প্রবন্ধ
গুনাহ যত বড়ই হোক, আল্লাহর রহমত তার চেয়েও বড়
৭ অক্টোবর, ২০২৬
৯৩৩
০
একজন মানুষ সারাদিন পরিশ্রম করে বাড়িতে ফিরেছে। তার শরীর ও কাপড়চোপড় ময়লা হয়ে গেছে। পরিবারের লোকেরা বলল, ‘গোসল করে পরিষ্কার হয়ে নাও।’
সে যদি উত্তর দেয়, ‘আজ গোসল করে কী হবে? কাল আবার কাজে যাব, আবার শরীর ময়লা হবে!’
তাহলে কি তার এই যুক্তি গ্রহণযোগ্য হবে? কেউ কি তাকে বলবে, ঠিক আছে, যেহেতু কাল আবার ময়লা হবে, তাই আজ আর পরিষ্কার হওয়ার দরকার নেই?
না। বরং তাকে বলা হবে, ‘আজকের ময়লা আজই পরিষ্কার করো। কাল আবার ময়লা হলে কাল আবার পরিষ্কার হবে।’
গুনাহের ব্যাপারেও আমাদের শিক্ষা হলো—গুনাহ হয়ে গেলে তাওবা করুন। পরে আবার ভুল হয়ে গেলে আবার তাওবা করুন। প্রতিবার গুনাহের পর আন্তরিকভাবে আল্লাহর দিকে ফিরে আসুন।
মনে রাখবেন, আপনার কাজ গুনাহকে ছোট করে দেখা নয়; আবার নিজের গুনাহকে এত বড় মনে করে আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ে যাওয়াও নয়। আপনার কাজ হলো—গুনাহকে গুনাহ মনে করা, আন্তরিকভাবে তাওবা করা এবং নিজেকে সংশোধনের চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া।
تَعَلُّق رَبْطِ بَاہَمْ ہے تو پھر یہ روٹھنا کیسا
اگر سو بار ٹوٹے تو سو بار جوڑ لیتے ہیں
অর্থাৎ—যদি সম্পর্কের বন্ধন থাকে, তাহলে অভিমান করে দূরে থাকা কেন?
একশোবার যদি সম্পর্ক ভেঙেও যায়, একশোবারই আমরা তা জুড়ে নিই।
اَلْحَمْدُ لِلّهِ وَكَفَى وَسَلَامٌ عَلَى عِبَادِهِ الَّذِيْن َاصْطَفَى اَمَّا بَعْدُ! فَاَعُوْذُ بِاللهِ مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّجِيْمِ. بِسْمِ اللهِ الرَّحْمنِ الرَّحِيْمِ. قُلْ يَا عِبَادِيَ الَّذِينَ أَسْرَفُوا عَلَى أَنْفُسِهِمْ لَا تَقْنَطُوا مِنْ رَحْمَةِ اللَّهِ ۚ إِنَّ اللَّهَ يَغْفِرُ الذُّنُوبَ جَمِيعًا ۚ إِنَّهُ هُوَ الْغَفُورُ الرَّحِيمُ
بَارَكَ اللهُ لِيْ وَلَكُمْ فِي الْقُرْآنِ الْعَظِيْمِ، وَنَفَعَنِيْ وَإِيَّاكُمْ بِمَا فِيْهِ مِنَ اْلآيَاتِ وَالذِّكْرِ الْحَكِيْمِ. وجَعَلَنِيْ إِيَّاكُمْ مِنَ الصَّالِحِينَ
أَقُوْلُ قَوْلِيْ هَذَا أَسْتَغْفِرُ اللهَ لِيْ وَلَكُمْ وَلِسَائِرِ الْمُسْلِمِيْنَ. فَاسْتَغْفِرُوْهُ، إِنَّهُ هُوَ الْغَفُوْرُ الرَّحِيْمُ.
اَللَّهُمَّ صَلِّ عَلَى سَيِّدِنَا مُحَمَّدٍ وَّعَلَى آلِ سَيِّدِنَا مُحَمَّدٍ وَّبَارِكْ وَسَلِّمْ
হামদ ও সালাতের পর!
রাহমান ও রাহীম
মুহতারাম হাজিরীন! আল্লাহ রব্বুল ইজ্জতের দুটি গুণবাচক নাম হলো—রাহমান ও রাহীম। দুটো নামই ‘রহমত’ থেকে এসেছে। তবে দুটির মধ্যে সূক্ষ্ম একটা পার্থক্য আছে। রাহমান অর্থ—অসীম ও ব্যাপক রহমতের অধিকারী। আর রাহীম অর্থ—যিনি তাঁর বান্দাদের ওপর বারবার, অবিরত ও বিশেষভাবে রহমত বর্ষণ করেন।
একজন মানুষের ধনী হওয়া তার একটি গুণ; কিন্তু সেই সম্পদ মানুষের কল্যাণে অকাতরে ব্যয় করার মানসিকতা তার আরেকটি গুণ। ঠিক তেমনি আল্লাহ তাআলা সীমাহীন রহমতের মালিক—এটি তাঁর একটি গুণ; আর বান্দাদের ওপর সেই রহমত অকাতরে বর্ষণ করা তাঁর আরেকটি বিশেষ গুণ।
তুমি এখনো আমার বান্দা
দুনিয়াতে আমরা দেখি, কোনো সন্তান যদি বাবার অবাধ্য হয়, বারবার বাবাকে কষ্ট দেয়, তাহলে একসময় বাবা তার ওপর রাগ করেন। সরাসরি কথা বলা বন্ধ করে দেন। কোনো প্রয়োজন হলে স্ত্রীকে বলেন, ‘ওকে বলে দাও, কাজটা যেন করে।’ সন্তান সামনে থাকলেও বাবা তার সঙ্গে সরাসরি কথা বলতে চান না।
কিন্তু আমার আল্লাহর ব্যাপারটা একেবারেই ভিন্ন! বান্দা আল্লাহর নাফরমানি করছে, গুনাহ করছে, আল্লাহকে নারাজ করছে—তারপরও আল্লাহ তাকে দূরে ঠেলে দেন না। বরং গুনাহগার বান্দাকেই সরাসরি সম্বোধন করে বলেন
قُلْ يَا عِبَادِيَ الَّذِينَ أَسْرَفُوا عَلَى أَنْفُسِهِمْ لَا تَقْنَطُوا مِنْ رَحْمَةِ اللَّهِ ۚ إِنَّ اللَّهَ يَغْفِرُ الذُّنُوبَ جَمِيعًا ۚ إِنَّهُ هُوَ الْغَفُورُ الرَّحِيمُ
বলুন, হে আমার সেই বান্দারা, যারা নিজেদের ওপর জুলুম করে ফেলেছ! তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করে দেন। নিশ্চয়ই তিনি পরম ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। [ সূরা আয-যুমার : ৫৩]
একটু খেয়াল করুন—আল্লাহ বলেননি, ‘হে গুনাহগাররা!’ বলেননি, ‘হে অপরাধীরা!’ বরং বলেছেন يَا عِبَادِيَ ‘হে আমার বান্দারা!’
তুমি গুনাহ করেছ, কিন্তু তুমি এখনো আমার বান্দা।
তুমি ভুল করেছ, কিন্তু আমার দরজা এখনো তোমার জন্য খোলা।
তুমি অনেক দূরে চলে গেছ, কিন্তু ফিরে আসার পথ এখনো বন্ধ হয়নি।
আল্লাহ তাআলা আরও বলেন لَا تَقْنَطُوا مِنْ رَحْمَةِ اللَّهِ ‘আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না।’
গুনাহ করার পর শয়তান যে ধোঁকা দেয়
মানুষ গুনাহ করার পর শয়তান তাকে ধোঁকা দেয়। বলে, তুমি তো অনেক গুনাহ করে ফেলেছ। তোমার আর ক্ষমা নেই। তুমি কীভাবে আল্লাহর সামনে যাবে?
না! এটাই শয়তানের সবচেয়ে বড় প্রতারণা। গুনাহ যত বড়ই হোক, আল্লাহর রহমত তার চেয়েও বড়।
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন
لَمَّا قَضَى اللَّهُ الْخَلْقَ، كَتَبَ فِي كِتَابِهِ عَلَى نَفْسِهِ، فَهُوَ مَوْضُوعٌ عِنْدَهُ: إِنَّ رَحْمَتِي تَغْلِبُ غَضَبِي
আল্লাহ যখন সৃষ্টিজগতের সৃষ্টি সম্পন্ন করলেন, তখন তিনি তাঁর কিতাবে নিজের ওপর লিখে রাখলেন—নিশ্চয়ই আমার রহমত আমার ক্রোধকে পরাভূত করে। [সহীহ মুসলিম : ২৭৫১]
আর আল্লাহ তাঁর একশত রহমতের মাত্র এক ভাগ দুনিয়ায় পাঠিয়েছেন, বাকি নিরানব্বই ভাগ নিজের কাছে রেখেছেন। তাহলে কোনো গুনাহগার বান্দা কেন আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হবে? বান্দার দায়িত্ব হলো—গুনাহের ওপর পড়ে না থাকা; বরং উঠে দাঁড়ানো, তাওবা করা এবং আল্লাহর দিকে ফিরে আসা।
দুনিয়ার আদালত বনাম আল্লাহর দয়ার আদালত
আল্লাহর ক্ষমা সত্যিই বিস্ময়কর! দুনিয়ার আদালতে কোনো মানুষ যখন অপরাধে অভিযুক্ত হয়, তার বিরুদ্ধে মামলা হয়, তদন্ত হয়, সাক্ষ্য-প্রমাণ নেওয়া হয়। পরে যদি সে বেকসুর খালাসও পায়, তবুও মামলার একটা রেকর্ড থেকে যায়। দশ বছর পর, বিশ বছর পর কেউ চাইলে সেই পুরোনো রেকর্ড বের করে বলতে পারে—হ্যাঁ, একসময় এই ব্যক্তির বিরুদ্ধেও মামলা হয়েছিল।
কিন্তু আমার আল্লাহর ব্যাপারটা সম্পূর্ণ আলাদা! একজন বান্দা যখন গুনাহ করে, তখন তার বিরুদ্ধে কত প্রমাণ! তার আমলনামায় সবকিছু লেখা হচ্ছে। তার নিজের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ কিয়ামতের দিন সাক্ষ্য দেবে। যে জমিনের ওপর দাঁড়িয়ে সে গুনাহ করেছে, সেই জমিনও সাক্ষ্য দেবে। আর আল্লাহ তাআলা তো শুরু থেকেই সবকিছু দেখছেন।
এতসব অকাট্য প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও বান্দা যদি সত্যিকার অর্থে তাওবা করে আল্লাহর দিকে ফিরে আসে, আল্লাহ শুধু তাকে ক্ষমাই করেন না—তার গুনাহ মুছে দেন। এমনভাবে মুছে দেন, যেন সেই গুনাহের কোনো অস্তিত্বই ছিল না।
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন
لَلَّهُ أَفْرَحُ بِتَوْبَةِ التَّائِبِ مِنَ الظَّمْآنِ الْوَارِدِ، وَمِنَ الْعَقِيمِ الْوَالِدِ، وَمِنَ الضَّالِّ الْوَاجِدِ، فَمَنْ تَابَ إِلَى اللَّهِ تَوْبَةً نَصُوحًا أَنْسَى اللَّهُ حَافِظَيْهِ وَجَوَارِحَهُ وَبِقَاعَ الْأَرْضِ كُلَّهَا خَطَايَاهُ وَذُنُوبَهُ
নিশ্চয়ই আল্লাহ কোনো তাওবাকারী বান্দার তাওবায় তার চেয়েও বেশি আনন্দিত হন—যেমন কোনো তৃষ্ণার্ত ব্যক্তি পানির কাছে পৌঁছে গেলে আনন্দিত হয়, কোনো বন্ধ্যা নারী সন্তান লাভ করলে আনন্দিত হয় এবং কোনো হারানো ব্যক্তি তার হারানো জিনিস ফিরে পেলে আনন্দিত হয়। সুতরাং যে ব্যক্তি আল্লাহর কাছে খাঁটি ও আন্তরিক তাওবা করে, আল্লাহ তার আমল সংরক্ষণকারী ফেরেশতাদের, তার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে এবং পৃথিবীর সকল স্থানকে তার করা গুনাহ ও অপরাধ ভুলিয়ে দেন। [ কানযুল উম্মাল : ১০১৬৬]
এ কেমন ক্ষমা! এ কেমন রহমত!
আল্লাহর রহমতের বিস্ময় এখানেই শেষ নয়। কুরআন মাজিদে আল্লাহ তাআলা আরও এক ধাপ এগিয়ে ঘোষণা করেছেন
إِلَّا مَنْ تَابَ وَآمَنَ وَعَمِلَ عَمَلًا صَالِحًا فَأُولَٰئِكَ يُبَدِّلُ اللَّهُ سَيِّئَاتِهِمْ حَسَنَاتٍ ۗ وَكَانَ اللَّهُ غَفُورًا رَحِيمًا
তবে যারা তাওবা করে, ঈমান আনে এবং নেক আমল করে—আল্লাহ তাদের গুনাহগুলোকে নেকিতে পরিবর্তন করে দেবেন। আর আল্লাহ অতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। [সূরা আল-ফুরকান : ৭০]
সুবহানাল্লাহ! বান্দা গুনাহ করল, তারপর লজ্জিত হয়ে ফিরে এল, তাওবা করল, ঈমানের ওপর অটল হলো, নেক আমল শুরু করল—আল্লাহ শুধু তার গুনাহ ক্ষমা করলেন না; বরং সেই গুনাহগুলোই নেকিতে পরিবর্তন করে দিলেন! এ কেমন রব! এ কেমন ক্ষমা! এ কেমন রহমত!
অন্যের গুনাহ নিয়ে উপহাস করা যাবে না
এখানেও একটা শিক্ষা আছে। যে ব্যক্তি সত্যিকার তাওবা করেছে, তাকে তার পুরোনো গুনাহ নিয়ে অপমান করা যাবে না। সে আজ তাওবাকারী, সে আজ আল্লাহর দিকে ফিরে এসেছে। তার অতীতকে টেনে এনে তাকে বারবার লজ্জা দেওয়া মুমিনের কাজ নয়।
রাসূলুল্লাহ ﷺ সতর্ক করেছেন
مَنْ عَيَّرَ أَخَاهُ بِذَنْبٍ لَمْ يَمُتْ حَتَّى يَعْمَلَهُ
কেউ তার কোনো মুসলিম ভাইকে তার গুনাহের কারণে অপমান করলে, সে নিজেই সেই গুনাহে লিপ্ত না হওয়া পর্যন্ত মৃত্যুবরণ করবে না। [ তিরমিযী : ২৫০৫]
তাই ভাইয়েরা, কারও অতীত জানলে তাকে গুনাহের তকমা দিয়ে বসে থাকবেন না। হতে পারে সে এমনভাবে তাওবা করেছে যে আজ সে আল্লাহর কাছে আপনার চেয়েও প্রিয়। আমরা মানুষের অতীত দেখি; আল্লাহ দেখেন মানুষের বর্তমান ও তাওবা।
হাদিসে নাজওয়া : আল্লাহর গোপন রহমতের পর্দা
আর আল্লাহর পর্দাপোশির ব্যাপারটি আরও বিস্ময়কর। সহীহ বুখারীর হাদিসে এসেছে, যা ‘হাদিসে নাজওয়া’ তথা ‘গোপন কথোপকথনের হাদিস’ নামে সুপরিচিত। কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলা একজন মুমিন বান্দাকে তাঁর নিকটে নিয়ে আসবেন এবং তার ওপর নিজের পর্দা ঢেকে দিয়ে তার গুনাহগুলোর কথা স্মরণ করাবেন।
আল্লাহ বলবেন, أَتَعْرِفُ ذَنْبَ كذا؟ আমার বান্দা! তুমি কি অমুক গুনাহ করেছিলে?
সে বলবে, نَعَمْ أَيْ رَبِّ হ্যাঁ, হে আমার রব।
আবার আল্লাহ জিজ্ঞেস করবেন, أَتَعْرِفُ ذَنْبَ كذا؟ তুমি কি অমুক গুনাহ করেছিলে?
সে বলবে, نَعَمْ أَيْ رَبِّ হ্যাঁ, হে আমার রব।
এভাবে তার অনেক গুনাহের কথা তাকে স্মরণ করানো হবে। তখন সে মনে করবে—আজ তো আমার ধ্বংস নিশ্চিত! এত গুনাহ করেছি, আজ সব প্রকাশ হয়ে গেল! কিন্তু তখন আল্লাহ তাআলা তাকে বলবেন
سَتَرْتُهَا عَلَيْكَ فِي الدُّنْيَا، وَأَنَا أَغْفِرُهَا لَكَ الْيَوْمَ
দুনিয়াতে আমি তোমার গুনাহগুলো মানুষের সামনে প্রকাশ করিনি; আজও আমি তোমাকে ক্ষমা করে দিলাম। [সহীহ বুখারী : ২৪৪১]
সুবহানাল্লাহ! দুনিয়াতে আমরা চাই আমাদের দোষ কেউ না জানুক। কোনো মানুষের সামনে আমাদের একটা ভুল প্রকাশ হয়ে গেলে আমরা লজ্জায় পড়ে যাই। অথচ আল্লাহ আমাদের অসংখ্য ভুল জানেন, আমাদের অসংখ্য গুনাহ দেখেছেন—তারপরও তিনি আমাদের পর্দা ঢেকে রেখেছেন। তাহলে বান্দারও উচিত, আল্লাহ যাকে ঢেকে রেখেছেন, তাকে মানুষের সামনে উন্মুক্ত না করা।
শয়তানের কথায় কান দেবেন না
তো বলছিলাম, আল্লাহর রহমত কত বিস্তৃত—আমরা কল্পনাও করতে পারি না। বান্দা গুনাহ করে, আল্লাহ তাকে সময় দেন। বান্দা আবার গুনাহ করে, আল্লাহ আবারও সুযোগ দেন। বান্দা একদিন লজ্জিত হয়ে ফিরে আসে; আল্লাহ তাকে ফিরিয়ে দেন না। বরং বলেন, ‘এসো, তুমি আমার বান্দা। তুমি ভুল করেছ, কিন্তু আমার রহমত থেকে তুমি বঞ্চিত নও।’ তাই কোনো গুনাহ হয়ে গেলে শয়তানের কথায় কান দেবেন না—তোমার আর ক্ষমা নেই। বরং সঙ্গে সঙ্গে আল্লাহর দিকে ফিরে আসুন। কারণ শয়তান চায় তুমি গুনাহ করো; আর গুনাহ হয়ে যাওয়ার পর সে চায় তুমি আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ে যাও। এই দ্বিতীয় ধোঁকাটি থেকে আমাদের অবশ্যই বাঁচতে হবে।
রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন, শয়তান লজ্জা ও ক্ষোভে আল্লাহকে বলেছিল
وَعِزَّتِكَ يَا رَبِّ، لَا أَبْرَحُ أُغْوِي عِبَادَكَ مَا دَامَتْ أَرْوَاحُهُمْ فِي أَجْسَادِهِمْ
‘হে আমার রব! আপনার মর্যাদার কসম! আমি আপনার বান্দাদেরকে ততক্ষণ পর্যন্ত পথভ্রষ্ট ও গোমরাহ করতেই থাকব, যতক্ষণ তাদের দেহে প্রাণ থাকবে।’
কিন্তু আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দাদের জন্য তাওবার দরজা খুলে রেখেছেন। আল্লাহ তাআলা জবাবে বললেন
وَعِزَّتِي وَجَلَالِي، لَا أَزَالُ أَغْفِرُ لَهُمْ مَا اسْتَغْفَرُونِي
‘আমার ইজ্জত ও মহিমার কসম! ওরাও যতক্ষণ পর্যন্ত আমার কাছে ক্ষমা (ইস্তিগফার) চাইতে থাকবে, আমিও ততক্ষণ পর্যন্ত ওদের ক্ষমা করতেই থাকব।’ [মুসনাদে আহমাদ : ১১০০৩, মুস্তাদরাক আল-হাকিম : ৭৬৭২]
সুতরাং শয়তানের সবচেয়ে বড় চাওয়া হলো—তুমি গুনাহ করো, তারপর গুনাহের কারণে আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ে যাও। আর মুমিনের কাজ হলো—গুনাহ হয়ে গেলে শয়তানের দ্বিতীয় ধোঁকায় না পড়া; বরং সঙ্গে সঙ্গে আল্লাহর দিকে ফিরে আসা।
আল্লাহ তাআলা বান্দার তাওবায় অত্যন্ত আনন্দিত হন
মুহতারাম হাজিরীন! শুধু এটুকুই নয় যে, আল্লাহ তাআলা গুনাহগার বান্দার তাওবা কবুল করেন; বরং সহিহ হাদিসে এসেছে—বান্দা যখন তাওবা করে, আল্লাহ তাআলা তার তাওবায় অত্যন্ত আনন্দিত হন।
রাসূলুল্লাহ ﷺ একটি অসাধারণ উদাহরণ দিয়ে বিষয়টি বুঝিয়েছেন। একজন মানুষ মরুভূমিতে সফর করছে। তার সঙ্গে একটি উটনী। সেই উটনীর ওপর তার খাবার-পানীয় ও সফরের প্রয়োজনীয় সামগ্রী বাঁধা। হঠাৎ উটনীটি দড়ি ছুটিয়ে পালিয়ে গেল। লোকটি তার পেছনে ছুটল। কিন্তু মরুভূমিতে উটের সঙ্গে মানুষ কতক্ষণ দৌড়াতে পারে? একসময় সে ক্লান্ত হয়ে গেল। উটনীটি চোখের আড়ালে চলে গেল।
এদিকে তার কাছে পানি নেই, খাবার নেই। সবকিছু উটনীর সঙ্গে চলে গেছে। সে জানে—এ মরুভূমিতে এভাবে পড়ে থাকলে তার মৃত্যু নিশ্চিত।
অবশেষে সে হতাশ হয়ে একটি গাছের নিচে শুয়ে পড়ল। কিছুক্ষণ পর হঠাৎ ঘুম থেকে উঠে দেখে—তার উটনীটি তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে! তার খাবার আছে, পানি আছে, জীবনের সব উপকরণ আবার ফিরে এসেছে।
লোকটি আনন্দে উটনীর লাগাম ধরে ফেলল। আনন্দের আতিশয্যে সে বলে ফেলল
اللَّهُمَّ أَنْتَ عَبْدِي وَأَنَا رَبُّكَ
‘হে আল্লাহ! আপনি আমার বান্দা, আর আমি আপনার রব!’
অতিরিক্ত আনন্দের কারণে কথাটাই উল্টে গেল। সে বলতে চেয়েছিল, ‘হে আল্লাহ! আপনি আমার রব, আমি আপনার বান্দা।’
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, বান্দা তার হারানো উটনী ফিরে পেয়ে যতটা আনন্দিত হয়, আল্লাহ তাঁর বান্দার তাওবায় তার চেয়েও বেশি আনন্দিত হন। সুবহানাল্লাহ! [সহীহ মুসলিম : ২৭৪৭]
গুনাহ হয়ে গেলে পালিয়ে যাবেন না
আমরা সাধারণত মনে করি—আমি গুনাহ করেছি, এখন আল্লাহ আমার ওপর রাগ করেছেন; আমি কীভাবে তাঁর কাছে যাব? কিন্তু উক্ত হাদিস আমাদের বিপরীত একটা চিত্র দেখাচ্ছে। তুমি যখন সত্যিকার অর্থে তাওবা করে আল্লাহর দিকে ফিরে আসো, তখন আল্লাহ তোমাকে ফিরিয়ে দেন না।
তাই ভাইয়েরা, গুনাহ হয়ে গেলে পালিয়ে যাবেন না—আল্লাহর কাছেই ফিরে যাবেন। কারণ গুনাহের পর আল্লাহ থেকে দূরে সরে যাওয়া শয়তানের পথ; আর গুনাহের পর আল্লাহর কাছে ফিরে আসা মুমিনের পথ।
দুই যুবকের কথপোকথন
একবার দুই যুবকের মধ্যে আলোচনা হচ্ছিল। একজন বলল, ‘যে ব্যক্তি জীবনে কখনো গুনাহ করেনি, আল্লাহর কাছে সেই ব্যক্তিই বেশি প্রিয়।’
অন্যজন বলল, ‘না, এমন ব্যক্তি বেশি মর্যাদার অধিকারী, যে গুনাহে পড়ে গিয়েছিল, কিন্তু পরে নিজের ভুল বুঝে আন্তরিকভাবে তাওবা করেছে এবং আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক ঠিক করে নিয়েছে।’
তাদের মধ্যে কোনো সিদ্ধান্ত হলো না। কিছুক্ষণ পর তারা একজন বৃদ্ধকে আসতে দেখল। তারা তাকে ডেকে বলল, ‘চাচা, আমরা একটা বিষয় নিয়ে আলোচনা করছি। আপনি একটু মীমাংসা করে দিন।’
বৃদ্ধ বললেন, ‘আমি তো আলেম নই, কুরআন-হাদিসের আলোকে তোমাদের ফয়সালা দেওয়ার মতো যোগ্যতা আমার নেই। তবে আমি কাপড় বুনি। কাপড় বুনতে লম্বা লম্বা সুতা লাগে। বুনতে গিয়ে কখনো কোনো সুতা ছিঁড়ে যায়। তখন আমি সেটাকে আবার জোড়া লাগিয়ে দিই। কিন্তু জোড়া লাগানোর পর সেই জায়গাটার দিকে আমি বারবার খেয়াল রাখি—যেন আবার ছিঁড়ে না যায়।’
তারপর তিনি বললেন, ‘তোমাদের কথার ব্যাপারে আমি শুধু এটুকু বলতে পারি—যে বান্দা গুনাহে পড়ে যাওয়ার পর নিজের ভুল বুঝে তাওবা করে, আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক আবার জুড়ে নেয় এবং নিজেকে সংশোধন করে নেয়—তার ব্যাপারে আল্লাহর রহমতের আশা করা যায়। কারণ সে ছিঁড়ে যাওয়া সম্পর্ককে আবার জুড়ে নিয়েছে।’
সবচেয়ে বিপজ্জনক অবস্থা
ভাইয়েরা! আমাদের মধ্যে এমন কে আছে যে কখনো গুনাহ করেনি? কেউ বলতে পারবে না—আমি জীবনে কোনো ভুল করিনি। আমরা সবাই কমবেশি গুনাহ করি, ভুল করি, কখনো নফসের কাছে হেরে যাই, কখনো শয়তানের ধোঁকায় পড়ে যাই। কিন্তু বুদ্ধিমান সে নয়, যে দাবি করে—আমি কখনো ভুল করি না। বুদ্ধিমান হলো সে, যে ভুল করার পর ভুলের ওপর পড়ে থাকে না।
গুনাহ হয়ে গেল—সঙ্গে সঙ্গে তাওবা।
চোখের গুনাহ হয়ে গেল—সঙ্গে সঙ্গে তাওবা।
মুখের গুনাহ হয়ে গেল—সঙ্গে সঙ্গে তাওবা।
হারাম কিছু হয়ে গেল—সঙ্গে সঙ্গে তাওবা।
কারও হক নষ্ট হয়ে গেল—সঙ্গে সঙ্গে তা ফিরিয়ে দিয়ে তাওবা।
কারণ সবচেয়ে বিপজ্জনক অবস্থা হলো—গুনাহ করা, আবার গুনাহ করা, একের পর এক গুনাহ করা, কিন্তু তাওবার কথা মনে না হওয়া।
তাই গুনাহ হয়ে গেলে বলুন, ‘হে আল্লাহ! আমি ভুল করেছি। আমি দুর্বল। আমি নিজের ওপর জুলুম করেছি। আপনি আমাকে ক্ষমা করুন। আমাকে আবার আপনার দিকে ফিরিয়ে নিন।’
মনে রাখবেন, শয়তান চায় গুনাহের পর আপনি আল্লাহ থেকে দূরে সরে যান; আর আল্লাহর রহমত আপনাকে ডাকছে—ফিরে এসো, তাওবা করো, আমার দিকে ফিরে এসো। তাই গুনাহকে ভয় করুন, কিন্তু আল্লাহর রহমত থেকে কখনো নিরাশ হবেন না।
ঈমানের স্ফুলিঙ্গ আবার জ্বলে উঠতে পারে
আমি অনেক সময় বলি—গুনাহ মানুষের দ্বারা হয়ে যেতে পারে। মানুষ ফেরেশতা নয়। ভুল হতে পারে, নফসের কাছে মানুষ হেরে যেতে পারে, শয়তানের ধোঁকায় পড়ে মানুষ গুনাহ করে ফেলতে পারে।
কিন্তু গুনাহ করার পর যদি একজন মানুষ অস্থির হয়ে যায়, অন্তরে অনুশোচনা হয়, নিজের ভুলের জন্য কষ্ট হয় এবং তাওবা করার জন্য মন ছটফট করতে থাকে—এটা আশার কথা। এটা প্রমাণ করে যে তার বুকে এখনো ঈমানের স্ফুলিঙ্গ আছে।
হয়তো সেই স্ফুলিঙ্গ গুনাহের ছাইয়ের নিচে চাপা পড়ে আছে। কিন্তু একটু বাতাস পেলেই যেমন আগুনের স্ফুলিঙ্গ আবার জ্বলে উঠতে পারে, তেমনি তাওবা, ইস্তিগফার ও আল্লাহর জিকিরের মাধ্যমে ঈমানের সেই স্ফুলিঙ্গও আবার জ্বলে উঠতে পারে। বুক আবার ঈমানের উত্তাপে উষ্ণ হতে পারে।
কিন্তু বিপদ তখন, যখন মানুষ গুনাহের পর গুনাহ করতেই থাকে, অথচ অন্তরে কোনো অস্থিরতা নেই; তাওবার কোনো চিন্তা নেই; এমনকি তার মনে এটাও আসে না যে, ‘আমি তো আমার রবকে নারাজ করে ফেলেছি!’ এটা অত্যন্ত ভয়ংকর অবস্থা।
অনুভূতি হারিয়ে যাওয়া অত্যন্ত ভয়ংকর
আজ আমাদের অনেকের অবস্থা এমন হয়ে গেছে। সকালবেলা ঘর থেকে বের হচ্ছি, সারাদিন চোখের হেফাজত নেই, জবান নিয়ন্ত্রণে নেই, কানকে হারাম থেকে বাঁচানোর চেষ্টা নেই। রাতের বেলায় ঘরে ফিরে ঘণ্টার পর ঘণ্টা স্ক্রিনের সামনে বসে থাকছি। কী দেখছি, কী শুনছি—তার কোনো হিসাব নেই। শেষ পর্যন্ত ক্লান্ত শরীর নিয়ে বিছানায় পড়ে যাচ্ছি।
কিন্তু একবারও অন্তরে এই অনুভূতি জাগছে না—আজ আমি কতগুলো গুনাহ করে ফেললাম! আজ আমি আমার রবকে কতবার নারাজ করলাম! এই অনুভূতিটা হারিয়ে যাওয়া অত্যন্ত ভয়ংকর।
তাই অন্তত এটুকু অভ্যাস করুন—গুনাহ ছাড়তে পারছেন না? তবুও তাওবা করতে দেরি করবেন না।
গুনাহ হয়ে গেছে—সঙ্গে সঙ্গে তাওবা করুন।
আবার হয়ে গেছে—আবার তাওবা করুন।
আবার পড়ে গেছেন—আবার উঠে দাঁড়ান।
কারণ আল্লাহর কাছে ফিরে আসার দরজা বন্ধ হয়নি।
আমরা তাওবা করতে দেরি করি কেন?
কিন্তু প্রশ্ন হলো—আমরা তাওবা করতে এত দেরি করি কেন?
এর পেছনে শয়তানের কয়েকটি বড় ধোঁকা কাজ করে। তার কয়েকটি বিষয় খেয়াল করুন।
প্রথম ধোঁকা : তোমার গুনাহ তো অনেক
প্রথম ধোঁকা হলো—শয়তান বলে, তোমার গুনাহ তো অনেক!
শয়তান মানুষের মনে ঢুকিয়ে দেয়, ‘তোর গুনাহ কি একটা-দুইটা? হাজার হাজার গুনাহ! কোনটা ছেড়ে কোনটার জন্য তাওবা করবি? এত গুনাহের পর আবার তুই তাওবা করতে যাবি?’
ভাইয়েরা! এটা শয়তানের প্রতারণা। কারণ, আল্লাহ তাআলা আমাদের বলেননি—প্রতিটি গুনাহের জন্য আলাদা আলাদা বসে তাওবা করো, তারপর আমার কাছে আসো। বরং বান্দা যদি আন্তরিকভাবে নিজের সব গুনাহ থেকে তাওবা করে আল্লাহর দিকে ফিরে আসে, আল্লাহ তার তাওবা কবুল করতে পারেন।
আল্লাহ তাআলা বলেন
قُلْ يَا عِبَادِيَ الَّذِينَ أَسْرَفُوا عَلَى أَنْفُسِهِمْ لَا تَقْنَطُوا مِنْ رَحْمَةِ اللَّهِ ۚ إِنَّ اللَّهَ يَغْفِرُ الذُّنُوبَ جَمِيعًا
বলুন, হে আমার সেই বান্দারা, যারা নিজেদের ওপর জুলুম করে ফেলেছ! তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করে দেন। [সূরা আয-যুমার : ৫৩]
খেয়াল করুন—الذُّنُوبَ جَمِيعًا ‘সমস্ত গুনাহ’। তাই শয়তান যদি বলে, তোমার গুনাহ অনেক। তাকে বলুন, আমার গুনাহ অনেক হতে পারে, কিন্তু আমার রবের রহমত তার চেয়েও অনেক বড়।
দ্বিতীয় ধোঁকা : এখন নয়; পরে তাওবা করবে
দ্বিতীয় ধোঁকা হলো—এখন তাওবা করো না, পরে করবে।
শয়তান বলে, ‘আজ না হয় থাক। তুমি এখনো যুবক। জীবন তো সামনে পড়ে আছে। এখন একটু জীবন উপভোগ করো। বুড়ো হলে তাওবা করবে। চুল সাদা হলে নামায-তাওবা-ইবাদতে মন দেবে। এখনো তো অনেক সময় আছে!’
ভাইয়েরা! এটাও শয়তানের বিপজ্জনক ধোঁকাগুলোর একটি। একজন আল্লাহওয়ালা সুন্দর কথা বলেছেন, ‘তাওবার আশায় গুনাহ করতে থাকা, আর জীবনের আশায় তাওবা পিছিয়ে দিতে থাকা—তোমার বিবেকের আলো নিভে যাওয়ার লক্ষণ।’
আজকের তাওবা আজই
আমরা বলি, বুড়ো হলে তাওবা করব। কিন্তু কে বলেছে যে বুড়ো হওয়ার সুযোগ আমরা পাব? মৃত্যুর জন্য কি চুল সাদা হওয়া জরুরি? মৃত্যুর জন্য কি ষাট-সত্তর বছর বয়স হওয়া জরুরি?
কত যুবক আজ কবরের বাসিন্দা! কত মানুষ সকালে ঘর থেকে বের হয়েছে, কিন্তু সন্ধ্যায় আর ঘরে ফিরতে পারেনি! কত মানুষ রাতে বিছানায় শুয়েছে, কিন্তু সকালে আর উঠতে পারেনি!
তাই যখন রাতে বিছানায় শুয়ে পড়বেন, একবার নিজের সঙ্গে কথা বলবেন, ‘আমি আজ ঘুমাতে যাচ্ছি। কিন্তু কে জানে, আগামীকাল সকালে আমি চোখ খুলতে পারব কি না?’
গাড়িতে উঠছেন, দূরের সফরে যাচ্ছেন—একবার ভাবুন, ‘আমি গন্তব্যে পৌঁছাব তো?’
এগুলো ভয় দেখানোর জন্য নয়; বরং জীবনের বাস্তবতা মনে করিয়ে দেওয়ার জন্য। মৃত্যু আমাদের বয়স দেখে আসে না। মৃত্যু আমাদের পরিকল্পনা দেখে আসে না। মৃত্যু বলে আসে না যে, ‘তুমি আগে তাওবা করে নাও, তারপর আমি আসব।’
তাই তাওবার ব্যাপারে কোনো বিলম্ব নয়। আজকের তাওবা আজই। এই মুহূর্তের তাওবা এই মুহূর্তেই। কারণ আমরা জানি না—পরের মুহূর্তটি আমাদের জন্য লেখা আছে কি না।
গুনাহের পর দ্রুত তাওবা করা হলো বুদ্ধিমানের কাজ; আর তাওবার সুযোগ পেয়েও বারবার তা পিছিয়ে দেওয়া হলো শয়তানের ফাঁদে পড়ে থাকা।
হাসান বসরী রহ.-এর উপদেশ
হাসান বসরী রহ. এক ব্যক্তিকে দাফন করার পর তার কবরের পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন। কিছুক্ষণ পর পাশে থাকা এক ব্যক্তিকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তোমার কী মনে হয়, এই ব্যক্তি যদি আবার দুনিয়ায় ফিরে আসার সুযোগ পেত, তাহলে সে কী করত?’
লোকটি বলল, ‘সে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইত, নামায পড়ত এবং নেক আমল করে আখিরাতের জন্য পাথেয় সংগ্রহ করত।’
তখন হাসান বসরী রহ. বললেন, ‘তার সুযোগ তো শেষ হয়ে গেছে; কিন্তু তোমার সুযোগ এখনো শেষ হয়নি। তাই তুমি যেন তার মতো সুযোগ হারিয়ে না ফেলো।’ [ বাহাউদ্দিন আল-আমিলি, আল-কাশকুল : ২/২৩০]
কী গভীর কথা! আজ যে মানুষটি কবরের নিচে চলে গেল, কাল সে আমাদের মতোই জীবিত ছিল। তারও সময় ছিল, সুযোগ ছিল, তওবার দরজা ছিল। কিন্তু আজ তার আমলনামা বন্ধ হয়ে গেছে।
সে যা হারিয়েছে, তা যেন আমরা না হারাই। মৃত্যু আসার আগেই তাওবা করি, নামাযের যত্ন নিই, নেক আমল করি এবং আখিরাতের জন্য পাথেয় সংগ্রহ করি।
তৃতীয় ধোঁকা : গুনাহকে ‘গুনাহ’ মনে না করা
তৃতীয় ধোঁকা হলো—গুনাহকে গুনাহই মনে না করা।
অনেক সময় কাউকে বলা হয়, ‘ভাই, আল্লাহর কাছে তাওবা করুন। নিজের রবের সঙ্গে সম্পর্কটা ঠিক করে নিন।’ কিন্তু সে অবাক হয়ে বলে, ‘আমি আবার কী গুনাহ করেছি? আমি তো জেনে-বুঝে কখনো গুনাহ করিনি! যদি ভুল করে কিছু হয়ে থাকে, আল্লাহ মাফ করে দেবেন।’
লক্ষ্য করুন, সমস্যা কোথায়! সে গুনাহ করছে, অথচ তার কাছে গুনাহগুলো গুনাহ বলেই মনে হচ্ছে না।
কোনো মানুষের জীবনযাপনে সুন্নাহর প্রতি উদাসীনতা, উপার্জনে হালাল-হারামের বাছবিচার না থাকা, চোখের হেফাজত না করা, জবানের নিয়ন্ত্রণ না থাকা, কান দিয়ে কী শুনছে তার পরোয়া না করা—এত কিছু থাকা সত্ত্বেও যখন তার মনে হয়, ‘আমি তো কোনো গুনাহই করিনি’, তখন বুঝতে হবে, নিজের হিসাব নেওয়ার অভ্যাসটাই হারিয়ে গেছে।
গুনাহ করে ভুলে গেলে কি গুনাহটি মাফ হয়ে যায়?
ভাইয়েরা! গুনাহ করে ভুলে যাওয়া আর গুনাহ মাফ হয়ে যাওয়া এক কথা নয়। আমরা কোনো গুনাহ ভুলে যেতে পারি, কিন্তু আমাদের ভুলে যাওয়ার কারণে আমলনামা থেকে সেই গুনাহ মুছে যায় না।
কিয়ামতের দিন যখন আমলনামা সামনে আসবে, তখন অপরাধীরা বিস্মিত হয়ে বলবে
مَالِ هَٰذَا الْكِتَابِ لَا يُغَادِرُ صَغِيرَةً وَلَا كَبِيرَةً إِلَّا أَحْصَاهَا
এ কেমন কিতাব! ছোট-বড় কোনো কিছুই বাদ দেয় না; সবকিছুই হিসাব করে রেখেছে! [সূরা আল-কাহফ : ৪৯]
তখন মানুষ দেখবে, যে গুনাহের কথা তার মনে নেই, সেটিও আমলনামায় লেখা রয়েছে। তাই নিজের গুনাহ মনে না পড়লেও আল্লাহর কাছে তাওবা করুন। বলুন, ‘হে আল্লাহ! জেনে-না জেনে, প্রকাশ্যে-গোপনে, ছোট-বড় যত গুনাহ করেছি, আপনি আমাকে ক্ষমা করে দিন।’
চতুর্থ ধোঁকা : বারবার গুনাহ হয়ে যায় বলে তাওবা ছেড়ে দেওয়া
চতুর্থ ধোঁকা হলো—বারবার গুনাহ হয়ে যায় বলে তাওবাই ছেড়ে দেওয়া।
অনেক মানুষ বলে, ‘আমি তাওবা তো করব, কিন্তু লাভ কী? আজ তাওবা করব, কাল আবার সেই গুনাহে পড়ে যাব। আবার তাওবা করব, আবার গুনাহ হবে। এভাবে তাওবা করে কী লাভ?’
এ কথাটিও শয়তানের একটি বড় ফাঁদ।
একটি দৃষ্টান্ত
ধরুন, একজন মানুষ সারাদিন পরিশ্রম করে বাড়িতে ফিরেছে। তার শরীর ও কাপড়চোপড় ময়লা হয়ে গেছে। পরিবারের লোকেরা বলল, ‘গোসল করে পরিষ্কার হয়ে নাও।’
সে যদি উত্তর দেয়, ‘আজ গোসল করে কী হবে? কাল আবার কাজে যাব, আবার শরীর ময়লা হবে!’
তাহলে কি তার এই যুক্তি গ্রহণযোগ্য হবে? কেউ কি তাকে বলবে, ঠিক আছে, যেহেতু কাল আবার ময়লা হবে, তাই আজ আর পরিষ্কার হওয়ার দরকার নেই?
না। বরং তাকে বলা হবে, ‘আজকের ময়লা আজই পরিষ্কার করো। কাল আবার ময়লা হলে কাল আবার পরিষ্কার হবে।’
গুনাহের ব্যাপারেও আমাদের শিক্ষা হলো—গুনাহ হয়ে গেলে তাওবা করুন। পরে আবার ভুল হয়ে গেলে আবার তাওবা করুন। প্রতিবার গুনাহের পর আন্তরিকভাবে আল্লাহর দিকে ফিরে আসুন।
মনে রাখবেন, আপনার কাজ গুনাহকে ছোট করে দেখা নয়; আবার নিজের গুনাহকে এত বড় মনে করে আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ে যাওয়াও নয়। আপনার কাজ হলো—গুনাহকে গুনাহ মনে করা, আন্তরিকভাবে তাওবা করা এবং নিজেকে সংশোধনের চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া।
تَعَلُّق رَبْطِ بَاہَمْ ہے تو پھر یہ روٹھنا کیسا
اگر سو بار ٹوٹے تو سو بار جوڑ لیتے ہیں
অর্থাৎ—যদি সম্পর্কের বন্ধন থাকে, তাহলে অভিমান করে দূরে থাকা কেন?
একশোবার যদি সম্পর্ক ভেঙেও যায়, একশোবারই আমরা তা জুড়ে নিই।
তাওবার দরজায় বারবার ফিরে আসার গল্প
রাসূলুল্লাহ ﷺ একটি সহিহ হাদিসে বলেছেন, একজন বান্দা গুনাহ করল। গুনাহ করার পর সে কিন্তু গুনাহ নিয়ে বসে থাকল না। সে লজ্জিত হলো। তারপর তার রবের কাছে ফিরে এসে বলল
رَبِّ أَذْنَبْتُ ذَنْبًا فَاغْفِرْ لِي
‘হে আমার রব! আমি গুনাহ করে ফেলেছি। আপনি আমাকে ক্ষমা করে দিন।’
তখন আল্লাহ তাআলা বলেন
أَعَلِمَ عَبْدِي أَنَّ لَهُ رَبًّا يَغْفِرُ الذَّنْبَ وَيَأْخُذُ بِهِ؟ غَفَرْتُ لِعَبْدِي
‘আমার বান্দা কি জানে না যে, তার একজন রব আছেন? সেই রব গুনাহ ক্ষমা করেন, আবার গুনাহের কারণে পাকড়াওও করেন। আমি আমার বান্দাকে ক্ষমা করে দিলাম।’
কিছুদিন পর বান্দাটা আবার গুনাহ করে ফেলল।
দেখুন, মানুষ তো মানুষই। নফস আছে, দুর্বলতা আছে, শয়তান আছে। সে আবার ভুল করে ফেলল। কিন্তু এবারও সে গুনাহকে আঁকড়ে ধরে থাকল না। আবার আল্লাহর কাছে ফিরে গেল। বলল
أَذْنَبْتُ آخَرَفَاغْفِرْهُ لِي
‘হে আমার রব! আমি আবার গুনাহ করে ফেলেছি। আপনি আমাকে ক্ষমা করে দিন।’
আল্লাহ আবার তাকে ক্ষমা করে দিলেন। কিছুদিন পর আবার গুনাহ হয়ে গেল। আবারও সে আল্লাহর কাছে ফিরে এল। আবার ক্ষমা চাইল। আল্লাহ তাআলা আবারও তাকে ক্ষমা করে দিলেন।
তারপর আল্লাহ তাআলা বললেন
غَفَرْتُ لِعَبْدِي ثَلَاثًا فَلْيَعْمَلْ مَا شَاءَ
‘আমি আমার বান্দাকে তিনবারই ক্ষমা করে দিলাম। এখন সে যা করতে চায়, করুক।’ [সহীহ বুখারী : ৭৫০৭, সহীহ মুসলিম : ৭১৬২]
এর অর্থ এই নয় যে, আমি তো তাওবা করবই, তাই ইচ্ছা করে গুনাহ করতে থাকি!
এর অর্থ হলো—বান্দা যদি সত্যিকারভাবে গুনাহ থেকে ফিরে আসে, অন্তর থেকে লজ্জিত হয়, আল্লাহর কাছে ক্ষমা চায় এবং আর গুনাহ না করার নিয়ত করে—তারপর দুর্বলতার কারণে আবার সেই গুনাহ হয়ে যায়, তাহলে সে যেন হতাশ না হয়। বরং সে আবার তাওবা করবে। আবার ফিরে আসবে। আবার আল্লাহর কাছে কাঁদবে। আবার বলবে, ‘হে আল্লাহ! আমি আবার ভুল করে ফেলেছি। আপনি আমাকে ক্ষমা করুন।’
পড়ে গেলে আবার উঠে দাঁড়ান
ভাইয়েরা আমার! শয়তান গুনাহ করানোর পর শুধু একবার আক্রমণ করে না, দ্বিতীয়বারও আক্রমণ করে। প্রথমে বলে, ‘গুনাহ করো।’ মানুষ গুনাহ করে ফেলে। তারপর শয়তান আবার বলে, ‘এখন আর তোমার কী হবে? তুমি তো বারবার গুনাহ করো। তোমার তাওবা করে কী লাভ?’ আর এই জায়গাতেই অনেক মানুষ হেরে যায়।
মনে রাখবেন, গুনাহ হয়ে যাওয়া মানেই সব শেষ নয়। আসল বিপদ হলো—গুনাহের পর আল্লাহর কাছে ফিরে আসার সাহস হারিয়ে ফেলা। তাই শয়তানকে এই জায়গায় জিততে দেবেন না।
পড়ে গেছেন? উঠে দাঁড়ান। আবার পড়ে গেছেন? আবার উঠে দাঁড়ান। কারণ নফস ও শয়তানের সঙ্গে এই লড়াই এক দিনের নয়; এটা পুরো জীবনের লড়াই।
একজন কবি বলেছিলেন
شکست کھا کے بھی ہم مسکرا کے اٹھ بیٹھے
ہمارے حوصلے اب بھی جواں ہیں پہلے سے
পরাজয় বরণ করেও আমরা হেসে আবার উঠে দাঁড়িয়েছি;
আমাদের সাহস আজও আগের মতোই তরুণ ও জীবন্ত।
আল্লাহর সঙ্গে আমাদের সম্পর্কও এমন হওয়া উচিত। গুনাহের কারণে সম্পর্ক দুর্বল হয়ে গেছে? আবার জোড়া লাগান। তাওবা করুন। ইস্তিগফার করুন। নামাযে দাঁড়ান। চোখের পানি ফেলুন। আল্লাহর কাছে নিজের ভাঙা হৃদয় নিয়ে ফিরে আসুন।
শয়তান অনেক কষ্ট করে আপনাকে গুনাহে ফেলল। কিন্তু আপনি যদি সঙ্গে সঙ্গে বলেন, ‘হে আল্লাহ! আমি ভুল করেছি, আমাকে ক্ষমা করুন।’ তাহলে তার সমস্ত পরিশ্রম ব্যর্থ হয়ে গেল।
আল্লাহর কাছে ফিরে আসতে লজ্জা পাবেন কেন?
গুনাহ হয়ে গেলে আল্লাহর কাছে ফিরতে লজ্জা পাবেন না। হ্যাঁ, গুনাহের জন্য লজ্জা থাকবে; কিন্তু সেই লজ্জা যেন আপনাকে আল্লাহর দরজা থেকে দূরে না সরায়। বরং গুনাহের কারণে যত বেশি লজ্জা পাবেন, তত বেশি তাঁর দরজায় পড়ে থাকুন।
শয়তান বলবে, ‘এত গুনাহ করে এখন কোন মুখে আল্লাহর কাছে যাবে?’
আপনি বলবেন, ‘এই মুখেই যাব। এই চোখ দিয়েই কাঁদব। এই ভাঙা হৃদয় নিয়েই বলব, ‘হে আল্লাহ! আমি ভুল করেছি, আপনি আমাকে ক্ষমা করুন।’
কবি গালিবের একটি প্রসিদ্ধ শের আছে
کعبہ کس منہ سے جاؤ گے غالبؔ
شرم تم کو مگر نہیں آتی
গালিব! কোন মুখে তুমি কাবায় যাবে?
তোমার কি একটুও লজ্জা হয় না?
কিন্তু কোনো আল্লাহওয়ালা এর জবাবে খুব সুন্দরভাবে বলেছেন
اُسی مُنہ سے جائیں گے کعبہ غالبؔ
شرم کو مٹی میں ملا دیں گے
رو رو کر اُن کو منائیں گے
اِس ٹوٹے دل کو بسا دیں گے
গালিব! এই মুখেই কাবায় যাব।
লজ্জাকে মাটিতে মিশিয়ে দেব।
কাঁদতে কাঁদতে তাঁকে মানাব,
আর এই ভাঙা হৃদয়টাকেই আবার গড়ে নেব।
কথাটার শিক্ষা হলো—আল্লাহর কাছ থেকে পালিয়ে গিয়ে আমরা নিজেদের ঠিক করতে পারব না; বরং আল্লাহর কাছেই ফিরে গিয়ে নিজেদের ভাঙা জীবনকে ঠিক করতে হবে।
পাঁচ ওয়াক্ত নামায কখনো ছাড়বেন না
আমি অনেক সময় বন্ধুদের বলি, আপনি যদি এখনই সব গুনাহ একেবারে ছেড়ে দিতে না পারেন, তবুও একটা জিনিস কোনো অবস্থাতেই ছাড়বেন না—পাঁচ ওয়াক্ত নামায। কারণ এই নামায আপনাকে দিনে পাঁচবার আপনার রবের দরবারে ফিরিয়ে আনে।
ধরুন, ফজরের নামায পড়ে আপনি বের হলেন। এরপর দিনের ব্যস্ততায় কত ভুল হয়ে গেল, কত গুনাহ হয়ে গেল—হয়তো খেয়ালই করলেন না। কিন্তু জোহরের আজান হলো। আপনি কাজ থামিয়ে ওযু করলেন, মসজিদের দিকে হাঁটলেন। তখন একটু নিজের অন্তরকে জিজ্ঞেস করুন—গত কয়েক ঘণ্টায় আমি কী করেছি? কত ভুল করেছি! কিন্তু হে আল্লাহ, আমি আপনার কাছ থেকে দূরে যেতে চাই না। তাই আবার আপনার দরবারে ফিরে এসেছি।
তারপর নামাযে দাঁড়ালেন। কিয়ামে আল্লাহর প্রশংসা করছেন, রুকুতে তাঁর মহত্ত্ব ঘোষণা করছেন, আর সিজদায় নিজের সবচেয়ে অসহায় অবস্থায় রবের সামনে পড়ে আছেন। এই নামাযই যেন আপনাকে মনে করিয়ে দিচ্ছে—তোমার রব একজন, তোমার ফিরে যাওয়ার জায়গাও একজন।
তারপর আসে আসর। আবার ফিরে গেলেন। মাগরিব এলো—আবার ফিরে গেলেন। এশা এলো—আবার ফিরে গেলেন।
এভাবে একজন বান্দা প্রতিদিন নিজের রবকে যেন বলে যাচ্ছে, ‘আল্লাহ! আমি দুর্বল। আমি সবসময় নিজেকে গুনাহ থেকে রক্ষা করতে পারছি না। কিন্তু আমি আপনাকে ছাড়তে চাই না, আপনার দরজাও ছাড়তে চাই না।’
ভাইয়েরা! এই মনোভাবটা খুব গুরুত্বপূর্ণ।
গুনাহ হয়েছে বলেই নামায আরও শক্ত করে ধরুন
একজন মানুষ গুনাহগার হতে পারে, কিন্তু যেন আল্লাহর প্রতি বিদ্রোহী না হয়। সে পড়ে যেতে পারে, কিন্তু পড়ে থেকে যাবে না। ভুল করতে পারে, কিন্তু ভুলকে জীবনদর্শন বানাবে না। গুনাহ হয়ে যেতে পারে, কিন্তু গুনাহকে হালাল মনে করবে না। শয়তানের কাছে হেরে যেতে পারে, কিন্তু তাওবার মাধ্যমে আবার উঠে দাঁড়াবে।
তাই গুনাহের কারণে নামায ছাড়বেন না। বরং গুনাহ হয়েছে বলেই নামায আরও শক্ত করে ধরুন।
শয়তান যদি বলে, ‘তুমি তো গুনাহগার, তোমার নামায পড়ে কী হবে?’
তাকে বলুন, ‘আমি গুনাহগার বলেই তো আমার নামায দরকার। আমি দুর্বল বলেই তো আমার রবের সাহায্য দরকার। আমি পড়ে গেছি বলেই তো আমাকে আবার উঠতে হবে।’
মনে রাখবেন, পাঁচ ওয়াক্ত নামায শুধু একটি দায়িত্ব নয়; প্রতিদিন পাঁচবার নিজের রবের দিকে ফিরে আসার সুযোগ। মানুষ যখন বারবার নিজের রবের দরজায় দাঁড়ায়, একসময় সেই দাঁড়ানোই তার অন্তরকে বদলে দেয়—ইনশাআল্লাহ।
আল্লাহর রহমত বাহানা খোঁজে
ভাইয়েরা, আল্লাহর রহমত বান্দার জন্য বাহানা খোঁজে। বান্দার পক্ষ থেকে সামান্য একটি ভালো দিকও যদি থাকে, আল্লাহ তাআলা সেটাকেই রহমতের কারণ বানিয়ে দেন। বান্দা আল্লাহর দিকে এক কদম এগিয়ে এলে আল্লাহর রহমত তাকে বহু দূর এগিয়ে নিয়ে যায়।
সহিহ বুখারিতে এমন এক ব্যক্তির ঘটনা এসেছে, যে ছিল অত্যন্ত গুনাহগার। মৃত্যুর সময় সে সন্তানদের বলল, ‘আমি মারা গেলে আমাকে দাফন করো না। আমার দেহ পুড়িয়ে তার কিছু অংশ বাতাসে ছড়িয়ে দিও, কিছু অংশ সমুদ্রে ফেলে দিও।’ সে মনে করেছিল, এভাবে তার দেহের কোনো চিহ্ন থাকবে না এবং সে আল্লাহর শাস্তি থেকে বেঁচে যাবে।
সন্তানরা তার ওসিয়ত পালন করল। কিন্তু আল্লাহ তাআলা যখন তাকে পুনরুত্থিত করলেন, তাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুমি এমনটা কেন করেছিলে?’
সে বলল, ‘হে আমার রব! আপনার ভয়েই। আমি আমার আমল সম্পর্কে জানতাম এবং আপনার শাস্তিকে ভয় করতাম।’
আল্লাহ তাআলা তাকে ক্ষমা করে দিলেন।
দেখুন, লোকটি গুনাহগার ছিল; কিন্তু তার অন্তরে আল্লাহর ভয় ছিল। সেই ভয়ই তার জন্য রহমতের কারণ হয়ে গেল।
তাহলে আমাদেরও হতাশ হওয়ার কারণ নেই। আমরা আমাদের গুনাহ জানি। কত ভুল করেছি, কতবার আল্লাহর নাফরমানি করেছি—সেটাও জানি। কিন্তু এখনো তো সময় আছে! হিসাবের দিন আসার আগেই আমরা আমাদের রবের দিকে ফিরে যেতে পারি।
চলুন, অন্তর থেকে বলি, ‘হে আল্লাহ! অতীতে যত গুনাহ করেছি, সবকিছুর জন্য আপনার কাছে তাওবা করছি। আপনি আমাকে ক্ষমা করে দিন। ভবিষ্যতে যেন আবার গুনাহের দিকে ফিরে না যাই, আপনি আমাকে সাহায্য করুন। আমি নিজে দুর্বল—আপনি আমাকে হেফাজত করুন।’
আমরা হাল ছেড়ে দেব না
সত্য কথা হলো, ফিতনার এই যুগে গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা সহজ নয়। চারদিক থেকে গুনাহের ডাক। চোখের সামনে গুনাহ, মোবাইলের পর্দায় গুনাহ, মানুষের কথায় গুনাহ, পরিবেশে গুনাহ। নফস একদিকে টানে, শয়তান আরেকদিকে টানে।
কিন্তু আমরা হাল ছেড়ে দেব না। আমরা বলব, ‘আমি পারি না, কিন্তু আমার আল্লাহ পারেন। আমি দুর্বল, কিন্তু আমার রব শক্তিশালী। আমি নিজেকে রক্ষা করতে পারি না, কিন্তু আল্লাহ আমাকে রক্ষা করতে পারেন।’
একটি দৃষ্টান্ত
একটি শিশু যখন হাঁটতে শেখে, বাবা তাকে একটু দূরে দাঁড় করিয়ে বলেন, ‘বাবা, এদিকে এসো।’ বাবা জানেন, সন্তানটি এখনো ভালোভাবে হাঁটতে পারে না; সে পড়ে যেতে পারে। তবুও বাবা অপেক্ষা করেন—কখন সন্তানটি প্রথম পদক্ষেপটি নেবে।
শিশুটি যখন এক পা বাড়ায়, টলতে টলতে পড়ে যেতে চায়, তখন বাবা ছুটে গিয়ে তাকে ধরে নেন।
আমাদের অবস্থাও অনেকটা এমন। ফিতনার এই পরিবেশে আমরা এক লাফে পরিপূর্ণ হয়ে যেতে পারব না। কিন্তু আমাদের কাজ হলো—আল্লাহর দিকে হাঁটা শুরু করা।
আল্লাহর ওপর ভরসা করুন
এক কদম এগিয়ে আসুন। চোখের পানি ফেলুন। সত্যিকারের তাওবা করুন। দৃঢ় সিদ্ধান্ত নিন, ‘হে আল্লাহ! যে গুনাহগুলো হয়ে গেছে, সেগুলোর জন্য আমি তাওবা করছি। আর ভবিষ্যতে সেগুলোর দিকে ফিরে না যাওয়ার সংকল্প করছি।’
তারপর নিজের ওপর নয়, আল্লাহর ওপর ভরসা করুন। কারণ তাওবার তাওফিক তাঁর পক্ষ থেকেই আসে, গুনাহ ছাড়ার শক্তিও তাঁর কাছ থেকেই আসে, আর তাওবার ওপর অটল থাকার সাহায্যও তাঁর কাছ থেকেই আসে।
তাই আজ আমরা হতাশ হব না। শয়তানকে সুযোগ দেব না, যেন সে আমাদের বলে, ‘তোমার আর ফেরার পথ নেই।’
না, ভাই! পথ আছে। তাওবার পথ আছে। আল্লাহর রহমতের দরজা খোলা আছে।
চলুন, আজ অন্তর থেকে বলি, ‘হে আল্লাহ! আমরা গুনাহগার, কিন্তু আপনার রহমত থেকে নিরাশ নই। আমরা দুর্বল, কিন্তু আপনার দরজা ছাড়তে চাই না। অতীতের সব গুনাহের জন্য আপনার কাছে তাওবা করছি। ভবিষ্যতে গুনাহ থেকে বেঁচে থাকার জন্য আপনার সাহায্য চাই। হে আল্লাহ! আমাদের তাওবা কবুল করুন, আমাদের গুনাহ ক্ষমা করুন, আমাদের অন্তরকে পবিত্র করুন এবং জীবনের শেষ পর্যন্ত আপনার আনুগত্যের ওপর অটল রাখুন।’
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সত্যিকারের তাওবা করার, গুনাহ ছেড়ে তাঁর দিকে ফিরে আসার এবং তাওবার ওপর অটল থাকার তাওফিক দান করুন—আমীন।
وَآخِرُ دَعْوَانَا أَنِ الْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ
মন্তব্য (...)
এ সম্পর্কিত আরও প্রবন্ধ
'সঙ্গ গুণে রঙ্গ ধরে'
[প্রদত্ত বয়ান থেকে সংগৃহীত] হামদ ও সালাতের পর... বুযুর্গানে মুহতারাম, আমরা সবাই দীন অর্জন করতে আগ্র...
তাকওয়া হাসিলের উপায়
‘ইসলাহে নফস’ বা আত্মশুদ্ধির বিষয়ে কিছু কথা আপনাদের খিদমতে পেশ করতে আমাকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্র...
দুআ একটি ইবাদতঃ দুআ কেন কবুল হয় না?
...
উক্তি ও উপদেশ
...
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন