প্রবন্ধ
দীন প্রচারে নারী সাহাবি
১ অক্টোবর, ২০২৬
৭৬৬
০
بسم الله الرحمن الرحيم.
الحمد لله رب العالمين والصلاة والسلام على سيد المرسلين وعلى آله وصحبه أجمعين, أما بعد!
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَٱلْمُؤْمِنُونَ وَٱلْمُؤْمِنَاتِ بَعْضُهُمْ أَوْلِيَآءُ بَعْضٍ يَأْمُرُونَ بِٱلْمَعْرُوفِ وَيَنْهَوْنَ عَنِ ٱلْمُنْكَرِ وَيُقِيمُونَ ٱلصَّلواَةَ وَيُؤْتُونَ ٱلزَّكَواةَ وَيُطِيعُونَ ٱللَّهَ وَرَسُولَهُ أُوْلَـٰئِكَ سَيَرْحَمُهُمُ ٱللَّهُ إِنَّ ٱللَّهَ عَزِيزٌ حَكِيمٌ
তরজমাঃ “ঈমানদার পুরুষ ও নারীগন একে অপরের সাহায্যকারী ও বন্ধু। তারা সৎ ও পুন্যময় কাজের নির্দেশ দেয় এবং অন্যায় ও পাপ কাজ হতে মানুষকে বিরত রাখে। আর নামায কায়েম করে ও জাকাত আদায় করে এবং আল্লাহর আনুগত্য করে। তাদের প্রতি আল্লাহ অবশ্যই অনুগ্রহ করেন। নিঃসন্দেহে আল্লাহ তাআলা মহা পরাক্রমশালী ও মহা বিজ্ঞানী।” (সুরা তাওবাঃ ৭১)
যুগ যুগ ধরে পৃথিবীর বিভিন্ন ধর্ম ও সভ্যতায় নারী জাতি নানাভাবে উপেক্ষিত, নিগৃহীত ও লাঞ্ছিত হয়ে এসেছে। পুরুষরা নারীকে বাদ দিয়ে তাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে ও বাস্তবায়ন করেছে। চাই সমাজে শান্তি আসুক বা না আসুক। ইহুদী ধর্মে নারীকে ‘পুরুষের প্রতারক’ বলা হয়েছে। ইউরোপীয়রা নারীকে ‘শয়তানের অঙ্গ’ মনে করত। গ্রীক সমাজের প্রাণপুরুষ বিশ্বখ্যাত দার্শনিক সক্রেটিসও মনে করতেন- ‘পৃথিবীতে বিশৃংখলা ও বিভেদের সর্ববৃহৎ উৎস হ’ল নারী’।
কিন্তু ইসলাম সম্পূর্ণ এর বিপরীত। ইসলামই একমাত্র ধর্ম, যা কিনা পুরুষের সাথে সব কাজেই নারীকে অন্তর্ভুক্ত করেছে।
আল্লাহ বলেন,
وَالْمُؤْمِنُوْنَ وَالْمُؤْمِنَاتُ بَعْضُهُمْ أَوْلِيَاءُ بَعْضٍ يَأْمُرُوْنَ بِالْمَعْرُوْفِ وَيَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنكَرِ
‘মুমিন ও মুমিনা একে অপরের বন্ধু। তারা সৎকাজের আদেশ দেয় এবং মন্দ কাজে বাধা দেয়’ (তওবা ৭১)।
ওমর (রাঃ) বলেন,
كُنَّا فِى الْجَاهِلِيَّةِ لاَ نَعُدُّ النِّسَاءَ شَيْئًا، فَلَمَّا جَاءَ الْإِسْلاَمُ وَذَكَرَهُنَّ اللهُ، رَأَيْنَا لَهُنَّ بِذَلِكَ عَلَيْنَا حَقًّا
‘আমরা জাহেলী যুগে নারীদেরকে কোন হিসাবেই ধরতাম না। অতঃপর যখন ইসলাম আসল এবং (কুরআনে) আল্লাহ তাদের (মর্যাদার) কথা উল্লেখ করলেন, তাতে আমরা দেখলাম যে, আমাদের উপর তাদের হক আছে’। সহিহ আল-বুখারী হা:৫৮৪৩।
মানবজাতি ও মানবসভ্যতার অপরিহার্য অংশ নারী। সভ্যতার অংশীদার নারীও পুরুষের মতো সম্মান ও মূল্যায়নের দাবি রাখে। ইসলাম নারীকে কাঙ্ক্ষিত সেই মর্যাদা দান করেছে। তাই ইসলামের সূচনাকাল থেকে নারীও শামিল হয়েছে দ্বিনি কার্যক্রমের সঙ্গে।
মুসলিম নারীরা শুধু দ্বীনি ইলম-আমলেই নয়; ইসলাম প্রচার-প্রসারেও অসামান্য অবদান রেখেছেন। ইসলামি আন্দোলনের নানা দিক ও বিভাগে নারীর অবদান অনস্বীকার্য। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর যুগ থেকেই আন্দোলন-সংগ্রামে অংশগ্রহণ করা মুসলিম নারীদের ঐতিহ্য।
এক কথায় ইসলামের প্রতিটি ক্ষেত্রেই নীরবে ও সম্মুখে ভূমিকা রেখেছেন নারী সাহাবিরা (রা.)।
রাসূলুল্লাহ এর যুগের নারী সাহাবীগণ ছিলেন ঈমান, জ্ঞান, ত্যাগ, ধৈর্য, সাহস ও দাওয়াতের ক্ষেত্রে অনন্য আদর্শ। তাঁদের কেউ ছিলেন জ্ঞানের শিক্ষক, কেউ ছিলেন দাওয়াতের সহযোগী, কেউ নির্যাতন সহ্য করে ঈমানের দৃঢ়তার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন, আবার কেউ যুদ্ধক্ষেত্রেও ইসলামের জন্য অসাধারণ ভূমিকা পালন করেছেন। নারী সাহাবীগণ শুধু নিজেরা ইসলাম গ্রহণ করেই থেমে থাকেননি; তাঁরা পরিবারে শিক্ষা প্রদান, অন্য নারীদের ইসলামের দিকে আহ্বান, হাদিস ও দ্বীনি জ্ঞান শিক্ষা, বিপদের সময় মুসলিমদের সহযোগিতা এবং ইসলামের জন্য ত্যাগ ও আত্মত্যাগের মাধ্যমে দীন প্রচারে অবদান রেখেছেন।
নারী সাহাবিদের অবদান ইসলামের ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও গৌরবোজ্জ্বল। নিচে কিছু উল্লেখযোগ্য নারী সাহাবির অবদান তুলে ধরা হলো:
১. হযরত খাদিজা (রাদিয়াল্লাহু আনহা):
পৃথিবীতে ইসলামের প্রচার ও প্রতিষ্ঠায় অনন্য অবদান রেখে যাওয়া মানুষের মধ্যে হজরত খাদিজা বিনতে খুওয়াইদিল (রা.) প্রথম নারী, যিনি নবুয়তের আগে থেকেই তার নিজের বিপুল সম্পদ সমাজের সর্বস্তরের মানুষের সার্বিক কল্যাণ এবং মহান রবের শাশ্বত জীবন বিধান ইসলাম প্রচার ও প্রতিষ্ঠার কাজে ব্যয় করেছেন। তাঁর অক্লান্ত প্রচেষ্টায় বহুসংখ্যক কুরাইশ রমণী ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে আসতে শুরু করেন। ধনবান মহিলা হওয়া সত্ত্বেও নিজ হাতে স্বামী রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সেবা করা, সব প্রতিকূলতাকে ধৈর্য ও সহনশীলতার সঙ্গে মোকাবিলা করার পাশাপাশি সমাজের মানুষের কল্যাণে এতটাই নিবেদিত ছিলেন যে, তার সম্পর্কে কোরআনের আয়াত পর্যন্ত নাজিল হয়।
তিনি ছিলেন সর্বদা রাসূল (সা.)-এর পাশে সাহসের প্রতীক।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম (হেরাগুহায় ধ্যানমগ্ন থাকার দিনগুলিতে) একদিন জিবরীল (আঃ) নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নিকট এসে বললেন,
يَا رَسُوْلَ اللهِ هَذِهِ خَدِيْجَةُ قَدْ أَتَتْ مَعَهَا إِنَاءٌ فِيْهِ إِدَامٌ أَوْ طَعَامٌ أَوْ شَرَابٌ، فَإِذَا هِىَ أَتَتْكَ فَاقْرَأْ عَلَيْهَا السَّلاَمَ مِنْ رَبِّهَا وَمِنِّيْ، وَبَشِّرْهَا بِبَيْتٍ فِى الْجَنَّةِ مِنْ قَصَبٍ، لاَ صَخَبَ فِيْهِ وَلاَ نَصَبَ
‘হে আল্লাহর রাসূল! এই যে খাদীজা একটি পাত্র নিয়ে আসছেন। তাতে তরকারী ও খাদ্যদ্রব্য রয়েছে। তিনি যখন আপনার নিকট আসবেন, তখন আপনি তাঁকে তাঁর প্রতিপালকের পক্ষ থেকে এবং আমার পক্ষ থেকে সালাম বলবেন এবং তাঁকে জান্নাতের মধ্যে মুক্তাখচিত এমন একটি প্রাসাদের সুসংবাদ দিবেন, যেখানে হৈ-হুল্লোড় নেই, নেই কোন কষ্ট’। সহিহ আল-বুখারী হা:৩৮২০।
ইসলামের খেদমতে হযরত খাদিজা রাযি. এর শ্রেষ্ঠতম একটি ঘটনা হলো, প্রথম ওহী নাযিল হওয়ার দিন। ‘হেরা’ গুহায় যখন অহী নাযিল শুরু হয় তখন জিবরীল আমীন এসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জড়িয়ে ধরে পর পর তিনবার খুব জোরে চাপ দেন। এতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ভীষণ ব্যথা অনুভব করেন। তৃতীয়বার ছেড়ে দিয়ে বলেন, ‘পড়ুন আপনার প্রতিপালকের নামে যিনি সৃষ্টি করেছেন’। এভাবে ৫টি আয়াত নাযিল করে ফেরেশতা চলে যান। এ ঘটনায় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ভয়ে তটস্থ হয়ে বাড়ি ফিরলেন। ঘরে এসে মমতাময়ী স্ত্রী খাদীজাকে বললেন, زَمِّلُوْنِيْ زَمِّلُوْنِيْ ‘আমাকে চাদর দিয়ে ঢেকে দাও, আমাকে চাদর দিয়ে ঢেকে দাও’। অতঃপর তাকে চাদর দিয়ে ঢেকে দেয়ার পর খাদীজাকে সব ঘটনা খুলে বললেন। এটাও বললেন, لَقَدْ خَشِيْتُ عَلَى نَفْسِيْ ‘আমি আমার জীবনের উপর আশংকা করছি’। খাদীজা (রাঃ) সান্তবনা দিয়ে বললেন,
كَلاَّ وَاللهِ مَا يُخْزِيْكَ اللهُ أَبَدًا إِنَّكَ لَتَصِلُ الرَّحِمَ وَتَحْمِلُ الْكَلَّ وَتَكْسِبُ الْمَعْدُوْمَ وَتَقْرِي الضَّيْفَ وَتُعِيْنُ عَلَى نَوَائِبِ الْحَقِّ.
‘কখনোই নয়, আল্লাহর কসম! আল্লাহ আপনাকে কখনোই অপমানিত করবেন না। আপনি আত্মীয়-স্বজনের সাথে সদাচরণ করেন। অসহায় মানুষের দায়িত্ব বহন করেন। নিঃস্বকে সাহায্য করেন। মেহমানের আপ্যায়ন করেন। হক্বের পথের বিপদগ্রস্থ ব্যক্তিদেরকে সহযোগিতা করেন’। সহিহ আল-বুখারী, হা:৩।
কি চমৎকার সান্ত্বনা! ভীতি দূরকারী কতই না কার্যকর ভাষা! আশংকা লাঘবকারী কি আদরমাখা অভয়! আসলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম -এর এই চরম মুহূর্তে মা খাদীজা (রাঃ)-এর মত একজন অসামান্য রমণীর বড়ই প্রয়োজন ছিল। মা খাদীজা প্রসঙ্গে ইবনে হিশাম বলেন, খাদীজা সর্বপ্রথম নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর উপর ঈমান আনেন। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে লোকেরা প্রত্যাখান করত, তাকে মিথ্যা বলত। এতে তিনি মনঃকষ্টে ভারাক্রান্ত হয়ে ঘরে আসার পর খাদীজা (রাঃ) তার নবুঅতের স্বীকৃতি দিতেন। তার দুঃখকে হালকা করতেন। সীরাত ইবনে হিশাম, ১ম খন্ড, পৃঃ ২০৬।
২. উম্মুল মুমিনিন হযরত আয়েশা (রা.):
ইসলাম প্রচার এবং জ্ঞান চর্চার ক্ষেত্রে নারী সাহাবিদের মধ্যে হযরত আয়েশা বিনতে আবু বকর (রা.) এর নাম সর্বাগ্রে স্মরণীয়। হিজরতের দুই বছর পূর্বে হযরত আয়েশা রা. এর বয়স যখন ৬ বছর, তখন রাসূলে আকরম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সঙ্গে তাকে বিয়ে দেন আবু বকর সিদ্দিক রা.। দ্বিতীয় হিজরীতে তিনি হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সংসারে গমন করেন। তখন তার বয়স হয়েছিল ৯ বছর। রাসুলের সঙ্গে সুদীর্ঘ ৯ বছর সংসার করার ফলে রাসুল থেকে সরাসরি বিভিন্ন বিষয়ের জ্ঞান অর্জন করেন।
তিনি কুরআন, হাদিস, ইসলামি আইন এমনকি রাজনৈতিক বিষয়ে অত্যন্ত পারদর্শী ছিলেন। কুরআনের তাফসির বর্ণনা, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর হাদীস বর্ণনা ও হাদীসের ব্যাখ্যা বিশ্লেষণে সারা বিশ্বে উম্মুল মু’মিনীন হযরত আয়েশা (রা.) সমস্ত মহিলা সাহাবিদের তুলনায় বৈশিষ্ট্যের অধিকারী ছিলেন। প্রসিদ্ধ ছয়জন হাদীছ বর্ণনাকারীর মধ্যে তিনি ছিলেন অন্যতম। সাহাবীদের মধ্যে যে ৭ জন ফিকাহশাস্ত্রে শিরোমণি ছিলেন, হযরত আয়েশা রা. তাদের অন্যতম। হযরত আয়েশা (রা.) অধিক হাদিস বর্ণনাকারী সাহাবিদের মধ্যে একজন। তিনি ২ হাজার ২শ ১০ টি হাদীস বর্ণনা করেন। রাসূলের জীবদ্দশায় ও ওফাতের পরে নানা ঘটনা প্রবাহে হযরত আয়েশা রা. মূখ্য ভূমিকা পালন করেন। হযরত ওসমান রা. এর খেলাফতের শেষদিকে উটের যুদ্ধে তিনি অগ্রণি ভূমিকা পালন করেন। দ্বীনী জ্ঞানের পাশাপাশি তিনি দুনিয়াবী জ্ঞানেও ছিলেন ঈর্ষণীয় অবস্থানে। তিনি তাফসীর, ফারায়েয, বংশবিদ্যা, কবিতা, চিকিৎসা, আরবদের ইতিহাস, আরবী সাহিত্য ও বক্তব্যে সমান পারদর্শী ছিলেন। বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ এসে ইসলাম ও সামাজিক বিধিবিধান সম্পর্কে তার কাছ থেকে অবগত হতেন। তার জ্ঞানের কথা স্বীকার করে ইমাম যুহরী (রহঃ) বলেন,
لو جمع علم عائشة إلى علم جميع أزواج النبي صلى الله عليه وسلم وعلم جميع النساء لكان علم عائشة أفضل-
‘যদি আয়েশা (রাঃ)-এর ইলম ও রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর অন্যান্য স্ত্রী ও সমস্ত নারীদের ইলম একত্রিত করা হয়, তবে আয়েশা (রাঃ)-এর ইলম উত্তম হবে’। আল-ইলম ওয়াল ওলামা, পৃ. ২৬৬।
যুবাইর ইবনুল আওয়াম (রাঃ) বলেন,
ما رأيت أحدا من الناس أعلم بالقرآن ولا بفريضة ولا بحلال وحرام ولا بشعر ولا بحديث العرب ولا النسب من عائشة رضي الله عنها.
‘আল-কুরআনের ফরয বিষয়, হালাল-হারাম, আরবদের কাহিনী, বংশবিদ্যা সম্পর্কে আয়েশা (রাঃ) অপেক্ষা অধিক জানে এমন কাউকে দেখিনি’। প্রাগুক্ত
এ বিষয়ে আবূ মূসা আশ‘আরী (রাঃ)-এর কথাটি উল্লেখযোগ্য। তিনি বলেন,
مَا أَشْكَلَ عَلَيْنَا أَصْحَابَ رَسُوْلِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ حَدِيْثٌ قَطُّ فَسَأَلْنَا عَائِشَةَ إِلَّا وَجَدْنَا عِنْدَهَا مِنْهُ عِلْمًا-
‘আমাদের রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর ছাহাবীদের নিকট কোন হাদীছের অর্থ বুঝা কষ্টকর হ’লে (খটকা লাগলে) আমরা আয়েশা (রাঃ)-এর নিকট জিজ্ঞেস করতাম এবং তার কাছে উহার সমাধান পেয়ে যেতাম।(তিরমিজি : কিতাবুল মানাকিব, হাদিস : ৩৮৮৩)
উরওয়া বিন জুবায়ের (রা.) বলেন, আয়েশা (রা.)-এর চেয়ে আইনশাস্ত্র, চিকিৎসাশাস্ত্র ও কবিতায় বেশি জ্ঞানসম্পন্ন অন্য কাউকে আমি দেখিনি। (আল ইসতিয়াব ফি মারিফাতিল আসহাব : খণ্ড ৪, পৃষ্ঠা ১৮৮৩)
মাসরুক (রহ.) বলেন, আমি মহানবী (সা.)-এর বড় সাহাবিদের আয়েশা (রা.)-কে উত্তরাধিকার (মিরাস) সম্পর্কে জিজ্ঞেস করতে দেখেছি। (তাহজিবুত তাহজিব, খণ্ড ১২, পৃষ্ঠা ৩৮৬)
মহানবী (সা.)-এর ইন্তেকালের সময় তাঁর বয়স ছিল ১৮ বছর।
হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত আয়েশার ঘরে ও তাঁর কোলে ওফাত লাভ করেন। সেই ঘরেই তিনি সমাহিত হন। সে ঘরই এখন রওযা আকদাস হিসেবে দুনিয়ার মুসলমানদের কাছে সবচে প্রিয় স্থান। হাদিসে তাঁর অনেক মানাকিব বর্ণিত হয়েছে। তিনি ৫৮ হিজরিতে ইন্তেকাল করেন এবং জান্নাতুল বাকিতে তাঁকে সমাহিত করা হয়। (সিয়ারু আলামিন নুবালা : খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ৪২৬)
৩. উম্মুল মুমিনিন উম্মে সালামা (রা.) :
উম্মুল মুমিনিন উম্মে সালামা (রা.)-এর নাম হিন্দ বিনতে আবি উমাইয়া (রা.)। জাহাবি (রহ.) তাঁকে ফকিহ বলেছেন এবং তাঁর আইনশাস্ত্রে দূরদর্শিতা, প্রজ্ঞা ও তীক্ষ্ণ বুদ্ধিমত্তা বহু হাদিস থেকে প্রমাণিত। উদাহরণস্বরূপ, হুদায়বিয়ার শান্তিচুক্তির সময়ে মহানবী (সা.) যখন সাহাবায়ে কেরামকে ওমরাহ না করে ‘হলক’ (মাথা মুণ্ডান)-এর নির্দেশ দেন, সে সময় সাহাবায়ে কেরাম প্রাথমিকভাবে তা অনুসরণ না করে ওমরাহ করার সুযোগের প্রতীক্ষায় ছিলেন। উম্মে সালামা (রা.) যখন বিষয়টি জানতে পারলেন, তখন তিনি মহানবী (সা.)-কে নিজের চুল নিজেই কাটতে পরামর্শ দিলেন। সুতরাং সাহাবায়ে কেরাম রাসুল (সা.)-কে চুল কাটতে দেখে তাঁরাও একে অপরের চুল কাটতে লাগলেন। এভাবেই উম্মে সালামা (রা.)-এর পরামর্শে সাহাবায়ে কেরাম সংঘাত অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসেন। উম্মুল মু’মিনীন উম্মে সালমা (রা.) ৩৭৮-টি হাদিস বর্ণনা করেছেন। তাঁর আইনশাস্ত্রে আর দূরদর্শিতার এমন উদাহরণ আরো অনেক রয়েছে। (আল-আলাম : খণ্ড ৮, পৃষ্ঠা ৯৭)
৪. উম্মুল মুমিনিন জুওয়াইরিয়া (রা.) :
উম্মুল মুমিনিন জুওয়াইরিয়া (রা.) ছিলেন বনু মুস্তালিক গোত্রের সরদার হারিসের কন্যা। ‘নিসাউ হাউলির রাসুল’ নামক গ্রন্থের লেখক মুহাম্মদ বুরহান (রহ.) তাঁকে ফকিহ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। কেননা ‘মুসান্নাফে আবি শাইবা’ ও ‘মুসান্নাফে আবদুর রাজ্জাক’ গ্রন্থদ্বয়ে তাঁর বহু ফাতওয়া সংকলিত হয়েছে। (মুসান্নাফে আবদুর রাজ্জাক : খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ১০৬; মুসান্নাফে আবি শাইবা : খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ৩৮)
৫. জায়নাব বিনতে আবি সালামা (রা.) :
জায়নাব বিনতে আবি সালামা (রা.) ছিলেন মহানবী (সা.)-এর স্ত্রী উম্মে সালামাহ (রা.)-এর কন্যা (আগের সংসারের সন্তান ছিলেন)। তিনি রাসুল (সা.) সাহচর্যে বড় হয়েছেন। আল্লামা ইবনে আসির আল-জাজরি ও ইবনে আবদুল বার (রহ.) তাঁকে তাঁর সময়ের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নারী আইনবিদ-ফকিহ বলে ঘোষণা করেছেন। আর আবু রাফি (রহ.) বলেন, আমি যখনই মদিনার কোনো নারী ফকিহের কথা আলোচনা করতাম, তখন শুধু জায়নাব বিনতে আবি সালামা (রা.)-এর আলোচনা করতাম। (আল-ইসতিয়াব : খণ্ড ৪, পৃষ্ঠা ১৮৫৫, আসাদুল গাবাহ : খণ্ড ৭, পৃষ্ঠা ১৩২, তাহজিবুত তাহজিব : খণ্ড ১২, পৃষ্ঠা ৪৫০)
৬. ফাতিমা বিনতে কায়স (রা.) :
তিনি একজন বিখ্যাত নারী সাহাবি। তিনি প্রথম দিকে হিজরতকারী নারীদের মধ্যে একজন। ইমাম শাবি (রহ.) তাঁকে ফিকহবিদ বলেছেন। কেননা একবার তিনি তালাকপ্রাপ্তা নারীর ভরণপোষণ ও বাসস্থানের বাধ্যবাধকতা না হওয়া সম্পর্কিত ফাতিমা বিনতে কায়েস (রা.)-এর হাদিস বর্ণনা করেন, তখন উপস্থিত এক ব্যক্তি বললেন যে ওমর (রা.) ফাতিমা বিনতে কায়েস (রা.)-এর এই বর্ণনা প্রত্যাখ্যান করেছেন। উক্ত ব্যক্তির প্রত্যুত্তরে ইমাম শাবি (রহ.) বলেন, আমি কি একজন নারী আইনবিদকে সমর্থন করব না, যিনি নিজেই এই সমস্যার সম্মুখীন হয়েছেন? (মুসতাখরিজে আবি আওওয়ানা : খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ১৮১)
৭. সাফিয়া বিনতে শাইবা (রা.) :
সাফিয়া (রা.) সর্বকনিষ্ঠ নারী সাহাবিদের একজন। আল্লামা জাহাবি (রহ.) তাঁকে ফকিহ বলেছেন। জ্ঞানের প্রতি তাঁর গভীর অনুরাগ ছিল। অনেকেই তাঁর কাছ থেকে হাদিস বর্ণনা করেছেন, বিশেষ করে সুনানের মুহাদ্দিসরা। ইমাম বুখারি (রহ.)ও তাঁর রেওয়ায়েত বর্ণনা করেছেন। (সিয়ারু আলামিন নুবালা : খণ্ড ৪, পৃষ্ঠা ৪৭৪, তাহজিবুত তাহজিব : খণ্ড ১২, পৃষ্ঠা ৩৮১, আল কাশেফ : খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ৫১২)
৮. উম্মে দারদা সুগরা (রা.) :
তাঁর নাম হাজিমা বিনতে হাই। তিনি ছিলেন মহানবী (সা.)-এর সুপরিচিত সাহাবি হজরত আবু দারদা (রা.)-এর দ্বিতীয় স্ত্রী। ইমাম বুখারি, ইমাম মাকহুল (রহ.)সহ অন্য বহু আলেম তাঁকে ফকিহ বলেছেন। তিনি তাঁর গোটা জীবন হাদিস ও আইনশাস্ত্র অধ্যয়ন এবং তারপর তা প্রচার-প্রসারে ব্যয় করেছেন, বিশেষ করে আইনশাস্ত্রে তাঁর উচ্চ অবস্থান ছিল। আল্লামা নববী (রহ.) বলেন, তাঁর ফিকহবিদ হওয়ার ব্যাপারে আহলে ইলমরা একমত। (সহিহ বুখারি : খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ১৬৫, তাহজিবুল কামাল : খণ্ড ৩৫, পৃষ্ঠা ৩৫৫, তাহজিবুল আসমা ওয়াল লুগাত : খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ৬২৩)
৯. উমরাহ বিনতে আবদুর রহমান (রা.) :
উমরাহ বিনতে আবদুর রহমান হলেন একজন নারী তাবেঈ। তাঁর পিতার নাম আবদুর রহমান এবং দাদার নাম সাদ বিন জারারা (রা.); উভয়েই সাহাবি। তিনি বিখ্যাত মুহাদ্দিস আবু বকর ইবনে হাজম (রহ.)-এর খালা। তিনি শৈশব থেকেই আয়েশা (রা.)-এর তত্ত্বাবধানে এবং লালন-পালনে বড় হয়েছেন। (তাহজিবুল কামাল : খণ্ড ১২, পৃষ্ঠা ৪৩৯, আল-আলাম : খণ্ড ৫, পৃষ্ঠা ৭২)
জাহাবি ও হিজরানি (রহ.)সহ প্রমুখ বহু আলেম তাঁকে ফকিহ বলেছেন। ইমাম জুহরি (রহ.) বলেন, আমি যখন উমরাহ (রা.)-এর কাছে এলাম, তখন তাঁকে জ্ঞানের অন্তহীন মহাসমুদ্র দেখতে পাই। (তারিখুল ইসলাম : খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ১১৫১, কিলাদাতুন নাহর : খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ৫০৬, সিয়ারু আলামিন নুবালা : খণ্ড ৪, পৃষ্ঠা ৫০৮)
১০. মুয়াজা আদাবিয়া (রা.) :
মুয়াজা বিনতে আবদুল্লাহ আদাবিয়া (রা.) হলেন অত্যন্ত ধার্মিক, পরহেজগার ও প্রখর জ্ঞানের অধিকারী। আইয়ুব সাখতায়ানি, জাফর বিন কায়সান, ইয়াজিদ আল-রিশকসহ বিদগ্ধ মুহাদ্দিসরা তাঁর কাছ থেকে ইলম অর্জন করেছেন। জাহাবি ও হিজরানি (রহ.) তাঁকে ফকিহ বলেছেন। প্রসিদ্ধ মুহাদ্দিস জাফর বিন কায়সান (রহ.) বলেন, আমি মুয়াজা আদাবিয়া (রা.)-কে দেখেছি যে তিনি পর্দায় ছিলেন এবং নারীরা তাঁকে বিভিন্ন প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করছিল। (আল ইবার ফি খাবার : খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ৯২, কিলাদাতুন নাহর : খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ১২, আল ইলাল ওয়া মারিফাতুর রিজাল : খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ৮০)
১১‘. শিফা বিনতে আবদুল্লাহ আল-কুরায়শিয়া আল-আদাবিয়া (রা.):
তিনি ছিলেন মক্কার এক সম্মানিত পরিবারের সন্তান। তার স্বামী ছিলেন আবু হাতমা ইবনে হুযাইফা। সুলায়মান ও মাসরূক নামে তাদের দুই সন্তান ছিল। হজরত ওমর ইবনে খাত্তাবের সঙ্গে আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিল তার ।
তার আসল নাম ছিল লাইলা। চিকিৎসায় অসাধারণ দক্ষতার কারণে ‘শিফা’ উপাধিটি পেয়েছিলেন তিনি।
ইসলামের শুরুর দিকেই তিনি মুসলিম হয়েছিলেন এবং হিজরতের প্রথম সারির সাহাবিদের একজন ছিলেন। মদিনায় তার বাড়ি ছিল মসজিদে নববীর কাছেই। অর্থনীতি ও সামাজিক বিভিন্ন বিষয়ে তিনি নবীজির পরামর্শদাতা হিসেবে পরিচিত ছিলেন। এজন্যই বিখ্যাত হাদিস বিশারদ ইবনে হাজার তাকে বুদ্ধিমতী ও মর্যাদাশীল নারীদের মধ্যে অন্যতম বলেছেন।
১২. হজরত ফাতেমা বিনতে খাত্তাব (রা.):
প্রাচীন আরবে যে ক’জন মানুষ লিখতে-পড়তে জানতেন, তাদের একজন ছিলেন হজরত ফাতেমা বিনতে খাত্তাব (রা.)। ফাতেমা বিনতে খাত্তাব (রা.) ছিলেন একজন বিশুদ্ধ অন্তরের নারী, যিনি তার জ্ঞানকে সঠিক পথে পরিচর্যা করে জাহেলি যুগের সব অপসংস্কৃতি ও পাপাচার থেকে নিজেকে মুক্ত রেখেছেন এবং সমাজের নারীদেরও বিরত রাখতে সদা স্বচেষ্ট ছিলেন। ইসলাম গ্রহণকারীদের সংখ্যা ১০ জনে থাকা অবস্থায় তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন এবং তিনিই সেই নারী, যার দৃঢ় সাহসীকতা ও গভীর ঈমানি শক্তির ফলে ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হজরত ওমর (রা.) এর মতো মানুষ ইসলাম গ্রহণ করেন। তার জীবনের গল্প আমাদেরকে দেখিয়ে দেয় অবহেলিত নারীদের কীভাবে ব্যক্তিত্বপূর্ণ ও দৃঢ় মনোবলে বলীয়ান হওয়া যায় তার চিত্র। ইসলামের উষ্ণলগ্নে যেখানে একজন ব্যক্তির ইসলাম গ্রহণই ছিল অকল্পনীয় ব্যাপার, সেখানে তিনি ইসলামকে পারিবারিক জীবনে চর্চা করতেন। তিনি এবং তার স্বামী একত্রে পবিত্র কোরআন শিখতেন। তাদের হৃদয়স্পর্শী তেলাওয়াত পথিকদের কোরআনের প্রতি আকৃষ্ট করত।
জিহাদ ও সংগ্রামে নারী সাহাবি: নবীজি (সা.) দ্বিনি দাওয়াত, ধর্মীয় জ্ঞানচর্চা, সামাজিক মর্যাদা ও দ্বিন প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে নারীকে অংশীদার করেছেন। তার শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের কারণে নারী সাহাবিরাও বীরত্ব ও সাহসিকতার অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। যুগে যুগে যাঁরা আল্লাহর রাহে প্রাণ উৎসর্গ করেছেন তাঁদের মধ্যে অন্যতম প্রধান হলেন সুমাইয়া (রা.)। তিনি ছিলেন রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর বিশিষ্ট সাহাবি ইয়াসির (রা.)-এর স্ত্রী ও আম্মার (রা.)-এর জননী। প্রথম মহিলা শহীদ সুমাইয়া (রা)। তিনি ছিলেন আবু হুযাইফার বাঁদী। ইয়াসের তাঁর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। তাদের ঘর আলোকিত করে আম্মার নামক ছেলে সন্তান। আম্মার রাসূলুল্লাহর আহ্বানে সাড়া দিয়ে ইসলাম গ্রহণ করেন। তাঁর দাওয়াত পেয়ে তাঁর পিতা ইয়াসের এবং পরে মা সুমাইয়া ইসলামের ছায়ায় আশ্রয় নেন। অত্যন্ত করুণ ও কঠিন অবস্থায় এই পরিবার নবীজির প্রতি ঈমান আনয়ন করে। মুশরিকরা এই দুর্বল পরিবারটির উপর তাদের নৃশংসতার মাত্রা পরীক্ষা করে। মুশরিকরা ইয়াসির পরিবারের উপর চরম নির্যাতন চালিয়ে অন্যদের কাছে এই বার্তা দিতে চেয়েছিল যে, মুহাম্মদের ধর্ম গ্রহণ করলে এ রকম মাসুল গুণতে হবে। সুমাইয়ার উপর তারা যে নির্যাতন চালায় তা ছিল লোমহর্ষক, অবর্ণনীয়। বলা হয়েছে, সুমাইয়ার দুই পা দুই উটের সাথে বেঁধে উট দুটিকে বিপরীত দিকে ধাবড়ানো হয়। আরো বর্ণিত আছে, মুশরিকরা হযরত সুমাইয়ার লজ্জাস্থানে বর্শা ঢুকিয়ে তাকে শহীদ করেছিল। ইসলাম গ্রহণের অপরাধে মক্কার কাফিররা তাঁদের ওপর কঠোর জুলুম নির্যাতন করত। যখন রাসুলুল্লাহ (সা.) আম্মার, তাঁর পিতা ইয়াসির (রা.) এবং তাঁর মা সুমাইয়া (রা.)-কে বিপদগ্রস্ত দেখতেন, তখন বলতেন, হে ইয়াসির পরিবার, সবর কর। কখনো বলতেন, হে আল্লাহ, তুমি ইয়াসির পরিবারকে ক্ষমা করো। আবার কখনো বলতেন, তোমাদের জন্য বেহেশতের সুসংবাদ, তোমাদের আশা পূর্ণ হবে। তাঁদের হৃদয়ে ঈমানের অটল দৃঢ়তা এতটাই ছিল যে, কোনোভাবেই তাঁদের ইসলাম থেকে দূরে সরানো যায়নি। জুলুম-নির্যাতনের এক পর্যায়ে আবু জাহেল বর্শা দিয়ে সুমাইয়া (রা.)-কে আঘাত করে নির্মমভাবে শহীদ করে। এই মহান নারীর রক্তে সিক্ত হয় ইসলামের প্রথম শহীদির ইতিহাস। (সিরাতুল মুস্তফা : পৃ. ১৯৯)
ইসলামের প্রচার ও প্রতিষ্ঠায় মহিলাদের এই ত্যাগ ও ভূমিকা আজকের বিশে^র মুসলিম মহিলাদের জন্য গৌরবের। সুমাইয়া (রা.) প্রমাণ করেছেন, একজন নারীর ঈমান ও ত্যাগ কতটা দৃঢ় হতে পারে। তাঁর এই আত্মোৎসর্গ পরবর্তী প্রজন্মের মুমিন নারীদের জন্য অনুপ্রেরণার বাতিঘর হয়ে আছে।
নারী সাহাবি হজরত নুসাইবা (রা.) অস্ত্র হাতে সম্মুখ যুদ্ধেও অংশ নিয়েছেন। আর হজরত রুফাইদা (রা.) আহত সাহাবিদের দিনরাত সেবা দিয়েছেন। যুদ্ধে গিয়ে কেউ আহত হলেই নবি (সা.) তাকে নারী সাহাবি রুফাইদা (রা.)-এর কাছে নিয়ে যেতে বলতেন।
বিভিন্ন সিরাত ও ইতিহাস গ্রন্থ থেকে জানা যায়, হজরত আয়েশা ও উম্মে সালমা (রা.) ওহুদ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। মহানবি (সা.)-এর ফুফু সুফিয়া বিনতে আবদিল মুত্তালিব (রা.) খায়বর যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। উম্মুল খায়ের, জুরকা বিনতে আদি, ইকরামা বিনতে আতরাশ ও উম্মে সিনান প্রমুখ নারী সাহাবিরা অসংখ্য যুদ্ধে প্রতিরক্ষামূলক কাজে সহযোগিতা করেন। আজরা বিনতে হারিস বিন কালদা সেনাদলের নেতৃত্ব প্রদান ও আহলে বিসানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন।
উম্মে আম্মারা (রা.) ওহুদের যুদ্ধে মহানবি (সা.)-এর জীবন রক্ষায় প্রতিরক্ষা বলয় তৈরি করেছিলেন। মহানবি (সা.) তাকে ‘খাতুনে ওহুদ’ উপাধি দিয়েছিলেন। ইসলামের ইতিহাসে প্রথম সামুদ্রিক অভিযানে প্রথম শাহাদতবরণ করেন উম্মে হারাম বিনতে মিলহান (রা.)। উম্মে আতিয়া আনসারি (রা.) মহানবি (সা.)-এর সঙ্গে সাতটি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। উমাইয়া বিনতে কায়েস কিফারিয়া খায়বর যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। উম্মে হাকিম বিনতে হারিস রোমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন।
উম্মে আয়মন হাবশি (রা.) ওহুদ, হুনাইন, খায়বর ও মোতার যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। উম্মে সুলাইম (রা.) খায়বর ও হুনাইনের যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। উম্মে হারাম বিনতে মিলহান ইসলামের প্রথম নারী নৌযোদ্ধা। রাবি বিনতে মুয়াওয়াজ (রা.) বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। নাসিবাহ বিনতে কাব আনসারিয়া ওহুদ, বনি কুরাইজা, হুদায়বিয়া, খায়বর, হুনাইন ও ইয়ামার যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন।
হুনাইনের যুদ্ধে যখন মুসলিম বাহিনী সাময়িক বিপর্যয়ের মধ্যে পড়েছিল, তখন অনেক যোদ্ধা যুদ্ধের ময়দান ত্যাগ করেছিল।
সেই কঠিন সময়ে উম্মে সুলাইম (রা.) বীরত্ব প্রদর্শন করেন। তিনি খঞ্জর হাতে দাঁড়িয়ে যান এবং কাফির বাহিনীর অপেক্ষা করতে থাকেন। তালহা (রা.) তাঁর কাছে এর কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি চাই কোনো অবিশ্বাসী আমার কাছে আসুক এবং আমি তার পেট ফেরে দিই।
খন্দকের যুদ্ধের সময় নবীজি (সা.) নারীদের একটি নিরাপদ দুর্গে অবস্থানের নির্দেশ দেন। তখন দুর্গের পাশে একজন ইহুদি ঘোরাফেরা করছিল। সাফিয়্যা (রা.) তাকে চিনতে পারেন এবং তাঁবুর খুঁটি দিয়ে আঘাত করে হত্যা করেন।
হযরত খানসা (রা) যুদ্ধের ময়দানে পুত্রদের ঠেলে দিয়েছিলেন শহীদ হওয়ার জন্য।
হযরত আসমা বিনতে আবু বকর এর কাহিনী আরো বিস্ময়কর। তিনি পুত্রকে বলেন, “তুমি জয়ী হয়ে ফিরে আসলে আনন্দিত হবো। কিন্তু তুমি আমার কোলে ফিরে না আসলেও আল্লাহর শোকর আদায় করবো।”
হযরত সাফিয়া (রা) যুদ্ধের ময়দানে প্রাণাধিক প্রিয় ভাইয়ের লাশ দেখে মরিয়া হওয়ার পরিবর্তে মন্তব্য করেছিলেন: “আল্লাহর রাস্তায় এটা কোন বড় কোরবানী নয়।”
ইলমের ময়দানে মহিলা সাহাবি: অনেক মহিলা সাহাবি আল কুরআনুল কারিমের দারস দিতেন। রাবিতা বিনতে হায়্যান, উম্মে ইমাম বিনতে হারিসা, হিন্দ বিনতে উবায়েদ, উম্মে সাদ ইবনে রবী (রা) সহ প্রমুখ মহিলা সাহাবি পবিত্র কুরানের বেশিরভাগ আয়াতের হাফিজা ছিলেন।
ফিকহশাস্ত্রে মহিলা সাহাবিদের উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রয়েছে। হযরত আয়েশা (রা.) কর্তৃক এতো অধিক ফতওয়া বর্ণিত হয়েছে যা একত্রিত করলে এক বৃহৎ গ্রন্থ হয়ে যেতে পারে। অনুরূপ, উম্মে সালমা (রা) কর্তৃক বর্ণিত ফাতওয়া সমূহ একখানা পুস্তিকার আকার ধারণ করতে পারে। ফতোয়া দানকারী মহিলা সাহাবিদের মধ্যে হাফসা (রা.),উম্মে হাবিবা (রা.), উম্মে আতিয়া (রা.), সাফিয়া (রা), লায়লা বিনতে কায়েস (রা.), উম্মে দারদা (রা.), যায়নাব বিনতে উম্মে সালামা (রা.), আসমা বিনতে আবু বকর (রা.) প্রমুখের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এছাড়া ফারায়েয (মৃতব্যক্তির ওয়ারিশ সম্পর্কিত বণ্টননীতি) বিষয়ে হযরত আয়েশা (রা.) সহ অন্যান্য মহিলা সাহাবিরাও পারদর্শী ছিলেন। জীবনের সমস্যা সমাধানের জন্য অনেক নারী-পুরুষ মহিলা সাহাবিদের নিকট শরণাপন্ন হতেন। এসব মহীয়সী নারীরা তাদের জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও দূরদর্শীতার দ্বারা মুসলিম উম্মাহকে সকল সমস্যার সমাধান দিয়ে সাহায্য করেছেন।
সমাজ ও রাজনীতিতে মহিলা সাহাবি: মদিনায় হিজরত করার পর মহানবী (সা.) যখন ইসলামী রাষ্ট্রের গোড়াপত্তন করেন, তখন নারী সাহাবিরাও ইসলামী সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তাঁরা পুরুষের মতো যুদ্ধের ময়দানে বীরত্ব ও সাহসিকতার প্রমাণ রাখেন, বরং নারী সাহাবিদের অনেকে বীরত্বের এমন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন, যা পৃথিবীর ইতিহাসে সোনালি অক্ষরে লিপিবদ্ধ হয়ে আছে।
রাজনৈতিক ক্ষেত্রে অনেক প্রতিভাবান মহিলা সাহাবি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। হযরত আবু বকর (রা.) ও ওমর (রা.) এর শাসনামলে রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে হযরত আয়েশা (রা.) এর সাথে পরামর্শ করতেন এবং তাঁর সিদ্ধান্তকে অত্যাধিক গুরুত্ব দিতেন। শিফা বিনতে আবদিল্লাহ (রা.) এর সিদ্ধান্তকে হযরত উমর (রা.) অনুমোদন করতেন।
উপসংহার: ইসলামের দৃষ্টিতে নারীর জীবন এক মহিমান্বিত জীবন। ইসলাম প্রচারের ক্ষেত্রে যেসব নারী জীবনের মায়া ত্যাগ করে সোনালী ইতিহাস গড়ে গিয়েছেন, তাদের অনুসৃত পথেই বর্তমান মা-বোনদের চলতে হবে। সে পথে চলার জন্য নারীদের আহবান করতে হবে। তাহলেই নারী জীবনে পূর্ণতা আসবে।
মন্তব্য (...)
এ সম্পর্কিত আরও প্রবন্ধ
সাহাবায়ে কিরামের ভ্রাতৃত্ব, মতভেদ ও আদর্শিক আচরণ: একটি শিক্ষনীয় চিত্র
নবী করীম ﷺ গভীরভাবে এ বাস্তবতা উপলব্ধি করতেন যে, উম্মতের টিকে থাকা ও অগ্রগতির একমাত্র উপায় হলো—পারস্...
সাহাবায়ে কেরামের পারিবারিক জীবন
ভূমিকা মানুষ একা থাকার জন্য সৃষ্টি হয়নি। তার জীবনের পথে একজন সঙ্গী প্রয়োজন—যার সঙ্গে সে সুখ ভাগ করবে...
নারী সাহাবীদের পারিবারিক জীবন
দাম্পত্য ও পারিবারিক জীবন হলো মানব সভ্যতার মূল ভিত্তি ও সুখের এক স্বর্গীয় নীড়। ইসলামের দৃষ্টিতে দাম্...
দ্বীনের হেফাজতে সাহাবায়ে কেরামের ভূমিকা
দ্বীনের হেফাজতে সাহাবায়ে কেরাম রাদিয়াল্লাহু আনহুমের ভূমিকা ছিল অতুলনীয়। তাঁরা শুধু ইসলাম গ্রহণ কর...
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন