প্রবন্ধ
স্ক্রিনের আলোয় হারিয়ে যাচ্ছে রাতের ইবাদত
২৫ জুলাই, ২০২৬
৫৯৮৩
০
আমরা প্রায়ই সন্তানদের নসীহত করি—বাবা, পাঁচ ওয়াক্ত নামায পড়ো। কিন্তু সে কি কখনো দেখেছে যে, আজান হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমরা সব কাজ ফেলে মসজিদের দিকে ছুটে গেছি?
আমরা বলি—বাবা, মোবাইল কম দেখো। কিন্তু আমাদের নিজের হাতেই কি সারাক্ষণ মোবাইল থাকে না?
আমরা বলি—মিথ্যা বলা মহাপাপ। কিন্তু নিজেদের প্রয়োজনে কি আমরা ছোট-বড় মিথ্যাকে সহজভাবে গ্রহণ করি না?
আমরা চাই সন্তান ভদ্র হোক, অথচ আমাদের মুখে রাগ, গালি ও কঠোর ভাষা। আমরা চাই সন্তান সত্যবাদী হোক, অথচ আমাদের কথার সঙ্গে কাজের মিল নেই।
মনে রাখতে হবে, সন্তান কেবল আমাদের উপদেশ শোনে না; সে আমাদের জীবন পড়ে। সে আমাদের প্রতিটি আচরণ, প্রতিটি অভ্যাস এবং প্রতিটি সিদ্ধান্ত নীরবে শিখে নেয়।এ কারণেই বলা হয়, সন্তান হলো মা-বাবার জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। মূল ছবিতে যা থাকবে, প্রতিচ্ছবিতেও তাই ফুটে উঠবে।
اَلْحَمْدُ لِلّهِ وَكَفَى وَسَلَامٌ عَلَى عِبَادِهِ الَّذِيْن َاصْطَفَى اَمَّا بَعْدُ! فَاَعُوْذُ بِاللهِ مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّجِيْمِ. بِسْمِ اللهِ الرَّحْمنِ الرَّحِيْمِ. كَانُوا قَلِيلًا مِنَ اللَّيْلِ مَا يَهْجَعُونَ. وَبِالْأَسْحَارِ هُمْ يَسْتَغْفِرُونَ
بَارَكَ اللهُ لِيْ وَلَكُمْ فِي الْقُرْآنِ الْعَظِيْمِ، وَنَفَعَنِيْ وَإِيَّاكُمْ بِمَا فِيْهِ مِنَ اْلآيَاتِ وَالذِّكْرِ الْحَكِيْمِ. وجَعَلَنِيْ إِيَّاكُمْ مِنَ الصَّالِحِينَ
أَقُوْلُ قَوْلِيْ هَذَا أَسْتَغْفِرُ اللهَ لِيْ وَلَكُمْ وَلِسَائِرِ الْمُسْلِمِيْنَ. فَاسْتَغْفِرُوْهُ، إِنَّهُ هُوَ الْغَفُوْرُ الرَّحِيْمُ.
اَللَّهُمَّ صَلِّ عَلَى سَيِّدِنَا مُحَمَّدٍ وَّعَلَى آلِ سَيِّدِنَا مُحَمَّدٍ وَّبَارِكْ وَسَلِّمْ
এ যুগে রাতের অর্থই যেন বদলে গেছে
মুহতারাম হাজিরীন! এক সময় মুসলিম সমাজে রাত মানেই ছিল কুরআন তিলাওয়াত, অশ্রুসিক্ত দোয়া, দীর্ঘ সিজদা, তাহাজ্জুদের নামায এবং আল্লাহ তাআলার সঙ্গে একান্ত কথোপকথনের সময়। রাত ছিল মুমিনের আত্মশুদ্ধির মুহূর্ত, গুনাহ মাফের সুবর্ণ সুযোগ এবং রবের নৈকট্য লাভের শ্রেষ্ঠ সময়।
কিন্তু এ যুগে যেন রাতের অর্থই বদলে গেছে। এখন অনেকের কাছে রাত মানেই—মোবাইলের স্ক্রিন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অন্তহীন ভিডিও, অর্থহীন গল্প, রিলস, বিনোদন কিংবা এমন সব গুনাহ, যা মানুষের চোখ এড়িয়ে গেলেও আল্লাহ তাআলার দৃষ্টি কখনো এড়ায় না।
এখন রাত অনেকের কাছে বিশ্রামের সময়ের চেয়েও বেশি গুনাহের সবচেয়ে উপযুক্ত সময়ে পরিণত হয়েছে। দিনের কাজ শেষ করে মানুষ রাতকে ইবাদতের জন্য নয়; বরং গুনাহের জন্য বরাদ্দ রাখে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা মোবাইলের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকতে ক্লান্তি লাগে না; অথচ দুই রাকাত তাহাজ্জুদের নামাযে দাঁড়াতে গেলেই শরীর ভারী হয়ে যায়। দুনিয়ার বিনোদনের জন্য রাত জাগা সহজ, কিন্তু আখিরাতের জন্য কয়েক মিনিট সময় বের করাও যেন কঠিন হয়ে গেছে।
এক সময় মানুষ রাত জাগত কুরআনের সঙ্গে, আর আজ অনেকেই রাত জাগে মোবাইলের স্ক্রিনের সঙ্গে। এক সময় রাত ছিল রহমত লাভের সময়, আর আজ অনেকের কাছে তা গুনাহ জমা করার সময়ে পরিণত হয়েছে।
সেল ফোন, নাকি হেল ফোন?
আমরা বলি ‘নেট’। নেট অর্থ ‘জাল’। আর ফিতনাও এক ধরনের জাল।
আমাদের শায়খ, মাহবুবুল উলামা হযরত মাওলানা জুলফিকার আহমদ নকশবন্দী রহ. একটি হৃদয়স্পর্শী কথা বলতেন। তিনি বলতেন, এটি শুধু ইন্টারনেট নয়; বরং যেন এন্টার নেট—অর্থাৎ, জালে প্রবেশ করো। কারণ, এই জালে একবার আটকে গেলে সেখান থেকে বের হওয়া অনেকের জন্য খুবই কঠিন হয়ে যায়।
তিনি আরও বলতেন, এটি শুধু ‘সেল ফোন’ নয়; বরং অনেকের জন্য ‘হেল ফোন’। ‘হেল’ মানে জাহন্নাম। অর্থাৎ, এই ফোন যদি মানুষকে গুনাহ, অশ্লীলতা, সময়ের অপচয় এবং আল্লাহর অবাধ্যতার দিকে নিয়ে যায়, তাহলে সেটিই তার জন্য জাহান্নামের পথে চলার একটি মাধ্যম হয়ে দাঁড়ায়।
আজ আমরা এই জালে এমনভাবে আবদ্ধ হয়ে গেছি যে, কোথাও এক-দুই ঘণ্টার জন্য বসলেও প্রথমেই চোখ খুঁজতে থাকে—এখানে ওয়াই-ফাই আছে কি না। রাতের পর রাত কেটে যায় স্ক্রল করতে করতে। এক ভিডিও শেষ হয়, আরেকটি শুরু হয়। কিন্তু সেই রাতই হয়তো আমাদের জীবনের শেষ রাত হতে পারে—এই চিন্তা আমাদের মনে খুব কমই আসে।
নিজেকে প্রশ্ন করুন
একটু নিজেকে প্রশ্ন করুন—
— গত সাত রাতের মধ্যে কয়টি রাত এমন কেটেছে, যেখানে অন্তত কয়েক মিনিট আল্লাহ তাআলার সামনে দাঁড়িয়েছি?
— শেষ কবে মানুষের অগোচরে, শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য চোখের পানি ফেলেছি?
— শেষ কবে নিজের গুনাহগুলোর কথা মনে করে তাওবা-ইস্তিগফার করেছি?
— শেষ কবে মোবাইলের স্ক্রিন বন্ধ করে কুরআন খুলেছি?
— শেষ কবে তাহাজ্জুদের জন্য ঘুম থেকে ওঠার চেষ্টা করেছি?
— যদি আজকের রাতই আমার জীবনের শেষ রাত হয়, তাহলে আমি কি আল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য প্রস্তুত?
আল্লাহ যাকে ভালোবাসেন, তার রাত কেমন হয়?
প্রশ্ন হলো, আল্লাহ যাকে ভালোবাসেন, তার রাত কেমন হয়?
এর উত্তর আল্লাহ নিজেই কুরআনে দিয়েছেন। আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রিয় বান্দাদের পরিচয় দিতে গিয়ে বলেন
كَانُوا قَلِيلًا مِنَ اللَّيْلِ مَا يَهْجَعُونَ. وَبِالْأَسْحَارِ هُمْ يَسْتَغْفِرُونَ
তারা রাতের অল্প অংশই নিদ্রায় কাটাত এবং শেষ রাতে তারা ক্ষমা প্রার্থনা করত। [সূরা আয-যারিয়াত : ১৭-১৮]
লক্ষ্য করুন, আল্লাহ বলেননি—তারা সারারাত জেগে থাকত। বরং বলেছেন, রাতের অল্প অংশই তারা ঘুমাত। অর্থাৎ তাদের জীবন ছিল ভারসাম্যপূর্ণ। তারা বিশ্রামও নিতেন, কিন্তু সেই বিশ্রাম তাদের রবের ইবাদত থেকে বিরত রাখতে পারত না। তারা জানতেন, দেহের যেমন বিশ্রাম দরকার, তেমনি আত্মারও খাদ্য দরকার। আর আত্মার সবচেয়ে বড় খাদ্য হলো—রাতের নির্জনে আল্লাহর সঙ্গে কিছু সময় কাটানো।
আরেক স্থানে আল্লাহ তাআলা বলেন
تَتَجَافَى جُنُوبُهُمْ عَنِ الْمَضَاجِعِ يَدْعُونَ رَبَّهُمْ خَوْفًا وَطَمَعًا
তাদের পার্শ্ব শয্যা থেকে পৃথক থাকে; তারা ভয় ও আশা নিয়ে তাদের রবকে ডাকে। [সূরা সাজদাহ : ১৬]
কী অপূর্ব এক দৃশ্য!
কী অপূর্ব এক দৃশ্য! চারদিকে গভীর নীরবতা। সবাই ঘুমিয়ে আছে। পৃথিবী যেন নিশ্চুপ। কেউ দেখছে না, কেউ প্রশংসা করছে না, কোনো ক্যামেরা নেই, কোনো মানুষ নেই—শুধু আল্লাহর প্রিয় বান্দা নিঃশব্দে বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়েছে।
কেন? কোনো মানুষের প্রশংসা পাওয়ার জন্য নয়। কোনো সম্মান বা পরিচিতি লাভের জন্য নয়। শুধু একজনের সন্তুষ্টির জন্য—আল্লাহর জন্য। এই ইবাদতের নামই ইখলাস। দিনের ইবাদতে অনেক সময় মানুষ দেখে, প্রশংসা করে। কিন্তু রাতের ইবাদতের সাক্ষী থাকে কেবল আল্লাহ। তাই রাতের তাহাজ্জুদ একজন বান্দার আন্তরিকতার সবচেয়ে বড় প্রমাণগুলোর একটি।
নুরানী চেহারার গোপন রহস্য
এ কারণেই হাসান বসরী রহ.-কে এক ব্যক্তি যখন জিজ্ঞেস করেছিল
مَا بَالُ المُتَهَجِّدِينَ بِاللَّيْلِ أَحْسَنَ النَّاسِ وُجُوهًا؟
‘তাহাজ্জুদ নামায আদায়কারীরা কেন নুরানী চেহারার অধিকারী হয়?’
উত্তরে তিনি বলেছিলেন
إِنَّهُمْ خَلَوْا بِالرَّحْمَنِ تَبَارَكَ وَتَعَالَى، فَأَلْبَسَهُمُ اللهُ عَزَّ وَجَلَّ نُوراً مِنْ نُورِهِ
তাঁরা আল্লাহর সাথে নিভৃতে অবস্থান করেন, ফলে আল্লাহ তাআলা তাদেরকে বিশেষ জ্যোতির্ময় পোশাক পরিধান করান। [আদদীনওয়ারী, আলমুজালাসা : ১/৪৪৫]
কবির ভাষায়
رات کی تنہائی میں جب ہاتھ اٹھتے ہیں دعا کو
عرش بھی کانپ اٹھتا ہے سن کر بندے کی صدا کو
‘রাতের নিঝুম অন্ধকারে যখন আল্লাহর দরবারে দোয়ার হাত উম্মোচিত হয়,
তখন বান্দার সেই ব্যাকুল ডাক শুনে আল্লাহর আরশও যেন কেঁপে ওঠে।’
রাসূল ﷺ-এর রাত
দেখুন! যিনি এ উম্মতের মধ্যে আল্লাহর সবচেয়ে প্রিয় বান্দা, যিনি নিষ্পাপ, যাঁর পূর্বাপর সব ত্রুটি আল্লাহ ক্ষমা করে দিয়েছেন, তিনিই ছিলেন রাতের সবচেয়ে বড় ইবাদতকারী।
উম্মুল মুমিনীন আয়শা রাযি. বলেন
كَانَ النَّبِيُّ ﷺ يَقُومُ مِنَ اللَّيْلِ حَتَّى تَتَفَطَّرَ قَدَمَاهُ
‘নবীজি ﷺ এত দীর্ঘ সময় রাতের নামায আদায় করতেন যে তাঁর পা ফুলে যেত।’
আমি বললাম
يَا رَسُولَ اللَّهِ، لِمَ تَصْنَعُ هَذَا وَقَدْ غَفَرَ اللَّهُ لَكَ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِكَ وَمَا تَأَخَّرَ؟
‘হে আল্লাহর রাসূল! আল্লাহ তো আপনার আগের ও পরের সব ত্রুটি ক্ষমা করে দিয়েছেন। তাহলে আপনি এত কষ্ট করেন কেন?’
তিনি বললেন
أَفَلَا أَكُونُ عَبْدًا شَكُورًا؟
‘আমি কি আল্লাহর কৃতজ্ঞ বান্দা হব না?’ [সহীহ বুখারী : ৪৮৩৮ ]
কী গভীর শিক্ষা! আমরা অনেক সময় ইবাদত করি প্রয়োজনের কারণে। বিপদ এলে দোয়া করি, কষ্ট এলে নামাযে দাঁড়াই, কোনো কিছু পাওয়ার আশা থাকলে আল্লাহকে বেশি বেশি ডাকি। কিন্তু রাসূল ﷺ-এর ইবাদতের অন্যতম কারণ ছিল ‘কৃতজ্ঞতা’। আল্লাহ তাঁকে যা দান করেছেন, তার শোকর আদায় করার জন্য তিনি রাতের পর রাত দাঁড়িয়ে থাকতেন।
যে মানুষটি আল্লাহর সবচেয়ে বেশি প্রিয়, তাঁর যদি এই অবস্থা হয়, তাহলে আমাদের অবস্থা কেমন হওয়া উচিত?
আল্লাহর বিশেষ আহ্বান
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন
يَنْزِلُ رَبُّنَا تَبَارَكَ وَتَعَالَى كُلَّ لَيْلَةٍ إِلَى السَّمَاءِ الدُّنْيَا حِينَ يَبْقَى ثُلُثُ اللَّيْلِ الْآخِرُ
প্রতি রাতের শেষ তৃতীয়াংশে আমাদের রব তাঁর শানের উপযোগীভাবে নিকটতম আসমানে অবতরণ করেন এবং বলেন
مَنْ يَدْعُونِي فَأَسْتَجِيبَ لَهُ؟
‘কে আমাকে ডাকবে? আমি তার ডাকে সাড়া দেব।’
مَنْ يَسْأَلُنِي فَأُعْطِيَهُ؟
‘কে আমার কাছে চাইবে? আমি তাকে দান করব।’
مَنْ يَسْتَغْفِرُنِي فَأَغْفِرَ لَهُ؟
‘কে আমার কাছে ক্ষমা চাইবে? আমি তাকে ক্ষমা করে দেব।’ [সহীহ বুখারী : ১১৪৫]
এটি এমন একটি সময়, যখন আল্লাহর পক্ষ থেকে আহ্বান আসে। তিনি ডাকছেন—কে আমাকে ডাকবে? কে আমার কাছে চাইবে? কে আমার কাছে ক্ষমা চাইবে?
অথচ কত মানুষ তখন গভীর ঘুমে থাকে। কত মানুষ মোবাইল হাতে রাত কাটায়। ভাবুন তো—যিনি আসমান ও জমিনের মালিক, যাঁর হাতে সবকিছুর মালিকানা, তিনি তাঁর বান্দাকে ডেকে বলছেন, ‘তুমি কী চাও? আমার কাছে চাও।’ এর চেয়ে বড় সম্মান আর কী হতে পারে? কে আছে, যে এমন ডাকে সাড়া দিতে চাইবে না?
وہ راتیں جو گزرتی ہیں خدا کی یاد میں عاصم
وہ آنسو جو نکلتے ہیں سحر کے آس پاس ہیں
‘হে আসিম! যে রাতগুলো আল্লাহর স্মরণে কাটে, আর ভোরের কাছাকাছি সময়ে চোখ থেকে যে অশ্রু ঝরে—তার চেয়ে মূল্যবান আর কিছুই নেই।’
বুজুর্গদের রাতের ইবাদতের প্রতি ভালোবাসা
আমাদের আকাবির ও সালাফে সালেহীনের জীবনে ইবাদত, যিকির ও রাতের নামাযের যে গভীরতা ছিল, তা সত্যিই বিস্ময়কর। কুরআনের আয়াত তাঁদের হৃদয়ে এমনভাবে প্রভাব ফেলত যে, তা তাঁদের চোখে অশ্রু এনে দিত, রাতের ঘুম কেড়ে নিত এবং দীর্ঘ সময় নামাযে দাঁড় করিয়ে রাখত।
উমর ইবন আব্দুল আযীয রহ.
উমর ইবন আব্দুল আযীয রহ.-এর স্ত্রী ফাতেমা বিনতে আব্দুল মালিক একদিন খুব কাঁদছিলেন। এটা দেখে তাঁর দুই ভাই, মাসলামা ও হিশাম বললেন, ‘তুমি এত কাঁদছ কেন? যদি দুনিয়ার কোনো জিনিস হারিয়ে গিয়ে থাকে, তাহলে আমাদের সম্পদ ও সামর্থ্য দিয়ে আমরা তোমাকে সাহায্য করব।’
জবাবে ফাতেমা রহ. বললেন, ‘আমি উমরের কোনো দুনিয়াবি বিষয় নিয়ে কাঁদছি না। আল্লাহর কসম! গত রাতে আমি এমন একটি দৃশ্য দেখেছি, যার কথা মনে পড়লেই আমার চোখে পানি আসে।’
তিনি বলেন, ‘গত রাতে আমি উমর ইবন আব্দুল আযীযকে নামাযে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছি। তিনি যখন আল্লাহ তাআলার এই বাণী তিলাওয়াত করলেন—
يَوْمَ يَكُوْنُ النَّاسُ كَالْفَرَاشِ الْمَبْثُوْثِ، وَتَكُوْنُ الْجِبَالُ كَالْعِهْنِ الْمَنْفُوْش
‘যেদিন মানুষ হবে বিক্ষিপ্ত পতঙ্গের মতো এবং পর্বতমালা হবে ধুনিত রঙিন পশমের মতো।’
তখন তিনি হঠাৎ চিৎকার করে উঠলেন এবং মাটিতে পড়ে গেলেন। এরপর এমনভাবে কাঁদতে ও আহাজারি করতে লাগলেন যে, আমার মনে হলো তাঁর রূহ বুঝি বের হয়ে যাবে। কিছুক্ষণ পর তিনি শান্ত হলে আমার মনে হলো, হয়তো তিনি ইন্তেকাল করেছেন। এরপর যখন তাঁর চেতনা ফিরে এল, তখন তিনি ফরিয়াদ করে বলতে লাগলেন—
وَيْلِي مِنْ يَوْمٍ يَكُونُ النَّاسُ فِيهِ كَالْفَرَاشِ الْمَبْثُوثِ، وَتَكُونُ الْجِبَالُ فِيهِ كَالْعِهْنِ الْمَنْفُوشِ
হায়! আমার কী হবে সেই দিনে, যেদিন মানুষ হবে বিক্ষিপ্ত পতঙ্গের মতো এবং পর্বতমালা হবে ধুনিত রঙিন পশমের মতো! [আল-মুনতাযাম ফী তারীখিল উমাম ওয়াল মুলূক : ৭/৭২]
রাবেয়া বসরী রহ.
রাবেয়া বসরী রহ. রাতভর নামায পড়তেন। সুবহে সাদিকের সময় তিনি জায়নামাযেই বসে ফজর পর্যন্ত সামান্য বিশ্রাম নিতেন। চোখ খুলতেই দ্রুত উঠে নিজেকেই সম্বোধন করে বলতেন
يَا نَفْسُ كَمْ تَنَامِينَ، وَإِلَى كَمْ تَقُومِينَ، يُوشِكُ أَنْ تَنَامِي نَوْمَةً لَا تَقُومِينَ مِنْهَا إِلَّا لِيَوْمِ النُّشُورِ
হে আমার নফস! আর কত ঘুমাবি? আর কবে জাগবি? মনে হয়, এমন এক ঘুম খুব কাছে, যেখান থেকে কিয়ামতের দিন ছাড়া আর জাগতে পারবি না।
রাবেয়া বসরী রহ.-এর খাদেমা আবদাহ, যিনি নিজেও একজন নেককার মহিলা ছিলেন, বলেন, আমি তাঁকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত এভাবেই ইবাদত করতে দেখেছি। [সিফাতুস সাফওয়া : ০২/২৫১]
কেয়ামতের সঙ্গে রাতের কতই না মিল
সালাফের যুগে একজন আবেদা ছিলেন। নাম ছিল মুনিরাহ রহ.। তাঁর সব সময়ের অভ্যাস ছিল, যখন রাত নেমে আসতো, বলতেন
قَدْ جَاءَ الْهَوْلُ، قَدْ جَاءَتِ الظُّلْمَةُ، قَدْ جَاءَ الْخَوْفُ، وَمَا أَشْبَهَ هَٰذَا بِيَوْمِ الْقِيَامَةِ؟
‘আতঙ্ক এসে গেছে। অন্ধকার ছেয়ে গেছে। ভয় এসে পড়েছে। কেয়ামতের সঙ্গে এর কতই না মিল!’
এরপর তিনি নামাযে দাঁড়িয়ে যেতেন। ভোর পর্যন্ত বিরতিহীনভাবে নামায পড়তেন। [মাউসুআ’ লি ইবনি আবিদ্দুনয়া : ১/২৬৯]
সুলতান মাহমুদ গজনবী রহ.
সুলতান মাহমুদ গজনবী রহ. তৎকালীন প্রখ্যাত বুজুর্গ হযরত আবুল হাসান খিরকানী রহ.-এর মুরিদ ছিলেন। একদিন রাজ্যের সমস্ত কাজকর্ম শেষ করে তিনি অত্যন্ত ক্লান্ত অবস্থায় নিজ কক্ষে ফিরলেন। সারাদিনের পরিশ্রমে শরীর অবসন্ন। মনে হচ্ছিল, একটু নরম বিছানায় শুয়ে বিশ্রাম নিলেই যেন শান্তি মিলবে।
তিনি শয্যার দিকে এগিয়ে গেলেন। ঠিক তখনই তাঁর দৃষ্টি পড়ল ঘরের একটি তাকের ওপর। সেখানে রাখা ছিল একটি পবিত্র কুরআন শরীফ। মুহূর্তেই তাঁর চিন্তার জগৎ বদলে গেল।
তিনি মনে মনে বললেন, ‘এ তো আল্লাহর কিতাব। আমি যদি এ বিছানায় শুই, তাহলে তো আমার পা কুরআনের দিকে চলে যাবে। আল্লাহর কিতাবের দিকে পা ছড়িয়ে শোয়া কীভাবে আমার পক্ষে সম্ভব?’
এই চিন্তা আসতেই তিনি সঙ্গে সঙ্গে খাটটি ঘুরিয়ে দিলেন, যেন কুরআনের দিকে পা না থাকে।
কিন্তু এতেও তাঁর মন শান্ত হলো না। তিনি আবার ভাবতে লাগলেন, ‘আল্লাহর কিতাব আমার ঘরে থাকবে, আর আমি তা না পড়ে ঘুমিয়ে পড়ব? আমি আরাম করব, অথচ আমার রবের বাণী আমার পাশেই থাকবে? যে কিতাবে আমার জীবন চলার দিশা, আমার মুক্তির পথ, আমার রবের আদেশ লেখা আছে—সেই কিতাব রেখে আমি কীভাবে নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারি?’
এরপর তাঁর মনে আরেকটি চিন্তা এল, ‘কুরআন শরীফটি যদি পাশের ঘরে রেখে আসি, তাহলে তো নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারব।’
কিন্তু এই চিন্তা মনে আসতেই তিনি যেন নিজের কাছেই লজ্জিত হয়ে গেলেন। তিনি বলতে লাগলেন, ‘হায়! আমি কত বড় পাষাণ হয়ে গেছি! নিজের সামান্য আরামের জন্য আমি আল্লাহর কিতাবকে এ ঘর থেকে সরিয়ে দিতে চাই! এ তো আমার রবের সঙ্গে বড় ধরনের বেয়াদবি!’
এই অনুভূতিতে তাঁর অন্তর কেঁপে উঠল। অশ্রু ঝরতে লাগল অবিরাম।
সেদিন রাতে তিনি আর বিছানায় শুতে পারলেন না। বিশ্রামের চিন্তা ভুলে গিয়ে তিনি কুরআন তিলাওয়াতে মগ্ন হয়ে গেলেন। কুরআন তিলাওয়াত করতে করতেই তাঁর পুরো রাত কেটে গেল।
মুহতারাম হাজিরীন! আজ আমাদের ঘরেও কুরআন আছে। কিন্তু আমরা কতদিন পর সেটি খুলে দেখি? কত রাত মোবাইলের স্ক্রিনের সামনে কেটে যায়, অথচ কুরআনের সঙ্গে কয়েক মিনিটও কাটে না। আমাদের ঘর থেকে কুরআন হারিয়ে যায়নি; হারিয়ে গেছে কুরআনের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক।
যেদিন কুরআনের প্রতি আবার সেই ভালোবাসা, সেই আদব এবং সেই টান ফিরে আসবে, সেদিনই আমাদের রাতের অর্থও আবার বদলে যাবে।
রাতের গুনাহ—ইবাদতের সবচেয়ে বড় বাধা
এখন একটি প্রশ্ন করি—কেন আমাদের চোখ তাহাজ্জুদের জন্য জাগে না? কেন অ্যালার্ম বন্ধ করে আমরা আবার ঘুমিয়ে পড়ি? কেন মোবাইল হাতে নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা রাত জাগতে পারি, কিন্তু দুই রাকাত সালাতের জন্য জাগতে পারি না?
এর উত্তর শুধু অলসতা নয়। এর উত্তর আমাদের অন্তরের অবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত।
আল্লাহ তাআলা বলেন
كَلَّا بَلْ رَانَ عَلَىٰ قُلُوبِهِم مَّا كَانُوا يَكْسِبُونَ
কখনো নয়! বরং তাদের কৃতকর্মই তাদের অন্তরের ওপর মরিচা ধরিয়ে দিয়েছে। [সূরা মুতাফ্ফিফীন : ১৪]
গুনাহ প্রথমে হাতে হয়, চোখে হয়, জিহ্বায় হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তার আঘাত লাগে হৃদয়ে।
একটি গুনাহের পর আরেকটি গুনাহ, তারপর আরেকটি—এভাবে যখন মানুষ তাওবা ছাড়া গুনাহ করতে থাকে, তখন ধীরে ধীরে হৃদয়ের ওপর মরিচা জমতে থাকে। সেই হৃদয় আর আগের মতো থাকে না।
তখন কুরআন ভালো লাগে না। নামাযে মন বসে না। দোয়ায় চোখে পানি আসে না। ভালো কথা শুনেও অন্তর নড়ে না। আর তাহাজ্জুদ—তা তো অনেক দূরের কথা!
ইবাদতে আগের মতো স্বাদ পাই না
অনেক মানুষ অভিযোগ করে, ‘ইবাদতে আগের মতো স্বাদ পাই না।’ কিন্তু সে কি কখনো ভেবে দেখেছে, দিনের বেলায় চোখ, কান, জিহ্বা ও অন্তরকে কী কী গুনাহে জড়িয়েছে?
যে হৃদয় সারাদিন গুনাহে ব্যস্ত থাকে, সে হৃদয়ের জন্য রাতের ইবাদতে স্বাদ পাওয়া সহজ নয়। যে হৃদয় গুনাহ থেকে পরিষ্কার হয়, সেই হৃদয়ের জন্যই আল্লাহ ইবাদতের দরজা সহজ করে দেন। তাই যদি ইবাদতের মাধুর্য ফিরে পেতে চাই, তাহলে গোপন ও প্রকাশ্য—সব গুনাহ থেকে আন্তরিক তাওবা করতেই হবে।
কেন গুনাহ মানুষকে তাহাজ্জুদ থেকে দূরে রাখে?
এজন্যই বিখ্যাত আল্লাহর অলি ইবরাহীম ইবন আদহাম রহ. বলতেন
لَا تَعْصِهِ بِالنَّهَارِ وَهُوَ يُقِيمُكَ بَيْنَ يَدَيْهِ فِي اللَّيْلِ، فَإِنَّ وُقُوفَكَ بَيْنَ يَدَيْهِ فِي اللَّيْلِ مِنْ أَعْظَمِ الشَّرَفِ، وَالْعَاصِي لَا يَسْتَحِقُّ ذَلِكَ الشَّرَفَ
তুমি দিনের বেলায় আল্লাহর কোনো নাফরমানি করো না। তাহলে আল্লাহ নিজেই তোমাকে রাতে তাঁর সামনে ইবাদতে দাঁড় করিয়ে দেবেন। কারণ, রাতের শেষ প্রহরে আল্লাহর দরবারে দাঁড়াতে পারা পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সম্মানের বিষয়। আর যে ব্যক্তি গুনাহে ডুবে থাকে, সে এই বিশেষ সম্মানের যোগ্য হয় না। [হা কাযা কানাসসালিহূন : ৩]
এর অর্থ হলো, গুনাহ মানুষকে ইবাদত থেকে বঞ্চিত করে। গুনাহ যত বাড়ে, ইবাদতের তাওফিক তত কমে যায়। আর যখন কোনো বান্দা তাওবা করে আল্লাহর দিকে ফিরে আসে, তখন আল্লাহ তার জন্য ইবাদতের পথ সহজ করে দেন।
তুমি তো এক বন্দি মানুষ
তাবেয়ীদের শ্রেষ্ঠ ইমামদের একজন হাসান বসরী রহ.—যাঁর উপনাম ছিল আবু সাঈদ—তাঁর কাছে এক ব্যক্তি এসে বলল, ‘হে আবু সাঈদ! আমার খুব ইচ্ছা হয় রাত জেগে তাহাজ্জুদ পড়ব, আল্লাহর ইবাদতে কাটাব। কিন্তু কিছুতেই তা পারি না। এর কারণ কী?
হাসান আল-বাসরী রহ. গভীর অন্তর্দৃষ্টিতে উত্তর দিলেন
أَنْتَ رَجُلٌ قَدْ قَيَّدَتْكَ ذُنُوبُكَ
‘তুমি তো এক বন্দি মানুষ। তোমার গুনাহগুলোই তোমাকে শৃঙ্খলিত করে রেখেছে।’ [সিফাতুস সাফওয়া : ৩/২৩৫]
কী গভীর কথা! মানুষ ভাবে, তাকে ঘুম আটকে রেখেছে। অথচ অনেক সময় তাকে আটকে রাখে তার গুনাহ।
অনুশোচনা : জীবন্ত ঈমানের লক্ষণ
গুনাহ ও গাফলতির জীবন অনেকটা একজন মেকানিকের ময়লা কাপড়ের মতো। তাতে নতুন কোনো দাগ লাগলে আলাদা করে আর বোঝা যায় না।
কিন্তু আল্লাহ তাআলা যখন কোনো বান্দাকে তাওবার তাওফিক দেন এবং তার অন্তরে ঈমানের নূর দান করেন, তখন তার অবস্থা হয়ে যায় একেবারে পরিষ্কার সাদা কাপড়ের মতো। সেই শুভ্র কাপড়ে সামান্য একটি দাগ লাগলেও যেমন সঙ্গে সঙ্গে চোখে পড়ে, ঠিক তেমনি ঈমানদারের অন্তরেও সামান্য কোনো ভুল বা গুনাহ হলে তা তাকে কষ্ট দেয়। আগে যে গুনাহগুলোকে কোনো পাত্তাই দেওয়া হতো না, এখন সেগুলোই তাকে অস্থির করে তোলে। সে দ্রুত তাওবা করে, আল্লাহর কাছে ফিরে আসে।
অতএব, আগে যে গুনাহগুলোকে কোনো গুরুত্ব দেওয়া হতো না, এখন যদি সামান্য ভুলও অন্তরে কষ্ট দেয়, তবে বুঝে নিতে হবে—এটিই জীবন্ত ঈমানের লক্ষণ।
গুনাহের প্রতি অভ্যস্ত হয়ে যাওয়া—একটি ভয়ংকর অবস্থা
হযরত আবদুল কাদির জিলানী রহ. বলতেন, ‘যখন মানুষের এমন অবস্থা হয় যে গুনাহ তার কাছে আনন্দদায়ক মনে হয়, আর নেক আমল ভালো লাগে না, তখন এটি অত্যন্ত ভয়ংকর লক্ষণ। আল্লাহ তাআলা দুনিয়ায় তার পর্দা রক্ষা করলেও, এই অবস্থা তার জন্য কঠিন পরিণতির ইঙ্গিত বহন করে।’
সে পরিণতি কতটা ভয়াবহ হতে পারে, তা বোঝা যায় ইমাম ইবনু রজব হাম্বলী রহ.-এর এই কথায়—
أَنَّ خَاتِمَةَ السُّوءِ تَكُونُ بِسَبَبِ دَسِيسَةٍ بَاطِنَةٍ لِلْعَبْدِ لَا يَطَّلِعُ عَلَيْهَا النَّاسُ
অনেক সময় মানুষের খারাপ মৃত্যুর কারণ হয় তার এমন গোপন গুনাহ, যা অন্য কেউ জানত না। [জামিউল উলুম ওয়াল হিকাম : ১/১৭২]
একটি সহজ উদাহরণ
ধরুন, একজন অসুস্থ মানুষ এমন কিছু খেল, যা তার শরীরের জন্য ক্ষতিকর। এরপর যদি বমি হয়ে যায়, তখন ডাক্তার বলেন, ‘আলহামদুলিল্লাহ, শরীর ক্ষতিকর জিনিস বের করে দিয়েছে।’
কিন্তু যদি সেই ক্ষতিকর বস্তু খাওয়ার পরও শরীর কোনো প্রতিক্রিয়া না দেখায়; বরং সেটিকে গ্রহণ করে নেয়, তখন চিকিৎসক আরও চিন্তিত হন। কারণ, এটি সুস্থতার লক্ষণ নয়।
ঠিক তেমনি, কোনো মানুষ গুনাহ করার পর যদি অনুতপ্ত হয়, অন্তরে কষ্ট অনুভব করে এবং আল্লাহর কাছে তাওবা করে, তাহলে এটি ঈমান জীবিত থাকার লক্ষণ।
কিন্তু যদি বছরের পর বছর সুদ খায়, ঘুষ নেয়, হারাম উপার্জন করে, মানুষের হক নষ্ট করে, যাকাত আদায় না করে—তবুও তার অন্তরে কোনো অনুশোচনা না জাগে, তাহলে বুঝতে হবে তার অন্তর গুনাহের সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে গেছে। এটি অত্যন্ত ভয়ংকর অবস্থা।
তাওবার তাওফিক হারিয়ে যাওয়ার আগে
এমন বহু ঘটনা রয়েছে, যেখানে মৃত্যুর সময় মানুষ ডাক্তারকে ডাকতে বলে, ওষুধ আনতে বলে, সংসারের নানা কথা বলে; কিন্তু আস্তাগফিরুল্লাহ বা তাওবার একটি বাক্যও তার মুখে আসে না। এর কারণ, জীবনে সে বারবার তাওবাকে পিছিয়ে দিয়েছে।
আরিফ বিল্লাহ মাওলানা শাহ হাকীম মুহাম্মদ আখতার রহ. একটি ঘটনা উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, আমাদের এক প্রতিবেশী গাফলত ও গুনাহের জীবন কাটাত। তাকে যখনই নসিহত করা হতো, বলত—এখনো অনেক সময় আছে। পরে তাওবা করে নেব। জীবন তো পড়েই আছে। পরে তাওবা করে নেব।
তার তাওবার ইচ্ছা ছিল, কিন্তু কখনো বাস্তবে তাওবা করে নি। এভাবে আজ-কাল করতে করতে একসময় আল্লাহ তাআলা তার কাছ থেকে তাওবার তাওফিকই উঠিয়ে নিলেন। মৃত্যুর সময় সে সব কথাই বলতে পারছিল, কিন্তু তাওবার বাক্যটি আর তাঁর জিহ্বায় আসেনি।
তাই তাওবাকে কখনো আগামীকালের জন্য ফেলে রাখা উচিত নয়। রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন
مَنْ فُتِحَ لَهُ بَابٌ مِنَ الْخَيْرِ فَلْيَنْتَهِزْهُ ، فَإِنَّهُ لَا يَدْرِي مَتَى يُغْلَقُ عَنْهُ
যার জন্য কল্যাণের কোনো দরজা খুলে দেওয়া হয়, সে যেন দেরি না করে সেই সুযোগ গ্রহণ করে। কারণ, সে জানে না কখন সেই দরজাটি তার জন্য বন্ধ হয়ে যাবে। [ইবনুল মুবারক, আয-যুহদ : ১১৭]
আজ যদি আল্লাহ তাআলা তাওবার তাওফিক দিয়ে থাকেন, আজই তাওবা করি। কারণ, আমরা জানি না—এই তাওফিক আগামীকালও থাকবে কি না।
ইবনুল কাইয়্যমি রহ.-এর হৃদয়স্পর্শী কথা
ইবনুল কাইয়্যমি রহ. বলেন
إِنَّ مِنْ عُقُوبَةِ السَّيِّئَةِ السَّيِّئَةَ بَعْدَهَا، وَإِنَّ مِنْ ثَوَابِ الْحَسَنَةِ الْحَسَنَةَ بَعْدَهَا. فَالْعَبْدُ إِذَا عَمِلَ حَسَنَةً قَالَتْ أُخْرَى إِلَى جَانِبِهَا: اعْمَلْنِي أَيْضًا، فَإِذَا عَمِلَهَا قَالَتِ الثَّانِيَةُ كَذَلِكَ، وَهَلُمَّ جَرًّا، فَتَضَاعَفَ الرِّبْحُ، وَتَزَايَدَتِ الْحَسَنَاتُ. وَكَذَلِكَ جَانِبُ السَّيِّئَاتِ أَيْضًا
একটি গুনাহের অন্যতম শাস্তি হলো—তার পর আরেকটি গুনাহের জন্ম নেওয়া। আর একটি নেক আমলের অন্যতম প্রতিদান হলো—তার পর আরেকটি নেক আমল করার তাওফিক লাভ করা।
যখন কোনো বান্দা একটি নেক কাজ করে, তখন যেন সেই নেক আমলটির পাশেই আরেকটি নেক আমল দাঁড়িয়ে বলে, ‘আমাকেও করো।’ সে যখন সেটিও করে, তখন দ্বিতীয়টি আবার তৃতীয়টিকে আহ্বান করে। এভাবেই একের পর এক নেক আমলের দরজা খুলতে থাকে। ফলে তার সওয়াব বৃদ্ধি পায়, নেকির ভাণ্ডার সমৃদ্ধ হতে থাকে এবং আল্লাহর নৈকট্যের পথে সে ক্রমেই অগ্রসর হতে থাকে।
ঠিক এর বিপরীত চিত্র গুনাহের ক্ষেত্রেও। একটি গুনাহ আরেকটি গুনাহকে ডেকে আনে। একবার অবাধ্যতার পথে পা বাড়ালে শয়তান মানুষের সামনে নতুন নতুন গুনাহকে সহজ ও আকর্ষণীয় করে তোলে। এভাবেই একটি গুনাহ আরেকটির জন্ম দেয়, তারপর আরেকটি—এবং মানুষ ধীরে ধীরে গুনাহের শৃঙ্খলে বন্দি হয়ে পড়ে। [ইবনুল কাইয়্যমি, আদদা-ওয়াদ্দাওয়া : ১৩৯]
এটি শুধু একটি উপদেশ নয়; এটি আমাদের প্রতিদিনের জীবনের বাস্তব চিত্র।
কখনো কি লক্ষ্য করেছেন?
কখনো কি লক্ষ্য করেছেন? একদিন ফজরের নামায কাজা হলে, পরদিনও যেন সহজে কাজা হয়ে যায়। একদিন কুরআন তিলাওয়াত না করলে, তারপর কয়েক দিন আর কুরআন খোলা হয় না। একদিন কোনো গুনাহকে হালকা মনে করলে, পরের গুনাহটিও সহজ হয়ে যায়।
আবার এর উল্টো দিকও সত্য। একদিন যদি আন্তরিকভাবে তাহাজ্জুদে দাঁড়ানো যায়, পরের রাতেও অন্তর ডাকে—আজও দাঁড়াও। একদিন মনোযোগ দিয়ে কুরআন তিলাওয়াত করলে, পরদিনও কুরআনের কাছে বসতে ইচ্ছা হয়। একদিন কোনো গুনাহ থেকে নিজেকে বাঁচাতে পারলে, পরেরবারও সেই গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা সহজ হয়ে যায়।
এটাই নেক আমল ও গুনাহের স্বভাব। নেক আমল মানুষকে আরও নেক আমলের দিকে টেনে নেয়। আর গুনাহ মানুষকে আরও গুনাহের দিকে নিয়ে যায়।
তাই কোনো নেক আমলকে ছোট মনে করবেন না। আর কোনো গুনাহকেও তুচ্ছ ভাববেন না। অনেক সময় একটি ছোট নেকিই মানুষকে আল্লাহর আরও নৈকট্যের দিকে নিয়ে যায়। আবার একটি ছোট গুনাহই মানুষকে ধীরে ধীরে ইবাদত থেকে দূরে সরিয়ে দেয়।
গোপন গুনাহ ও গোপন ইবাদত
ইবনুল কাইয়্যমি রহ. আরও বলেন
أَجْمَعَ الْعَارِفُونَ بِاللهِ أَنَّ ذُنُوبَ الْخَلَوَاتِ هِيَ أَصْلُ الِانْتِكَاسَاتِ، وَأَنَّ عِبَادَاتِ الْخَفَاءِ هِيَ أَعْظَمُ أَسْبَابِ الثَّبَاتِ
আল্লাহওয়ালারা এ বিষয়ে একমত যে, নির্জনে করা গুনাহই দীনের পথে পিছিয়ে পড়ার মূল কারণ। আর গোপন ইবাদত দীনের ওপর অবিচল থাকার অন্যতম বড় উপায়। [মাউকিউ দুরারিস সুন্নিয়্যা : ১/২৪৩]
এ কথাটিও খুব বাস্তবসম্মত। কারণ, সাধারণত: মানুষ প্রকাশ্যে নিজেকে ভালো রাখার চেষ্টা করে। মানুষের সামনে নামায পড়ে, ভালো কথা বলে, দীনের কথা বলে। কিন্তু যখন একা থাকে, তখন যদি আল্লাহর নাফরমানিতে লিপ্ত হয়, সেই গোপন গুনাহ ধীরে ধীরে তার অন্তরকে দুর্বল করে দেয়। ফলে ইবাদতের স্বাদ চলে যায়। তাহাজ্জুদের তাওফিক উঠে যায়। কুরআনের সঙ্গে সম্পর্ক দুর্বল হয়ে যায়। দোয়ার মধ্যে আর আগের মতো আকুতি থাকে না।
অন্যদিকে, যে মানুষ নির্জনে আল্লাহকে ভয় করে, মানুষের অগোচরে দুই রাকাত নামায পড়ে, গোপনে কাঁদে, গোপনে দান করে এবং গোপনে তাওবা করে, আল্লাহ তার ঈমানকে দৃঢ় করে দেন। গোপন ইবাদত তার অন্তরকে জীবিত রাখে এবং প্রকাশ্য আমলকেও সুন্দর করে তোলে।
তাই আমাদের শুধু প্রকাশ্য আমল ঠিক করলেই হবে না; নির্জনের জীবনও ঠিক করতে হবে। কারণ, মানুষের সামনে আমরা যেমন, আল্লাহর কাছে আমাদের প্রকৃত পরিচয় হলো—মানুষের চোখের আড়ালে আমরা কেমন।
গোপন গুনাহ মানুষের অন্তরকে ধ্বংস করে
সাওবান রাযি. বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন
لَأَعْلَمَنَّ أَقْوَامًا مِنْ أُمَّتِي يَأْتُونَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ بِحَسَنَاتٍ أَمْثَالِ جِبَالِ تِهَامَةَ بِيضًا فَيَجْعَلُهَا اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ هَبَاءً مَنْثُورًا
‘আমি অবশ্যই আমার উম্মতের এমন কিছু লোককে চিনি, যারা কিয়ামতের দিন তিহামা পর্বতমালার মতো বিশাল, শুভ্র নেক আমল নিয়ে উপস্থিত হবে। কিন্তু আল্লাহ তাআলা তাদের সেই নেক আমলগুলোকে উড়ন্ত ধূলিকণার মতো ছিন্নভিন্ন করে দেবেন।’
এ কথা শুনে সাওবান রাযি. অত্যন্ত উদ্বিগ্ন হয়ে বললেন
يَا رَسُولَ اللَّهِ صِفْهُمْ لَنَا جَلِّهِمْ لَنَا ، أَنْ لَا نَكُونَ مِنْهُمْ وَنَحْنُ لَا نَعْلَمُ
‘হে আল্লাহর রাসূল! তাদের পরিচয় আমাদের স্পষ্ট করে বলুন। তাদের অবস্থা খুলে বলুন, যাতে অজান্তেই আমরা তাদের অন্তর্ভুক্ত না হয়ে যাই।’
তখন রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন
أَمَا إِنَّهُمْ إِخْوَانُكُمْ وَمِنْ جِلْدَتِكُمْ وَيَأْخُذُونَ مِنْ اللَّيْلِ كَمَا تَأْخُذُونَ ، وَلَكِنَّهُمْ أَقْوَامٌ إِذَا خَلَوْا بِمَحَارِمِ اللَّهِ انْتَهَكُوهَا
‘শোনো, তারা তোমাদেরই ভাই, তোমাদেরই মতো মানুষ। তারা তোমাদের মতোই রাত জেগে ইবাদত করে। কিন্তু যখন তারা নির্জনে থাকে, যেখানে আল্লাহ ছাড়া আর কেউ তাদের দেখে না, তখন তারা আল্লাহর নিষিদ্ধ বিষয়গুলো নির্দ্বিধায় লঙ্ঘন করে।’ [ইবন মাজাহ : ৪২৪৫]
কী ভয়াবহ সতর্কবার্তা! এরা কাফির নয়। মুনাফিক বলেও তাদের পরিচয় দেওয়া হয়নি। তারা ইবাদতও করে, রাত জেগেও ইবাদত করে। কিন্তু তাদের একটি গোপন জীবন ছিল, যা মানুষের চোখের আড়ালে হলেও আল্লাহর দৃষ্টি থেকে আড়াল ছিল না। সেই গোপন গুনাহই একসময় তাদের নেক আমলকে ধ্বংস করে দেয়।
আমাদের প্রকৃত ঈমানের পরীক্ষা মানুষের সামনে নয়; নির্জনে
কী ভয়াবহ সতর্কবার্তা! মানুষের সামনে আমরা হয়তো পরহেজগার। আমাদের কথা, পোশাক, আচরণ—সবই ইসলামী।
কিন্তু যখন ঘরের দরজা বন্ধ হয়, যখন হাতে মোবাইল থাকে, যখন কেউ আমাদের দেখছে না, তখন কি আমাদের অন্তরে এই অনুভূতি জাগ্রত থাকে—আল্লাহ আমাকে দেখছেন?
মানুষের সামনে গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা খুব কঠিন নয়। কারণ সেখানে মানুষের ভয় কাজ করে। কিন্তু নির্জনে গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা—এটাই তাকওয়ার পরিচয়।
গোপনে যে গুনাহ করতে আমাদের হাত কাঁপে না, সেই গুনাহই হয়তো প্রকাশ্য ইবাদতের পাহাড়সম আমলকে ধূলিকণায় পরিণত করে দিতে পারে।
সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্থ কে?
ইবনুল আরাবী রহ. বলতেন
أَخْسَرُ الْخَاسِرِينَ مَنْ أَبْدَى لِلنَّاسِ صَالِحَ أَعْمَالِهِ، وَبَارَزَ بِالْقَبِيحِ مَنْ هُوَ أَقْرَبُ إِلَيْهِ مِنْ حَبْلِ الْوَرِيدِ
সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্থ ওই ব্যক্তি যে মানুষের সামনে ভালো আমল করে। কিন্তু যে মহান সত্তা তার শাহ-রগের চেয়েও অধিক নিকটে তাঁর সামনে গুনাহ করে। [তাবাকাতুল আউলিয়া : ১/৭৭]
আর আমাদের শাহ-রগের চেয়েও অধিক নিকটে কে?
আল্লাহ তাআলা বলেন
وَنَحْنُ أَقْرَبُ إِلَيْهِ مِنْ حَبْلِ الْوَرِيدِ
আর আমি তার গলার শিরা থেকেও নিকটবর্তী। [সূরা ক্বাফ : ১৮]
আল্লাহর এক আরিফ চমৎকার বলেছেন
فَاسْتَحْيِ مِنْ نَظَرِ الْإِلَهِ وَقُلْ لَهَا
إِنَّ الَّذِي خَلَقَ الظَّلَامَ يَرَانِي
‘লজ্জা কর রবের দৃষ্টিকে। নফসকে বল, যিনি অন্ধকার সৃষ্টি করেছেন তিনি আমাকে দেখেন।’
গোপন ইবাদত—আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয়
মুহতারাম হাজিরীন! যেমন গোপন গুনাহ মানুষকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়, তেমনি গোপন ইবাদত মানুষকে আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের কাতারে পৌঁছে দেয়।
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন
سَبْعَةٌ يُظِلُّهُمُ اللَّهُ فِي ظِلِّهِ... وَرَجُلٌ ذَكَرَ اللَّهَ خَالِيًا فَفَاضَتْ عَيْنَاهُ
সাত শ্রেণির মানুষকে আল্লাহ তা‘আলা সেদিন তাঁর আরশের ছায়ায় স্থান দেবেন, যেদিন তাঁর ছায়া ছাড়া আর কোনো ছায়া থাকবে না। তাদের একজন সেই ব্যক্তি, যে নির্জনে আল্লাহকে স্মরণ করেছে, অতঃপর তার দুই চোখ অশ্রুসিক্ত হয়ে গেছে। [সহীহ বুখারী : ৬৬০]
একবার লক্ষ্য করুন—এখানে মানুষের প্রশংসা, বাহবা বা স্বীকৃতির কোনো কথা নেই। বলা হয়েছে শুধু—‘নির্জনে...’
কারণ নির্জনতা এমন এক ময়দান, যেখানে রিয়ার কোনো স্থান নেই। সেখানে নেই দর্শক, নেই করতালি, নেই প্রশংসা। সেখানে থাকে শুধু একজন বান্দা এবং তাঁর রব।
যে চোখ মানুষের সামনে নয়; বরং একান্তে আল্লাহর ভয়ে অশ্রু ঝরায়—সেই অশ্রুর মূল্য আল্লাহর কাছে অপরিসীম। যে কণ্ঠ গভীর রাতে নিঃশব্দে ইস্তিগফার করে, যে হৃদয় নিভৃতে সিজদায় ভেঙে পড়ে, যে হাত গোপনে দান করে, যে আত্মা একাকীত্বেও গুনাহ থেকে নিজেকে বিরত রাখে—এসবই আল্লাহর কাছে অত্যন্ত প্রিয় আমল।
আল্লাহ তাআলা বলেন
إِن تُبْدُوا الصَّدَقَاتِ فَنِعِمَّا هِيَ ۖ وَإِن تُخْفُوهَا وَتُؤْتُوهَا الْفُقَرَاءَ فَهُوَ خَيْرٌ لَّكُمْ
তোমরা যদি প্রকাশ্যে দান কর, তা ভালো। কিন্তু যদি গোপনে দান করে দরিদ্রদের দাও, তবে তা তোমাদের জন্য আরও উত্তম। [সূরা বাকারা : ২৭১]
যখন গোপন দান আল্লাহর কাছে এত প্রিয়, তখন গোপন নামায, গোপন ইস্তিগফার, গোপন কান্না এবং গোপন তাওবা তাঁর কাছে কত প্রিয় হতে পারে!
নিজের সঙ্গে একটু কথা বলুন
অল্লাহর বান্দারা! মাঝে মাঝে নিজের সঙ্গে একটু কথা বলুন। আজ রাতে যদি আল্লাহ তাআলা আমাকে ডেকে নেন—তাহলে আমার শেষ রাতটি কেমন হবে?
আমি কি মোবাইল হাতে নিয়ে একের পর এক ভিডিও দেখতে দেখতে ঘুমিয়ে পড়ব? নাকি অযুর শীতল পানিতে মুখ ধুয়ে, সবার অগোচরে দুই রাকাত নামাযে দাঁড়িয়ে রবের সামনে নিজের গুনাহের জন্য কান্না করব?
আমার শেষ রাতের সাক্ষী হবে কোনটি—মোবাইলের স্ক্রিন, নাকি সিজদার মাটি?
একদিন আমি এই পৃথিবী ছেড়ে চলে যাব। তখন আমার সন্তানরা আমাকে কীভাবে স্মরণ করবে?
তারা কি বলবে—আমাদের আব্বু গভীর রাতে তাহাজ্জুদ পড়তেন, কুরআন তিলাওয়াত করতেন, আল্লাহর কাছে অনেক দোয়া করতেন।
নাকি বলবে—আমাদের আব্বু রাত জেগে মোবাইল চালাতেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সময় কাটাতেন, কিন্তু নামাযের জন্য উঠতে পারতেন না।
একটু নিজের বিবেককে জিজ্ঞেস করুন—আপনি আপনার সন্তানদের জন্য কোন স্মৃতিটি রেখে যেতে চান?
কারণ সন্তান শুধু আপনার কথা শুনে বড় হয় না; সে আপনার জীবন দেখে বড় হয়। আপনি যা করেন, সেটাই তার কাছে সবচেয়ে বড় শিক্ষা। আপনি যদি রাতের নীরবতায় আল্লাহর সামনে দাঁড়ান, একদিন আপনার সন্তানও সেই দৃশ্য দেখে শিখবে। আর যদি সে সবসময় আপনাকে দুনিয়ার ব্যস্ততায় ডুবে থাকতে দেখে, তবে সেটিই তার কাছে স্বাভাবিক জীবন হয়ে যাবে।
আজ আমরা যে জীবন যাপন করছি, আগামী প্রজন্ম সেটিকেই অনুসরণ করবে। তাই আজই সিদ্ধান্ত নিন—আপনি কী রেখে যেতে চান?
সন্তান গড়ে ওঠে যেমন পরিবেশে, তেমনি চরিত্রে
মনে রাখবেন, একটি সুন্দর ভবন নির্মাণের জন্য যেমন শক্ত ভিত্তি প্রয়োজন, তেমনি একজন আদর্শ সন্তান গড়ে তোলার জন্য প্রয়োজন একটি সুন্দর পরিবার ও সুশৃঙ্খল পরিবেশ।
যেমন ছাঁচে কোনো বস্তু ঢালা হয়, বস্তুটিও তেমন আকৃতি ধারণ করে। ছাঁচ যদি নিখুঁত হয়, তাহলে তৈরি জিনিসও সুন্দর হয়; আর ছাঁচ যদি বিকৃত হয়, তাহলে তার ফলও বিকৃত হয়।
পরিবার হলো সন্তানের প্রথম বিদ্যালয়, আর মা-বাবাই তার প্রথম শিক্ষক। শিশুর চোখ খুলতেই সে যে পরিবেশ দেখে, যে ভাষা শোনে, যে আচরণ প্রত্যক্ষ করে—সেগুলোই ধীরে ধীরে তার চরিত্রের অংশ হয়ে যায়।
যদি ঘরে কুরআনের তিলাওয়াত হয়, জামাতে নামাযের গুরুত্ব থাকে, সত্যবাদিতা, লজ্জাশীলতা, পরস্পরের প্রতি সম্মান ও আল্লাহভীতি থাকে—তবে সেই ঘর থেকেই ইনশাআল্লাহ নেককার সন্তান গড়ে উঠবে।
আর যদি ঘরে অশ্লীলতা, মিথ্যা, গীবত, ঝগড়া-বিবাদ, অকারণ মোবাইল আসক্তি ও দুনিয়ামুখিতা থাকে, তাহলে সেই পরিবেশ সন্তানের মন-মানসিকতাকেও প্রভাবিত করবে।
হযরত আহমদ আলী লাহোরী রহ. অত্যন্ত সুন্দরভাবে বলেছেন
تعلیم یافتہ بھی ہوں، نیک بخت بھی ہوں
تم سے رہیں ملائم، شیطاں پر سخت بھی ہوں
قرآن ہی کرے گا ان بیبیوں کو پیدا
پاکیزہ تخم جب ہوں تو عمدہ درخت بھی ہوں
অর্থাৎ—তারা হবে শিক্ষিত, আবার সৌভাগ্যবতীও। আপনজনের প্রতি হবে কোমল, কিন্তু শয়তানের সামনে হবে দৃঢ়। কুরআনের শিক্ষাই এমন নারী গড়ে তুলবে। আর বীজ যদি পবিত্র হয়, তবে বৃক্ষও উৎকৃষ্ট হবে।
কথাগুলো শুধু নারীদের জন্য নয়; পুরো পরিবারের জন্যই একটি নীতি। কারণ পবিত্র বীজ থেকেই পবিত্র বৃক্ষ জন্ম নেয়। পরিবার যদি ঈমান, ইলম ও তাকওয়ার ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়, তাহলে সেই পরিবার থেকেই সমাজের জন্য কল্যাণকর মানুষ বের হয়ে আসে।
সন্তানের আগে নিজেকে সংশোধন করুন
আমরা প্রায়ই সন্তানদের নসীহত করি—বাবা, পাঁচ ওয়াক্ত নামায পড়ো। কিন্তু সে কি কখনো দেখেছে যে, আজান হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমরা সব কাজ ফেলে মসজিদের দিকে ছুটে গেছি?
আমরা বলি—বাবা, মোবাইল কম দেখো। কিন্তু আমাদের নিজের হাতেই কি সারাক্ষণ মোবাইল থাকে না?
আমরা বলি—মিথ্যা বলা মহাপাপ। কিন্তু নিজেদের প্রয়োজনে কি আমরা ছোট-বড় মিথ্যাকে সহজভাবে গ্রহণ করি না?
আমরা চাই সন্তান ভদ্র হোক, অথচ আমাদের মুখে রাগ, গালি ও কঠোর ভাষা। আমরা চাই সন্তান সত্যবাদী হোক, অথচ আমাদের কথার সঙ্গে কাজের মিল নেই।
মনে রাখতে হবে, সন্তান কেবল আমাদের উপদেশ শোনে না; সে আমাদের জীবন পড়ে। সে আমাদের প্রতিটি আচরণ, প্রতিটি অভ্যাস এবং প্রতিটি সিদ্ধান্ত নীরবে শিখে নেয়। এ কারণেই বলা হয়, সন্তান হলো মা-বাবার জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। মূল ছবিতে যা থাকবে, প্রতিচ্ছবিতেও তাই ফুটে উঠবে।
তাই যদি আমরা চাই আমাদের সন্তানরা আল্লাহভীরু, সৎ, নামাযী, কুরআনপ্রেমী, চরিত্রবান ও আদর্শ মানুষ হোক, তাহলে প্রথমে নিজেদের জীবনকেই বদলাতে হবে।
সন্তানকে পরিবর্তন করার সবচেয়ে কার্যকর উপায়
সন্তানকে পরিবর্তন করার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো—নিজেকে পরিবর্তন করা।
আমরা নিজেরা যদি নামাযের গুরুত্ব দিই, সন্তানও নামায ভালোবাসবে। আমরা নিজেরা যদি কুরআনের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলি, সন্তানও কুরআনের প্রতি আকৃষ্ট হবে। আমরা নিজেরা যদি সততা, আমানতদারি ও উত্তম চরিত্রের দৃষ্টান্ত স্থাপন করি, তাহলে সেই আলোই সন্তানের জীবনকে আলোকিত করবে। মনে রাখবেন, সন্তান আপনার মুখের ভাষার চেয়ে আপনার জীবনের ভাষা অনেক বেশি বোঝে।
তাই আজ থেকেই নিজেকে সংশোধনের যাত্রা শুরু করি। কারণ, বড়রা ঠিক হয়ে গেলে—আল্লাহর ইচ্ছায়—ছোটরাও ঠিক হয়ে যাবে। আর একটি নেককার পরিবার থেকেই গড়ে উঠবে একটি নেককার সমাজ।
হে আল্লাহ! আমাদের প্রকাশ্য ও গোপন—উভয় জীবনকে পবিত্র করে দিন এবং আমাদেরকে রাতের নিভৃত ইবাদতকারীদের অন্তর্ভুক্ত করুন—আমীন।
وَآخِرُ دَعْوَانَا أَنِ الْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ
মন্তব্য (...)
এ সম্পর্কিত আরও প্রবন্ধ
খেলাধুলার শরয়ী বিধান
১৯৯৭ খ্রিস্টাব্দ। আকরাম খানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ ক্রিকেট দল কেনিয়াকে হারিয়ে আইসিসি চ্যাম্পিয়ন হল। দেশ...
মুসলমানদের অধঃপতনের মূল কারণ
...
আসক্তি বা addiction: ভাবতে হবে এখনই
হামদ ও সালাতের পর! আল্লাহ তা’আলা নিজেদেরকে সংশোধন করার উদ্দেশ্যে তাঁরই জন্য কিছু সময় বের করার তাওফিক...
دورِ جدید کا فقہی ذخیرہ
فقہ اسلامی زمانہٴ تدوین سے لے کر عصرِ حاضر تک مختلف مراحل سے گزری،اس پر متنوع انقلابات آئے،فقہ اسلام...
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন