প্রবন্ধ
পাপ-পুণ্যের ধারা প্রবাহিত হবে মৃত্যুর পরেও
১ নভেম্বর, ২০২৬
১৫৯
০
ভুমিকা
মানবজীবনে পাপ ও পুণ্য নৈতিকতা ও কর্মের মানদণ্ড। আল্লাহ মানুষকে বিবেক-বুদ্ধি ও ভালো-মন্দের পার্থক্য করার ক্ষমতা দিয়েছেন, যার সঠিক ব্যবহারের ওপরই ইহকাল ও পরকালের সাফল্য নির্ভর করে।
দুনিয়া হলো আখেরাতের কর্মক্ষেত্র। মৃত্যুর মাধ্যমে মানুষের দুনিয়াবী জীবনের সমাপ্তি ঘটে এবং আমল করার ক্ষমতা নিঃশেষ হয়ে যায়। কবরের পর কিয়ামতের দিন সকলকে আল্লাহর সামনে উপস্থিত হতে হবে, যেখানে হিসাব-নিকাশের পর স্থান হবে জান্নাত বা জাহান্নামে। সেদিন সবাই কৃতকর্মের জন্য আফসোস করবে, কিন্তু পুনরায় দুনিয়ায় ফেরার কোনো সুযোগ থাকবে না।
পাপ ও পুণ্যের ধারা মৃত্যুর পরও প্রবহমান থাকে। মানুষ দুনিয়া থেকে বিদায় নিলেও তার সূচিত ভালো কাজের অনুকরণে যারা আমল করবে, তার একটি সওয়াব মৃত ব্যক্তি পেতে থাকবে। একইভাবে, কেউ কোনো মন্দ কাজের প্রচলন করে গেলে, পরবর্তীতে যারা তা অনুসরণ করবে, তাদের গুনাহের সমপরিমাণ বোঝা সূচনাকারীর আমলনামায়ও যুক্ত হতে থাকবে।
তাই বুদ্ধিমানের কাজ হলো মৃত্যুর আগেই আখেরাতের সুচিন্তিত প্রস্তুতি নেওয়া, ভালো কাজের শুভ সূচনা করা এবং যেকোনো পাপাচার বা মন্দ প্রথা থেকে নিজেকে মুক্ত রাখা।
বুদ্ধিমানের কর্তব্য গোনাহ থেকে যথাসম্ভব বেঁচে থাকা, আখেরাতের চিরস্থায়ী সুখ ও শান্তির পথে অগ্রগামী হওয়া এবং মৃত্যুর আগেই মৃত্যু ও তার পরের জীবনের যথোচিত প্রস্তুতি নেওয়া।
পবিত্র কুরআন, হাদীস ও আসলাফের বাণী
আল্লাহ তাআলা কুরআন মাজীদে তাঁর প্রিয় মুমিনদেরকে এ কথাই স্মরণ করিয়েছেন:
وَأَنفِقُوا مِن مَّا رَزَقْنَاكُم مِّن قَبْلِ أَن يَأْتِيَ أَحَدَكُمُ الْمَوْتُ فَيَقُولَ رَبِّ لَوْلَا أَخَّرْتَنِي إِلَىٰ أَجَلٍ قَرِيبٍ فَأَصَّدَّقَ وَأَكُن مِّنَ الصَّالِحِينَ وَلَن يُؤَخِّرَ اللَّهُ نَفْسًا إِذَا جَاءَ أَجَلُهَا ۚ وَاللَّهُ خَبِيرٌ بِمَا تَعْمَلُونَ
অর্থ: আমি তোমাদের যে রিযিক দিয়েছি তা থেকে ব্যয় কর, এর আগে যে, তোমাদের কারো মৃত্যু এসে যাবে আর তখন সে বলবে, হে আমার প্রতিপালক! তুমি আমাকে কিছু কালের জন্য সুযোগ দিলে না কেন, তাহলে আমি দান-সদকা করতাম এবং নেক লোকদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যেতাম। যখন কারো নির্ধারিত কাল এসে যাবে তখন আল্লাহ তাকে কিছুতেই অবকাশ দিবেন না। আর তোমরা যা কিছু কর আল্লাহ সে সম্পর্কে পরিপূর্ণ অবহিত। (সূরা মুনাফিকূন, আয়াত নং: ১০-১১)
হাদীসে বুদ্ধিমানের পরিচয় এভাবে ব্যক্ত হয়েছে:
" الْكَيِّسُ مَنْ دَانَ نَفْسَهُ وَعَمِلَ لِمَا بَعْدَ الْمَوْتِ وَالْعَاجِزُ مَنْ أَتْبَعَ نَفْسَهُ هَوَاهَا وَتَمَنَّى عَلَى اللَّهِ ".
অর্থ: বুদ্ধিমান সে-ই যে নিজের হিসাব নেয় এবং মৃত্যুর পরের জীবনের জন্য আমল করে। আর অক্ষম সে-ই যে নিজের খেয়াল-খুশি অনুযায়ী চলে এবং আল্লাহর কাছে (বৃথা) আশা পোষণ করে। (জামে তিরমিযী, হাদীস নং: ২৪৫৯)
চতুর্থ খলীফা আলী ইবনে আবী তালিব (রা.)-এর বক্তব্যে দুনিয়া-আখেরাতের স্বরূপ এভাবে বর্ণিত হয়েছে:
إِنَّ الدُّنْيَا قَدْ تَرَحَّلَتْ مُدْبِرَةً، وَإِنَّ الْآخِرَةَ مُقْبِلَةٌ وَلِكُلِّ وَاحِدَةٍ مِنْهُمَا بَنُونَ، فَكُونُوا مِنْ أَبْنَاءِ الْآخِرَةِ، فَإِنَّ الْيَوْمَ عَمَلٌ وَلَا حِسَابَ، وَغَدًا حِسَابٌ وَلَا عَمَلَ
অর্থ: দুনিয়া ফিরে যাচ্ছে আর আখেরাত এগিয়ে আসছে। আর এ দুটির প্রত্যেকটিরই আছে সন্তানাদি। তোমরা আখেরাতের সন্তান হও। কারণ আজ শুধু আমল, হিসাব নেই। আর আগামীকাল শুধু হিসাব, আমল নেই। (মেশকাত শরীফ, হাদীস নং: ৫২১৫)
মৃত্যুর পর সওয়াব লাভের ধারাবাহিক উপায়সমূহ
আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের বিশেষ নিআমত হলো, মৃত্যুর মধ্য দিয়ে আমলের ধারা বন্ধ হয়ে গেলেও জীবদ্দশায় নির্দিষ্ট কিছু আমল করে গেলে মৃত্যুর পরও সওয়াব জারি থাকে। সওয়াব লাভের প্রধান প্রধান উপায়গুলো নিচে উল্লেখ করা হলো:
এক. সদকায়ে জারিয়া
স্থায়ী উপকারিতাসম্পন্ন দানকে ‘সদকায়ে জারিয়া’ বলা হয়, যা মৃত্যুর পরও সওয়াবের ধারা অব্যাহত রাখে। যেমন: ১. মসজিদ নির্মাণ, ২. মকতব-মাদরাসা প্রতিষ্ঠা, ৩. দ্বীনী পাঠাগার ও কিতাবের ব্যবস্থা, ৪. ঈদগাহ বানানো, ৫. কবরস্থান তৈরি, ৬. দ্বীনী কাজে জমি ওয়াকফ করা, ৭. এতীম ও অসহায়দের বাসস্থান ও উপার্জনের ব্যবস্থা, ৮. রাস্তা ও পুল নির্মাণ, ৯. পানির ব্যবস্থা করা, ১০. ফলদার বৃক্ষ রোপণ, ১১. সরাইখানা তৈরি এবং ১২. সীমান্ত পাহারা দেওয়া।
দুই. উপকারী ইলম
দরকারী দ্বীনী ইলম শিক্ষা দেওয়া ও তা প্রচার-প্রসার করা এমন এক আমল, যার আলো ও সওয়াব যুগ-যুগ ধরে অব্যাহত থাকে।
তিন. নেক সন্তান
সন্তানকে নেককার ও সদ্বংশীয় হিসেবে গড়ে তুললে মা-বাবা মৃত্যুর পরও তাদের দুআ ও ইস্তিগফারের সুফল ভোগ করতে থাকেন।
হাদীস শরীফে এসেছে:
إِذَا مَاتَ الْإِنْسَانُ انْقَطَعَ عَنْهُ عَمَلُهُ إِلَّا مِنْ ثَلَاثَةٍ: إِلَّا مِنْ صَدَقَةٍ جَارِيَةٍ، أَوْ عِلْمٍ يُنْتَفَعُ بِهِ، أَوْ وَلَدٍ صَالِحٍ يَدْعُو لَهُ
অর্থ: মানুষ যখন মৃত্যুবরণ করে তখন তার তিনটি আমল ছাড়া সমস্ত আমল তার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। আমল তিনটি হচ্ছে, সদকায়ে জারিয়া, এমন ইলম, যা থেকে উপকৃত হওয়া যায় এবং নেক সন্তান, যে তার জন্য দুআ করে। (সহীহ মুসলিম, হাদীস নং: ১৬৩১)
আরেক হাদীসে এসেছে:
أَفْضَلُ الصَّدَقَةِ أَنْ يَتَعَلَّمَ الْمَرْءُ الْمُسْلِمُ عِلْمًا ثُمَّ يُعَلِّمَهُ أَخَاهُ الْمُسْلِمَ
অর্থ: উত্তম সদকা হলো নিজে ইলম শিক্ষা করা এবং অপর মুসলিম ভাইকে তা শিক্ষা দেওয়া। (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস নং: ২৪৩)
সন্তানের ইস্তিগফার প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেন:
إِنَّ اللَّهَ عَزَّ وَجَلَّ لَيَرْفَعُ الدَّرَجَةَ لِلْعَبْدِ الصَّالِحِ فِي الْجَنَّةِ، فَيَقُولُ: يَا رَبِّ، أَنَّى لِي هَذِهِ؟ فَيَقُولُ: بِاسْتِغْفَارِ وَلَدِكَ لَكَ
অর্থ: আল্লাহ তাআলা জান্নাতে নেককারের মর্যাদা উঁচু করলে সে জিজ্ঞেস করবে, হে আমার প্রতিপালক! এটা আমার জন্য কোথা থেকে এল? তিনি বলবেন, তোমার জন্য তোমার সন্তানের ইস্তিগফারের কারণে। (মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং: ১০২০২)
সওয়াব প্রবাহের অন্যান্য অনুঘটকসমূহ
চার. নেক কাজের সূচনা
কোনো ভালো ও নেক কাজের ভিত্তি স্থাপন করলে পরবর্তী সময়ে যত মানুষ ঐ কাজ করবে, তাদের সকলের সমপরিমাণ সওয়াব সূচনাকারী পাবে।
হাদীসে বর্ণিত হয়েছে:
وَمَنْ سَنَّ فِي الإِسْلاَمِ سُنَّةً سَيِّئَةً فَعُمِلَ بِهَا بَعْدَهُ كُتِبَ عَلَيْهِ مِثْلُ وِزْرِ مَنْ عَمِلَ بِهَا وَلاَ يَنْقُصُ مِنْ أَوْزَارِهِمْ شَىْءٌ ".
অর্থ: যে ইসলামে কোনো উত্তম নিয়ম চালু করে, যে অনুযায়ী পরবর্তীতে আমল করা হয়, তার জন্য আমলকারীদের অনুরূপ সওয়াব লেখা হবে। তাদের সওয়াব সামান্য পরিমাণও কমানো হবে না। (সহীহ মুসলিম, হাদীস নং: ১০১৭)
পাঁচ. মৃত সুন্নাহ জীবিত করা
সমাজে বিলুপ্ত বা অপসৃত হওয়া সুন্নাতকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করলে তা অনুসরণকারীদের সমপরিমাণ সওয়াব লাভ হয়।
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ইরশাদ করেছেন:
مَنْ أَحْيَا سُنَّةً مِنْ سُنَّتِي قَدْ أُمِيتَتْ بَعْدِي فَإِنَّ لَهُ مِنَ الأَجْرِ مِثْلَ مَنْ عَمِلَ بِهَا
অর্থ: যে আমার পরে একটি মৃত সুন্নাহ জীবিত করবে সে পরবর্তীতে যারা এ অনুযায়ী আমল করে, তাদের সমপরিমাণ সওয়াব লাভ করবে। তাদের সওয়াব সামান্য পরিমাণও কমবে না। (জামে তিরমিযী, হাদীস নং: ২৬৭৭)
ছয়. হেদায়েতের দিকে ডাকা
মানুষকে সত্য ও হেদায়েতের দিকে আহ্বান জানালে দাওয়াতে সাড়াদানকারীদের আমলের সমপরিমাণ সওয়াব অব্যাহতভাবে পাওয়া যায়।
হাদীসে এসেছে:
مَنْ دَعَا إِلَى هُدًى كَانَ لَهُ مِنَ الأَجْرِ مِثْلُ أُجُورِ مَنْ تَبِعَهُ
অর্থ: যে মানুষকে হেদায়েতের দিকে ডাকে পরবর্তীতে যারা তা অনুসরণ করে তাদের অনুরূপ সওয়াব তাকে দান করা হবে। তবে ওদের সওয়াব বিন্দুপরিমাণও কমবে না। (সহীহ মুসলিম, হাদীস নং: ২৬৭৪)
গোনাহে জারিয়ার ভয়াবহতা ও সতর্কতা
যেভাবে নেক আমলের ধারা মৃত্যুর পরও চালু থাকে, ঠিক তেমনি মন্দ বা গোনাহের কাজের সূচনা করলে 'গোনাহে জারিয়া' হিসেবে মৃত্যুর পরও তার আমলনামায় পাপ জমা হতে থাকে।
কুরআন মাজীদে সতর্ক করে বলা হয়েছে:
لِیَحْمِلُـوْۤا اَوْزَارَهُمْ كَامِلَةً یَّوْمَ الْقِیٰمَةِۙ-وَ مِنْ اَوْزَارِ الَّذِیْنَ یُضِلُّوْنَهُمْ بِغَیْرِ عِلْمٍؕ-اَلَا سَآءَ مَا یَزِرُوْنَ۠
অর্থ: কিয়ামতের দিন তারা নিজেদের (কৃত গোনাহের) পরিপূর্ণ ভারও বহন করবে এবং তাদেরও ভারের একটা অংশ, যাদেরকে তারা অজ্ঞতার কারণে বিপথগামী করছে। (সূরা নাহল, আয়াত নং: ২৫)
অন্যত্র ইরশাদ হয়েছে:
وَلَيَحْمِلُنَّ أَثْقَالَهُمْ وَأَثْقَالًا مَعَ أَثْقَالِهِمْ
অর্থ: তারা নিজেদের গোনাহের বোঝা বহন করবে এবং নিজেদের বোঝার সাথে আরো কিছু বোঝা। (সূরা আনকাবুত, আয়াত নং: ১৩)
প্রথম অন্যায় হত্যার প্রবর্তন প্রসঙ্গে নবীজী (ﷺ) বলেন:
لاَ تُقْتَلُ نَفْسٌ إِلَّا كَانَ عَلَى ابْنِ آدَمَ الأَوَّلِ كِفْلٌ مِنْهَا
অর্থ: যে কাউকে অন্যায়ভাবে হত্যা করা হবে এর গোনাহের একটা অংশ প্রথম আদম সন্তানের উপর বর্তাবে। কারণ সেই প্রথম হত্যার প্রবর্তন করেছে। (সহীহ বুখারী, হাদীস নং: ৬৮৬৭)
উপসংহার:
মৃত্যুর পর সওয়াবের দরজা খোলা রাখার জন্য সদকায়ে জারিয়া, উপকারী ইলম এবং নেক সন্তান রেখে যাওয়া মুমিনের প্রধান অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। পাশাপাশি মৃত্যুর পর গোনাহ জারি থাকে এমন সকল কাজ থেকে নিজেকে সম্পূর্ণ দূরে রাখা বুদ্ধিমানের অপরিহার্য কর্তব্য।
(সংগৃহীত ও সংযোজিত)
মন্তব্য (...)
এ সম্পর্কিত আরও প্রবন্ধ
আল্লামা যাহেদ কাউসারীর বাণী সমগ্র থেকে -
...
পরিবারে খুন, নৃশংসতা ও ব্যাপক সামাজিক ধ্বস
মানুষ হত্যা মহাপাপ। ইসলাম হত্যা, খুন, গুম ও নৃশংসতাকে হারাম সাব্যস্ত করেছে। পবিত্র কোরআন ও সুন্নাহর ...
ঈমান-আমল সুরক্ষিত রাখতে হক্কানী উলামায়ে কেরামের সঙ্গে থাকুন, অন্যদের সঙ্গ ছাড়ুন
[প্রদত্ত বয়ান থেকে সংগৃহীত] হামদ ও সালাতের পর... قال الله تعالى: يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتّ...
আল্লাহওয়ালাদের তাযকেরায় দিল তাযা হয়
...
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন