প্রবন্ধ
হারাম জীবনের শান্তি কেড়ে নেয়
৩ অক্টোবর, ২০২৬
৫২১
০
নাহমাদুহু ওয়ানুসাল্লি আলা রাসূলিহিল কারিম। আম্মা বাদ।
আল্লাহ তায়ালা সুরা বাকারা এর ১৬৮ আয়াতে ইরশাদ করেন,
یٰۤاَیُّہَا النَّاسُ کُلُوۡا مِمَّا فِی الۡاَرۡضِ حَلٰلًا طَیِّبًا ۫ۖ وَّلَا تَتَّبِعُوۡا خُطُوٰتِ الشَّیۡطٰنِ ؕ اِنَّہٗ لَکُمۡ عَدُوٌّ مُّبِیۡنٌ
অর্থ: হে মানুষ! পৃথিবীতে যা-কিছু হালাল, উৎকৃষ্ট বস্তু আছে তা খাও এবং শয়তানের পদচিহ্ন ধরে চলো না। নিশ্চিত জান, সে তোমাদের এক প্রকাশ্য শত্রু। ।
আল্লাহ তাআলা সুরা ত্বহা এর ১২৪ নং আয়াতে ইরশাদ করেন,
وَمَنۡ اَعۡرَضَ عَنۡ ذِکۡرِیۡ فَاِنَّ لَہٗ مَعِیۡشَۃً ضَنۡکًا وَّنَحۡشُرُہٗ یَوۡمَ الۡقِیٰمَۃِ اَعۡمٰی
আর যে আমার উপদেশ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে, তার জীবন হবে বড় সংকটময়। আর কিয়ামতের দিন আমি তাকে অন্ধ করে উঠাব।
ইসলামী জীবনদর্শনে 'হালাল' ও 'হারাম' কেবল কোনো আনুষ্ঠানিক বিধি-নিষেধ নয়, বরং মানুষের সার্বিক কল্যাণ ও মানসিক শান্তির এক অলঙ্ঘনীয় প্রাচীর। মানুষ স্বভাবগতভাবেই জীবনে সুখ, সমৃদ্ধি এবং প্রশান্তি খোঁজে। কিন্তু যখন কেউ সাময়িক লোভ, মোহ বা অবৈধ উপায়ে অর্জিত কোনো 'হারাম' বা নিষিদ্ধ বিষয়ের দিকে ধাবিত হয়, তখন আপাতদৃষ্টিতে তাকে লাভবান মনে হলেও প্রকৃতপক্ষে তা তার জীবনের আসল সম্পদ—আত্মিক শান্তি—কেড়ে নেয়। হারাম উপার্জন, হারাম খাদ্য কিংবা অবাধ্য ও অনৈতিক আচরণ মানুষের বিবেককে কলুষিত করে এবং তাকে এক চিরস্থায়ী অপরাধবোধ ও অস্থিরতার দিকে ঠেলে দেয়। পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ তায়ালা ঘোষণা করেছেন যে, তাঁর স্মরণ এবং নির্দেশিত সৎ পথেই রয়েছে হৃদয়ের প্রকৃত প্রশান্তি। এর বিপরীতে, হাড়ভাঙা খাটুনি বা বিপুল ধন-সম্পদ থাকার পরেও হারামের স্পর্শে জীবন হয়ে ওঠে বিষাদময় এবং বরকতহীন। তাই জীবনের প্রকৃত স্থিতি ও মানসিক শান্তি বজায় রাখতে হলে হালাল পন্থায় জীবন পরিচালনার কোনো বিকল্প নেই।
মানুষ জীবনে সুখ ও শান্তি খোঁজে। কেউ অর্থ-সম্পদের মধ্যে শান্তি খোঁজে, কেউ বিলাসী জীবনযাপনে, কেউ মানুষের প্রশংসায়, আবার কেউ নিজের প্রবৃত্তির চাহিদা পূরণে। কিন্তু ইসলাম আমাদের শিক্ষা দেয়—প্রকৃত শান্তি শুধু পার্থিব ভোগ-বিলাসে নয়; বরং আল্লাহর আনুগত্য, হালাল জীবনযাপন এবং অন্তরের পবিত্রতার মধ্যে।
অন্যদিকে হারাম উপার্জন, হারাম সম্পর্ক, হারাম ভোগ, অন্যের অধিকার নষ্ট করা কিংবা আল্লাহর নিষিদ্ধ কাজে জড়িয়ে পড়া—এসব সাময়িক আনন্দ দিতে পারে; কিন্তু ধীরে ধীরে মানুষের অন্তর থেকে প্রশান্তি কেড়ে নেয়।
আল্লাহ তাআলা বলেন—
أَلَا بِذِكْرِ اللَّهِ تَطْمَئِنُّ الْقُلُوبُ
“জেনে রাখো, আল্লাহর স্মরণেই অন্তরসমূহ প্রশান্ত হয়।” —সূরা আর-রাদ: ২৮
এই আয়াত আমাদের জীবনের একটি মৌলিক সত্য জানিয়ে দেয়—অন্তরের প্রকৃত প্রশান্তির উৎস হলো আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক। তাই যে জীবন আল্লাহর অবাধ্যতা ও হারামে পূর্ণ হয়ে যায়, সেখানে বাহ্যিক চাকচিক্য থাকলেও অন্তরের শান্তি নষ্ট হওয়া অস্বাভাবিক নয়।
হারাম কী?
হারাম হলো এমন কাজ, কথা, উপার্জন বা ভোগ, যা শরিয়ত স্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ করেছে। যেমন—সুদ, ঘুষ, চুরি, জুলুম, ব্যভিচার, মদ, জুয়া, প্রতারণা, অন্যের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভক্ষণ, হারাম উপার্জন এবং আল্লাহর নির্ধারিত সীমা লঙ্ঘন করা— এসবই হারামের অন্তর্ভুক্ত।
আল্লাহ তাআলা বলেন—
وَلَا تَعْتَدُوا ۚ إِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ الْمُعْتَدِينَ
“তোমরা সীমালঙ্ঘন করো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সীমালঙ্ঘনকারীদের ভালোবাসেন না।” —সূরা আল-বাকারা: ১৯০
হারাম শুধু একটি বাহ্যিক অপরাধ নয়; বরং এটি মানুষের অন্তর, চরিত্র, পরিবার এবং আখিরাত—সবকিছুর ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
হারাম আনন্দ দেয়, কিন্তু শান্তি দেয় না
হারামের অন্যতম বিপজ্জনক দিক হলো—এটি অনেক সময় প্রথমে আনন্দদায়ক মনে হয়। একজন ব্যক্তি হারাম অর্থ উপার্জন করে বিলাসবহুল বাড়ি বানাতে পারে। কেউ হারাম সম্পর্কের মাধ্যমে সাময়িক আবেগ ও আনন্দ পেতে পারে। কেউ নিষিদ্ধ বিনোদন বা প্রবৃত্তির পেছনে ছুটে কিছু সময়ের জন্য নিজেকে সুখী মনে করতে পারে। কিন্তু আনন্দ এবং প্রশান্তি এক জিনিস নয়!
"আনন্দ হতে পারে ক্ষণিকের, কিন্তু প্রশান্তি হলো অন্তরের চিরস্থায়ী স্থিরতা। হারাম মানুষের মাঝে সাময়িক আনন্দের মোহ তৈরি করে। তবে সেই ক্ষণস্থায়ী আনন্দের পরপরই নেমে আসে তীব্র অপরাধবোধ, অস্থিরতা, ভয় আর এক দমবন্ধ করা গোপনীয়তার চাপ। দুঃখজনকভাবে, এই চক্রের মধ্যে কিছুদিন অতিবাহিত হওয়ার পর মানুষ একসময় তার পূর্বের অপরাধবোধ সম্পূর্ণ ভুলে যায়। ফলে, সেই পুরনো আনন্দের কৃত্রিম নেশায় সে আবারও ব্যাকুল হয়ে ওঠে।" এভাবে মানুষ এক ধরনের চক্রের মধ্যে আটকে যায়।
হারাম উপার্জন জীবনের বরকত নষ্ট করে
মানুষের জীবনে অর্থের প্রয়োজন আছে। ইসলাম বৈধ উপার্জনকে উৎসাহিত করেছে। কিন্তু উপার্জনের পরিমাণের চেয়ে উপার্জনের পদ্ধতি অধিক গুরুত্বপূর্ণ।
রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন—
إِنَّ اللَّهَ طَيِّبٌ لَا يَقْبَلُ إِلَّا طَيِّبًا
“নিশ্চয়ই আল্লাহ পবিত্র; তিনি পবিত্র বস্তু ছাড়া গ্রহণ করেন না।”
এরপর নবী ﷺ এমন ব্যক্তির কথা উল্লেখ করেন, যে দীর্ঘ সফরে রয়েছে, এলোমেলো চুল ও ধূলিমলিন অবস্থায় হাত তুলে দোয়া করছে—“হে আমার রব! হে আমার রব!” অথচ তার খাবার হারাম, পানীয় হারাম, পোশাক হারাম এবং হারাম দ্বারা তার শরীর পুষ্ট হয়েছে। এরপর নবী ﷺ প্রশ্ন করেছেন—তার দোয়া কীভাবে কবুল হবে? —সহিহ মুসলিম: ১০১৫
এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, হারাম উপার্জন মানুষের শুধু অর্থনৈতিক জীবনকেই প্রভাবিত করে না; বরং তার ইবাদত ও আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্কের ওপরও মারাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে। অর্থ অনেক হতে পারে, কিন্তু তাতে যদি বরকত না থাকে, তাহলে সেই অর্থ মানুষকে প্রকৃত শস্তি দিতে পারে না।
হারাম সম্পর্ক অন্তরের প্রশান্তি কেড়ে নেয়
বর্তমান সময়ে এটি মানুষের মানসিক অশান্তির অন্যতম প্রধান কারণ। অনেক সময় বন্ধুত্ব, আবেগ কিংবা ভালোবাসার সুদৃশ্য মোড়কে এই অবৈধ সম্পর্কের সূচনা হয়। শুরুতে মনে হয়—'এই মানুষটিই বুঝি আমার সব সুখের উৎস এবং বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন; তাকে ছাড়া জীবন একেবারেই নিঃস্ব।' কিন্তু সম্পর্কটি যখন শরিয়তসম্মত গণ্ডি পেরিয়ে যায়, তখন এর সঙ্গে নানাবিধ পাপ ও জটিলতা যুক্ত হতে শুরু করে। ফলশ্রুতিতে মিথ্যা, ধোঁকা এবং প্রতারণার আশ্রয় নিতে গিয়ে সম্পর্কের অবক্ষয় ঘটে। এর চূড়ান্ত পরিণতিতে দেখা দেয় তীব্র মানসিক অস্থিরতা, অপরাধবোধ, ইবাদতে অনীহা এবং আল্লাহর নৈকট্য থেকে দূরে সরে যাওয়ার গ্লানি। পরিশেষে, গভীর গোপনীয়তার চাপ এবং পারস্পরিক চরম শত্রুতার মধ্য দিয়েই এই সম্পর্কের করুণ ইতি ঘটে।"
আল্লাহ তাআলা বলেন—
وَلَا تَقْرَبُوا الزِّنَىٰ ۖ إِنَّهُ كَانَ فَاحِشَةً وَسَاءَ سَبِيلًا
“তোমরা ব্যভিচারের নিকটবর্তী হয়ো না। নিশ্চয়ই তা অশ্লীল এবং নিকৃষ্ট পথ।” —সূরা বানি ইসরাঈল, আয়াত: ৩২
লক্ষ্য করার বিষয় হলো, আল্লাহ শুধু ব্যভিচার করতে নিষেধ করেননি; বরং বলেছেন ‘তার নিকটবর্তী হয়ো না।’ অর্থাৎ যেসব পথ মানুষকে হারামের দিকে নিয়ে যায়, সেগুলো থেকেও দূরে থাকার নির্দেশ রয়েছে।
গুনাহ অন্তরে প্রভাব ফেলে
গুনাহ মানুষের হৃদয়ের ওপর প্রভাব ফেলে—এ বিষয়টি হাদিসে অত্যন্ত সুন্দরভাবে বর্ণিত হয়েছে। রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন—
إِذَا أَذْنَبَ الْعَبْدُ نُكِتَتْ فِي قَلْبِهِ نُكْتَةٌ سَوْدَاءُ
“বান্দা যখন কোনো গুনাহ করে, তখন তার অন্তরে একটি কালো দাগ পড়ে।”
বান্দা তওবা করলে ও গুনাহ থেকে ফিরে এলে তার অন্তর পরিশুদ্ধ হয়। কিন্তু সে যদি গুনাহের ওপর গুনাহ করতে থাকে, তাহলে সেই দাগ বৃদ্ধি পেতে থাকে। —জামে তিরমিজি, হাদিস: ৩৩৩৪
এটি মানুষের অন্তর্জগতের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা তুলে ধরে। প্রথমবার গুনাহ করার পর যে অস্বস্তি অনুভূত হয়, বারবার করতে করতে অনেকের কাছে সেটিই স্বাভাবিক হয়ে যায়। তখন গুনাহের প্রতি লজ্জা কমে যায় এবং অন্তরের সংবেদনশীলতাও দুর্বল হতে থাকে।
হারাম মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দেয়
গুনাহের একটি বড় ক্ষতি হলো—এটি মানুষের কাছে খারাপকে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক করে দিতে পারে।
প্রথমে একজন ব্যক্তি কোনো হারাম কাজ করতে ভয় পায়। পরে একবার করে ফেলে। তারপর আবার করে। একসময় সে বলতে শুরু করে—“এতে এমন কী হয়েছে?” এভাবেই গুনাহের প্রতি সংবেদনশীলতা কমতে থাকে। একসময় তারা গুনাহের ব্যাপারে ধৃষ্ঠতা প্রদর্শন করা শুরু করে ফলে তার জীবনে আর তাওবা করা কিংবা অনুশোচনা করার তাওফিক হয় না। রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন— كُلُّ أُمَّتِي مُعَافًى إِلَّا الْمُجَاهِرِينَ “আমার উম্মতের সবাই ক্ষমাপ্রাপ্ত হতে পারে, তবে প্রকাশ্যে গুনাহকারীরা ব্যতিক্রম।” সহিহ বুখারী, হাদিস: ৬০৬৯; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৯৯০।
তাই গুনাহকে হালকা মনে করা এবং প্রকাশ্যে তা নিয়ে গর্ব করা অত্যন্ত বিপজ্জনক।
হারাম ভোগের বিপরীতে হালাল জীবনের সৌন্দর্য
"হারাম ভোগের বিপরীতে হালাল জীবনের সৌন্দর্য চিরন্তন। ইসলাম মানুষকে দুনিয়া ত্যাগ করতে বলেনি; বরং বৈধ আনন্দ, বৈধ সম্পদ, বৈধ ভালোবাসা এবং পবিত্র উপভোগের চমৎকার পথ দেখিয়েছে। মানুষের নিত্যনৈমিত্তিক স্বাভাবিক জীবনে শরিয়ত কোনো অযৌক্তিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেনি, আবার তাকে সীমাহীন বা লাগামহীনভাবে ছেড়েও দেয়নি। বরং মানুষের প্রতিটি কাজকে সুনিয়ন্ত্রিত ও সুবিন্যস্ত করতে শরিয়ত একটি নিখুঁত ভারসাম্য (Balance) শিখিয়েছে। মহান আল্লাহ তায়ালা বলেন— আল্লাহ তাআলা বলেন—
قُلْ مَنْ حَرَّمَ زِينَةَ اللَّهِ الَّتِي أَخْرَجَ لِعِبَادِهِ وَالطَّيِّبَاتِ مِنَ الرِّزْقِ
'বলুন, আল্লাহর সেই সৌন্দর্য—যা তিনি তাঁর বান্দাদের জন্য সৃষ্টি করেছেন এবং পবিত্র রিজিক—কে হারাম করেছে?' —সূরা আল-আরাফ: ৩২
অর্থাৎ, ইসলামের শিক্ষা এটি নয় যে মানুষ সুখী হবে না; বরং শিক্ষা হলো—সুখ ও আনন্দের খোঁজে মানুষের জন্য হারামের দরজা খোলার কোনো প্রয়োজন নেই। হালালের পথ হয়তো অনেক সময় ধীরগতির মনে হতে পারে, কিন্তু তাতে থাকে এক অলৌকিক বরকত ও মানসিক প্রশান্তি। পক্ষান্তরে, হারামের পথ হয়তো দ্রুত লাভের মরিচীকা দেখায়, কিন্তু এর চূড়ান্ত পরিণতি অত্যন্ত ভয়াবহ ও ধ্বংসাত্মক।"
কেন হারাম জীবনে শান্তি থাকে না?
হারাম জীবনে অশান্তির অন্যতম কারণগুলো হলো—
১. আল্লাহর অবাধ্যতার বোঝা
একজন মুমিন যখন জেনে-শুনে আল্লাহর কোনো বিধান অমান্য করে, তখন তার রূহ বা আত্মা এক গভীর সংকটে পড়ে। তওবা না করলে এই পাপাচারের বোঝা ধীরে ধীরে অন্তরের চিরস্থায়ী অশান্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ফলশ্রুতিতে অন্তরের দহনযন্ত্রণা তার দেহকেও পুড়িয়ে ছাই করে দেয় এবং জগতের কোনো কিছুই তাকে শীতল করতে পারে না। শুধু তা-ই নয়, এই অবাধ্যতার কারণে অন্তরে এক অবর্ণনীয় খটকা ও অস্থিরতা তৈরি হয়, যা মানুষকে প্রতিনিয়ত তাড়া করে বেড়ায়। এ প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন:
«الإِثْمُ مَا حَاكَ فِي نَفْسِكَ وَكَرِهْتَ أَنْ يَطَّلِعَ عَلَيْهِ النَّاسُ»
"গুনাহ বা পাপ হলো তা-ই, যা তোমার অন্তরে খটকা বা অস্থিরতা সৃষ্টি করে এবং মানুষের সামনে তা প্রকাশ হয়ে পড়াকে তুমি অপছন্দ করো।" সহীহ মুসলিম, হাদিস নং: ২৫৫৩
এমনকি মৃত্যুর পরও অবাধ্যতার কারণে মানুষের ওপর নেমে আসে ভয়াবহ আজাব এবং মর্মন্তুদ শাস্তি। আর এই অনস্বীকার্য বাস্তবতা সামনে রেখেই আল্লাহ তাআলা কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে ইরশাদ করেন:
وَمَنۡ اَعۡرَضَ عَنۡ ذِکۡرِیۡ فَاِنَّ لَہٗ مَعِیۡشَۃً ضَنۡکًا وَّنَحۡشُرُہٗ یَوۡمَ الۡقِیٰمَۃِ اَعۡمٰی
"আর যে আমার উপদেশ (স্মরণ) থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে, তার জীবন হবে বড় সংকটময় (অশান্তিপূর্ণ)। আর কিয়ামতের দিন আমি তাকে অন্ধ অবস্থায় পুনরুত্থিত করব।" সূরা ত্বহা, আয়াত: ১২৪
সুতরাং, নাফরমানির কারণে আল্লাহ তাআলা যার জীবনকে সংকটময় করে দিয়েছেন, যাকে কিয়ামতের দিন অন্ধত্বের গ্লানি ও বোঝা বয়ে বেড়াতে হবে; এই নশ্বর পৃথিবীতে এমন কে আছে যে তার জীবনকে সুখ-সমৃদ্ধিতে ভরিয়ে দেবে? হাশরের সেই কঠিন ময়দানে তার হাতে আলোর মশাল তুলে দেবে? কেউ নেই, কারো সেই সাধ্য নেইা!
২. হারানোর ভয়
হারাম সম্পদ, অবৈধ সম্পর্ক কিংবা অন্যায়ভাবে অর্জিত যেকোনো সুবিধা মানুষকে সবসময় এক মানসিক কারাগারের মধ্যে বন্দি রাখে। "কখন ধরা পড়ে যাব", "কখন সম্পর্ক ভেঙে যাবে" বা "কখন মান-সম্মান চলে যাবে"—এই অবিরত ভয় তাকে তাড়া করে বেড়ায়। ফলে সুখের চাদরে মুড়িয়েও সে বস্ত্রহীন থাকে। আপাতদৃষ্টিতে তাকে স্বাধীন ও সুখী মনে হলেও, ভেতরে ভেতরে সে এক চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে। কেননা হারামের ওপর গড়া যেকোনো প্রাসাদের ভিত্তি অত্যন্ত নড়বড়ে। এই মনস্তাত্ত্বিক সত্য ও আকস্মিক পতনের ভয়াবহতা সম্পর্কে সতর্ক করে মহান আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:
فَأَتَى اللَّهُ بُنْيَانَهُم مِّنَ الْقَوَاعِدِ فَخَرَّ عَلَيْهِمُ السَّقْفُ مِن فَوْقِهِمْ وَأَتَاهُمُ الْعَذَابُ مِنْ حَيْثُ لَا يَشْعُرُونَ
"অতঃপর আল্লাহ তাদের প্রাসাদের ভিত্তিমূলে আঘাত করলেন। ফলে ওপর থেকে ছাদ তাদের মাথার ওপর ভেঙে পড়ল এবং তাদের ওপর আজাব এমন একদিক থেকে আসল, যা তারা কল্পনাও করতে পারেনি।" সূরা আন-নাহল, আয়াত: ২৬
মানুষ যখন আল্লাহর অবাধ্য হয়ে হারাম উপায়ে কোনো কিছু অর্জন করতে চায়, তখন আল্লাহ তার থেকে নিরাপত্তার চাদর তুলে নেন। ফলে মান-সম্মান হারানো, লাঞ্ছিত হওয়া এবং শত্রুর কাছে অপদস্থ হওয়ার ভয় তাকে প্রতিনিয়ত গ্রাস করে।
৩. লোভের বৃদ্ধি
হারাম উপার্জন বা হারাম ভোগ মানুষকে এক অতৃপ্ত মায়াজালে নিমজ্জিত করে। এটি এমন এক নেশা, যা যত বেশি পাওয়া যায়, পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা ততই জ্যামিতিক হারে বাড়তে থাকে। ফলে বাহ্যিক সম্পদ বাড়লেও তার মন থেকে তৃপ্তি হারিয়ে যায়। আরো চাই; আরো চাই; করে সারাক্ষণ সম্পদের পেছনে ছুটতে থাকে। এমনকি জীবনের শেষ সময়ে শয্যাশায়ী হয়েও সম্পদের নেশায় লোভাতুর থাকে। এই জাতীয় লোকদের অশুভ পরিণাম সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা সুরা তাকাছুর নাযিল করে ইরশাদ করেন,
اَلۡہٰکُمُ التَّکَاثُرُ ۙ حَتّٰی زُرۡتُمُ الۡمَقَابِرَ ؕ ………… ثُمَّ لَتُسۡـَٔلُنَّ یَوۡمَئِذٍ عَنِ النَّعِیۡمِ
"প্রচুর পাওয়ার প্রতিযোগিতা তোমাদেরকে (আল্লাহর স্মরণ থেকে) গাফেল করে রেখেছে—যতক্ষণ না তোমরা কবরে প্রবেশ করো। … অতঃপর সে দিন তোমাদেরকে নি‘আমতরাজি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হবে (যে, তোমরা তার কী হক আদায় করেছ?) সূরা আত তাকাছুর, আয়াত নং ১-৮
অর্থাৎ দুনিয়ায় যেসব নি‘আমত তোমরা লাভ করেছিলে সে কারণে তোমরা আল্লাহ তাআলার কী শোকর আদায় করেছ এবং তাঁর কেমন আনুগত্য করেছ? সব কিছুরই হিসাব দিতে হবে।
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,
«لَوْ كَانَ لِابْنِ آدَمَ وَادِيَانِ مِنْ مَالٍ لاَبْتَغَى ثَالِثًا، وَلاَ يَمْلَأُ جَوْفَ ابْنِ آدَمَ إِلَّا التُّرَابُ، وَيَتُوبُ اللَّهُ عَلَى مَنْ تَابَ»
যদি আদম সন্তানের দুটি উপত্যকাপূর্ণ ধনসম্পদ থাকে তবুও সে তৃতীয়টার আকাঙ্ক্ষা করবে। আর মাটি ছাড়া লোভী আদম সন্তানের পেট ভরবে না। অবশ্য যে ব্যক্তি তওবা করবে, আল্লাহ তাআলা তার তওবা কবুল করবেন। " সহিহ বুখারী: হাদিস: ৬৪৩৬
৪. অন্তরের অন্ধকার
গুনাহের অবিরত চর্চা মানুষের মনের কোমলতা ও আত্মিক সংবেদনশীলতাকে নষ্ট করে দেয়। ফলে অন্তরের ওপর এক অন্ধকার পর্দা পড়ে যায়। এর ফলে ইবাদতের মিষ্টি স্বাদ হারিয়ে যায় এবং আল্লাহর স্মরণ থেকে মানুষ যোজন যোজন দূরে সরে যায়। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,
كَلَّا ۖ بَلْ ۜ رَانَ عَلَىٰ قُلُوبِهِم مَّا كَانُوا يَكْسِبُونَكَلَّا ۖ بَلْ ۜ رَانَ عَلَىٰ قُلُوبِهِم مَّا كَانُوا يَكْسِبُونَ
"কখনোই নয়, বরং তারা যা উপার্জন (গুনাহ) করে, তা-ই তাদের হৃদয়ে মরিচা বা অন্ধকার সৃষ্টি করেছে।" — সুরা মুতাফফিফীন, আয়াত: ১৪
إِنَّ الْعَبْدَ إِذَا أَخْطَأَ خَطِيئَةً نُكِتَتْ فِي قَلْبِهِ نُكْتَةٌ سَوْدَاءُ...إِنَّ الْعَبْدَ إِذَا أَخْطَأَ خَطِيئَةً نُكِتَتْ فِي قَلْبِهِ نُكْتَةٌ سَوْدَاءُ...
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "বান্দা যখন একটি গুনাহ করে, তখন তার অন্তরে একটি কালো দাগ পড়ে। যদি সে তওবা করে, তবে তার অন্তর আবার পরিষ্কার হয়ে যায়। আর যদি সে গুনাহ বাড়িয়ে দেয়, তবে সেই দাগও বাড়তে থাকে এবং একসময় তার পুরো অন্তরকে ঢেকে ফেলে।" — সুনানে তিরমিযী, হাদিস নং: ৩৩৩৪
৫. বরকতের অভাব
পরিমাণ বা সংখ্যার বিচারে কোনো কিছু বেশি হওয়া আর তাতে 'বরকত' বা কল্যাণ থাকা এক বিষয় নয়। অল্প হালাল সম্পদও মানুষের জীবনে অলৌকিক শান্তি নিয়ে আসে, অথচ কোটি টাকার হারাম সম্পদও মানুষের রাতের ঘুম ও ঘরের শান্তি কেড়ে নেয়। শান্তির সকল আসবাব থাকা সত্ত্বেও আশান্তির অনলে সে সর্বদাই দগ্ধ হতে থাকে। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,
يَمْحَقُ اللَّهُ الرِّبَا وَيُرْبِي الصَّدَقَاتِيَمْحَقُ اللَّهُ الرِّبَا وَيُرْبِي الصَّدَقَاتِ
"আল্লাহ সুদকে (হারাম উপার্জনকে) ধ্বংস করেন এবং সদকাকে (হালাল সম্পদকে) বৃদ্ধি বা বরকত দান করেন।" সুরা বাকারা: আয়াত; ২৭৬
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,
لَيْسَ الْغِنَى عَنْ كَثْرَةِ الْعَرَضِ، وَلَكِنَّ الْغِنَى غِنَى النَّفْسِلَيْسَ الْغِنَى عَنْ كَثْرَةِ الْعَرَضِ، وَلَكِنَّ الْغِنَى غِنَى النَّفْسِ
لَيْسَ الْغِنَى عَنْ كَثْرَةِ الْعَرَضِ، وَلَكِنَّ الْغِنَى غِنَى النَّفْسِ
প্রচুর ধন-সম্পদ থাকলেই ধনী হওয়া যায় না, প্রকৃতপক্ষে অন্তরের ধনী হওয়াই আসল ধনী (বা শান্তি)।" সহীহ বুখারী, হাদীস নং: ৬৪৪৬ —
শান্তির প্রকৃত ঠিকানা কোথায়?
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন—
اَلَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا وَتَطۡمَئِنُّ قُلُوۡبُہُمۡ بِذِکۡرِ اللّٰہِ ؕ اَلَا بِذِکۡرِ اللّٰہِ تَطۡمَئِنُّ الۡقُلُوۡبُ ؕ
অর্থঃ এরা সেই সব লোক, যার ঈমান এনেছে এবং যাদের অন্তর আল্লাহর যিকিরে প্রশান্তি লাভ করে। স্মরণ রেখ, কেবল আল্লাহর যিকিরেই অন্তরে প্রশান্তি লাভ হয়। সুরা আর রা'দ - আয়াত নং: ২৮
তাই জীবনে প্রকৃত শান্তি পেতে হলে শুধু বাহ্যিক জীবনকে সাজালেই হবে না; অন্তরকেও আল্লাহর আনুগত্যে সাজাতে হবে।
নামাজ, কুরআন তিলাওয়াত, জিকির, হালাল উপার্জন, পিতা-মাতার সঙ্গে সদাচরণ, মানুষের অধিকার আদায়, বৈধ উপায়ে ভালোবাসা ও পরিবার গঠন—এসবই একজন মুমিনের জীবনে প্রশান্তির পথ তৈরি করে।
হারামে জড়িয়ে গেলে কী করবেন?
কেউ যদি ইতোমধ্যে কোনো হারাম কাজে জড়িয়ে পড়ে, তার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো হতাশ না হওয়া। বরং হারাম ছেড়ে দিয়ে কায়মনোবাক্যে আল্লাহ তাআলার কাছে তওবা করা। আল্লাহ তাআলা বলেন—
قُلْ يَا عِبَادِيَ الَّذِينَ أَسْرَفُوا عَلَىٰ أَنفُسِهِمْ لَا تَقْنَطُوا مِن رَّحْمَةِ اللَّهِ ۚ إِنَّ اللَّهَ يَغْفِرُ الذُّنُوبَ جَمِيعًا
“বলুন, হে আমার সেই বান্দারা, যারা নিজেদের ওপর জুলুম করেছ! তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সব গুনাহ ক্ষমা করেন।” —সূরা আয-যুমার: ৫৩
কাজেই হারাম ছাড়ার প্রথম পদক্ষেপ হলো সত্যিকার তওবা। তওবার জন্য মৌলিক চারটি শর্ত:
১. গুনাহ ত্যাগ করতে হবে।
২. অতীতের গুনাহের জন্য আন্তরিকভাবে অনুতপ্ত হতে হবে।
৩. ভবিষ্যতে আর গুনাহে ফিরে না যাওয়ার দৃঢ় সংকল্প করতে হবে।
৪. মানুষের অধিকার নষ্ট করলে তা যথাসম্ভব ফিরিয়ে দিতে হবে বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির হক আদায় করতে হবে। বিস্তারিত দেখতে ক্লিক করুন।
হারাম ছেড়ে দিলে কি জীবন কঠিন হবে?
অনেক সময় শয়তান মানুষকে এই ভয় দেখায়—“এটা ছেড়ে দিলে তুমি কীভাবে চলবে?” কিন্তু মুমিনের বিশ্বাস হলো—আল্লাহর জন্য কোনো কিছু ছেড়ে দিলে আল্লাহ তার জন্য উত্তম কিছু দিতে সক্ষম।
রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন—
إِنَّكَ لَنْ تَدَعَ شَيْئًا لِلَّهِ عَزَّ وَجَلَّ إِلَّا بَدَّلَكَ اللَّهُ بِهِ مَا هُوَ خَيْرٌ لَكَ مِنْهُ
“তুমি আল্লাহর জন্য কোনো কিছু ত্যাগ করলে আল্লাহ অবশ্যই তার পরিবর্তে তোমার জন্য তার চেয়ে উত্তম কিছু দান করবেন।” —মুসনাদ আহমদ, হাদীস নং: ২২০০০
তাই হারাম থেকে বেরিয়ে আসা ক্ষতি নয়; বরং এটি একজন মুমিনের জন্য আল্লাহর দিকে ফিরে আসার প্রথম পদক্ষেপ।
শেষ কথা
দুনিয়ার সব সুখ পাওয়ার পরও যদি অন্তর অশান্ত থাকে, তাহলে সেই সুখ পূর্ণ সুখ নয়। বিপরীতে, একজন মানুষ হয়তো অল্প সম্পদ নিয়ে জীবনযাপন করছে, কিন্তু তার উপার্জন হালাল, তার অন্তর আল্লাহর স্মরণে প্রশান্ত, তার পরিবারে ভালোবাসা এবং তার হৃদয়ে আখিরাতের আশা—তাহলে তার জীবনে এমন এক সম্পদ রয়েছে, যা টাকা দিয়ে কেনা যায় না।
হারাম হয়তো চোখকে আনন্দ দিতে পারে, কিন্তু সবসময় অন্তরকে শান্ত করতে পারে না।
আর হালাল পথ হয়তো কখনো কঠিন মনে হতে পারে, কিন্তু আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য সেই পথ বেছে নেওয়ার মধ্যেই রয়েছে প্রকৃত সফলতা।
তাই আসুন—
হারামকে আনন্দের পথ নয়, বিপদের পথ হিসেবে চিনতে শিখি।
হালালকে শুধু বিধান নয়, বরং শান্তির পথ হিসেবে গ্রহণ করি।
আর জীবনের প্রতিটি সিদ্ধান্তে আল্লাহর সন্তুষ্টিকে অগ্রাধিকার দিই।
কারণ প্রকৃত শান্তি সম্পদের আধিক্যে নয়, মানুষের প্রশংসায় নয়, প্রবৃত্তির অবাধ স্বাধীনতায়ও নয়—প্রকৃত শান্তি আল্লাহর আনুগত্যের মধ্যেই।
মন্তব্য (...)
এ সম্পর্কিত আরও প্রবন্ধ
বরকতময় জীবন লাভের উপায়
ইমারতে ইসলামিয়া আফগানিস্তানে আমাদের ভাইদের মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা বিশ্বাবাসীকে দেখিয়ে দিচ্ছেন ইসলামী...
হালাল রিযিক : আল্লাহ প্রদত্ত বড় নিয়ামত
পৃথিবীতে আগমনের পর জীবনধারণের জন্য মানুষের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন রিযিক। রিযিক বলতে আমরা সাধারণত খাদ্য-পা...
সন্তানের মৃত্যুতে ধৈর্য ও পিতা-মাতার জন্য সুসংবাদ
সন্তান আল্লাহ তাআলার অমূল্য নিয়ামত ও শ্রেষ্ঠ আমানত। একজন মা-বাবার জীবনের সবচেয়ে বড় সুখ যেমন সন্তা...
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন