প্রবন্ধ
সাহাবায়ে কেরামের ওসিয়ত ও নসীহত
১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
৫৭
০
সাহাবায়ে
কেরাম রা. ছিলেন কুরআন-সুন্নাহর জীবন্ত আদর্শ। তাঁদের কথা ও কাজে ছিল আল্লাহভীতি, আখিরাতের
চিন্তা, নামাজের
যত্ন, সত্যবাদিতা, আমানতদারি, মানুষের হক
আদায়, উত্তম
চরিত্র ও বিপদে সবর। তাঁরা শুধু নসীহত করতেন না; বরং নিজেদের
জীবন দিয়ে সেই নসীহতের বাস্তব রূপ দেখিয়ে গেছেন।
এই
প্রবন্ধে তাঁদের জীবন থেকে কিছু গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা তুলে ধরা হয়েছে—তাকওয়া ও
আত্মজবাবদিহি,
কুরআন-সুন্নাহর অনুসরণ, নামাজের
হেফাজত, সত্যবাদিতা, ন্যায়বিচার, ইলম অর্জন, উত্তম
চরিত্র, আত্মীয়তা
রক্ষা, দুর্বলের
প্রতি দায়িত্ব,
জুলুম থেকে বাঁচা, পরিবারের হক, ধৈর্য, ইখলাস, ফিতনা থেকে
বাঁচা, ক্ষমা
ও আমর বিল মারুফ।
আজ
আমাদের জীবন বদলে গেলেও আমাদের অন্তরের রোগগুলো বদলায়নি। তাই সাহাবায়ে কেরামের
নসীহত ও জীবন আদর্শ আমাদের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। তাঁদের জীবন আমাদের শেখায়, আল্লাহর
সঙ্গে সম্পর্ক ঠিক করতে হবে, নিজের হিসাব নিজেকেই নিতে হবে, মানুষের হক
আদায় করতে হবে এবং দুনিয়ার চেয়ে আখিরাতকে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে।
সাহাবায়ে কেরামের জীবন আদর্শ, নসীহত ও দিকনির্দেশনা মেনে আমাদের জীবন আলোকিত করার চেষ্টা করা—এটাই হোক আমাদের লক্ষ্য।
ভূমিকা
ইসলামের ইতিহাসে
সাহাবায়ে কেরাম রা. এমন এক অনন্য প্রজন্ম,
যাঁদের
ঈমান, আমল, ত্যাগ, তাকওয়া, ইখলাস, জ্ঞান ও চরিত্র
কিয়ামত পর্যন্ত মুসলিম উম্মাহর
জন্য
আদর্শ হয়ে থাকবে। তাঁরা শুধু রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সান্নিধ্য লাভ
করেননি; বরং তাঁর হাতে গড়ে ওঠা ইসলামী আদর্শের জীবন্ত বাস্তবায়ন ছিলেন।
তাঁরা কুরআনের নাজিল হওয়া প্রত্যক্ষ করেছেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সুন্নাহ শিখেছেন এবং নিজেদের জীবন দিয়ে তার বাস্তব রূপ দেখিয়েছেন।
রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁদের মর্যাদা ঘোষণা করে ইরশাদ করেছেন—
خَيْرُ النَّاسِ قَرْنِي، ثُمَّ
الَّذِينَ يَلُونَهُمْ، ثُمَّ الَّذِينَ يَلُونَهُمْ
অর্থ : মানুষের মধ্যে
সর্বোত্তম হলো আমার যুগের মানুষ;
এরপর তাদের পরবর্তী যুগের মানুষ;
এরপর তাদের পরবর্তী যুগের মানুষ। — সহিহ বুখারি, হাদিস ২৬৫২; সহিহ মুসলিম, হাদিস ২৫৩৩
সাহাবায়ে কেরামের
জীবন তাই শুধু ইতিহাসের কোনো অধ্যায় নয়; বরং তা ঈমান ও আমল সংশোধনের
এক জীবন্ত পাঠশালা। বিশেষত তাঁদের ওসিয়ত ও নসীহতগুলো গভীরভাবে পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, তাঁদের চিন্তার কেন্দ্রে ছিল—আল্লাহর ভয়, আখিরাতের
প্রস্তুতি, কুরআন-সুন্নাহর অনুসরণ, নামাজের হেফাজত, আত্মজবাবদিহি, সত্যবাদিতা, আমানতদারি, মানুষের অধিকার,
ইলম, ঐক্য, সবর ও তাওয়াক্কুল।
আজ আমাদের জীবনযাত্রা প্রযুক্তি ও সভ্যতার দিক
থেকে অনেক পরিবর্তিত হয়েছে; কিন্তু মানুষের
অন্তরের রোগ—লোভ, হিংসা, অহংকার, প্রবৃত্তির অনুসরণ, দুনিয়ার মোহ, গীবত ও অন্যায়—মূলত
একই রয়ে গেছে। তাই সাহাবায়ে কেরামের নসীহত আজও আমাদের জন্য অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।
নিম্নে তাঁদের নসীহত, তাঁদের নিজস্ব জীবনাচরণ এবং কুরআন-সুন্নাহর সেই শিক্ষা, যা তাঁরা নিজেদের জীবনে সবচেয়ে বিশুদ্ধভাবে বাস্তবায়ন করে
দেখিয়েছেন, উভয় দিক থেকেই কিছু
গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা কুরআন, সহিহ হাদিস ও
নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক বর্ণনার আলোকে তুলে ধরা হলো।
তাকওয়া ও আত্মজবাবদিহি, নাজাতের প্রথম সোপান
সাহাবায়ে কেরামের
নসীহতের অন্যতম প্রধান বিষয় ছিল
তাকওয়া, অর্থাৎ সর্বাবস্থায় আল্লাহকে ভয় করা এবং তাঁর সন্তুষ্টিকে
জীবনের প্রধান লক্ষ্য বানানো।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ
করেন—
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ حَقَّ
تُقَاتِهِ
অর্থ : হে ঈমানদারগণ!
তোমরা যথাযথভাবে আল্লাহকে ভয় করো।
—
সূরা
আলে ইমরান, ৩:১০২
সাহাবায়ে কেরামের
কাছে তাকওয়া কোনো মুখস্থ শব্দ ছিল
না; বরং তা ছিল তাঁদের প্রতিটি সিদ্ধান্ত ও আচরণের নিয়ন্ত্রক
শক্তি। তাঁরা মানুষের দৃষ্টির চেয়ে
আল্লাহর দৃষ্টিকে বেশি গুরুত্ব দিতেন।
হযরত উমর ইবনুল
খাত্তাব রা. (ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা)-এর প্রসিদ্ধ আসারে এসেছে—
حَاسِبُوا أَنْفُسَكُمْ قَبْلَ أَنْ
تُحَاسَبُوا، وَزِنُوا أَنْفُسَكُمْ قَبْلَ أَنْ تُوزَنُوا، وَتَزَيَّنُوا
لِلْعَرْضِ الْأَكْبَرِ
অর্থ : তোমাদের হিসাব
নেওয়ার আগে নিজেদের হিসাব নিজেরা নাও, তোমাদের আমল ওজন করার
আগে নিজেরাই তা ওজন করে নাও এবং মহাপ্রদর্শনের দিনের জন্য প্রস্তুত হও।
[এটি
রাসূলুল্লাহ ﷺ -এর হাদিস
নয়; বরং
হযরত উমর রা.-এর নামে বর্ণিত একটি প্রসিদ্ধ আসার। ইমাম তিরমযী
রাহ. সুনানে তিরমিযীর ২৪৫৯ হাদীসের বর্ণনার পরে হযরত উমর
রা.-এর এ আসারটি উল্লেখ করেছেন।]
এই নসীহত আমাদের জন্য
প্রতিদিনের আত্মসমালোচনার দরজা
খুলে
দেয়। দিনের শেষে আমরা নিজেদের প্রশ্ন করতে পারি—আজ আমার নামাজ কেমন হয়েছে? কারও হক নষ্ট করেছি কি? গীবত করেছি কি?
উপার্জনে
হারাম কিছু প্রবেশ করেছে কি? আমার অন্তরে অহংকার,
হিংসা
কিংবা রিয়া জন্ম নিয়েছে কি? মৃত্যু যদি আজই আসে, আমি কি আল্লাহর সামনে দাঁড়ানোর জন্য প্রস্তুত?
অন্যের ভুল খুঁজে বের
করার আগে নিজের ভুল খুঁজে বের
করাই
মুমিনের সৌন্দর্য।
কুরআন-সুন্নাহর দৃঢ় অনুসরণ ও কুরআন
অনুযায়ী জীবন
সাহাবায়ে কেরামের
সমগ্র জীবন ছিল কুরআন ও সুন্নাহকেন্দ্রিক। রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন—
فَعَلَيْكُمْ بِسُنَّتِي وَسُنَّةِ الْخُلَفَاءِ
الرَّاشِدِينَ الْمَهْدِيِّينَ، عَضُّوا عَلَيْهَا بِالنَّوَاجِذِ
"তোমরা আমার সুন্নাহ এবং
হেদায়াতপ্রাপ্ত খোলাফায়ে
রাশেদীনের সুন্নাহ আঁকড়ে ধরো এবং তা মাড়ির দাঁত দিয়ে শক্তভাবে আঁকড়ে ধরো।"
— সুনানে আবু দাউদ, হাদিস ৪৬০৭; জামে তিরমিজি, হাদিস ২৬৭৬
সাহাবায়ে কেরাম এই
নির্দেশ শুধু মুখে গ্রহণ করেননি; তাঁরা জীবনের প্রতিটি
ক্ষেত্রে বাস্তবায়ন করেছেন।
হযরত উসমান ইবনে
আফফান রা. (ইসলামের তৃতীয় খলিফা)-এর প্রসিদ্ধ উক্তি বর্ণিত হয়েছে—
لَوْ طَهُرَتْ قُلُوبُنَا مَا شَبِعْنَا مِنْ كَلَامِ
رَبِّنَا
অর্থ : আমাদের অন্তর
যদি পবিত্র হতো, তাহলে আমরা আমাদের রবের কালাম থেকে কখনো
পরিতৃপ্ত হতাম না। — আল বেদায়া ওয়ান নেহায়া, খন্ড ১০, পৃষ্ঠা ৩৮৮
রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন—
خَيْرُكُمْ مَنْ تَعَلَّمَ الْقُرْآنَ وَعَلَّمَهُ
অর্থ : তোমাদের মধ্যে
সর্বোত্তম সেই ব্যক্তি, যে কুরআন শেখে এবং অন্যকে শেখায়। — সহিহ বুখারি, হাদিস ৫০২৭
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে
মাসউদ রা. (কুরআনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ
শিক্ষক
ও ফকীহ সাহাবি) ছিলেন কুরআনের গভীর জ্ঞানের অধিকারী। তাঁর নামে বিভিন্ন
আসারগ্রন্থে কুরআনকে গভীরভাবে
অনুধাবন এবং তার ওপর আমলের প্রতি উৎসাহিত করার বর্ণনা পাওয়া যায়।
সাহাবায়ে কেরামের
শিক্ষা ছিল—কুরআন শুধু দ্রুত পড়ে
শেষ
করার জন্য নয়; বরং তা বুঝতে হবে, হৃদয়ে ধারণ করতে হবে এবং জীবনে বাস্তবায়ন করতে হবে।
আমাদের কুরআনের সঙ্গে
সম্পর্ক তাই শুধু তিলাওয়াতের
মধ্যে
সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। কুরআন যেন আমাদের আকিদায় আসে, ইবাদতে আসে, চরিত্রে আসে,
পরিবারে
আসে, ব্যবসায় আসে এবং সামাজিক
আচরণে প্রতিফলিত হয়।
নামাজের হেফাজত ও আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক
সাহাবায়ে কেরামের
জীবনে নামাজ ছিল ঈমানি জীবনের কেন্দ্রবিন্দু। রাসূলুল্লাহ
ﷺ ইরশাদ করেছেন—
وَجُعِلَتْ قُرَّةُ عَيْنِي فِي الصَّلَاةِ
অর্থ : আমার চোখের
শীতলতা নামাজের মধ্যে রাখা হয়েছে। — সুনানে নাসায়ি, হাদিস ৩৯৪০
তাঁদের কাছে নামাজ
ছিল শুধু একটি আনুষ্ঠানিক ইবাদত নয়; বরং আল্লাহর সঙ্গে
সম্পর্ক নবায়নের প্রধান মাধ্যম।
আজ আমাদের জীবনে
কাজের চাপ, ব্যবসা, চাকরি, পড়াশোনা, মোবাইল ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, সবকিছুর জন্য সময় আছে; কিন্তু নামাজের সময় হলে যেন
ব্যস্ততা
আমাদের গ্রাস না করে। যে হৃদয় নামাজের মাধ্যমে আল্লাহর সঙ্গে যুক্ত হয়, সেই হৃদয় গুনাহ থেকে বাঁচার শক্তি পায়।
তাই সাহাবায়ে
কেরামের নসীহত আমাদের যেন মনে করিয়ে দেয়—নামাজকে জীবনের অতিরিক্ত কোনো কাজ নয়, বরং জীবনের কেন্দ্র বানাতে হবে।
সত্যবাদিতা, আমানতদারি ও মানুষের অধিকার
খলিফা হওয়ার পর হযরত
আবু বকর সিদ্দীক রা. (ইসলামের
প্রথম
খলিফা) যে ভাষণ দিয়েছিলেন, তাতে নেতৃত্ব, সত্যবাদিতা, আমানতদারি ও
ন্যায়বিচারের অসাধারণ নীতি ফুটে
ওঠে। সীরাত ও ইতিহাসের গ্রন্থে (যেমন তারিখে তাবারি, সীরাতে ইবনে হিশাম-জাতীয় উৎসে)
তাঁর ভাষণের বিভিন্ন বর্ণনা পাওয়া যায়। তিনি বলেন—
أَيُّهَا النَّاسُ، إِنِّي قَدْ وُلِّيتُ عَلَيْكُمْ
وَلَسْتُ بِخَيْرِكُمْ، فَإِنْ أَحْسَنْتُ فَأَعِينُونِي، وَإِنْ أَسَأْتُ
فَقَوِّمُونِي، الصِّدْقُ أَمَانَةٌ، وَالْكَذِبُ خِيَانَةٌ
অর্থ : হে মানুষ!
আমাকে তোমাদের ওপর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে,
অথচ আমি তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম নই। আমি ভালো কাজ করলে তোমরা আমাকে সহযোগিতা করবে, আর আমি ভুল করলে আমাকে সংশোধন করবে। সত্যবাদিতা
আমানত, আর মিথ্যা খেয়ানত।
তিনি আরও বলেন—
وَالضَّعِيفُ فِيكُمْ قَوِيٌّ عِنْدِي حَتَّى أُرْجِعَ
إِلَيْهِ حَقَّهُ، وَالْقَوِيُّ فِيكُمْ ضَعِيفٌ عِنْدِي حَتَّى آخُذَ الْحَقَّ
مِنْهُ
অর্থ : তোমাদের মধ্যে
দুর্বল ব্যক্তি আমার কাছে শক্তিশালী,
যতক্ষণ না আমি তার হক তাকে ফিরিয়ে দিই; আর শক্তিশালী ব্যক্তি আমার কাছে দুর্বল, যতক্ষণ না আমি তার কাছ থেকে হক আদায় করি। — আল বেদায়া ওয়ান
নেহায়া,
খন্ড ৮, পৃষ্ঠা ৮৯
এই ভাষণ আমাদের
শেখায়, ক্ষমতা সম্মানের বিষয় হলেও তার চেয়েও বড় বিষয় হলো জবাবদিহি। সত্যবাদিতা
শুধু মুখের কথায় নয়; ব্যবসা, চাকরি, শিক্ষা, পরিবার ও সামাজিক সম্পর্ক—সব ক্ষেত্রেই এর বাস্তবায়ন
জরুরি।
আজ মিথ্যা বিজ্ঞাপন, পণ্যের ত্রুটি গোপন করা, ওজনে কম দেওয়া, কর্মচারীর প্রাপ্য আটকে রাখা, প্রতিষ্ঠানের সম্পদে খেয়ানত করা কিংবা কারও অধিকার আত্মসাৎ করা,
সবই
আমানতদারির পরিপন্থী।
একজন মুসলিমের পরিচয়
তার লেনদেন, আচার ব্যবহারের ক্ষেত্রেও প্রকাশ পেতে হবে।
ন্যায়বিচার, দায়িত্ব ও জবাবদিহি
রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন—
كُلُّكُمْ رَاعٍ وَكُلُّكُمْ مَسْئُولٌ عَنْ
رَعِيَّتِهِ
অর্থ : তোমাদের
প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেককে তার অধীনস্থদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে। — সহিহ বুখারি, হাদিস ৮৯৩; সহিহ মুসলিম, হাদিস ১৮২৯
শাসক তাঁর প্রজার
ব্যাপারে, বাবা-মা সন্তানদের ব্যাপারে, শিক্ষক ছাত্রদের ব্যাপারে, প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা কর্মচারীদের ব্যাপারে এবং প্রত্যেক মানুষ নিজ নিজ দায়িত্বের ব্যাপারে জিজ্ঞাসিত
হবে।
হযরত উমর রা.-এর
জীবনেও এই জবাবদিহির অনুভূতি অত্যন্ত প্রবল ছিল। তাঁর মৃত্যুর পূর্বে পরবর্তী খলিফা নির্বাচনের জন্য ছয়জন বিশিষ্ট
সাহাবিকে নিয়ে শূরা গঠন করার
ঘটনা সহিহ বুখারীতে বর্ণিত হয়েছে। হাদিস নং: ৩৭০০
এতে শিক্ষা হলো, নেতৃত্ব ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়; এটি উম্মাহর আমানত। আর
আমানতের সঙ্গে জড়িত থাকে পরামর্শ, দায়িত্ববোধ ও
জবাবদিহি।
দুনিয়ার মোহ থেকে বেঁচে আখিরাতমুখী জীবন
রাসূলুল্লাহ ﷺ হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা.-কে ইরশাদ করেছিলেন—
كُنْ فِي الدُّنْيَا كَأَنَّكَ غَرِيبٌ أَوْ عَابِرُ
سَبِيلٍ
অর্থ : তুমি
দুনিয়ায় এমনভাবে থাকো, যেন তুমি একজন অপরিচিত ব্যক্তি অথবা পথ
অতিক্রমকারী মুসাফির। — সহিহ বুখারি, হাদিস ৬৪১৬
সাহাবায়ে কেরাম
দুনিয়াকে ব্যবহার করেছেন, কিন্তু দুনিয়াকে নিজেদের চূড়ান্ত লক্ষ্য বানাননি।
হযরত আবু যর গিফারী
রা. ছিলেন দুনিয়াবিমুখতা ও সরলতার
জন্য
প্রসিদ্ধ।
হযরত আবু যর গিফারী
রা. ছিলেন দুনিয়াবিমুখতা ও সরলতার জন্য প্রসিদ্ধ। একবার শামের আমীর তাঁর কাছে
তিনশ দিনার উপঢৌকন পাঠালে তিনি তা ফিরিয়ে দিয়ে বলেন—
أَوَجَدَ أَمِيرُ الشَّامِ عَبْدًا لِلَّهِ أَهْوَنَ
عَلَيْهِ مِنِّي
অর্থ : শামের আমীর কি আমার চেয়েও
নিকৃষ্ট কোনো আল্লাহর বান্দা খুঁজে পেল না, যে আমাকে এই সম্পদ পাঠাল? — আল মু’জামুল কাবীর লিত তাবরানী, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ১৫০, হাদীস নং ১৬৩০; তাফসীরে ইবনে কাসীর (সূরা বাকারা, ২৭৩)
তাঁর মৃত্যুর ঘটনাও
অত্যন্ত হৃদয়স্পর্শী। তিনি এক নির্জন স্থানে ইন্তেকাল করেন এবং একদল মুসলিম তাঁর জানাজায় উপস্থিত হয়। হযরত ইবনে
মাসউদ (রা.)ও তার জানাযায় শরিক হন।
তাঁর মৃত্যু সম্পর্কে বিস্তারিত মুসতাদরাকে হাকেম বিস্তারিত বর্ণনা আছে। (আল-মুসতাদরাক লিল হাকিম, হাদিস ৪৩৭৩)।
এই ঘটনা আমাদের স্মরণ
করিয়ে দেয়, দুনিয়ার চাকচিক্য ক্ষণস্থায়ী। শেষ পর্যন্ত মানুষকে একাই কবরের পথে
যেতে হবে। সঙ্গে যাবে না সম্পদ, পদমর্যাদা কিংবা জনপ্রিয়তা; সঙ্গে যাবে ঈমান ও আমল।
ইলম অর্জন, সংরক্ষণ ও প্রচার
সাহাবায়ে কেরাম
ইলমকে শুধু মর্যাদার বিষয় মনে করতেন না; তাঁরা একে নাজাতের পথ হিসেবে
গ্রহণ করেছিলেন। রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন—
مَنْ يُرِدِ اللَّهُ بِهِ خَيْرًا يُفَقِّهْهُ فِي
الدِّينِ
অর্থ : আল্লাহ যার
কল্যাণ চান, তাকে দ্বীনের গভীর
জ্ঞান দান করেন। — সহিহ বুখারি, হাদিস ৭১; সহিহ মুসলিম, হাদিস ১০৩৭
হযরত আবু হুরায়রা
রা. বিপুলসংখ্যক হাদিস সংরক্ষণ ও
প্রচারের
মাধ্যমে উম্মাহর ওপর অসামান্য ঋণ রেখে গেছেন। তাঁর মাধ্যমে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর হাদিসে এসেছে—
مَنْ سُئِلَ عَنْ عِلْمٍ فَكَتَمَهُ أُلْجِمَ يَوْمَ
الْقِيَامَةِ بِلِجَامٍ مِنْ نَارٍ
অর্থ : যাকে কোনো
জ্ঞান সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলো,
অতঃপর সে তা গোপন করল, কিয়ামতের দিন তাকে
আগুনের লাগাম পরানো হবে। — সুনানে আবু দাউদ, হাদিস ৩৬৫৮; জামে তিরমিজি, হাদিস ২৬৪৯
হযরত মুআয ইবনে জাবাল
রা.-এর জীবনেও ইলমের প্রতি গভীর
অনুরাগ
দেখা যায়। তাঁর নামে বিভিন্ন বর্ণনায় ইলমের মর্যাদা ও তা অন্বেষণের প্রতি উৎসাহের কথা এসেছে।
তবে ইলমের উদ্দেশ্য
শুধু তথ্য সংগ্রহ নয়। ইলমের প্রকৃত
ফল হলো, আল্লাহভীতি, আমল, চরিত্র ও আত্মসংশোধন। যা সাহাবায়ে কেরামের জীবনে পরিপূর্ণ বাস্তবায়িত হয়েছিল।
উত্তম চরিত্র, তওবা ও আত্মশুদ্ধি
রাসূলুল্লাহ ﷺ হযরত মুআয ইবনে জাবাল রা.-কে নসীহত করে ইরশাদ করেছিলেন—
اتَّقِ اللَّهَ حَيْثُمَا كُنْتَ، وَأَتْبِعِ
السَّيِّئَةَ الْحَسَنَةَ تَمْحُهَا، وَخَالِقِ النَّاسَ بِخُلُقٍ حَسَنٍ
অর্থ : তুমি যেখানেই
থাকো আল্লাহকে ভয় করো। মন্দ কাজের পর ভালো কাজ করো, তা মন্দ কাজকে মুছে দেবে। আর মানুষের সঙ্গে উত্তম চরিত্রে
আচরণ করো। — জামে তিরমিজি, হাদিস ১৯৮৭
এখানে একটি বিষয়
বিশেষভাবে লক্ষণীয়—এটি মুআয রা.-এর নিজের বক্তব্য নয়; বরং রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর মুআয রা.-কে দেওয়া নসীহত।
এই সংক্ষিপ্ত নসীহতের
মধ্যে একটি মুমিনের পূর্ণাঙ্গ
আত্মশুদ্ধির
পথনির্দেশ রয়েছে—আল্লাহর সঙ্গে তাকওয়ার সম্পর্ক, গুনাহের পর তওবা ও নেক আমল, এবং মানুষের সঙ্গে উত্তম আচরণ।
ইসলামী চরিত্রের
সৌন্দর্য হলো—মানুষ মসজিদে যেমন, ঘরেও তেমন;
আলেমের
সামনে যেমন, একাকীত্বেও তেমন; মানুষের সঙ্গে যেমন,
দুর্বল
মানুষের সঙ্গেও তেমন।
ঐক্য, আত্মীয়তা ও সামাজিক সম্পর্ক রক্ষা
হযরত আলী ইবনে আবি
তালিব রা. (চতুর্থ খলিফা)-এর নামে
বর্ণিত
ওসিয়তসমূহে তাকওয়া, পারস্পরিক সম্পর্ক
রক্ষা, আত্মীয়তার বন্ধন অটুট রাখা, এতিম ও প্রতিবেশীর হক আদায় এবং মানুষের মধ্যে সংশোধন
সাধনের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব পাওয়া
যায়।
রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন—
أَلَا أُخْبِرُكُمْ بِأَفْضَلَ مِنْ دَرَجَةِ
الصِّيَامِ وَالصَّلَاةِ وَالصَّدَقَةِ؟ ... إِصْلَاحُ ذَاتِ الْبَيْنِ
অর্থ : আমি কি
তোমাদের এমন আমলের কথা বলব না,
যা রোজা, নামাজ ও সদকার
মর্যাদার চেয়েও উত্তম? ... তা হলো পারস্পরিক
সম্পর্ক সংশোধন করা। — জামে তিরমিজি, হাদিস ২৫০৯; সুনানে আবু দাউদ, হাদিস ৪৯১৯
আর আত্মীয়তার
সম্পর্ক সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ
ﷺ ইরশাদ করেছেন—
مَنْ أَحَبَّ أَنْ يُبْسَطَ لَهُ فِي رِزْقِهِ، وَأَنْ
يُنْسَأَ لَهُ فِي أَثَرِهِ، فَلْيَصِلْ رَحِمَهُ
অর্থ : যে ব্যক্তি
চায় তার রিজিক প্রশস্ত করা হোক এবং তার আয়ু বৃদ্ধি করা হোক, সে যেন আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখে। — সহিহ বুখারি, হাদিস ৫৯৮৬; সহিহ মুসলিম, হাদিস ২৫৫৭
আজ সামান্য সম্পদ, উত্তরাধিকার, বিবাহ, পারিবারিক মতপার্থক্য কিংবা পুরোনো বিরোধের কারণে আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে
যায়। অথচ ইসলামের শিক্ষা হলো, ব্যক্তিগত অভিমান ও বিরোধের ঊর্ধ্বে উঠে আত্মীয়তার হক
আদায় করা।
উম্মাহর ঐক্যও
একইভাবে গুরুত্বপূর্ণ। মতপার্থক্য থাকতে পারে, কিন্তু তা যেন ঘৃণা, বিদ্বেষ ও সম্পর্কচ্ছেদের কারণ না হয়।
এতিম, প্রতিবেশী ও দুর্বল মানুষের প্রতি দায়িত্ব
রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন—
مَا زَالَ جِبْرِيلُ يُوصِينِي بِالْجَارِ حَتَّى
ظَنَنْتُ أَنَّهُ سَيُوَرِّثُهُ
অর্থ : জিবরাইল আমাকে
প্রতিবেশীর ব্যাপারে এত বেশি ওসিয়ত করতে থাকলেন যে, আমার মনে হলো তিনি হয়তো প্রতিবেশীকে উত্তরাধিকারী বানিয়ে
দেবেন। — সহিহ বুখারি, হাদিস ৬০১৪; সহিহ মুসলিম, হাদিস ২৬২৪
সাহাবায়ে কেরামের
নসীহতেও এতিম, প্রতিবেশী ও দুর্বল মানুষের প্রতি দায়িত্বের বিষয়টি গুরুত্ব
পেয়েছে।
একটি সমাজের প্রকৃত
সৌন্দর্য বোঝা যায় সেখানে দুর্বল
মানুষের
অবস্থা দেখে। আমাদের আশপাশে কোনো এতিম ক্ষুধার্ত কি না, কোনো প্রতিবেশী চিকিৎসার অভাবে কষ্ট পাচ্ছে কি না, কোনো দরিদ্র পরিবার শীত বা খাদ্যের সংকটে আছে কি না—এসবের খোঁজ নেওয়া ঈমানি দায়িত্বের অংশ।
জুলুম থেকে বেঁচে থাকা ও মানুষের সম্মান
রক্ষা
রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন—
اتَّقُوا الظُّلْمَ، فَإِنَّ الظُّلْمَ ظُلُمَاتٌ
يَوْمَ الْقِيَامَةِ
অর্থ : তোমরা জুলুম
থেকে বেঁচে থাকো; নিশ্চয়ই জুলুম কিয়ামতের দিন অন্ধকারসমূহে
পরিণত হবে। — সহিহ মুসলিম, হাদিস ২৫৭৮
জুলুম শুধু মারধর বা
শারীরিক নির্যাতনের নাম নয়। কারও
সম্পদ
আত্মসাৎ করা, উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত করা, কর্মচারীর প্রাপ্য আটকে রাখা, ব্যবসায় প্রতারণা করা, স্ত্রী-সন্তানের অধিকার নষ্ট করা—এসবও জুলুমের অন্তর্ভুক্ত।
একইভাবে মানুষের
সম্মান রক্ষা করাও জরুরি। রাসূলুল্লাহ ﷺ গীবতের সংজ্ঞা দিতে ইরশাদ
করেছেন—
أَتَدْرُونَ مَا الْغِيبَةُ؟ ... ذِكْرُكَ أَخَاكَ
بِمَا يَكْرَهُ
অর্থ : তোমরা কি জানো
গীবত কী? ... তোমার ভাই সম্পর্কে এমন কথা বলা, যা সে অপছন্দ করে। — সহিহ মুসলিম, হাদিস ২৫৮৯
আজ গীবতের ক্ষেত্র
শুধু বৈঠকখানা নয়; মোবাইল, ফেসবুক, মেসেঞ্জার, হোয়াটসঅ্যাপ ও অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমও এর বড়
ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে।
কাউকে অপমান করা, ব্যক্তিগত বিষয় ছড়িয়ে দেওয়া, যাচাইহীন
অভিযোগ
প্রচার করা কিংবা কারও সম্মান নষ্ট করার মতো পোস্ট শেয়ার করা—এসবের ব্যাপারে একজন মুমিনকে অত্যন্ত সতর্ক থাকতে হবে।
পরিবারের হক ও
সন্তানদের দ্বীনি তরবিয়ত
পরিবারের হক আদায়ের ব্যাপারে সাহাবায়ে কেরাম অপরিসীম
গুরুত্ব দিতেন। তাঁরা এটাও শিখিয়েছেন যে, ইবাদতের প্রতি আগ্রহ যেন জীবনের অন্যান্য হক নষ্ট করার কারণ
না হয়ে যায়। হযরত সালমান ফারসী রা. একবার হযরত আবু দারদা রা.-কে দেখতে গিয়ে
দেখলেন,
তিনি রাতভর নফল ইবাদত ও দিনভর রোজায় নিজেকে এতটাই ব্যস্ত
রেখেছেন যে পরিবারের হকও আদায় করতে পারছেন না। তখন সালমান রা. তাঁকে বলেন—
إِنَّ
لِرَبِّكَ عَلَيْكَ حَقًّا، وَلِنَفْسِكَ عَلَيْكَ حَقًّا، وَلِأَهْلِكَ عَلَيْكَ
حَقًّا، فَأَعْطِ كُلَّ ذِي حَقٍّ حَقَّهُ
অর্থ
: নিশ্চয় তোমার
রবের তোমার ওপর হক আছে, তোমার নিজের ওপরও তোমার হক আছে এবং তোমার পরিবারেরও তোমার ওপর হক আছে। সুতরাং প্রত্যেক হকদারকে তার হক
আদায় করো।
— সহিহ বুখারি, হাদিস ১৯৬৮
আবু দারদা রা. এ কথা রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে
জানালে তিনি বলেন, “সালমান
সত্য বলেছে।” এই ঘটনা আমাদের শেখায়, ইবাদতের প্রতি আগ্রহ যত গভীরই হোক না কেন, তা যেন পরিবারের হক আদায়ে অবহেলার কারণ না হয়। প্রকৃত
তাকওয়া হলো ভারসাম্য—আল্লাহর হক, নিজের হক এবং
পরিবারের হক—সবগুলো যথাযথভাবে আদায় করা।
আল্লাহ তাআলা সন্তানদের ব্যাপারে ইরশাদ করেন—
يَا
أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا قُوا أَنْفُسَكُمْ وَأَهْلِيكُمْ نَارًا
অর্থ : হে ঈমানদারগণ!
তোমরা নিজেদের এবং তোমাদের পরিবারকে আগুন থেকে রক্ষা করো। — সূরা আত-তাহরিম, ৬৬:৬
সন্তান আল্লাহর
দেওয়া আমানত। তার জন্য ভালো খাবার, পোশাক, শিক্ষা ও আর্থিক নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা যেমন জরুরি, তেমনি তার ঈমান,
নামাজ, কুরআন, আদব, সত্যবাদিতা ও চরিত্র গঠনের দায়িত্বও অভিভাবকের।
আজ আমরা সন্তানের
ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা করি, সে কোন স্কুলে পড়বে? কোন পেশায় যাবে? কত টাকা উপার্জন করবে? কিন্তু তার চেয়েও বড় প্রশ্ন হলো, সে আল্লাহকে কতটুকু
চিনবে? নামাজের সঙ্গে তার সম্পর্ক
কেমন হবে? হালাল-হারামের বোধ তার মধ্যে কতটুকু থাকবে?
দুনিয়ার জীবনে
সন্তানের সাফল্য যেমন আনন্দের, তার ঈমানী ও নৈতিক সাফল্য তার চেয়েও বড় সম্পদ।
সবর, তাওয়াক্কুল ও বিপদের সময় দৃঢ়তা
সাহাবায়ে কেরামের
জীবন ছিল পরীক্ষা-নিরীক্ষায় পরিপূর্ণ। নির্যাতন, ক্ষুধা, হিজরত, যুদ্ধ, সম্পদহানি ও প্রিয়জনের মৃত্যু—কোনো কিছুই তাঁদের ঈমানকে ভেঙে দিতে পারেনি।
وَمَنْ يَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ فَهُوَ حَسْبُهُ
অর্থ : যে ব্যক্তি
আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করে, আল্লাহই তার জন্য যথেষ্ট। — সূরা আত-তালাক, ৬৫:৩
হযরত খাব্বাব ইবনুল
আরাত রা.-এর ঘটনা সহিহ বুখারীতে
বর্ণিত
হয়েছে। মক্কার কঠিন নির্যাতনের সময় তিনি রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করলে
তিনি পূর্ববর্তী মুমিনদের কঠিন পরীক্ষার কথা স্মরণ করিয়ে ধৈর্য ধারণে উৎসাহিত করেন। সহিহ বুখারি, হাদিস ৩৬১২
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ
করেন—
তাওয়াক্কুল মানে
উপায়-উপকরণ পরিত্যাগ করা নয়। বরং
বৈধ
উপায় অবলম্বন করে ফলাফলের ব্যাপারে আল্লাহর ওপর নির্ভর করাই প্রকৃত তাওয়াক্কুল।
জীবনে বিপদ এলে হতাশ
না হয়ে আমাদের মনে রাখতে হবে—আল্লাহ আমাদের অবস্থা জানেন। মুমিন চেষ্টা করবে,
দোয়া
করবে, ধৈর্য ধরবে এবং ফলাফলের ভার
আল্লাহর ওপর ছেড়ে দেবে।
ইখলাস, গুনাহ থেকে সতর্কতা ও মৃত্যুর প্রস্তুতি
রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন—
إِنَّمَا الْأَعْمَالُ بِالنِّيَّاتِ
অর্থ : নিশ্চয়ই
আমলসমূহ নিয়তের ওপর নির্ভরশীল।
— সহিহ বুখারি, হাদিস ১; সহিহ মুসলিম, হাদিস ১৯০৭
সাহাবায়ে কেরামের
আমলের অন্যতম শক্তি ছিল ইখলাস। তাঁরা মানুষের প্রশংসার জন্য নয়, আল্লাহর সন্তুষ্টির
জন্য কাজ করতেন।
অন্যদিকে তাঁরা
গুনাহকে কখনো হালকা মনে করতেন না।
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. নিজে বলেছেন—
إِنَّ الْمُؤْمِنَ يَرَى ذُنُوبَهُ كَأَنَّهُ قَاعِدٌ
تَحْتَ جَبَلٍ يَخَافُ أَنْ يَقَعَ عَلَيْهِ
অর্থ : মুমিন ব্যক্তি
তার গুনাহগুলোকে এমনভাবে দেখে,
যেন সে একটি পাহাড়ের নিচে বসে আছে এবং আশঙ্কা করছে যে, পাহাড়টি তার ওপর ধসে পড়বে। — সহিহ বুখারি, হাদিস ৬৩০৮
সামান্য মনে করে গুনাহ করতে করতে মানুষের অন্তর একসময়
গুনাহের প্রতি নির্লজ্জ হয়ে যেতে পারে। তাই কোনো গুনাহকে "এটা তো সামান্য" বলে অবহেলা করা উচিত নয়।
মৃত্যুর স্মরণও
তাঁদের জীবনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল। রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন—
أَكْثِرُوا ذِكْرَ هَاذِمِ اللَّذَّاتِ
অর্থ তোমরা অধিক
পরিমাণে আনন্দ বিনাশকারী বিষয় মৃত্যুকে স্মরণ করো। — জামে তিরমিজি, হাদিস ২৩০৭
মৃত্যুর স্মরণ
মানুষকে হতাশ করার জন্য নয়; বরং তাকে সচেতন করার জন্য। যে ব্যক্তি জানে তাকে একদিন
আল্লাহর সামনে দাঁড়াতে হবে, সে অন্যায় করতে ভয় পায়, মানুষের হক নষ্ট করতে সংকোচ বোধ করে এবং আমলের প্রতি যত্নবান হয়।
ফিতনা থেকে বেঁচে থাকা ও রক্তের মর্যাদা
রক্ষা
হযরত উসমান রা.-এর
শাহাদাতের পূর্ববর্তী সময় ছিল মুসলিম উম্মাহর জন্য অত্যন্ত কঠিন ফিতনার সময়। ইতিহাসের বিভিন্ন গ্রন্থে তাঁর
অবরুদ্ধ অবস্থার বিবরণ পাওয়া যায়।
তিনি মুসলমানদের পারস্পরিক রক্তপাত এড়াতে চেয়েছিলেন এবং নিজের পক্ষ থেকে সংঘাত বাড়াতে অনিচ্ছা প্রকাশ
করেছিলেন।
এই ঘটনাগুলোর
বিস্তারিত বিবরণ মূলত ইতিহাসগ্রন্থে পাওয়া যায়। তাই এগুলোকে সহিহ হাদিসের সমপর্যায়ের দলিল
হিসেবে নয়, ঐতিহাসিক বর্ণনা
হিসেবে উপস্থাপন করাই
সতর্কতার দাবি।
তবে এখান থেকে একটি
গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা স্পষ্ট—ফিতনার
সময়
আবেগের পরিবর্তে হিকমত, সংযম, শরিয়তের নীতি এবং মুসলমানের রক্তের মর্যাদা বিবেচনা করতে হয়।
আজ সামাজিক ও
রাজনৈতিক মতপার্থক্য খুব দ্রুত শত্রুতায় পরিণত হয়। তাই সাহাবায়ে কেরামের জীবন থেকে আমাদের শিখতে হবে—মতপার্থক্য
থাকলেও অন্যায়, গালাগালি, অপমান, বিদ্বেষ ও রক্তপাতের
পথ বেছে নেওয়া যাবে না।
ক্ষমা, উদারতা ও হৃদয়ের পরিচ্ছন্নতা
হযরত আবু বকর সিদ্দীক
রা.-এর জীবনে ক্ষমার এক অনন্য
দৃষ্টান্ত
রয়েছে। মিসতাহ রা.-এর ঘটনায় তিনি কষ্ট পাওয়ার পর আল্লাহ তাআলা ক্ষমা ও উদারতার শিক্ষা দিয়ে ইরশাদ করেন—
وَلْيَعْفُوا وَلْيَصْفَحُوا أَلَا تُحِبُّونَ أَنْ
يَغْفِرَ اللَّهُ لَكُمْ
অর্থ : তারা যেন
ক্ষমা করে এবং উপেক্ষা করে। তোমরা কি পছন্দ করো না যে, আল্লাহ তোমাদের ক্ষমা করুন? — সূরা আন-নূর, ২২
এরপর আবু বকর রা.
পুনরায় তাঁর অনুদান চালু করার সিদ্ধান্ত নেন। এ ঘটনার মূল বিবরণ সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিমে (হাদিসে ইফক-এর দীর্ঘ
বর্ণনার অংশ হিসেবে) এসেছে।
ক্ষমা করা সহজ নয়, বিশেষত যখন কেউ আমাদের কষ্ট দেয়। কিন্তু আল্লাহর ক্ষমা পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা একজন মুমিনকে নিজের
রাগ ও অভিমান নিয়ন্ত্রণ করতে শেখায়।
যে হৃদয় অন্যকে
ক্ষমা করতে পারে, সে হৃদয় নিজেও
প্রশান্তি লাভ করে।
আমর বিল মারুফ ও নাহি আনিল মুনকার
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ
করেন—
وَلْتَكُنْ مِنْكُمْ أُمَّةٌ يَدْعُونَ إِلَى الْخَيْرِ
وَيَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَيَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنْكَرِ
অর্থ : তোমাদের মধ্যে
এমন একটি দল থাকা উচিত, যারা কল্যাণের দিকে আহ্বান করবে, সৎকাজের নির্দেশ দেবে এবং অসৎকাজ থেকে নিষেধ
করবে। — সূরা আলে ইমরান, ৩:১০৪
সাহাবায়ে কেরাম
নিজেদের সংশোধনের পাশাপাশি সমাজ সংশোধনের ব্যাপারেও সচেতন ছিলেন। তবে অন্যকে সংশোধনের ক্ষেত্রে জ্ঞান, হিকমত, কোমলতা ও শরিয়তের নীতিকে গুরুত্ব দিতে হবে।
নসীহতের উদ্দেশ্য
কাউকে অপমান করা নয়; বরং তাকে আল্লাহর দিকে ফিরিয়ে আনা।
আজ সামাজিক
যোগাযোগমাধ্যমে আমরা অনেক সময় অন্যের ভুল ধরতে অত্যন্ত তৎপর, কিন্তু নিজের ভুল
সংশোধনে উদাসীন। সাহাবায়ে কেরামের পথ হলো—প্রথমে নিজেকে সংশোধন, এরপর হিকমতের সঙ্গে অন্যকে সংশোধনের চেষ্টা।
আমাদের জীবনে সাহাবায়ে কেরামের নসীহতের
প্রয়োগ
সাহাবায়ে কেরামের
নসীহত পড়ে যদি আমাদের জীবন পরিবর্তিত না হয়, তাহলে সেই পাঠের উদ্দেশ্যই
অপূর্ণ থেকে যায়। তাঁরা আমাদের জন্য শুধু কিছু কথা রেখে যাননি;
বরং সেই
কথাগুলো নিজেদের জীবনে বাস্তবায়ন করে দেখিয়ে গেছেন। তাই তাঁদের নসীহত, তাঁদের জীবন আদর্শ
আমাদের কাছে শুধু পাঠের বিষয় নয়, বরং জীবন গড়ার উপকরণ।
আমরা যদি সত্যিই
সাহাবায়ে কেরাম রা.-কে ভালোবাসি, তাহলে তাঁদের ভালোবাসার দাবি আমাদের জীবনেও কিছু
পরিবর্তন আনতে হবে। এখনে এমন কিছু বিষয় উল্লেখ করা হলো,
প্রথমত, আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করা। দিনের ব্যস্ততার মধ্যেও
নামাজকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
কুরআনকে
শুধু তিলাওয়াতের কিতাব হিসেবে নয়, জীবন পরিচালনার কিতাব
হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। প্রতিদিন কিছু
সময় কুরআন পড়া, বোঝা এবং নিজের
জীবনের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা—এ অভ্যাস
গড়ে
তুলতে হবে।
দ্বিতীয়ত, নিজেদের হিসাব নিজেরাই নিতে হবে। অন্যের দোষ খুঁজে বেড়ানোর
আগে নিজেকে প্রশ্ন করতে হবে—আমার
ঈমান
কেমন? আমার নামাজ কেমন? আমার উপার্জন হালাল তো? আমার কথায় মিথ্যা আছে কি? আমি কারও হক নষ্ট করেছি কি? কারও মনে কষ্ট দিয়েছি কি? গোপনে এমন কোনো গুনাহ করছি কি, যা মানুষ জানে না কিন্তু আল্লাহ জানেন?
তৃতীয়ত, সত্য ও আমানতদারিকে জীবনের পরিচয় বানাতে হবে। ব্যবসায়, চাকরিতে, লেখাপড়ায়, পারিবারিক
জীবনে
কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে—কোনো ক্ষেত্রেই মিথ্যা, প্রতারণা ও খেয়ানতের আশ্রয় নেওয়া যাবে না। মনে রাখতে হবে, মানুষের চোখ এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব; কিন্তু আল্লাহর দৃষ্টি থেকে কিছুই গোপন নয়।
চতুর্থত, মানুষের হককে গুরুত্ব দিতে হবে। বাবা-মা, স্বামী-স্ত্রী,
সন্তান, আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী, কর্মচারী, সহকর্মী—প্রত্যেকেরই
কোনো না কোনো হক রয়েছে। অনেক সময় আমরা নফল ইবাদতে যতটা আগ্রহী, মানুষের হক আদায়ের
ব্যাপারে ততটা সচেতন নই। অথচ সাহাবায়ে কেরামের জীবন আমাদের শেখায়—আল্লাহর হকের পাশাপাশি বান্দার হকও অত্যন্ত
গুরুত্বপূর্ণ।
পঞ্চমত, আমাদের ঘরকে দ্বীনের ঘর বানাতে হবে। সন্তানকে শুধু দুনিয়াবি
সফলতার জন্য প্রস্তুত করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না।
তাকে নামাজ শেখাতে হবে, কুরআনের সঙ্গে পরিচিত
করতে হবে, সত্যবাদিতা ও আদব শেখাতে হবে, হালাল-হারামের অনুভূতি তৈরি করতে হবে। সন্তান যেন শুধু বড় হয়ে সফল মানুষ না হয়; বরং আল্লাহর নেক বান্দা হয়—এটাই হওয়া উচিত একজন মুসলিম অভিভাবকের বড় চিন্তা।
ষষ্ঠত, সম্পর্কগুলোকে জোড়া লাগাতে হবে। কোনো ভাইয়ের সঙ্গে অভিমান, আত্মীয়ের সঙ্গে বিরোধ, প্রতিবেশীর সঙ্গে মনোমালিন্য কিংবা পুরোনো কোনো কষ্ট যদি আমাদের সম্পর্ক ছিন্ন
করে রাখে, তাহলে সাহাবায়ে কেরামের আদর্শ অনুসরণ করে আমাদেরই আগে
এগিয়ে যেতে হবে। সব সময় কে আগে ভুল করেছে—এই
হিসাব না করে ভাবতে হবে, আমি কি আল্লাহর
সন্তুষ্টির জন্য ক্ষমা করতে পারি না?
সপ্তমত, জবান ও আঙুল—দুটোকেই সংযত করতে হবে। মুখের গীবত যেমন গুনাহ, তেমনি মোবাইলে কারও বিরুদ্ধে লেখা, অপবাদ ছড়ানো, যাচাইহীন সংবাদ শেয়ার করা কিংবা কারও সম্মান নষ্ট করে এমন
মন্তব্য করাও বিপজ্জনক। একটি
কথা বলার আগে কিংবা একটি পোস্ট শেয়ার করার আগে নিজেকে জিজ্ঞেস করা দরকার—এটি কি আল্লাহকে সন্তুষ্ট করবে?
অষ্টমত, দুনিয়াকে হাতে রাখতে হবে, হৃদয়ে নয়। অর্থ,
বাড়ি, ব্যবসা, চাকরি, প্রযুক্তি—এসব আমাদের প্রয়োজন; কিন্তু এগুলো যেন আমাদের জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্য না হয়ে
যায়। মৃত্যু একদিন সবকিছু থেকে বিচ্ছিন্ন করে
দেবে। তাই দুনিয়ার জন্য যতটা চেষ্টা করছি,
আখিরাতের
জন্যও ততটাই প্রস্তুতি নেওয়া
দরকার।
আর যখন জীবনে বিপদ
আসবে, তখন সাহাবায়ে কেরামের মতো সবর ও তাওয়াক্কুল অবলম্বন করতে হবে। হতাশ হয়ে
পড়া নয়; বরং চেষ্টা, দোয়া, তওবা ও আল্লাহর ওপর ভরসা—এই চারটি বিষয়কে আঁকড়ে ধরতে
হবে।
সবশেষে, অন্যকে সংশোধনের আগে নিজেকে সংশোধন করতে
হবে। সাহাবায়ে কেরামের
নসীহত থেকে আমরা যেন এমন মানুষ হয়ে উঠি,
যাকে
দেখে পরিবার দ্বীনের প্রতি আগ্রহী
হয়, যার লেনদেনে মানুষ নিরাপদ বোধ
করে, যার কথায় সত্য থাকে, যার অন্তরে আল্লাহর ভয় থাকে এবং যার উপস্থিতিতে মানুষ
শান্তি অনুভব করে।
সাহাবায়ে কেরামের
যুগে ফিরে যাওয়া আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়;
কিন্তু সাহাবায়ে কেরামের আদর্শের দিকে ফিরে যাওয়া আজও সম্ভব। তাঁদের মতো হওয়ার দাবি হয়তো আমরা করতে পারব না, কিন্তু
তাঁদের
পথ অনুসরণ করার চেষ্টা তো করতে পারি। সেই চেষ্টাই হতে পারে আমাদের ভালোবাসার সবচেয়ে সুন্দর প্রমাণ।
উপসংহার
সাহাবায়ে কেরামের
নসীহত যত পড়ি, ততই মনে হয়, তাঁরা যেন শুধু তাঁদের
সময়ের মানুষকে নয়, আমাদেরকেও উদ্দেশ্য
করে কথা বলেছেন। তাঁদের ভাষায়
ছিল
আখিরাতের চিন্তা, কথায় ছিল আল্লাহর
ভয়, জীবনে ছিল কুরআনের আমল এবং
আচরণে ছিল মানুষের প্রতি দয়া ও
ইনসাফ।
আজ আমাদের হাতে কুরআন
আছে, কিন্তু কুরআনের শিক্ষা কি আমাদের জীবনে আছে?
আমরা হাদিস পড়ি, কিন্তু সুন্নাহ কি আমাদের চরিত্রে ফুটে ওঠে?
আমরা সাহাবায়ে কেরাম
রা.-কে ভালোবাসি, কিন্তু তাঁদের সত্যবাদিতা কি আমাদের কথায় আছে? তাঁদের আমানতদারি কি আমাদের লেনদেনে আছে? তাঁদের তাকওয়া কি আমাদের নির্জন জীবনে আছে? তাঁদের সবর কি আমাদের
বিপদের সময় আছে? তাঁদের
দুনিয়াবিমুখতা কি আমাদের হৃদয়ে আছে? তাঁদের উম্মাহর প্রতি দরদ কি আমাদের আচরণে আছে?
প্রশ্নগুলো কঠিন, কিন্তু এ প্রশ্নগুলোই হয়তো আমাদের জন্য সবচেয়ে প্রয়োজনীয়।
একবার ভেবে দেখি, আজ যদি আমাদের জীবনের শেষ দিন হয়, তাহলে কী নিয়ে আমরা আল্লাহর সামনে দাঁড়াব? আমাদের ব্যাংক-ব্যালেন্স? ব্যবসার হিসাব? সামাজিক মর্যাদা? নাকি নামাজ, কুরআন, সত্যবাদিতা, মানুষের হক আদায়, গোপন ইবাদত ও একটি পরিশুদ্ধ হৃদয়?
সাহাবায়ে কেরামের
জীবন আমাদের শেখায়, মানুষের প্রকৃত সফলতা দুনিয়ায় কত কিছু
অর্জন করেছে, তার মধ্যে নয়; বরং আল্লাহর কাছে কী নিয়ে পৌঁছাতে পারল, তার মধ্যে।
তাই আসুন, আজ থেকেই আমরা নিজেদের জীবনে কিছু পরিবর্তনের অঙ্গীকার করি। নামাজকে আর অবহেলা করব না। কুরআনের
সঙ্গে নতুন করে সম্পর্ক গড়ব। হারাম
উপার্জন
থেকে বাঁচব। মিথ্যা ও প্রতারণা পরিত্যাগ করব। মানুষের হক আদায় করব। গীবত ও অপবাদ থেকে জবানকে হেফাজত করব। আত্মীয়তার
সম্পর্ক জোড়া লাগাব। সন্তানদের দ্বীনি তরবিয়তের প্রতি যত্নবান হব। বিপদে সবর করব, নেয়ামতে শুকর করব এবং সর্বাবস্থায় আল্লাহর ওপর ভরসা রাখব।
কোনো ভাইয়ের সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট হয়ে থাকলে,
হয়তো
আজই একটি ফোন করা যায়।
কাউকে কষ্ট দিয়ে থাকলে, হয়তো আজই ক্ষমা চাওয়া যায়।
কোনো গুনাহে জড়িয়ে থাকলে, হয়তো আজ রাতেই তওবা
করা যায়।
কুরআন থেকে দূরে সরে গেলে, হয়তো আজই আবার কুরআন
খুলে বসা যায়।
নামাজে অবহেলা হয়ে থাকলে, হয়তো পরবর্তী আজান
থেকেই নতুনভাবে শুরু করা যায়।
কারণ আল্লাহর দিকে
ফিরে আসার জন্য কোনো নির্দিষ্ট বয়স লাগে না,
কোনো বিশেষ দিন লাগে না; লাগে শুধু একটি
সত্যিকারের সিদ্ধান্ত।
সাহাবায়ে কেরাম রা.
আমাদের জন্য যে ঈমানি উত্তরাধিকার
রেখে
গেছেন, আসুন আমরা তা শুধু পড়ে না
রাখি, হৃদয়ে ধারণ করি, জীবনে বাস্তবায়ন করি এবং পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিই।
হয়তো আমরা তাঁদের
মতো হতে পারব না; কিন্তু তাঁদের পথের পথিক হতে পারি।
হয়তো তাঁদের ত্যাগের
সমান ত্যাগ করতে পারব না; কিন্তু নিজের নফসের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করতে পারি।
হয়তো তাঁদের মতো
তাকওয়া অর্জন করতে পারব না; কিন্তু তাকওয়ার পথে প্রতিদিন এক ধাপ করে এগিয়ে যেতে
পারি।
সাহাবায়ে কেরামের
নসীহত আমরা কতটুকু পড়েছি, এটি বড় কথা নয়; বরং তাঁদের নসীহতের কতটুকু আমাদের জীবনে এসেছে, সফলতার আসল হিসাব হবে সেটিই।
আল্লাহ তাআলা আমাদের
অন্তরকে সাহাবায়ে কেরামের ঈমানি
আদর্শের
আলোয় আলোকিত করুন, তাঁদের নসীহত থেকে
শিক্ষা গ্রহণের তাওফীক দিন এবং কুরআন-সুন্নাহ অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করে তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনের তাওফীক
দান করুন।
اللَّهُمَّ أَصْلِحْ قُلُوبَنَا
وَأَعْمَالَنَا، وَاجْعَلْنَا مِنْ أَهْلِ الْقُرْآنِ وَالسُّنَّةِ، وَاحْشُرْنَا
مَعَ النَّبِيِّينَ وَالصِّدِّيقِينَ وَالشُّهَدَاءِ وَالصَّالِحِينَ
آمِينَ يَا رَبَّ الْعَالَمِينَ
মন্তব্য (...)
এ সম্পর্কিত আরও প্রবন্ধ
মাহে রমযান কুরআন ও তাকওয়ার পথে অগ্রসর হওয়ার মৌসুম
বছর ঘুরে আবারো বিশ্বের মুসলমানদের দোরগোড়ায় উপস্থিত হয়েছে রমযানুল মোবারক। রহমত ও মাগফিরাত , সহমর্মিতা...
আল্লাহওয়ালাদের তাযকেরায় দিল তাযা হয়
...
সত্যের পথে অবিচলতা: গুরুত্ব, টিকে থাকার উপায় ও বিচ্যুতির কারণসমূহ
সত্যের উপর অবিচল থাকার গুরুত্ব মানবজাতির চিরন্তন সফরের সবচেয়ে কঠিন অথচ অনিবার্য পরীক্ষা হলো সত্যের ...
আল্লাহর নিকট ইসলাহের তাওফীক প্রার্থনা করুন
...
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন