প্রবন্ধ
দুনিয়ার শান্তি ও আখেরাতের মুক্তি
৮ আগস্ট, ২০২৬
১৭২
০
ইসলামি জীবন ব্যবস্থায় দুনিয়ার শান্তি ও আখেরাতের মুক্তির গ্যারান্টি দিয়েছেন স্বয়ং মহান আল্লাহ তাআলা ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম।
পবিত্র মক্কা নগরীর উঁচু পাহাড় জাবালে আবু কুবাইস। সেখানেই প্রথম শান্তি ও মুক্তির পতাকা উড়ান বিশ্বশান্তির অগ্রদূত আখেরাতের মুক্তির দূত মহানবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে শান্তি ও মুক্তির বাণী ঘোষণা করেন দরাজ কন্ঠে। “হে মানবজাতী! আল্লাহ তাআলাই তোমাদের উপাস্য। তিনি ছাড়া আর কোন উপাস্য নেই। আমি তোমাদেরকে এক অজানা বিষয় সম্পর্কে জানাতে আল্লাহর পক্ষ থেকে রাসূল হিসেবে এসেছি। তাহলো— আল্লাহ এক”। আল্লাহর নিকট আত্মসমর্পনই শান্তি ও মুক্তির একমাত্র মূলমন্ত্র।
মহান আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে সৃষ্টি করে বসবাসের জন্য এই পৃথিবীতে রেখেছেন। দুনিয়া আমাদের সাময়িক প্রয়োজনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু এটি আমাদের জীবনের চূড়ান্ত গন্তব্য নয়।
জীবনকে সুখী করতে মানুষ আজ নানা পথ খুঁজে বেড়াচ্ছে। আধুনিকতার এই যুগে আমরা বাহ্যিক চাকচিক্য আর জাগতিক প্রাপ্তিকে সুখ—শান্তির চাবিকাঠি মনে করি। অথচ ইসলাম আমাদের এমন কিছু মৌলিক ও চিরন্তন নীতিমালা শিক্ষা দিয়েছে, যা যথাযথভাবে মেনে চললে দুনিয়া ও আখেরাত-উভয় জগতেই প্রকৃত কল্যাণ, শান্তি ও মুক্তি লাভ করা সম্ভব। তার মধ্যে অন্যতম হলো যুহদ, কানাআত ও তাওয়াক্কুল।
যুহদ ও কানাআত বা সন্তুষ্টি আসলে কী?
যুহদ (দুনিয়াবিমুখতা): যুহদ হলো আল্লাহ তাআলা আপনাকে যা দিয়েছেন তা সঠিকভাবে ব্যবহার করা, কিন্তু সেটাকে জীবনের একমাত্র বা আসল লক্ষ্য না বানানো। আপনার হাতে প্রচুর অর্থসম্পদ থাকতে পারে, চমৎকার বাড়ি থাকতে পারে, ভালো পেশা থাকতে পারে; তবে এগুলো যদি আপনার অন্তরের মালিক হয়ে বসে, তবেই আধ্যাত্মিক বিপর্যয় ও অশান্তি শুরু হয়।
কানাআত ও তাওাক্কুল: এটি হলো নিজের সর্বোচ্চ হালাল চেষ্টা করার পর আল্লাহ তাআলার ফয়সালার ওপর মন থেকে সন্তুষ্ট থাকা। আপনি পরিশ্রম করবেন, দোয়া করবেন, সুন্দর পরিকল্পনা করবেন; অতঃপর যা অর্জিত হবে, তা—ই আল্লাহর হিকমত ও অনুগ্রহ মনে করে শান্ত থাকবেন। সহজ কথায়, যুহদ দুনিয়ার প্রতি অতিরিক্ত আসক্তি কমায়, আর সন্তুষ্টি অন্তরের সব অভিযোগ অশান্তি দূর করে দেয়।
পবিত্র কুরআন আমাদের দুনিয়াকে পুরোপুরি বর্জন করতে শেখায় না। বরং এটি দুনিয়ার প্রকৃত স্বরূপ ও অবস্থান আমাদের সামনে স্পষ্ট করে দেয়। যেমন আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন:
اعْلَمُوا أَنَّمَا الْحَيَاةُ الدُّنْيَا لَعِبٌ وَلَهْوٌ وَزِينَةٌ وَتَفَاخُرٌ بَيْنَكُمْ وَتَكَاثُرٌ فِي الْأَمْوَالِ وَالْأَوْلَادِ
অর্থ: "তোমরা জেনে রাখো, পার্থিব জীবন তো কেবল খেলাধুলা, তামাশা, শোভা—সৌন্দর্য, তোমাদের পারস্পরিক অহংকার এবং ধন—সম্পদ ও সন্তান—সন্ততিতে একে অপরের চেয়ে বেশি হওয়ার প্রতিযোগিতা মাত্র।" (সূরা আল—হাদীদ, আয়াত: ২০)
অন্য এক আয়াতে আল্লাহ তাআলা নির্দেশ দিয়েছেন দুনিয়া ও আখিরাতের ভারসাম্য রক্ষা করতে:
وَابْتَغِ فِيمَا آتَاكَ اللَّهُ الدَّارَ الْآخِرَةَ ۖ وَلَا تَنْسَ نَصِيبَكَ مِنَ الدُّنْيَا
অর্থ: "আল্লাহ তোমাকে যা দিয়েছেন তা দিয়ে আখিরাতের কল্যাণ অনুসন্ধান করো এবং দুনিয়া থেকে তোমার অংশ ভুলে যেয়ো না।" (সূরা আল—কাসাস, আয়াত: ৭৭)
এখানেই নিহিত রয়েছে মুমিনের জীবনের সবচেয়ে বড় দীক্ষা। মুমিন সংসারত্যাগী হয় না। সে দুনিয়াকে আখিরাতের পাথেয় হিসেবে গ্রহণ করে। তার অর্থসম্পদ অসহায়ের কল্যাণে ও সদকায় ব্যয় হয়, তার জ্ঞান মানুষের উপকারে আসে, এবং তার প্রতিটি মুহূর্ত অতিবাহিত হয় ইবাদত ও দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়ে। হৃদয়ে থাকবে আল্লাহর ভালোবাসা, আর হাতে থাকবে দুনিয়ার সম্পদ- এটাই যুহদের মূল কথা।
আরেকটি বিষয় হলো, আল্লাহর রহমত ছাড়া প্রশান্তি পাওয়ার কোনো উপায় নাই।
মহান আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে মুমিনের উপর দয়া হচ্ছে সর্বশ্রেষ্ঠ সাকিনাহ। কোরআন সুন্নাহর একাধিক স্থানে সাকিনাহ শব্দের ব্যবহার ও প্রয়োগ দেখা যায়। এ ‘সাকিনাহ’ হচ্ছে এক প্রকার মানসিক প্রশান্তি, স্বস্তি, সান্ত্বনা, স্থিরতা ও সহনশীলতা। যা আল্লাহ তাআলা বান্দার অন্তের ঢেলে দেন। ফলে যত ভয়—ভীতি ও বিপদাপদ আসুক না কেন সে হতাশ হবেন না, অস্থির হবেন না, ভেঙ্গে পড়বেন না বরং মানসিকভাবে শক্তি ও সাহস খুঁজে পাবেন। সাকিনাহ যেহেতু বান্দার প্রতি মহান আল্লাহর বিশেষ রহমত বা অনুগ্রহ। তাই আল্লাহর অনুগ্রহ লাভে কোরআন—সুন্নাহ মোতাবেক জীবনযাপনের বিকল্প নেই। যখনই বান্দা মহান আল্লাহর রঙে নিজের জীবন রাঙিয়ে তুলবে তখনই তার ওপর নাজিল হতে থাকবে সাকিনাহ বা প্রশান্তি।
মুমিনের জীবনেও দুঃখ—কষ্ট, অভাব—অনটন ও প্রিয়জন হারানোর পরিস্থিতি আসে। তবে প্রশান্ত হৃদয়ের অধিকারী ব্যক্তি কখনও আল্লাহর ফয়সালার প্রতি মন্দ ধারণা পোষণ করে না। সে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে, তার রব পরম দয়ালু ও প্রজ্ঞাময়; তিনি কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণে ভুল করেন না। এমন ব্যক্তি রিজিক লাভ করলে কৃতজ্ঞতা বা শুকরিয়া আদায় করে, আর সংকটকালে সবর বা ধৈর্য ধারণ করে; কিন্তু কখনও কোনো হারাম উপায়ে উপার্জনের পথে পা বাড়ায় না। সে তার
পার্থিব দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করে, কিন্তু ফলাফলের জন্য ব্যাকুল হয়ে নিজের শান্তি নষ্ট করে না। তার অন্তরে বিরাজ করে এক স্বর্গীয় প্রশান্তি ও শক্তি। তাই সাকিনাহ ও প্রশান্তি লাভের জন্য আল্লাহর নিকট সবসময় এই দোয়া পাঠ করা উচিত:
اَللَّهُمَّ أَنْزِل عَلَى قَلْبِىْ السَّكِيْنَةَ
উচ্চারণ : ‘আল্লাহুম্মা আনযিল আলা ক্বালবি সাকিনাহ’
অর্থ : ‘হে আল্লাহ! আপনি আমার অন্তরে সাকিনাহ বা প্রশান্তি দান করুন।’
প্রিয় পাঠক, কেবল দুনিয়ার সুখ—শান্তির চিন্তায় মগ্ন থাকলে হবে না। আখেরাতের মুক্তির চিন্তাও প্রতিটি মুসলমানের জন্য আবশ্যক। মনে রাখতে হবে পরকাল দুনিয়া অপেক্ষা শ্রেয়। আল্লাহ তাআলা বলেন—
وَ لَلۡاٰخِرَۃُ خَیۡرٌ لَّکَ مِنَ الۡاُوۡلٰی
‘আর অবশ্যই পরকাল তোমার জন্য ইহকাল (দুনিয়া) অপেক্ষা শ্রেয়।’ (সুরা দোহা: আয়াত ৪)
সুতরাং মানুষের উচিত আখেরাত বা পরকালের চিন্তা বেশি বেশি করা।
মহান রাব্বুল আলামিন মানুষকে সতর্ক হওয়ার জন্য ঘোষণা করেছেন—
بَلۡ تُؤۡثِرُوۡنَ الۡحَیٰوۃَ الدُّنۡیَا وَ الۡاٰخِرَۃُ خَیۡرٌ وَّ اَبۡقٰی
‘কিন্তু তোমরা দুনিয়ার জীবনকে প্রাধান্য দাও। অথচ পরকালই উৎকৃষ্ট ও স্থায়ী।’ (সুরা আলা: আয়াত ১৬—১৭)
বর্তমান পরকালের চিন্তা করার মানুষের সংখ্যা খুবই কম। দুনিয়া নিয়েই মানুষ বেশি ব্যস্ত থাকে। অথচ পরকালের চিন্তা—ভাবনায় মহান আল্লাহ তাআলা বান্দার দুনিয়ার সব কাজকেই সহজ করে দেন। পরকালের চিন্তা—ভাবনায় মানুষের দুনিয়ার অনেক পেরেশানি দূর হয়ে যায়। হাদিসের দিকনির্দেশনা থেকেই তা প্রমাণিত।
হজরত আসওয়াদ ইবনে ইয়াজিদ রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেছেন, হজরত আবদুল্লাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন, আমি তোমাদের নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি—
مَنْ جَعَلَ الْهُمُومَ هَمًّا وَاحِدًا هَمَّ الْمَعَادِ كَفَاهُ اللَّهُ هَمَّ دُنْيَاهُ وَمَنْ تَشَعَّبَتْ بِهِ الْهُمُومُ فِي أَحْوَالِ الدُّنْيَا لَمْ يُبَالِ اللَّهُ فِي أَىِّ أَوْدِيَتِهِ هَلَكَ
‘যার চিন্তার কেন্দ্রবিন্দু হবে পরকাল; তার পার্থিব (দুনিয়ার) চিন্তার জন্য আল্লাহই যথেষ্ট হয়ে যান। আর যে ব্যক্তি দুনিয়ার চিন্তায় মোহগ্রস্ত থাকে তার যে কোন উপত্যকায় বা প্রান্তরে ধ্বংস হয়ে যাওয়াতে আল্লাহর কোন পরোয়া নাই।’ (ইবনে মাজাহ: ৪১০৬)
২. হজরত আবান ইবনে উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেছেন, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি—
مَنْ كَانَتِ الدُّنْيَا هَمَّهُ فَرَّقَ اللَّهُ عَلَيْهِ أَمْرَهُ وَجَعَلَ فَقْرَهُ بَيْنَ عَيْنَيْهِ وَلَمْ يَأْتِهِ مِنَ الدُّنْيَا إِلاَّ مَا كُتِبَ لَهُ وَمَنْ كَانَتِ الآخِرَةُ نِيَّتَهُ جَمَعَ اللَّهُ لَهُ أَمْرَهُ وَجَعَلَ غِنَاهُ فِي قَلْبِهِ وَأَتَتْهُ الدُّنْيَا وَهِيَ رَاغِمَةٌ
‘দুনিয়ার চিন্তা যাকে মোহগ্রস্ত করবে, আল্লাহ তার কাজকর্মে অস্থিরতা সৃষ্টি করবেন, দরিদ্রতা তার নিত্যসংগী হবে এবং পার্থিব স্বার্থ ততটুকুই লাভ করতে পারবে, যতটুকু তার তাকদিরে লেখা রয়েছে। আর যার উদ্দেশ্য হবে আখেরাত বা পরকাল; আল্লাহ তার সবকিছু সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করে দেবেন, তার অন্তরকে ঐশ্বর্যমন্ডিত করবেন এবং দুনিয়া স্বয়ং তার সামনে এসে হাজির হবে।’ (ইবনে মাজাহ: ৪১০৫)
দুনিয়ার সফরে আমাদের অবস্থান কেমন হওয়া উচিত, তা নিয়ে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:
كُنْ فِي الدُّنْيَا كَأَنَّكَ غَرِيبٌ أَوْ عَابِرُ سَبِيلٍ
উচ্চারণ: কুন ফিদ্দুন্য়া কাআন্নাকা গারীবুন আও আ—বিরু সাবীল।
অর্থ: "তুমি দুনিয়াতে একজন প্রবাসী অথবা পথচারীর মতো জীবনযাপন করো।" (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৪১৬)
একজন মুসাফির বা পথচারী যেভাবে পথ চলতে চলতে কোনো গাছের ছায়ায় সামান্য বিশ্রাম নেয় এবং আবার তার স্থায়ী গন্তব্যের দিকে রওনা হয়, মুমিনও ঠিক সেভাবে দুনিয়াকে ব্যবহার করে। সে ঘরবাড়ি বানাবে, পরিবার সামলাবে, তবে সদাসর্বদা মনে রাখবে যে তার আসল ও চিরস্থায়ী ঠিকানা হলো আখিরাত বা পরকাল।
আখেরাতের মুক্তির জন্য প্রধানত কাজ হলো আখেরাতের উপর দৃঢ় ইমান রাখা। মানুষকে আল্লাহ ও আখেরাতের উপর বিশ্বাস রাখতে হবে। আখেরাত বিশ্বাস মানুষের জীবনে সুদূরপ্রসারী ফলাফল নির্ণয় করে।
দুনিয়া আমাদের জন্য পরীক্ষার স্থান- এখানে আমরা অতিথি মাত্র। এই ক্ষণস্থায়ী জীবনের মোহে পড়ে যদি আমরা চিরস্থায়ী আখেরাতকে ভুলে যাই, তবে সেটিই হবে সবচেয়ে বড় ক্ষতি। কিন্তু সুখবর হলো- আল্লাহ আমাদের পথ দেখিয়েছেন, আমাদের সতর্ক করেছেন, আমাদের জন্য সহজ পথ রেখেছেন।
আখেরাতের মুক্তির লক্ষ্যে আমরা আরও কিছু কাজ করতে পারি।
১. বেশি বেশি নেক আমল করা
মানুষের প্রকৃত সম্পদ তার আমল। দুনিয়ার সবকিছু একদিন ছেড়ে যেতে হবে- থেকে যাবে শুধু নেক কাজ। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন যে, আল্লাহ বলেন-
يَا ابْنَ آدَمَ تَفَرَّغْ لِعِبَادَتِي، أَمْلَأْ صَدْرَكَ غِنًى، وَأَسُدَّ فَقْرَكَ، وَإِنْ لَمْ تَفْعَلْ، مَلَأْتُ صَدْرَكَ شُغْلًا، وَلَمْ أَسُدَّ فَقْرَكَ
‘হে আদম সন্তান! আমার ইবাদতের জন্য সময় বের কর। আমি তোমার অন্তরকে ঐশ্বর্যমন্ডিত করব এবং তোমার দরিদ্রতা দূর করে দেব। যদি তুমি তা না কর, তাহলে আমি তোমার অন্তরকে ব্যস্ততা দিয়ে ভরে দেব এবং তোমার দরিদ্রতা দূর করব না’। (তিরমিজি ২৪৬৬, ইবনে মাজাহ ৪১০৭, ইবনে হিববান ৩৯৩)
হজরত আনাস (রা.) হতে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) এরশাদ করেন-
يَتْبَعُ الْمَيِّتَ ثَلاَثَةٌ، فَيَرْجِعُ اثْنَانِ وَيَبْقَى مَعَهُ وَاحِدٌ، يَتْبَعُهُ أَهْلُهُ وَمَالُهُ وَعَمَلُهُ، فَيَرْجِعُ أَهْلُهُ وَمَالُهُ، وَيَبْقَى عَمَلُهُ
‘মৃত ব্যক্তিকে অনুসরণ করে (তার কবর পর্যন্ত যায়) তিনটি বস্তু। দুটি ফিরে আসে, আর একটি তার সঙ্গে থেকে যায়। তাকে অনুসরণ করে তার পরিবার, তার সম্পদ ও তার আমল। অতঃপর (দাফন কার্য শেষে) তার পরিবার ও মাল—সম্পদ ফিরে চলে আসে। শুধু আমল তার সঙ্গে থেকে যায়।’ (বুখারি ৬৫১৪, মুসলিম ২৯৬০, মিশকাত ৫১৬৭)
এই হাদিস থেকে সুস্পষ্ট হলো যে, দুনিয়ার সহায়—সম্পদ পরিবার—পরিজন অর্থকড়ি পরকালে কোন কাজেই আসবে না। কেবল আমল ব্যতীত। সুতরাং আমাদেরকে আমলের খাতা সমৃদ্ধ করতে হবে। মহান আল্লাহর ইবাদতে বেশি বেশি মনোনিবেশ করতে হবে। দুনিয়াবী কোন বিষয়ে নয় প্রতিযোগিতা করতে হবে নেকির কাজে। সত্য, সুন্দর ও কল্যাণকর কাজে।
২. আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক দৃঢ় করা
যখন একজন বান্দা তার রবের সঙ্গে সম্পর্ককে মজবুত করে- নামাজ, দোয়া, কোরআন তিলাওয়াত ও তাকওয়ার মাধ্যমে-তখন আল্লাহ তার হৃদয়ে প্রশান্তি দান করেন এবং অন্য মানুষের হৃদয়েও তার জন্য ভালোবাসা সৃষ্টি করে দেন। রবের সাথে এই নিবিড় সম্পর্ক মানুষের জীবনকে সহজ ও সুন্দর করে তোলে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যে আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তার জন্য উত্তরণের পথ বের করে দেন এবং তাকে এমন উৎস থেকে রিজিক দান করেন, যা সে কল্পনাও করতে পারে না।’ (সুরা তালাক, আয়াত: ২
৩. জান্নাতি মানুষের পরিচিতিতে আল্লাহ তাআলা কুরআন মাজিদে যে সূত্র বর্ণনা করেছেন, এগুলো নিজের মধ্যে বাস্তবায়ন করা।
قَدۡ اَفۡلَحَ الۡمُؤۡمِنُوۡنَ ۙ
الَّذِیۡنَ ہُمۡ فِیۡ صَلَاتِہِمۡ خٰشِعُوۡنَ ۙ
وَالَّذِیۡنَ ہُمۡ عَنِ اللَّغۡوِ مُعۡرِضُوۡنَ ۙ
وَالَّذِیۡنَ ہُمۡ لِلزَّکٰوۃِ فٰعِلُوۡنَ ۙ
وَالَّذِیۡنَ ہُمۡ لِفُرُوۡجِہِمۡ حٰفِظُوۡنَ ۙ
اِلَّا عَلٰۤی اَزۡوَاجِہِمۡ اَوۡ مَا مَلَکَتۡ اَیۡمَانُہُمۡ فَاِنَّہُمۡ غَیۡرُ مَلُوۡمِیۡنَ ۚ
فَمَنِ ابۡتَغٰی وَرَآءَ ذٰلِکَ فَاُولٰٓئِکَ ہُمُ الۡعٰدُوۡنَ ۚ
وَالَّذِیۡنَ ہُمۡ لِاَمٰنٰتِہِمۡ وَعَہۡدِہِمۡ رٰعُوۡنَ ۙ
وَالَّذِیۡنَ ہُمۡ عَلٰی صَلَوٰتِہِمۡ یُحَافِظُوۡنَ ۘ
اُولٰٓئِکَ ہُمُ الۡوٰرِثُوۡنَ ۙ
الَّذِیۡنَ یَرِثُوۡنَ الۡفِرۡدَوۡسَ ؕ ہُمۡ فِیۡہَا خٰلِدُوۡنَ
‘অবশ্যই সফল হয়েছে, সেসব বিশ্বাসীগণ, যারা তাদের নামাজে বিনয়ী বিনম্র,
যারা অসার ক্রিয়াকলাপ হতে বিরত থাকে,
যারা জাকাত প্রদানে সক্রিয়,
যারা নিজেদের গোপনাঙ্গ সংযত রাখে, নিজেদের স্ত্রী ও তাদের মালিকানাধীন দাসীদের ছাড়া অন্য সকলের থেকে, কেননা এতে তারা নিন্দনীয় হবে না। তবে কেউ এ ছাড়া অন্য কিছু কামনা করলে তারাই হবে সীমালঙ্ঘনকারী।
যারা তাদের আমানত ও প্রতিশ্রম্নতি রক্ষা করে এবং
যারা তাদের নামাজে যত্নশীল হয়,
তারা হবে জান্নাতুল ফেরদৌসের অধিকারী। যাতে তারা চিরস্থায়ী হবে।’ (সুরা—২৩ মুমিনুন, আয়াত: ১—১১)
সবোর্পরি: দুনিয়ার প্রশান্তি এবং আখিরাতের মুক্তি অর্জনের জন্য সবসময় জটিল কোনো পথ অনুসরণ করতে হয় না। অনেক সময় ছোট ছোট কিন্তু ধারাবাহিক আমলই জীবনে বড় পরিবর্তন এনে দেয়। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ, তাহাজ্জুদ, সালাতুদ—দুহা, ইস্তিগফার, জিকির ও দোয়া, কোরআন তেলাওয়াত, সৎ লোকদের সংস্পর্শ, সদাকাহ এবং দরুদ শরিফ- এই আমলগুলো যদি আমরা আন্তরিকতার সঙ্গে নিয়মিত পালন করি, তবে আল্লাহ তাআলা আমাদের জীবনে শান্তি, বরকত, সফলতা এবং আখেরাতে নাজাত দান করবেন, ইনশাআল্লাহ।
মন্তব্য (...)
এ সম্পর্কিত আরও প্রবন্ধ
হাদীসের পাঠ : নাজাতের পথ
الحمد لله رب العالمين، والصلاة والسلام على سيد الأنبياء والمرسلين سيدنا ومولانا محمد وعلى آله وأصحاب...
নাজাতের জন্য শিরকমুক্ত ঈমান ও বিদ'আতমুক্ত আমল জরুরী
[প্রদত্ত বয়ান থেকে সংগৃহীত] الحمد لله وكفى وسلام على عباده الذين اصطفى، أما بعد فأعوذ بالله من الشي...
আপনি কি দ্বীনের খাদিম হতে চান?
...
আলেমদের প্রতি আস্থাহীনতা গোমরাহীর প্রথম সোপান
কুরআন-সুন্নাহর আলোকে আলেমগণের মর্যাদা আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের পবিত্র ঘোষনা, এক. إِنَّمَا يَخْشَى الل...
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন