প্রবন্ধ
ধর্মে বাড়াবাড়ী নয়
২৫ জুন, ২০২৬
২৯৩
০
আল্লাহ তায়ালা এই পৃৃথিবী সৃষ্টি করে মানুষকে পৃথিবী পরিচালনা করার এবং আল্লাহর খেলাফত বা প্রতিনিধিত্ব করার নির্দেশ দিয়েছেন। ইরশাদ করেছেন। আমি পৃথিবীতে আমার খলিফা বা প্রতিনিধি সৃষ্টি করবো। স্বভাবতই যিনি খলিফা হবেন তিনি প্রধানের নির্দেশিত পথ ও পদ্ধতি অনুসরণ করবেন। প্রধান যেই সীমা নির্ধারণ করে দিবেন প্রতিনিধি তা মেনে চলবেন। অতিক্রম করবেন না। আল্লাহ তায়ালা মানুষকে প্রতিনিধি হিসেবে পাঠিয়ে আল্লাহর প্রতিনিধিত্ব বাস্তবায়নের জন্যও কিছু পথ ও পদ্ধতি নির্ধারণ করে দিয়েছেন। কোনো মানুষের জন্য সেই পথ ও পদ্ধতির ব্যতিক্রম করা বৈধ হবে না। আল্লাহ তায়ালা যেই নির্দেশনাগুলো দিয়ে মানুষকে পাঠিয়েছেন সেগুলোর বিধিবদ্ধরূপই হলো, ধর্ম। আরবিতে যাকে বলে দ্বীন।
দ্বীন (ধর্ম)-এর সংজ্ঞা:
' الدين শব্দটি আরবি ক্রিয়ামূল (دانَ) থেকে এসেছে এবং এর মূল অর্থ হলো আনুগত্য ও বশ্যতা। প্রসঙ্গভেদে এর আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থ রয়েছে:
আনুগত্য ও বশ্যতা: যেমন دُنتُ لله (দানতু লিল্লা-হ), অর্থাৎ আমি আল্লাহর অনুগত হয়েছি এবং তাঁর কাছে আত্মসমর্পণ করেছি।
প্রতিদান ও হিসাব: যেমন পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে, مَالِكِ يَوْمِ الدِّينِ , যার অর্থ হলো বিচার বা প্রতিফল দিবসের মালিক।
অভ্যাস ও রীতি: যেমন বলা হয়, "هذا ديني ودَيدني" (হাযা দাইনী ওয়া দাইদানী), যার অর্থ এটিই আমার স্বভাব ও চিরচেনা রীতি।
পারিভাষিক সংজ্ঞা:
الدين: هو"وضع إلهي سائغ لأولي العقول، يدعوهم إلى الإيمان بالله وكتبه ورسله، وإلى العمل الصالح، ويقودهم إلى السعادة في الدنيا والآخرة".
দ্বীন বা ধর্ম হলো, বোধসম্পন্ন ব্যক্তির জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত এমন একটি জীবন বিধান, যা তাদের আল্লাহ, তাঁর কিতাবসমূহ ও তাঁর রাসূলদের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন এবং সৎকাজের দিকে আহ্বান করে; এবং তাদেরকে ইহকাল ও পরকালে সৌভাগ্যের দিকে পরিচালিত করে।"
মানবজীবনে দ্বীন-ধর্মের প্রয়োজনীয়তা:
মানবজীবনে ধর্মের গুরুত্ব অপরিসীম। যা তার সংজ্ঞা থেকেই স্পষ্ট। ধর্মের প্রধান উদ্দেশ্য হলো, এটি জীবনের উদ্দেশ্য নির্ধারণ করে দেয়। মানুষ কেন পৃথিবীতে এসেছে এবং তার দায়িত্ব কী, ধর্ম তার সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা দেয়। এটি মানুষকে সৎ পথে পরিচালিত করে এবং পরকালের মুক্তির পথ দেখায়। মানুষের ব্যক্তিগত, সামাজিক ও নৈতিক জীবনকে সুশৃঙ্খল, অর্থবহ এবং সুন্দর করে তোলে। ধর্ম মানুষকে ন্যায়পরায়ণতা, সহানুভূতি ও আত্মসংযমের শিক্ষা দেয়, যা বিশৃঙ্খল সমাজকে শান্তিময় ও মানবিক রাখতে অপরিহার্য।
ইসলামকেই কেন মানতে হবে?
ধর্মের পরিচয় এবং গুরুত্ব জানার পর স্বভাবতই প্রশ্ন জাগতে পারে যে, ধর্ম যখন এতই উপকারী এবং আবশ্যকীয় বিষয় তাহলে সেটাতো হতে পারে যে কোনো ধর্মই! কারণ সকল ধর্মই তো সত্য ও ন্যায়ের কথা বলে!
এই প্রশ্নের জবাবে আমরা বলবো– ‘‘সকল ধর্মই সত্য ও ন্যায়ের কথা বলে"— কথাটি বাহ্যত শুনতে সত্য এবং মানবতাবাদী মনে হলেও, ইসলামের মৌলিক আকিদা ও কুরআন-সুন্নাহর মানদণ্ডে এই বক্তব্য পূর্ণাঙ্গ সত্য নয়। বরং বাস্তবতার সাথে তার আংশিক মিল এবং অধিকাংশই অমিল রয়েছে। তার কায়েকটি দিক তুলে ধরা হচ্ছে
১. নৈতিক শিক্ষার আংশিক মিল
ইসলামের দৃষ্টিতে মানবজাতির সূচনালগ্ন থেকেই আল্লাহ তাআলা বিভিন্ন যুগে যুগে অসংখ্য নবী-রাসূল পাঠিয়েছেন এবং তাঁদের ওপর ঐশী গ্রন্থাবলি অবতীর্ণ করেছেন। এগুলোর মূল উদ্দেশ্য ছিল একত্ববাদের প্রচার এবং সত্য ও ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা, আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আনুগত্য এবং সচ্চরিত্রের চর্চা। এই অর্থে নৈতিকতার দিক থেকে পূর্ববর্তী নবী-রাসূলদের আনীত মৌলিক সত্য ও ন্যায়ের কথার সাথে মিল থাকা স্বাভাবিক।
২. ধর্মে বিকৃতি ও অর্ধমীয় মতবাদ
কিন্তু পরবর্তী সময়ে মানুষের হস্তক্ষেপ, বিকৃতি এবং কালক্রমে বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী সমাজ পৌত্তলিকতা বা শিরক-এ লিপ্ত হওয়ার ফলে ধর্মের আদি ও ঐশী রূপ হারিয়ে সেগুলো বহুশ্বরবাদী এবং কুসংস্কারাচ্ছন্নে নিপতিত হয়েছে। ফলে ধর্মের মূল দাবি লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু— আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নাই— এই শ্বাশত বাণী বিলুপ্ত হয়ে গেছে। ধর্মের পরিবর্তে সেগুলো বিভিন্ন ব্যক্তি বা শ্রেণি-গোষ্ঠীর মতাবাদ হিসেবে গণ্য হয়েছে। কাজেই সেগুলোকে ধর্ম বলা চলে না। অধিকন্তু প্রচলিত অর্থে ধর্ম বললেও ‘‘সকল ধর্মই সত্য ও ন্যায়ের কথা বলে’’ এই বক্তব্যকে সম্পূর্ণ ‘সত্য’ হিসেবে গ্রহণ করার কোনো অবকাশ নেই।
৩. চূড়ান্ত ও পূর্ণাঙ্গ দ্বীন হিসেবে ইসলাম
পবিত্র কুরআনের ঘোষণা অনুযায়ী, আল্লাহ তাআলা সর্বশেষ ও চূড়ান্ত নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর মাধ্যমে মানবজাতিকে সম্পূর্ণ ও পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান বা ধর্ম দান করেছেন। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেছেন,
اِنَّ الدِّیۡنَ عِنۡدَ اللّٰہِ الۡاِسۡلَامُ
“নিশ্চয়ই আল্লাহর নিকট একমাত্র মনোনীত ধর্ম হলো ইসলাম” (সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৯)
وَمَن يَبْتَغِ غَيْرَ الْإِسْلَامِ دِينًا فَلَن يُقْبَلَ مِنْهُ وَهُوَ فِي الْآخِرَةِ مِنَ الْخَاسِرِينَ
যে ব্যক্তিই ইসলাম ছাড়া অন্য কোনও দীন অবলম্বন করতে চাবে, তার থেকে সে দীন কবুল করা হবে না এবং আখিরাতে সে মহা ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে।- সুরা আলে ইমরান: ৮৫।
সংক্ষিপ্তসার:
পূর্ববর্তী ধর্মগুলোর আদি শিক্ষা এবং ইসলামের ন্যায় ও নৈতিকতার ক্ষেত্রে কিছু মিল থাকলেও, কালক্রমে পূর্ববর্তী ধর্মগুলো বিকৃত হওয়া ও ইসলামকে সর্বশেষ চূড়ান্ত বিধান হিসেবে ঘোষণা করায় শরঈ দৃষ্টিকোণ থেকে অন্যান্য সকল ধর্মকে সার্বিকভাবে ‘সত্য’ হিসেবে মেনে নেওয়া যায় না। একজন মুসলিমের বিশ্বাস হলো, ইসলামই একমাত্র আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য ও অপরিবর্তিত সত্য।
ইসলাম ধর্মের শ্রেষ্ঠত্বের কারণ
শুরুতেই আলোকপাত করা হয়েছে যে, ইসলামিক দৃষ্টিকোণ থেকে, আল্লাহ তা'আলা মানবজাতিকে সৃষ্টি করেছেন কেবল তাঁর ইবাদত ও আনুগত্য করার জন্য। ইসলাম শব্দের আক্ষরিক অর্থ আল্লাহর কাছে পূর্ণাঙ্গ আত্মসমর্পণ করা। কাজেই ইসলাম ছাড়া অন্য কোনো ধর্মমত, মতবাদ গ্রহনযোগ্য নয়। তার প্রধান কারণগুলো হলো:
একমাত্র মনোনীত ধর্ম: ইসলাম কোনো ব্যক্তির তৈরি করা ধর্ম নয়, বরং এটি সমগ্র সৃষ্টির একক স্রষ্টা আল্লাহর পক্ষ থেকে মানবজাতির জন্য প্রেরিত সর্বশেষ ও পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ ঘোষণা করেছেন: "নিশ্চয়ই আল্লাহর নিকট একমাত্র মনোনীত ধর্ম হলো ইসলাম।
পূর্ববর্তী ধর্মের চূড়ান্ত রূপ: আল্লাহ যুগে যুগে অনেক নবী ও রাসূল (যেমন- মূসা, ঈসা, ইব্রাহিম আ.) পাঠিয়েছেন এবং তাঁদের ওপর ঐশী গ্রন্থ অবতীর্ণ করেছেন। মুহাম্মদ (সা.)-এর মাধ্যমে সেই ধর্মকেই পূর্ণতা দান করা হয়েছে, যা মানব ইতিহাসের শেষ দিন পর্যন্ত প্রযোজ্য।
বিধানের অপরিবর্তনীয়তা: পূর্ববর্তী ধর্মগ্রন্থগুলোর মূল বাণী মানুষের হস্তক্ষেপে কালক্রমে পরিবর্তিত বা বিকৃত হয়ে গেছে। পক্ষান্তরে, আল্লাহর সরাসরি তত্ত্বাবধানে পবিত্র কোরআন অবিকৃত রয়েছে।
যৌক্তিকতা ও ভারসাম্য: ইসলাম ধর্মের মূল ভিত্তি হলো তাওহীদ বা আল্লাহর একত্ববাদ। এটি স্রষ্টা ও সৃষ্টির মধ্যে কোনো মধ্যস্থতাকারী ছাড়াই সরাসরি সম্পর্কের শিক্ষা দেয়, যা মানুষের সহজাত স্বভাবের (ফিতরাত) সাথে সম্পূর্ণ সামঞ্জস্যপূর্ণ।
ইহকাল ও পরকালের সফলতা: ইসলাম শুধু ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের সমষ্টি নয়, বরং এটি পার্থিব জীবনের সকল ক্ষেত্রে (ব্যক্তিগত, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাষ্ট্রীয়) সঠিক নির্দেশনা প্রদান করে। এই বিধান মেনে চললে ইহকালীন জীবনে মানসিক প্রশান্তি এবং পরকালে চিরস্থায়ী মুক্তি ও জান্নাত লাভ করা সম্ভব।
ইসলাম ধর্মের সাথে অন্যান্য ধর্মের পার্থক্য
ইসলাম ধর্মের সাথে অন্যান্য ধর্মের মূল পার্থক্য মূলত এর একেশ্বরবাদের (তৌহিদ) কঠোরতা, ঐশ্বরিক গ্রন্থ সংরক্ষণ, এবং জীবনব্যবস্থা হিসেবে সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গির ওপর প্রতিষ্ঠিত।
অন্যান্য প্রধান ধর্মের সাথে ইসলামের মৌলিক পার্থক্যগুলো নিচে দেওয়া হলো:
একেশ্বরবাদ বনাম বহুত্ববাদ: ইসলামের বিশ্বাস হলো, 'আল্লাহ' একক ও অদ্বিতীয়, তাঁর কোনো শরিক বা অংশীদার নেই। পক্ষান্তরে, হিন্দুধর্মসহ বহু ধর্মে বহুঈশ্বরবাদ বা একাধিক দেব-দেবী ও অবতারের ধারণা রয়েছে। আবার খ্রিস্টধর্মে ত্রিত্ববাদ বা পিতা, পুত্র ও পবিত্র আত্মার ধারণা পাওয়া যায়, যা ইসলামের মূল বিশ্বাসের সম্পূর্ণ বিপরীত।
আল্লাহর সাথে সরাসরি সম্পর্ক: ইসলামে বান্দা ও আল্লাহর মধ্যে কোনো মধ্যস্থতাকারী (যেমন: পুরোহিত, যাজক বা পোপ) নেই। যেকোনো মুসলিম সরাসরি আল্লাহর কাছে ক্ষমা ও সাহায্য চাইতে পারে। পক্ষান্তরে খ্রিস্টধর্মে পোপ বা যাজকের কাছে পাপ স্বীকারের বিধান রয়েছে।
নবী-রাসূলদের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি: ইসলাম ধর্মে হযরত মুহাম্মদ (সা.)-কে সর্বশেষ ও চূড়ান্ত নবী এবং আল্লাহর প্রেরিত পুরুষ হিসেবে গণ্য করা হয়। অন্য অনেক ধর্মে বিশেষ কোনো মহামানবকে ঈশ্বরের পুত্র (যেমন: যিশু খ্রিস্ট) অথবা অবতার হিসেবে গণ্য করা হয়।
ধর্মগ্রন্থের বিশুদ্ধতা ও সংরক্ষণ: ইসলামের প্রধান ধর্মগ্রন্থ 'কুরআন' অবিকৃত এবং এটি সরাসরি আল্লাহর বাণী। অন্যদিকে, অধিকাংশ পূর্ববর্তী ধর্মগ্রন্থগুলো কালের বিবর্তনে মানুষের হস্তক্ষেপ ও পরিবর্তনের শিকার হয়েছে ।
একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা: ইসলাম শুধু উপাসনা বা আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি ব্যক্তিগত জীবন, সমাজ, অর্থনীতি, রাজনীতি এবং রাষ্ট্র পরিচালনার একটি পূর্ণাঙ্গ ও বিস্তারিত নিয়মকানুন (শরীয়াহ) প্রদান করে।
কর্মফল ও পরকাল: ইসলামে মৃত্যুর পর বিচারদিবস ও পরকালীন জীবনে (জান্নাত বা জাহান্নাম) বিশ্বাস অত্যন্ত জোরালো। পক্ষান্তরে, বৌদ্ধ ও হিন্দুধর্মে কর্মফল ও পুনর্জন্মের ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়।
ধর্ম (ইসলাম) পালনের সীমারেখা এবং উদ্দেশ্য:
যেহেতু ইসলাম একটি সর্বকালীন এবং সার্বজনীন ধর্ম। দুনিয়ার সফলতা এবং আখেরাতের মুক্তি কেবল এর ওপরই নির্ভরশীল। কাজেই প্রতিটি মানুষের ওপর আবশ্যকীয় কর্তব্য হলো, জীবনের সকল ক্ষেত্রে আল্লাহ তায়ালার বিধান বাস্তবায়ন করা। তার হুকুম মতো জীবন পরিচালনা করা। এক্ষেত্রে সে যেমনিভাবে নিজের ওপর দায়িত্বপ্রাপ্ত তেমনিভাবে পরিবারের অন্যান্য সদস্য এবং তার অধিনস্তদেরও ওপর দায়িত্বশীল। হাশরের ময়দানে তাকে তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হবে।
প্রকৃত ধার্মিক সেই যে শরীয়তের সকল নির্দেশনা বাস্তবায়ন করে এবং সকল নিষেধাজ্ঞা মেনে চলে। যে যতটুকু শরীয়তের আদেশনিষেধ মেনে চলবে আল্লাহ তায়ালার কাছে সে ততটুকুই ধার্মিক, আল্লাহ ভীরু ও অনুগত বান্দা হিসেবে বিবেচিত হবেন। কেননা আল্লাহ তায়ালা সূরা বাকারাহ এর ২০৮ নয় আয়াতে নির্দেশ দিয়েছেন
یٰۤاَیُّہَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوا ادۡخُلُوۡا فِی السِّلۡمِ کَآفَّۃً ۪ وَلَا تَتَّبِعُوۡا خُطُوٰتِ الشَّیۡطٰنِ ؕ اِنَّہٗ لَکُمۡ عَدُوٌّ مُّبِیۡنٌ
অর্থঃ হে মুমিনগণ! তোমরা ইসলামে সম্পূর্ণরূপে প্রবেশ কর এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না। নিশ্চয়ই সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু।
ইসলামের পূর্ণ অনুসরণ কি বাড়াবাড়ি?
প্রকৃত ধর্মপালনকারীদের দোষারোপ করার প্রবণতা সকল যুগে, সকল সমাজেই লক্ষ করা যায়। বিভিন্ন নামে, বিভিন্ন শব্দে তাদের ট্যাগিং করার প্রবণতা বহু প্রাচীন। প্রকৃত দ্বীনের অনুসারীদের ধর্মান্ধ অথবা মৌলবাদী বলে গালি দেওয়া ধর্মদ্রোহী শ্রেণির নিত্যকর্ম। মূলত অজ্ঞতা, ব্যক্তিগত বিদ্বেষ বা নীতিভ্রষ্টতার বহিঃপ্রকাশের ফলেই এগুলো সৃষ্টি হয়ে থাকে। তা না হলে ইসলামের মূল ভিত্তি হলো, আল্লাহ তায়ালার একত্ববাদ, নবী সা. এর সুন্নাহের অনুসরণ এবং মানবতার কল্যাণ। প্রকৃত ধর্মচর্চা মানুষকে আরও নম্র, দয়ালু এবং পরোপকারী করে তোলে। ধর্মের প্রকৃত শিক্ষা আঁকড়ে থাকা মোটেও বাড়াবাড়ি নয়। বরং এটা আল্লাহ তায়ালারই নির্দেশ। ইরশাদ হচ্ছে وَاعۡتَصِمُوۡا بِحَبۡلِ اللّٰہِ جَمِیۡعًا وَّلَا تَفَرَّقُوۡا ۪ অর্থ : তোমরা আল্লাহর রশিকে (অর্থাৎ তাঁর দীন ও কিতাবকে) দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরে রাখ এবং পরস্পরে বিভেদ করো না। (সূরা আলে ইমরান, আয়াত নং ১০৩)।
https://muslimbangla.com/sura/3/tafsir/103
ধর্মের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করা হারাম।
আল্লাহ তায়ালা সূরা নিসা এর ১৭১ নং আয়াতে ইরশাদ করেন,
یٰۤاَہۡلَ الۡکِتٰبِ لَا تَغۡلُوۡا فِیۡ دِیۡنِکُمۡ وَلَا تَقُوۡلُوۡا عَلَی اللّٰہِ اِلَّا الۡحَقَّ ؕ اِنَّمَا الۡمَسِیۡحُ عِیۡسَی ابۡنُ مَرۡیَمَ رَسُوۡلُ اللّٰہِ وَکَلِمَتُہٗ ۚ اَلۡقٰہَاۤ اِلٰی مَرۡیَمَ وَرُوۡحٌ مِّنۡہُ ۫ فَاٰمِنُوۡا بِاللّٰہِ وَرُسُلِہٖ ۚ۟ وَلَا تَقُوۡلُوۡا ثَلٰثَۃٌ ؕ اِنۡتَہُوۡا خَیۡرًا لَّکُمۡ ؕ اِنَّمَا اللّٰہُ اِلٰہٌ وَّاحِدٌ ؕ سُبۡحٰنَہٗۤ اَنۡ یَّکُوۡنَ لَہٗ وَلَدٌ ۘ لَہٗ مَا فِی السَّمٰوٰتِ وَمَا فِی الۡاَرۡضِ ؕ وَکَفٰی بِاللّٰہِ وَکِیۡلًا ٪
অর্থঃ হে কিতাবীগণ! নিজেদের দীনে সীমালংঘন করো না এবং আল্লাহ সম্পর্কে সত্য ছাড়া অন্য কথা বলো না। মারয়ামের পুত্র ঈসা মাসীহ তো আল্লাহর রাসূল মাত্র এবং আল্লাহর এক কালিমা, যা তিনি মারয়ামের কাছে পাঠিয়েছিলেন। আর ছিলেন এক রূহ, যা তাঁরই পক্ষ হতে (সৃষ্টি হয়ে) ছিল। সুতরাং তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলগণের প্রতি ঈমান আন এবং বলো না (আল্লাহ) ‘তিন’। এর থেকে নিবৃত্ত হও। এরই মধ্যে তোমাদের কল্যাণ। আল্লাহ তো একই মাবুদ। তাঁর কোনও পুত্র থাকবে এর থেকে তিনি সম্পূর্ণ পবিত্র। আকাশমণ্ডল ও পৃথিবীতে যা-কিছু আছে, তা তাঁরই। (সকলের) তত্ত্বাবধানের জন্য আল্লাহই যথেষ্ট।
আয়াতের লিংকঃ https://muslimbangla.com/sura/4/tafsir/171
আয়াতের প্রেক্ষাপট:
ওপরোক্ত আয়তে আল্লাহ তায়ালা ইহুদী-নাসারাদের ধর্মের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করতে নিষেধ করেছেন। غلو শব্দের অর্থ সীমা ছাড়িয়ে যাওয়া। ইমাম জাস্সাস ’আহকামুল-কোরআন’-এ লিখেছেন- الغلو في الدين هو مجاوزة حد الحق فيه অর্থাৎ ধর্মের ব্যাপারে غلو (বাড়াবাড়ি) করার অর্থ তার ন্যায়সঙ্গত সীমারেখা অতিক্রম করা!
আহলে-কিতাব অর্থাৎ ইহুদী ও খৃস্টান—উভয় জাতিকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যে, ধর্মের ব্যাপারে কোনরূপ বাড়াবাড়ি করো না। কারণ, এ বাড়াবাড়ির রোগে উভয় জাতিই আক্রান্ত হয়েছে। খৃস্টানরা হযরত ঈসা (আ)-কে ভক্তি, শ্রদ্ধা ও সম্মান প্রদর্শনের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করেছে । তাঁকে স্বয়ং খোদা, খোদার পুত্র অথবা তিনের এক খোদা বানিয়ে দিয়েছে। অপর দিকে ইহুদীরা তাকে অমান্য ও প্রত্যাখ্যান করার দিক দিয়ে বাড়াবাড়ির শিকার হয়েছে। তারা হযরত ঈসা (আ)-কে আল্লাহর নবী হিসাবে স্বীকার করেনি, বরং তাঁর মাতা হযরত মরিয়ম (আ)-এর উপর (নাউযুবিল্লাহ্ মিন যালিকা) মারাত্মক অপবাদ আরোপ করেছে এবং তাঁর নিন্দা করেছে।
ধর্মের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি ও সীমালঙ্ঘনের কারণে ইহুদী ও খৃষ্টানদের গোমরাহী ও ধ্বংস হওয়ার শোচনীয় পরিণতি বারবার প্রত্যক্ষ হয়েছে, তাই হযরত রাসূলে করীম (সা) তাঁর প্রিয় উম্মতকে এ ব্যাপারে সংযত থাকার জন্য সতর্ক করেছেন। মসনদে আহমদে হযরত ফারুকে আযম (রা) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) ইরশাদ করেছেনঃ
لاتطروني كما اطرت النصـاری عیسی إبـن مـريـم فـانـمـا انـا عـبـد فقولوا عبد الله ورسوله
অর্থাৎ ’তোমরা আমার প্রশংসা করতে গিয়ে এমন অতিরঞ্জিত করো না, যেমন খৃস্টানরা হযরত ঈসা ইবনে মরিয়ম (আ)-এর ব্যাপারে করেছে। খুব স্মরণ রাখবে যে, আমি আল্লাহর পূর্ণ বান্দা। অতএব, আমাকে আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রাসূল বলবে।’ বোখারী ও ইবনে মাদয়িনী এ হাদীস উল্লেখ করে এর সন্দকে সহীহ্ বলেছেন।
সারকথা, আল্লাহর বান্দা ও মানুষ হিসাবে আমিও অন্য লোকদের সমপর্যায়ের। তবে আমার সবচেয়ে বড় মর্যাদা এই যে, আমি আল্লাহর রাসূল। এর চেয়ে অগ্রসর করে আমাকে আল্লাহ্ তা’আলার কোন বিশেষণে বিভূষিত করা বাড়াবাড়ি বৈ নয়। তোমরা ইহুদী-নাসারাদের মত বাড়াবাড়ি করো না। বস্তুত ইহুদী-খৃষ্টানরা শুধু নবীদের ব্যাপারেই বাড়াবাড়ি করে ক্ষান্ত হয়নি বরং এটা যখন তাদের স্বভাবে পরিণত হলো, তখন তারা নবীদের সহচর অনুগামীদের ব্যাপারেও অতিরঞ্জিত সব গুণ আরোপ করেছিল, পাদ্রী-পুরোহিতদেরও তারা নিষ্পাপ মনে করতো। অতঃপর এতটুকু যাচাই করাও প্রয়োজন মনে করতো না যে, তারা সত্যিকারভাবে নবীদের অনুগত এবং তাঁদের শিক্ষার অনুসারী, না শুধু উত্তরাধিকারসূত্রে পণ্ডিত-পুরোহিতরূপে পরিগণিত হন। ফলে পরবর্তীকালে তাদের নেতৃত্ব ও কর্তৃত্ব এমন পাদ্রী-পুরোহিতদের কুক্ষিগত হয়েছে যারা নিজেরা স্বার্থপর ও পথভ্রষ্ট ছিল এবং অনুসারীদেরকে চরম বিভ্রান্তি গোমরাহীর আবর্তে নিক্ষেপ করেছে। ধর্মকর্মের নামে তারা অধর্ম অনাচারে লিপ্ত হয়েছে। কোরআন পাক ঘোষণা করছে— اتَّخَذُوا أَحْبَارَهُمْ وَرُهْبَانَهُمْ أَرْبَابًا مِنْ دُونِ اللَّهِ —অর্থাৎ “তারা আল্লাহ্কে ছেড়ে তাদের ধর্মীয় পণ্ডিত ও সন্ন্যাসীদের মা’বুদের আসনে বসিয়েছিল।” রাসূলকে তো খোদা বানিয়েছিলই, রাসূলের প্রতি ভক্তি-শ্রদ্ধার নামে পূর্ববর্তী নবীদেরও পূজা করা শুরু করেছিল ।
https://masail.muslimbangla.com/masail/11299
এর থেকে বোঝা যায় যে, ধর্মের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করা এমন এক মারাত্মক ব্যাধি, যা ধর্মের নামেই পূর্ববর্তী ধর্মসমূহের সত্যিকার রূপরেখাকে বিলীন করেছে। তাই আমাদের প্রিয়নবী (সা) স্বীয় উম্মতকে এহেন ভয়াবহ মহামারীর কবল থেকে রক্ষা করার জন্য পূর্ণ সতর্কতা ও নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন।
সুনান ইবনে মাযাহ এর ৩০২৯ হাদিসে হযরত ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন, যে
قَالَ رَسُولُ اللَّهِ ـ صلى الله عليه وسلم ـ غَدَاةَ الْعَقَبَةِ وَهُوَ عَلَى نَاقَتِهِ " الْقُطْ لِي حَصًى " . فَلَقَطْتُ لَهُ سَبْعَ حَصَيَاتٍ هُنَّ حَصَى الْخَذْفِ فَجَعَلَ يَنْفُضُهُنَّ فِي كَفِّهِ وَيَقُولُ " أَمْثَالَ هَؤُلاَءِ فَارْمُوا " . ثُمَّ قَالَ " يَا أَيُّهَا النَّاسُ إِيَّاكُمْ وَالْغُلُوَّ فِي الدِّينِ فَإِنَّمَا أَهْلَكَ مَنْ كَانَ قَبْلَكُمُ الْغُلُوُّ فِي الدِّينِ " .
রাসূলুল্লাহ্ (ﷺ) জামরাতুল আকাবার ভোরে উষ্ট্রীর পিঠে আরোহণ করা অবস্থায় বলেনঃ আমার জন্য কংকর সংগ্রহ করে লও। আমি তাঁর জন্য সাতটি কংকর সংগ্রহ করলাম। তা ছিল সাইজে ছোট। তিনি তা নিজের হাতের তালুতে নাড়াচাড়া করতে করতে বললেনঃ তোমরা এই সাইজের কংকর নিক্ষেপ করবে। এরপর তিনি বললেনঃ হে লোক সকল! দ্বীনের বিষয়ে বাড়াবাড়ি করা থেকে তোমরা সাবধান থাকবে। কেননা, তোমাদের পূর্বেকার লোকদের দ্বীনের ব্যাপারের বাড়াবাড়ি, ধ্বংস করে দিয়েছে। (সুনানে ইবনে মাযাহ হাদিস নং ৩০২৯)
https://muslimbangla.com/hadith/28320
উক্ত হাদিসের ব্যাখ্যার বিভিন্ন দিক থাকলেও এখানে মূল পয়েন্ট হলো, إياكم والغلو في الدين فإنما هلك من قبلكم بالغلو في دينهم অর্থাৎ ধর্মের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করা থেকে দূরে থেকো। কেননা তোমাদের পূর্ববর্তী উম্মতসমূহ তাদের ধর্মের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করার কারণেই ধ্বংস হয়েছে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় লক্ষণীয়। সেটা হলো, রমীয়ে জামারাহ্ অর্থাৎ কংকর নিক্ষেপের উপরিউল্লিখিত প্রেক্ষাপটে রাসূলুল্লাহ্ (সা) إياكم والغلو في الدين فإنما هلك من قبلكم بالغلو في دينه এর প্রসঙ্গ টেনে আনলেন কেন? এর উত্তরে মুহাদ্দিসগণ বলেন, রাসূলুল্লাহ সা. জামারায় ছোট ছোট পাথর নিক্ষেপের নির্দেশ এজন্য দিয়েছেন যেন কেউ মনে না করে যে, বড় পাথর মারলে শয়তান বেশি আঘাত পাবে বা বেশি সওয়াব হবে। নবীজী ﷺ এই ভ্রান্ত ধারণা ভেঙে দিয়েছেন। তিনি বুঝিয়ে দিলেন, হজের এই আমলটি একটি প্রতীকী ইবাদত এবং আল্লাহর আদেশের আনুগত্য মাত্র।
আল্লাহ তায়ালা দেড় হাজার বছর আগে নবী সা. কে যেই বিষয়টি জানিয়ে দিয়েছেন সময়ের বাস্তবতায় বিষয়টি আমাদের কাছেও স্পষ্ট। কিছু বছর আগেও আমরা দেখেছি যে, মানুষ জামারায় শয়তান আছে মনে করে সাথে যা থাকতো, জুতা, ছাতা, ছড়ি পানির বোতল ইত্যাদি ছুড়ে মারতো। সৌদি সরকারের কড়াকড়ির ফলে এগুলো অনেক কমেছে।
যাই হোক। মূল কথা হলো শরীয়তে যা নেই তাকে শরীয়তের অংশ মনে করা শরীয়তের মধ্যে বাড়াবাড়ির শামিল। এজন্য কুরআন সুন্নাহে বিষয়টির ব্যাপারে সতর্ক করা হয়েছে। মধ্যপন্থা ও পরিমিতিবোধের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সাবধান করা হয়েছে যাতে কেউ এ ব্যাপারে বাড়াবাড়ি ও শিথিলতা- এ দুই প্রান্তিকতার কোনওটারই শিকার না হয়। যেমন ইরশাদ হয়েছে, (তরজমা) তুমি নিজের নামায বেশি উঁচু স্বরে পড়বে না এবং অতি নিচু স্বরেও না। বরং উভয়ের মাঝামাঝি পন্থা অবলম্বন করবে (বনী ইসরাঈল : ১১০)।
ধর্মীয় বিষয়ে বাড়াবাড়ির কুফল:
ধর্মীয় বিষয়ে বাড়াবাড়ির বহুবিধ কুফল রয়েছে। তন্মধ্যে অন্যতম হলো, বিশ্বাস ও চিন্তাগত বাড়াবাড়ি। এর ফলে মানুষের মাঝে গোমরাহী তৈরি হয়। এবং অনেক সময় তা মানুষকে ইবাদতের প্রতি নিরুৎসাহীও করে তোলে। আর কর্মগত বাড়াবাড়ির সবচেয়ে বড় ক্ষতি হল তা ইবাদতের স্থায়িত্ব ও নিরবচ্ছিন্নতা নষ্ট করে দেয়। কেননা ইবাদতে মাত্রাজ্ঞান হারালে ক্লান্তি ও অবসাদ অনিবার্য হয়ে পড়ে, যার পরিণাম ইবাদতকে বিদায় জানানো।
সহিহুল বুখারীর ৩৯ নং হাদিসে নবী সা. ইরশাদ করেন,
" إِنَّ الدِّينَ يُسْرٌ، وَلَنْ يُشَادَّ الدِّينَ أَحَدٌ إِلاَّ غَلَبَهُ، فَسَدِّدُوا وَقَارِبُوا وَأَبْشِرُوا، وَاسْتَعِينُوا بِالْغَدْوَةِ وَالرَّوْحَةِ وَشَىْءٍ مِنَ الدُّلْجَةِ ".
অর্থ: নিশ্চয়ই দ্বীন সহজ-সরল। দ্বীন নিয়ে যে কড়াকড়ি/বাড়াবাড়ি করে দ্বীন তার উপর বিজয়ী হয়। কাজেই তোমরা মধ্যপন্থা অবলম্বন কর এবং (মধ্যপন্থার) নিকটবর্তী থাক, আশান্বিত থাক এবং সকাল-সন্ধ্যায় ও রাতের কিছু অংশে (ইবাদতের মাধ্যমে) সাহায্য চাও। (সহিহুল বুখারী হাদিস নং ৩৮ অন্তর্জাতিক হাদিস নংঃ ৩৯) https://muslimbangla.com/hadith/38
ধর্মের নামে বাড়াবাড়ি করার অর্থ হলো, নিজের ওপর কিংবা অন্যের ওপর এমন কঠিন ইবাদত বা শরঈ কঠোরতা চাপিয়ে দেওয়া যা ইসলাম শেখায়নি এবং পালন করা অসম্ভব। ইসলাম এটাকে পছন্দ করে না। বরং এটা ইসলামের নীতি-নৈতিকতা পরিপন্থি। এটা যেমনিভাবে নিন্দনীয় তেমনিভাবে ধর্মের প্রতি অবহেলা করা, ফরয-ওয়াজিব ত্যাগ করা বা শরীয়তের বিধিবিধানকে ইচ্ছাকৃতভাবে হালকা মনে করাও নিন্দনীয়। উভয়টিই বাড়াবাড়ি এবং ছাড়াছাড়ি। কোনোটিই মধ্যপন্থা নয়।
তাওহিদের প্রকৃত শিক্ষা বনাম বাড়াবাড়ি
একত্ববাদে বিশ্বাস: তাওহিদের মূল কথা হলো একমাত্র আল্লাহকে সৃষ্টিকর্তা, পালনকর্তা এবং ইবাদতের যোগ্য হিসেবে মনে-প্রাণে বিশ্বাস করা।
মধ্যপন্থা অবলম্বন: আল্লাহর গুণাবলিকে যেভাবে কোরআন ও হাদিসে বর্ণনা করা হয়েছে, কোনো রকম বিকৃতি বা অতি-ব্যাখ্যা ছাড়াই তা বিশ্বাস করা।
সহজ সরল ইবাদত: ইবাদত ও দোয়ার ক্ষেত্রে কোনো মাধ্যম ছাড়া সরাসরি আল্লাহর কাছে সাহায্য চাওয়া।
উদার মনোভাব: কোনো মুসলিম ভাই কোনো বিষয়ে ভুল করলে তাকে সরাসরি কাফের ফতোয়া না দিয়ে সংশোধনের চেষ্টা করা।
তাওহিদের ক্ষেত্রে বাড়াবাড়ির রূপ
অন্ধ চরমপন্থা: ছোটখাটো বা অনিচ্ছাকৃত ভুলের জন্য অন্য মুসলিমদের ঢালাওভাবে 'কাফের' বা 'মুশরিক' বলে ঘোষণা করা (তাকফিরি মানসিকতা)।
আল্লাহর গুণের অতি-মানবিকীকরণ: আল্লাহর গুণাবলিকে মানুষের গুণের সাথে তুলনা করা বা তার অবয়ব নিয়ে অতিরিক্ত বিতর্ক সৃষ্টি করা।
সীমালঙ্ঘন: নবী, রাসুল বা অলি-আউলিয়াদের প্রতি ভালোবাসার নামে তাঁদের আল্লাহর সমকক্ষ বা অতি-মানবিক ক্ষমতার অধিকারী মনে করা।
আমুসলিমদের সাথে আচরণে ইসলামের শিক্ষা বনাম বাড়াবাড়ি:
সহিহুল বুখারীর , ১২৩৩ নং হাদীসে জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,
مَرَّ بِنَا جَنَازَةٌ، فَقَامَ لَهَا النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَقُمْنَا بِهِ، فَقُلْنَا: يَا رَسُولَ اللَّهِ إِنَّهَا جِنَازَةُ يَهُودِيٍّ، قَالَ: «إِذَا رَأَيْتُمُ الجِنَازَةَ، فَقُومُوا»
আমাদের পাশ দিয়ে একটি জানাযা যাচ্ছিল। নবী (ﷺ) তা দেখে দাঁড়িয়ে গেলেন। আমরাও দাঁড়িয়ে পড়লাম এবং আরয করলাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! এ তো এক ইয়াহুদীর জানাযা। তিনি বললেনঃ তোমরা যে কোন জানাযা দেখলে দাঁড়িয়ে পড়বে।’’
পবিত্র কোরআন ও হাদিস অনুযায়ী, যারা মুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেনি এবং ঘর থেকে বের করে দেয়নি, তাদের সাথে সদাচরণ ও ন্যায়বিচার করতে আল্লাহ তাআলা নির্দেশ দিয়েছেন।
পক্ষান্তরে অন্য ধর্মের মানুষের উপাসনালয় (যেমন: মন্দির, গির্জা, প্যাগোডা) জোরপূর্বক দখল করা, আগুন দেওয়া বা প্রার্থনায় বাধা প্রদান করা অত্যন্ত নিন্দনীয় বাড়াবাড়ির উদাহরণ।
বাড়াবাড়ির আরো কয়েকটি দিক:
উপহাস ও অবমাননা: বিধর্মীদের দেব-দেবী, অবতার বা ধর্মীয় নেতাদের নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বা প্রকাশ্যে কটূক্তি করা ও ব্যঙ্গাত্মক চিত্র প্রচার করা। এটি অমুসলিমদের মনে গভীর আঘাত দেয় এবং সমাজে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট করে।
জোরপূর্বক ধর্মান্তরকরণ: বলপ্রয়োগ, ভীতি প্রদর্শন বা প্রলোভনের মাধ্যমে কোনো অমুসলিমকে তার ধর্ম পরিবর্তন করতে বাধ্য করা। ইসলাম ধর্মেও দ্বীনের ব্যাপারে কোনো জবরদস্তি নেই বলে সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে।
সম্পত্তি বা অধিকার হরণ: নিছক ধর্মীয় ইস্যুকে কেন্দ্র করে পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে কোনো বিধর্মী ব্যক্তির সহায়-সম্পত্তি, জমিজমা দখল করা বা তাদের নাগরিক অধিকার হরণ করা।
ধর্মীয় উৎসবে বাধা দেওয়া: অমুসলিমদের নিজস্ব ধর্মীয় উৎসব (যেমন: দুর্গোৎসর্গ, বড়দিন ইত্যাদি) পালনে অহেতুক হুমকি দেওয়া, বাধা সৃষ্টি করা বা বিশৃঙ্খলা তৈরি করা। তবে যদি তাদের কোনো কার্যকলাপের ফলে ইসলাম ধর্মের ক্ষতি সাধণ হয় তাহলে সেটা স্থানীয় কিংবা জাতীয় পর্যায়ে পারস্পরিক আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করে নিতে হবে।
আল্লাহ তায়ালা আমাদের ইসলামের মধ্যমপন্থ এবং পরিমিতিবোধকে ধারণ করার তাওফিক দান করুন। আমিন।
মন্তব্য (...)
এ সম্পর্কিত আরও প্রবন্ধ
স্রষ্টা ও তাঁর অস্তিত্ব
...
ঈমানের মূল ভিত্তি ইসলামী আকায়েদ
...
শরীয়তের উপর অবিচলতা
...
শান্তি সম্প্রীতি ও উদারতার ধর্ম ইসলাম
নামে যার শান্তির আশ্বাস তার ব্যাপারে আর যাই হোক, সন্ত্রাসের অপবাদ দেয়ার আগে তার স্বরূপ উদঘাটনে দু'দণ...
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন