প্রবন্ধ
কোনো গুনাহকে হালকা মনে না করা
১৭ অক্টোবর, ২০২৬
০
০
গুনাহ ছোট হোক বা বড়, কোনোটিকেই তুচ্ছ বা হালকা মনে করার সুযোগ নেই। কারণ গুনাহের ওজন শুধু তার বাহ্যিক আকারের ওপর নির্ভর করে না; বরং তার চেয়েও বড় প্রশ্ন হলো, কার অবাধ্যতা করা হচ্ছে, আর সেই গুনাহের প্রতি অন্তরের অবস্থান কেমন?
“এইটুকু ছোট কাজ করলে আর কী হবে?”, এই মানসিকতা নিয়ে ছোট গুনাহকে অবহেলা করে যেতে থাকা নীরবে এক ভয়ংকর পথ তৈরি করে। ছোট ছোট গুনাহ জমতে জমতে একসময় অন্তরকে অসাড় করে দেয়, আল্লাহভীতি ও লজ্জাবোধ ক্ষয় করে দেয়, আর একটি গুনাহ অপর গুনাহের দিকে টেনে নিয়ে যায়।
সাহাবায়ে কেরাম সামান্যতম গুনাহকেও ভয় পেতেন। আর এটিই মুমিনের প্রকৃত পরিচয়, গুনাহকে হালকা না ভাবা, ভুল হয়ে গেলে বিলম্ব না করে দ্রুত তওবা করে আল্লাহর দিকে ফিরে আসা এবং তাঁর অসীম রহমত থেকে কখনো নিরাশ না হওয়া।
তাই মনে রাখা উচিত,
“গুনাহ ছোট কি বড়,
তা দেখার আগে দেখা
উচিত, আমি আসলে কার অবাধ্যতা করছি।”
ভূমিকা
মানুষ সাধারণত বড় গুনাহকে ভয় করে; কিন্তু ছোট মনে হওয়া গুনাহের ব্যাপারে অনেক সময় উদাসীন হয়ে পড়ে। ‘এটা তো সামান্য ব্যাপার’, ‘এতে আর কী হয়েছে!’, ‘সবাই তো এমন করে’, ‘একবার করলে কী হবে’, এ ধরনের চিন্তা ধীরে ধীরে মানুষকে গুনাহের প্রতি নির্লজ্জ ও উদাসীন করে দিতে পারে।
অথচ ইসলামের শিক্ষা হলো, কোনো গুনাহকেই তুচ্ছ বা হালকা মনে করা উচিত নয়। কারণ গুনাহ ছোট না বড়, এটি যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো, বান্দা কার অবাধ্যতা করছে এবং সেই গুনাহের প্রতি তার অন্তরের অবস্থান কী।
আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَكَانَ اللَّهُ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ رَقِيبًا
অর্থ : আল্লাহ সবকিছুর উপর সতর্ক দৃষ্টি রাখেন।
সূরা আল-আহযাব, আয়াত নং ৫২
একটি ছোট গুনাহকে যদি মানুষ ভয় করে, লজ্জিত হয় এবং সঙ্গে সঙ্গে তওবা করে, তবে আল্লাহর রহমত লাভের আশা থাকে। পক্ষান্তরে কোনো গুনাহকে তুচ্ছ মনে করে বারবার করতে থাকা, তা নিয়ে হাসি-তামাশা করা কিংবা ‘এতে আর কী হয়েছে!’, এমন মনোভাব পোষণ করা অত্যন্ত ভয়ংকর।
আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَتَحْسَبُونَهُ هَيِّنًا وَهُوَ عِندَ اللَّهِ عَظِيمْ
অর্থ : তোমরা একে তুচ্ছ মনে করছ, অথচ আল্লাহর কাছে তা অত্যন্ত গুরুতর।
সূরা আন-নূর, আয়াত নং ১৫
এই আয়াত যদিও একটি বিশেষ ঘটনার প্রেক্ষাপটে নাজিল হয়েছে, তবে এতে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা রয়েছে, কোনো অন্যায়কে মানুষের কাছে ছোট মনে হওয়া মানেই আল্লাহর কাছে তা ছোট হওয়া নয়।
গুনাহ ছোট-বড়, এই পার্থক্য শরিয়তে
রয়েছে
ইসলামী শরিয়তে গুনাহের মধ্যে কবিরা ও সগিরা, বড় ও ছোট, এমন পার্থক্য রয়েছে। কুরআন ও হাদিসে বড় গুনাহ থেকে বেঁচে থাকার বিশেষ নির্দেশ এসেছে।
আল্লাহ তাআলা বলেন,
إِن تَجْتَنِبُوا كَبَائِرَ مَا تُنْهَوْنَ عَنْهُ نُكَفِّرْ عَنكُمْ سَيِّئَاتِكُمْ وَنُدْخِلْكُم مُدْخَلاً كَرِيمًا
অর্থ : তোমরা যদি তোমাদের নিষিদ্ধ করা বড় গুনাহগুলো থেকে বেঁচে থাকো, তবে আমি তোমাদের ছোটখাটো গুনাহগুলো ক্ষমা করে দেব এবং তোমাদের সম্মানজনক স্থানে প্রবেশ করাব।
সূরা আন-নিসা, ৪:৩১
এ আয়াত প্রমাণ করে যে বড় ও ছোট গুনাহের মধ্যে শরয়ি পার্থক্য রয়েছে। কিন্তু এর অর্থ কখনোই এই নয় যে ছোট গুনাহকে ইচ্ছাকৃতভাবে করা বা তুচ্ছ মনে করা নিরাপদ। বরং একজন মুমিনের অন্তরে প্রতিটি গুনাহের ব্যাপারে আল্লাহভীতি থাকা উচিত।
তুচ্ছ মনে করা গুনাহ থেকে সতর্কতা
ইসলামী শরিয়তে গুনাহের মধ্যে অবশ্যই বড় ও ছোট, এমন পার্থক্য রয়েছে। কুরআন ও হাদিসে কবিরা গুনাহের কথা পৃথকভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু ছোট গুনাহকে ‘কিছুই না’ মনে করে অবহেলা করা মুমিনের জন্য নিরাপদ নয়।
রাসুলুল্লাহ ﷺ সাহাবায়ে কেরামকে সতর্ক করে বলেছেন,
إِيَّاكُمْ وَمُحَقَّرَاتِ الذُّنُوبِ
অর্থ : তোমরা ছোট মনে করা গুনাহগুলো থেকে বেঁচে থাকো।
এরপর তিনি এর একটি দৃষ্টান্ত দিয়ে বলেন, কিছু লোক কোনো এক প্রান্তরে অবতরণ করল। প্রত্যেকে একটি করে কাঠি নিয়ে এলো, এভাবে কাঠি জমা হয়ে তাদের খাবার প্রস্তুত হলো। তারপর রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেন, ছোট মনে করা গুনাহগুলোর অবস্থাও এমন, মানুষ সেগুলো জমা করতে থাকে, একসময় তা তাকে ধ্বংস করে দিতে পারে।
মুসনাদে আহমাদ, ২২৮০৮; আল-মু’জামুল আওসাত (হাদিসটির একাধিক বর্ণনা রয়েছে)
দৃষ্টান্তটি অত্যন্ত গভীর। একটি কাঠি দিয়ে হয়তো বড় আগুন জ্বলে না। কিন্তু বহু কাঠি একত্র হলে সেই কাঠিগুলোই বড় আগুন সৃষ্টি করে।
তেমনি একটি ছোট গুনাহকে মানুষ হয়তো তুচ্ছ মনে করতে পারে। কিন্তু প্রতিদিন একটি, দু’টি, তিনটি করে গুনাহ জমতে থাকলে একসময় তা মানুষের আমলনামাকে ভারী করে দিতে পারে এবং অন্তরকে গুনাহের প্রতি অসংবেদনশীল করে দিতে পারে।
গুনাহের চেয়েও বিপজ্জনক: গুনাহকে
ছোট মনে করা
এখানে একটি সূক্ষ্ম বিষয় বোঝা জরুরি। একজন ব্যক্তি ভুলবশত কোনো ছোট গুনাহ করে ফেলল, এরপর তার অন্তরে অনুতাপ হলো, সে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইল এবং তা ছেড়ে দিল, তার অবস্থা একরকম।
অন্যদিকে কেউ একই গুনাহ করে বলল, “এতে আর কী হয়েছে?” এরপর বারবার করতে থাকল এবং তওবার প্রয়োজনই অনুভব করল না, তার অবস্থা ভিন্ন। অর্থাৎ গুনাহের পাশাপাশি গুনাহের প্রতি মানুষের অন্তরের অবস্থানও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
গুনাহের ভয়াবহতা শুধু গুনাহটির বাহ্যিক আকারের ওপর নির্ভর করে না; বরং একজন বান্দা কার অবাধ্যতা করছে? এটি ভেবে দেখা জরুরি। একজন মানুষ যদি কারও সামান্য সম্পদ নষ্ট করে, তাহলে সে বিষয়টি হালকা মনে করে না। কিন্তু আল্লাহ তাআলার অসংখ্য নিয়ামত ভোগ করে তাঁর একটি নিষেধাজ্ঞা অমান্য করার বিষয়টি অনেক সময় মানুষ অত্যন্ত হালকা মনে করে। মুমিনের অন্তরে তাই গুনাহের ব্যাপারে ভয় থাকা উচিত।
হযরত আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ রা.-এর বর্ণনায় এসেছে,
إِنَّ الْمُؤْمِنَ يَرَى ذُنُوبَهُ كَأَنَّهُ قَاعِدٌ تَحْتَ جَبَلٍ، يَخَافُ أَنْ يَقَعَ عَلَيْهِ
অর্থ : মুমিন তার গুনাহকে এমনভাবে দেখে, যেন সে একটি পাহাড়ের নিচে বসে আছে এবং ভয় করছে, পাহাড়টি তার ওপর পড়ে যায় কি না। আর পাপাচারী ব্যক্তি তার গুনাহকে নাকের ওপর দিয়ে চলে যাওয়া মাছির মতো মনে করে।
এখানে মুমিনের অন্তরের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য তুলে ধরা হয়েছে, গুনাহ হয়ে গেলে সে নিশ্চিন্ত হয়ে যায় না; বরং তার অন্তরে ভয় ও অনুতাপ সৃষ্টি হয়।
সাহাবায়ে কেরাম ছোট মনে হওয়া
গুনাহকেও ভয় করতেন
সাহাবায়ে কেরামের যুগে মানুষের ঈমান ও আল্লাহভীতি এমন ছিল যে, তারা এমন অনেক বিষয়কেও ভয় করতেন যা পরবর্তী যুগের মানুষের কাছে অতি সামান্য মনে হতে পারে।
হযরত আনাস রা. বলেন,
إِنْ كُنْتُمْ لَتَعْمَلُونَ أَعْمَالًا هِيَ أَدَقُّ فِي أَعْيُنِكُمْ مِنَ الشَّعَرِ، إِنْ كُنَّا لَنُعَدُّهَا عَلَى عَهْدِ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّم مِنَ الْمُوبِقَاتِ
অর্থ : তোমরা এমন কিছু কাজ কর, যা তোমাদের চোখে চুলের চেয়েও সূক্ষ্ম; অথচ আমরা রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর যুগে সেগুলোকে ধ্বংসকারী মনে করতাম।
সময়ের পরিবর্তনে সমাজে কোনো কোনো গুনাহের প্রতি মানুষের সংবেদনশীলতা কমে যেতে পারে। কোনো কাজ একসময় যে কারণে মানুষ লজ্জিত হতো, পরে সেটিই হয়তো বিনোদন, সামাজিক রীতি কিংবা স্বাভাবিক আচরণ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। কিন্তু কোনো কাজ সমাজে প্রচলিত হয়ে গেলেই তা হালাল হয়ে যায় না।
মুমিনের মাপকাঠি হলো, আল্লাহ ও তাঁর রাসুল (ﷺ)-এর নির্দেশ; মানুষের প্রচলন নয়। তাই ‘সবাই তো করছে’, ‘এটা তো সামান্য ব্যাপার’, ‘এতে কারও কী ক্ষতি হচ্ছে’, এ ধরনের যুক্তি দিয়ে গুনাহকে হালকা মনে করা উচিত নয়।
গুনাহ বারবার করলে অন্তরে কালো
দাগ পড়ে
গুনাহের অন্যতম ভয়াবহ ক্ষতি হলো, তা মানুষের অন্তরের ওপর প্রভাব ফেলে। রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন,
إِنَّ الْعَبْدَ إِذَا أَخْطَأَ خَطِيئَةً نُكِتَتْ فِي قَلْبِهِ نُكْتَةٌ سَوْدَاءُ
অর্থ : বান্দা যখন কোনো গুনাহ করে, তখন তার অন্তরে একটি কালো দাগ পড়ে।
সুনানে তিরমিযী, ৩৩৩৪; সুনানে ইবনে মাজাহ, ৪২৪৪
অতঃপর সে যদি তওবা করে, গুনাহ থেকে ফিরে আসে এবং ক্ষমা চায়, তাহলে তার অন্তর পরিষ্কার করা হয়। আর যদি সে পুনরায় গুনাহে ফিরে যায়, তাহলে সেই কালো দাগ বাড়তে থাকে। এভাবে গুনাহ মানুষের অন্তরের সংবেদনশীলতা নষ্ট করে দিতে পারে।
প্রথমবার যে গুনাহে অন্তর কেঁপে ওঠে, দ্বিতীয়বার হয়তো কিছুটা কম ভয় লাগে। বারবার করতে করতে একসময় সেই গুনাহই স্বাভাবিক বলে মনে হতে পারে। এটাই গুনাহকে হালকা মনে করার অন্যতম ভয়ংকর পরিণতি।
গুনাহের প্রতি অভ্যস্ত হয়ে যাওয়া
আরও ভয়ংকর
গুনাহ করে ফেলা এক বিষয়, আর গুনাহকে গুনাহই মনে না করা আরও ভয়ংকর ও গুরুতর বিষয়। মানুষ যখন কোনো গুনাহ প্রথমবার করে, তখন অন্তরে অস্বস্তি থাকতে পারে। কিন্তু সে যদি তওবা না করে বরং বারবার করতে থাকে, তখন অন্তর ধীরে ধীরে সেই গুনাহের সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে যেতে পারে।
● গুনাহ আর গুনাহ বলে মনে হয় না
● অনুতাপ কমে যায়
● লজ্জাবোধ দুর্বল হয়
● আল্লাহর ভয় কমে যায়
● অন্য মানুষকে একই গুনাহ থেকে সতর্ক করার অনুভূতিও দুর্বল হয়ে পড়ে
তাই একজন মুমিনের বৈশিষ্ট্য হলো, ভুল হয়ে গেলে সে অনুতপ্ত হয়, লজ্জিত হয় এবং আল্লাহর কাছে ফিরে আসে। আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَالَّذِينَ إِذَا فَعَلُوا فَاحِشَةً أَوْ ظَلَمُوا أَنْفُسَهُمْ ذَكَرُوا اللَّهَ فَاسْتَغْفَرُوا لِذُنُوبِهِمْ
অর্থ : আর যারা কোনো অশ্লীল কাজ করে ফেললে অথবা নিজেদের ওপর জুলুম করলে আল্লাহকে স্মরণ করে এবং নিজেদের গুনাহের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে।
সূরা আলে ইমরান, আয়াত নং ১৩৫
আয়াতের শিক্ষা হলো, মুমিন ভুল-ত্রুটিমুক্ত নয়; বরং তার বৈশিষ্ট্য হলো, গুনাহ হয়ে গেলে সে গুনাহের ওপর অটল থাকে না।
একটি গুনাহ
থেকে আরও অনেক গুনাহের দরজা খুলে যায়
গুনাহের আরেকটি বিপদ হলো, একটি গুনাহ অন্য গুনাহের পথ খুলে দিতে পারে। যেমন, কেউ মিথ্যা বলল। মিথ্যা গোপন করতে তাকে দ্বিতীয়বার মিথ্যা বলতে হলো, এরপর তৃতীয়বার। এভাবে একটি গুনাহ থেকে একাধিক গুনাহ সৃষ্টি হতে পারে।
রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন,
وَإِيَّاكُمْ وَالْكَذِبَ، فَإِنَّ الْكَذِبَ يَهْدِي إِلَى الْفُجُورِ، وَإِنَّ الْفُجُورَ يَهْدِي إِلَى النَّارِ
অর্থ : তোমরা মিথ্যা থেকে বেঁচে থাকো। কারণ মিথ্যা পাপাচারের দিকে নিয়ে যায়, আর পাপাচার জাহান্নামের দিকে নিয়ে যায়।
সহীহ বুখারী, ৬০৯৪; সহিহ মুসলিম, ২৬০৭
অতএব, ‘একবারই তো’, এই চিন্তা অনেক সময় মানুষকে এমন একটি পথে নিয়ে যেতে পারে, যেখান থেকে ফিরে আসা কঠিন হয়ে যায়।
গুনাহের প্রতি হাসি-তামাশা করা
গুনাহ করে ফেলা এক বিষয়;
কিন্তু গুনাহকে স্বাভাবিক মনে করা, তা নিয়ে গর্ব করা কিংবা হাসি-তামাশা করা আরও ভয়ংকর
প্রবণতা। কোনো হারাম কাজকে শুধু এ কারণে হালকা মনে করা উচিত নয় যে, সেটি সমাজে প্রচলিত,
সবাই করছে অথবা মানুষ সেটি নিয়ে হাসাহাসি করছে।
মুমিনের অন্তরে আল্লাহর বিধানের প্রতি সম্মান থাকা উচিত। মুমিনের মাপকাঠি হলো, আল্লাহ ও তাঁর রাসুল (ﷺ)-এর নির্দেশ, মানুষের প্রচলন নয়। আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَمَا كَانَ لِمُؤْمِنٍ وَلَا مُؤْمِنَةٍ إِذَا قَضَى اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَمْرًا أَنْ يَكُونَ لَهُمُ الْخِيَرَةُ مِنْ أَمْرِهِمْ
অর্থ : আল্লাহ ও তাঁর রাসুল কোনো বিষয়ে সিদ্ধান্ত দিলে কোনো মুমিন পুরুষ বা মুমিন নারীর জন্য সে বিষয়ে নিজস্ব সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ থাকে না।
সূরা আল-আহযাব, আয়াত নং ৩৬
তাই সমাজে কোনো হারাম কাজ প্রচলিত হয়ে গেলেও একজন মুমিনের জন্য তার শরয়ি অবস্থান বিবেচনা করে তা পরিহার করা জরুরি।
মানুষের হক নষ্ট করার বিষয়টি
আরও সতর্কতার
গুনাহের মধ্যে এমন কিছু বিষয় রয়েছে, যাতে বান্দার হকও জড়িত। কারও গীবত করা, অপবাদ দেওয়া, প্রতারণা করা, কারও টাকা আত্মসাৎ করা, ওজনে কম দেওয়া, আমানতের খেয়ানত করা, কারও সম্মান নষ্ট করা, এসবকে সামান্য মনে করা উচিত নয়।
রাসুলুল্লাহ (ﷺ) সাহাবায়ে কেরামকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন,
أَتَدْرُونَ مَا الْمُفْلِسُ . قَالُوا الْمُفْلِسُ فِينَا مَنْ لاَ دِرْهَمَ لَهُ وَلاَ مَتَاعَ . فَقَالَ " إِنَّ الْمُفْلِسَ مِنْ أُمَّتِي يَأْتِي يَوْمَ الْقِيَامَةِ بِصَلاَةٍ وَصِيَامٍ وَزَكَاةٍ وَيَأْتِي قَدْ شَتَمَ هَذَا وَقَذَفَ هَذَا وَأَكَلَ مَالَ هَذَا وَسَفَكَ دَمَ هَذَا وَضَرَبَ هَذَا فَيُعْطَى هَذَا مِنْ حَسَنَاتِهِ وَهَذَا مِنْ حَسَنَاتِهِ فَإِنْ فَنِيَتْ حَسَنَاتُهُ قَبْلَ أَنْ يُقْضَى مَا عَلَيْهِ أُخِذَ مِنْ خَطَايَاهُمْ فَطُرِحَتْ عَلَيْهِ ثُمَّ طُرِحَ فِي النَّارِ ".
অর্থ : তোমরা কি বলতে পার, দরিদ্র (দেউলিয়া) কে? তারা বললেন, আমাদের মধ্যে যার দিরহাম (টাকা কড়ি) ও আসবাপত্র (ধন-সম্পদ) নেই সেই তো দরিদ্র। তখন তিনি বললেনঃ আমার উম্মতের মধ্যে সেই প্রকৃত অভাবগ্রস্ত, যে ব্যক্তি কিয়ামতের দিন নামায, রোযা ও যাকাত নিয়ে আসবে; অথচ সে এই অবস্থায় আসবে যে, একে গালি দিয়েছে, একে অপবাদ দিয়েছে, এর সম্পদ ভোগ করেছে, একে হত্যা করেছে ও একে মেরেছে। এরপর একে তার নেক আমল থেকে দেওয়া হবে, একে নেক আমল থেকে দেওয়া হবে। এরপর তার কাছে (পাওনাদারের) প্রাপ্য তার নেক আমল থেকে পূরণ করা না গেলে ঋণের বিনিময়ে তাদের পাপের একাংশ তার প্রতি নিক্ষেপ করা হবে। এরপর তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।
অতএব, মানুষের হক সম্পর্কিত গুনাহকে বিশেষভাবে ভয় করা উচিত।
বড় গুনাহ থেকে যেমন বাঁচতে হবে,
ছোট গুনাহের প্রতিও তেমন সতর্ক থাকতে হবে
রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বড় গুনাহের ব্যাপারেও কঠোরভাবে সতর্ক করেছেন। তিনি বলেছেন, “তোমরা সাতটি ধ্বংসকারী গুনাহ থেকে বেঁচে থাকো।” এর মধ্যে তিনি শিরক, জাদু, অন্যায়ভাবে মানুষ হত্যা, সুদ ভক্ষণ, এতিমের সম্পদ আত্মসাৎ, যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পলায়ন এবং সতী-সাধ্বী মুমিন নারীর বিরুদ্ধে অপবাদ দেওয়ার কথা উল্লেখ করেছেন।
এগুলো বড় গুনাহ, এ ব্যাপারে সন্দেহ নেই। কিন্তু মুমিনের দৃষ্টিভঙ্গি শুধু বড় গুনাহের তালিকা জানা পর্যন্ত সীমাবদ্ধ নয়। বরং ছোট মনে হওয়া গুনাহ থেকেও সতর্ক থাকা জরুরি, যাতে ছোট গুনাহের প্রতি অবহেলা ধীরে ধীরে বড় গুনাহের দিকে নিয়ে না যায়।
‘ছোট গুনাহ’ শব্দটি শুনে কেউ যেন এমন ধারণা না করে যে, তা করতে সমস্যা নেই। কারণ,
১. ছোট গুনাহ বারবার করলে তা বড় বিপদের কারণ হতে পারে।
২. গুনাহকে তুচ্ছ মনে করা অন্তরের রোগের লক্ষণ।
৩. গুনাহের কারণে অন্তরে কালো দাগ পড়ে।
৪. একটি গুনাহ অন্য গুনাহের পথ খুলে দেয়।
৫. গুনাহ মানুষের লজ্জাবোধ ও আল্লাহভীতি দুর্বল করে দেয়।
৬. মানুষের হক নষ্ট হলে শুধু তওবা করাই যথেষ্ট নয়; অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির কাছ থেকে ক্ষমাও চাইতে হয়।
গুনাহ হয়ে গেলে হতাশ হওয়া নয়,
দ্রুত তওবা করা
গুনাহকে হালকা মনে না করার অর্থ এই নয় যে, গুনাহ হয়ে গেলে মানুষ নিজেকে ধ্বংস মনে করবে বা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ে যাবে। বরং ইসলাম গুনাহের পর তওবার দরজা খুলে দিয়েছে। ইসলাম মানুষকে হতাশ হতে শেখায় না; বরং গুনাহ হয়ে গেলে দ্রুত আল্লাহর দিকে ফিরে আসতে শেখায়।
আল্লাহ তাআলা বলেন,
قُلْ يَا عِبَادِيَ الَّذِينَ أَسْرَفُوا عَلَى أَنْفُسِهِمْ لَا تَقْنَطُوا مِنْ رَحْمَةِ اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ يَغْفِرُ الذُّنُوبَ جَمِيعًا
অর্থ : বলুন, ‘হে আমার সেই বান্দারা, যারা নিজেদের ওপর জুলুম করেছ, তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সব গুনাহ ক্ষমা করে দেন।’
সূরা আয-যুমার, আয়াত নং ৫৩
গুনাহ হয়ে গেলে দেরি না করে কয়েকটি বিষয় গুরুত্বের সঙ্গে করা উচিত,
১. গুনাহ থেকে বিরত হওয়া।
২. অন্তর থেকে অনুতপ্ত হওয়া।
৩. আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা এবং পুনরায় না করার দৃঢ় সংকল্প করা।
৪. গুনাহের সঙ্গে মানুষের অধিকার জড়িত থাকলে যথাসম্ভব সেই অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া বা সংশোধন করা।
৫. যে পরিবেশ, সঙ্গ বা কারণ গুনাহের দিকে নিয়ে যায়, তা থেকে দূরে থাকার ব্যবস্থা করা।
কারণ শুধু মুখে তওবা করাই যথেষ্ট নয়; তওবার বাস্তব প্রভাব বাস্তব জীবনেও প্রকাশ পাওয়া উচিত।
মুমিনের দৃষ্টিভঙ্গি: ভয় ও আশার
মধ্যে ভারসাম্য
মুমিন নিজের কোনো গুনাহকে তুচ্ছ মনে করবে না; আবার নিজের গুনাহের কারণে আল্লাহর রহমত থেকেও নিরাশ হবে না। গুনাহ হয়ে গেলে তার অন্তরে ভয় থাকবে, কিন্তু সেই ভয় তাকে তওবার দিকে নিয়ে যাবে। আল্লাহর রহমতের আশা থাকবে, কিন্তু সেই আশা তাকে গুনাহে সাহসী করে তুলবে না।
সে জানবে, আমি দুর্বল, আমার ভুল হতে পারে; কিন্তু আমার রব ক্ষমাশীল, তাই ভুল হওয়ার পর তাঁর কাছেই ফিরে যেতে হবে।
উপসংহার
গুনাহের ভয় শুধু বড় গুনাহ থেকে বেঁচে থাকার নাম নয়; বরং গুনাহের প্রতি অন্তরের অবস্থানও সংশোধন করা জরুরি। একটি ছোট গুনাহ হয়ে গেলে ‘এ আর এমন কী!’, এমন চিন্তা না করে মনে রাখা উচিত, এটি আমার রবের অবাধ্যতা। তাই সঙ্গে সঙ্গে তওবা ও ইস্তিগফারের দিকে ফিরে আসা উচিত।
রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন,
كُلُّ بَنِي آدَمَ خَطَّاءٌ، وَخَيْرُ الْخَطَّائِينَ التَّوَّابُونَ
অর্থ : আদম সন্তানের প্রত্যেকেই ভুলকারী; আর ভুলকারীদের মধ্যে উত্তম হলো যারা বেশি তওবা করে।
সুনানে তিরমিযী, ২৪৯৯; সুনানে ইবনে মাজাহ, ৪২৫১
সুতরাং গুনাহ হয়ে যাওয়া মানুষের দুর্বলতা হতে পারে; কিন্তু গুনাহকে হালকা মনে করা, তাতে অভ্যস্ত হয়ে যাওয়া এবং তওবা থেকে দূরে থাকা অত্যন্ত ভয়ংকর।
মুমিনের অন্তর এমন হওয়া উচিত, নেক আমল করলে অহংকার নয়, বরং আল্লাহর শুকরিয়া; আর গুনাহ হয়ে গেলে অবহেলা নয়, বরং অনুতাপ ও তওবা।
বুযুর্গানে দ্বীন বলেন,
لَا تَنْظُرْ إِلَى صِغَرِ الْمَعْصِيَةِ، وَلَكِنْ انْظُرْ عَظَمَةَ مَنْ عَصَيْتَ، فَإِنْ حَدَّثَتْكَ نَفْسُكَ بِالْمَعْصِيَةِ فَقُلْ لِنَفْسِكَ: أَتَدْرِيْنَ مَنْ تَعْصِيْنَ؟
অর্থ : তুমি পাপের ক্ষুদ্রতার দিকে তাকিও না, বরং যার অবাধ্য হচ্ছো তাঁর মহত্ত্বের কথা বিবেচনা করো। এরপরও মন যদি গুনাহের দিকে টানে, তবে মনকে প্রশ্ন করো: তোমার জানা আছে? তুমি আসলে কার হুকুম অমান্য করছ?
আল্লাহ তাআলা আমাদের অন্তরে তাঁর ভয় সৃষ্টি করুন, গুনাহকে ঘৃণা করার তাওফিক দিন, কোনো গুনাহকে তুচ্ছ মনে করা থেকে হেফাজত করুন এবং ভুল-ত্রুটি হয়ে গেলে দ্রুত তওবা করার তাওফিক দান করুন।
آمِين يَا رَبَّ الْعَالَمِينَ
মন্তব্য (...)
এ সম্পর্কিত আরও প্রবন্ধ
লেনদেনে সততা ও হালাল জীবিকা
...
তাকওয়া ও খোদাভীতি
...
গোনাহ থেকে বেঁচে থাকার ১০ আমল ও কৌশল
গোনাহের সবচেয়ে বড় এবং ভয়াবহ ক্ষতি হলো, মানুষ আল্লাহর ইবাদত থেকে মাহরুম হয়ে যায়। আল্লাহর ইবাদত ক...
যাবতীয় গুনাহ থেকে বেঁচে থাকার ৭০ টি শক্তিশালী পরামর্শ
الحمد لله والصلاة والسلام على رسول الله وبعد: সবচেয়ে দামী আমল: গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা আব্দুল্লাহ ইব...
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন