প্রবন্ধ
মুরাকাবা ও মুহাসাবা
১০ জুলাই, ২০২৬
৩৭১
০
আত্মশুদ্ধি, তাকওয়া ও ইহসান অর্জনের দুটি মৌলিক মাধ্যম
ইসলামের লক্ষ্য শুধু বাহ্যিক আমলের সংশোধন নয়; বরং মানুষের অন্তরকে পরিশুদ্ধ করে আল্লাহমুখী বানানো। এ উদ্দেশ্যে কুরআন-সুন্নাহ যে বিষয়গুলোর উপর সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়েছে, তার মধ্যে মুরাকাবা (المراقبة) ও মুহাসাবা (المحاسبة) অন্যতম।
মুরাকাবা মানুষের অন্তরে সর্বক্ষণ এই অনুভূতি সৃষ্টি করে যে, আল্লাহ তাআলা তাকে দেখছেন, শুনছেন এবং তার প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য সব অবস্থা জানেন। আর মুহাসাবা মানুষকে প্রতিদিন নিজের আমল, নিয়ত ও আচরণের বিচার করতে শেখায়।
ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম রহ. বলেন-
المراقبة دوام علم العبد وتيقنه باطلاع الحق سبحانه وتعالى على ظاهره وباطنه.
মুরাকাবা হলো বান্দার অন্তরে সর্বদা এ বিশ্বাস জীবিত থাকা যে, আল্লাহ তাআলা তার প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য সব অবস্থার উপর সদা অবগত। -মাদারিজুস-সালিকীন : ২/৬৫
মুরাকাবা (المراقبة)
মুরাকাবার শাব্দিক অর্থ
"راقب" ধাতু থেকে "মুরাকাবা" শব্দের উৎপত্তি।
অর্থ-
পাহারা দেওয়া
সতর্ক দৃষ্টি রাখা
পর্যবেক্ষণ করা
সর্বদা লক্ষ্য রাখা
শরয়ী অর্থে-
আল্লাহ সর্বদা আমাকে দেখছেন- এই বিশ্বাসকে হৃদয়ে জীবন্ত রাখা।
কুরআনুল কারীমে মুরাকাবার শিক্ষা
১. আল্লাহ আমাকে সর্বদা দেখছেন। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তায়ালা বলেন-
﴿الَّذِي يَرَاكَ حِينَ تَقُومُ وَتَقَلُّبَكَ فِي السَّاجِدِينَ﴾
"যিনি আপনাকে দেখেন যখন আপনি দাঁড়ান এবং সিজদাকারীদের মাঝে আপনার চলাফেরাও দেখেন।"
-সূরা আশ-শু'আরা, আয়াত নং: ২১৮-২১৯
সালাফে সালেহীনের ব্যাখ্যাগুলোতে কিছু শব্দগত পার্থক্য আছে, তবে সবগুলোর মূল শিক্ষা একটিই-
আল্লাহ তাআলা বান্দার সকল অবস্থা, সকল আমল ও সকল নড়াচড়া প্রত্যক্ষ করেন। তাই বান্দার উচিত সর্বদা আল্লাহর উপস্থিতির অনুভূতি (মুরাকাবা) নিয়ে জীবনযাপন করা।
তাফসীরে ইবনে কাছীরের মধ্যে এ আয়াতদ্বয়ের ব্যাখ্যায় মুফাসসিরগণের যে বক্তব্য তুলে ধরা হয়েছে, তা সরল ভাষায় বললে-
ইবনে আব্বাস রা. জোর দিয়েছেন সালাতে দাঁড়ানোর উপর।
ইকরিমা রহ. জোর দিয়েছেন সালাতের প্রতিটি রুকন (দাঁড়ানো, রুকু, সিজদা)-এর উপর।
হাসান বসরী রহ. বলেছেন, একাকী ইবাদতেও আল্লাহ দেখছেন।
দাহ্হাক রহ. বলেছেন, বিছানা বা আসন থেকে ওঠাসহ দৈনন্দিন জীবনেও আল্লাহ দেখছেন।
কাতাদা (রহ.) বিষয়টিকে আরও ব্যাপক করে বলেছেন, দাঁড়ানো, বসা ও সব অবস্থায় আল্লাহ দেখছেন।
﴿وَتَقَلُّبَكَ فِي السَّاجِدِينَ﴾-এর ব্যাখ্যায় কাতাদা, ইকরিমা, আতা খুরাসানী ও হাসান বসরী রহ. বলেছেন, একাকী হোক বা জামাআতে- উভয় অবস্থায়ই আল্লাহ বান্দাকে দেখেন। -তাফসীরে ইবনে কাছীর : ৬/১৫৪
মোটকথা এই আয়াতদ্বয়ের মূল শিক্ষা হলো-
আল্লাহ তাআলা মানুষের প্রতিটি অবস্থা, প্রতিটি ইবাদত, প্রতিটি চলাফেরা ও প্রতিটি কর্ম সম্পর্কে পূর্ণ অবগত। কোনো অবস্থাই তাঁর দৃষ্টি থেকে গোপন নয়। এই বিশ্বাসই মুরাকাবার ভিত্তি।
এ কারণেই মুরাকাবা বিষয়ে আলোচনা করতে গিয়ে আলেমগণ এই আয়াত (﴿الَّذِي يَرَاكَ حِينَ تَقُومُ وَتَقَلُّبَكَ فِي السَّاجِدِينَ﴾) অন্যতম প্রধান দলিল হিসেবে উল্লেখ করেন।
২. অপর আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেন-
﴿أَلَمْ يَعْلَمْ بِأَنَّ اللَّهَ يَرَى﴾
সে কি জানে না যে আল্লাহ দেখছেন? -সূরা আল-আলাক: ১৪
অর্থাৎ সে কি জানে না যে, আল্লাহ তাকে দেখছেন, তার কথা শুনছেন এবং তাকে তার কৃতকর্মের বিনিময় পূর্ণাঙ্গভাবে দিবেন। -তাফসীরে ইবনে কাছীর : ৮/৪৩৮
৩. মুরাকাবার অন্যতম প্রধান ভিত্তি- আল্লাহ তায়ালা পৃথিবীর সবকিছু সম্পর্কে সম্যক অবগত।
কুরআনুল কারীমে ইরশাদ হয়েছে-
﴿يَعْلَمُ مَا يَلِجُ فِي الْأَرْضِ وَمَا يَخْرُجُ مِنْهَا... وَهُوَ مَعَكُمْ أَيْنَ مَا كُنْتُمْ﴾
তিনি জানেন যা যমিনে প্রবেশ করে, যা তা থেকে বের হয়, যা আকাশ থেকে নেমে আসে এবং যা আকাশে আরোহণ করে। আর তোমরা যেখানেই থাকো, তিনি তোমাদের সঙ্গে আছেন। -সূরা আল-হাদীদ : ৪
ইমাম তাবারী (রহ.) বলেন, এই আয়াতের অর্থ হলো- আল্লাহ তাআলার জ্ঞান থেকে কোনো কিছুই গোপন নয়। যমিনের মধ্যে যা কিছু প্রবেশ করে বা বের হয়, আকাশ থেকে যা অবতীর্ণ হয় কিংবা আকাশে যা আরোহণ করে- সবই তিনি জানেন। আর "তিনি তোমাদের সঙ্গে আছেন" অর্থ হলো, তিনি সর্বদা বান্দাদের অবস্থা, আমল, চলাফেরা ও অবস্থান সম্পর্কে পূর্ণ অবগত। -তাফসীরে তবারী : ২২/৩৮৭
ইমাম ইবনে কাসীর রহ. বলেন ﴿وَهُوَ مَعَكُمْ أَيْنَ مَا كُنْتُمْ﴾
"তোমরা যেখানেই থাকো, তিনি তোমাদের সঙ্গে আছেন।"
এ আয়াতাংশের অর্থ হলো- আল্লাহ তাআলা সর্বদা বান্দার উপর পর্যবেক্ষক ও সাক্ষী। মানুষ স্থলে বা সমুদ্রে, রাতে বা দিনে, ঘরে বা প্রান্তরে- যেখানেই থাকুক না কেন, সে আল্লাহর জ্ঞান, দৃষ্টি ও শ্রবণের বাইরে নয়। আল্লাহ তার কথা শোনেন, অবস্থান দেখেন এবং প্রকাশ্য ও গোপন সব বিষয় জানেন। এজন্যই ইহসানের প্রকৃত অর্থ হলো- এমনভাবে আল্লাহর ইবাদত করা যেন তুমি তাঁকে দেখছ; আর যদি তা সম্ভব না হয়, তবে অন্তত এ বিশ্বাস রাখা যে, তিনি তোমাকে দেখছেন। -তাফসীর ইবন কাসীর, ৮/৯;
এই আয়াত ও তাফসীরের মূল শিক্ষা হলো, আল্লাহ তাআলার জ্ঞান, দৃষ্টি ও শ্রবণ সর্বদা বান্দাকে পরিবেষ্টন করে আছে। তাই প্রকাশ্যে-গোপনে, নির্জনে-জনসমক্ষে সর্বাবস্থায় আল্লাহকে উপস্থিত জেনে তাঁর আনুগত্য করা- এটাই মুরাকাবার প্রকৃত অর্থ।
৪. চতুর্থ আয়াত
আল্লাহ তায়ালা বলেন-
﴿إِنَّ اللَّهَ كَانَ عَلَيْكُمْ رَقِيبًا﴾
"নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের উপর সদা পর্যবেক্ষক।" -সূরা আন-নিসা: ১
এই আয়াতটিও মুরাকাবার অন্যতম মৌলিক ভিত্তি। এখানে আল্লাহ তাআলা বান্দাকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন যে, তিনি তার প্রতিটি কথা, কাজ ও অবস্থার উপর সদা পর্যবেক্ষক। তাই মুমিনের উচিত সর্বদা আল্লাহর উপস্থিতির অনুভূতি নিয়ে জীবনযাপন করা।
ইমাম ইবনে কাসীর রহ. বলেন, উক্ত আয়াতের অর্থ হলো—আল্লাহ তাআলা মানুষের সকল আমল ও সকল অবস্থার উপর পর্যবেক্ষক। যেমন আল্লাহ তায়ালা অন্য আয়াতে বলেন-
﴿وَاللَّهُ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ شَهِيدٌ﴾
আল্লাহ সমস্ত কিছু দেখছেন। -সূরা আল-বুরূজ, আয়াত নং: ৯
অতঃপর ইবনে কাসীর রহ. বলেন, এই হাদীস বান্দাকে সর্বদা 'রকীব' (সর্বপর্যবেক্ষক) আল্লাহর মুরাকাবা বা উপস্থিতির অনুভূতি বজায় রাখার নির্দেশনা দেয়। -তাফসীরে ইবনে কাছীর : ২/২০৬
এই আয়াত ও তাফসীরের শিক্ষাও হলো-
আল্লাহ তাআলা সর্বদা বান্দার প্রতিটি আমল ও অবস্থা পর্যবেক্ষণ করছেন। এই বিশ্বাস অন্তরে দৃঢ় হলে মানুষ প্রকাশ্যে ও নির্জনে সমানভাবে আল্লাহর আনুগত্যে অবিচল থাকে। আর এটাই মুরাকাবার প্রকৃত রূপ।
ইমাম তাবারী রহ. বলেন, "الرقيب" অর্থ হলো—আল্লাহ তাআলা সর্বদা মানুষের উপর পর্যবেক্ষক। তিনি তাদের সকল আমল সংরক্ষণ করেন, আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করছে নাকি ছিন্ন করছে- তা নিবিড়ভাবে লক্ষ্য করেন এবং তাদের সব কর্ম সম্পর্কে পূর্ণ অবগত। মুজাহিদ (রহ.) "রকীব" শব্দের অর্থ করেছেন "حفيظ" (সংরক্ষণকারী ও তত্ত্বাবধায়ক)। আর ইবনে যায়েদ রহ. বলেন, এর অর্থ হলো- আল্লাহ তোমাদের সব আমল জানেন ও সেগুলো সম্পর্কে সম্পূর্ণ অবগত। -তাফসীর তাবারী : ৬/৩৪৮–৩৪৯
উক্ত আয়াতে ‘রকীব’ শব্দ আর আমাদের আলোচ্য বিষয় ‘মুরাকাবা’ একই ধাতু থেকে নির্গত।
হাদীসে মুরাকাবা
প্রথম হাদীস
হাদীসে জিবরীল নামক দীর্ঘ হাদীসে ইহসানের মর্মার্থ প্রকাশ করে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-
c، فَإِنْ لَمْ تَكُنْ تَرَاهُ فَإِنَّهُ يَرَاكَ
তুমি এমনভাবে আল্লাহর ইবাদত কর যেন তুমি তাঁকে দেখছ। আর যদি তা সম্ভব না হয়, তবে অন্তত এ বিশ্বাস রাখ যে, তিনি তোমাকে দেখছেন। -সহীহ বুখারী : হাদীস নং ৫০, ৪৭৭৭; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং: ৮, ৯;
ইমাম নববী রহ. বলেন, এটি রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সংক্ষিপ্ত অথচ সর্বাধিক ব্যাপক বাণীগুলোর একটি। এর উদ্দেশ্য হলো, বান্দা যেন এমন একাগ্রতা, বিনয় ও আন্তরিকতার সঙ্গে আল্লাহর ইবাদত করে, যেন সে আল্লাহকে প্রত্যক্ষ করছে। আর যেহেতু বান্দা আল্লাহকে দেখতে পায় না, তাই সর্বদা এ বিশ্বাস রাখবে যে, আল্লাহ তাকে দেখছেন। এই অনুভূতিই ইবাদতে ইখলাস, খুশূ-খুযূ এবং পরিপূর্ণতা সৃষ্টি করে। অতঃপর ইমাম নববী রহ. বলেন, এ হাদীসের মূল উদ্দেশ্য হলো ইবাদতে ইখলাস এবং সর্বাবস্থায় আল্লাহর মুরাকাবা (তাঁর সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণের অনুভূতি) প্রতিষ্ঠা করা। আর কাযী ইয়ায (রহ.) মন্তব্য করেন, এই হাদীস ইসলামের বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ সকল ইবাদত, ঈমান, আন্তরিকতা এবং আমলের ত্রুটি থেকে আত্মরক্ষার মৌলিক নীতিগুলোকে একত্রে ধারণ করেছে। -শরহু মুসলিম নববী : ১/১৫৭
দ্বিতীয় হাদীস : সর্বত্র তাকওয়া
হযরত আবু যর রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমাকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-
اتَّقِ اللهَ حَيْثُمَا كُنْتَ، وَأَتْبِعِ السَّيِّئَةَ الْحَسَنَةَ تَمْحُهَا، وَخَالِقِ النَّاسَ بِخُلُقٍ حَسَنٍ.
তুমি যেখানেই থাকো, আল্লাহকে ভয় করো (তাঁর অবাধ্যতা থেকে বেঁচে থাকো)। কোনো মন্দ কাজ হয়ে গেলে তার পরে একটি ভালো কাজ করো, তা সেই মন্দ কাজ মুছে দেবে। আর মানুষের সঙ্গে উত্তম চরিত্রে আচরণ করো।
সালাফদের দৃষ্টিতে মুরাকাবা
ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম রহ. বলেন-
مَنْ تَحَقَّقَ فِي الْمُرَاقَبَةِ خَافَ عَلَى فَوَاتِ لَحْظَةٍ مِنْ رَبِّهِ لَا غَيْرَ.
জুনাইদ রহ. বলেন, যার অন্তরে প্রকৃত মুরাকাবা সৃষ্টি হয়, সে এক মুহূর্তের জন্যও আল্লাহকে ভুলে যেতে বা তাঁর উপস্থিতির অনুভূতি হারাতে ভয় পায়। -মাদারিজুস সালিকীন : ২/৬৫
যুননুন মিসরী (রহ.) বলেন¬-
عَلَامَةُ الْمُرَاقَبَةِ إِيثَارُ مَا أَنْزَلَ اللَّهُ، وَتَعْظِيمُ مَا عَظَّمَ اللَّهُ، وَتَصْغِيرُ مَا
মুরাকাবার নিদর্শন হলো- আল্লাহ যা পছন্দ করেন তাকে অগ্রাধিকার দেওয়া এবং আল্লাহ যাকে মর্যাদা দিয়েছেন তাকে মর্যাদা দেওয়া। -মাদারিজুস সালিকীন : ২/৬৫; রিসালাতুল কুশাইরিয়া : ১/৩৩১
মুহাসাবা (المحاسبة) :
আত্মসমালোচনার মাধ্যমে আত্মশুদ্ধির এক অনন্য পদ্ধতি
মানুষ ভুল-ত্রুটি থেকে মুক্ত নয়। শয়তানের প্ররোচনা, নফসের চাহিদা এবং দুনিয়ার ব্যস্ততার কারণে মানুষ প্রায়ই আল্লাহর নির্দেশ পালনে ত্রুটি করে বসে। তাই ইসলাম শুধু নেক আমলের আদেশই দেয়নি; বরং নিয়মিত নিজের আমল পর্যালোচনা করে ভুল সংশোধনেরও শিক্ষা দিয়েছে। ইসলামী পরিভাষায় এটিই মুহাসাবা (المحاسبة)।
মুরাকাবা যেমন মানুষকে গুনাহ থেকে বিরত রাখে, তেমনি মুহাসাবা তাকে সংঘটিত ভুলের সংশোধন ও তাওবার পথে পরিচালিত করে। তাই আত্মশুদ্ধির ক্ষেত্রে এ দুটি গুণ পরস্পরের পরিপূরক।
মুহাসাবার পরিচয়
মুহাসাবা শব্দটি "حَاسَبَ" ধাতু থেকে এসেছে। এর অর্থ- হিসাব নেওয়া, পর্যালোচনা করা, আত্মসমালোচনা করা।
পরিভাষায় বলা যায়, আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে নিজের ঈমান, নিয়ত, কথা, কাজ ও চরিত্রের বিচার-বিশ্লেষণ করে ত্রুটি সংশোধনের প্রচেষ্টাই মুহাসাবা।
কুরআনে মুহাসাবার নির্দেশ
আল্লাহ তাআলা বলেন-
يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ ٱتَّقُواْ ٱللَّهَ وَلۡتَنظُرۡ نَفۡسٞ مَّا قَدَّمَتۡ لِغَدٖۖ وَٱتَّقُواْ ٱللَّهَۚ إِنَّ ٱللَّهَ خَبِيرُۢ بِمَا تَعۡمَلُونَ
হে মুমিনগণ! আল্লাহকে ভয় কর এবং প্রত্যেকেই ভেবে দেখুক আগামী কালের জন্য সে কী অগ্রিম পাঠিয়েছে এবং আল্লাহকে ভয় কর। নিশ্চয়ই তোমরা যা-কিছু কর সে সম্পর্কে আল্লাহ পুরোপুরি অবগত। -সূরা হাশর : ১৮
ইমাম ইবনে কাসীর রহ. বলেন,﴿وَلْتَنْظُرْ نَفْسٌ مَا قَدَّمَتْ لِغَدٍ﴾ আয়াতের অর্থ হলো—কিয়ামতের আগে প্রত্যেক মানুষের উচিত নিজের আমলের হিসাব নেওয়া এবং আখিরাতের জন্য কী নেক আমল সঞ্চয় করেছে তা পর্যালোচনা করা। এরপর আল্লাহ পুনরায় তাকওয়ার নির্দেশ দিয়ে স্মরণ করিয়ে দেন যে, তিনি মানুষের সব আমল ও অবস্থা সম্পর্কে পূর্ণ অবগত; কোনো ছোট-বড় কাজই তাঁর কাছ থেকে গোপন নয়। -তাফসীরে ইবনে কাছীর : ৮/৭৭
নিম্নোক্ত হাদীস থেকেও মুহাসাবার নির্দেশনা পাওয়া যায়।
হযরত শাদ্দাদ ইবনে আউস রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-
الكَيِّسُ مَنْ دَانَ نَفْسَهُ وَعَمِلَ لِمَا بَعْدَ المَوْتِ، وَالعَاجِزُ مَنْ أَتْبَعَ نَفْسَهُ هَوَاهَا وَتَمَنَّى عَلَى اللَّهِ
প্রকৃত বুদ্ধিমান সেই ব্যক্তি, যে নিজের নফসের হিসাব নেয় এবং মৃত্যুর পরের জীবনের জন্য আমল করে। আর অক্ষম ব্যক্তি সেই, যে নিজের নফসকে প্রবৃত্তির অনুসরণে ছেড়ে দেয় এবং আল্লাহর কাছে শুধু আশা-আকাঙ্ক্ষা পোষণ করে।
ইমাম তিরমিযী (রহ.) হাদীসের «مَنْ دَانَ نَفْسَهُ» অংশের ব্যাখ্যায় বলেন, এর অর্থ হলো- যে ব্যক্তি কিয়ামতের আগে দুনিয়াতেই নিজের আমলের হিসাব নেয়। এরপর তিনি উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)-এর উক্তি উল্লেখ করেন: "তোমাদের হিসাব নেওয়ার আগেই নিজেদের হিসাব নাও।" কেননা, যে ব্যক্তি দুনিয়ায় নিজের হিসাব নেয়, কিয়ামতের দিনের হিসাব তার জন্য সহজ হবে। এছাড়া মাইমূন ইবনে মিহরান রহ. বলেন, বান্দা ততক্ষণ প্রকৃত মুত্তাকী হতে পারে না, যতক্ষণ না সে নিজের আমলের হিসাব এমনভাবে নেয়, যেমন একজন ব্যবসায়ী তার অংশীদারের আয়-ব্যয়ের হিসাব নেয়।
সূত্র: জামে তিরমিযী, হাদীস ২৪৫৯-এর ব্যাখ্যা।
সালাফদের জীবনে মুহাসাবা
উমর ইবনুল খাত্তাব রা. বলেন-
حَاسِبُوا أَنْفُسَكُمْ قَبْلَ أَنْ تُحَاسَبُوا وَزِنُوهَا قبل أن توزنوا
তোমাদের হিসাব নেওয়ার আগেই নিজেদের হিসাব নাও। আর তোমাদের আমল ওজন হওয়ার আগেই নিজেরাই তা যাচাই (মূল্যায়ন) করো। -ইহইয়াউ উলূমিদ্দীন : ৪/৪০৪
অন্য বর্ণনায় এসেছে-
উমর ইবনুল খাত্তাব রা. বলেন:
তোমাদের হিসাব নেওয়ার আগেই নিজেদের হিসাব নাও। তোমাদের আমল ওজন হওয়ার আগেই নিজেরা তা যাচাই করো। আর সেই মহা উপস্থাপনার (কিয়ামতের) দিনের জন্য নিজেদের প্রস্তুত করো।
তিনি আবু মূসা আল-আশআরী রা.-কে লিখেছিলেন-
সুদিনে (স্বাচ্ছন্দ্যের সময়) নিজের হিসাব নাও, কঠিন দিনের (কিয়ামতের হিসাবের) আগে। -ইহইয়াউ উলূমিদ্দীন : ৪/৩৯৬
এই উক্তির মূল শিক্ষা হলো- যে ব্যক্তি দুনিয়ায় নিয়মিত আত্মসমালোচনা করে নিজের ভুল সংশোধন করবে, কিয়ামতের হিসাব তার জন্য সহজ হবে।
মুহাসাবার গুরুত্ব
মুহাসাবা মানুষের অন্তরকে জাগ্রত রাখে এবং আত্মতুষ্টি থেকে রক্ষা করে। যে ব্যক্তি নিয়মিত নিজের হিসাব নেয়, সে সহজেই নিজের ত্রুটি উপলব্ধি করতে পারে, দ্রুত তাওবা করে এবং একই ভুল পুনরাবৃত্তি থেকে বেঁচে থাকার চেষ্টা করে। এভাবেই তার ঈমান, ইখলাস ও তাকওয়া ক্রমাগত বৃদ্ধি পায়।
কী কী বিষয়ে মুহাসাবা করা উচিত?
প্রতিদিন একজন মুমিন নিজেকে কয়েকটি প্রশ্ন করতে পারে—
ফরজ ইবাদতগুলো যথাযথভাবে আদায় করেছি কি?
কোনো ওয়াজিব বা সুন্নতের প্রতি অবহেলা হয়েছে কি?
আমার নিয়ত কি আল্লাহর জন্য বিশুদ্ধ ছিল?
আমার মুখ থেকে গীবত, মিথ্যা বা কষ্টদায়ক কথা বের হয়েছে কি?
কারও হক নষ্ট করেছি কি?
কোনো গুনাহ হয়ে থাকলে আমি কি আন্তরিক তাওবা করেছি?
আজকের দিনটি কি গতকালের তুলনায় আল্লাহর নৈকট্য অর্জনে বেশি সহায়ক হয়েছে?
মুহাসাবার উপকারিতা
আত্মশুদ্ধি ও তাকওয়া বৃদ্ধি পায়।
গুনাহের প্রতি সংবেদনশীলতা সৃষ্টি হয়।
তাওবা ও ইস্তিগফারের অভ্যাস গড়ে ওঠে।
ইবাদতে ইখলাস ও আন্তরিকতা বৃদ্ধি পায়।
চরিত্র ও আচরণের উন্নতি হয়।
কিয়ামতের কঠিন হিসাবের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ সহজ হয়।
উপসংহার
মুহাসাবা একজন মুমিনের নিত্যদিনের আত্মশুদ্ধির অনুশীলন। মুরাকাবা তাকে গুনাহ থেকে সতর্ক রাখে, আর মুহাসাবা তাকে ভুল সংশোধন ও আল্লাহর দিকে ফিরে আসার সুযোগ করে দেয়। তাই প্রতিদিন কিছু সময় নিজের আমলের হিসাব নেওয়া, ত্রুটি স্বীকার করা, তাওবা করা এবং আগামী দিনের জন্য নিজেকে আরও উন্নত করার সংকল্প গ্রহণ করা- একজন সচেতন মুমিনের বৈশিষ্ট্য। এভাবেই মুহাসাবা মানুষকে ধীরে ধীরে ইহসান, তাকওয়া ও আল্লাহর সন্তুষ্টির উচ্চ মর্যাদায় পৌঁছে দেয়।
মন্তব্য (...)
এ সম্পর্কিত আরও প্রবন্ধ
ঈমান-আমল সুরক্ষিত রাখতে হক্কানী উলামায়ে কেরামের সঙ্গে থাকুন, অন্যদের সঙ্গ ছাড়ুন
[প্রদত্ত বয়ান থেকে সংগৃহীত] হামদ ও সালাতের পর... قال الله تعالى: يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتّ...
ইলমে দীন ও আধুনিক শিক্ষার সমন্বয় ভাবনা
[প্রদত্ত বয়ান থেকে সংগৃহীত] আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন,اليوم أكملت لكم دينكم وأتممت عليكم نعم...
ঝাড়ফুঁক-তাবীয : একটি দালীলিক বিশ্লেষণ (৩য় পর্ব)
...
ইয়াহুদী-খ্রিস্টানদের বহুমুখী ষড়যন্ত্র মুসলিম উম্মাহর করণীয়
কুরআন-হাদীসে ইয়াহুদী-খ্রিস্টানের পরিচয় ইয়াহুদী জাতি পৃথিবীর প্রাচীনতম জাতি। আল্লাহ তা'আলা হযরত নূহ আ...
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন