এর মধ্যে প্রবেশ করেছে। এটিই মূলত হুলুল আকিদা। এই আকিদা নি:সন্দেহে কুফুরী, এবং এর বিরুদ্ধে খোদ আল্লাহ তাআলা আয়াত নাযিল করেছেন—
يَا أَهْلَ الْكِتَابِ لَا تَغْلُوا فِي دِينِكُمْ وَلَا تَقُولُوا عَلَى اللَّهِ إِلَّا الْحَقَّ ۚ إِنَّمَا الْمَسِيحُ عِيسَى ابْنُ مَرْيَمَ رَسُولُ اللَّهِ وَكَلِمَتُهُ أَلْقَاهَا إِلَىٰ مَرْيَمَ وَرُوحٌ مِّنْهُ ۖ فَآمِنُوا بِاللَّهِ وَرُسُلِهِ ۖ وَلَا تَقُولُوا ثَلَاثَةٌ ۚ انتَهُوا خَيْرًا لَّكُمْ ۚ إِنَّمَا اللَّهُ إِلَٰهٌ وَاحِدٌ
“হে কিতাবীগণ, নিজেদের দীনে সীমালংঘন করো না এবং আল্লাহ সম্পর্কে সত্য ছাড়া অন্য কথা বলো না। মারইয়ামের পুত্র ঈসা মাসীহ তো আল্লাহর রাসুল মাত্র এবং আল্লাহর এক কালিমা, যা তিনি মারইয়ামের কাছে পাঠিয়েছিলেন। আর ছিলেন এক রূহ, যা তাঁরই পক্ষ হতে (সৃষ্টি হয়ে) ছিলো। সুতরাং তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলগণের প্রতি ঈমান আনো এবং বলো না (আল্লাহ) ‘তিন’। এর থেকে নিবৃত্ত হও। এরই মধ্যে তোমাদের কল্যাণ। আল্লাহ তো একই মাবুদ।” —সুরা নিসা : ১৭১
সুতরাং বুঝা গেলো—হুলুলের আকিদা সরাসরি কুরআনের বিরোধী এবং একটি কুফরী মতবাদ। কিন্তু এই আকিদা আরও বিস্তৃতভাবে লালন বা বাউলরা ধারণ করে। তাদের বিশ্বাস অনুযায়ী, শুধুমাত্র ঈসা (আ.)এর মধ্যেই নয়, বরং সকল মানুষের মধ্যে আল্লাহর সত্তা প্রবেশ করেছে। নাউযুবিল্লাহ!
ফকীহুন নফস আল্লামা রশিদ আহমদ গাংগুহী (রহ.) ‘ইমদাদুদ সুলক’ নামক গ্রন্থে এ ‘হুলুল’ আকিদার অসারতা বিশদভাবে তুলে ধরেছেন—
حق تعالی سب سے جدا ہے مخلوق اس سے مباین ہے پس مخلوق کا اس میہ حلول کرنا یا اس کا مخلوق میی حلول کرنا دونوں ہی محال ہی اور تمام انبیاء اور اولیاء و علماء حلول کے خلاف متفق ہے
“আল্লাহ তাআলা সবকিছু থেকে পৃথক। মাখলুক তথা সৃষ্টি তার থেকে ভিন্ন এবং পৃথক। মাখলুক তাঁর মাঝে হুলুল করা বা তিনি মাখলুকের মাঝে হুলুল করা কোনভাবেই সম্ভব নয়। হুলুলের আকিদার বিরুদ্ধে সকল নবী, ওলী এবং আলিমগণ একমত।” —(ইমদাদুস সুলুক, পৃ. ১৯৪)
মন্তব্য (...)
এ সম্পর্কিত আরও প্রবন্ধ
জেনারেল শিক্ষিতরা কীভাবে দীনের খেদমত করবেন?
দীনের খিদমত কী জিনিস? ধরেন, আমি ডাক্তার। এক হচ্ছে, আমি হালালভাবে ইনকাম করছি, যথাসাধ্য রোগীদের ফ্রী-ড...
ডাঃ শামসুল আরেফীন শক্তি
৭ নভেম্বর, ২০২৪
৫৫৫৯